Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    1 day, 4 hours ago

    নোনাজলের স্বপ্ন এবং সম্রাট আকবরের সেনাপতি

    টেবিলে ‘হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট’-এর মোটা বইটা খোলা। চারপাশের শব্দগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছিল। ৩২০ কোটি ক্ষারক বা নিউক্লিওটাইড বেসের বিন্যাস পড়তে পড়তে কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছিল, টের পাইনি। এ যেন এক অদ্ভুত মহাজাগতিক কোড, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতিকে টিকিয়ে রেখেছে, লড়াই করতে শিখিয়েছে।
    ​হঠাৎ এক তীব্র আলোর ঝলকানি। ধুলো আর ঘোড়ার খুরের আওয়াজে চারপাশটা কেঁপে উঠল। তাকিয়ে দেখি, সামনে স্বয়ং শাহেনশাহ সম্রাট আকবর! তাঁর জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় পোশাক, চোখে ইস্পাতকঠিন চাউনি।
    ​তিনি আমার দিকে তাকিয়ে গমগমে আওয়াজে বললেন, “উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় নেই! তুমি ঘোড়া, হাতি, সৈন্য, সামন্ত নিয়ে এখনই প্রস্তুত হও। সমুদ্র উপকূলের ‘চর সোনাপুর’-এর অবাধ্য রাজা আমাদের কর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সাম্রাজ্যের অবমাননা বরদাস্ত করা হবে না। আক্রমণ করো! যদি জয়ী হতে পারো, তবে তুমিই হবে চর সোনাপুর এর নতুন অধিপতি।”
    ​আমি? এই শান্তিশিষ্ট, বইয়ের পাতায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষটা হবো সেনাপতি? কিন্তু আমার শরীরের ভেতর তখন অন্য এক আদিম রক্তের স্রোত বইতে শুরু করেছে। হাজার বছরের পুরনো শিকারি এবং যোদ্ধার যে জিনগুলো সুপ্ত ছিল, তারা যেন হঠাৎ জেগে উঠল। আমি তরবারি উঁচিয়ে হুকুম দিলাম—”আক্রমণ!”
    ​চর সোনাপুর জয় করতে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু বিজয়ের আসল পরীক্ষা তো শুরু হলো তার পরে। কিছুদিন পরই টের পেলাম, আমার মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নতুন বিজিত এলাকাটি দখলে রাখা, এখানকার মানুষের ক্ষোভ শান্ত করা এবং কর আদায় করা। অথচ, আমার ভেতরে তখন এক অস্থিরতা। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল রাজ্যটাকে আরও বড় করি, সীমানা ছাড়িয়ে যাই। কিন্তু উপায় নেই! চারদিকেই সম্রাট আকবরের বিশাল সাম্রাজ্যের কাঁটাতার। এক পা বাড়ানোর জায়গা নেই। এক খাঁচায় বন্দী সিংহের মতো ছটফটানি।
    ​”কী হলো? ঘুমে কাদা হয়ে গেলে নাকি? চা-টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!”
    ​স্ত্রীর গলার আওয়াজে ধড়মড় করে বাস্তবতার মাটিতে আছড়ে পড়লাম। সামনে কোনো সম্রাট নেই, তরবারি নেই। আছে কেবল টেবিলের ল্যাম্পের আলো আর আধখোলা জিনোমের বইটা। কপালে জমে থাকা ঘামটা মুছে হাসলাম। ভাবলাম, কী অদ্ভুত এই মানুষের মন, আর কী অদ্ভুত তার ভেতরের জিনোম!
    ​আসলে, আমার সেই স্বপ্নের ছটফটানি আর বাস্তবতার এই লড়াইয়ের সূত্র তো লুকিয়ে আছে এই ৩২০ কোটি লেটারের কোডের ভেতরেই। আমাদের জিনোমে শুধু প্রোটিন তৈরির নির্দেশ থাকে না, থাকে আমাদের স্বভাবের, আমাদের আদিম ইচ্ছের এক বিশাল ব্লুপ্রিন্ট।
    ​বিজ্ঞান বলে, মানুষের জিনোমে থাকা কিছু বিশেষ সিকোয়েন্স আমাদের ‘ঝুঁকি নেওয়ার’ বা ‘নতুন কিছু খোঁজার’ (Novelty Seeking) তাগিদ দেয়। আমার ভেতরের সেই যাযাবর, রাজ্য বড় করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাটি হয়তো আমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া সেই বিশেষ জিনেরই কারসাজি। আর অন্য দিকে, জিনের যে অংশটি পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে শেখায় (Survival Instinct), সে আমাকে বলছে—”বাস্তবতা বোঝো, চর সোনাপুর দখলে রাখাই এখন তোমার জীবন ও জীবিকা।”
    ​বাস্তব জীবনে আমরা কি সবাই একেকজন চর সোনাপুরের অধিপতি নই?
    ​আমরা একটা চাকরি বা একটা জীবিকা আঁকড়ে ধরে থাকি, সেটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য দিনরাত সংগ্রাম করি। চারপাশের চেনা নিয়মের দেয়ালগুলো যেন সম্রাট আকবরের সেই অজেয় সীমানা—যাকে ডিঙানোর সাধ্য আমাদের নেই। কিন্তু মনের ভেতরের সেই ২০-২৫ হাজার জিনের কোনো একটা কোণ থেকে প্রতিনিয়ত বিদ্রোহের সুর ওঠে। সেই সুর আমাদের কবিতা লেখায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখায়, সমুদ্রের নোনাজলে বেঁচে থাকার গান গাইতে উদ্বুদ্ধ করে, আবার কখনো বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে বাধ্য করে।
    ​জীবনের এই টক-মিষ্টি স্বাদটাই আসলে জিনোম আর কল্পনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এক দিকে টিকে থাকার কঠোর বাস্তব সংগ্রাম (যা আমাদের আদিম জিনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে), অন্য দিকে সীমানা ছাড়িয়ে চরের পরিধি বড় করার রঙিন স্বপ্ন।
    ​চোখের সামনে থেকে স্বপ্নের ধুলোবালি উবে গেল। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। আমার জিনোম আমাকে এই মুহূর্তে একবিংশ শতাব্দীর এক সাধারণ মানুষ বানিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর সে চিরকাল এক চিরন্তন যোদ্ধার গল্প বুনে চলেছে। কল্পনার চর সোনাপুর আমার হাতেই থাক, আর আমি আমার বাস্তবতার যুদ্ধটা ভালোবেসেই চালিয়ে যাই।

    5
    3 Comments
    • বিজ্ঞান ও কল্পনার অপূর্ব সন্ধি….🤍

    • বিজ্ঞানের একটি কঠিন বিষয়কে আপনি যেভাবে ইতিহাসের গল্প এবং মানুষের মনের দর্শনের সাথে মিলিয়ে লিখেছেন তা সত্যিই অসাধারণ
      এই লেখাটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ

    • ‘জীবনের এই টক-মিষ্টি স্বাদটাই আসলে জিনোম আর কল্পনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন’—পুরো লেখার এই সারমর্মটা ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে গেল। বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে এত সহজ আর মায়াবী ভাষায় রূপক দিয়ে বোঝানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

Skip to toolbar