Profile Photo

অভিমানী মনOffline

  • ovimanimon
  • Profile picture of অভিমানী মন

    অভিমানী মন

    4 years, 5 months ago

    লুঙ্গি খুলে দেখে নিতো হিন্দু না মুসলমান

    ৭১এর চিটাগাং ছিল ছোট্ট শহর। সদরঘাট থেকে বহদ্দার হাট পযর্ন্ত এর দৈর্ঘ্য। খুলশী, পাহাড়তলী, শোলোশহর, হালিশহর, পতেঙ্গা ছিল শহরতলীর জনপদ।
    যুদ্ধ শুরুর পর বন্দরের কাজকর্ম কমে আসে। পথঘাট সৈন্যদের দখলে চলে যায়। শহরে চেপে বসে গুজব আর আতঙ্ক।
    এরিমধ্যে আমরা মাদারবাড়িতে মামার বাসায় আসি।
    তিনটা দোতলা ভবনের মাঝখানে একপ্রস্থ মাঠ। আমরা তাতে খেলাধুলা করি। তবে রাস্তায় যাওয়া বারণ। গাড়ির শব্দ পেলে তবু বাউন্ডারি দেয়ালের কাছে গিয়ে উুঁকি দিই।
    খাকীউর্দ্দী পরা মিলিটারিদের দেখি, হেলমেট মাথায় হাতে রাইফেল নিয়ে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে।
    ওরা একটু দূরে চলে গেলে আমরা বকা ছুড়ে দিই– ঐ পাঞ্জাবি, ভাগি যা…। তারপর দলবেঁধে ছড়া কাটি–ইলিশ মাছের ত্রিশ কাঁটা/ বোয়াল মাছের দাড়ি/ টিক্কার বউ ভিক্ষা করে/ শেখ মুজিবের বাড়ি…।
    দিনের বেলায় আব্বা যদিবা বাসায় আসে; সন্ধ্যার পর আর দেখি না।
    মা জানায়, তোমাদের বাবা মুক্তিদের সঙ্গে কাজ করে। এজন্য রাতে আসতে পারে না।
    শুনে আমার গর্ব হয়। যুদ্ধ যে ভয়ের এই বোধ তখনো হয়নি।
    কর্ণফুলি পেপার মিল তখনো দাউদ কোম্পানির কতৃত্বে চলে। আমার মামা আইসফেক্টরী রোডের দাউদ চেম্বারে ডিউটিতে যায়। তার কাছে কারফিউ পাশ আছে। তবু আতঙ্ক পিছু ছাড়ে না।
    সৈনিকরা পথ ঘাট অফিস বাসা যেকোনো স্থানে হানা দিয়ে যেকাউকে তুলে নিয়ে ক্যাম্পে আটকে রাখে। ঐসব পরিবারে তখন শুরু হয় কেয়ামতের আলামত।
    দিনের বেলায় যেমন তেমন; রাত আসে বিভীষিকাময় হয়ে । প্রতিটি বাসার জানালা আর ভেন্টিলেশনগুলো কালো কাগজ দিয়ে এমনভাবে ব্লকআউট করে দেওয়া হয়, একফোটা আলো যেন বাইরে ঠিকরোতে না পারে। যেন মনে হয়, এসব বাড়িতে কেউ থাকে না।
    রাতের শহর ডুবে থাকে ভূতুড়ে অন্ধকারে। বিমান থেকে বোমা ফেলার ভয়ও কাজ করে শহরের ঘরে ঘরে।
    এক সন্ধ্যায় মিলিটারির লরী এসে মাঠটার মাঝখানে দাঁড়ায়। সৈনিকরা ঘরে ঘরে ঢুকে তল্লাশি করে। ভয়ে আমরা বিড়াল ছানার মতো মার আাঁচলে লুকিয়ে চোখ বড়োবড়ো করে সব দেখি। সৈনিক না যেন যমদূত, চলে যাওয়ার পর এমন স্বস্থি পাই সবাই।
    শহরের উপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ে যেতে দেখেছি। রাতে কখনো শুনেছি থেকে থাকে একটানা গুলির শব্দ।
    মা বলতো– যুদ্ধ চলতেছে। চুপ করে শুয়ে থাকো।
    একদুপুরে আব্বা এসে বলে–কয়েকদিনের জন্য কারফিউ তুইলা নিছে। বরিশাল রুটে জাহাজ চলার অনুমতি দিছে। কাইল সকালে তোমরা জাহাজে উঠবা…।
    বাড়ি ফিরবো; এই আনন্দে ভোরে ভোরে ঘুম থেকে উঠি। স্কুটারে চড়ে সদরঘাটে যাই।
    জাহাজজুড়ে মিলিটারিরা রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। সবাইকে তল্লাশি করে উঠানো হয়। যাত্রি হিন্দু না মুসলিম লুঙ্গি খুলে দেখে নেয়।
    আমরা ডেকে চাদর পেতে বসি; তৈয়ব চাচীর দেওয়া চাদরটা। বহুক্ষণ ধরে বহুযাত্রীতে জাহাজ পূর্ণ হলে ভোঁভোঁ করে সাইরেণ বেজে ওঠে।
    যন্ত্রের ঘর্ষণে জলের ছলছল শব্দ হয়।
    দুপুরের খররৌদ্রে জাহাজটা পতেঙ্গার নদীমুখ দিয়ে সাগরে নেমে যায়।
    সাগরবক্ষ থেকে দেখা, ক্রমশ পিছে সরে যাওয়া বন্দরের অপূর্ব শোভা আজও চোখে লেগে আছে। #
    *চলবে…

    24
    10 Comments
Skip to toolbar