-
ঈদ অথবা আমার মায়ের বাড়ি
(ক’দিন পর ঈদ , কার ঈদ ? )
রেদওয়ান খানআমার উৎসবগুলো বহুকাল ধরে থমকে আছে মায়ের কবরে–
সেইখানে বাঁশঝাড় আর পাতাবাহারেরা কালের বাতাসে কাঁপছে ।শুকনো ডাল থেকে হলদে পাতারা ঝরে যায় চৈত্র-দুপুরে–
যেন আমারই মর্মরিত অশ্রু– টুপটাপ টুপটাপ !
দূরের আকাশে ভেসে ভেসে ডেকেছিল , কেঁদেছিল যে-শঙ্খচিল
সে-আমারই কলিজা বিদীর্ণ-করা দুঃখ– ঝিলমিল
আর আমি কিছুতেই নদীটি অতিক্রম করতে পারি না
ডাকাতিয়ার পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি– চূর্ণ-বিচূর্ণ মহাকাল ।
হেমাঙ্গ মাঝির খেয়া নৌকাটি চিৎ হয়ে শুয়ে আছে ;
স্রোতহীন স্তব্ধ কচুরি ফুলের আড়ালে–
রোদ পোহাচ্ছে ভীষণ ঘুমকাতুরে মা কচ্ছপ আর তার সাতটি ছানা !
এই দৃশ্য দেখে আমি করতলে মুখ রেখে প্রার্থনায় ভেঙে পড়ে কাঁদছি…
এ-আমার ঈদের মোনাজাত !এ-নদী পেরোলেই আমাদের বাড়ি !
সে-বাড়ির চিহ্ন হয়ে সবচেয়ে উঁচু দেবদারু গাছটি এখনও ডাকছে সন্ধ্যায় , ইশারায়
মনে হয়, অন্ধকার চরাচরে কেউ নাই, কিছু নাই , আমি একা– মহানিঃসঙ্গ , অসহায়…
এ-নদী পেরোলেই আমার শৈশব, ছেলেবেলা, যৌবন, আমাদের ময়দান– ঈদের জামাত ।
আমাদের মুখে মুখে , ক্ষুদ্র অন্তরে বেজে-ওঠা পরম বিশ্বাস , মৃদু স্বর– কলেমা সাহাদাৎ
এক হাতে নিবারণের মুড়ির মোয়া আরেক হাতে বাঁশি– ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে-যাওয়া ঈদ–
এ-সবই ছিল মায়ের বিবাহের শাড়িটির মতো নেপথালিন-মাখা লাজুক স্মৃতি– আনন্দ-সঙ্গীত ।
এ-নদী পেরোলেই আমাদের বাড়ি
পুরনো কাপড়ওয়ালাকে কে যেন বিকিয়েছে
পরতে পরতে রোদমাখা আমার মায়ের বিবাহের শাড়ি !–
এই প্রশ্ন জেগে উঠলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাতারাতি এক ধূ ধূ বালুচর
হারিয়ে ফেলেছি জুঁইফুল , মায়ের বানানো ঘর , আলোহীন সেই বাড়ি– ভীষণ ধূসর ।আমার উৎসবগুলো বহুকাল ধরে থমকে আছে মায়ের কবরে ।
সেইখানে বাঁশঝাড় আর পাতাবাহারেরা কালের বাতাসে কাঁপছে ।একদা মায়ের মুখর উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে আমি যেন একখণ্ড পাথর-ফলক
আমাকে খোদাই করে কালের রাখালেরা এঁকে যায় নূতন কালের ক্ষয় ।টিনের ঘরের চাল খুলে নিয়ে গেছে অংশীদার হিংসুক করাতি-সময়–
শ্রাবণের বৃষ্টিতে সেই চালে বেজেছিল কত-না জীবনের লৌকিক সঙ্গীত
সে-ঘরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একদিন, আতরের নীল কৌটা খুলে
ঈদের পবিত্র গন্ধে মাতাল হয়ে উঠতাম আমরা সাত ভাই-বোন
ময়দানে নামাজ শেষে বাড়ি ফিরলে মা বলতেনঃ
’আয়, এট্টু সেমাই খেয়ে তোর নানাবাড়ি ঘুরে আয়–
তোর নানার লাইগ্যা রাঁনছিলাম কড়কড়া মুগডাল দিয়া লাল রাতার সালুন !’
তখন মায়ের চোখের সুরমায় ঝিলিক দিয়ে উঠতো গুচ্ছ গুচ্ছ জীবন ।আমার উৎসবগুলো বহুকাল ধরে থমকে আছে মায়ের কবরে ।
সেইখানে বাঁশঝাড় আর পাতাবাহারেরা কালের বাতাসে কাঁপছে ।
আর আমি , কিছুতেই পার হতে পারি না নদী– মৃত ডাকাতিয়া
এ-নদী পেরোলেই অশ্বত্থ-বটের ছায়পথের প্রান্তে আমাদের বাড়ি !কসকো সাবান মেখে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে এসে , ভেজা চুলে–
তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করলে , মা মিটিমিটি হাসতেন ( আহা কী মিষ্টি ! )
সেই হাসিই ছিল আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঈদের বকশিস !
আর মা , একটু পর পর , ধোঁয়া-ওড়া রসুই ঘরে ফিরনী রাঁধতে রাঁধতে
ভেজা আঁচলের খুঁট খুলে খুলে বিলিয়ে দিতেন চকচকে সুগোল মোহর–
কোন দূর গাঁ থেকে আসা কোঁকড়াচুল হাজেরা বিবিকে
কোন দূর গাঁ থেকে আসা দু’ঠ্যাং-পোড়া ঠুণ্ডি বুড়িকে
কোন দূর গাঁ থেকে আসা ’চশমাধারী কালা বেটি’-কে
আর রমা পাগলার মায়াবী বৌটি, ঈদের বিহানে, টুক টুক পায়ে এসে–
লাজুক কণ্ঠে বলতেন, ‘ও বুবু, আমারে দিবেন না কিছু ফিতরা-যাকাত !’
মা নেই আজ, যেন বহুকাল থমকে আছে ঈদের নামাজ– দু’রাকাত ।মানুষের জন্য মায়ের মমতা-ই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড়ো ঈদ ।
নামাজ শেষে এ-পাড়া ও-পাড়া বেড়ানো কিছুতেই শেষ হতো না আমাদের ।
মেয়েদের চুলের ফিতায় উড়ে বেড়াতো শিরিষ ফুলের মতো তুলতুলে শেষ বিকেলের ঈদ
তারপর , পাড়া বেড়িয়ে ঘরে এলে–
মাগরিবের নামাজের সালাম ফিরিয়ে মা, পুনরায় বলতেনঃ
’আল্লাহ, তুমি আরেকটা ঈদ পর্যন্ত সবাইকে সহী-সালামতে রাইখ্যো !’
কুপিবাতির কম্পমান আলো যেন মায়ের কথারই আলো ছড়িয়ে রাখতো–
জায়নামাজে ,
ঘরের চৌখুপী জানালায় ,
শিকায় ঝুলানো হলদে শসার দোলনায় ।আমার উৎসবগুলো বহুকাল ধরে থমকে আছে মায়ের কবরে ।
সেইখানে বাঁশঝাড় আর পাতাবাহারেরা কালের বাতাসে কাঁপছে ।মা যে-কড়ির বাটিতে করে সেমাই খেতে দিতেন, সে-বাটি এখন কার দখলে ?
মায়ের আঁচলে মোছা সেই চিহ্ন নিয়ে কারো কোনো কথা নাই, অশ্রুপাত নাই !
এমনকি কোনো মাছিও ওড়ে না আর বৈশাখী-ঢুলমুল গরমে , মোহনভোগের তলায় ;
আয়না-বাঁধানো সোনার হরিণের মতো হারিয়ে গিয়েছে আমাদের সেইসব ঈদ–
বাঁশঝাড় পাতাবাহারের বাগান পেরিয়ে মা কি আজ আসবেন ?
মা , আজ ঈদ , আপনার জন্য এনেছি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি !
অশ্রুনদীর ওপারেই আমার মায়ের সেই ভীষণ সুন্দর একেলা বাড়ি…আমি কিছুতেই নদীটি পার হতে পারি না, নদীর ওপারে আমার মায়ের বাড়ি, ঘর
ফিতরের খুৎবা শুনে চোখ মেলে দেখি– মা নাই, পড়ে আছে কালের জীর্ণ পাথর ।11 Comments -
Friends
নাজমুল হাসান
@nazmulhasan-bdde
অরণ্য
@xoykumar
রবিউল আলম মাজেদ
@majed1997
Masfi K
@masfi-mohammad
ছন্নছাড়া মহাপ্রান
@mihirmilton
বিদৌরা প্রিয়দর্শিনী বারহান
@bedowrapriodarshini
সা দি য়া (নন্দিনী)
@nandini
প্রিন্স ঠাকুর
@princetagorebd
Drako Shajib
@drako



আমি স্তব্ধ! মন কেমন করা একটা অনুভূতি নিয়ে পড়ে শেষ করলাম আর মনে হলো পুরোটা সময় আমার চোখের সামনে দিয়ে পার হয়ে গেলো।