Profile Photo

naznin shamimOffline

  • nazninshamim
  • Profile picture of naznin shamim

    naznin shamim

    • 1 week, 3 days ago

    “​কাগজের পথ ধরে বিশ্বজয়: পান্ডুলিপি ও তুলট কাগজের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি”
    — ​নাজনীন শামীম
    চট্টগ্রাম থেকে
    ২৪শে অক্টোবর ২০২৬ইং

    ​শতবর্ষ আগের এক নিঝুম আঁধার রাত। মাটির প্রদীপের মিটিমিটি আলোয় ঝুঁকে বসে আছেন এক নিবিষ্ট পুথিকার। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি কলম তিনি ডোবাচ্ছেন কাচপোকা আর হরিতকীর ক্বাথ দিয়ে প্রস্তুত করা বিশেষ এক কালিতে। আর যে বস্তুটির ওপর তিনি পরম মমতায় লিখে চলেছেন অক্ষরের পর অক্ষর, তা কোনো সাধারণ কাগজ নয়—হলুদরঙা এক জীবন্ত দলিল, যার নাম ‘তুলট কাগজ’। আধুনিক ছাপার কলের ঘূর্ণন শুরুর বহু আগে থেকেই এই হাতে তৈরি তুলট কাগজ বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল বাংলার জ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য আর ইতিহাসের অমূল্য রত্নভাণ্ডার।
    ​আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্পর্শহীন কাচের স্ক্রিনের যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা অতীতকে খুঁজতে যাই, তখন অজান্তেই ভুলে যাই—জ্ঞানের এই বহতা ধারা আমাদের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে কত বড় এক ঘামঝরা শিল্পকলা ও সাধনা নীরবে কাজ করে গেছে।
    ​১. চীনে উদ্ভাবন, বাংলায় নবসৃজন
    ​কাগজ আবিষ্কারের প্রথাগত কৃতিত্ব চীনা কারিগর সাই লুনের (Cai Lun)। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যখন ভারতীয় উপমহাদেশ পেরিয়ে বাংলায় প্রবেশ করল, তখন এদেশের মৃৎশিল্প ও কুটিরশিল্পের কারিগররা তাতে যুক্ত করলেন নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও দেশীয় উপাদান।
    ​তুলার মণ্ড, কসাই গাছ বা পাটকাঠির ফাইবার, চালের মাড়, তেঁতুল বিচির আঠা এবং কাঁচা হলুদ ও মেটে সিঁদুরের মিশ্রণে তৈরি হতে শুরু করল বিশেষ ধরনের এই কাগজ। হলুদ রঙের ছোঁয়া থাকার কারণে এর নামকরণ হয় ‘তুলট কাগজ’। শুধু লেখার মাধ্যম হিসেবেই নয়, এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর দীর্ঘস্থায়িত্ব। এই কাগজে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর কারণে এতে সহজে উইপোকা বা ছত্রাক আক্রমণ করতে পারত না, ফলে বাংলার আর্দ্র আবহাওয়াতেও শত শত বছর ধরে পুথিগুলো টিকে থাকত অবিকল।
    ​২. জ্ঞানচর্চা ও ভূ-রাজনীতির অদৃশ্য দলিল
    ​মধ্যযুগীয় বাংলায় তুলট কাগজ কেবল সাহিত্য রচনার উপাদান ছিল না; এটি ছিল জ্ঞান ও ক্ষমতার আদান-প্রদানের অন্যতম হাতিয়ার।
    ​রাজকীয় ও প্রশাসনিক দলিল: সুলতানি ও মুঘল আমল থেকে শুরু করে স্থানীয় জমিদারদের ভূমি বন্দোবস্ত, রাজস্বের হিসাব এবং রাজকীয় ফরমান লেখা হতো এই টেকসই তুলট কাগজে।
    ​সাহিত্যের প্রাণপ্রবাহ: মহাভারত-রামায়ণের বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য (যেমন—চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল) কিংবা সুফি সাধকদের মারফতি গীতি—সবই অমরত্ব লাভ করেছে এই কাগজের কল্যাণে।
    ​বাণিজ্যিক যোগাযোগ: সেকালে বাংলার বণিকরা সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম বন্দর ও বঙ্গোপসাগরের নৌপথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যে বাণিজ্য চালাতেন, তার চুক্তিপত্র বা দলিলপত্রও সংরক্ষিত হতো এই নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে।
    . আধুনিকতার ঝড়ে হারানো ঐতিহ্য ও ‘কাগজি’ পাড়া
    ​উনিশ শতকের গোড়ার দিকে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস ও অন্যান্য ঔপনিবেশিক ছাপাখানার হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ করে আধুনিক কাগজের যুগ। কলের তৈরি সস্তা ও চকচকে বিলেতি কাগজের বন্যায় মুহূর্তের মধ্যে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বাংলার কুটিরশিল্পের এই ঐতিহ্য। একসময় যে গ্রামগুলোতে ‘কাগজি’ বা কারিগররা বংশপরম্পরায় তুলট কাগজ তৈরি করতেন, সেই কাগজকুঠিগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় কাগজ তৈরির সেই গোপন ও জটিল রসায়নও।
    ​কিন্তু ইতিহাসের একটি চিরন্তন সত্য হলো—যন্ত্র হয়তো উৎপাদনের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু মানুষের হাতের ছোঁয়া ও প্রাণের গভীরতা তাতে থাকে না। আজ দেশের বিভিন্ন জাদুঘর ও প্রাচীন সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত চার-পাঁচশ বছরের পুরনো যে তুলট কাগজের পুথিগুলো আমরা দেখি, সেগুলো কেবল কৌতূহলের বস্তু নয়; সেগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের মেধা, শিল্পবোধ এবং স্বাবলম্বী সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষী।
    ​উপসংহার
    ​কাগজ কেবল অক্ষরের ধারক নয়, কাগজ একটি সভ্যতার আত্মপরিচয়। ‘তুলট কাগজ’ আমাদের হারানো ঐতিহ্যের এমন এক সোনালী অধ্যায়, যা প্রমাণ করে বাঙালি জাতি সবসময়ই সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে সমৃদ্ধ ছিল। “অভিমুখ”-এর পাতায় অতীতের এই ধুলোবালিমাখা অধ্যায়টি তুলে ধরার মূল উদ্দেশ্য হলো—আমরা যেন আমাদের শেকড়কে ভুলে না যাই। আধুনিকতার এই ঝোড়ো হাওয়ায় দাঁড়িয়েও আমাদের অন্তত জানা থাকা উচিত, প্রযুক্তির বহুদূর আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা কাগজের বুক জুড়ে বিশ্বজয়ের কী দারুণ স্বপ্নই না বুনে দিয়েছিলেন!

    4
    5 Comments
    • “যন্ত্র হয়তো উৎপাদনের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু মানুষের হাতের ছোঁয়া ও প্রাণের গভীরতা তাতে থাকে না” —আপনার লেখাটি পড়ে এই লাইনটিতে এসেই এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করলো। তুলট কাগজের এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

      • অনেক ধন্যবাদ প্রিয় রুপাই বন্ধু, এভাবে সমালোচনা করে পাশেথেকো🌹🌹

    • কাগজের পাতায় যে শুধু অক্ষর নয়, একটি জাতির ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ও বেঁচে থাকে

    • নাজনীন শামীম, আপনার লেখায় “শতবর্ষ আগের এক নিঝুম আঁধার রাত” এবং মাটির প্রদীপের আলোর যে বর্ণনা আপনি তুলে ধরেছেন, তা পাঠকের মনের মণিকোঠায় এক অমলিন চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলে। প্রাচীন ঐতিহ্যের হারানো গৌরব নিয়ে আপনার এই গবেষণাধর্মী কাজটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে আপনি চাইলে তুলট কাগজ তৈরির বিশেষ কারিগরদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে আরও কিছু ছোট গল্প যুক্ত করার কথা ভাবতে পারেন; আপনি নিয়মিত কলম চালিয়ে যান, আপনার লেখা আমাদের ভীষণ ভালো লেগেছে।

    • তুলট কাগজের অমর পাতায় বাংলার কারিগরি মেধা, জ্ঞান ও সভ্যতার শিকড় আজও বিশ্বজয়ের ইতিহাস হয়ে জেগে আছে…..🤍🖤

Friends

Profile Photo
TOUHIDUL ISLAM
@touhidulislam
Profile Photo
তুবা
@zariyaat
Profile Photo
Sharif Uddin Jumman
@sharifuddinjumman
Profile Photo
Ferdaus Sorkar
@ferdaussorkar1
Profile Photo
খতিব আলম
@khotibalom007gmail-com
Profile Photo
Dhali Moin
@dhali-moin
Profile Photo
Zahidul Jamy
@zahidul
Skip to toolbar