-
একা একা এই পথে
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি
৫.
মায়ার সঙ্গে আরিফের পরিচয় শিল্পকলা একাডেমি থেকেই।আরিফ আর রানা প্রায়ই শিল্পকলায় যেত। থিয়েটারের নাটক দেখত। নাটক শেষ হওয়ার পর অনেকক্ষণ বসে থেকে অভিনয় নিয়ে আলোচনা করত দুজন।রানা অবশ্য আরিফের চেয়ে একটু বেশি বাস্তববাদী ছিল।মায়াকে মঞ্চে দেখলেই সে আরিফকে বলত,বন্ধু, তুই একটু কম কল্পনাপ্রবণ হো।। বাস্তববাদী হো।। মায়া আপার মতো অভিনয় করতে শিখ। মানুষটা কত সুন্দর অভিনয় করে!
আরিফ হেসে বলত,
সবাই যদি তোর মতো বাস্তববাদী হয়ে যায়, তাহলে কবিরা কী করবে?রানা বলত,
কবিরা আগে নিজের জীবনটা সামলাক।আজও তারা দুজন শিল্পকলায় গিয়েছিল।
নাটক শেষ হলো।
আরিফ আর রানা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মায়ার অভিনয় নিয়ে কথা বলল। রানা স্বভাবমতো মুচকি হেসে বলল,
বন্ধু, দেখলি? এই জন্যই তোকে বলি, একটু বাস্তববাদী হ। মায়া আপার অভিনয় দেখ। অভিনয় কাকে বলে, শিখ।আরিফ হেসে বলল,
তুই না থাকলে আমার বাস্তববাদী হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।রানা বলল,
ঠিক আছে, তুই কবি হয়ে থাক। আমি চললাম। আমার আবার কাজ আছে।আরিফ বলল,
আচ্ছা, তুই যা। আমি আপার সঙ্গে একটু কথা বলব।
রানা যাওয়ার আগে বলল,বেশি কল্পনায় চলে যাস না কিন্তু! আরিফ হেসে মাথা নাড়ল।রানা চলে গেল।
আরিফ কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল।তারপর মায়ার দিকে ফিরে বলল,
আপা, দারুণ হয়েছে। আপনার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
অনেক ধন্যবাদ, আরিফ। তোমাদের কাছ থেকে এমন কথা শুনে সত্যিই ভালো লাগল। তোমরা বেশি বেশি মঞ্চনাটক দেখো। শুধু গল্প দেখলে হবে না কীভাবে অভিনয় করছে, সংলাপ কীভাবে বলছে, মুভমেন্ট কেমন, মঞ্চ ব্যবহার করছে কীভাবে এসবও খেয়াল করো। এতে তোমাদের অনেক উপকার হবে।
আরিফ মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
তারপর আবার আরিফ বলল আপা, আপনার সময় হবে?
মায়া বলল কেন আরিফ ?
আরিফ বলল আপা আপনার সাথে আজ বিকেলে দেখা করতাম, ওই ছোট্ট একটা আড্ডা দিতাম।
মায়া একটু ভেবে বলল, হবে। টিএসসিতে বিকেল পাঁচটায় আসো।
আরিফ বলল,আচ্ছা। আমি যাব। রাইট সময়ে।
তারপর মায়াও নিজের কাজে চলে গেল।শেষ ক্লাসটা করেই আরিফ মেসে ফিরে গেল।
ফ্রেশ হলো। জামা বদলাল।বিকেল পাঁচটার একটা অপেক্ষা তখন থেকেই আরিফের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছে।
মায়া ছিল আরিফের ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র। বয়স হবে পঁচিশের মতো।মায়ার চুল এত লম্বা ছিল যে আরিফের মাঝে মাঝে মনে হতো কোনো নদী বুঝি ভুল করে তার মাথার ভেতর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করেছে।
মায়াকে দেখলেই আরিফের বুকের ভেতরেও যেন নদী বয়ে যেত।যখন সময় হলো আরে তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেল আর মায়ার কথা ভেবে শাহবাগ থেকে রজনীগন্ধা ফুল কিনলো | বিকেল পাঁচটার কিছু আগেই আরিফ টিএসসিতে পৌঁছে গেল।কেন কিনেছে, সে নিজেও ঠিক জানে না। কিছু কিছু ফুল শুধু মানুষকে মনে করিয়ে দেয় আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো নয়।
সে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মায়া এল।
আকাশী নীল শাড়ি পরে।
মায়াকে দেখেই আরিফ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
তার মাথার ভেতর অন্য একজন এসে দাঁড়াল।
নীলু।
আরিফ মনে মনে বলল,
‘আহ্ নীলু… তুমি আর দূরে থাকা মেঘ নও। আমার সামনে মেঘ হয়ে এসে দাঁড়িয়েছ।’
মায়া কাছে এসে বলল,
আরিফ, কী ভাবছ?
আরিফ চমকে উঠল।
মায়া হেসে বলল,
আমি কিন্তু তোমার আপা। এত দূরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসতে বলো।
আরিফ হালকা লজ্জার হাসি দিয়ে বলল,
দুঃখিত নীলু আপা… বসেন।
মায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
আমার নাম নীলু না, মায়া।
আরিফ এবার সত্যিই লজ্জা পেল।
আপা, কিছু না।
মায়া বসে পড়ল।
আরিফ কিছুক্ষণ তার শাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
আপনি আকাশী নীল শাড়ি পরে এসেছেন, তাই মনে হলো… আকাশের দূরবর্তী কোনো মেঘ বুঝি আমার ডাকে নেমে এসেছে।
মায়া কিছু বলল না।
শুধু হাসল।
আরিফ এবার রজনীগন্ধার ফুলগুলো এগিয়ে দিল।
আপা, রজনীগন্ধার সুগন্ধির মতো আমাদের সুন্দর একটা বন্ধন হোক।
মায়া এবার একটু জোরেই হেসে ফেলল।
তুমি আসলেই কবি!
আরিফ বলল,
কবি না আপা। মাঝে মাঝে কবিতা এসে আমাকে বিরক্ত করে।
মায়া বলল,
কবিতা তো ভালো জিনিস।আরিফ সব কবিতা ভালো না।
মায়া প্রশ্ন করল ,কেন আরিফ ? তোমার ভাবনা এমন |
আরিফ বলল,কিছু কবিতা মানুষকে নিজের কাছেই অপরিচিত করে দেয়।
মায়া এবার আর হাসল না।দুজনের সামনে চা এসে গেল।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। চারপাশে মানুষের ভিড়। কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে, কেউ কোথাও যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছে।
অথচ তাদের দুজনের ছোট্ট টেবিলটায় সময় যেন একটু ধীরে চলছিল।
অনেক কথা হলো।
থিয়েটার নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে।
কবিতা নিয়ে।
আরিফের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
একসময় মায়া হঠাৎ বলল,
আমার জন্য একটা কবিতা লিখবে না?
আপনার জন্য?
হ্যাঁ। তুমি তো কবি।
আরিফের মুখ লাল হয়ে গেল।
সিগারেটের ধোঁয়ায় নয়।
অন্য কোনো কারণে।
সে জিজ্ঞেস করল,
কী নিয়ে লিখব?মায়া খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
আমাকে নিয়ে।তারপর একটু থেমে যোগ করল,
অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে না। শুধু আমাকে নিয়ে।আরিফ মাথা নিচু করল।
তার মাথার ভেতর তখন তিনজন মানুষ হাঁটছে।
নীলু।
শিউলি।
মায়া।
তিনজন তিনদিকে যাচ্ছে।
আরিফ মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
মনে হলো, কেউ যেন তাকে একটা তাসের প্যাকেট দিয়ে বলেছে—
‘একটা কার্ড বেছে নাও।’
কিন্তু সে জানে না, কোন কার্ডটা তার।
সময় কখন পেরিয়ে গেল, দুজনের কেউ টের পেল না।
মায়া হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
আরিফ, আজকে যায়। অনেক সময় হয়ে গেল। হলে ফিরতে হবে।
মায়া রোকেয়া হলে থাকত।
আরিফ উঠে দাঁড়াল।
আচ্ছা আপা।
মায়াকে সালাম জানিয়ে বিদায় দিল সে।
গাড়িতে তুলে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
গাড়িটা চলে গেল।
আরিফ তাকিয়ে রইল।
কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাদের চলে যাওয়া শেষ হয় না।
তারা রাস্তার আলোয় থেকে যায়।
কথার ভেতর থেকে যায়।
রাত প্রায় ১১টা বাজে।
রাতে আবার বিড়াল এলো।
আরিফ আবার সিগারেট জ্বালিয়ে জানালার কাছে বসে আছে।
আরিফ বিড়ালটিকে বলল
“ধলা, তুই কি বলতে পারিস—আমি কার জন্য সিগারেট খাই?”
বিড়াল “মিঁউ” বলল।
আরিফ ভাবল—
“মানে আমি এখনও নীলুকেই ভালোবাসি?”
বিড়াল তখন তার থাবা দিয়ে আরিফের ফোনের স্ক্রিনে টোকা দিল। সেখানে খোলা ছিল মায়ার ছবি।
আরিফ হাসল।
বিড়াল অন্য চলে গেল।
আরিফ ভাবল, ও অভিমান করেছে। হয়তো আমার আদর চেয়েছিল।
সিগারেট হাওয়ায় শেষ।
আরিফ তার টেবিলে গেল। ঘুমানোর আগে শেষ পর্যন্ত কী করল?
সে তিনটি মেয়েকে নিয়ে একটা কবিতা লিখল।
কবিতার নাম—“তিনটি ঋতু”
নীলুয়া বসন্ত উড়ে যায় অজানার প্রান্তরে,
শিউলি শিশির ভিজিয়ে দেয় দুর্বা ঘাসের ওপর,
মায়া শীত জড়িয়ে ধরে কাঁপন তুলে মনের কোণে,
আমি তো শুধু কাগজের নৌকা,
ভাসি, আর ডুবি, আবার ভাসি।
কবিতাটি রিভিশন করার সময় আরিফের চোখে জল এলো।
কারণ সে জানত—এই কবিতা কাউকে দেওয়া যাবে না।
এটি শুধু তার নিজের।
তারপর ঘুমাতে গেল।
পরের দিন ক্লাস আছে।
তাই অনেক চেষ্টা করে ঘুমিয়ে পড়ল আরিফ।
ভোররাতে বৃষ্টি হচ্ছিল।
কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আরিফের।
আরিফ দরজা খুলে বাইরে গেল।
আর বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে… কে?
আরিফ চোখ কচলায়।
ওই তো…
একটা মেহগনি গাছের ডাল ভাঙা পড়ে আছে।
আর তার ওপর ঝুম বৃষ্টি পড়ছে।
আরিফ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
বৃষ্টি তার চুল ভিজিয়ে দিল।
প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করতে গিয়ে দেখল—সিগারেটের প্যাকেট ভিজে গেছে। তাতে আর আগুন জ্বলে না।
আরিফ এগিয়ে গেল।
ভাঙা ডালটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
ডালটা দেখতে অনেকটা হাতের মতো—যেন কেউ ডাকছে।
যেন নীলু বলছে—
“এই যে আমি।”
যেন শিউলি বলছে—
“দেখো, আমি এখানেই আছি।”
যেন মায়া বলছে—
“তোর জন্য অপেক্ষা করছি।”
কিন্তু ডালটা নিশ্চুপ।
শুধু বৃষ্টি পড়ছে তার ওপর।
আরিফ ডালটা তুলে নিল।
বেশ ভারী।
মনে হলো—
“এটা যদি আমি বাড়ি নিয়ে যাই?
তাহলে কি হয়?”
আরিফ বাড়ি ফিরে এল।
ভেজা ডালটা দরজার সামনে রাখল।
বৃষ্টি থামল না।
তবে কিছু একটা থামল—
আরিফের মাথার ভেতরের গোলমালটা।
সে বুঝতে পারল—
সে যাকে খুঁজছে, সে নেই।
সে যাকে পেতে চায়, সেও নেই।
আছে শুধু এই ভাঙা ডাল, এই ঝুম বৃষ্টি, এই মাঝরাত।
আরিফ চোখ বুজল।
ঘুম আসছে না।
তবুও চেষ্টা করল।
কারণ সে বুঝতে পারল—
ভাঙা ডালের মতো মানুষও ভাঙে।
কিন্তু ভাঙার পরও সে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঠিক যেমন মেহগনির গাছের ডাল—
যার ডাল ভেঙে গেলেও, গাছটা থেকে যায়।
আরিফ জানত—
ওর জীবনে তিনটি মেয়ে এসেছিল।
তাদের মধ্যে কাউকে হয়তো পাবে, নইলে পাবে না।
কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই তার জীবনে কোনো না কোনো ঋতু হয়ে এসেছিল।
আর আরিফ?
সে শুধু কাগজের নৌকা।
ভাসতে জানে।
ডুবতে জানে।
কিন্তু কোন তীরে গিয়ে থামবে
সেটা জানে না। মায়া এসেছিল শীতের নরম রোদ হয়ে।
তিনজনই চলে যেতে পারে।
কিন্তু ঋতু চলে গেলেও—
তার গন্ধ থেকে যায়।
আরিফ জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি একটু কমেছে আকাশের কোথাও আলো ফুটছে কি না, বোঝা যাচ্ছে না।
সে শুধু জানে,
আজ তার ক্লাস আছে।
আজও তাকে মানুষের ভিড়ে যেতে হবে।
হাসতে হবে।
কথা বলতে হবে।আর কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করবে
“কী হয়েছে আরিফ? এত চুপচাপ কেন?”
আরিফ তখন আগের মতোই মৃদু হাসবে।
বলবে
“কিছু হয়নি।”কারণ কিছু কিছু দুঃখের কোনো নাম হয় না।
তারা শুধু মানুষের সঙ্গে হাঁটে।
চুপচাপ।
একা একা।
এই পথে।6 Comments-
-
-
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি, আপনার লেখাটির গভীর আবেগ ও মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো প্রকাশের ভঙ্গি আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে বৃষ্টির রাতে ভাঙা ডাল হাতে নিয়ে নিজের ভেতরকার দ্বন্দ্ব সমাধানের দৃশ্যটি দারুণ এক দৃশ্যায়ণ তৈরি করেছে। আপনার এই সৃজনশীলতায় আবেগের বহিঃপ্রকাশ আরও জোরালো করতে চাইলে শব্দ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছুটা সংযম বজায় রাখতে পারেন, যা পাঠককে নিজের মতো করে ভাবার আরও সুযোগ করে দেবে। আপনার লেখনী অনাগত দিনে আরও বিকশিত হোক, এই শুভকামনা রইল।
-
Friends
Moin Uddin
@moinuddin1
মোস্তফা কামাল সাকি
@mostofakamal
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
তিতা ফুল
@nadia1
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Pulock Sheth
@pulocksheth
Shahadat Hossain Bhuiyan
@shahadathossainbhuiyan
Kaoser Ahmed
@kaoserahmed
Nayan Monir
@nayanmonir


গল্পটা পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল আরিফের মনের ভেতরের এই হাহাকারটুকু খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারছি। দারুণ লিখেছেন আপনি, একদম জীবনের সহজ কিন্তু গভীর কিছু সত্য ফুটে উঠেছে আপনার লেখায়।