Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    4 years, 5 months ago

    গীতল রাত্রি
    ===================

    ধীরেন বাসস্ট্যান্ডে আসার আগেই বাসটা বেরিয়ে গেল। নিঝুম তেঁতুলতলায় একজন মাত্র যাত্রী নেমেছে। সবে সন্ধ্যা নামল এরপর নাকি আর একখানা মাত্র বাস মিলবে।

    রাস্তাটা প্রাগৈতিহাসিক। পিচের বংশ নেই। নৌকোর মত দোল খেতে খেতে বাসগুলো গাড্ডা পেরোয়। ছুটলে কি ধরা যায় বাসটা? আবার কখন বাস আসবে কে বলতে পারে। স্ট্যান্ডের একমাত্র চা-দোকানে ঝাঁপ পড়ছে। ধীরেন আবছা অন্ধকারে উড়ন্ত ধুলোর পিছনে ছোটার প্রস্তুতি নিতেই হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে এগিয়ে এলো যাত্রীটি। বলল, ‘চলি যাচ্ছিলে নাকি? কি আশ্চয্যি! আর আমি তোমার জন্যি মাছ নে এলুম। এই দ্যাকো কি বড় বড় বাইন মাছ, আজকাল পাওয়া যায় না বুইজলে! চলো ঝোল খাবে।

    ধীরেন কিছু বলার আগেই যমদূতের মত কালো প্রকাণ্ড হাত ওর বাহু আঁকড়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলো বুকের কাছে, বলল ‘‘লাস্ট বাস চলি গেছে, এর পরে আর বাস নেই, ঝেটা শুনোচো ওই আশায় থাকলি ভোর হয়ি যাবে। হেঁটে শহরে যাবার মতলব এঁটোচো মনে হচ্ছে, হে হে। চলো গরীবের ঘরে নয় একটা রাত থাকলে। খেয়েদেয়ে পাশের ঘরের বুনোর মা গান দেচে, শুনবে অকন।’’

    রাত হয়েছে। আঁশটে গন্ধে ভরা বাইনমাছের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খেয়ে অন্ধকার দাবায় বসে আছে ধীরেন। চাঁচের খাঁচার ভেতর শালিকটা ঝটপট করে উঠছে মাঝেমাঝেই।
    রতন হালদারের উঁচু দাওয়া থেকেই দেখা যাচ্ছে বুনোর উঠোন। সেখানে মনসার ভাসান গান হচ্ছে। হ্যাজাক জ্বলছে শোঁ শোঁ করে। আলো একবার কমছে আবার বাড়ছে। খুব ভিড় চারদিকে। লোক যাচ্ছে আসছে। বাইরে এদিক ওদিক হাঁড়িয়া, তাড়ি, চুল্লুর আসর বসেছে। ওদের চারপাশে উড়ছে মাতাল জোনাকি।

    ও যেখানে বসে আছে তার পাশেই একটা বকুলগাছ। ফুল ফুটেছে দেদার। গন্ধে তন্ময় হয়ে ধীরেন ভাবছে তার ভাঙা চাল, নোনাখসা ঘরের কথা। সেখানে কোনও বকুলগাছ নেই, মনসার ভাসান নেই, হ্যাজাকের আলো নেই। চাঁদ মুছে যায় স্ট্রিটলাইটে। নর্দমায় মাছি ওড়ে দিনে, সন্ধ্যায় মশা ভনভন করে। বর্ষায় ঘরে ঢোকে জল। গরমে হাওয়াকে কান ধরে ঘোরাতে ঘোরাতে সিলিং ফ্যান হাঁপিয়ে যায়।

    যদিও এখানেও ছেঁড়াফাটা মানুষ, কারও ঘরে ধানের গোলা নেই, অথচ কী মিঠে হাওয়া, জ্যোৎস্নামোড়া পথ, ধানমাঠ, মাতাল জোনাকি। ভাল্লাগে না ফিরে যেতে। যমদূত কি তাকে আরও কিছুদিন রেখে দেবে।

    ধীরেন আচমকা তার পিছনের অন্ধকার গাছতলায় চুড়ির শব্দ পায়, হাসির শব্দ পায়, শ্বাসের শব্দ পায়। সে চমকে ওঠে। পিছন ঘোরার আগেই সামনে ধেয়ে আসে সেই কালো কুচ্ছিত হাত, ‘‘নাও বিড়ি খাও।’’ সে বিড়িটিড়ি খায় না, কিন্তু নেয় ধরায়। তারপর রতন হালদারের ছেলে ঘরে ঢুকে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় অন্ধকারে। কিছুক্ষণ জ্বলে ওটা তারপর দেখে দপদপ করে জোনাকিরাই জ্বলছে।

    ওদিকে কান্নার রব ওঠে। লখিন্দরকে সাপে কেটেছে। ভেসে আসে বিষণ্ণ সঙ্গীত। আড়বাঁশি বাজায় দলের কালোভূত একটা ছোকরা। ভিড়টা আধোঘুম জাগরণে ঢুলছে দেখতে পায় ধীরেন।
    সে ধীরে ধীরে উঠোনে নেমে আসে। মাথার উপর ডানার আওয়াজ পায়। বনপাখি উড়ে যাচ্ছে, দেখে। চালে খসখস শব্দ ওঠে। জুলজুলে পেঁচার চোখের সার্চলাইট ঘুরছে, দেখে। মাথার উপর মড়ার খুলির মত চাঁদ ঝুলে আছে দেখতে দেখতে ওর মনে হয় এই পৃথিবীটারও তো অনেক বয়স হলো।

    ও বকুলগাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। তার ইচ্ছে হয় হাজার বছর ধরে সে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। রাত কি ফুরিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি? অনেকদিন তো রাত জাগা হয়নি!

    @হাসনাতের হস্তাক্ষর

    12
    15 Comments
Skip to toolbar