Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    6 days, 8 hours ago

    দূর সাগরের ঝড় যখন আমার ব্যবসার টেবিলে: আইল্যান্ড চেইন স্ট্র্যাটেজি ও একজন আমদানিকারকের চোখ দিয়ে দেখা ভূ-রাজনীতি

    ভূ-রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিকে অনেকেই কেবল পাঠ্যবই কিংবা চাকুরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সাধারণ জ্ঞান (General Knowledge) হিসেবেই দেখে থাকেন। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। চাকুরির ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়েই প্রথম মুখস্থ করেছিলাম “দ্য আইল্যান্ড চেইন স্ট্র্যাটেজি” (The Island Chain Strategy) বা দ্বীপমালা কৌশলের নাম। খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য পড়া সেই তত্ত্বটি যে একদিন আমার কর্মক্ষেত্রে এসে আক্ষরিক অর্থেই কোটি টাকার ব্যবসায়িক লোকসান আর বাস্তব উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনো ভাবিনি।

    আজ যখন আমি নিজে চীন থেকে পণ্য আমদানি করছি, তখন খুব কঠিনভাবে উপলব্ধি করেছি—বিশ্বায়নের এই যুগে দূরবর্তী কোনো সাগরের সামরিক উত্তেজনা কীভাবে আমাদের দেশের একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর পুঁজি আর অস্তিত্বকে সরাসরি সংকটে ফেলতে পারে।
    তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা: মালাক্কা প্রণালীর সেই এক মাস
    আমার আমদানিকৃত পণ্যবাহী জাহাজগুলোর রুট খুবই নির্দিষ্ট: চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর থেকে রওনা হয়ে জাহাজগুলো ভারত মহাসাগর ও আন্দামান সাগর পেরিয়ে मालाক্কা প্রণালীতে (Strait of Malacca) প্রবেশ করে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই সরু জলপথটি এক বিরাট চোকপয়েন্ট (Chokepoint)। এই একটিমাত্র সংকীর্ণ রুট দিয়ে এশিয়ার প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়।

    বাস্তব অভিজ্ঞতাটি হলো, সম্প্রতি পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক অবনতির কারণে এই রুটে হঠাৎ কড়া নজরদারি ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে তল্লাশি শুরু হয়। বলা হলো, নিরাপত্তা জনিত কারণে এই তল্লাশি। কিন্তু এর সরাসরি খেসারত দিতে হলো আমাদের মতো আমদানিকারকদের। যে পণ্যবাহী জাহাজ সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে বন্দরে পৌঁছানোর কথা, তা সাগরেই আটকে রইল এক থেকে দেড় মাস। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের কারণে আমাদের স্থানীয় সাপ্লাই চেইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি পণ্য আমদানি করছিলাম, তারা সময়মতো সরবরাহ না পেয়ে চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি পণ্য না নেওয়ার চূড়ান্ত হুমকি দেয়। চাকুরির পরীক্ষার জন্য পড়া সেই ‘আইল্যান্ড চেইন স্ট্র্যাটেজি’ তখন আর নিছক কোনো বইয়ের পাতা রইল না, তা রূপ নিল বাস্তব ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে।

    ভোক্তা পর্যায় আর ভূ-রাজনীতির অদৃশ্য সুতো
    আমাদের দেশের সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে কেউ হয়তো ভাবতেই পারবেন না যে, সুদূর ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের মধ্যকার কূটনৈতিক শীতল যুদ্ধ কীভাবে তাদের নিত্যদিনের পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সাধারণ মানুষ দোকানে গিয়ে যে দেশীয় পণ্যটি কিনছেন, সেটির মূল কাঁচামাল হয়তো এসেছে চীন থেকে। কিন্তু সেই কাঁচামালবাহী জাহাজটি যখন মালাক্কা প্রণালীতে ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পড়ে আটকে থাকে, তখন বাংলাদেশের কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ভোক্তা হয়তো ভাবছেন দেশের ভেতরের কোনো সমস্যার কারণে দাম বাড়ছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা নীতি বাংলাদেশের বাজারের পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে—এই অদৃশ্য সুতোর টান একজন আমদানিকারক ছাড়া আর কারও পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন।

    আইল্যান্ড চেইনের মূল বিন্যাস ও বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ
    যাঁরা বিষয়টি নতুন করে জানছেন, তাঁদের সুবিধার্থে বলি—এই স্ট্র্যাটেজিটি মূলত তিনটি প্রধান ভৌগোলিক স্তরে বা চেইনে বিভক্ত:

    ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন (প্রথম দ্বীপমালা): জাপানের মূল ভূখণ্ড, ওকিনাওয়া, তাইওয়ান এবং ফিলিপাইন হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোই হলো বাণিজ্যিক জাহাজ বের হওয়ার মূল পথ।

    সেকেন্ড আইল্যান্ড চেইন (দ্বিতীয় দ্বীপমালা): গুয়াম, পালাউ এবং মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ। এটি মূলত দূরবর্তী সামরিক ও লজিস্টিক অবকাঠামোর মূল কেন্দ্র।

    থার্ড আইল্যান্ড চেইন (তৃতীয় দ্বীপমালা): হাওয়াই থেকে শুরু করে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল।

    কোনো কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উত্তেজনা তৈরি হলে, এই দ্বীপমালাগুলোকে ভিত্তি করে মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজের গতিপথ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, গতি হ্রাস বা তল্লাশি করা সম্ভব হয়। আর এই তল্লাশির চক্করে পড়েই সাধারণ ব্যবসায়ীদের লজিস্টিক খরচ ও সময় অপচয় হয়।
    বিকল্পের খোঁজে বিশ্ব বাণিজ্য
    আমেরিকার এই কৌশলকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের জন্য “কৌশলগত অবরুদ্ধকরণ” মনে করে। ফলে এর বিপরীতে এখন বিকল্প বাণিজ্য পথ বা উইন্ডো তৈরি করা হচ্ছে। যেমন—বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতায় পাকিস্তান (গোয়াদার বন্দর), শ্রীলঙ্কা (হাম্বানটোটা বন্দর) এবং মিয়ানমারের (কিউকফিউ বন্দর) মতো কৌশলগত স্থানে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যাতে মালাক্কা প্রণালী বা প্রথম আইল্যান্ড চেইনের সংবেদনশীল রুট এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে পণ্য আনা-নেওয়া করা যায়। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ নদীপথ থেকে সরাসরি দক্ষিণ চীন সাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য পিংলু খাল (Pinglu Canal)-এর মতো মেগা প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে।

    উপসংহার
    আজকের দিনে ব্যবসা করতে গেলে শুধু বাজারের চাহিদা আর পণ্যের মান বুঝলেই চলে না, বৈশ্বিক রাজনীতির মানচিত্রটাও বুঝতে হয়। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন আমাদের স্থানীয় ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলোকে মাথায় রেখেই এখন আমাদের ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বিকল্প ব্যাকআপ রুট সাজাতে হবে। কোনো প্রকার উসকানিমূলক পদক্ষেপ ব্যতিরেকে মুক্ত বাণিজ্য পথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমেই কেবল বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও আমাদের মতো সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

    6
    3 Comments
Skip to toolbar