-
বিয়ে দর্শনের বিদ্যাপাঠ
একবার এক গ্রামে গোপালপুর হাইস্কুল নামে একটা স্কুল ছিল। স্কুলের নাম শুনলেই মনে হবে সেখানে গম্ভীর গম্ভীর বিদ্যার চর্চা হয়, কিন্তু বাস্তবে স্কুলটা ছিল রম্য আর কৌতুকের খনি। বিশেষ করে যখন ক্লাস নাইন–এর ছাত্র মজনু ক্লাসে থাকে, তখন আর পাঠ্যবইয়ের কোনো পাতায় শিক্ষকরা পৌঁছাতে পারেন না।
সেদিন দুপুরবেলা ইতিহাসের ক্লাস চলছিল। শিক্ষক দাড়ি–গোঁফে ভরা, মাথায় খানিকটা টাক পড়া, গম্ভীর চেহারার মানুষ। ছাত্ররা ওনাকে গোপনে “স্যার পণ্ডিত” বলে ডাকত, তবে স্যারের কোনো ধারণাই ছিল না এই গোপন নামকরণের। স্যার সবসময় ভাবতেন, তিনি ছাত্রদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিচ্ছেন। তিনি বলতেন, “জীবন মানে সংগ্রাম, জীবন মানে সৎভাবে এগিয়ে যাওয়া, জীবন মানে ত্যাগ…” ইত্যাদি।
কিন্তু মজনু নামক ছেলেটার মাথায় এসব ঢুকত না। সে বরং জীবনের সব সমাধান খুঁজে পেত একটা মাত্র শব্দে—“বিয়ে”।
সেদিন স্যার হঠাৎ করে ক্লাসে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন—
“তুমি বড় হয়ে কী করবে?”
সবাই চুপ, কারণ স্যারকে দেখে ভয় লাগে। কিন্তু মজনু ভড়কে যাওয়ার ছেলে নয়। সে বুক ফুলিয়ে বলল, “বিয়ে।”
পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল। স্যার ভেবেছিলেন, হয়তো ছাত্র কোনো ভুল বুঝেছে। তাই আবার প্রশ্ন করলেন,
“আমি জানতে চাইছি, বড় হয়ে তুমি কী হবে?”
মজনু এবারও দেরি না করে উত্তর দিল, “জামাই।”
হাসির রোল আবার বয়ে গেল। কিছু ছাত্র চেয়ার থেকে পড়ে গেল, কেউবা মুখ চেপে ধরে কাঁপছে, কেউবা পেনসিল কামড়াচ্ছে হাসি আটকাতে। স্যারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আমি বলতে চাইছি, তুমি বড় হয়ে কী পেতে চাও?”
মজনু এবার শান্তভাবে বলল, “বউ।”
স্যারের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম। তিনি মনে মনে ভাবলেন, এ ছেলের মাথায় হয়তো গন্ডগোল আছে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। প্রশ্ন ঘুরিয়ে আবার বললেন,
“তুমি বড় হয়ে মা–বাবার জন্য কী করবে?”
মজনু জবাব দিল, “বউ নিয়ে আসব।”
এবার পুরো ক্লাসে একসাথে এমন হট্টগোল উঠল যে জানালা দিয়ে পাশের ক্লাসের শিক্ষক উঁকি দিলেন। স্যার লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন, কিন্তু তবু নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে আবার চেষ্টায় গেলেন।
“তোমার মা–বাবা তোমার কাছে কী চায়?”
মজনু বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়ে বলল, “নাতি–নাতনি।”
স্যারের মাথা ঘুরে গেল। শেষ চেষ্টা করে বললেন,
“তাহলে তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?”
মজনু শান্ত গলায় আবারো মহাসত্য ঘোষণা করল, “বিয়ে।”
এই উত্তর শোনার পর স্যার যেন বজ্রাহত হলেন। তাঁর বুক ধকধক করতে লাগল, চোখে ঝাপসা দেখা দিল, আর তিনি ধপাস করে চেয়ারেই পড়ে গেলেন।
ছাত্ররা চিৎকার করে উঠল, “স্যার অজ্ঞান!” কেউ পানি আনতে ছুটল, কেউ স্যারের মাথায় বাতাস করতে লাগল। অথচ মজনু নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। বরং সে ফিসফিস করে বলছে, “স্যারও বুঝলেন, বিয়েই আসল সমাধান।”
স্যারকে যখন স্কুলের অফিসে নেওয়া হলো, তখন প্রধান শিক্ষকও ছুটে এলেন। ব্যাপারটা শুনে তিনি খানিক হেসে ফেললেন। তবে ভেতরে ভেতরে চিন্তাও হলো—এমন ছাত্রকে কীভাবে সামলানো যায়?
পরের দিন আবার ক্লাসে ডাক হলো মজনুকে। স্যারের জায়গায় এবার প্রধান শিক্ষক নিজে ক্লাসে গেলেন। তিনি স্নেহভরে বললেন, “দেখো মজনু, তোমার চিন্তাধারা অদ্ভুত হলেও মজার। কিন্তু সবকিছুর আগে পড়াশোনা, নৈতিকতা, মানুষ হয়ে ওঠা—এসব গুরুত্বপূর্ণ। তুমি শুধু বিয়ে বিয়ে করলে চলবে না।”
মজনু এবার শান্তভাবে উত্তর দিল, “স্যার, আমি তো বিয়ের কথাই বলেছি, কিন্তু ভেবে দেখুন—বিয়ে মানে পরিবার, পরিবার মানে দায়িত্ব, দায়িত্ব মানে সংগ্রাম, সংগ্রাম মানে সফলতা। তাই তো আমি একেবারে জীবনের সারাংশ বলে ফেলেছি!”
প্রধান শিক্ষক থমকে গেলেন। সত্যিই, কথাটা মন্দ নয়। অন্য ছাত্ররাও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। হেসে ওঠা ক্লাস এবার চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ল।
স্যার পণ্ডিত যিনি আগের দিন অজ্ঞান হয়েছিলেন, তিনি খবর শুনে রেগে গেলেন। কিন্তু পরে ভেবে দেখলেন, হয়তো মজনুর ভেতরে অন্যরকম যুক্তি লুকিয়ে আছে। সেই যুক্তি হয়তো খুবই সহজ, কিন্তু মানুষের জীবনের আনন্দ আর মিলনের জায়গাটাই সেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এরপর থেকে মজনুর নাম দেওয়া হলো “বিয়ে মজনু”। সে যখনই কিছু বলত, পুরো স্কুল হো হো করে হাসত। তবে এক অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ছাত্ররা মজনুর উত্তর শুনে আর লজ্জা পেত না। তারা বুঝতে শুরু করল, জীবনে হাসি–ঠাট্টারও জায়গা আছে।
একদিন এক সহপাঠী মজনুকে বলল, “তুই আমাদের হাসাইছিস, কিন্তু তোর মধ্যে একটা পজিটিভ দিকও আছে। তুই পরিবার নিয়ে ভাবিস, বাবা–মায়ের স্বপ্ন নিয়ে ভাবিস। এটা তো খারাপ কিছু নয়।”
মজনু মুচকি হেসে জবাব দিল, “ভাই, আমি চাই সবাই একসাথে থাকুক। মা–বাবা খুশি থাকুক, আমি দায়িত্ব নি। বিয়ে মানে শুধু হাসির বিষয় নয়, এটা দায়িত্বও।”
তখন সবাই হাততালি দিল। সেই দিন থেকে মজনুর ‘বিয়ে’ দর্শন একেবারে মজার গল্প থেকে পজিটিভ বার্তায় রূপ নিল।
স্কুলের শিক্ষকরা অবশেষে মানলেন, হয়তো সব ছাত্র ডাক্তার–ইঞ্জিনিয়ার হবে না, কিন্তু প্রত্যেকের চিন্তাভাবনায় হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসার বীজ থাকা উচিত। আর সেই বীজ বপনের নাম মজনু।
এভাবেই গোপালপুর হাইস্কুলের একদিনের হাস্যকর ঘটনা গ্রামে কিংবদন্তি হয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল—“ওই স্কুলে এক ছেলেপুলে আছে, যার জীবনের লক্ষ্য শুধু বিয়ে, অথচ সেই লক্ষ্যই শেখাল পরিবারের গুরুত্ব।”
শেষমেশ স্যার পণ্ডিতও স্বীকার করলেন, “আমার পড়ানো ইতিহাসে হয়তো রাজা–বাদশাহরা আছে, কিন্তু মজনুর ইতিহাসে আছে সুখী পরিবার, হাসি আর মিলনের কাহিনি।”
এভাবেই এক ছাত্রের বিয়ের উত্তর পুরো গ্রামে ছড়িয়ে দিল হাসি, আনন্দ আর মিলনের ইতিবাচক বার্তা।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


পুরো ঘটনাপ্রবাহে মজার ছলে একটা দার্শনিক সত্যও উঠে এসেছে—“বিয়ে মানে দায়িত্ব, দায়িত্ব মানে সংগ্রাম, সংগ্রাম মানে সফলতা।”