-
নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন নয়, প্রয়োজন বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যাবস্থা
……. স্বপন বিশ্বাসবাংলাদেশের শিক্ষা খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার বিস্তারে রাষ্ট্রের অন্যতম বড় সাফল্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে শিক্ষার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি সাক্ষরতার হারও উন্নত হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। এখন আর শিক্ষা খাতের প্রধান সংকট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নয়; বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈষম্য, শিক্ষার্থীর সংকট এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। তাই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন ও সমতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। দুঃখজনক হলেও সত্য, একদিকে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বাতিল বা স্থগিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। একই শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত শিক্ষা পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে। যখন বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাচ্ছে না, তখন নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের নীতিমালায় দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক দূরত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মফস্বল এলাকায় সাধারণভাবে তিন কিলোমিটারের মধ্যে এবং ১০ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হয়। এই নীতিমালার আলোকে দেশের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ২০ হাজার ৩১৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯ হাজার ২৫৯টি মাদ্রাসা এবং ৭ হাজার ৯২৫টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাৎ এই তিন ধারার প্রতিষ্ঠানই প্রায় সাড়ে ৩৭ হাজার। এর বাইরেও রয়েছে হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধারার প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং প্রচলিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। এই সংকটের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কারিগরি শিক্ষায়। সরকারি তথ্য বলছে, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬২ শতাংশ আসন শূন্য পড়ে থাকে। আবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রমে ৩৭৮টি কলেজে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন বহু স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে একটি শ্রেণিতে মাত্র ১০, ২০ কিংবা ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান চলছে। এমন বাস্তবতায় নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মানে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট আরও বাড়িয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈষম্যও চোখে পড়ার মতো। কোথাও একাধিক বহুতল ভবন, আধুনিক বিজ্ঞানাগার, আইসিটি ল্যাব ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার রয়েছে; আবার কোথাও একটি নিরাপদ ভবন পর্যন্ত নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো কার্যকর আইসিটি ল্যাব গড়ে ওঠেনি, পর্যাপ্ত কম্পিউটার নেই, বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। ফলে একই দেশের শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে উঠছে। এটি শুধু অবকাঠামোগত বৈষম্য নয়, শিক্ষার মানের বৈষম্যও।আজ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত না করে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।শিক্ষা খাতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো তদারকির অভাব। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক, কোথাও নিয়মিত পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের পরিবর্তে প্রশাসনিক দুর্বলতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর মনিটরিং, জবাবদিহিতা এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। তাই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে সেই অর্থ বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে ব্যয় করাই অধিক যৌক্তিক। একটি নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অর্থ দিয়ে বহু বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণ, আইসিটি ল্যাব স্থাপন, বিজ্ঞানাগার উন্নয়ন, গ্রন্থাগার সমৃদ্ধকরণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে অনেক বেশি শিক্ষার্থী সরাসরি উপকৃত হবে।অবশ্যই দেশের দুর্গম চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা এমন অঞ্চল যেখানে এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংকট রয়েছে, সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু যেখানে একই এলাকায় একাধিক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে, সেখানে নতুন অনুমোদন নয়; বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়, মানোন্নয়ন এবং বৈষম্য দূর করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি। শিক্ষা কোনো ভবনের নাম নয়, শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। সেই ভিত্তি তখনই শক্তিশালী হবে, যখন দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান সুযোগে মানসম্মত শিক্ষা পাবে। তাই এখন সময় এসেছে সংখ্যার প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে গুণগত উন্নয়নের পথে হাঁটার। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈষম্য দূর করা, আধুনিকায়ন, কার্যকর তদারকি এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হোক আগামী দিনের শিক্ষা নীতির প্রধান লক্ষ্য। তাহলেই শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন হবে, রাষ্ট্রের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা লাভ করবে।
…..
স্বপন বিশ্বাস
কবি ও কলামিস্ট
১০/৮/২৬5 Comments-
স্বাগত জানাই লেখকের গঠনমূলক ভাবনাগুলোকে! এমন সময়োপযোগী লেখা ভীষণ দরকারী। লেখকের পর্যবেক্ষণটা সমাজের অসংগতির দিকে স্পষ্ট আঙুল তোলে। “শিক্ষা কোনো ভবনের নাম নয়, শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি” এই লাইনটা খুব ভালো লাগলো! লেখক যথার্থই বলেছেন, আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানোন্নয়ন ও সমতার উপর জোর দেওয়াটা খুবেই দরকার। নয়ত সমাজে বৈষম্যতা কখনোই দূর করা যাবে না।
Friends
ই.ত.মু আদিল
@ispahat
M Abdul Haque
@mabdulhaque
MD. Imjamul Hoque Bhuiyan
@dpimjam
মোঃ আরিফুল ইসলাম
@md-arifulislam
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman
চিন্তাতরঙ্গিনী
@thoughtwaves
অনুভূতির ডাইরি
@onuvutir-dairi
Abdullah Jubair
@abdullahjubair
abrar
@abrar


আপনার এই লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো, বিশেষ করে “শিক্ষা কোনো ভবনের নাম নয়, শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি”—এই লাইনটা একদম ঠিক বলেছেন আপনি।