-
||রাত্রিকথা||
১.
আমি আগেও ওকে দেখেছি।তবে ঠিক চিনতাম না,এমনকি নামটাও জানা ছিল না।অথচ থাকি একপাড়াতেই!আসলে মেয়েদের সাথে আমি কথা বলতে পারি না।চোখ তুলে চাইতেই পারি না! রাস্তায় যদি সামনে কেনো মেয়ে থাকে আমি তো ঠিকমতো হাঁটতেই পারি না,মাথা তো আপনা-আপনিই নিচু হয়ে যায়।
মনে করতাম,ও বুঝি আমার জুনিয়র হবে।পরে মাধ্যমিকের সময় দেখলাম আমার সাথেই দিলো পরীক্ষা!এমন অনেককেই আমি চিনি না।বললাম না,মেয়েদের থেকে দূরেই থাকি।
ওকে তো অনেকবার দেখেছি, কিন্তু ওকে যে আমার ভালো লেগে যাবে এটা কোনোদিন ভাবিনি!হঠাৎ করেই কেন জানি ওকে ভালো লাগতে শুরু করলো!ফলে নামটাও জেনে গেছি—“রাত্রি’’।জানতেই হলো।
যদিও ওর সাথে নিয়মিত কোনো দেখা হতো না।তবে মাঝে-মধ্যেই ওর সাক্ষাৎ পেয়ে যেতাম।কিন্তু দিব্যি কেটে বলতে পারি,একদিনও ওর দিকে সোজাসুজি চোখ তুলে তাকাইনি।বরং আরো ১৮০ ডিগ্রী ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে চাইতে চাইতে চলতাম!তবে কদাচিৎ একটু আড়চোখে একটু দেখতাম,মিথ্যে বলবো না!তখন মাঝে-মাঝেই দেখতাম রাত্রিও আমার দিকেই তাকিয়ে!একবার তো সোজাসুজি চোখাচোখি হয়ে গেছিল!সেদিন পাড়ায় অনুষ্ঠান ছিল।আমি আর আমার বন্ধু একপাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম।হঠাৎ চোখটা অন্যদিকে ফেরাতেই রাত্রির চোখে আমার চোখ!ও আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল!ও তো এমনিতেই সুন্দর,সেদিন যেন আরো বেশি সুন্দর লাগছিলো।আমার বুকটা কেমন যেন করে উঠলো!আমি তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
তবে সত্যি,সেদিন খুব ভালো লেগেছিল ওকে!আমি বোঝাচ্ছিলাম নিজেকে—না,না এসবে পড়া যাবে না!আমি সবসময়ই এসব থেকে দূরে থাকতে চাই!কিন্তু বোঝাতে পারলাম না।
এখন বলতে তো হবে ওকে?কথা হচ্ছে, জীবনেও কোনোদিন ভালো করে মেয়েদের সাথে কথা বলিনি!ওইজায়গায় হঠাৎ করে গিয়ে কিভাবে কি বলি?আর ওর সাথে তো আমার কোনোদিন কথাও হয়নি।ওর সাথে আগে কথা বলা তো শুরু করতে হবে!এটাই আমার জন্য মুশকিল!চোখ তুলে চাইতেই পারিনা যেজায়গায়,ওইজায়গায় কথা বলা সম্ভবই না!
কয়দিন পর রেজাল্ট দিবে।ভেবে নিলাম,যেদিন রেজাল্ট দিবে, ওইদিনই রেজাল্ট জানার ভাব দেখিয়ে কথা বলা শুরু করবো।হাজার হোক, একক্লাসেই পড়ি।ওই হিসেবে এমনভাবে কথা বলা শুরু করা যাবে।আমি হয়তো ওকে চিনিনা,কিন্তু ও যে এবার মাধ্যমিক দিয়েছে এটা জানি।তেমনি রাত্রিও হয়তো আমাকে সেই হিসেবে চিনে!২.
যেদিন রেজাল্ট দিবে, ওইদিন ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। এমনিতে ৯ টা ১০ টার আগে উঠতাম না।টেনশনে কি করবো, কি না এমন অবস্থা!সময়ও যেন কাটছিলো না,রেজাল্টের টাইমও হচ্ছিল না যেন।একটু হেঁটেও আসলাম।না,টাইম কাটার নয় কোনোমতেই!
রেজাল্ট প্রকাশিত হলো।ভয়ে ভয়ে দেখলাম।রেজাল্ট আসলো, কিন্তু আমার দেখার সাহস হচ্ছিল না!বুক ধড়পড়ানো বেড়েই চলেছে,মনে হচ্ছিল হার্ট অ্যাটাক হয়েই যাবে।তাকালাম রেজাল্টের দিকে—রেজাল্ট ভালোই হয়েছে। সবগুলোতে প্লাস আর ৯৪ পার্সেন্ট।এবার একটু সাহস হলো।তাড়াতাড়ি মাকে জানালাম।সবার আগে মাকেই জানাতে হবে,এর আগে কাউকে না।
এখন আরো কিছু টেনশন।বন্ধুদের রেজাল্ট। ওদের খোঁজ নিলাম।একজন তো ওর রেজাল্ট দেখার দায়িত্ব আমার উপরেই দিয়ে দিয়েছিল,ওর সাহস হচ্ছিল না দেখার!ওরটাও দেখলাম।এর মধ্যে জানা কথা,আত্মীয়দের ফোন!মিষ্টি-টিষ্টি আনা-দেওয়া।আর যেহেতু রেজাল্টের দিন,বন্ধুুদের সাথে কথা তো হবেই।একজন বলবে,’’জানা কথা তুই ভালো করবি,শুধু শুধু ভাব দেখাতি!” আরেকজন বলবে,”কংগ্রেট্স ব্রো!” আরেকজন বলবে, “ভাই ট্রিট?”
এর মধ্যেই একজন বলে উঠলো,” ভাই ফাটিয়ে দিয়েছো,তুমি টপার।সবচেয়ে বেশি মার্ক পেয়েছো!” আমি নিজেই অবাক!
এসবের মধ্যে আজ রাত্রির সাথে যে আমার কথা বলা লাগবেই,এটা বেমালুম ভুলে গেছি!ওর রেজাল্টও জানি না।আর জানবোও কার থেকে!কিন্তু রাত্রির রেজাল্টের খবরটা আমার পরিকল্পিত পরিকল্পনার মাঝে জল ঢেলে বাতাসে উড়ে এলো—রাত্রি এক বিষয়ে ফেল!মনটা বিগড়ে গেলো!এখন জিগ্যেস করি কিভাবে?যে জায়গায় ও ফেল,আর আমি পেয়েছি সর্বোচ্চ নাম্বার!আমি যে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছি, এটাও বাতাসে ছড়িয়ে গেছে!আর এমনিতেও মেয়েরা এসব খোঁজ-খবরও ভালো রাখে। এখন জিগ্যেস করলে ভাববে,“যে কোনসময় আমার সাথে কথা বলেনি,আজ ভালো রেজাল্ট করেছে বলে আর আমি ফেল করেছি বলে ভাব দেখাতে এসেছে ইচ্ছে করে!” বিষয়টা প্যাঁচালো হয়ে যাবে!তাই আর ওর সাথে কথা বলা হলো না।ভাবলাম পরে যেভাবেই হোক,ওর সাথে কথা বলবোই।৩.
এরমধ্যে রাত্রির সাথে আমার কথা হয়নি!তারপর আমি শহরের বাইরে এক কলেজে এডমিশন নিয়ে চলে গেলাম।হোস্টেলে থাকি।পড়ালেখার চাপে,আর ওখানের বন্ধবান্ধবদের সাথে মিশে রাত্রির কথা মনে পড়তো মাঝে-মধ্যে,তবে বেশি না।বাড়িতেও আসতাম মাঝে-মধ্যে ১-২ দিনের জন্য, কিন্তু রাত্রির দেখা পেতাম না সবসময়!
তবে সেবার দূর্গাপুজোয় ওকে আবার দেখলাম।শাড়ি পড়েছিল। অষ্টমীর দিন বোধহয়।এর আগে আর ওকে শাড়িতে কোনোদিন দেখিনি,খুব সুন্দর লাগছিল ওকে।যেন সাক্ষাৎ দূর্গা মর্ত্যে আগমন করেছেন।সেবারও ওর সাথে কথা বলবো-বলবো করে বলাই হয়নি!কিভাবে বলবো,কি দিয়ে কথা শুরু করবো —এসবই ভেবে পাইনি।পুজোও চলে গেল।ওর সাথেও কথা বলা হলো না। ভাবলাম পরে কোনোসময় ওর সাথে কথা বলবোই।আমিও ফিরে গেলাম।
এরমধ্যে ৩ মাসে ২ দিনের জন্যে একবার বাড়ি এসেছিলাম।রাত্রির সাক্ষাৎ পেয়েছি একদিন, কিন্তু কথা বলতে পারিনি,সাহস হয়নি।আবার ফিরে গেলাম।
এরপর যখন আবার বাড়ি আসলাম,তখন আর রাত্রির দেখা পাইনি।আর হয়তো কোনোদিন পাবোও না আর কথাও বলা হবে না ওর সাথে।কারণ,রাত্রির বিয়ে হয়ে গেছে!ওই দূর্গাপুজোর সময় থেকেই নাকি বিয়ের আলাপ চলছিলো।পাত্রপক্ষও নাকি ভালো,বড়লোক,পণও নেয়নি!তাই বিয়ে দিয়ে নাকি রাত্রির বাবা মুক্তি হয়েছেন!খবর বাতাসে ছড়ায়, তাই জানতে পেরেছি।নাহলে কাকে গিয়ে জিগ্যেস করতাম রাত্রির কথা?আর আমিও তো একটু হলেও রাত্রির খোঁজ রাখতাম!
আমি যতই পাষাণ হই না কেন,আমার কেমন কষ্ট হচ্ছিল।আসলে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল!ওর সাথে একটু কথাও বলতে পারিনি!ভালো লেগেছিল ওকে, বলবো দূরে থাক।
আমারই দোষ।আমি পরে বলবো, পরে বলবো করে,এটা ভুলে গেছিলাম যে পরে হয়তো আর সুযোগই হবে না বলার।কারণ,আমাদের সমাজে এখনও এমন মানুষ আছেন,যারা মেয়ে মাধ্যমিক দিতে না দিতেই, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে মুক্তি হতে চান!আর পাত্র একটু বড়লোক হলে তো কথাই নেই!বলেন ঠিকই মেয়ের ভালোর জন্যই দিচ্ছি,কিন্তু মেয়ের ভালোটা আর কোনোদিন ভেবে দেখেন না!
চাপা একটা কষ্ট,রাগ আর অভিমান সারাজীবন থেকে যাবে নিজের ওপর।আর একটা আপসোস থেকে যাবে,রাত্রির সাথে একটু কথাও বলতে পারি নি।বলার সেই সুযোগ আর উপলক্ষ যেটা আমি খোঁজেছিলাম,সেটাই পাইনি!কোনোদিন চোখে চোখ রেখে সোজাসুজি তাকাতে পারিনি! একটু ভালো করে কেনোদিন ওর সাথে কথা হয়নি, ওকে দেখা হয়নি!আর হবেও না!
রাত্রিকে আমি কোনোদিনও ভুলতে পারবো না।রাত্রি যেখানেই আছে,যেন ভালো থাকে।~অনিক বিশ্বাস
3 Comments
Friends
ইহতেমাম ইলাহী
@ihtemamelahi
রায়হানা জাকিয়া (নিঃসঙ্গ অ্যালবাট্রস)
@alonelyalbatross
Aziza Mahbub Siddique
@aziza-mahbub-siddique
মোরশেদ সাকিব
@morshedsakib
Ekhtiar Uddin
@ekhtiar2003
আবু রায়হান মোহাম্মদ
@aburayhanmohammed
অমিত
@amitroy
ইভান
@ivan
afrad zayan
@afradzayan


“পরে বলবো, পরে বলবো করে, এটা ভুলে গেছিলাম যে পরে হয়তো আর সুযোগই হবে না বলার।” এটি কেবল একটি লাইন নয়, এটি অনেকের জীবনের এক পরম শিক্ষা।