Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    1 week, 2 days ago

    ঈদে বাড়ি ফেরা

    ​১৯৯০ সালের রমজানের শেষ দিক। আকাশে ঈদের চাঁদের জন্য অপেক্ষা, আর মনে ঘরে ফেরার ছটফটানি। তখন আমি রাজশাহীতে কাজ করি। মা-বাবা থাকেন চট্টগ্রামে। আজকের দিনের মতো চার-ছয় লেনের মসৃণ হাইওয়ে কিংবা যমুনার ওপর ঝকঝকে বঙ্গবন্ধু সেতু তখনো ভবিষ্যতের গর্ভে। উত্তরবঙ্গ থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার রুটটি ছিল এক দীর্ঘ, Uncertain কিন্তু অদ্ভুত মায়াময় অ্যাডভেঞ্চার। রাজশাহী থেকে বাসে চেপে পাবনার নগরবাড়ী ফেরিঘাট, সেখান থেকে যমুনা নদী পার হয়ে মানিকগঞ্জের আরিচা, তারপর ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম। ২৪ ঘণ্টার সেই পথ কখনো কখনো নদী আর ফেরির খামখেয়ালিতে ঠেকে যেত ৪৮ ঘণ্টায়।
    ​কিন্তু সেই দীর্ঘযাত্রায় ক্লান্তি ছিল না, ছিল না আজকের দিনের যান্ত্রিক বিরক্তি। সেই যুগে ভ্রমণ মানেই ছিল গল্প করার এক বিশাল ক্যানভাস, অচেনা মানুষের সাথে চটজলদি বন্ধু বনে যাওয়া, পথের ধারের চটকা-কিসসা শোনা আর যাত্রা বিরতিতে ভাঁড়ের ধোঁয়া ওঠা চা আর স্থানীয় সুস্বাদু মিষ্টির স্বাদ নেওয়া। ছুটির আকাল থাকলেও ভ্রমণে ছিল বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা।
    ​সেবার ঈদের ছুটিতেও এর ব্যতিক্রম হলো না। সন্ধ্যাবেলা রাজশাহী থেকে রওনা দিয়ে যখন নগরবাড়ী ঘাটে পৌঁছালাম, ততক্ষণে রাত নেমেছে। ঘাটে এসে জানা গেল, যমুনার নাব্যতার সংকট আর ঈদের বাড়তি গাড়ির চাপে সময়মতো ফেরি পাওয়া লটারি জেতার সামিল। কোনোমতে একটা ডাম্প ফেরিতে জায়গা মিলল বটে, কিন্তু মাঝনদীতে এসে চরের কাছে ড্রেজিংয়ের অভাবে ফেরিটি আটকে গেল বালিতে।
    ​শহুরে ব্যস্ত মানুষ হলে হয়তো কপাল চাপড়াতাম, কিন্তু ঈদের এই ঘরমুখো মানুষগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত সহনশীলতা ছিল। কেউ বিরক্ত হলো না। চালক জানালেন, জোয়ারের পানি বা অন্য ফেরির সাহায্য ছাড়া রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। ব্যস, নদীর বুকের সেই নির্জন চরটিই যেন মুহূর্তের মধ্যে এক টুকরো উৎসবের ময়দান হয়ে উঠল। যাত্রীরা ফেরি থেকে নেমে চরের বালিতে এসে বসল। কেউ পকেট থেকে মুড়ি-চানাচুর বের করল, কেউ সুর করে শুরু করল পুঁথিপাঠ, আর কেউ বা বলতে লাগল নিজের জীবনের নানান কাহিনি, ছন্দ, শ্লোক। অচেনা মানুষগুলো এক রাতেই যেন হয়ে উঠল একই পরিবারের সদস্য। মা-বাবার কাছে পৌঁছানোর ব্যাকুলতা আর অস্থিরতা তো ছিলই—কখন বাড়ি যাব, কখন মাকে দেখব, বাবাকে দেখব—কিন্তু প্রকৃতির এই থমকে যাওয়া রূপের ভেতর এক অন্যরকম শান্তিও ছিল। চরে আটকে যাওয়া ফেরিতে রাত কাটানো, আড্ডা আর চরে ঘুরে বেড়ানোটা এক নিমেষেই এক দারুণ স্মৃতিতে রূপ নিল।
    ​রাত কেটে ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করল, যমুনার বুকে কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্যটা উঁকি দিল। চরের চারপাশটা তখন এক অপার্থিব সৌন্দর্যে রূপ নিয়েছে। আমি ফেরির ডেক থেকে নেমে নদীর পাড়ে একটু হাঁটছিলাম। তখনই দেখা হলো নূরীর সাথে।
    ​নয়-দশ বছরের এক ফ্রক পরা ফুটফুটে খুকি। তার বড় বড় উৎসুক চোখ দুটো আটকে আছে আমাদের এই বিশাল লোহার ফেরিটার ওপর। চরে হুট করে এত মানুষ আর এত বড় একটা জলযান আটকে গেছে দেখে সে বেশ কৌতূহল নিয়ে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
    ​আমি তার কাছে গিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কী গো মা, এত সকালে নদীর পাড়ে যে? মা-বাবা কোথায়?”
    ​নূরী চটপটে গলায় জবাব দিল, “ফেরি দেখতে আইছি। আমাগো ঘর তো ওই চরের ওপারেই।”
    কথা প্রসঙ্গে জানলাম, ওরা তাঁতী পরিবার। সুদূর সিরাজগঞ্জ থেকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে এই চরে এসে বসতি গেড়েছে। নূরীর মা-বাবা এই সাতসকালেই ঘরে তাঁত বুনতে বসে গেছেন, ঈদের আগে কাপড়ের খুব চাপ।
    ​নূরী এবার বড় বড় চোখ করে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী করো গো ভাইজান? এই বড় জাহাজে কই যাও?”
    ​আমি হেসে বললাম, “আমি তো চাকরি করি। রাজশাহীতে থাকি, চট্টগ্রামে মা-বাবার কাছে যাচ্ছি ঈদ করতে।”
    ​নূরী মাথা দুলিয়ে বলল, “ওহ, তুমিও তাঁত ফ্যাক্টরিতে কাজ করো বুঝি? আমাগো চরের ওপারেও একটা বড় ফ্যাক্টরি আছে।”
    ​শহরের কর্পোরেট বা সরকারি চাকরির পরিভাষা এই চরের খুকির জানা নেই। তার চেনা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান হলো ‘তাঁত ফ্যাক্টরি’। আমি আর তার ভুল ভাঙালাম না। এই সহজ, সরল আর নিষ্পাপ ভাবনার মাঝেই তো লুকিয়ে থাকে আমাদের মাটির আসল রূপ। পকেট থেকে একটা লজেন্স বের করে নূরীর হাতে দিতেই তার মুখে যে চিলতে রোদ খেলে গেল, তা যেন ভোরের সূর্যকেও হার মানায়।
    ​বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ আর পানির তোড়ে ফেরিটি আবার সচল হলো। সাইরেন বাজিয়ে যখন ফেরি চরের বালি ছেড়ে গভীর জলের দিকে রওনা দিল, আমি ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে দেখলাম, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নূরী ছোট ছোট হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।
    ​ফেরির ইঞ্জিন সগর্জনে চলতে শুরু করল আরিচার উদ্দেশ্যে। সামনে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি, ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে হবে, মায়ের হাতের সেমাই খেতে হবে, বাবার সাথে ঈদের নামাজে যেতে হবে। কিন্তু নগরবাড়ী আর আরিচার মাঝখানের এই যমউনার চর, মাঝরাতের সেই অচেনা মানুষদের আড্ডা, আর ভোরের আলোয় দেখা তাঁতী কন্যা নূরীর সেই সরল মুখটি আমার হৃদয়ে এক গভীর উত্তরণ ঘটিয়ে দিল।
    ​আমি বুঝলাম, ঈদ মানে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; ঈদ মানে এই যাত্রাপথের ধুলোবালি, নদী, প্রকৃতি আর পথের ধারের অতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার সাথে নিজের মনের এক পরম মিলন। যান্ত্রিক জীবনের সব ক্লান্তি ধুয়েমুছে আমি তখন পুরোপুরি এক ঘরের ছেলে, যে তার শিকড়ের টানে এগিয়ে চলেছে।

    4
    2 Comments
Skip to toolbar