-
Migaloo / Son of Migaloo
———————————————–অত্যন্ত বিরল, সুন্দর, আকর্ষণীয় এবং বিশ্বের একমাত্র সাদা কুঁজযুক্ত স্তন্যপায়ী সামুদ্রিক প্রাণী Migaloo হচ্ছে পুরুষ হাম্পব্যাক তিমি (White Humpback Whale) । সচরাচর খুব একটা চোখে পড়ে না । গত ২৬শে জুলাই ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল Queensland অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় শহর Gold Coast (Gold Coast সুন্দর উপক্রান্তীয় জলবায়ু, ছুটির দিনে ভ্রমণের প্রধান পর্যটন গন্তব্য, সার্ফিং, সৈকত, আকাশচুম্বী ভবনের আধিপত্য, দিগন্তের হাতছানি, থিম পার্ক, নাইটলাইফ, বৃষ্টিঅরণ্য এবং টেলিভিশন প্রযোজনা ও একটি প্রধান চলচ্চিত্র শিল্প শহর । এটি Hinterland এর জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত) এর কাছাকাছি বিরল প্রজাতির এ সাদা হ্যাম্পব্যাক বন্য তিমিটিকে দেখা যায় । দক্ষিণ মেরু বা পৃথিবীর সর্বদক্ষিণে শীতলতম, শুষ্কতম এবং সর্বাধিক ঝটিকাপূর্ণ মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা থেকে উষ্ণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলের দিকে ছিল যার গন্তব্যস্থল । অ্যান্টার্কটিকা থেকে প্রচণ্ড শীতের কারণে প্রায় ১০০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতি বৎসর প্রায় ২৫০০০ হাম্পব্যাক তিমি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের উপকূল ঘেঁষা কোরাল সাগরের Great Barrier Reef এর বিস্তীর্ণ জলরাশির উষ্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলে খাদ্যের জন্য, তাদের বাচ্চাদের খাওয়াতে, সঙ্গী করতে এবং প্রজনন বা বংশবৃদ্ধি করতে আসে, যার মধ্যে এটিই একমাত্র Albino humpback whale । এছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঢেউ তুলে সাঁতার কাটার সময় তিমি প্রায়শই Cook Strait প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে থাকে (Cook Strait নিউজিল্যান্ডের উত্তর ও দক্ষিণ দ্বীপপুঞ্জকে পৃথক করা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং অনির্দেশ্য/অনিশ্চিত জলের প্রণালী । যেটি উত্তর-পশ্চিমে তাসমান সাগরকে ( Tasman Sea) দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে । প্রথম ইউরোপীয় পোতনায়ক/সেনাপতি James Cook এর নামে এ প্রণালীটির নামকরণ করা হয়, যিনি ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে এর মধ্য দিয়ে যাত্রা করেছিলেন ) । সুমেরু বা ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে যখন প্রচন্ড শীত পড়ে বেশিরভাগ প্রজাতি তখন বিষুবরেখার কাছাকাছি উষ্ণ সাগর অঞ্চলে পুরো সময়টাই কাটিয়ে দেয় । Humpback এবং Blue whale প্রজাতিগুলি খাবার ছাড়াই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেয় দুর্বার গতিতে । জুলাই মাসে অভিপ্রয়াণ (Migrate) করার সময় অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল Moreton Island এর সমুদ্র সৈকত থেকে এদেরকে দেখা যায় । এক সময় তিমিগুলি Moreton Bay এর জলে সাঁতার কাটা বা খেলা বন্ধ করতে পছন্দ করে এবং গ্রীষ্মের সময় অ্যান্টার্কটিকের জল উষ্ণ হতে শুরু করলে তিমিগুলি তাদের বাচ্চাদের নিয়ে পুনরায় ফিরে আসে । সুতরাং কল্পনা করুন যে, আপনি আপনার চোখ দিয়ে Migaloo কে সমুদ্রের স্বচ্ছ ও নীল পানিতে অনন্য সুন্দর সাঁতার কাটার সে দৃশ্য দেখতে পেলে নিজেকে কতোই না ভাগ্যবান মনে করবেন । অবশ্যই এটি হবে আপনার জীবনে এক বিরল অভিজ্ঞতার ঘটনা । ২৮শে জুন ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রশান্ত মহাসাগরীয় তিমি ফাউন্ডেশন (The Pacific Whale Foundation) কর্তৃক অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ কুইন্সল্যান্ডের উপকূলীয় শহর Harvey Bay (Harvey Bay এর নিকটবর্তী Fraser Island এর সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণের জন্য একটি আদর্শ কেন্দ্র । যেখানে ডিঙ্গো এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য একটি বৃষ্টিঅরণ্য (Rainforest) আবাসস্থল রয়েছে) উপকূলে দুর্লভ প্রজাতির এ তিমিকে প্রথমবার দেখার পর থেকেই অবশ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় । এটি স্থানীয় Celebrity হয়ে এক কিংবদন্তী খ্যাতি অর্জন করে । মিগালু নামটি একটি আদিবাসী শব্দ, অস্ট্রেলীয় আদিবাসী ভাষায় এর অর্থ “সাদা লোক” (White Fella) । সে মানুষের কাছে অন্য তিমিগুলির চেয়ে খুবই প্রিয় হয়ে উঠে । এখনো পর্যন্ত এ তিমির অনন্য রঙের সঠিক কারণটি জানা যায়নি । তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, প্রাণীটি হয় Leucism বা তার আসল Albino । Albinism হচ্ছে জন্মগত বা জিনগত ব্যাধি- যা কারও ত্বক, চুল এবং চোখের বর্ণের আংশিক বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত অথবা ক্ষতিগ্রস্থ করে । এনজাইম দ্বারা সৃষ্ট Tyrosinase এর অভাবে দেহে রঞ্জক পদার্থ Melanin (প্রাকৃতিক রঞ্জক) উৎপাদন করতে পারে না । ফলে দেহের মধ্যে Melanin এর অভাবের কারণে এ ধরণের রোগ হয় । তার মানে মিগালু হচ্ছে Hypo-Pigmented Humpback Whale (Megaptera novaeangliae) । সে মোটেও রঞ্জক পদার্থ দ্বারা তার দেহ কোষসমূহের স্বাভাবিক রং তৈরি করতে অক্ষম (Pigmentation) । অর্থাৎ রঞ্জক পদার্থ উৎপাদন করার ক্ষমতা নেই । হয়তো এটি তার জিনগত ফল । তবে, মিগালু এর চোখ রঙিনও হতে পারে । প্রশান্ত মহাসাগরীয় তিমি ফাউন্ডেশনের গবেষকরা উদ্বিগ্ন যে, এটি ক্যান্সারযুক্ত হতে পারে । কারণ, সমস্ত সাদা তিমির মধ্যে রঞ্জকতার অভাবের কারণে এটিকে বিশেষ করে সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে । ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে Migaloo (Son of Migaloo / Migaloo Junior) কে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্য New South Wales এর উপকূলীয় শহর Byron Bay (Byron Bay ছুটি কাটানোর জন্য জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল, যা Sea beach, Surfing এবং Scuba diving site হিসেবে বেশ পরিচিত) উপকূলে দেখা মেলে । মিগালুর ত্বক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে, এটি একটি পুরুষ তিমি । বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সম্ভবত এটির জন্ম ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে এবং এ সকল দুর্দান্ত প্রাণী প্রায় ৮০ বৎসর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে । সর্বশেষ ২০১১ খ্রিস্টাব্দে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার Great Barrier Reef এর আশেপাশে এটিকে দেখা যায় । তবে, কিছুদিন পূর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল Danger Point এর কাছে একটি Albino humpback whale এর সন্ধান পাওয়া যায় । মিগালু এর সুরক্ষার জন্য সরকারিভাবে নানা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ফলে বেশ সচেতন অস্ট্রেলীয় প্রাণী সুরক্ষা বিভাগ । গত বেশ কয়েক বৎসর যাবৎ সমুদ্র বা মহাসাগরে এ প্রজাতির তিমি খুব কমই দেখা গেছে । এ পর্যন্ত মাত্র চারটি সাদা হ্যাম্পব্যাক তিমি নথিভুক্ত করা আছে ।
পৃথিবীর জীবিত প্রাণীর মধ্যে তিমিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী জলজ প্রাণী । কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগে (আনুমানিক ২৩ কোটি বৎসর পূর্বে) ডাইনোসর বিবর্তিত হয়ে প্রায় ১৬ কোটি বৎসর ধরে পৃথিবীতে মহা দাপটে চরে বেড়ানো সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী প্রাণী । আজও তাদের কঙ্কাল এবং জীবাশ্ম পৃথিবীর বিখ্যাত কয়েকটি জাদুঘরে সযত্নে সংরক্ষণ করা আছে । শ্রেণীবিন্যাসবিদরা ধারণা করেন যে, Cretaceous যুগের শেষে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বৎসর পূর্বে একটি বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডাইনোসরদের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়ার পর থেকে তাদের একটি শ্রেণী Theropod ডাইনোসরদের সরাসরি বংশধর আধুনিক পাখিরাই কেবল বর্তমান যুগ পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছে । মহাকালের প্রবর্তন এবং দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার মধ্য দিয়ে অন্য সকল প্রাণীরা বিবর্তিত হয়ে আজ অবধি পৃথিবীতে টিকে আছে । তিমি তাদেরই একটি । ধারণা করা হয়, অতি প্রাচীন কাল প্রায় ৩৪ থেকে ৫০ মিলিয়ন বৎসর পূর্বে চতুষ্পদ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী তিমির সাধারণ পূর্বপুরুষরা (Ancestors) স্থলে বসবাস করতো । তিমির আদি পুরুষ হচ্ছে : পর্যায়ক্রমে (ক) Elomeryx (2 m long) (খ) Pakicetus (2 m long) (গ) Rodhocetus (3 m long) (ঘ) Dorudon (5 m long) । দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিমি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে জলজ পরিবেশের সাথে নিজেকে অভিযোজিত করে নিয়েছে । সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রিক দার্শনিক Aristotle (384–322 B.C.E.) তিমিকে স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে ধারণা দিয়েছিলেন । জীববিজ্ঞানের শ্রেণীবিন্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকে মাছ, ব্যাঙ, সরীসৃপ এবং পক্ষীকুলের পরেই স্তন্যপায়ীদের অবস্থান । যদিও তিমিকে প্রায়ই তিমি মাছ বলা হয় । কিন্তু এটি মোটেও মাছ নয় । মানুষের মতোই এর হৃৎপিণ্ডে চারটি প্রকোষ্ঠ, স্তন্যপায়ী এবং মেরুদণ্ডী প্রাণী । কারণ, মাছের ফুলকা আছে এবং শ্বাস নেয় ফুলকার সাহায্যে । কিন্তু তিমির কোনো ফুলকা নেই এবং শ্বাস নেয় আমাদের মতোই ফুসফুসের সাহায্যে । স্তন্যপায়ী প্রাণী বলে এদের নিঃশ্বাস নেয়ার জন্যে অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে, তাই তিমিকে পানির উপর ভেসে উঠতে হয় এবং তার সুবিশাল নাসারন্ধ্রের (Blowhole) মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ার কাজটি সম্পন্ন করে । ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার সময় বাতাসের সাথে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন গ্রহণ করার ফলে এ প্রাণীটি টানা প্রায় দুই ঘন্টা গভীর জলে থাকতে পারে । অন্য সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতোই তিমিকেও ঘুমাতে হয়, যদিও এরা পুরোপুরি ঘুমন্ত থাকে না । তিমির মস্তিষ্কের দু’টি অংশ, এটি পালাক্রমে মস্তিষ্কের অর্ধেক ঘুমায়, বাকি অর্ধেক অংশ জেগে থাকে, যাতে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ঘুমের মধ্যেও ভেসে উঠতে পারে (Electro Encephalo Graphy (EG) এর মাধ্যমে এটি জানা যায়) । তিমি নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকাবস্থায়ও খেতে পারে ।
তিমি বিশাল মহাসমুদ্রের অধিপতি, তাই রাজার মতো ঘুরে বেড়ায় উন্মুক্ত সমুদ্রে । জটিল এবং রহস্যময় শব্দের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তিমি পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরে বিচরণ করে । তিমি শিকারী প্রাণী । শিকার ধরার জন্য এটি অনেক গভীরতায় ডুব দেয়ার জন্য নিজেকে খুব ভালোভাবেই খাপ খাইয়ে নেয় । তিমির রক্ত উষ্ণ । এর সবচেয়ে কাছের আত্মীয় হচ্ছে জলহস্তী । গভীর সমুদ্রে বাস করা বিশালাকার এ দানব এর খাদ্য তালিকায় রয়েছে: Fish, Squid, Cephalopod, Penguin, Amphipod, Octopus, Crab, Copepod, Plankton এবং Krill ইত্যাদি । তিমি প্রজাতি দুই ভাগে বিভক্ত: (ক) Baleen whale, প্রায় ১৬ প্রজাতির দাঁত ছাড়া তিমি (খ) Toothed whale (Odontoceti), প্রায় ৭৩ প্রজাতির দাঁতযুক্ত তিমি । বিভিন্ন প্রজাতির তিমি রয়েছে যেমন: Blue whale, Sperm whale, Killer whale, Humpback whale, Fin whale, Pilot whale , Black whale, White whale (Beluga whale), Right whale, Bowhead whale, Sei whale, Gray whale ইত্যাদি । তিমির বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস: Kingdom: Animalia, Phylum: Chordata, Class: Mammalia, Order: Artiodactyla, Infraorder: Cetacea । তিমি আটটি বিদ্যমান পরিবার নিয়ে গঠিত: Balaenopteridae (The rorquals), Balaenidae (Right whales), Cetotheriidae (The pygmy right whale), Eschrichtiidae (The grey whale), Monodontidae (Belugas and Narwhals), Physeteridae (The sperm whale), Kogiidae (The dwarf and Pygmy sperm whale) এবং Ziphiidae (The beaked whales) । জায়গা: Southern Chile, Arctic, The Galápagos, Coral Triangle, Gulf of California, Coastal East Africa (Antarctica Ocean, Pacific Ocean, Atlantic Ocean, Indian Ocean, North Atlantic Ocean (Newfoundland, Nova Scotia), Greenland, Iceland) । বাসস্থান: Polar Regions ।
নীল তিমি Baleen whale parvorder Mysticeti এর অন্তর্গত, এর বৈজ্ঞানিক নাম: Balaenoptera musculus । The Society for Marine Mammalogy’s Committee on Taxonomy বর্তমানে নীল তিমির চারটি উপ-প্রজাতিকে স্বীকৃতি দেয়; (ক) B. m. musculus উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে, (খ) B. m. intermedia দক্ষিণ মহাসাগরে, (গ) B. m. brevicauda (The pygmy blue whale) ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে, (ঘ) B. m. indica উত্তর ভারত মহাসাগরে বাস করে । এছাড়া, চিলির জলের মধ্যে একটি জনসংখ্যা রয়েছে যা পঞ্চম উপ-প্রজাতি গঠন করতে পারে । স্ত্রী নীল তিমি প্রায়শই পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বড় হয় । একটি নীল তিমি প্রায় ১০৮ ফুট (৩৩ মিটার) দৈর্ঘ্যে পৌঁছতে পারে এবং ১১২ টন (২৪৭০০০ পাউন্ড) ওজন হয় । অপরদিকে একটি স্ত্রী নীল তিমির দৈর্ঘ্য ২৫.৪ থেকে ২৬.৩ মিটার (৮৩.৪ থেকে ৮৬.৩ ফুট) এবং ওজন প্রায় ১৩০ টন (২৯০০০০ পাউন্ড) হয়ে থাকে । নীল তিমির প্রায় ৫টি উপ-প্রজাতি রয়েছে । নরওয়েবাসী Svend Foyn এর দ্বারা “নীল তিমি” নামটি নরওয়েজিয়ান “blåhval” থেকে এসেছে । নরওয়ের বিজ্ঞানী G.O. Sars ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে এটি সাধারণ নাম হিসেবে গ্রহণ করেন । Robert Sibbald নীল তিমিকে ‘Sibbald’s rorqual’ হিসেবে বর্ণনা করেন । নীল তিমির রঙ নীলচে ধূসর । নীল তিমির ফ্যাকাশে বা বিবর্ণ নীচের দিকটায় পেটের কাছে Diatom এর হলদে রঙের আবরণ জমা হতে পারে, তাই ঐতিহাসিকভাবে নীল তিমি “Sulphur bottom” হিসেবে পরিচিত (অবশ্য এ হলুদ রং বিশাল প্রাণীটির জন্মগত নয় । অসংখ্য অণুজীব নীল তিমির পেটের ত্বকের উপর বসতি স্থাপন করে তারা সেখানেই বেঁচে থাকে । আর এ অণুজীবগুলির কারণেই নীল তিমির পেটের অংশ হলদে দেখায়) । নীল তিমির মাথা চ্যাপ্টা, অনেকটা ইংরেজি U অক্ষরের মতো । এটি খুব ধীরে ধীরে সাঁতার কাটে । নীল তিমির মুখের ভিতর দাঁতের বদলে ছাঁকনির মতো Baleen রয়েছে । এ Baleen বা ছাঁকনি প্রাণীটির উপরের চোয়ালে থাকে । মানুষ ব্যতীত হত্যাকারী বা ঘাতক তিমি (Killer whale) দ্বারা আক্রান্ত হয় নীল তিমি । গবেষকরা দেখেছেন, একটি তিমি নিজের খাদ্য থেকে একসঙ্গে ৮ হাজার ৩ শত ৬ ক্যালরি থেকে শুরু করে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৮ শত ৩৫ ক্যালরি পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে । সর্বোচ্চ যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করে তাতে ২২৮ জনেরও বেশি মানুষকে প্রতিদিন ২০০০ কিলো ক্যালরি খাদ্য খাওয়ানো সম্ভবপর । তিমিকে কেবল একবার তার দেহকে নড়াচড়া করতেই নিঃশেষ করতে হয় ৭৭০ কিলো ক্যালরি ৷ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানতে পেরেছেন, একটি নীল তিমি প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকে । একটি স্ত্রী নীল তিমির সাথে প্রজননের জন্য কয়েকটি পুরুষ নীল তিমি লড়াই বা প্রতিযোগিতা করে থাকে । স্ত্রী নীল তিমির গর্ভধারণকাল ১০ থেকে ১১ মাস এবং ২ থেকে ৩ বৎসর পরপর একটি বাচ্চা প্রসব করে । শিশু বাচ্চা মায়ের দুধ খেয়ে বেঁচে থাকে । নীল তিমির দুধে শতকরা ৩৯ থেকে ৪১ ভাগ চর্বি এবং শতকরা ৪৫ থেকে ৪৮ ভাগ পানি থাকে । নীল তিমির Balaenopteridae পরিবারের বর্তমান অনেক সদস্য রয়েছে । ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে এক বিশ্লেষণে অনুমান করা হয় যে, ১০.৪৮ থেকে ৪.৯৮ মিলিয়ন বৎসর আগে Miocene এর শেষের দিকে Balaenopteridae পরিবারটি অন্যান্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল । শারীরতাত্ত্বিকভাবে প্রাচীনতম আবিষ্কৃত আধুনিক নীল তিমির আংশিক খুলির জীবাশ্ম দক্ষিণ ইতালিতে পাওয়া যায়, যা প্রায় ১.৫ থেকে ১.২৫ মিলিয়ন বৎসর পূর্বে The Early Pleistocene এর সাথে সম্পর্কিত । The Australian Pygmy নীল তিমি শেষ হিমবাহ Maximum এর সময় বিচ্ছিন্ন হয়েছিল । তাদের বিচ্যুতির ফলে উপ-প্রজাতিগুলি অপেক্ষাকৃত কম ‘সৃষ্টি বা জন্ম সম্বন্ধীয়’ (Genetic) বৈচিত্র্য পেয়েছে এবং নিউজিল্যান্ডের নীল তিমির জিনগত বৈচিত্র্য আরও কম । নীল তিমি এবং অন্যান্য Rorqual প্রজাতির পুরো Genome sequencing থেকে বুঝা যায় যে, নীল তিমির নিকট আত্মীয় (Sister group) হিসেবে Gray whale সহ Sei whale এর সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত । এ গবেষণা থেকে Minke whale ও নীল তিমি এবং সে তিমির পূর্বপুরুষদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জিন প্রবাহ পাওয়া যায় । নীল তিমি উচ্চ মাত্রার জিনগত পরিবর্তনশীলতাও প্রদর্শন করে । আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা International Union for Conservation of Nature (IUCN) ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে নীল তিমিকে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ।
Sperm whale (বৈজ্ঞানিক নাম: Physeter macrocephalus) সম্পর্কে এক সময় মানুষের ধারণা ছিল যে, এর মাথায় যে সাদা অর্ধতরল পদার্থ রয়েছে সেটি হচ্ছে বীর্য বা Sperm । তাই, প্রাচীনকালে মানুষ এর নাম দেয় Sperm whale বা শুক্রাণু তিমি বা বীর্য তিমি । পরবর্তীতে মানুষের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় যে, এটি আসলে বীর্য নয় । এক প্রকার তেল, যা ছাড়া তিমি বাঁচতে পারে না । তিমির মাথার ভেতরে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কিলোগ্রাম Spermaceti তরল অবস্থায় জমা থাকে । অন্যতম প্রধান খাদ্য Squid থেকে তিমি এ তেল জাতীয় তরল পদার্থ অর্জন করে । এ তেলের গলনাঙ্ক (Melting point) ৩১ ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিন্তু তিমির দেহের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস । তিমির দেহের তাপমাত্রা তিমির মাথায় থাকা তেলের গলনাঙ্ক অপেক্ষা বেশি । ফলে গভীর সমুদ্রে ঠাণ্ডা পানিতে মাথার তেল জমে গিয়ে দেহের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং শরীরের ঘনত্ব ও পানির ঘনত্ব সমান হয় । গভীর সমুদ্রের নীচে সূর্যের আলোক রশ্মি পৌঁছে কম, ফলে তাপমাত্রাও কম । এতে করে মাথায় থাকা তেল ঠাণ্ডায় জমাট বেঁধে কঠিন এবং ঘন হয় । তাই Sperm whale দীর্ঘ সময় পানির নিচে গভীরে থাকতে পারে । এছাড়া, তিমির উষ্ণ রক্ত এবং প্রায় ১০ ইঞ্চি পুরো ত্বকের নীচে চর্বিযুক্ত ঘন স্তর বা Blubber থাকার কারণে সমুদ্রের ঠাণ্ডা জল থেকে একে প্রাকৃতিক নিয়মে আলাদা করে রাখতে (Insulate) সহায়তা করার ফলে (যা Hypothermia থেকে রক্ষা করে) গভীর জলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রায় ৯০ মিনিট পর্যন্ত পানির নিচে থাকতে পারে । শুক্রাণু তিমি পানিতে মলত্যাগের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে এবং এসব বর্জ্য পদার্থে আয়রন (লৌহ) থাকার কারণে মহাসাগরে Plankton জন্মাতে সাহায্য করে । একটি শুক্রাণু তিমি শ্বাসত্যাগের মাধ্যমে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড সামুদ্রিক পরিবেশে ত্যাগ করে তার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ কার্বন তার পরিত্যক্ত মল দ্বারা শোষিত হয় । ফলে Ecosystem এর জন্য যথেষ্ট সহায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ প্রাণী সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে । তাই তিমির বিলুপ্তি ঘটলে পৃথিবীর জন্য চরম অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে । এটি প্রায় ৭০ বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকে । বিপন্ন প্রায় শুক্রাণু তিমির (Sperm whale) অন্যতম প্রধান খাদ্য হচ্ছে Squid । স্কুইডের চঁচু বা ঠোঁট (Beak) খুব শক্ত যা শুক্রাণু তিমির পাকস্থলীতে হজম হয় না বরং হজম প্রক্রিয়ায় বাধা বা প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করে । পরবর্তীতে এটি জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বমি আকারে বের হয় এবং সাগরে ভাসতে থাকে । এর নাম অ্যাম্বারগ্রিস (Ambergris) । অ্যাম্বারগ্রিস শব্দটি Latin: Ambra grisea, প্রাচীন ফরাসি Ambre gris (Ambergrease) বা “ধূসর আম্বর” (Grey amber) থেকে এসেছে এবং Amber (Ambre) একই উৎস থেকেই আসে । কিন্তু ইউরোপে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এটি বাল্টিক অঞ্চল থেকে প্রায় একচেটিয়াভাবে জীবাশ্মযুক্ত গাছের শালীনির্যাসে প্রয়োগ করা হতো । অ্যাম্বারগ্রিস হচ্ছে তিমি মাছের বমি বা উদগীরণ (Whale vomit) । এটি শুক্রাণু তিমির অন্ত্রের দেওয়ালে সংযুক্ত এক জাতীয় মোমের মতো আঠালো পদার্থের আবরণ । যা শুক্রাণু তিমির (Sperm whale) অন্ত্র থেকে নির্গত হয় । এটি ধূসর বা কালো রংয়ের পিচ্ছিল, কঠিন, মোমের মতো, জ্বলন্ত পদার্থ । অ্যালকোহল থাকে, গাদ এর মতো গন্ধ । বলতে গেলে এটি তিমির পেটের গুপ্তধন বা Floating gold । তিমি শিকার করে অথবা মৃতদেহকে সমুদ্রের তীরবর্তী ডাঙ্গায় পরিষ্কার করে অ্যাম্বারগ্রিস নিষ্কাশিত করা হয় । অনুমান করা হয় যে, শুধুমাত্র এক শতাংশ শুক্রাণু তিমি টেকসই বা কার্যকরী অ্যাম্বারগ্রিস উৎপাদন করে থাকে । এটি খুবই দূর্লভ বস্তু । Christopher Kamp তার বইয়ে এটিকে “White gold” বলে আখ্যায়িত করেছেন । White Ambergris কে বিভিন্ন ফুলের নির্যাস এবং এর সাথে আরও কিছু উপাদান মিশিয়ে সুগন্ধি বা আতর তৈরি করা হয় । সাধারণত ক্রান্তীয় সমুদ্রে (Tropical seas) বিরল এ পদার্থটি ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়, পরবর্তীকালে উপকূলের দিকে । অ্যাম্বারগ্রিসের গন্ধে কুকুর আকৃষ্ট হয় এবং কুকুরের কাছে এটি পরিচিত । ”সুগন্ধি এবং সুবাস উপকরণ” এর প্রাকৃতিক উৎস অ্যাম্বারগ্রিস । এটি সুগন্ধি উৎপাদনে (Perfume manufacture) ব্যবহৃত হয় । অ্যাম্বারগ্রিস Alcohol, Chloroform, Ether, Volatile (উদ্বায়ী) এবং কিছু নির্দিষ্ট তেলে দ্রবণীয় একটি পদার্থ । অতীতে অ্যাম্বারগ্রিস ঐতিহাসিকভাবে খাদ্য এবং পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ইংরেজ এবং অস্ট্রেলিয়ান প্রিয় খাবারের বইয়ে সুগন্ধি বা সুবাসের জন্য রুম, বাদাম, ক্লোভ, ক্যাসিয়া এবং কমলা ছিলে এর সাথে অ্যাম্বারগ্রিস যুক্ত করে মন্থিত পানীয় (Cocktail) তৈরির কথা উল্লেখ রয়েছে । এটি তুর্কি কফি এবং গরম চকোলেটে সুবাসিত স্বাদযুক্ত উপাদান হিসেবে ব্যবহার হতো । প্রাচীন মিশরীয়রা সুবাসের জন্য অ্যাম্বারগ্রিসকে ধূপ হিসেবে জ্বালাতো, অথচ আধুনিক মিশরীয়রা সিগারেটের সুবাসের জন্য এটিকে ব্যবহার করে । প্রাচীন চীনারা অ্যাম্বারগ্রিসকে “ড্রাগনের থুথু বা লালা’র সুবাস” (Dragon’s spittle fragrance) হিসেবে অভিহিত করতো । মধ্যযুগে ইউরোপের ”কালো মৃত্যুর” সময় লোকেরা বিশ্বাস করতো যে, অ্যাম্বারগ্রিসের একটি পিণ্ড বা দলা বহন করলে এটি তাদেরকে প্লেগ (Plague) রোগ থেকে মুক্তি দিবে । কারণ, এর সুবাস আকাশকে সুগন্ধে আচ্ছাদিত করে রাখতো বলে মনে করা হতো । মৃত্যু বা মৃতদেহের দুর্গন্ধ ঢেকে যাওয়ার উপায় হিসেবে এটিকে সুবাস হিসেবে ব্যবহার করা হতো । ইউরোপীয়রা অ্যাম্বারগ্রিসকে মাথাব্যাথা, ঠান্ডা, মৃগীরোগ, যৌন উত্তেজক ঔষধ এবং অন্যান্য অসুস্থতার জন্য ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করতো । শুক্রাণু তিমি ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের অধীনে (Wildlife Protection Act) একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী । এটি শিকার নিষিদ্ধ এবং এর অ্যাম্বারগ্রিস নিষিদ্ধ বস্তু । প্রতি বৎসর সারাবিশ্বে প্রায় ৫০০০০ শুক্রাণু তিমি নিহত হয় । গবেষণায় দেখা গেছে যে, এ প্রজাতির তিমি হুমকির মুখে পড়ছে ।
হ্যাম্পব্যাক তিমি (Megaptera novaeangliae) Baleen whale এর একটি প্রজাতি । Humpback প্রজাতি খাবার ছাড়াই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিতে পারে । বিজ্ঞানীরা বিশ্বজুড়ে Humpback whale এর আচরণের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ বা নকশা (Pattern) চিনতে শুরু বা উপলব্ধি করে দেখেছেন যে, ”মানুষই একমাত্র প্রাণী হতে পারে না, যা অন্যান্য প্রাণীর কল্যাণের কথা চিন্তা করে” । এটি তিমির একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য, যা প্রাণীজগতে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত । তবে, তিমির এ আচরণের গুরুত্ব বুঝতে বিজ্ঞানীদের আরও বেশি বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণা করতে হবে । একটি বড় হ্যাম্পব্যাক তিমি প্রায় ৬০ ফুট দৈর্ঘ্যে পৌঁছতে পারে এবং প্রায় ৪০ টন পর্যন্ত ওজন হয় । হ্যাম্পব্যাক তিমি Arctic এবং Antarctic এর বরফ অঞ্চল বাদে গ্রীষ্মমণ্ডল থেকে উচ্চ অক্ষাংশ পর্যন্ত বিশ্বের মহাসাগরগুলির মধ্যে পাওয়া যায় । একটি পূর্ণবয়স্ক ও পরিপক্ক হাম্পব্যাক তিমি খুবই হিংস্র এবং ভয়ঙ্কর ।
তিমি সাধারণত প্রজনন মৌসুমে সুনির্দিষ্ট সঙ্গী বাছাই করে না এবং পুরুষ তিমি সাধারণত প্রতিবৎসর একাধিক নারীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয় । কিন্তু নারী তিমি শুধুমাত্র প্রতি দুই থেকে তিন বৎসর পর সঙ্গম করে এবং একটি স্ত্রী তিমির একাধিক সঙ্গী থাকে । স্ত্রী তিমি সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মে একটি বাচ্চা জন্ম দেয় । জন্মের সময় লেজ ভের হয়ে নবজাতক ভূমিষ্ঠ হয়েই সাঁতার কাটে, সত্যিই আশ্চর্য্যের বিষয়! এদের গর্ভধারণকাল ১০ থেকে ১১ মাস বা তারও কিছু বেশি । মা তিমি তাদের বাচ্চাকে প্রতিপালনের সমস্ত দায়িত্ব বহন করে এবং বাচ্চা লালন-পালন করার সময় মা ও শিশু তিমির মধ্যে এক নিবিড় বন্ধন গড়ে উঠে । মা তিমি নবজাতক শিশুকে লেই (Paste) এর মতো দলা পাকানো দুধ পান করায়, যে দুধে প্রায় ৫০ শতাংশ চর্বি থাকে এবং প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত শিশু তিমি মায়ের দুধ পান করে । কিছু প্রজাতির মা তিমি উপবাস করে এবং তার বাচ্চাকে এক থেকে দুই বৎসর পর্যন্ত তাদের দুধ পান করায় বা সেবা করে । তিমি খুবই বুদ্ধিমান, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সামাজিক প্রাণী । দুই বা একটি পরিবার মিলে দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটতে পছন্দ করে । অনেক সময় তিমি স্রোতের কারণে তীরে আটকা পড়ে, তাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসে তার পরিবারের কেউ কিংবা সঙ্গীরা এবং কখনো দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে আটকা পড়ে যায় তারাও, এ কারণে তাদের প্রাণ দিতে হয় । কোনো আত্মীয় বা বন্ধুপ্রতিম কেউ মারা গেলে এটি খুব গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করে । তিমির বিশালতা, শক্তিমত্তা, বহু দূর থেকে দুর্দান্তভাবে স্নায়বিক সম্পর্ক স্থাপন, একচেটিয়া শব্দ উৎপন্ন (জানা গেছে, তিমি ১৬৩ Decibel শব্দ তীব্রতায় ২০০০০ Acoustic watt শব্দ তৈরি করে) বা মোহনীয় গান, বিভিন্ন ধরণের কণ্ঠস্বর তৈরি এবং কৌতুকপূর্ণ আচরণের জন্য এরা বিখ্যাত । মানবসৃষ্ট নানাবিদ কর্মকান্ড যেমন শহরের ভারী ধাতু, অ্যাটমিক বর্জ্য (Atomic wastes), শিল্প বর্জ্য সাগরের পানিতে বিষাক্ত হয়ে, অন্যান্য দূষণ, গভীর সমুদ্রে বড় ফিশিং জাহাজ, প্রাকৃতিক কারণ বা জলবায়ু পরিবর্তন, পলিথিন বা প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য, দ্রুতগামী জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়ে, জেলেদের জালে আটকা পড়ে ডুবে যায় বা অভুক্ত থেকে, সন্তান জন্মদানকালীন সময়ে শারিরীক কোনো জটিলতার কারণে, বার্ধক্যজনিত বা অসুস্থতার কারণে শ্বাস গ্রহণে বাধা পেয়ে অনেক তিমি মারা যায় । এছাড়া তিমি তার সঙ্গী কিংবা দলনেতার মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে নিজের আত্মহত্যা করার (Whale Stranding Event) প্রবণতা রয়েছে । ভাসমান জাহাজ, ডুবন্ত সাবমেরিন ইত্যাদির শব্দ এর জীবন ব্যবস্থায় মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করে । পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ তিমির মাংস ও চর্বিকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে । তিমির চর্বি থেকে তেল প্রস্তুত করা হয় । তিমির মাংস ব্যবসা অবৈধ এবং তিমি হত্যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ ।
হারপুন ও বর্শা দিয়ে লক্ষ লক্ষ জীবন্ত প্রাণী তিমিকে সাগরের বুকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয় সামান্য কিছু তেল এবং সুগন্ধি পদার্থের জন্য (Blubber, Spermaceti, Ambergris), যা একটি তিমির শরীরের মূল আয়তনের কিছু অংশ মাত্র । এ সকল পদার্থ সংগ্রহের পর তিমির অবশিষ্ট বিশাল দেহটিকে গভীর সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয় । এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মহোৎসব শুরু হয় ষোল শতকের শেষের দিকে । সপ্তদশ শতাব্দীতে সংঘবদ্ধভাবে তিমি শিকারের প্রচলন ঘটে এবং প্রাথমিকভাবে এ সংক্রান্ত শিল্পক্ষেত্রের সূচনা হয় । অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিযোগিতামূলক তিমি শিকার শিল্প গড়ে উঠে । বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিমি শিকারের পাশাপাশি মৎস্য-প্রক্রিয়াজাতকরণের সূচনা এবং পরবর্তীতে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে । ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সব মহাসাগরে নীল তিমি প্রচুর পরিমাণে বসবাস করতো । ১৯০০ থেকে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার তিমি শিকারিদের হাতে মারা যায় । তিমির এ হত্যাযজ্ঞ রোধ করতে The International Whaling Commission ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে সমস্ত তিমি শিকার নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত এটি প্রায় বিলুপ্তির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল । ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে The International Whaling Commission তিমি সংরক্ষণ এবং সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চিরস্থায়ীভাবে রক্ষা করা ও তিমি জনসংখ্যা পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আইন প্রণয়ন করে । তবে, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সে বাণিজ্যটি এখনও বৈধ । দুর্ধর্ষ শিকারি, অসাধু জেলে ও ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে নির্বিচারে তিমি শিকার করার ফলে সাগর-মহাগরে তিমির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার কারণে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা মারাত্মকভাবে চিন্তিত । ফলে তিমি রক্ষা করা এবং এর জীবন ব্যবস্থায় নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করে একে রক্ষায় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিকভাবে বিভিন্ন উপাত্ত (Data) সংরক্ষণ করছে । বিংশ শতাব্দীতে উত্তর আটলান্টিকে ডান তিমি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যার জনসংখ্যা ৪৫০টিরও কম এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় Grey whale এর জনসংখ্যা বিপন্ন । যার কারণে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা International Union for Conservation of Nature (IUCN) এ মর্মস্পর্শী ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে । তবে, International Wheeling Commission (IWC) তিমি শিকার ও অবৈধ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা বাণিজ্যিকভাবে তিমির উপর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তিমি শিকার থেকে সামুদ্রিক এ প্রাণীটি পুনরুদ্ধার করতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে । ফলে, বর্তমানে তিমি জনসংখ্যার দিক থেকে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে । তিমি এখন আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত এবং কঠোর আইনি সুরক্ষা ভোগ করে । মিগালু নিজেই একটি অতিরিক্ত আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকে, ফলে সমস্ত নৌকা বা জাহাজ তার থেকে কমপক্ষে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে জলসীমায় থাকতে হয় । বিপরীতে অস্ট্রেলীয় নৌযান অন্যান্য তিমির ক্ষেত্রে প্রায় ১০০ মিটারের মধ্যে যেতে পারে এবং যদি এ প্রাণীর সাথে বাচ্চা থাকে সেক্ষেত্রে প্রায় ৩০০ মিটার দূর জলসীমায় থাকতে হয় । বিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজনে সীমিত আকারে তিমি হত্যা করার অনুমতি রয়েছে । ”Classified” আইনের আওতায় গবেষণা বিষয়টি গোপনীয় হওয়ার কারণে- সে সুযোগ নিয়ে সারাবিশ্বের খ্যাতনামা কয়েকটি তিমি শিকার কোম্পানি অবৈধভাবে তিমি শিকার করছে বলে পরিবেশবিদ, বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অভিযোগ রয়েছে ।7 Comments
Friends
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
শরীফ এমদাদ হোসেন
@sharif-emdad-hossain
শায়েরুল ইসলাম
@shaerulislam
সা দি য়া (নন্দিনী)
@nandini
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
Arshadul Khan Tuhin
@aktuhin
Muhammad Jabed
@jabed92



বরাবরের মত চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে সাজানো চমৎকার লেখা। খুব ভালো লাগল। শুভেচ্ছা নেবেন লেখক।