-
“যে চিঠির কোনো প্রাপক ছিল না”
নাজনীন শামীম
৩০-০৮-২৬ইং
ভোরের ডাকপিয়নটা যখন শিউলির দরজায় চিঠিটা রেখে গেল, তখনও শহরের বেশিরভাগ জানালা ঘুমে ঢাকা।
চিঠির খামে কোনো প্রাপকের নাম নেই।
শুধু লেখা—
“যে মেয়েটি সত্যিটা জানতে চায়, তার জন্য।”
শিউলি চিঠিটা হাতে নিয়েই বুঝেছিল, এই চিঠি তার জন্যই।
কারণ গত বারো বছর ধরে সে একটা সত্যির অপেক্ষায় আছে।
আর আশ্চর্যের বিষয়—
চিঠিটা পাঠানো হয়েছে তার নিজের ঠিকানা থেকেই।
শিউলি খাম খুলল।
ভেতরে মাত্র তিন লাইন।
“তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে যাননি।
তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।
সত্যিটা জানতে চাইলে আজ সন্ধ্যায় পুরোনো রেলস্টেশনে এসো।”
শিউলির আঙুল কেঁপে উঠল।
তার বাবা রায়হানকে সে দেখেছে শেষবার বারো বছর আগে।
সেদিনও এমনই বৃষ্টি ছিল।
বাবা বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন—
“শিউলি, মানুষকে বিশ্বাস করার আগে তার ছায়াটা দেখিস।”
তারপর তিনি আর ফেরেননি।
পাড়া বলেছিল, তিনি পালিয়ে গেছেন।
আত্মীয়রা বলেছিল, অন্য কোথাও সংসার করেছেন।
শিউলির মা কখনো কিছু বলেননি।
শুধু প্রতিবার বাবার কথা উঠলে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতেন।
আজ প্রথমবার শিউলির মনে হলো—
মায়ের নীরবতাও হয়তো একটা চিঠি ছিল।
সন্ধ্যায় পুরোনো রেলস্টেশনে গিয়ে শিউলি কাউকে পেল না।
শুধু প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে বসে ছিল একজন বৃদ্ধ।
চোখে মোটা চশমা।
হাতে একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
শিউলি কাছে যেতেই বৃদ্ধ বললেন,
“তুমি শিউলি?”
“জি।”
“তোমার বাবার মেয়ে?”
শিউলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“হ্যাঁ।”
বৃদ্ধ ব্যাগ থেকে একটা কালো ডায়েরি বের করলেন।
“এটা তোমার বাবার।”
শিউলি ডায়েরিটা হাতে নিল।
প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—
“আমি যদি কোনোদিন ফিরে না আসি, শিউলিকে বলো—আমি কাপুরুষ ছিলাম না।”
শিউলির বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
“আমার বাবা কোথায়?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।
বরং ডায়েরির মাঝখান থেকে একটা ছবি বের করে তার হাতে দিলেন।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
তার বাবা।
একজন অপরিচিত যুবক।
আর—
তার মা।
শিউলি ছবিটার দিকে তাকিয়ে জমে গেল।
কারণ ছবির পেছনে লেখা—
“যেদিন এই তিনজন একসঙ্গে হয়েছিল, সেদিনই বিপদ শুরু হয়েছিল।”
বাড়ি ফিরে শিউলি মাকে ছবিটা দেখাল।
মা ছবিটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“তোর বাবাকে আমি থামাতে পারিনি।”
“কোথায় গিয়েছিল বাবা?”
“মানুষের পাশে দাঁড়াতে।”
“তাহলে সবাই কেন বলেছিল, বাবা আমাদের ছেড়ে পালিয়েছে?”
মায়ের চোখে পানি জমল।
“কারণ সত্যিটা বললে তোকে নিয়েও ভয় ছিল।”
শিউলি এবার গলা শক্ত করে বলল,
“কিসের ভয়?”
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু আলমারি খুলে একটা লাল কাপড়ের পুঁটলি বের করলেন।
তার ভেতরে ছিল আরও সাতটি চিঠি।
সবগুলো একই হাতের লেখা।
সবগুলোতেই একই নাম—
অপরাজিতা।
শিউলি অবাক হয়ে বলল,
“অপরাজিতা কে?”
মা বললেন,
“তোর বাবার শেষ চিঠির প্রাপক।”
সাতটি চিঠির কোনোটিই পাঠানো হয়নি।
কোনোটির ওপর ডাকটিকিট নেই।
কোনোটির প্রাপকের ঠিকানাও নেই।
কিন্তু প্রতিটি চিঠিতে ছিল একই গ্রামের কথা।
একটা পুরোনো খালের কথা।
কয়েকটি পরিবারের কথা।
আর এমন এক জমির কথা, যেটা নাকি বছরের পর বছর জোর করে দখল করার চেষ্টা চলছিল।
শেষ চিঠিতে লেখা—
“অপরাজিতা, মানুষ জমি হারালে ঘর হারায়।
কিন্তু মানুষ যদি নিজের কণ্ঠ হারায়, সে পুরো জীবনটাই হারায়।”
শিউলি বুঝল, তার বাবা কোনো ব্যক্তিগত কারণে হারিয়ে যাননি।
তিনি অন্য কারও জন্য দাঁড়িয়েছিলেন।
কিন্তু সেই “অপরাজিতা” কে?
পরদিন শিউলি বাবার পুরোনো গ্রামের দিকে রওনা হলো।
গ্রামে পৌঁছে সে দেখল, সেই খাল নেই।
খালের জায়গায় বিশাল দেয়াল।
দেয়ালের ওপারে নতুন ভবন।
স্থানীয় মানুষজন সেই ভবনটার দিকে তাকিয়েও কথা বলে না।
শিউলি একজন বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করল,
“এখানে আগে কী ছিল?”
বৃদ্ধা বললেন,
“খাল ছিল।”
“খালটা ভরাট হলো কীভাবে?”
বৃদ্ধা চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“তোর বাবা বাধা দিয়েছিল।”
“তারপর?”
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তারপর তোর বাবাকে সবাই চোর বানিয়ে দিল।”
শিউলি স্তব্ধ।
“চোর?”
“হ্যাঁ। বলা হলো, গ্রামের তহবিলের টাকা সে চুরি করেছে।”
শিউলির মাথায় যেন বাজ পড়ল।
বাবার বিরুদ্ধে এত বড় মিথ্যা!
কিন্তু প্রমাণ?
বৃদ্ধা বললেন,
“প্রমাণ ছিল। কিন্তু যে মানুষটা প্রমাণ রেখেছিল, সে-ও একদিন নিখোঁজ হয়ে গেল।”
“কে?”
বৃদ্ধা শিউলির চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“তোর বাবার বন্ধু কদম।”
সেদিন রাতে শিউলি বাবার ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল।
সেখানে একটা ঠিকানা।
শহরের পুরোনো এক লাইব্রেরি।
পরদিন সেখানে গিয়ে সে দেখল, ধুলোমাখা একটা তাকের পেছনে ছোট্ট একটা লোহার বাক্স।
বাক্স খুলতেই পাওয়া গেল জমির কাগজ, ব্যাংকের হিসাব আর কয়েকটি ছবি।
সবকিছু মিলিয়ে একটা সত্য পরিষ্কার হয়ে গেল—
গ্রামের খাল আর জমি দখলের জন্য বহু বছর ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তার বাবা সেই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
আর “অপরাজিতা”?
তিনি ছিলেন গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা।
তিনি মানুষগুলোকে একত্র করেছিলেন।
কিন্তু এক রাতে তিনিও নিখোঁজ হয়ে যান।
শিউলি ডায়েরির শেষ পাতায় চোখ রাখল।
সেখানে লেখা—
“অপরাজিতা যদি হারিয়ে যায়, তাকে খুঁজবে না।
তার কাজটাকে খুঁজবে।”
শিউলির বুকের ভেতর কেমন একটা শব্দ হলো।
কারণ সে বুঝতে পারল—
অপরাজিতা হয়তো একজন মানুষ নন।
অপরাজিতা হয়তো একটা প্রতীক।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এলো।
ওপাশে পুরুষের কণ্ঠ—
“তুমি যা খুঁজছো, সেটা খুঁজে পেলে তোমার বাবার নাম পরিষ্কার হবে।”
শিউলি বলল,
“আপনি কে?”
“কদম।”
তার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?”
কদম কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,
“আমি পালাইনি। আমাকে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল।”
“আমার বাবা?”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর কদম বললেন—
“তোমার বাবা শেষ পর্যন্ত কারও কাছে মাথা নত করেননি। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কাজ করে গিয়েছিলেন।”
“কী কাজ?”
“তোমার নামে একটা মামলা করেছিলেন।”
শিউলি অবাক।
“আমার নামে?”
“হ্যাঁ। কারণ তিনি জানতেন, একদিন তুমি বড় হবে। আর তখন সত্যিটা তোমার হাতেই তুলে দিতে হবে।”
পরদিন কদম নিজে শিউলির কাছে এলেন।
তার হাতে ছিল সেই পুরোনো লাল খাম।
তিনি বললেন,
“এটা তোমার বাবার শেষ চিঠি।”
শিউলি খাম খুলল।
ভেতরে লেখা—
“শিউলি,
তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তবে বুঝব আমি তোর কাছে ফিরতে পারিনি।
কিন্তু মনে রাখিস, বাবারা সবসময় সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে যায় না।
কখনো কখনো তারা একটা অসমাপ্ত লড়াই দিয়ে যায়।
সেটাই আমার উত্তরাধিকার।”
শিউলির চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
চিঠির শেষ লাইনে—
“আর যদি কখনো অপরাজিতাকে খুঁজে পাস, তাকে বলিস—আমি হেরে যাইনি।”
শিউলি থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে চিঠিটা উল্টে দেখল।
পেছনে মাত্র একটি নাম—
“তোর মা।”
শিউলি ঘরে ফিরে মায়ের সামনে চিঠিটা রাখল।
মা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“তুই আজ সত্যিটা জানার বয়সে পৌঁছেছিস।”
“অপরাজিতা কে?”
মা এবার চোখ তুলে তাকালেন।
“আমি।”
শিউলির নিঃশ্বাস থেমে গেল।
“তুমি?”
মা মাথা নেড়ে বললেন,
“অপরাজিতা ছিল আমার ছদ্মনাম। তোর বাবা আর আমি মিলে গ্রামের মানুষগুলোর জন্য লড়েছিলাম।”
“তাহলে বাবা?”
মায়ের চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এল।
“তোর বাবাকে হারানোর পর আমি তোকে নিয়ে শহরে চলে এসেছিলাম। কারণ যারা তাকে থামিয়েছিল, তারা জানত—তার লড়াই শেষ হয়নি।”
“তুমি আমাকে কিছু বলোনি কেন?”
মা মৃদু হেসে বললেন,
“কারণ তোর শৈশবটুকু অন্তত ভয়মুক্ত রাখতে চেয়েছিলাম।”
কয়েক মাস পর আদালতে বাবার বিরুদ্ধে করা পুরোনো অভিযোগের নথি পুনরায় খোলা হলো।
প্রমাণ সামনে এলো।
মিথ্যাগুলো একে একে ভেঙে পড়ল।
বাবার নাম থেকে “চোর” শব্দটা মুছে গেল।
গ্রামের খালের জমি নিয়ে তদন্ত শুরু হলো।
আর যে সাতটি চিঠি কখনো কোনো ডাকবাক্সে পড়েনি, সেগুলো শিউলি প্রকাশ করল একটি বইয়ে।
বইটির নাম—
“অপরাজিতা”
বইয়ের প্রথম পাতায় সে লিখল—
“আমার বাবার অসমাপ্ত লড়াইয়ের নামে।”
বছরখানেক পর সেই গ্রামে আবার খালের পানি দেখা গেল।
বৃদ্ধারা বলল—
“রায়হান ফিরে এসেছে।”
শিউলি হেসে বলল,
“না। বাবা ফেরেনি।”
“তাহলে?”
সে খালের পানির দিকে তাকিয়ে বলল—
“বাবার সত্যিটা ফিরেছে।”
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় শিউলি ডাকবাক্সে একটা নতুন চিঠি পেল।
খামের ওপর কোনো নাম নেই।
শুধু লেখা—
“যে মানুষ সত্যের উত্তরাধিকারী হয়, তার কাছে কোনো চিঠিই অনাথ থাকে না।”
শিউলি চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।
দূরে তখন শিউলি ফুল ঝরছিল।
আর সে প্রথমবার বুঝল—
কিছু মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সত্য
প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে।
সমাপ্ত13 Comments-
-
আপনার সাবলীল লেখনশৈলী এবং গভীর রহস্যময়তা বজায় রেখে সত্যের উন্মোচন যেভাবে সাজিয়েছেন, তা সত্যিই পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। শিউলির বাবার অসমাপ্ত লড়াইয়ের এই আবেগঘন যাত্রা এবং মায়ের সাহসের পরিচয় দেওয়ার মুহূর্তগুলো আপনার বর্ণনায় অত্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে, যা আপনার লেখনী চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে।
-
-
-
naznin shamim, গল্পটির প্রতিটি পরতে যে গভীর আবেগ আর রহস্য ছিল তা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে “বাবারা সবসময় সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে যায় না, কখনো কখনো তারা একটা অসমাপ্ত লড়াই দিয়ে যায়”—এই লাইনটি আমার হৃদয়ে গেঁথে রইল।
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
মোঃ বায়েজীদ
@bayejid
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
Shojan Maria Shoche
@shojanmaria
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
Santo Mon
@santomon
Ariba Mehzabin Yeana
@aribamehzabin
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia


এক টানে পড়ে গেলাম। বেশ ভালো লাগল। শুভেচ্ছা নিন।