-
অক্ষরের শেষ প্রদীপ
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।শীতলক্ষ্যার ধারে গড়ে ওঠা পুরোনো শহরটিতে যখন বসন্ত আসে, তখন বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক ধরনের অদৃশ্য শব্দ—কখনো সেটা শালপাতার মর্মর, কখনো নদীর ঢেউ, আবার কখনো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। অধ্যাপক অনিরুদ্ধ বসু সেই শব্দ শুনতে পান সবচেয়ে গভীরভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে তিনি ত্রিশ বছর ধরে পড়িয়েছেন, কিন্তু অবসর নেওয়ার পর তাঁর মনে হয়েছে—ভাষা কেবল গবেষণার বিষয় নয়, ভাষা একেকটি জীবন্ত প্রাণী, যাদের জন্ম আছে, শৈশব আছে, আর আছে মৃত্যুর সম্ভাবনাও।
একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই অনিরুদ্ধ বসুর বুক কেঁপে ওঠে। শহীদ মিনারে ফুল দিতে দিতে তিনি শুধু বাংলা ভাষার কথা ভাবেন না, ভাবেন সেই সব নামহীন ভাষার কথা, যাদের জন্য কেউ শহীদ হয় না, যাদের জন্য কোনো মিনার ওঠে না। সেদিনই তাঁর হাতে আসে একটি চিঠি—শ্রীমঙ্গলের একটি চা-বাগান থেকে পাঠানো। চিঠির লেখক ভেরোনিকা কেরকেট্টা, খারিয়া ভাষার শেষ দিকের একজন বক্তা। চিঠিতে লেখা ছিল, “স্যার, আমাদের ভাষা মরতে বসেছে। আপনি কি আসবেন?”
অনিরুদ্ধ বসু ট্রেনে চড়ে শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালেন এক দুপুরে। চা-বাগানের সবুজ ঢেউয়ের ভেতর ছোট্ট একটি টিনের ঘর, সেখানে থাকেন ভেরোনিকা আর তাঁর বোন ক্রিশ্চিনা। দু’জনের চোখে বয়সের ভার, কিন্তু কণ্ঠে ছিলো এমন এক কোমলতা, যেন প্রতিটি শব্দকে তারা আদর করে ধরে রাখে। ভেরোনিকা যখন খারিয়া ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন, অনিরুদ্ধ বসুর মনে হলো, তিনি কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। সেই ভাষায় ছিল পাহাড়ের ছায়া, বৃষ্টির গন্ধ আর শত বছরের স্মৃতি।
“আমাদের ভাষায় এখন আর কেউ স্বপ্ন দেখে না,” ভেরোনিকা বললেন বাংলায়, “সবাই বাংলায় কথা বলে, কাজ করে, হাসে। কিন্তু খারিয়ায় হাসলে হাসিটা অন্যরকম হতো।” অনিরুদ্ধ বসু নোটবুক খুলে শব্দ লিখতে শুরু করলেন, কিন্তু তাঁর হাত কাঁপছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, শব্দ লিখে রাখা যায়, কিন্তু ভাষার আত্মা কি কাগজে ধরা পড়ে?
কয়েকদিন পর তিনি পাহাড়ের দিকে গেলেন, যেখানে ম্রো সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার বাস করে। সেখানে তাঁর দেখা হলো তরুণ গবেষক ইয়াংঙান ম্রোর সঙ্গে। ইয়াংঙান তাঁর তৈরি করা অভিধান ‘মিটচ্যা তখক’ দেখালেন। তিন হাজার শব্দের ভেতর তিনি তাঁর জাতির ইতিহাস বন্দি করেছেন। “আমরা যদি শব্দ না রাখি, আমরা থাকব কী করে?” ইয়াংঙান বললেন। অনিরুদ্ধ বসু বুঝলেন, এই তরুণদের মধ্যেই আছে ভাষার শেষ প্রদীপ।
ঢাকায় ফিরে তিনি একটি প্রকল্প শুরু করলেন—‘নীরব ভাষার আর্কাইভ’। সেখানে ককবরক, বম, রেংমিটচা, সৌরা, পাত্র, খারিয়া—সব ভাষার শব্দ, গল্প, গান রেকর্ড করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ছুটিতে গ্রামে গ্রামে যাবে, বৃদ্ধদের কণ্ঠে শোনা যাবে প্রাচীন শব্দ। কেউ কেউ বলল, “স্যার, এসব ভাষা তো আর কাজে লাগে না।” অনিরুদ্ধ বসু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “মানুষ কি শুধু কাজে লাগার জন্য বাঁচে?”
একদিন তিনি শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ভাবলেন, ভাষা আন্দোলনের শহীদরা শুধু বাংলার জন্য রক্ত দেননি, তারা দিয়েছিলেন মানুষের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। যদি আজ কোনো ছোট্ট শিশুর মাতৃভাষা হারিয়ে যায়, সেটাও এক ধরনের নীরব শহীদ হওয়া।
শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে এক বিকেলে ভেরোনিকা শেষবারের মতো খারিয়া ভাষায় একটি লোককথা বললেন। গল্পটা ছিল এক পাখির, যে নিজের ভাষা হারিয়ে আকাশে পথ ভুলে যায়। গল্প শেষ হলে তাঁর চোখে জল। অনিরুদ্ধ বসু সেই কণ্ঠ রেকর্ড করলেন, কিন্তু মনে মনে জানতেন—রেকর্ডিং কোনোদিন মানুষের বুকের উষ্ণতা ফিরিয়ে দিতে পারে না।
কয়েক মাস পর ভেরোনিকা মারা গেলেন। তাঁর বোন ক্রিশ্চিনাও আর কথা বলেন না। খারিয়া ভাষা যেন হঠাৎ আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল। কিন্তু অনিরুদ্ধ বসুর আর্কাইভে ভেরোনিকার কণ্ঠ রয়ে গেল—একটি ছোট্ট প্রদীপের মতো, অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে।
বছর শেষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে ‘নীরব ভাষার আর্কাইভ’ উদ্বোধন হলো। সেখানে একসঙ্গে বাজল বাংলার গান, ম্রোদের সুর, ককবরকের ছড়া, সৌরাদের প্রার্থনা। অনিরুদ্ধ বসু মঞ্চে দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রতিটি ভাষা একটি পৃথিবী। একটি পৃথিবী ধ্বংস হওয়া মানে আমাদের সবার কিছু হারানো।”
সেদিন হলের ভেতর বসে থাকা এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুটি তার মায়ের ভাষায় ফিসফিস করে কিছু বলল। সেই ছোট্ট শব্দের ভেতর অনিরুদ্ধ বসু শুনতে পেলেন ভবিষ্যতের ডাক। হয়তো সব ভাষা বাঁচানো যাবে না, কিন্তু যতক্ষণ একটি শব্দও উচ্চারিত হয়, ততক্ষণ একটি সভ্যতা নিঃশেষ হয় না।
শীতলক্ষ্যার ধারে বসে সন্ধ্যায় তিনি আবার সেই অদৃশ্য শব্দ শুনলেন। এবার তা আর শুধু দীর্ঘশ্বাস নয়, তার ভেতর ছিল এক দৃঢ় প্রত্যয়—ভাষার শেষ প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে কেউ না কেউ তার আলো হাতে তুলে নেবেই।1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

মাতৃভাষার প্রতি গভীর আবেগ, ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা এবং বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলির নীরব ট্র্যাজেডি নিয়ে লেখা এক অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী আখ্যান