Profile Photo

সাব্বির হোসেন।Offline

  • shadowhunter3d
  • Profile picture of সাব্বির হোসেন।

    সাব্বির হোসেন।

    • 6 months, 4 weeks ago

    [“শেষ বিকেলের মায়া”]

    ​দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শুনে আনিস সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। এ সময় কার আসার কথা? কেউ তো আসার কথা নয়। এই শহরে মানুষের দরজায় কড়া নাড়ার অভ্যাসটা কমে যাচ্ছে। সবাই এখন ফোনে ‘টুং’ করে মেসেজ পাঠায়। কড়া নাড়ার মধ্যে একটা মানবিক ব্যাপার আছে, যা মোবাইলের স্ক্রিনে নেই।
    ​আনিস সাহেব দরজা খুললেন। বাইরে কেউ নেই। কেবল এক ঝলক তপ্ত বাতাস হু হু করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। বৈশাখ মাস আসছে, প্রকৃতির মেজাজ এখন বেশ চড়া। আনিস সাহেব বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আকাশটা কেমন যেন ছাই রঙের হয়ে আছে। বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই, অথচ গুমোট একটা ভাব।
    ​মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতা অনেকটা এই বিকেলের আকাশের মতো। না রোদ, না বৃষ্টি। একটা দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। আনিস সাহেব ভাবলেন, জীবনের এই যে চুয়ান্নটা বছর তিনি পার করলেন, তার প্রাপ্তি কী? একটা নীল রঙের হাউজিংয়ের ফ্ল্যাট, যার কিস্তি শোধ করতেই জীবনটা অর্ধেক ফুরিয়ে গেল। অথচ ছোটবেলায় তিনি স্বপ্ন দেখতেন জঙ্গলঘেরা এক ছন ছনে বাড়িতে থাকবেন, যেখানে জ্যোৎস্না পড়লে উঠোনটা দুধের মতো সাদা হয়ে যাবে।
    ​এখনকার জ্যোৎস্না বড় ভেজাল। শহরের নিয়ন আলোর দাপটে আকাশের চাঁদটা এখন খুব ফ্যাকাশে দেখায়।
    ​তার বড় ছেলেটা এখন দূরে থাকে। কত দূরে? আনিস সাহেব মনে মনে হিসেব মেলাতে পারেন না। ছেলেটা যখন ছোট ছিল, তখন বৃষ্টি নামলেই বাবার হাত ধরে ছাদে যাওয়ার বায়না করত। এখন ছেলেটা ফোন দিয়ে বলে, “বাবা, শরীরটা সাবধানে রেখো, ঠিকমতো ওষুধ খেও।” ব্যস, ওটুকুই। বাস্তবতার রুক্ষতা আমাদের আবেগগুলোকেও কেমন যেন কেজো করে দেয়। ওষুধের প্রেসক্রিপশন আর ইনস্যুরেন্সের পলিসিতেই আটকে যায় সব ভালোবাসা।
    ​নিচে রাস্তায় একটা জটলা দেখা যাচ্ছে। হয়তো কোনো রিকশাওয়ালা আর যাত্রীর মধ্যে দুই টাকা নিয়ে তুমুল তর্ক চলছে। আমরা সবাই খুব অদ্ভুত। লাখ টাকার ফ্ল্যাটে থেকেও দুই টাকার জন্য আমাদের গলা চড়ে যায়। এটাই হয়তো মানুষের চিরন্তন স্বভাব।
    ​আনিস সাহেবের হঠাৎ মনে হলো, এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না। চিনি ছাড়া কড়া চা। চিনি খাওয়া তার বারণ, ডাক্তার কড়া গলায় বলে দিয়েছেন। কিন্তু আজ তার খুব মনে হচ্ছে, এক চামচ চিনি বেশি দিয়ে চা খেলে কি খুব ক্ষতি হতো? জীবনে নিয়ম মেনে চলতে চলতে আমরা জীবনের স্বাদটাই নিতে ভুলে যাই।
    ​তিনি অন্ধকার ঘরে একা বসে রইলেন। জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠেছে। একটা ফিঙে পাখি কার্নিশে বসে লেজ ঝাপটাচ্ছে। আনিস সাহেব মৃদু হেসে নিজেকেই বললেন, “জীবনটা আসলে খুব ছোট নয়, আবার খুব বড়ও নয়। জীবনটা হলো জুতোর ভেতর ঢুকে পড়া ছোট এক টুকরো কাঁকরের মতো। হাঁটতে গেলে খচখচ করবে, কিন্তু ওই কাঁকর নিয়েই আমাদের বহুদূর যেতে হবে।”
    ​তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কেতলিটা চুলায় বসালেন। বাস্তবতার রুক্ষতা এক নিমেষে উড়ে যায় যদি মনের ভেতর এক টুকরো শৈশব আর খানিকটা মায়া বাঁচিয়ে রাখা যায়।

    [ সাব্বির হোসেন। ]

    1
    1 Comment
    • আনিস সাহেবের একাকিত্ব কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই এত বাস্তব লেগেছে… অনবদ্য💙❤🤍

Sabbir Hossain

Skip to toolbar