Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    6 days, 2 hours ago

    সত্য ও ন্যায়ের সন্ধানে: বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর ও আধুনিক উম্মাহর অগ্রযাত্রা

    “লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক…” — হে আল্লাহ, আমি হাজির, আমি উপস্থিত। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে উচ্চারিত তাওহীদের এই মহান বাণী বিশ্বাসী হৃদয়ে যে আত্মিক আকুলতা ও বিশ্বজনীন ঐক্যের জন্ম দেয়, তার কোনো তুলনা নেই। ইসলামের এই পথচলা যুগে যুগে কেবল মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবতা, শান্তি, পারস্পরিক সহাবস্থান এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন অভিযাত্রা।

    আজকের পরিবর্তনশীল পৃথিবীর দিকে তাকালে একজন ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের মনে নানা জিজ্ঞাসা জাগে। ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের সংকট এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের কষ্ট আমাদের মানবিক হৃদয়কে ব্যথিত করে। বছরের পর বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া ফিলিস্তিন আজ বিশ্ব মানবতার এক অনন্য সহনশীলতার প্রতীক, যেখানে প্রতিটি মানুষ তাদের নাগরিক অস্তিত্ব ও মর্যাদার সুরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আবার এই বৈশ্বিক সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা উঠলে জাতিসংঘের কাঠামোগত বাস্তবতার বিষয়টিও আমাদের অনুধাবন করতে হয়। জাতিসংঘ মূলত বিশ্বের সকল স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের একটি সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম। কোনো একক দেশের পক্ষে বা কোনো সুনির্দিষ্ট আবেগীয় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এই সংস্থার পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের কারণে সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এটিই আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা।

    ঐতিহ্যের আলোয় ইসলামের ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় বিস্তৃতি
    ইসলামের ইতিহাস কেবল একটি দর্শনের বিকাশ নয়, বরং এটি একটি অনন্য সভ্যতা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব জাগরণ। মক্কার মরুভূমি থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত ইসলামের এই রাষ্ট্রীয় বিস্তৃতি ও রূপান্তরকে সুনির্দিষ্ট সময়কাল অনুযায়ী কয়েকটি প্রধান যুগে দেখা যায়:

    নবুয়ত ও নবী করীম (সা.)-এর আমল (৬১০–৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ): ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ‘মদিনা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘মদিনা সনদ’-এর মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি ইনসাফভিত্তিক ও বহুমাত্রিক সমাজ গঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপ এই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে আসে।

    খুলাফায়ে রাশিদুনের আমল (৬৩২–৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ): এই শাসনকাল ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম আদর্শ যুগ। এই সময়ে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ, বিচার বিভাগ ও কোষাগার (বায়তুল মাল) গঠন করা হয়। আইনের চোখে শাসক এবং সাধারণ নাগরিকের অধিকার ছিল সমান। এই সময়ে ইসলামের সীমানা আরব ছাড়িয়ে বর্তমান ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

    উমাইয়া খিলাফতের আমল (৬৬১–৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ):সিরিয়ার দামেস্কে রাজধানী স্থানান্তরের মাধ্যমে এই যুগে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। পশ্চিমে উত্তর আফ্রিকা পেরিয়ে স্পেনের (আন্দালুসিয়া) সিংহভাগ এবং পূর্বে সিন্ধু নদ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত খিলাফত বিস্তৃত হয়।

    আব্বাসীয় খিলাফত ও ‘ইসলামের স্বর্ণযুগ’ (৭৫০–১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ): ইরাকের বাগদাদ নগরীকে কেন্দ্র করে এই যুগটি জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও চিকিৎসার অনন্য উৎকর্ষের জন্য বিখ্যাত হয়। খলিফা হারুন আল-রশিদের আমলে প্রতিষ্ঠিত **’বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom)** হয়ে ওঠে তৎকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গবেষণাকেন্দ্র। ইবনে সিনা, আল-খোওয়ারিজমি, আল-বিরুনির মতো বিজ্ঞানীদের হাত ধরে আধুনিক পৃথিবী আলোর মুখ দেখে। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গোল আক্রমণে বাগদাদ ধ্বংস হলে এই যুগের অবসান ঘটে।

    আঞ্চলিক সালতানাত, মুঘল ও নবাবী আমল (১৩শ–১৮শ শতাব্দী): বাগদাদের পতনের পর মুসলিম বিশ্ব শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজবংশের মাধ্যমে বিকশিত হতে থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘলরা স্থাপত্য, অর্থনীতি এবং সুশাসনের মাধ্যমে এক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সুফি-সাধকদের উদারতা ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় ইসলামের মানবিক মূল্যবোধের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং বাংলার নবাবরা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখেন।

    উসমানী (অটোমান) খিলাফতের আমল (১২৯৯–১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ):তুরস্কের আনাতোলিয়া থেকে উত্থাপিত এই সাম্রাজ্য ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ের পর বিশ্বশক্তির রূপ নেয়। উসমানী খিলাফত প্রায় ৪০০ বছর দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বিশাল অংশ জুড়ে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমন্বয় ধরে রেখেছিল। তাদের ‘মিলেট পদ্ধতি’ (Millet System)-র মাধ্যমে বহুজাতি ও বহুধর্মের মানুষ নিজস্ব ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছিল।

    ২. বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা, মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবচ্ছেদ ও আধুনিক বাস্তবতা

    বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরো পৃথিবীর মানচিত্রকে আমূল বদলে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানী সাম্রাজ্যের পতন এবং তার ফলশ্রুতিতে ১৯১৬ সালের গোপন ‘সাইকস-পিকোট চুক্তি’র মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সীমানা তৈরি হয়। এর ফলে জন্ম নেয় আধুনিক ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান বা লেবাননের মতো স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্র এবং ১৯৭০-এর দশকে ওমান সালতানাত পা রাখে আধুনিকায়নের পথে।

    এই বিশ্বযুদ্ধগুলোর ধাক্কা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান মুসলিম বিশ্বকে একক কোনো সাম্রাজ্যের অধীনে রাখার পরিবর্তে বহু স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রে (Nation-states) বিভক্ত করে দেয়। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, অতীতের সেই বাগদাদ বা তুরস্কের মতো বিশাল একক রাজনৈতিক বা সামরিক নেতৃত্ব বর্তমানের সম্পূর্ণ ভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের পক্ষে সেভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান যুগে প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার আলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

    ৩. আধুনিক বিশ্বে মুসলিম দেশসমূহের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা

    এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ইসলাম দুর্বল হয়ে পড়েছে। বরং অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখলে বলা যায়, ইসলাম আজ বর্তমান যুগের তাগিদে এবং আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।

    আজকের পৃথিবীতে ওআইসি (OIC) ভুক্ত ৫৭টি মুসলিম প্রধান দেশ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক শক্তি আজ বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে আমাদের এই বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম উম্মাহ আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইটি সেক্টর, আধুনিক শিক্ষা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে।

    ৪. বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক প্রাপ্তি ও অর্থনৈতিক মুক্তি

    আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বযুদ্ধের এই ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলো দূরবর্তী অঞ্চলে ঘটলেও, পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ বাংলাদেশের মানুষের জন্য তা অনেক বড় সুযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছিল:

    আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উন্মোচন: মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীন দেশগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে যে আধুনিক অবকাঠামোগত বিপ্লব শুরু হয়, তার ফলে ১৯৭০-এর দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। আজ আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ‘রেমিট্যান্স’ বা প্রবাসী আয়, যার সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী ভাই-বোনদের মেধার বিনিময়ে।

    স্বাধীনতার পথ সুগম হওয়া: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় ১৯৪৭ সালে তারা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়, যা প্রকারান্তরে ১৯৭১ সালে আমাদের একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ লাভের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।
    হজ্ব ও ওমরাহ পালনে শৃঙ্খলা:আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সৌদি সরকারের পবিত্র হারামাইন সম্প্রসারণের ফলে আজ প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে লাখো মানুষ অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে হজ্ব পালন করতে পারছেন।

    উপসংহার: সত্য ও ন্যায়ের চিরন্তন আহ্বান

    যুগে যুগে মানচিত্র বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তরিত হয়েছে। উটের পিঠের কাফেলা থেকে শুরু হওয়া সমাজ আজ আধুনিক এভিয়েশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে পদার্পণ করেছে। কিন্তু একটি সুন্দর ও আদর্শ পৃথিবীর জন্য মানুষের যে চিরন্তন ক্ষুধা—তা হলো, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা।

    ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু আজ মানচিত্রের রেখায় ও স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের নিজস্ব নিয়মে বন্দি থাকলেও, ইসলামের সেই মূল চেতনা—যা বিশ্বশান্তি, নৈতিকতা ও ইনসাফের কথা বলে, তা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানায় আটকে নেই। বর্তমান বিশ্বের সমস্ত মুসলিম দেশের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাই পারে মানব সমাজকে আবার সত্য ও কল্যাণের আলোকিত পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

    5
    1 Comment
Skip to toolbar