-
ছুটির বাহুবলী
অফিসে এক অদ্ভুত সকাল। সবাই ব্যস্ত কম্পিউটারে চোখ গুঁজে কাজ করছে, কীবোর্ডের শব্দ যেন সুর করে বাজছে। কিন্তু এর মাঝেই একজন কর্মী—রাশেদ—হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে গেল। মুখে একধরনের দ্বিধার ছাপ, মনে হচ্ছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। সে চশমাটা ঠিক করে নিয়ে ধীরে ধীরে বসের কেবিনে ঢুকল।
বস ছিলেন অফিসের সবচেয়ে কঠোর অথচ সবচেয়ে হাস্যরসিক মানুষ। সকালবেলায় যখন সবাই ঢুকত, তিনি দরজার ভেতর থেকে হুঁশিয়ারি দিতেন—“কে দেরি করে ঢুকেছে, আজকে তার জন্য পেনাল্টি—আমার কফি বানাতে হবে!” কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, পরে দেখা যেত তিনি নিজেই সেই কফি বানিয়ে নিয়ে আসছেন। ফলে সবাই বুঝে গেছে, বস যতই ভয় দেখান না কেন, ভেতরে ভেতরে তিনি একজন খাঁটি রসিক মানুষ।
রাশেদ ভেতরে ঢুকেই আসন নিলো। বস কাগজপত্রে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু চোখ সরু করে তাকালেন।
—“হুম, বলো তো রাশেদ, এত সকালে আমার কাছে কেন?”
রাশেদ ভদ্রভাবে বলল—“স্যার, কয়েক দিনের ছুটি দরকার।”
বস কপালে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন—“আহা! এই দেশের কর্মীদের সবচেয়ে বড় রোগ কী জানো? ছুটির জ্বর। কাজ শুরু করতেই মাথা গরম, আর ছুটির নাম শুনলেই গা ঠান্ডা!”
রাশেদ একটু হেসে ফেলল। —“স্যার, আসলে জরুরি কারণ আছে। খুব দরকার।”
বস দুষ্টু চোখে তাকালেন। —“একটা শর্ত আছে। একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে ছুটি পাবে।”
রাশেদ গম্ভীর হয়ে গেল। মনে মনে ভাবছে, প্রশ্নটা আবার কেমন হবে! হয়তো অফিসের ফাইলের হিসাব, হয়তো টার্গেটের রিপোর্ট, আবার হয়তো ইংরেজি ব্যাকরণ থেকে কিছু একটা।
কিন্তু বস নাটকীয়ভাবে চেয়ারে হেলান দিলেন, হাতের কলমটা আঙুলে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন—“কাটাপ্পা বাহুবলীকে কেন মেরেছিল?”
এক মুহূর্ত অফিস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাশেদের চোখ কপালে। এই প্রশ্ন তো পুরো দেশের কোটি মানুষের প্রশ্ন!
রাশেদ ভেবে ভেবে এক মুহূর্তে উত্তর দিল—“স্যার, বাহুবলী হয়তো কাটাপ্পাকে ছুটি দেয়নি!”
পুরো কেবিনে এমন হাসি ছড়িয়ে পড়ল যে বাইরে বসে থাকা কর্মীরাও চমকে গেল। বস টেবিলে হাত ঠুকে হাসতে হাসতে বললেন—“বাহ, একদম সঠিক উত্তর! কাজের চেয়ে ছুটির গুরুত্ব যদি কেউ না বোঝে, তবে সে সত্যিই বিপদে পড়বে। বলো, কত দিনের ছুটি লাগবে?”
এভাবেই ছুটির অনুমোদন হলো।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি। রাশেদ যখন বাইরে বেরোল, সহকর্মীরা ঘিরে ধরল। সবাই জানতে চাইছে, কীভাবে ছুটি পেল। সে যখন পুরো ঘটনা বলল, তখন অফিসে হুলুস্থুল শুরু হলো। সবাই নিজ নিজ মাথায় বাহুবলী আর কাটাপ্পাকে ঘুরাতে লাগল।
একজন বলল—“মানে, যদি বসকে খুশি করতে চাই, তবে সৃজনশীল উত্তর দিতে হবে।”
অন্যজন যোগ করল—“ঠিকই তো, আমাদের রিপোর্টেও একটু বাহুবলীর মতো নাটকীয়তা আনতে হবে। কেবল শুকনো হিসাব দিলে বস খুশি হবেন না। হাসি পেলে রিপোর্ট পাস।”
সেদিন বিকেলে অফিসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন হলো। আগে যেখানে সবাই গম্ভীর মুখে কাজ করত, হঠাৎ করে সেখানে হাসি-ঠাট্টা শুরু হয়ে গেল। একজন বলল—“স্যার, কম্পিউটার হ্যাং করেছে।”
বস সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন—“হ্যাং করেনি, ও ছুটি চাইছে।”
অন্যজন প্রিন্টারে কাগজ আটকে গেলে চিৎকার দিল—“স্যার, প্রিন্টার কাজ করছে না।”
বস বললেন—“ওও তো বাহুবলীর মতো কাহিনি বানাচ্ছে।”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
ধীরে ধীরে এই পরিবেশ অফিসের সংস্কৃতিতে ঢুকে গেল। সবাই কাজের ফাঁকেই একটু রসিকতা জুড়ে দেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এতে কাজের চাপ হালকা হয়ে গেল, আর টিমের মধ্যে একটা দারুণ মিলনাত্মক ভাব তৈরি হলো। আগে যেখানে কেউ কারও ডেস্কে যেত না, এখন সবাই একসাথে লাঞ্চ করে। চায়ের টেবিলে গল্পের ছড়াছড়ি, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকে “বাহুবলী” আর “কাটাপ্পা”।
একদিন তো দেখা গেল, পুরো অফিস মিলেমিশে “বাহুবলী ছুটির কমিটি” গঠন করেছে। নিয়ম হলো—যে ছুটি চাইবে, তাকে প্রথমে একটি মজার উত্তর দিতে হবে। যদি উত্তর ভালো হয়, তবে ছুটি অনুমোদিত। এক সহকর্মী এসে বলল—“আমার স্ত্রী ফোন দিয়েছে, বাসায় ওয়াইফাই নষ্ট। তাই ছুটি চাই।”
বস হেসে জিজ্ঞেস করলেন—“এর সঙ্গে বাহুবলীর কী সম্পর্ক?”
কর্মী মুহূর্তেই বলল—“স্যার, বাহুবলী যদি ওয়াইফাই ছাড়া যুদ্ধ করত, তবে কাটাপ্পা ওকে মেরে ফেলত।”
বস হো হো করে হেসে বললেন—“বাহ, একদম পারফেক্ট যুক্তি। যাও, ছুটি নাও।”
এভাবে ছুটি নিতেও হাস্যরসের প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কেউ নাটক করে, কেউ গান গেয়ে, কেউ আবার কৌতুক শুনিয়ে ছুটি আদায় করত। একসময় দেখা গেল, অফিসে ছুটি পাওয়া কঠিন নয়—বরং হাসি দিয়ে ছুটি নিতে হয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো বসের মধ্যে। আগে তিনি কঠোর মনে হলেও এখন সবাই বুঝল, ভেতরে ভেতরে তিনি চান কর্মীরা শুধু কাজের মধ্যে ডুবে না থাকুক; বরং হাসুক, গল্প করুক, আর জীবনটাকে সহজভাবে নিক।
দিনের শেষে রাশেদ ভাবল—“আসলে ছুটি শুধু বিশ্রামের জন্য নয়, ছুটি হলো টিমকে আরও কাছাকাছি আনার উপায়। আর হাসি হলো সেই ছুটির আসল সেতু।”
অফিসে তখন এক নতুন সংস্কৃতি—কঠিন কাজের ভেতরেও হালকা রসিকতা, টিমওয়ার্কের ভেতরেও একঝলক আনন্দ। যেন সবাই বাহুবলী, কিন্তু কাউকেই কাটাপ্পা মারছে না, কারণ সবাই একে অপরকে সময় আর হাসি দিচ্ছে।
অতএব, কাটাপ্পা বাহুবলীকে কেন মেরেছিল—এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর অবশেষে অফিসে নতুন এক অর্থ পেল। বাহুবলী ছুটি দেয়নি বলেই হয়তো কাহিনি ট্র্যাজেডি হয়েছিল, কিন্তু এখানে সবাই ছুটি পায়, হাসি পায়, তাই কোনো ট্র্যাজেডি নেই—শুধুই কমেডি, মিলন আর আনন্দমুখর এক কর্মজীবন।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


হাস্যরস, অফিস কালচার, আর বাহুবলী–কাটাপ্পা রেফারেন্স সব মিলিয়ে চমৎকার একটা গল্প।