Profile Photo

Rafi Bin ShahadatOffline

  • Rafi68
  • Profile picture of Rafi Bin Shahadat

    Rafi Bin Shahadat

    4 years, 5 months ago

    -শোনো বালিকা, তোমার চোখে দেখেছি প্রেম;
    দেখেছি অভিমানী অট্টালিকা!

    মেয়েটা তখনও তাকিয়ে আছে শ্যাওলা পড়া বেঞ্চের দিকে। রাগ করেছে কি-না জানি না, তবে অভিমান সে করেছে। মাঝেমাঝে নাক টানার মৃদু শব্দ কানে ভেসে আসছে। প্রথমে ভেবেছিলাম সে কাঁদছে, পরে মনে পড়লো কাল রাতে তাকে এলাট্রল খেতে বলেছিলাম সর্দির জন্য। তাহলে কি সে খায়নি! এমনটা তো হবার কথা না, সে তো কখনো আমার অবাধ্য হয়না। তাহলে ওষুধ কাজ করেনি বোধহয়। আমি তার নাকে হাত দিলাম, এই কাজটা আমি মাঝেমধ্যেই করি। নাক টিপে ধরে বসে থাকি। আমার হিসাবমতে নাকে অপরিপক্ক সর্দি জমাট বেঁধে থাকার কথা, কিন্তু হাত দিতেই বুঝলাম তার নাক পরিষ্কার। সে আমার হাত ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে দিলো। তার মানে সে কাঁদছে। আমি বুঝতে দিলাম না যে আমি তার কান্না টের পেয়েছি।

    পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে তার সামনে ধরে বললাম-“আপাতত টিস্যু দিয়ে কাজ চালাও। হাতে একটা ভ্যাকুম ক্লিনার থাকলে নাকের ভিতরে ঢুকায়ে দিয়ে সব সর্দি একবারে বের করে নিতাম।” সে হাসলো না! জানি অনেক নিচুস্তরের একটা জোকস বলেছি; আগেও বলেছি, কিন্তু সে না হেসে থাকেনি। সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বললো- “হাত ছেড়ে দাও, আমি চলে যাব।”

    খেয়াল করে দেখলাম, সে নিজেই আমার হাত ধরে আছে। আগে এই কাজটা অনেক করতো সে। হাত ধরে বলতো-“চলো না, আমরা আলাদা হয়ে যাই!”,”তোমার সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখব না।” আমি হেসে বলতাম-“এসব কথা কেও হাত ধরে বলে!” আমি কিছু বললাম না, তাকিয়ে থাকলাম। গুগল প্লেস্টোরে একটা এপ্স নামিয়েছিলাম-‘বউ পটানোর ১০১ টা টিপস্”। সেইখানে একটা লাইন ছিল-“বউয়ের মুখ যখন রাগে, অভিমানে ফ্যাকাসে হয়ে যাবে, তখন তার কপালে আদর করে দিতে হবে।” সাধারণত আমি এক লজ্জাহীন পুরুষ, এসব ঠুনকো খুনসুটির জন্য লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই। তাই হুট করে এই লাইন মনে হওয়ায় আমার খুব হাসি পেলো। আমি হাসি আটকে রাখতে পারলাম না। আমার হাসি দেখে সে পাশে এসে বসলো। সে কথা বলছে; তার গলা ভারী হয়ে আছে, শীতের বৃষ্টির মত নীরবে সে কাঁদছে।

    – আমি যে একটা মানুষ তোমার পাশে বসে আছি, অভিমান করে আছি, তোমার মিনিমাম কমন সেন্স নেই রাফি? আমার অভিমান ভাঙানোর একবার চেষ্টাও তুমি করবেনা তাই বলে! একবার জিজ্ঞেসও করবেনা আমাকে, কেন অভিমান করেছি!

    আমি চুপ করে বসে আছি। আমি জানি সে কেন অভিমান করেছে, সে কি চায়। সে যা চায় তা আমার পক্ষে করা সম্ভব না। সে আমাকে শেষ করে দিতে চায়, সে আমার মৃত্যু চায়, মানসিক মৃত্যু।

    – তুমি কেন বাবা- মার কথা শুনছো না রাফি? কি হয়েছে তোমার? তুমি কি একবারও নিজের মেয়েটার দিকে তাকাবে না? নিজে তো সারাদিন অফিস নিয়ে পড়ে থাকো, মেয়েটার কি হবে একবারও ভেবেছ?

    – আমি তো মেয়েটাকে চাইনি, তোমাকে চেয়েছি।

    – কিন্তু আমি মেয়েটাকেই চেয়েছি রাফি, বাচ্চাটা আমাদের।
    – আমাকে হারিয়ে?

    – তোমাকে আমি হারাইনি, যখন খুশি তখন তোমার কাছে আসতে পারি আমি। তুমি এখনই আব্বুর কাছে যাবে। গিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে আসবে। বুঝতে পারছ কি বলছি আমি?

    – সেটা আমি নিয়ে আসবো; কিন্তু আরেকটা বিয়ে আমি করতে পারব না।

    – করতে হবে, আমার হাত ছুঁয়ে বলো তুমি করবে।

    – আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করো, আমি তোমার জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারব না।

    সে আমার হাতটা ছেড়ে দিল। তারপর আমার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল-“মৃত মানুষের জায়গায় শুধু তার আত্মাই বসতে পারে। এইতো আমি, যখনই আমার কথা মনে হবে, আমার কবরের পাশে এসে বসে থাকবে। আমি চলে আসবো। নিজের জীবনটা দিয়ে আমাদের মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছি রাফি, এক ফোঁটা চোখের জল যেন মেয়েটা কোনোদিন না ফেলে। ওর নতুন মা কে বলে দিও সে যেন আমাকে নিয়ে হিংসা না করে………..”

    – ভাইজান, উঠেন এখন। গোরস্তানের গেটে তালা দিব।

    আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেঞ্চ থেকে উঠলাম। ছেলেরা যেখানে-সেখানে কাঁদতে পারে না, কথাটা সত্যি। বুক ভারী হয়ে আসছে, খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে; কিন্তু পারছি না। এদিকে গাড়ি ড্রাইভ করে যেতে হবে ভেবেই কুবুদ্ধি মাথায় ভর করা শুরু করছে। খুব ইচ্ছা করছে মারা যেতে। বেঁচে থাকার অতীব্র ইচ্ছা নিয়ে গাড়ি ড্রাইভিং শুরু করলাম, পথিমধ্যে কিছু হলে এক্সিডেন্টাল ডেথ হবে তো!

    -অভিমানী অট্টালিকা

    3
    2 Comments
Skip to toolbar