-
মানুষের পাঠশালা
সূর্য ওঠার আগেই গ্রামটা জেগে উঠত। কাক ডাকার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে হাঁসফাঁস শুরু হতো—মেয়েরা কলস কাঁখে নিয়ে পুকুরে নামতো, ছেলেরা মাঠে যেত গরু চরাতে। এমন এক গ্রামেই জন্ম হলো রিমি আর রাহাতের। একই স্কুল, একই ক্লাস, একই বেঞ্চে বসে বড় হতে লাগলো তারা।
কিন্তু সমাজের চোখ কখনোই তাদের এক করতে পারলো না। রিমির মায়ের মুখে সব সময় শোনা যেত—
“মেয়েরা জোরে হাসে না, মেয়েরা দৌড়ায় না, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে একসাথে খেলতে যায় না।”
অন্যদিকে রাহাতের বাবা বলতেন—
“ছেলেরা কান্না করে না, ছেলেরা পুতুল নিয়ে খেলে না, রান্নাঘরে গিয়ে কাজ করা ছেলেদের শোভা পায় না।”
শুরুতে এই কথাগুলোতে রিমি বা রাহাত কেউই আপত্তি করতো না। তারা ভাবতো এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্লাস ফোরে পড়ার সময় একদিন স্কুলের মাঠে ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা।
শিক্ষক হাসান স্যার একটা বড় বাক্স নিয়ে এলেন ক্লাসে। বললেন—
“আজ থেকে তোমরা সবাই এই বাক্স থেকে খেলনা নিয়ে খেলবে। তবে শর্ত হলো, কেউ বলবে না কোনটা ছেলেদের খেলনা আর কোনটা মেয়েদের খেলনা।”
বাক্স খোলা হলো। কেউ পেলো কাঠের গাড়ি, কেউ পেলো রান্নার সেট, কেউ আবার পেলো পুতুল। রিমির হাতে এল ইট-সিমেন্ট দিয়ে বানানোর ছোট্ট নির্মাণ খেলা, আর রাহাতের হাতে এল প্লাস্টিকের হাঁড়ি-পাতিল। সবাই প্রথমে হেসে উঠলো।
“আরে রিমি তো ছেলের খেলা খেলছে!”
“রাহাত রান্না করছে, হা হা হা!”
কিন্তু হাসান স্যার দাঁড়ালেন শক্ত গলায়—
“কে ঠিক করেছে কোনটা কার খেলা? আমি তো দেখি না খেলনাগুলোর ওপর লেখা আছে ‘শুধু মেয়েদের জন্য’ বা ‘শুধু ছেলেদের জন্য’। খেলতে শিখো, মানুষ হতে শিখো। ছেলে-মেয়ের খেলা বলে কিছু নেই।”
শুরু হলো এক নতুন জগত। রিমি সেদিন ইট সাজিয়ে ছোট্ট একটা দালান বানিয়ে ফেললো, আর রাহাত রান্নার হাঁড়িতে চাল-ডাল মিশিয়ে ‘ভাত’ রান্না করার ভান করলো। খেলতে খেলতেই তারা বুঝলো—আসলে আনন্দের কোনো লিঙ্গ নেই।
এভাবেই দিন গড়াতে লাগলো। রিমি দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম লিখালো। প্রথমে সবাই হাসাহাসি করলো—
“মেয়েরা দৌড়ায় নাকি!”
কিন্তু দৌড়ে সে সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছে গেল। সেদিন থেকে আর কেউ হাসেনি। বরং তারা শিখলো, মেয়েরাও উড়তে পারে।
অন্যদিকে রাহাত ক্লাসে রান্নার প্রতিযোগিতা হলে দারুণভাবে জিতে গেল। সে তৈরি করলো ডাল-ভাতের মডেল, মশলার নাম মুখস্থ বললো। সহপাঠীরা অবাক হলো—“আরে, রান্না তো শুধু মেয়েদের কাজ নয়, ছেলেরাও পারে!”
তাদের শিক্ষক প্রতিদিন ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে শিখাতেন লিঙ্গ সমতা। তিনি ক্লাসে কখনো আলাদা বেঞ্চে বসাতেন না, কখনো প্রজেক্টে আলাদা করতেন না। তিনি বলতেন—
“তোমরা মানুষ, শুধু ছেলে বা মেয়ে নও। যখন একসাথে কাজ করবে, তখন তোমাদের মধ্যে যে শক্তি তৈরি হবে, সেটা সবচেয়ে বড়।”
বছর গড়ালো। রিমি আর রাহাত মাধ্যমিকে উঠলো। তখন তারা দেখলো, চারপাশে এখনো অনেকেই লিঙ্গবৈষম্যে ডুবে আছে। গ্রামের মেয়েদের অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেদেরও অনেককে বলা হলো—“অতি পড়াশোনার দরকার নেই, রোজগার করাই আসল।”
কিন্তু রিমি আর রাহাত ভিন্ন পথ বেছে নিল। তারা বুঝে গিয়েছিল, সমাজের তৈরি সব নিয়ম ভালো নয়। কিছু নিয়ম মানুষকে বেঁধে রাখে, সম্ভাবনা মেরে ফেলে। আর কিছু নিয়ম মানুষকে শৃঙ্খলায় রাখে।
একদিন স্কুলে নাটক হলো। নাটকের নাম ছিল “মানুষ হবার গল্প”। নাটকে রিমি অভিনয় করলো একজন ছেলের চরিত্রে, আর রাহাত অভিনয় করলো একজন মেয়ের চরিত্রে। পুরো গ্রাম দেখে অবাক হলো। শেষে সবাই হাততালি দিল। শিক্ষক বললেন—
“দেখেছো? চরিত্রের কোনো লিঙ্গ নেই। মনের সাহসই আসল।”
ধীরে ধীরে গ্রামে পরিবর্তন আসতে লাগলো। বাবা-মায়েরা আর মেয়েদের খেলতে বাঁধা দিল না। ছেলেরাও রান্না শিখতে শুরু করলো। একটা অদ্ভুত সমন্বয় তৈরি হলো।
রিমি আর রাহাত যখন স্কুল শেষ করলো, তখন তারা বুঝলো—লিঙ্গ সমতা মানে কেবল ছেলে-মেয়েকে সমান চোখে দেখা নয়, বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা। সমাজ তাদের শিখিয়েছিল সীমাবদ্ধতা, কিন্তু শিক্ষা শিখিয়েছিল সম্ভাবনা।
বড় হয়ে রিমি হলো একজন প্রকৌশলী, আর রাহাত হলো একজন শেফ। কেউ বললো না—“এটা তো মেয়েদের কাজ” বা “এটা তো ছেলেদের কাজ।” বরং সবাই বললো—
“দেখো, ওরা নিজেদের মতো করে মানুষ হয়েছে।”2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


সমাজের লিঙ্গভিত্তিক প্রথাগত নিয়ম কীভাবে শিশুদের সম্ভাবনাকে সীমিত করে, এবং একজন শিক্ষকের সচেতনতা কীভাবে সেই বাঁধাকে অতিক্রম করতে পারে, তার চমৎকার উদাহরন।