Profile Photo

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরীOffline

  • shakawat83
  • হেপাটাইটিস প্রতিরোধে করণীয় কী? সহজ পদক্ষেপে সুস্থ জীবন

    হেপাটাইটিস হলো লিভারের এক ধরনের প্রদাহজনিত রোগ, যা মূলত ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। একে নীরব ঘাতক রোগও বলা হয়, কারণ এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রায়শই স্পষ্ট হয় না, বা খুবই মৃদু থাকে। এর ফলে রোগীর যতক্ষণ না পর্যন্ত লিভারের গুরুতর ক্ষতি হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই রোগ সম্পর্কে অবগত থাকেন না। যেকারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বা লিভারের জটিল রোগে ভুগতে থাকেন।
    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন ব্যক্তি হেপাটাইটিসের কারণে মারা যায়। এই ভয়াবহতার মধ্যেও একটি আশার কথা হলো—প্রতিরোধই হেপাটাইটিসের সেরা চিকিৎসা। সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব এবং কিছু ভুল ধারণার কারণে অনেকেই প্রতিরোধের সহজ উপায়গুলো সম্পর্কে জানেন না। এই নিবন্ধে আমরা হেপাটাইটিস প্রতিরোধের সহজ ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে সুস্থ জীবন ধারণে সহায়তা করবে।
    হেপাটাইটিস কী এবং কেন এটি ভয়ংকর?
    হেপাটাইটিস বলতে লিভারের প্রদাহকে বোঝায়। আমাদের শরীর পরিচালনায় লিভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে; এটি রক্তকে পরিশোধিত করে, পুষ্টি উপাদান প্রক্রিয়াজাত করে এবং হজমে সহায়তা করে। যখন লিভারে প্রদাহ হয়, তখন লিভারের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। হেপাটাইটিস প্রধানত পাঁচ ধরনের ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট হয়: হেপাটাইটিস A, B, C, D এবং E।
    হেপাটাইটিস A ও E: সাধারণত দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এগুলো তীব্র কিন্তু স্বল্পমেয়াদী হয় এবং সাধারণত লিভারের স্থায়ী ক্ষতি করে না।
    হেপাটাইটিস B, C ও D: এগুলো রক্ত ও অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস B ও C দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক হতে পারে, যা লিভারের গুরুতর ক্ষতির কারণ। হেপাটাইটিস D কেবল হেপাটাইটিস B ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেই দেখা যায়।
    হেপাটাইটিস কেন ভয়ংকর? কারণ, হেপাটাইটিস B ও C ভাইরাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সময়ের সাথে সাথে এটি লিভার সিরোসিস (লিভারের কোষগুলো শক্ত হয়ে কার্যক্ষমতা হারায়) এবং লিভার ক্যানসারে রূপ নিতে পারে, যা প্রায়শই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হয়।
    কীভাবে সংক্রমিত হয়
    হেপাটাইটিস ভাইরাস প্রতিরোধ করতে হলে কীভাবে এই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটায় সে সম্পর্কে জানা জরুরি:
    দূষিত খাদ্য ও পানি (হেপাটাইটিস A ও E): এই ভাইরাসগুলো সাধারণত অরক্ষিত পানি, অপরিষ্কার খাবার বা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে ছড়ায়।
    রক্ত ও রক্তজাত পণ্য (হেপাটাইটিস B, C ও D): দূষিত রক্ত সঞ্চালন, জীবাণুমুক্ত নয় এমন সুঁইয়ের ব্যবহার (যেমন: মাদক গ্রহণ), বা দূষিত ব্লেড-রেজারের মাধ্যমে হেপাটাইটিস B, C ও D ছড়াতে পারে।
    যৌন সংস্পর্শ (হেপাটাইটিস B, C): অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে হেপাটাইটিস B এবং কিছু ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস C ছড়াতে পারে।
    একাধিকবার ব্যবহৃত সূঁচ বা ব্লেড: ট্যাটু, পিয়ারসিং, বা সেলুনে ব্যবহৃত জীবাণুমুক্ত নয় এমন সূঁচ, ব্লেড বা সরঞ্জাম থেকে হেপাটাইটিস B ও C ছড়াতে পারে।
    মায়ের দেহ থেকে নবজাতকে সংক্রমণ (হেপাটাইটিস B): হেপাটাইটিস B আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময় নবজাতকের দেহে ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।
    হেপাটাইটিস প্রতিরোধে করণীয়
    কিছু সহজ এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
    ১. টিকাদান
    টিকাই হেপাটাইটিস প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়:
    হেপাটাইটিস A ও B-এর জন্য কার্যকর টিকা: এই দুটি ভাইরাসের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর টিকা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দেয়।
    শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া: শিশুদের জন্মের পরপরই হেপাটাইটিস B-এর টিকা দেওয়া হয়। এটি জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির (EPI) অন্তর্ভুক্ত। শিশুদের এই টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
    প্রাপ্তবয়স্কদেরও ঝুঁকি থাকলে টিকা নেওয়া: হেপাটাইটিস A বা B ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি থাকলে (যেমন: স্বাস্থ্যকর্মী, ভ্রমণকারী, বা পরিবারে আক্রান্ত ব্যক্তি থাকলে) প্রাপ্তবয়স্কদেরও টিকা নেওয়া উচিত।
    ২. নিরাপদ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি
    হেপাটাইটিস A ও E প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও বিশুদ্ধ পানি:
    ফুটানো পানি পান করা: টিউবওয়েলের পানি বা সরবরাহকৃত পানি ফুটিয়ে পান করুন।
    বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা: রাস্তার ধারে তৈরি খোলা খাবার বা অপরিষ্কার পরিবেশে তৈরি খাবার পরিহার করুন।
    স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার অভ্যাস: খাবার তৈরি ও খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করুন।
    ৩. নিরাপদ রক্ত গ্রহণ
    রক্তবাহিত হেপাটাইটিস প্রতিরোধে রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি:
    রক্ত দেওয়ার আগে স্ক্রিনিং করা: নিশ্চিত করুন যে রক্ত দেওয়ার আগে দাতা হেপাটাইটিস এবং অন্যান্য রক্তবাহিত রোগের জন্য পরীক্ষা করা হয়েছে।
    রেজিস্টার্ড ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত গ্রহণ: শুধুমাত্র সরকারি অনুমোদিত এবং বিশ্বস্ত ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত গ্রহণ করুন।
    অবৈধ ক্লিনিক ও অপরীক্ষিত রক্ত সঞ্চালন এড়িয়ে চলা: অননুমোদিত বা সন্দেহজনক ক্লিনিক থেকে রক্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
    ৪. সুরক্ষিত যৌনাচার
    হেপাটাইটিস B ও C যৌন সংক্রামক হতে পারে, তাই সুরক্ষা অপরিহার্য:
    কনডম ব্যবহার: অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলুন এবং সঠিক পদ্ধতিতে কনডম ব্যবহার করুন।
    একাধিক যৌন সঙ্গীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা: একাধিক সঙ্গীর ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। এক্ষেত্রে যৌন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সতর্কতা জরুরি।
    ৫. ব্যবহৃত সূঁচ, ব্লেড, ট্যাটু ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতনতা
    রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সুরক্ষায় নজর দিন:
    নতুন ও জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার: ইনজেকশন, ট্যাটু, পিয়ারসিং বা রক্ত পরীক্ষার জন্য সবসময় নতুন ও জীবাণুমুক্ত সূঁচ এবং সরঞ্জাম ব্যবহার করা নিশ্চিত করুন।
    রাস্তার সেলুন বা ট্যাটু পার্লারে সতর্ক থাকা: সেলুনে শেভ বা চুল কাটার সময় নিশ্চিত করুন যে ব্লেড বা রেজারটি নতুন ও জীবাণুমুক্ত। ট্যাটু পার্লারে গেলে তাদের জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
    ব্যক্তিগত সামগ্রী ভাগাভাগি না করা: টুথব্রাশ, রেজার, নেইল কাটার বা যেকোনো ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্যের সাথে ভাগাভাগি করবেন না।
    ৬. চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও ইনজেকশন গ্রহণ
    যেকোনো চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন:
    নিজের মতো ওষুধ/ইনজেকশন না নেওয়া: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ইনজেকশন গ্রহণ করবেন না।
    সরকারি অনুমোদিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেওয়া: সবসময় সরকারি বা অনুমোদিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা ও ইনজেকশন গ্রহণ করুন।
    ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা
    হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও জরুরি:
    পারিবারিক সচেতনতা: পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে হেপাটাইটিসের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করুন।
    স্কুল, কলেজ, কর্মস্থলে স্বাস্থ্য শিক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে হেপাটাইটিস প্রতিরোধের ওপর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কর্মশালা আয়োজন করা উচিত।
    সামাজিক প্রচারণা, ক্যাম্পেইন, মিডিয়ার ভূমিকা: গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় সরকারের উচিত হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।
    বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে অংশগ্রহণ ও প্রচার: প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করুন।
    ডায়েট ও সুস্থ জীবনধারা
    একটি সুস্থ জীবনধারা লিভারকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে:
    লিভার-বান্ধব খাবার গ্রহণ: টাটকা ফল, সবজি, শস্য, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত ফ্যাট ও চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুন।
    অ্যালকোহল ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জন: অ্যালকোহল এবং তামাক লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা উচিত।
    শারীরিক পরিশ্রম ও পর্যাপ্ত ঘুম: নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে সুস্থ রাখে এবং লিভারের কার্যকারিতা উন্নত করে।
    নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ: ঝুঁকি থাকলে বা সন্দেহ হলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লিভার পরীক্ষা করান।
    বাংলাদেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে চলমান উদ্যোগ
    বাংলাদেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে:
    ইপিআই (Expanded Program on Immunization): জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হেপাটাইটিস B-এর টিকা দেওয়া হচ্ছে।
    সরকার ও বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রম: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন সচেতনতা বৃদ্ধি, পরীক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাজ করছে।
    কীভাবে আরও উন্নয়ন করা সম্ভব? দেশের প্রতিটি স্তরে হেপাটাইটিস পরীক্ষার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ব্যয় কমানো, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া।
    আসুন সচেতন হই
    হেপাটাইটিস একটি গুরুতর রোগ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য। ২০২৫ সালের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য “হেপাটাইটিস অপেক্ষা করে না – পরীক্ষা করুন, চিকিৎসা নিন, প্রতিরোধ করুন” আমাদের একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। আমাদের সামান্য সচেতনতা, কিছু সহজ অভ্যাস এবং দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই নীরব ঘাতক রোগ থেকে আমাদের জীবনকে বাঁচাতে। হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও হেপাটাইটিস-মুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি।

    সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
    লেখক ও সমাজ গবেষক

    3
    3 Comments
Skip to toolbar