Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    15 hours, 49 minutes ago

    কাঁটাতারের শিউলি

    ​কুমিল্লার সীমান্তবর্তী গ্রাম ধানুয়ায় হেমন্তের বিকেল নামলেই এক অদ্ভুত বাতাস বইতে শুরু করে। কাঁটাতারের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি কুয়াশা আর এপাশের বাঁশঝাড়ের ছায়া মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বিলের ওপর ভেসে থাকা শাপলা আর ভোরের শিশিরে ভেজা শিউলির গন্ধে গ্রামটা যেন সবসময় এক মায়াবী চাদরে ঢাকা থাকে। এই গ্রামের মানুষের কাছে সীমান্ত শুধু একটা কাঁটাতারের রেখা নয়, ওটা তাদের জীবনযাত্রার এক অলিখিত নিয়ম।

    ​নূরীর সংসারটা ছিল এই নিয়মের মাঝেই এক চিলতে শান্তির প্রদীপ। তাঁর স্বামী রফিক ঢাকায় ছোট্ট একটা চাকরি করত। শহরের ইট-কাঠের খাঁচা ছেড়ে বছরে দু-একবার যখন সে বাড়ি আসত, নূরীর উঠোনে যেন ঈদের আনন্দ নেমে আসত। গাছের আম কুড়ানো, সন্ধ্যায় পুকুরঘাটে বসে আলতো গল্প—এসবের মাঝেই লুকিয়ে থাকত তাদের গভীর ভালোবাসা।

    ​সেদিন ছিল এক শান্ত দুপুর। পুকুরের টলটলে জলে রোদের আলো তখন মেহগনি গাছের পাতার ফাঁক গলে ঝিলমিল করছে। রফিক কাঁধে সুতি লুঙ্গি আর হাতে প্লাস্টিকের সাবানদানীটা নিয়ে পুকুরঘাটের দিকে গেল। ঠিক তখনই সীমান্তে প্রহরীদের ঝুলানো কাঁচের বোতলগুলো বাতাসের ধাক্কায় বিকট শব্দে বেজে উঠলো—টুং, টুং, টুং! কাঁটাতারে কেউ হাত দিয়েছে বোধহয়। মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে ভেসে এলো এক রাউন্ড গুলির শব্দ। পাখির ঝাঁক ডানা ঝাপটে উড়ে গেল দূর আকাশে।
    ​অনেকক্ষণ পর যখন নূরী ব্যাকুল হয়ে পুকুরঘাটে গেল, দেখল রফিক পড়ে আছে কাঁচা মাটির ওপর। হাত থেকে গড়িয়ে যাওয়া সাবানদানীর সাবানটা থমকে থাকা জলের প্রান্তে সাদা ফেনা তৈরি করছে। না, রফিক কোনো অপরাধী ছিল না। সে ছিল সীমান্ত এলাকার এক নিরপরাধ, সাধারণ মানুষ। কাঁটাতারে ঝুলতে থাকা খালি কাঁচের বোতলগুলো সেদিন যেভাবে হঠাৎ বেজে উঠেছিল, নূরীর বুকের ভেতরেও ঠিক তেমনই এক নীরব হাহাকার বাজতে শুরু করল।

    ​শ্বশুর-শাশুড়ির বুকভাঙা কান্না আর নিজের সীমাহীন শূন্যতাকে নূরী এক গভীর শক্তিতে পরিণত করল। সে বুঝল, কাঁটাতারের ভয় দেখিয়ে বা বোতল ঝুলিয়ে কখনো মানুষের পেট থামানো যায় না, আবার অহেতুক রক্ত ঝরাও বন্ধ হয় না। এর জন্য চাই এক আলোকময় পথ।

    ​নূরী চোখের জল মুছে শ্বশুর-শাশুড়ির হাত দুটি শক্ত করে ধরল। সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে নিজের নামে একটি বৈধ ‘আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স’ বের করল সে। গ্রামের যে তরুণরা পেটের তাগিদে রাতে লুকিয়ে সীমান্ত পার হতো, নূরী তাদের ডেকে পরম মমতায় বুঝাল। তাদের হাতে তুলে দিল বৈধ ব্যবসার দায়িত্ব।

    ​শীতের সকালে মাটির হাঁড়িতে ভরা খাঁটি খেজুরের গুড়, বর্ষার তাজা ফসল আর স্থানীয় হস্তশিল্প এখন নিয়ম মেনে, শুল্ক দিয়ে সীমান্তে পার হয়। ওপার থেকেও আসে প্রয়োজনীয় পণ্য। অন্ধকার ও ভীতি ঘেরা সীমান্ত এলাকাটি এখন এক প্রাণবন্ত ব্যবসার কেন্দ্র।

    ​কয়েক বছর পর, এক স্নিগ্ধ বিকেলে নূরী আবার পুকুরঘাটে এসে দাঁড়াল। পাশে তাঁর বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি। দূরে কাঁটাতারে ঝুলতে থাকা কাঁচের বোতলগুলো দখিনা বাতাসে মৃদু টুংটাং শব্দ করছে। তবে এখন আর সেই শব্দে রক্তের ভয় জাগে না; বরং বাতাসে ভেসে বেড়ায় শিউলির গন্ধ, আর মানুষের বেঁচে থাকার এক সুন্দর, আলোকময় আশ্বাস।

    5
    4 Comments
    • ভয়ের বোতল আজ বাজে শান্তির সুরে
      শোককেই নূরী বদলে দিল আলোর পথে…..🤍🖤

    • Syed Farah, লেখাটা পড়ে একদম অন্যরকম একটা অনুভূতির জন্ম হলো মনের ভেতর। নূরীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যিই খুব অনুপ্রেরণামূলক।

    • কষ্টটাকে শক্তিতে বদলায়া নূরী যা করলো, এইটাই আসল সাহস
      সীমান্তের বাস্তবতাটা এত নিখুঁতভাবে তুলে ধরছেন, গা শিউরায় ওঠে
      শেষে শিউলির গন্ধ ফিরে আসাটা মনে অনেক শান্তি দিলো, দারুণ লেখা👌

    • ‘হাত থেকে গড়িয়ে যাওয়া সাবানদানীর সাবানটা থমকে থাকা জলের প্রান্তে সাদা ফেনা তৈরি করছে’—এমন দৃশ্যকল্পটি আপনার বর্ণনায় এক গভীর ট্র্যাজেডির আমেজ তৈরি করেছে, যা আমাকে সীমান্ত জীবনের কঠিন বাস্তবতার কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিল। আপনি যেভাবে দুঃসময়ের শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে নূরীর মাধ্যমে জীবনের নতুন জয়গান শুনিয়েছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ও হৃদয়স্পর্শী। সীমান্ত নিয়ে এমন মানবিক ও ইতিবাচক প্রেক্ষাপট ভবিষ্যতে আরও অনেক গল্পের জন্ম দেবে, তাই আপনার কলম সচল থাকুক এই শুভকামনা রইল।

Skip to toolbar