Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    3 days, 17 hours ago

    ব্যালকোন ডেল চাম্পাকি: মেঘের সমুদ্রের দেশে

    বুয়েনস আয়ার্সের মিনিস্ত্রো পিস্তারিনি এয়ারপোর্ট থেকে যখন বের হলাম, তখন মাথার ভেতর মারাদোনা-মেসির দেশের চেনা হাওয়া। কতজন কত কথা বলেছিল—ব্রাজিলের ফুটবল শিক্ষক মাইকেল, চিলির সাদেক, কিংবা উরুগুয়ের সুমনের আটলান্টিক দেখার আমন্ত্রণ। কিন্তু একজন ফুটবল-প্রেমী এবং মানবিক বোধসম্পন্ন লেখকের কাছে আর্জেন্টিনার টানটা অন্য স্তরের। যে মাটি বিশ্বকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, যে মাটিতে ফুটবল কোনো খেলা নয়—এক পরম ধর্ম, সেই মাটির ডাক উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল। ‘দক্ষিণ আমেরিকার প্যারিস’ খ্যাত বুয়েনস আয়ার্সে যখন পা রাখলাম, তখন কেবল ফুটবল নয়, এ দেশের শিল্প ও ইতিহাসের প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করছিলাম।

    ভাবিনি এয়ারপোর্টের বাইরেই অপেক্ষা করছে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর ধারালো এক মোড়!

    ফেইসবুকের একটা ছোট্ট চেক-ইন দেখে সাফিয়া আর তার হাজবেন্ড কার্লোস গাড়ি নিয়ে হাজির। গাড়িতে উঠতেই সাফিয়া কোনো ওজর-আপত্তির সুযোগ না দিয়ে সরাসরি আমার অবচেতনের তীব্রতম ইচ্ছাটাকে ছুঁয়ে দিল। বলল, “আমি জানি তুই ফুটবলের টানে এসেছিস, কিন্তু তুই তো সারাজীবন সেই ‘ব্যালকোন ডেল চাম্পাকি’-র মেঘের সমুদ্রের কথাও বলতিস। আমরা এখন সোজা কর্দোবা যাচ্ছি। যাওয়া-আসা দুদিন, আর ট্রেইলে তিন দিন—মোট পাঁচ দিনের মিশন। প্রকৃতিকে দেখার এই চোখ না খুললে তুই আর্জেন্টিনার ফুটবল উন্মাদনার গভীরতা বুঝবি না! ওখান থেকে ফিরে এসে তারপর একসাথে ফুটবল ক্লাব আর স্টেডিয়াম। রাজি?”

    সাফিয়ার এই প্রস্তাবটি যেন আমার দ্বিধাদ্বন্দ্বকে এক নিমেষে কেটে কুচকুচ করে দিল। চিলির পাহাড় বা ব্রাজিলের সমুদ্র সৈকত নয়, এই এক আর্জেন্টিনাতেই আমি একসঙ্গে পাচ্ছি প্রকৃতির রুদ্র-সুন্দর রূপ আর ফুটবলের চিরন্তন আবেগ। এই পরম প্রাপ্তির প্রস্তাব হাতছাড়া করার প্রশ্নই ওঠে না। এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। শুরু হলো আমাদের ‘ব্যালকোন ডেল চাম্পাকি’ জয়ের মিষ্টি, রোমাঞ্চকর এক অভিযান।

    প্রথম দিন: কর্দোবার পথে ও প্রস্তুতির গল্প
    বুয়েনস আয়ার্স থেকে আমাদের গাড়ি ছুটল কর্দোবা প্রদেশের দিকে। দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। চওড়া মসৃণ হাইওয়ে ধরে দুপাশের পাম্পাস অঞ্চলের সবুজ ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে গল্প জমে উঠল। কার্লোস স্প্যানিশ টানে চমৎকার ইংরেজি বলে। ও-ই আমাদের মনে করিয়ে দিল চাম্পাকির আসল চ্যালেঞ্জের কথা—পাহাড়ের খামখেয়ালি আবহাওয়া আর খাড়া পাথুরে ট্রেইল।

    বিকালে আমরা পৌঁছালাম পাহাড়ের পাদদেশের ছোট্ট, সুন্দর গ্রাম ভিলা আলপিনা-তে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১,৩৪০ মিটার। এখান থেকেই শুরু হবে মূল ট্র্যাকিং। স্থানীয় এক অভিজ্ঞ গাইড হোসের সাথে দেখা করে আমরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারলাম। হোসে আমাদের ব্যাগ দেখে হেসে বলল, “অতিরিক্ত সব জিনিস রেখে দাও। পাহাড়ে প্রতি গ্রাম ওজনকে এক কেজি মনে হবে!” আমরা ভারী কাপড় ছাঁটাই করে কেবল ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট, ট্র্যাকিং পোল, কিছু এনার্জি বার আর জল সাথে নিলাম।

    দ্বিতীয় দিন: পাথুরে ট্রেইল আর ‘খুদে গল্প’
    ভোরবেলা যখন হাঁটা শুরু করলাম, চারপাশটা পাইন বনে ঘেরা, বাতাসে একটা মিষ্টি পাহাড়ি সুবাস। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরেই প্রকৃতি তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করল। পাইন বন শেষ হয়ে শুরু হলো রুক্ষ, পাথুরে চড়াই-উতরাই পথ।

    ঘণ্টা তিনেক হাঁটার পর সাফিয়া এক পাথরের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল, “উফ! আমার পা দুটো মনে হচ্ছে বুয়েনস আয়ার্সেই ফেলে এসেছি!” কার্লোস তখন পকেট থেকে চকোলেট বের করে সাফিয়ার মুখে পুরে দিয়ে বলল, “এনার্জি নাও, ডার্লিং! মেঘের বারান্দা এত সহজে ধরা দেয় না।”

    পথের ক্লান্তি দূর করতে আমরা গল্প জুড়লাম আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে। গাইড হোসে বোকা জুনিয়র্সের অন্ধ ভক্ত। আমি তাকে যখন বললাম, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার কোটি কোটি সমর্থক আছে এবং মানুষ ম্যারাডোনা-মেসির জন্য রাত জেগে প্রার্থনা করে, হোসের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। ও আনন্দের চোটে আমাদের তার ফ্লাস্ক থেকে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ‘ম্যাটে’ (এক ধরণের ভেষজ চা) খাইয়ে দিল। তিতকুটে কিন্তু অদ্ভুত চনমনে সেই চা খেয়ে আমাদের ক্লান্তি এক নিমেষে হাওয়া!

    প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা হেঁটে, পাহাড়ের খাঁজে পাথর দিয়ে তৈরি একটা ছোট রিফিউজে (আশ্রয়স্থল)-এ যখন পৌঁছালাম, তখন আমরা ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছি। কিন্তু পাহাড়ি ডাল আর গরম স্টু খেয়ে যখন কাঠের তৈরি বাংকে ঘুমাতে গেলাম, মনের ভেতর তখন কেবলই রোমাঞ্চ।

    তৃতীয় দিন: মেঘের বারান্দায় স্বপ্নের উত্তরণ
    আজই সেই মহামুক্তির দিন। আমরা ভোর ৪টায় রওনা হলাম মূল চূড়া, অর্থাৎ ২,৮৮৪ মিটার উঁচুর সেরো চাম্পাকির উদ্দেশ্যে। আবহাওয়া এখানে এক মহা খামখেয়ালি জাদুকর। হোসে বারবার সতর্ক করছিল, “তাড়াতাড়ি পা চালাও, কখন কুয়াশা (নেবলিনা) চলে আসে বলা যায় না।”

    পথটা এবার আরও খাড়া, আরও পিচ্ছিল। হাত-পা এক করে পাথর আঁকড়ে ওপরে উঠছি। বাতাসের বেগ বাড়ছে, সাথে কামড় দেওয়া ঠাণ্ডা। এক সময় মনে হলো ফুসফুস আর বাতাস নিতে পারছে না। সাফিয়া কার্লোসের হাত শক্ত করে ধরে বলল, “আমি আর পারছি না।” আমি আমার ট্র্যাকিং পোলটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “আর একটু সাফিয়া! মেঘের দেশ জাস্ট আর কয়েক কদম!”

    এবং ঠিক সকাল সাড়ে আটটায় আমরা পৌঁছালাম সেই কাঙ্ক্ষিত “ব্যালকোন ডেল চাম্পাকি”-তে।

    চূড়ায় পা রাখতেই আমাদের সব আড্ডা, সব হাসি-ঠাট্টা, এমনকি ক্লান্তির তীব্র নিঃশ্বাসটুকুও স্তব্ধ হয়ে গেল। স্প্যানিশ সেই প্রবাদটা মনে পড়ে গেল—“Sobran las palabras” (শব্দ এখানে নিষ্প্রয়োজন)।

    আমাদের পায়ের নিচে দিগন্ত বিস্তৃত ধবধবে সাদা মেঘের এক সুবিশাল সমুদ্র! মনে হচ্ছিল আমরা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে আকাশের এক বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। মাথার ওপরে কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশ, আর নিচে মেঘের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ধূসর পাথুরে পাহাড়ের গায়ে। আমরা তিনজনে একে অপরের হাত ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কার্লোস সাফিয়াকে জড়িয়ে ধরল, আর আমার চোখ দিয়ে তখন আনন্দের জল। এই সেই দৃশ্য, যার জন্য জীবনের সব জমানো ক্লান্তি এক নিমেষে বিসর্জন দেওয়া যায়!

    চতুর্থ ও পঞ্চম দিন: ফিরে আসা এবং স্বপ্নের রিভিউ
    চতুর্থ দিনে যখন পাহাড় থেকে নামছিলাম, তখন আমাদের পায়ে ব্যথার চেয়ে মনে আনন্দের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। নামার পথটাও সহজ ছিল না, পিচ্ছিল পাথরে দু-একবার আছাড় খেতে খেতেও আমরা হাসছিলাম। হোসে বিদায় নেওয়ার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি শুধু ফুটবলের টানে আসোনি বন্ধু, তুমি চাম্পাকির মেঘেরও টানে এসেছ।”

    পঞ্চম দিনে আমরা যখন আবার বুয়েনস আয়ার্সের চেনা রাজপথে, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষ মনে হচ্ছিল। সাফিয়ার সেই জেদি প্রস্তাবটা না শুনলে আর্জেন্টিনার এই স্বর্গীয় রূপটা আমার অদেখাই থেকে যেত। একদিকে মেঘের সমুদ্র জয়ের দুর্দান্ত তৃপ্তি, অন্যদিকে সামনেই অপেক্ষা করছে লা বমবোনেরা স্টেডিয়াম আর ফুটবল রোমাঞ্চ।

    গাড়ির জানালা দিয়ে আর্জেন্টিনার হাওয়া গায়ে মাখতে মাখতে মনে হলো—বন্ধুদের সব যুক্তি একদিকে, আর আর্জেন্টিনার এই জাদুকরী টান একদিকে। এই ভ্রমণ শুধু দূরত্বের উত্তরণ নয়, এ যেন এক স্বপ্নের চূড়ান্ত উত্তরণ!

    7
    3 Comments
    • মেঘের সমুদ্রে স্বপ্নের উত্তরণ….🤍

    • ফুটবল আর ভ্রমণকে আপনি যেভাবে একই সুতোয় গেঁথেছেন, তা আপনার লেখাকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে
      অনন্য সৃষ্টি, শুভকামনা কবি

    • পড়ার পর মনে হচ্ছে এখনই ব্যাগ গুছিয়ে আর্জেন্টিনার সেই মেঘের দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিই।

Skip to toolbar