-
গাঁজার ধোঁয়ায় পবিত্র প্রেম।
কাঁধের উপর মাথা রেখে তন্ময়ের হাতের আলতো পরশ খেতে খেতে কবিতা আবৃত্তি করছে তনুশ্রী।
’তোমার লাগি ঘর ছাড়িয়া পাড়ি দিবো মৃত্যু পাহাড়
মিলাও আঁখি সব ভুলিয়া আজ বলে দাও তুমি আমার’ছন্দ মেলাতে না পারলেও কথাগুলো খুব একটা খারাপ লাগলোনা। কিন্তু তন্ময়ের উত্তর সব সময় প্রস্তুতই থাকে। যতকিছুই হোক, মুড থাকুক বা না থাকুক, সবসময় বলতে হবে ‘বাহ! দারুন ছিলো। আরেকটা শোনাওনা প্লিজ!’
যদিও কখনও কখনও বিরক্ত লাগে তবুও এটাই একমাত্র উপায় তনুশ্রীকে নিবিড় আলিঙ্গনে পাবার। একটু ভুলভাল কিছু করলেই রাজ্যের সব অভিমান একত্রে করে উঠে চলে যাবে।
তাই নিরাপদ হচ্ছে যদি ভালো নাও লাগে তাও তারিফ করে দাও।
তনুশ্রী তারিফ শুনে বললো ‘হয়েছে, হয়েছে, আর বলতে হবেনা।’, কিন্তু মনে মনে অনেক খুশী। প্রশংসা শুনলে কঠিন করে রাখা মেয়েটাও আড়ালে আয়নার সামনে ধেই ধেই করে নাচে। এটা আমার কথা নয় প্রেম বিশেষজ্ঞদের বানী। তনুশ্রী এমনিতে যেঁচে আরো কিছু শোনাতো নিজে থেকেই কিন্তু যেহেতু তন্ময় বলেছে আরেকটা শোনাতে তাই আবারও সেই মেয়েলী ঢঙে বলে দিলো ‘উহুঁ, পারবোনা, মুড চলে গেছে’।
যদিও তনুশ্রীর প্রবল ইচ্ছা আরো শোনানোর কিন্তু ও চায় তন্ময়ের মনটাকে নিয়ে রহস্য করতে। চরম মাত্রায় পৌঁছিয়ে দিয়ে অধরা থাকার মজা নিতে। প্রেমকে ধরা দিতে নেই। একটু কাছে এসে সরে যাও দেখবে প্রেমিক এমনিই পিছু পিছু ছুটছে। তনুশ্রীর পেট ফুলে গেলেও মুখটাতে ন্যকামো একটা ভাব নিয়ে রাখলো। এ ক্ষেত্রে মেয়েরা যে নোবেল পাওয়ার উপযোগী তা বলাই বাহুল্য।মেয়েদের প্রতি প্রকৃতির এটাও একটা দান নয়তো ছেলেগুলো আজকাল যা লুইচ্চা হয় যদি মেয়েদের মনের আবেগগুলো চেহারায় প্রকাশ পেতো তাহলে যে কি হতো তা স্বয়ং খোদাই জানে। আর হবার কেই বা বাকি আছে?
পবিত্র প্রেমের নাম ভাঙ্গিয়ে কাশবনের ভেতর স্বর্গের চাবিকাঠি খুঁজতে থাকা কপোত-কপোতীরা যখন পবিত্রতার মাথা খেয়ে আবেগের শহর থেকে বিতাড়িত হয়ে বাস্তব জগতে পদার্পন করে তখন দেখে যে বেকার প্রেমিকের চেয়ে বি. সি. এস দেয়া ভাইয়াটার কাছে বেশী আরাম আয়েশে থাকা যাবে কিংবা প্রতিবেশী বিলাতে থাকা দাদার বিয়ে করা সুন্দরী বৌদির আকর্ষনটা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে তাই শুরু হোক বৌদি পটানো। যাই হোউক দাদার একাউন্টে যোগ হবে। যে সম্পর্কগুলো শুরু হয় চামড়া থেকে আর শেষ হয় অর্থের ঝাপটায় সেখানে পবিত্র প্রেম শব্দটা বড়ই বেমানান। তবে ঘুনে ধরা সমাজের উদ্দেশ্যহীন জীবনের কথিত সফলতার সংজ্ঞা পড়ে বড় হওয়া ছেলে মেয়েরা এগুলোর মানে বুঝবেনা। যেদিন বুঝে সেদিন নিজেকে দেবদাসের জায়গায় খুঁজে পায় আর এতদিনে ভালোবাসাকে অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে চলে যেতে দেখা যায়। কিংবা ডাস্টবিনে পবিত্র প্রেমের অবৈধ সন্তানকে ফেলে দেয়ার মাধ্যমে মাতৃত্বের চরম ধর্ষন করে মুখ রক্ষা করে পার পায়। কিন্তু মুখ রক্ষা করলেই কি আর মন রক্ষা করা যায়? একধরনের অস্থিরতা থেকে কেউ প্রেমকে গাল দেয় আর কেউ বা আত্নহুতী দেয়। কেউ বা আবার বিভিন্ন কোমলমনা ছেলে মেয়েদের নিজেদের ফাঁদে ফেলে নিজের আঘাতের প্রতিশোধ নেয়।
এরকমই এক আঘাত খাওয়া দেবদাস ‘আনসার মিয়া’ যে কি না একদা একটা মেয়েকে খুউব ভালোবাসতো। মেয়েটা তাকে সওলমেট বলতো। আনসার মিয়া নিজে তথাকথিত মানুষ হবার চিন্তা বাদ দিয়ে শাহিদা আক্তারকে মানুষ করতে চেয়েছিলো। শাহিদার ক্যরিয়ার যদি সুন্দর হয় তবে ভবিষ্যতে বাচ্চা কাচ্চাকে মানুষ করতে পারবে। কিন্তু আখেরে একদিন যখন শাহিদা ম্যডিকেলে চান্স পেয়ে গেলো তখন নানান ব্যস্ততা দেখিয়ে আনসার মিয়াকে পাশ কাটাতে লাগলো। আনসার মিয়া যখনই দেখা করার জন্য বলতো তখনই নিত্য নতুন বাহানা দাড় করাতো শহিদা আক্তার।
’তুমি কি চাওনা আমি ডাক্তার হই? মানুষ হই? তুমি না বলতা যে আমি মানুষ হলে বাচ্চা কাচ্চাদের মানুষ করতে পারবো? তুমি দেখা করলে পরে আমার পড়াশোনায় কনসেন্ট্রেইট করতে সমস্যা হয়…কেন বুঝোনা তুমি আমাকে?’
কথা শুনে উল্টো আনসার মিয়ার নিজেকেই দোষী দোষী মনে হলো। আমতা আমতা করে ফিরে এলো। প্রতি মাসে টাকা পাঠায় আনসার মিয়া। সারাদিন কাজ করে আর সন্ধে বেলায় ঘামে ভেজা শরীরটা নিয়ে পুকুরে ডুব দিয়ে বলে ‘এইতো আর ক’টা দিন। আমার শাহিদা ডাক্তারী পাশ করলেই….।’
যৌবন তো আর ডাক্তারী বুঝেনা। হয়তো কোনরকমে প্রকৃতির করুনার মাধ্যমে স্বপ্ন হয়ে ভেসে যায়। কিন্তু শাহিদার এখন নতুন সমাজ হয়েছে আর নতুন নতুন জীবনের সংজ্ঞা শিখেছে। ফেইসবুকে এক হাই লিখলে দশ হাজার রিপ্লাই পায়। সেখানে আনসার মিয়া কোন চ্য…..র বা…।
’ধুর! যে লোকটা আমাকে তিলে তিলে গড়ে তুললো, সে লোকটাকে গাল দেয়া অন্তত ঠিক নয়। কিন্তু তার মতো লোয়ার স্ট্যটাসের মানুষের সাথে সংসার তো করতে পারিনা’…
সত্যিই চিন্তা ধারার আমূল পরিবর্তন শাহিদার। হয়তো মানুষগুলো আধুনিক শিক্ষায় আর তথাকথিত স্ট্যাটাস ওয়ালা সমাজে যখন অমানুষ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে যায় সেটাকেই হয়তো সফলতা বলে।
একদিন আনসার মিয়া মেডিকেলের কোনায় একটা বাগানে যখন শাহিদাকে দেখলো এক ছেলের সাথে কথা বলতে তখন আনসার মিয়া ইচ্ছে করেই আড়ি পাতলো। শাহিদা আরিফকে বলছে ‘তুমিই আমার প্রথম ও শেষ প্রেম। তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা। আসলে শাহিদা জানে আরিফের বাবা হচ্ছেন একজন বড় নেতা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। জীবনে উঠতে গেলে এরকম মই একটা দুটো ধরতেই হয়। আর মইগুলো ধরতে গেলে হয়তো পবিত্র প্রেমগুলো কাজে দেয়।
’এই কাছে এসোনা!’
শাহিদা আরিফের বুকে মাথা রাখলো।
আরিফ দিগন্তের গোধুলী লক্ষ করে দৃষ্টি ছুড়ে দিলো।
আনমনে মনে গানের কলি মুখ থেকে বেরোলো ‘ ইয়ে এক এয়সা পবিত্রা বন্ধন হেয়। যাহা একতারাফ তু অওর একতারাফ মেরা ধরকন হেয়।’সেই দৃশ্যের পর থেকে আনসার মিয়া ঘোর পাগল এখন সে পার্কে থাকে। যে কোন কপোত কপোতী দেখলেই তেড়ে আসে। তনুশ্রী আর তন্ময়ের ভাগ্য হয়তো খারাপই। আনসার মিয়ার সাথে সরাসরি মোলাকাৎ।
’কি তোরা প্রেম করস? পবিত্র প্রেম তাইনা?’
’এই আপনি কে? আমাদের মধ্যে কি চান হ্যাঁ?’
’এই চিল্লাবিনা তাইলে কিন্তু ভিডিও ওঠায়া ছাইড়া দিমু।’ আজকাল পাগলও সেলফি আর ভিডিও তুলে ছাড়লে যে সবাই দেখে তা জানে। অনেকে বুঝে লাইক দেয় অনেকে না বুঝে তাতে কিছু আসে যায়না। কন্টেন্ট ই বড় কথা। আর এই মুহুর্তে তন্ময় আর তনূশ্রী হচ্ছে সেরা কন্টেন্ট।
তনুশ্রী ভয় পেয়ে গেলো। বাড়ির সবাই যদি দেখে! তাছাড়া ও যে প্রেম করে তা কেউ জানেনা। কেন কি হয়েছে জানলে? প্রেম কি খারাপ কিছু? কিন্তু প্রেমের কথা বললেই বাবা মা তেড়ে আসবেন। তাই ভয়ে প্রেমের কথা বলা হয়না। বাবা মা গুলোও আস্ত একটা বোকা। প্রথমে তারা কখনই মেনে নিবেনা কিন্তু যখন ছেলে মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করে তখন একসময় মেনে নিতেই হয়। মধ্য থেকে কত কিছু সইতে হয়।
তার চেয়ে ভালো বুঝালেই তো পারে ’দেখো মা! যে ছেলেটা তোমাকে ভালোবাসে সে কেন বিয়ে করতে চাইছেনা? যদি প্রকৃত ভালো বেসেই থাকো তাহলে বিয়ে করে কেন ক্যরিয়ার কন্টিনিউ করা যায়না? যে ছেলেকে ভালোবাসো ধরো আজকে যদি তুমি একসিডেন্ট করে একটা পা হারাও তবে কি সে তোমাকে বউ করে নেবে? কিন্তু যদি তুমি পবিত্র প্রেম কে সবকিছু দিয়ে দাও আর কাল তোমার এমনকিছু হয় সে তোমাকে বিয়ে করলোনা তখন কি হবে? আচ্ছা বাবা যে মেয়েটিকে তুই ভালোবাসিস সে মেয়েটা কি তোকে তখনও ভালোবাসবে যখন তোর কাছে টাকা থাকবেনা? কিংবা যখন্ কোন কারনে তুই পঙ্গু হয়ে গেলি?’
এগুলো বললে হয়তো পবিত্র প্রেম ও ভালোবাসার প্রকৃত রুপটা ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারতো। হয়তো পবিত্র প্রেম কত বড় কঠিন দায়িত্ব তার অনুভূতি সৃষ্টি হতো, হয়তো প্রেমের নাম ভাঙিয়ে জীবনকে অহেতুক করে তুলতোনা কেউ। কিন্তু বাবা মা কখনও কি সন্তানের সাথে এমন কিছু বলে?
অনেকে আবার যদিও ফ্রি কিন্তু এরা নিজের মেয়েকে পণ্যের মতো গড়ে তুলে। ছোট থেকেই কোন এক পয়সাওয়ালার ঘরনী করার জন্যই বড় করে। ‘প্রেম কর ঠিক আছে, কিন্তু বিয়ে করতে হবে আমাদের পছন্দ মতই।’ আবার ছেলেরা বড় হয় আত্নপরিচয়হীন ও মেরুদন্ডহীন হয়ে। ছোট থেকে একটাই কথা ‘পড়ালেখা করা নয়তো বউ পাবিনা। পড় মনযোগ দিয়ে তাহলে চাকুরী ভালো পাবি, একটা সুন্দরী বউ পাবি।’
মানুষের ছোটবেলা থেকে লক্ষই যখন মনুষত্বকে কেন্দ্র করে হয়না তখন মানুষের মত চেহারা নিয়ে এরা যে পরিমল কিংবা সমাজে ভালো সেজে থাকা পয়সাওয়ালা প্রবাসীর পতিতা বউ হবেনা তা কে বলতে পারে?
হয়তো সবাই সবটা বলতে পারেনা কিন্তু এই কথাগুলো একনাগাড়ে আনসার মিয়া বলে চললো তন্ময় ও তনুশ্রীকে লক্ষ করে। তন্ময় আনসার মিয়ার বিঁচি লক্ষ করে লাথ দিতে চেষ্টা করলো। কিন্তু তনূশ্রী তন্ময়কে বাঁধা দিলো।
’তন্ময়! মারছো কেন?’
’দেখোনা পাগলটা বক বক করে যাচ্ছে। কিন্তু এতক্ষন সহ্য করেছি আর নয়।
আমদের পবিত্র প্রেম নিয়ে মসকরা?’
’তন্ময়! ও পাগল হলেও কথা কিন্তু ঠিকই বলেছে। তুমি চিন্তা করে দেখো আমরা যদি পরস্পর ভালোই বাসি আর সারাজীবন একসাথেই থাকতে চাই তবে কেন অপরাধীর মতো এখানে বসে আছি?’
তন্ময় তনুশ্রীর মুখ থেকে এরকম কথা শুনবে আসা করেনি। কিন্তু তন্ময়ও পাগলটার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অনুভব করলো।
পাগলটাও তাদের আচরনে অবাক হলো। সবাই এতদিন ইট ছুড়ে মেরেছে। কিন্তু ওরাতো উল্টো ওকে খাওয়াতে চাইছে।
আনসার মিয়া তার বিখ্যাত এক ডায়লগ দিলো…’ভালোবাসলে বিয়া কর। পবিত্র প্রেম মারায়োনা। ভালা মাইনসে প্রেম করেনা..ফস্টি নস্টি করে।’
একটু পরে নিজেই আবার বলে উঠলো… ‘সত্যিকার প্রেমিকেরা কখনই তথাকথিত প্রেমের বাহানায় পবিত্রতা বিসর্জন দিবেনা। প্রেম একটা অঙিগকার, একটা সারাজীবন থাকার অলিখিত চুক্তি অতএব এ সম্পর্ককে যারা বিয়ের আগে কলুষিত করে তারা ভালো ছেলে বা মেয়ে হতে পারেনা।
দার্শনিকের মত কথাগুলো বললো অানসার মিয়া।
তনুশ্রী প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলো। কিন্তু কি যেন ভেবে আর প্রতিবাদ করলোনা। মনে হয় ও নিজেও ভাবছে কথাটার যৌক্তিকতা। সত্যিইতো যদি ভালোইবাসো তবে লুকোচুরি কেন। দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে একসাথে জীবন শুরু করা হোক…’যা ভাবা তাই হলো। সমাজের তথাকথিত মান-সম্মান স্ট্যটাস জাত যাবে তাই মা বাবা কিছু্তেই মেনে নেবেনা। তন্ময় হচ্ছে সামান্য চাকুরেজীবি। সবমিলিয়ে আট হাজার টাকা উপার্জন করে। আর রনি, তনুশ্রীর কাজিন, লন্ডনে থাকে, তার কামাই হচ্ছে ডলারে। আহ কত ইচ্ছে! যদি একবার রনিকে দিয়ে তনূশ্রীকে বিয়ে করানো যায়। তবে লন্ডনের সেরা মার্কেট থেকে বেনারশী শাড়ি কিনবে। যতই হোক দেশী কিন্তু লন্ডন থেকে কেনাটাই বড় কথা। উহুঁ! বাচ্চা মেয়ের কথা কোন ভাবেই মানা যাবেনা।
এখানেই বাবা মায়েদের সমস্যা। বাচ্চা ছেলে মেয়েরা কখন প্রেমে পড়ে, কখন অবৈধ বাচ্চা পয়দা করে, কিংবা কখন হয়তো সুসাইড নোট লিখে আত্নহননের প্রতীক্ষায় খোঁজ রাখেননা কিন্তু বিয়ের কথা বললেই বাচ্চা মেয়ে। কিন্তু এই লন্ডনে থাকা রনিই যদি এই বাচ্চা মেয়েটাকে বিয়ে করতে চাইতো তখন একবছর বাড়িয়ে হলেও বিয়ের জন্য ব্যবস্থা করতো তখন হয়তো বলতো ‘প্রথমেই কি সব শেখা যায়, শ্বশুরবাড়ী যা, সব শিখে যাবি।’
সমাজ এক অদ্ভুত দৈত্য যা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেনা। সুতরাং সমাজের তখাকথিত জীবনের সংজ্ঞা দিয়ে হয়তো আত্নপ্রবঞ্চনা ক্রয় করে মেকী সুখের ভাব দেখানো যায় কিন্তু সুখী হওয়া যায়না।
যাই হোক, যখন তনূশ্রী নাছোড়বান্দা যে সে পালিয়ে যাবে যদি তার পছন্দের তন্ময়ের সাথে বিয়ে দেয়া না হয়।
বাবা- মা নিরুপায় হয়ে আত্নীয় স্বজনের দারস্থ হলেন। আত্নীয় স্বজনেরা তনূশ্রীকে নিয়ে ব্যস্ত আজকাল। জীবনে চলতে গেলে প্রেম দিয়ে হয়না চাই অর্থ, চাই আরাম-আয়েশ, আরো কতকিছু! অভাব এলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালাবে।
চামড়া আর অর্থের উপর দাড়ানো মোহের প্রলেপে মোড়ানো প্রেমের ভূত নামতে দেরী হলোনা। তনূশ্রী আজকাল তন্ময় থেকে কেমন যেন দুরে সরে যাচ্ছে।হঠাৎ একদিন তনূশ্রীর বাড়িতে বিয়ের গেট দেখে তন্ময় অবাক। কিচ্ছুই জানায়নি তনূশ্রী। গেটের উপর ডেকোরেটরের দোকানের এড দেয়া। শ্লার দোকানের নামও ‘পবিত্র প্রেম’। গরীব হয়ে প্রেম করছো যখন প্রকৃতির হাতেও বাঁশ খাবার জন্য প্রস্তুত থাকো! তন্ময় নিথর দাড়িয়ে কল্পনা করতে লাগলো কত শত প্রতিশ্রুতি, কত শত প্রেমের কবিতা –কোথায় এগুলো?
পাশে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো তারই বন্ধু রফিক…
তন্ময় কে বিয়ের গেটের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে খুব খারাপ লাগলো ওর। কিছু না বলে পাশের একটা বিড়ির দোকান থেকে ’পাইলট’ কিনে তাতে আগুন ধরিয়ে তন্ময়ের ঠোঁটে গুঁজে দিলো। প্রেম মনে হয় এটাই, যে তন্ময় সিগারেট ধরতেও জানতোনা সে এমনভাবে কষে টান দিলো যেন সে মহা গাঁজাখোর…চেইন স্নোকার।
’মামা! কইছিলামনা এইগুলার মধ্যে যায়োনা। কি পাইলি? না পাইলি নিজের কইরা কয়েকটা রাত…… আর না পাইলি বিয়া করতে। এইজন্যই কয় পাখি ধইরা রাখতে হইলে আগেই বিড়াল মাইরা ফেলো…পরে দেখবা তোমার পিছন পিছন ঘুরবো।’
’মনে হয় তুই ই ঠিক ছিলিস।’
বিশুদ্ধ বাংলায় বললো তন্ময়। কন্ঠই বলে দিচ্ছে যে চরম মাত্রার কষ্টের মেঘ জমে অন্ধকার হয়ে রয়েছে চতুর্দিক যে কোন সময় ভয়ঙ্কর বর্ষন হতে পারে।
একটা জোরে চিৎকার দিলো তন্ময়।
’চিৎকার দিয়া কি হইবো! কইছিলামনা আসল প্রেম এত সোজা না’
যখন মানুষ কষ্টে থাকে তাতে নুন ছিটিয়ে দিতে সবসময় কেউ কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসবে। কিন্তু আনসার মিয়া একটা ভালো লোক। মানে সমাজের চোখে পাগল হয়তো সত্যিই পাগল। এবং আসলেও সে পাগল… সবাই ঘৃণা করে তাকে কিন্তু কেউ তার পাশে গিয়ে তার কথা শুনেনি। আবার জোর গলায় আওয়াজ তুলে ‘মানুষ মানুষের জন্য’। সব ভণিতা, এডভারটাইজ আর পাবলিসিটি। নিকুচি করি এই সমাজকে।
’দোস্ত! ভালা মাইয়্যা আর পোলারা প্রেম করেনা। এইযে তোর সাথে ও প্রেম করলো এখন সারাজীবন আরেকজনের লগে প্রেমের অভিনয় করবো…ও কি ভালা থাকলো?’
’বন্ধু! সবাইকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক না..অনেকে প্রেম করে পবিত্র মনে।’ কষ্টকে কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে তন্ময় তাই হয়তো কথাটা বলতে পেরেছে।
’আমি পবিত্র টবিত্র বুঝিনা…আমি এতো রিস্কে যাইতে চাইনা।. আমার ভালা লাগলে প্রেম করমু ঠিক আছে কিন্তু আগে বিয়া কইরা লমু। তারপর যতখুশী ডেটিং করুম। তখন নিজেরে অপরাধিও মনে হইবোনা আর নিজের আত্নার কাছেও ফেরেশ থাকমু।’ রফিক অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললো। রফিক এভাবেই ঠুসঠাস কথা বলে। তন্ময়ের কষ্টে রফিকও কষ্ট পেয়েছে। ’হুমম..’ সায় দিলো আনসার মিয়া।
তন্ময়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। রফিকও চুপ। আনসার মিয়া লুঙ্গির ভাঁজ থেকে একটা গাঁজার মসলা বের করে রোল করলো এবং তাতে আগুন ধরিয়ে টান দিলো। এই মুহুর্তে কিছু শোনার মুডে নেই তন্ময়। পরামর্শ কিংবা সহমর্মিতা প্রদর্শন করে লাভ হবেনা। এটা সকলেই দেয়। সস্তা মাল। আনসার মিয়াকে আগে কেউ পরামর্শ দিলে বলতো যে পরামর্শ না দিয়ে কিছু টাকা ধার দেন ব্যবসা করে শোধ করে দিবো। আনসার মিয়ার হয়তো কথাগুলো মনে পড়ে গেছে তাই কোন কথা না বলে একমনে গাঁজা টেনে যাচ্ছে। ও তন্ময়কে সাধবেনা। কারন তন্ময় সারাজীবন বলুক যে গাঁজা খাওয়া শিখিয়েছে আনসার মিয়া এই দায়ভার বহন করতে চায়না। এ মুহুর্তে আনসার মিয়া জাতে মাতাল তালে ঠিক প্রবাদ বাক্যের যথার্থ প্রয়োগ করে চলেছে। কিন্তু ও জানে যে এই মুহুর্তে তম্নয়কে এই কয়েকটা টানই দিতে পারে একটু প্রশান্তি, হয়তো তন্ময় তনুশ্রীকে ভুলে থাকতে পারবে কিছুটা সময় হলেও।
মনের কথাটা বোধ হয় তন্ময় বুঝে ফেলেছিলো। তাই হ্যচকা টান দিয়ে কেড়ে নিলো গাঁজার রোলটা আর তাতে কষে টান দিলো। কয়েকটা টান দিতেই কাশতে শুরু করলো। তবু টান দিয়ে গেলো। একসময় হাসতে শুরু করলো। হাহ হাহ হা।দু বছর পর। তন্ময় রিতীমত গাঁজাখোর। সঙ্গী আনসার মিয়া। হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো সেই নাম ‘মাই জান’….
তনুশ্রীর ম্যসেজ ‘অর্থ হলেই সুখী হওয়া যায়না। পারলে ক্ষমা করে দিও।’
তন্ময় মোবাইলটা ছুঁড়ে মারলো মেঝেতে। মোবাইল দু টুকড়ো হয়ে গেলো।
অশ্রাব্য একটা গাল দিয়ে গাঁজায় অাবার টান দিতে শুরু করলো।আনসার মিয়া গান ধরলো….
আমার কাছে নাই গো পয়সা
আমার কাছে নাই গো পয়সা
তাহার কাছে আছে
তাইতো আমি পাগল কুতুব
তুই তাহার পাছে।
যাহার লাইগা দিলাম পরান
রক্ত কইলজা সব হারাইলাম
দিন শেষে অবিশ্বাসের
দিন শেষে অবিশ্বাসের
সর্প কাটলো দিলে
গাইঞ্জার টানে আশেক প্রেমিক
কষ্টের পাহাড় গিলে।—————————————-
7 Comments

ঠিকানাহীন অরণ্য -
লেখক
আমি স্বত্মা সম্বলিত আত্মাবাহক মানুষ
কষ্ট চাষ করে শব্দ ভেদ করে সাহিত্য রস বের করা আমার কাজ
প্রেম আমার ধর্ম, ন্যায়বিচারের কথা আমার যুদ্ধ
আমি চোখের ভেতর সাগর চষি উম্মাদ উম্মত্য হয়ে
জাগতিকতার যান্ত্রিকতা কি করবে আমায় নিয়ে?
আমি ভবঘুরে, আনমনে, বণ্য এক অরণ্য---
Friends
Md.Khaladur Rahman (অনল)
@wanol
পরিমল রায়
@parimal-roy
Rejwana Khan
@rejwana-khan
Shovan Khan Sabuz
@methopath
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Reazul Kabir
@reazul-kabir



চমৎকার