Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    4 years, 4 months ago

    হলুদ চিঠি
    হাসনাত সৌরভ
    ===========================

    রাগীবের লটারি লেগে গেল। মাত্র পাঁচশো টাকায় যামিনী রায়ের এরকম একটা কালেকশন পেয়ে যাবে, স্বপ্নেও ভাবেনি। ভাগ্যিস বসের বাবা মারা গেল। অফিসও ছুটি হয়ে গেল দুপুরবেলা। সবাই এদিক ওদিক কেটে পড়ল। রাগীবের সেরকম কোনো নেশা নেই। একমাত্র চেরাগিতে পুরানো বইয়ের গন্ধ। হাতে নিয়ে দেখে। দরদাম করে। কখনো কখনো সস্তায় মণিরত্ন মিলে যায়। আর আজকে তো একেবারে বৈদুর্যমণি!

    বাড়ি এসে চা বানিয়ে বইটা খুলতেই চিঠিটা চোখে পড়ল। বইয়ের ভেতর সযত্নে রাখা। কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে। কোনো এক সুমাকে লেখা রাদের চিঠি— ‘দেরি হয়ে গেছে অনেক। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। অন্যায় করেছি। পারলে ক্ষমা করে দিও।’

    বইয়ের পাতাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আর কোনো নাম ঠিকানা পাওয়া গেল না। বোঝাই যাচ্ছে চিঠি সুমার হাতে পৌঁছায়নি। আর রাদ? তার কথাগুলো তো না বলাই থেকে গেল! এরকম কত কথা বলা হয়ে ওঠে না মানুষের সারা জীবনে। সেই রাত্তিরে ঘুম এল না রাগীবের। বিছানায় এদিকওদিক করল। দুবার বাথরুমে গেল। জল খেল। তারপর বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পাঁচতলার নীচে কত না বলা কথা নিয়ে একটা শহর ঘুমিয়ে আছে।

    পরের দিন অফিস যাওয়ার জন্য বেরিয়ে চেরাগির বাস ধরল রাগীব। একটা অস্বস্তি ভেতরে যার সমাধান না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। এখনও চেরাগি জাগেনি। পুরানো বইয়ের দোকানদার সবে বইপত্র গুছিয়ে রাখছে। রাগীব বইটা দেখালো। লোকটা ভীষণ বিরক্ত। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল— পুরানো বই ফেরত হয় না। কাগজওয়ালার কাছে কিলো দরে বেচে দেন।

    রাগীব একটা কুড়ি টাকার নোট লোকটার হাতে দিয়ে বলল, চটো কেন কাকা? এই বইটা যার থেকে কিনেছ সেই কাগজওয়ালার ঠিকানা দাও। কতগুলো টাকা লস হলো বলো তো?

    হেমসেন লেনে একটা লড়ঝড়ে বাড়ি। তার একতলায় গোলকের দোকান। বইটা দেখে বলল, এতো জায়গা থেকে বই আসে, মনে রাখা মুশকিল। তবে এই বইটা মনে আছে। একলটে বিশ হাজার টাকার বই বিক্রি করেছিল। কী সব কালেকশন। আসলে আমিও তো সাহিত্যের লোক। হেঁ হেঁ…

    বাড়ির গেটে দারোয়ান আটকাল। ভেতরে শ্বেতপাথরের ঝরনা, গোলাপের বাগান। পুরানো বড়লোক হবে। বইয়ের ব্যাপারে এসেছি বলাতে দারোয়ান প্রায় কলার ধরে বের করে দেয় আর কী! বলল, সাহেব মারা যাওয়ার পর বই কেনার ধুম পড়েছে। আর বই নেই। এবার আপনি আসেন। দুপুরবেলা যত্তসব…

    তীরে এসে তরী ডুববে? রাগীব শেষ চেষ্টা করল। বলল, আমার কিছু টাকা দেওয়ার ছিল। ম্যাজিকের মতো কাজ হল। শহরের মধ্যে এতো জায়গা জুড়ে এরকম বাড়ি আছে, জানা যায় না। তবে ভেতরে এসে এটুকু বোঝা গেল অবস্থা পড়তির দিকে। গোলাপের বাগানে ঘাসের জঙ্গল। ঝরনাতেও বয়সের ছাপ। যে বড় সোফাটায় বসতে দেওয়া হল তারও চামড়া উঠে গেছে অনেক জায়গায়।

    এক ভদ্রলোক এলেন লুঙ্গির কষি বাঁধতে বাঁধতে। রাগীবের আপাদমস্তক মেপে বললেন, বাবার মাথাটা শেষদিকে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বই, ছবির শখে জমানো পয়সা শেষ করে দিল। রক্তের সম্পর্কের কথাও ভাবেনি। একে তাকে বিলিয়ে দিয়েছে। আপনাকে তো আগে দেখিনি কোনদিন।

    রাগীব বলল, দেখুন রাদভাই আমাকে চিনতেন। যামিনী রায়ের ছবি নিয়ে…

    বলার সঙ্গে সঙ্গে লোকটার মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে গেল। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন। তারপর রাগীবের দিকে তাকিয়ে বললেন— তুই সুমাইলা আনজুমের ছেলে নাকি? লজ্জা করে না? রাদ শাহামাতকে ভাই বলছে! শালা, বাজারি মেয়েছেলের রক্ত! এখানে কিসের জন্য? টাকা? এক পয়সাও পাবি না।

    রাগীব চুপচাপ লোকটাকে দেখছে। লোকটা বলেই চলেছে— বাবাকে তখনই বলেছিলাম উল্টোপাল্টা মেয়েছেলেকে কাজে রেখো না। উনি তো নিজের মর্জির মালিক। ভিখারির মেয়ে ছল্লিবাজি করে বাবাকে গাপ করল। বাবার তো তখন ধ্যান, জ্ঞান সব ও। তারপর নিজের খেল দেখাল তো! অত দামী যামিনী রায়ের ছবিটা চুরি করল। ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছি। বাবা কিচ্ছু বলতে পারেনি। তোর সাহস তো মন্দ না। ভাগ এখান থেকে। নাহলে…

    রাগীব শান্তভাবে বলল— নাহলে কী করবেন? চুরিটা সুমাইলা আনজুম করেনি, করেছেন আপনি। আমি ওনার ছেলে নই। কিন্তু এটুকু জানি, উনি আপনার বাবার জন্য যা করেছেন, সেটা আপনার বাবা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মনে রেখেছেন। ছেলে হিসেবে আপনি কিছুই বাবাকে দেননি। ভোগ করেছেন। বাবার ভালোলাগার বইগুলো পর্যন্ত সস্তায় বেচে দিয়েছেন। ওনার এতো শখের যামিনী রায়ের ছবি! দোষটা চাপালেন গরীব মহিলার ওপর। এই অপরাধবোধের ভার নিতে পারেননি রাদ শাহামাত।

    রাগীব ভয় পাচ্ছে না। বরং মনটা ফুরফুরে লাগছে। শুধু একজন অসহায় মহিলার জন্য খারাপ লাগছে। লোকটা একটু থতমত খেয়ে গেছে। ঘাড় ঝুলে গেছে। কোনোমতে বলল, আপনি কে?

    রাগীব বলল, আমার সঙ্গে রাদসাহেবের সম্পর্কটা আপনি বুঝবেন না। শুধু জেনে রাখুন আপনার বাবার এক টুকরো হৃদয় আমার কাছে গচ্ছিত আছে। যা আপনি কখনও ছুঁতে পারেননি।

    রাগীব বাইরে বেরনোর পর মুষলধারে বৃষ্টি নামল।

    @হাসনাতের হস্তাক্ষর

    17
    13 Comments
Skip to toolbar