-
প্রিয় তুহিন,
অনেক অনেক দিন পরে তোমাকে লিখতে বসলাম।
তোমার বড় ছেলে ১৮ বছরে এবং ছোটো ছেলে ১৬তে পড়েছে।
এই অনেক অনেক দিনের মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে।
অনেক কিছুর সাক্ষী হয়েছি আমরা, যা কখনো চিন্তাও করিনি।
সারাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিলো। আর আমি! তুমি ছাড়া একা তোমার দুইছেলেকে নিয়ে উৎকন্ঠায় দিন/রাত কাটিয়েছি।
এক মহামারীর সময়ে তোমাকে হারিয়ে আমি এমনিতে ই দিশেহারা , আর এক আন্দোলনে তোমার বড় ছেলেকে আমি কিছুতেই আটকে রাখতে পারিনি।
প্রতিটি মূহুর্তে ই মনে হয়েছে আমি ওকে হারিয়ে ফেললাম।
তুহিন , আমি বড্ড স্বার্থপর।
ও যখন আমাকে বলেছিলো- সবাই তো যাচ্ছে আমি যাবো না কেন?
আমি ওকে বলেছিলাম – “সবাইকে আমি চিনি না, তুমি আমার ,আমি শুধু তোমাকেই চিনি। তোমার কিছু হলে , সেটা আমার হবে। ”
কি রাগ করছো আমার কথা শুনে?
তুহিন , আসলে এটাই বাস্তবতা। এটাই সত্যি।
যার প্রমান আমি পেয়েছি তুমি চলে যাওয়ার পরে।
কাছের ,দূরের কাউকে ই আমার পাশে পাইনি।
সবাই যেন আমাদের কাছ থেকে শতেক দূরে চলে গেছে।
হয়তো তাদের ধারণা ছিলো আমাদের পাশে থাকা মানে আমাদের দায়িত্বের বোঁঝা নেওয়া।
তাই একদিন যারা তোমার খুব কাছের ছিলো , তুমি যাদের জন্য বিনা স্বার্থে সব কিছু করতে তাদের দ্বারাই আমরা ক্ষত, বিক্ষত হয়ে গেলাম।
সুযোগ সন্ধানীরা সুযোগের সদব্যবহার করলো।
এতকিছুর পরেও যখন আমি উঠে দাঁড়িয়ে চলা শুরু করলাম, তখন বারবার পিছন থেকে আমাকে টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করলো এবং করেই চলেছে।
তুহিন ,সব জায়গায় এটা ঘটেছে এবং ঘটছে।আমার যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও যেন আমাকে অযোগ্য প্রমাণ করতে পারলেই তারা খুশী।
হ্যাঁ , আমি তাদের খুশীতে হাত দেই না।
তাই আমার কাছে দেশ মানে আমার পরিবার।আমার পরিবারের সদস্যদের যদি আমি সঠিকভাবে লালন -পালন করতে পারি , তবেই আমার ক্ষুদ্র পরিসর থেকে দেশের কাজ করা হবে বলে আমি মনে করি।
এই সব কারণেই তোমার ছেলেকে আমি বাধা দিয়েছিলাম।
আমি যখন মা হয়েছি, তখন থেকেই শুধু নিজের ছেলেদেরই মা হইনি।সবার সন্তানকেই আমি অন্তর থেকে সন্তান ভাবি এবং জানি।
আবু সাইদ যেদিন শহীদ হলো, আমার বুকের মধ্যে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হলো।আমি বারবার তার ভিডিও টা দেখছিলাম এবং কষ্টে আমার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছিলো।
শহীদ আবু সাইদ কিভাবে বুক প্রসস্থ করে সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো?
তার সামনে যাদেরকে দেখছিলো , তারাও তো ঠিক তারই মতো। দুটো হাত, দুটো পা, দিটো চোখ..একদম মানুষের ই মতো দেখতে। এবং এই বাংলা মায়েরই সন্তান! একই আলো বাতাসে , রোদ্র ছায়ায় বেড়ে উঠেছে।
তার সাথে পার্থক্য শুধু একটা পেশার।যে পেশার টাকা আবু সাইদ , আমাদের সবার ট্যাক্স থেকেই পেয়ে থাকে।
সে কিভাবে তাকে বুলেট ছুড়তে পারবে তার বুকে?
যদিও বা ছুড়েই তবু ও সেটা তার পায়েই লাগবে।
কিন্তু নাহ্ , আবু সাইদকে একটা নয় বরং চার চারটি বুলেট ঝাঁঝড়া করেছে।
এই দৃশ্য সহ্যকরা কি সম্ভব ,তুহিন?
আমি জানি প্রতিটি মা- বাবাই সেই সময়ে ঘুমাতে পারেনি।
তুহিন , আমার স্কুলের একজন বান্ধবী সেই সময়ে প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আল্লাহর সাথে ঝগড়া করতো।
হাসছো তুমি! এমনই দিন পার করেছি আমরা।
তুহিন তোমার ছোট ছেলের কথা বলি এবার।
কার্ফিউ চলছিলো দেশে তখন। যখন কার্ফিউ তুলে নিতো তখন একদিন ওকে বললাম- আমি বাজার করতে যাবো , তুমি যাবে আমার সাথে?
ও রাজি হয়ে গেলো। খুব দ্রুত বাজার করে ফিরতে হবে, ওকে বললাম- চলো KFC তে খাওয়াই।
ও বললো- খাবো না, তুমি আমাদের স্কুলের কাছে চলো।
নিয়ে গেলাম ওকে, স্কুল দেখলো।পুরো ২৭ নং রোড ও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো।
পরে বুঝতে পারলাম ও কেন এভাবে মনোযোগ দিয়ে ২৭ নং রোড দেখছে। কারণ তার একদিন আগে ফারহান ২৭ নং এই শহীদ হয়েছে।
তোমাকে বলতে ভুলেই গেছি- তোমার ছোট ছেলে খুব কম কথা বলে এবং যে কথা বলে সেটাও খুব ধীরে।
তোবে বন্ধুদের সাথে বেশ ভালো ই গল্প করে।
যতই দিন পার হচ্ছিলো , ততই যেন পরিস্থিতি ভয়ংকর রুপ নিচ্ছিলো।
তুমি শুনলে হাসবে যে, তখন আমি রাশি চক্রে দেখতাম।কি আছে আমার ভাগ্যে? ঠিক ৫আগষ্ট এও আমি ভোরে উঠে অনলাইন পেপারে রাশি চক্র দেখলাম।তাতে লেখা ছিলো – আজ আপনার সন্তান আপনার বাধ্য থাকবে😁।
আমি খুশিতে মাহিনকে ডেকে দেখালাম।
তুমি ভাবতে পারো, কতোটা অসহায় অবস্থায় ছিলাম যে রাশি ফল দেখে সান্ত্বনা খুঁজেছি!
এবার আসি আমার কথায়। আমি এখন ক্লাইম্যাক্টেরিক ফেজ পার করছি।
এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া , রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হ্রাস পাওয়ার কারণে ই স্বাভাবিক ভাবেই এটা মেয়েদের হয়ে থাকে।
এই সময়ে নানা উপসর্গ দেখা দেয়।আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আর সব উপসর্গের পাশাপাশি যেটা হয় তা হলো – মেজাজ খিটখিটে।
সবার সাথে ই খিটখিটে ব্যবহার করি, ছেলেদেরও এখন যে পরিবর্তন হচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তারা কথা শুনবে না, তর্ক করবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাই ওদের খিয়খিটানি এবং আমার খিটখিটানি কাটাকাটি হয়ে যায় 😜😆।
তুমি থাকলে আমাকে এবং তোমার ছেলেদেরকে এই সময়ে সবচেয়ে বেশী সাপোর্ট দিতে জানি।
আজ এপর্যন্ত ই
তোমার হেনা।
২৭/১০/২০২৪1 Comment
Friends
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed
মেঘ
@megh
রোদেলা শিশির
@rodelashishir


ভালো লাগলো