-
“যে সৃতি শেষ হবে মরনে”
নভেম্বর, ডিসেম্বর মাস আসলে ছোট বেলাকে খুব মনে পরে। বুকের ভিতরে একটা হাহাকার অনুভূত হয়। অন্য কার বেলায় কি রকম হয় জানি না। তবে ছোট বেলার কথা আমার এই সময়ে বেশি মনে হয়। এই সময়ে গ্রামে খাল বিল, নদীর পানি প্রায় তলানিতে থাকে। ১৯৯২ সাল হতে ২০০২ এই সময়টার কথা আমার বেশি মনে পরে। তখন নদী, খালে, ও নিচু জমিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। খাল নদী হতে জ্যান্ত মাছ ধরার যে কি আনন্দ যে এই কাজ করেনি তাকে বোঝানো কঠিন। মা বলতেন আর মাছ দরকার নেই, রৌদ্র কাঁদা পানিতে ভিজে এত এত মাছ ধরে কি হবে? কিন্তু কে শোনে মায়ের কথা! শুঁটকি মাছের গন্ধে টেকা দায়। কাঁদা পানির গন্ধেও এক রকম মাদকতা আছে। এটা আমাদের সমবয়সী যারা গ্রামে বড় হয়েছেন তারা বলতে পারবেন। আজও সেই নদী আছে কিন্তু নদীতে মাছ নেই, নদীর বুকে স্রোত নেই, পাল তোলা, গুন টানা নৌকা আজ কল্পনা।
নভেম্বর মাসে গ্রামে শীতের আগমন ভালই বোঝা যায়। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির সকালে ঠোঁটে মাখানো ছিল নিত্য দিনের কাজ। মিষ্টি রোদে বসে খেজুর রস, আহা! পাটালী গুড় দিয়ে মুড়ি খাওয়া সকাল বেলা খুব মজা হত। নভেম্বর, ডিসেম্বর মাসে শীতের সকালে মাঠে মাঠে কৃষকের হাঁকডাক ছিল দেখার মত। গরু দিয়ে টানা নাঙ্গল আজকাল আর চোখে পরেনা। ফসলের মাঠে গরু দিয়ে নাঙ্গল করার ফলে বড় বড় ঢিলা হত। ঐ ঢিলা গুল ভেঙ্গে ছোট করার জন্য ইটামুগুর দিয়ে পিটানো হত। কুয়াশাছন্ন ভোরে সারা মাঠে একটা ছন্দ বয়ে যেত।এই সময় গ্রামে গেলে ভোর বেলায় যখন ঘুম ভাঙ্গে এখনো কল্পনায় বাজে সেই ছন্দ।
আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন ভোর বেলায় গমের ক্ষেতে পাখি তাড়ানোর একটা ব্যাপার ছিল। গমের বীজ মাঠে ছিটানোর পর কয়েক দিন ভোর ও বিকেল বেলা মাঠ পাহারা দিতে হত। না হলে পাখিরা বিশেষ করে শালিখ পাখি গমের বীজ খেয়ে ফেলত। বীজ ফুটে চারা বের হবার আগ পর্যন্ত মাঠে পাহারা থাকতাম আমরা। সকাল সন্ধ্যা খেলাধুলার একটা অংশ মনে হত এটা। শীত নিবারনের জন্যই হোক আর আনন্দের জন্যই হোক সকাল বিকাল মাঠে শুঁকনো ঘাস পাতা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে চারপাশে দাড়িয়ে আগুন পোহানও একটা খেলা ছিল। তখন এত আধুনিকতা হয়ত ছিল না কিন্তু আন্তরিকতার কোন অভাব ছিল না। চোখের সন্মুখে মাঝেমধ্যে সৃতি গুল খুব ছোটাছুটি করে, তখন হাত দিয়ে ধরতে বড্ড ইচ্ছে করে। যদি পারতাম!
ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে অফুরন্ত অবসর। লাটিম খেলা, সঙ্গে মার্বেল খেলা। বাড়ি হতে বের হলেই বিস্তীর্ণ সরিষা ফুলের হলুদের সমারোহ অথবা মন মাতানো কচি গমের শীষ। রাত্রে টিনের চালায় টপটপ শিশিরের শব্দ আজও কানে বাজে। এটা অবশ্য আজও উপভোগ করা যায়। শীতের পিঠা পুলির সেই স্বাদ আগের মত আর অনুভূত হয় না। আজকাল শহরের লোকদের নিকট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খুব জনপ্রিয় একটি খাবার কিন্তু ছোট বেলায় জমি হতে নতুন আলু উঠানোর পর ঐ জমিতেই আলু গাছ ঢাকার কাজে ব্যাবহারিত শুকনা ঘাস জ্বালিয়ে আলু পুড়িয়ে খাবারও একটা আলাদা মজা ছিল।
বাড়ি হতে যেদিন লেখাপড়ার জন্য শহরের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম সেদিন ছিল ১৯শে নভেম্বর। এই কারনেই কি এই সময়টা ছোট বেলার আবেগকে বেশি তারা করে? নিজেকে ঘর ছাড়া করার মাস বলে? তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। দু টাকার সেই ছোট হলুদ খামে কত আবেগ মাখানো ছিল! শেষ চিঠিটা কবে লিখেছিলাম আজ মনে পরে না। চিঠির পরিবর্তে যখন মোবাইলটা হাতে আসলো তখন পরিবর্তনের নেশায় মত্ত ছিলাম। তখনও একটা আবেগ কাজ করেছিল নতুন বিষয় কে গ্রহন করার আবেগ। নতুন পরিবর্তনের আবেগ। কিন্তু এই পরিবর্তনটা এত তাড়াতাড়ি কেন হল ভেবে মাঝেমধ্যে খুব মন খারাপ হয়। জানি এটা মন খারাপের কোন বিষয় নয়, তার পরেও হয়।শেষ কবে বৃষ্টিতে ভিজেছি মনে পরে না। অথচ একটা সময় এটা নেশার মত কাজ করত। ছোট বেলায় বৃষ্টি শুরু হলেই নানা অজুহাতে মা, বাবা কে ফাকি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম। বিশেষ করে বর্ষার শুরুতে। তখন ফসলের জমি ধান কাটা হয়ে গেলে ফাঁকা থাকতো। ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খোলা মাঠে কখনো ফুটবল, কখনো ডাংগুলি খেলা, কখনো পাড়ার ছোটরা মিলে উদ্দেশ্যহীন বৃষ্টিতে ভেজা।আহা! মনে আছে প্রাইমারী স্কুলে যখন পড়ি তখন স্কুল হতে ফেরার সময় বৃষ্টি শুরু হলে এক হাতে বই বুকে জরিয়ে ধরতাম অন্য হাতে বড় ফ্যান কচুর পাতা মাথার উপর ধরে বাড়ি ফিরতাম। বৃষ্টির আরও একটা আনন্দ ছিল। সকালে বৃষ্টি শুরু হলে স্কুলে যাওয়া লাগতো না।
বর্ষা মৌসুমে নানা বাড়ীতে যাবার সময় মামারা সব সময় ছোট ডিঙ্গি নৌকা পাঠাতেন । কখনো ছই ওলা নৌকা কখনো ছই ছাড়া নৌকা। বৃষ্টি থাকলে সাধারণত ছই ওলা নৌকা আসতো। শান্ত নদী বাঁ বিলের পানিতে খইয়ের মত ফুটছে বৃষ্টির পানি। ডিঙ্গি নৌকা ধিরলয়ে চলছে পানির বুক চিরে। এক বার দৃশ্যপটটা মনে হলেই বুকের ভিতর কেমন করে উঠে। মনে হয় এক দৌড়ে চলে যাই সেই জায়গায়!
এবার বৃষ্টি মৌসুম শুরু হলে শহরের একগুঁয়ে জীবন কে ছুটি দিয়ে কিছু দিনের জন্য গ্রামে চলে যাব। একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকাও কিনে ফেলবো। নিকষ কালো অন্ধকার বৃষ্টির রাতে নৌকা জলে ভাসিয়ে জলের ভিতরে বৃষ্টির খইয়ের শব্দ শুনবো। ছইয়ের নিচে চুপ করে বসে বৃষ্টির ভাষা বোঝার চেষ্টা করবো।3 Comments
Friends
ashraful alom
@ashrafulalom
Abbas Ali
@abbasali
শারমিন আক্তার
@sarmin
ফরিদুল ইসলাম
@dailychandpursomoy
মাসুদ আহম্মেদ
@masudahmmed800gmail-com
Md Sojib Ahmeed
@mdsojibahmeed
মোঃ রিয়াদ হাছান
@riadhasan751
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor


শুধু স্মৃতিচারণ করেই থেমে যাননি; আবার সেই গ্রামে ফিরে যাওয়ার একটা স্বপ্নও রেখে গেলেন।