Profile Photo

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরীOffline

  • shakawat83
  • অবহেলা নয়, সহমর্মিতাই বাঁচায় প্রাণ
    (বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আমাদের অঙ্গীকার)
    প্রতি বছর ১০ই সেপ্টেম্বর, যখন আমরা বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালন করি, তখন আমাদের চারপাশে এমন হাজারো মুখ ভেসে ওঠে যারা নীরবে ভেঙে পড়ছে। এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি বিশেষ বার্তা। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে তারা একা, কষ্টে বা দুশ্চিন্তায়। আমাদের একটি অবহেলা, একটি তির্যক মন্তব্য, অথবা ‘সব ঠিক আছে!’ বলে এড়িয়ে যাওয়া—কেউ হয়তো সেদিন আর কোনো সঙ্গী পায় না। তাই এই বিশেষ দিনে আসুন আমরা অঙ্গীকার করি, হেলা নয়, সহমর্মিতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে শিখব। কারণ অনেক সময় একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়াই কাউকে আবার হাত ধরে জীবনের পথে ফেরাতে সাহায্য করে। এই লেখাটি সেই নীরব যন্ত্রণাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রতিটি জীবনকে মূল্যবান বলে মনে করার একটি প্রয়াস।
    উপেক্ষা নয় তার সমস্যাটা বুঝুন
    আত্মহত্যার প্রবণতা বা বিষণ্নতা কখনোই হেলা করার মতো কোনো বিষয় নয়। মানব মন এক জটিল জগত। এখানে প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি কষ্ট তার নিজস্ব গভীরতা নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা প্রায়শই এই গভীরতাকে বুঝতে ব্যর্থ হই। যখন কোনো বন্ধু বা পরিবারের সদস্য হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায়, অথবা তার প্রিয় কাজগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে—আমরা তখন তাকে বলি, “তুমি বেশি ভাবছো”, “সবার সাথে এমন হয়”, “এসব পাত্তা দিও না, আরে এটা কোনো ব্যাপার হলো”। এই ধরনের কথাগুলো তাদের কাছে আরো বেশি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভাবে, তাদের কষ্টটা কেউ বুঝতে চাইছে না, বরং হেলা করছে। এই অবহেলা তাদের ভেতরের দেয়ালকে আরো মজবুত করে তোলে এবং তারা নিজেদেরকে আরও বেশি গুটিয়ে নেয়।
    আজকের এই ডিজিটাল যুগে মানবিক সংযোগের অভাব এক বড় সংকট। স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের একে অপরের থেকে আরও বেশি দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন পাশের মানুষটির মনের খবর না রেখে, অনলাইনে হাজার হাজার মানুষের আপডেট জানতে আগ্রহী। এই বিচ্ছিন্নতা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন বিষণ্ণতা (Depression) বা আত্মহত্যার (Suicide) ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যদি একজন মানুষ তার কষ্ট নিয়ে কথা বলতে না পারে, অথবা তার সমস্যাগুলো গুরুত্ব না পায়, তাহলে তার ভেতরের যন্ত্রণা আরও বাড়তে থাকে।
    তাই, নীরব সংকেতগুলোকে উপেক্ষা না করে, মনোযোগ দিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। একজন মানুষ যদি দূরে সরে যেতে থাকে, তাকে অবহেলা নয়, বরং বুঝিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তার সমস্যা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। আমাদের বুঝতে হবে, নীরবতা সবসময় শান্তির লক্ষণ নয়, বরং তা ভেতরের ঝড়ের ইঙ্গিতও হতে পারে।
    নিজে বোঝার চেষ্টা করুন: সহমর্মিতার হাত বাড়ান
    বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন ভালো শ্রোতা হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা মানে কেবল তার কথাগুলো কানে নেওয়া নয়, বরং তার অনুভূতির গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা। যখন কেউ তার কষ্ট ভাগ করে নেয়, তখন তাকে জাজ না করে বা উপদেশ না দিয়ে কেবল তার কথাগুলো শোনাটাই সবচেয়ে জরুরি। তাকে বলতে দিন, সে যা অনুভব করছে সেটা প্রকাশ করতে দিন। কারণ অনেক সময় একজন শ্রোতাই তার কাছে প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে। হয়তো আমরা সব সমস্যার সমাধান জানি না, কিন্তু আমরা অন্তত তাকে জানাতে পারি, “তুমি একা নও, আমিও আছি তোমার পাশে”।
    সহানুভূতি এবং সহমর্মিতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা এই দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সহানুভূতি (Sympathy) হলো অন্যের কষ্ট অনুভব করা, যেমন “আহারে, তোর অনেক কষ্ট হচ্ছে।” কিন্তু সহমর্মিতা (Empathy) হলো অন্যের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে তার কষ্টটা অনুভব করা, যেমন “আমি বুঝতে পারছি তোর কেমন লাগছে।” সহমর্মিতা মানে এমন নয় যে আমি কারো জীবন ঠিক করে দেব; বরং তার ব্যথাকে সম্মান করা।
    যখন কোনো মানুষ শুনতে পায়, “তোমার কষ্টটা সত্যি,” তখন সে বুঝতে পারে যে সে কোনো বোঝা নয়, বরং সে গুরুত্বপূর্ণ। সহমর্মিতা হলো শক্তি দেওয়া, দায়িত্ব নয়। এটি অন্যকে সাহায্য করার প্রথম ধাপ। আমাদের বুঝতে হবে, “মনে কিছু রেখো না,” বা “সব ঠিক হয়ে যাবে” বলাটা যথেষ্ট নয়। বরং তাকে বোঝাতে হবে যে তার কষ্টটা সত্যি, এবং সে একা নয়।
    আসুন সাহস যোগায়

    বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস আমাদের শেখায় কীভাবে একজন হতাশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। কোনো মানুষ যদি খুব হতাশ হয়ে পড়ে, তাকে ধমক না দিয়ে সহানুভূতির ভাষা ব্যবহার করা জরুরি। কখনও কখনও সরাসরি প্রশ্ন করতে হয়: “তুমি কি আসলেই ভালো নেই! তোমার মাথায় কি উল্টাপাল্টা কিছু আসছে?” এই সরাসরি প্রশ্ন তাকে মনে করিয়ে দেয় যে কেউ একজন তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ধরনের প্রশ্ন সরাসরি আত্মহত্যা সম্পর্কিত হতে পারে, যা নিয়ে কথা বলা আমাদের সমাজে এখনও একটি ট্যাবু। কিন্তু এই ট্যাবু ভাঙা অত্যন্ত জরুরি। কারণ কথা বললে জীবনের পথ খুলে যায়।
    একই সাথে তাকে পেশাদার সাহায্য নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিন। তাকে বোঝান যে মানসিক সমস্যা বা সাময়িক হতাশা কোনো পাগলামি নয়, বরং এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য অসুস্থতা। যেমন শরীরের কোনো রোগ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই, তেমনি মনের ক্ষত সারানোর জন্য একজন কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া জরুরি। তাকে বোঝান যে সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সাহসিকতা।
    প্রয়োজনে তার সঙ্গে প্রথম সেশনে যান। হাত ধরে পাশে থাকা, তাকে একা না ফেলে যাওয়া—এই কাজটিই হয়তো তাকে বড় কোনো সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। আমাদের দায়িত্ব তার ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলা, তাকে জোর করে ভালো থাকার কথা বলা নয়। তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে তার পাশে আমরা আছি, এবং আমরা তাকে এই পথ থেকে বের হতে সাহায্য করব।
    মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন
    আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু করা। আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনো তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেকেই মানসিক অসুস্থতাকে লজ্জার বিষয় মনে করে। অথচ শারীরিক রোগের মতো মানসিক অসুস্থতাও প্রতিটি মানুষের সুস্থ জীবনের অংশ। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে আমাদের দৈনন্দিন জীবন, কাজ এবং সম্পর্ক সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে হেলা করা উচিত নয়।
    ভালো থাকা বা সেলফ-কেয়ার মানে শুধু ভালো খাওয়া বা শরীরচর্চা করা নয়। এর মধ্যে আছে মনকে শান্ত রাখা, পছন্দের কাজ করা, একাকিত্ব দূর করার চেষ্টা করা। যদি কেউ মানসিকভাবে খারাপ থাকে, তবে তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তার সঙ্গে কথা বলা, তার পছন্দের কাজে তাকে উৎসাহ দেওয়া, এবং তাকে বোঝানো যে এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। আমরা যখন নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই, তখন অন্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও আমরা আরও বেশি সংবেদনশীল হতে পারি। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা কোনো ট্যাবু নয়, বরং এটি সুস্থ সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
    পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব
    বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমরা পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বের কথা বলি। পরিবার হলো সবার প্রথম আশ্রয়। যদি পরিবারে কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ না থাকে, তাহলে মানুষ আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাবা-মা, ভাই-বোন, অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি উষ্ণ এবং নিরাপদ সম্পর্ক থাকে, তবে মন খুলে কথা বলা সহজ হয়। ছোটবেলা থেকে যদি শেখানো হয়, “কষ্ট হলে, বিপদে পড়লে, ব্ল্যাকমেইল করলে অবশ্যই বলবে, আর যেকোনো বিষয় বড়দের সাথে শেয়ার করাই স্বাভাবিক,” তাহলে বড় হয়েও মানুষ নিজের মনের কথা সহজে প্রকাশ করতে পারে।
    পাশাপাশি সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাটা এগিয়ে নিতে হবে। স্কুল, কলেজ, অফিস—সবখানে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মশালা, সেমিনার বা খোলা আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। একই সাথে, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সহায়তা কেন্দ্র বা হেল্পলাইনগুলোকে আরও সহজলভ্য এবং সবার কাছে পরিচিত করে তুলতে হবে, যাতে প্রয়োজনে যে কেউ সাহায্য পেতে পারে। আমাদের সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাহায্য চাওয়াটা স্বাভাবিক এবং সম্মানজনক বলে বিবেচিত হবে।
    আসুন তাদের পাশে দাঁড়াই
    এই সেপ্টেম্বর মাসে, বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আসুন আমরা অঙ্গীকার করি, আমরা অবহেলা নয়, সহমর্মিতা দিয়ে জীবন বাঁচাব। কারণ একটি জীবন চলে গেলে আমরা বুঝি, “ওর হয়তো দরকার ছিল শুধু একটি ফোন কল, একটি জিজ্ঞেস করা, একটি ‘আমি শুনছি তোকে’।” কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না। তাই আজই হয়তো আমাদের উচিত—কেউ দূরে সরে গেলে তার দিকে তাকিয়ে একটু জিজ্ঞেস করা, “তুমি কেমন আছো?”
    হতে পারে সেই একটি প্রশ্ন, একটি হাসি, একটি কথাই তাকে বাঁচিয়ে দেবে। এই বিশ্বাস হৃদয়ে রেখে চলুন, আমরা নিজেরাও বাঁচি, অন্যকেও বাঁচতে সাহায্য করি। একমাত্র সহমর্মিতাই পারে হতাশা ভাঙতে। অবহেলা নয়, সহমর্মিতাই বাঁচায়—এই বিশ্বাস নিয়েই এই দিবসটি আমাদের জীবনে নতুন করে এক সংকল্প নিয়ে আসুক।

    সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
    লেখক ও সমাজ গবেষক।

    1
    1 Comment
    • লেখাটি খুবই সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। এটি সমাজের একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য একটি দারুণ সূচনা।

Skip to toolbar