<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | Fahmida-Reea-Fahmida-Reea | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/fahmida-reea-fahmida-reea/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/fahmida-reea-fahmida-reea/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for Fahmida-Reea-Fahmida-Reea.</description>
	<lastBuildDate>Sat, 06 Jun 2026 13:51:16 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">73b0e150968d257be11b9afd6f959424</guid>
				<title>﻿নিভিয়া বাঁচিল নিশার প্রদীপ



কন্ঠটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। এমন কি ভঙ্গিমাটাও বড্ড পরিচিত। কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে গাছগুলির পরিচর্যা করতে করতে বেডরুম থেকে ভেসে আসা গানে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল বারতা।  থেমে যাচ্ছিল হাত বার বার। সেই ভরাট কন্ঠে  - 
“গোপন কথাটি রবেনা গোপনে
উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে - -”
অনেক দিন পর আজ কেনই বা এমন করে মনে পড়লো ? এতটা বছরে মনের ফুরসত তো মেলেনি বারতার। সেই যে বিয়ের পর কটা মাস শ্বশুর বাড়িতে নতুনের সঙ্গে পরিচিত হতে না হতেই শাশুড়ি মা তোড়জোড় করে বারতাকে স্বামীর কাছে প্রবাসে পাঠিয়ে দিলেন। তার পরের দিনগুলোতো সংসারের অষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাওয়া। বছর গড়ায় সংসার বাড়তে থাকে আর বাড়তে থাকে মধুর ব্যস্ততায় মোড়ানো প্রতিটি ঘন্টা মিনিট সেকেন্ড। একে একে ছেলে মেয়েরা বড় হতে থাকে। 

একসময়  ফেরার সময় হলো। একসাথে কাটিয়ে ফিরলো স্বদেশে স্বগৃহে। সেদিনের বিশাল বাড়িটা তেমনিই আছে। শুধু মানুষগুলি নেই। শাশুড়ি মা গত হয়েছেন কবেই, তিন ভাই আপন আপন গন্ডিতে বাঁধা। আসিফ-বারতা স্মৃতি চারনে প্রায় আবেগ আপ্লুত হয়। 

প্রবাস জীবনের দিনগুলিতে নিজেদের গন্ডিটা ছিল ছকে বাঁধা আর খুব বেশি ঘেঁষাঘেষি। বাচ্চারা অভ্যস্ত হয়েছিল সময়ানুবর্তিতা আর চটজলদি কাজের নির্দেশিকা অনুযায়ী। এরি মধ্যে উইক এন্ডের হুল্লোড়টা ছিল উপভোগ্য। মুক্ত স্বাধীন চার দেয়াল ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে। কখনো বা কোনো সি-বিচের মন মাতানো প্রকৃতিতে, কিংবা দুর পাহাড়ের হাতছানি দেয়া ধু ধু প্রান্তরে, কোনো কৃত্রিম লেকের পাড় ঘেঁষে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য।কখনোবা শুধুই লং ড্রাইভ। এক শহর থেকে আর এক শহরে। একটু আধটু কেনা কাটা। বিভিন্ন দেশের রেষ্টুরেন্টের বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ। আবার কখনোবা শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে স্বদেশির দেয়া পার্টিতে অংশ গ্রহন। প্রাণ খুলে মায়ের ভাষায় কথা বলার তৃপ্তিই আলাদা। 

‘গোপন কথাটি রবেনা গোপনে’ - - গানটি থেমে গেছে অনেক ক্ষণ। কিন্তু রেশটা যেন আছেই। পাশের রিডিং রুমের বইয়ের আলমারির কোন ঘেষে রাখা জলচৌকির ওপর তানপুরাটা। কতগুলো বছর বসা হয়না। ধূলো ঝাড়তে গিয়ে তারে আঙ্গুলের ছোঁয়া লাগে। মনের ভেতর গুন গুনিয়ে ওঠে, রবীন্দ্রনাথ। সুরের আবেশে আবেশিত বারতার মন চলে যায় মনোজ&#039;দার গানের আড্ডায়।

ভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকেই এখানে আসা যাওয়া অব্যাহত রেখেছিল বারতা। পহেলা বৈশাখ, ফাগুন, বর্ষা বরণ, বসন্ত উৎসব আরো কতযে ছুতোয় অনুষ্ঠান হতো বারতাও অংশ নিতো। লেখাপড়ার পালা শেষ হবার পরও প্রাইভেট হোষ্টেলে থেকে বি সি এস কোচিং করবার ফাঁকে ফাঁকে মনোজদার গানও চালিয়ে গেছে বারতা সপ্তাহে একবার করে হাজিরা দিয়ে। 

সেদিন সবার মত বারতারও চোখে পড়লো নতুন সদস্যটিকে। মনোজদারই আবিস্কার। একহারা গড়ন, হাসি হাসি মুখ, গভীর চাহনি আর চমৎকার কন্ঠ। শুনলে মনে হয় বারতার প্রাণের গানগুলি যেন গেয়ে ওঠে। এভাবে কখন কিভাবে মননের সঙ্গে প্রথম পরিচয় বারতার মনে নেই। টিন এজের মোহাচ্ছন্নতা কিংবা লকোচুরির মাদকতার বয়সও ছিলনা সেটা। অথচ মন নিজের অগোচরেই কি এক ভাল লাগার পানে ধেয়ে যাচ্ছিল দ্রুতই। কারন একটাই, রবি ঠাকুর। সেই পুরোনো ভালবাসা। মাত্র তিনটি মাসেই বয়ে চলে ভাল লাগাগুলি মননের কন্ঠের সুর আর গানে। তার ভরাট কন্ঠ যেন বারতার মন বুঝে সুরে সুরে কথা বলে। বারতার মুগ্ধতা মননের অনুভবে অনুরণন তোলে। 

বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। ফিরিয়ে দেয়না বারতা। কথার পিঠে কথা হয়, গানের পিঠে গানও। এক সময় বারতা খেয়াল করে দিন গুলো মননময় হয়ে উঠেছে। ভাবনা জুড়ে শুধুই মনন। সপ্তা শেষে অপেক্ষায় রাখে মনোজদার গানের আড্ডা। ভাললাগা এভাইে এগুচ্ছিল ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকু কথা শুনি’ এই সুরে প্রকৃতির সবুজে নিজেকে হারিয়ে ফেলার অনুভব ছুঁয়ে দেয় কর্ণকুহর। ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুরো হাওয়ায়’, সুরে বারতা ভেসে বেড়ায় বুড়িগঙ্গার বুকে নাও ভাসিয়ে। এমনি করে প্রতিনিয়ত মানস চোখে ভেসে বেড়ায় পাখিদের নীড়ে ফেরা আর সূর্যাস্ত দেখার অনাবিল আনন্দ বারতার দুচোখে। হয়তো বা এভাবেই একটু একটু করে ভালবাসাবাসির কাছাকাছি পৌছেও যেত ওরা। কিন্তু এরি মধ্যে বারতার নিজের ছোট্ট শহরটায় একটা চাকরি জুটে গেল। বাবা তড়িঘড়ি করে খবর পাঠালেন -
গতবার ইন্টাভিউ দিয়ে গেলি যে ব্যাংকে সেটার এপয়েনমেন্ট লেটার এসে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়। 

চাকরিতে জয়েন করে দুটো দিনের জন্য আবার এলো বারতা হোষ্টেলের সিট ক্যানসেলের ফরমালিটিগুলো সারতে হবে। মনোজদার স্বরলিপির খাতাটাও রয়ে গেছে পৌঁছাতে হবে। যদিও বাড়ি থেকে ফোনে মনোজদাকে খবরটা দিয়েছিল বারতা। 

সেই চির চেনা লাল কারপেটে মোড়ানো মেঝেয় বসতেই অনেকের মাঝে একজোড়া চোখের সাথে চোখাচোখি হয় বারতার। বুকের মাঝখানটায় একটু মোচড় দিয়ে ওঠে। আহা এমন দিনগুলো, এক সুরে গলা মেলানো আরতো পাবেনা কোনো দিন। 

- কি হল, হুট করে বাড়ি চলে গেলে যে ? সব ভাল তো ?
স্বভাবজাত হাসিটা ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করে মনন।
বারতা কিছু বলবার আগেই তবলায় চাটি মেরে মনোজদা বলে ওঠেন
- আমাদের বারতাতো এখন সার্ভিস হোল্ডার। রিতীমত জয়েন করে ফিরেছে। হয়ে যাক চা সিঙ্গাড়া।

সবার হৈ হল্লা, ধুমায়িত চায়ের কাপ, হারমনিয়ামের সুর আর ডুগি তবলার দাদরা কাহারবা তাল ছাপিয়ে খুব কাছ থেকে মননের কন্ঠ তার কানে পৌছায় - বারতা
- বলো
- তুমি চলে যাবে সত্যি ?
- যাচ্ছিই তো। নিয়মের গন্ডিতে বাঁধা পড়েছি যে।

কথোপোকথন আর এগোয় না। মনোজদা রিহারসেল করাচ্ছিলেন হঠাৎ বলে উঠলেন
- বারতা, প্রাকটিসটা রেখো। আশির্বাদ থাকবে সব সময় তোমার জন্য।

এবার মননের দিকে তাকিয়ে বললেন
- মনন তোমার ডুয়েটের পার্টনার বারতার স্থলে কাকে নেয়া যায় বলোতো, অনুষ্ঠানের দিনও তো ঘনিয়ে এলো। 

মননের জবাবটা শোনা হয়না বারতার। তার আগেই নিরাদির ডাকে ওপাশটায় গিয়ে বসে বারতা। একে একে বিদায় পর্ব সারা হয় সবার সাথে। হাত ঘড়িতে সময় দেখে, বেলা পড়ে এসেছে। হোষ্টেল গেট বন্ধ হবার আগেই পৌছুতে হবে। 

উঠে দাঁড়ায় বারতা। মননের অঙ্গুলে হারমনিয়মের রিডগুলো সুর তুলছে মনোজদা তবলায় ঠুক ঠুক করে তাল ঠিক করতে করতে বলেন
- কই, ধরো।
‘গোপন কথাটি রবেনা গোপনে 
উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে’

মননের ভরাট কন্ঠ বারতার পা দুটোকে তখনই যেতে দেয়না। প্রতি বারের মত এবারও অপলকে গানটা শোনে বারতা। মনটা ভিজে ওঠে। দলা পাকানো একটা কষ্ট গলায় আটকে যায়। কথা সরেনা। এগোয় হোষ্টেলের পথে। পায়ে হাঁটা দুরত্ব।

হঠাৎ খেয়াল করে পাশে মনন
- না বলেই চলে এলে যে ?
মনন ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে।

না তাকিয়েই জবাব দেয় বারতা
------ কিছু বলার থাকলেতো 
------ শোনার ও কি কিছু নেই ?

বারতা কিছু বলেনা, মননও চুপ করে যায়। দুজনেই পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। হোষ্টেল অবধি এগিয়ে দিয়ে যায় মনন। সন্ধ্যার আধো আলো ছায়ায় হোষ্টেল গেটে ঢুকে পিছন ফিরে তাকায় বারতা। মনন স্থির, অবিচল দাঁড়িয়ে। এগুবার চলৎশক্তি নেই আর। সীমানা এপর্যন্তই। হাত নাড়ে বারতা, হাত উঠায় মননও। লাইট পোষ্টের আবছা আলোতে কেউ কারো চোখ ভরা নোনা জল দেখতে পায় না, হয়তো অনুভব করে তপ্ত অশ্রুর গড়িয়ে পড়া।


দিন গড়িয়েছে দিনের নিয়মেই। যখন গুছিয়ে বসার অবকাশ মিললো তখনি ঘটলো ঘটনার ঘনঘটা। 

অফিস থেকে ফিরেই দেখে একেবারে অন্দর মহলে দুজন অতিথি। একজন মায়ের বান্ধবি সেতু খালা অন্যজন উনার বড়বোন। রাজশাহী থেকে এসেছেন বারতাদের বাড়ির পাশের আইডিয়াল ক্লিনিকের নতুন জয়েন করা ডাক্তার সুজানাকে দেখতে। 

গিয়ে দেখেন সিনিয়ার সার্জেনের সাথে ওটিতে ঢুকেছে সুজানা। সাতটার আগে বেরুবে না। সেতু খালারা তাই সময়টুকু কাটাতে মার কাছে এসেছেন। বারতার সাথে পরিচয় হয় সেতু খালার বড় আপার। উনার প্রবাসী ছেলের জন্যই এই সুজানাকে দেখতে আসা। বারতা অফিসের পোষাক পালটিয়ে ফিরে আসে ছোট্ট ট্রেতে দু’গ্লাস লেবু শরবত নিয়ে। গ্লাস দুটো উনাদের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলে
- একটু শীতল হন। যা গরমটা পড়েছে দুদিন থেকে। আপনাদের খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

সাইড টেবিলের ফ্যানটা অন করে দিয়ে বলে
- সাত বাজতে এখনো দেরি আছে। আপনারা পা তুলে রিলাক্স করে বসেন তো খালা। 

খালারা সত্যিই পা তুলে বসলেন আয়েস করে। শরবতটা খেয়ে হাতের গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে সেতু খালার বড় আপা বললেন
- খুব ভালে লাগলো মা। অনেক দোয়া তোমার জন্য।

ব্যস্ এপর্যন্তই। দিন তিনেক পরে সেতু খালা আবার হাজির তবে একা। মা হেসে বললেন
- সেদিন শেষ পর্যন্ত মেয়ের দেখা পেয়েছিলি ? পছন্দ হল বড় আপার ? 
- হল, তবে সেই মেয়েকে নয়। 
- কেন ?
- কারণ সেই মেয়েকে তো সেদিন বড় আপা আর দেখতেই গেলেন না। তোর এখান থেকে বের হয়ে বললেন “ও মেয়ে দেখে আর কাজ নেই। মেয়ে আমার পছন্দ হয়েই গেছে। ওর বাবা মায়ের অমত না থাকলে বারতাকেই আমি ছেলের বৌ করবো।”

সেতু খালা ভুমিকা ছাড়াই এক নাগাড়ে বলে ফেললেন কথা কটি। মা বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে বললেন
- কিন্তু তুই যে সেদিন বললি উনি পরমা সুন্দরী সেই ডাক্তার মেয়েকে দেখতেই সুদুর রাজশাহী থেকে এসেছেন। 
সেতু খালা হাসতে হাসতে বললেন
- তাইই তো এসে ছিলেন। কিন্তু বারতার লেবু শরবতের শীতলতায় আর ঐযে পা তুলে বসতে বলার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে বড় আপা বললেন - “সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিরে সেতু। বারতার শ্যামা রঙা অতি সাধারণ চেহারার মাঝে অন্তরের অপার সৌন্দর্য্যটা আমি দেখতে পেয়েছি।”

মা আমতা আমতা করে বললেন - কিন্তু ছেলে ? ছেলের মতামত লাগবে না ? দেখবেনা মেয়ে ?

- আসিফ তো এখন আমার বাসায়। গত কালই এসেছে। অফিসে গিয়ে আজ বারতাকে দেখেও এসেছে। যদিও মায়ের পছন্দই ওর পছন্দ। তবুও মায়ের অনুরোধে কথা রেখেছে। এখন তোদের মতামত পেলে ‘ঘরবর’ দেখার ব্যবস্থা করি।
সময় স্বল্পতার মধ্যে সবই হল। বাবা এক পর্যায়ে বারতাকে কাছে ডেকে বললেন

- তোর মতটাও যে জানা দরকার মা। অন্য কোথাও পছন্দ নেই তো ? 

বারতার মনের মাঝে মননের মুখটা উঁকি দেয়, কোথায় যেন একটা অব্যক্ত ব্যথা জাগে। কিন্তু কি বলবে। মননের ভরাট কন্ঠের গান ছাড়া আর তো কিছু শোনা হয়নি। জীবনের চরম বাস্তব ক্ষণে মননের প্রসঙ্গ নিতান্তই অবান্তর। আর তখনি মাথা দুলিয়ে সম্মতিটা জানিয়ে দেয় বারতা। 

অজস্র বেলি ফুলে ছাওয়া নীল গাড়িটা থেকে আসিফের পাশে পাশে বিশাল বাড়ির আলো ঝলমল বিশাল গেটটা পেরুতে না পেরুতেই অপরিচিতদের ভিড়ে একটা পরিচিত মুখ দেখে স্বস্তি পেল বারতা। পরক্ষণেই মনে পড়লো, এযে সেতু খালার বড় আপা। আমারই শাশুড়ি মা। 

হ্যাঁ, আসলেই তিনি বারতার ভরসা স্থল হয়েছেন দিনে দিনে। ছেলের স্বল্পকালীন সময়টার পুরোটাই গুছিয়ে দিয়েছেন দুজনার জন্য। ছোট্ট সময়টুকুতে ফিরানি কিংবা স্বজনদের ভিড় থেকে আলাদা করে রেখেছেন দুটিকে, পাঠিয়েছেন সাজেকের উড়াল মেঘের নির্জনতায়। 

কটাদিন স্বপ্নের মত সঙ্গ দিয়ে একদিন উড়াল দেয় আসিফ কিন্তু মন খারাপের অবকাশ দেননি এই স্নেহময়ী শাশুড়ি মা। আগলে রেখেছেন শত কথার ফল্গুধারাতে। আসিফের শৈশব কৈশোর চিনিয়েছেন, পছন্দ অপছন্দ জানিয়েছেন আর হাতে কলমে শিখিয়েছেন ছেলের ভাল লাগার রান্না। পালং পাতা দিয়ে ইলিশ মাথা কিংবা সর্ষে ইলিশের নানা পদ, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর মুরগির মঞ্জুরী। 

ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতালার পুরোটাই তিন ছেলে, বৌমারা, পাঁচ পাঁচটে নাতি নাতনিকে নিয়ে শাশুড়িমার সরগরম অবস্থান। নিচে ঢালাও গ্যারেজ পেরিয়ে লিভিং রুম কিচেন ষ্টোর আর খোলা মেলা ডাইনিং। পাশে লাগোয়া গেষ্টরুম, এককোনে সার্ভেন্ট রুম। ভেতরের সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় ওঠার পরই খানিকটা জায়গা খোলা আকাশের নিচে খোলা হাওয়ায় চমৎকার সব রংবাহারী ফুল আর পাতা বাহারের টবের সারি।

শাশুড়ি মার শখের বাগানের দায়ীত্ব অভ্যাস বশত বারতাই লুফে নেয়। ছোট্ট টিনের ঝর্ণার পানিতে গাছগুলোকে ভিজিয়ে দেয় গুন গুন সুরে। “আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে / দিন ও রজনী কত অমৃত রস উথলি যায় অনন্ত গগনে- - -।”

এরপর থেকে যে কদিন শাশুড়ির কাছে ছিল বারতা, গান না শুনিয়ে উপায় ছিল না। বড় জায়েরাও কখনোবা জোছনা রাতে রিতী মত আসরের আয়োজন করে ফেলতো। এত দ্রুত একের পর এক সব ঘটতে থাকে বারতা তাল মিলাতেই হিমশিম খায়।

তিন মাসের মাথায় আসিফের কাছে যাবার সব কাগজপত্র রেডি হয়ে যায়। শাশুড়ি মার হাত থেকে টিকিটটা নিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে বারতা। বলে
- আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা আপনাকে ছেড়ে যেতে। 
শাশুড়ি মা বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু এঁকে বললেন
- পাগলি মেয়ে কষ্ট কিসের। আমার তো আনন্দ হচ্ছে। আসিফটা আর একা থাকবে না। বড্ড ছেলে মানুষ আসিফ। ওকে তুমি দেখ বৌমা। আর মনে রেখ ওর মনটা একটা সাদা কাগজ। কোনো দাগ নেই। যে আঁচড়টা কাটবে সেটাই থাকবে। 

দীর্ঘ প্লেন জার্নি শেষে এয়ারপোর্টের হাজারো ফরমালিটি সেরে বেরিয়ে এলো যখন বারতা, ভিন দেশি মুখগুলোর ভিড়ে আপন মানুষের মুখটা চিনবেতো সংশয় জাগলো মনে। মাত্র এগারো দিনের পরিচয়।
মুহুর্তের মধ্যেই হাতে হাত রেখে মুখোমুখি দাঁড়ালো আসিফ জনসমক্ষে। প্রথমটায় চমকে উঠলেও পর মুহুর্তে স্পর্শে শিহরিত হলো বারতা আবার নতুন করে। ড্রাইভিং সিটে বসা আসিফের পাশে বারতা যেন সব কথা খুইয়ে বসে আছে। এই কমাসের জমানো একটা কথাও মনে পড়ছেনা বারতার।

আসিফ বলেই চলেছে অনর্গল। ভাললাগার আবেশ জড়ানো বারতার মনটা কতক শুনছে আর কতক সময় হারিয়ে যাচ্ছে পথের দুপাশের নতুন নতুন দৃশ্যপটে। 

ছোট্ট বাংলো টাইপ বাসা। সবুজ গালিচার মত বিছানো বাড়িময় কার্পেট। বেডের পাশে সাইড টেবিলে রাখা মস্ত ফ্লাওয়ারভাসে নাম না জানা ফুলের চমৎকার তোড়া। আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল বারতার জন্য। গমগমে কন্ঠে রেকোর্ডারে বেজে উঠলো
- “যেমন আছো তেমনি এসো আর করোনা সাজ/ বেনি না হয় এলিয়ে রবে সিঁথি নাহয় বাঁকা হবে/ নাইবা হল পত্রলেখায় সকল কারুকাজ- - ”

ধপ করে বেডে বসে পড়লো বারতা, পাশে আসিফও। নিমগ্ন দুজনেই। কখনযে বারতার হাত আসিফের হাতের মুঠোয় চলে গেছে টের পায়নি বারতা। আবৃত্তিটা শেষ হতেই আসিফের চোখের তারায় বারতা চোখ রাখে। আসিফ পড়ে ফেলে বারতার মুগ্ধতার দৃষ্টি। 

- ফোনে মা প্রায়ই বলেন তুমি রবীন্দ্রনাথ ভালবাস খুব। রবীন্দ্রনাথের গান গাও। কিন্তু আমি নিজেতো গাইতে জানিনা। শুরু করলাম রবীন্দ্রনাথকে খোঁজা। পেয়েও গেলাম ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়ের সময়োপযোগী এই আবৃত্তি খানি। নিজেও চমৎকৃত হলাম। মজার কথাকি জান, তোমার জন্য গান বাছতে গিয়ে আমি নিজেই একজন ভক্ত বনে গেলাম রবীন্দ্রনাথের। অভিভুত হয়ে যাই প্রতিটি গানের চরনে।

হঠাৎ আসিফের চোখে চোখ পড়তেই বারতার কন্ঠ থেমে দৃষ্টি আনত হল। নিজেকে সঁপে দিল আসিফের বিশাল বুকটিতে, প্রগাঢ় আলিঙ্গনে। 

ক্রিং ক্রিং ক্রিং নিচের লিভিং রুমে টেলিফোনের একটানা শব্দে বারতার ভাবনায় ছেদ  পড়ে। ফিরে বর্তমানে। সচকিত হয়ে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভাঙ্গে বারতা
- হ্যালো
- বারতা আমি কাজে আটকা পড়ে গেছি, দেরি হবে একটু। তুমি খেয়ে নিও।
- অসুবিধে নেই, তুমি কাজ সেরে এসো। ছেলেমেয়েরাও কেউ ফিরেনি। সবাই এলে একসাথে খাবো। বুয়া টেবিল রেডি দিয়েই রেখেছে।
- ও, কে।

হঠাৎ খেয়াল হল টেলিফোনের পাশে একটা নতুন সিডির মোড়ক। হাতে তুলে চোখ বুলাতেই “নীরব নয়নে ” শিরোনামের রবীন্দ্র সঙ্গীত, শিল্পী মনন রায়হান। 
স্থানুর মত বসে থাকে বারতা। নড়বার শক্তিটুকুও যেন হ্রাস পেয়েছে। তার ধারনা এতোটা সঠিক। এতটাই ! 

মনন তার মনের নিভৃতে এভাবে বিচরণ করে। এতটা বছর সেতো তার সুখের খিল দেয়া ঘর থেকে একটুও পিছন ফিরে তাকায়নি। টের পায়নিতো এমন বিচরণের। 

সন্ধ্যার পর ছেলেমেয়েরা যেযার ঘরে পড়াশুনায় ব্যস্ত। এসময়টা বারতা আর আসিফ নিজেদের মত করে সময় কাটায়। আসিফও সাধারনত এসময়টাতে কোনো কাজ রাখেনা। বেডরুমের লাগোয়া দক্ষিণের ব্যালকুনিতে দোলুনি চেয়ারে গা এলিয়ে পেপার পত্রিকা পড়ে। বারতার সাথে কোনো বিষয় নিয়ে বিচার বিশ্লেষন করে। কখনো বা একমত কখনোবা দ্বিমত পোষণ। তাতে কিছু যায় আসেনা। আলোচনা শেষ, মতামতও শেষ। 

আজ বারতা একটু অন্য মনস্ক। আসিফ কথা বলতে বলতে হঠাৎ খেয়াল করে
- বারতা এমন ভুল তো তোমার হয়না।
- কি ?
- এখনো বুঝতে পারছোনা ?
- না 
- তোমার রবি ঠাকুর নেই যে আজ, ভুলে গেছ ?
- উঁহু 
- তবে ?
- একটা কথা আছে তোমার সাথে।
- কত হাজারোটা কথা বলে চলেছ আজ বিশটা বছর ধরে, আর এখন অনুমতি একটা কথার জন্য ?
হাসতে হাসতে বলে আসিফ
- “বি সিরিয়াস” আসিফ।
- সিরিয়াস
মুখোমুখি বসলো আসিফ। বারতা সিডির মোড়কটা এগিয়ে ধরলো আসিফের চোখের সামনে। মনন রায়হান। আসিফ নেড়েচেড়ে বললো
- কাল তো এই সিডিটাই আনলাম। নতুন শিল্পী, শুনলাম ভালই গায়।
- নতুন নয় তো, বিশ বছর আগের চেনা কন্ঠ। 
- তাই নাকি ? তোমার গানের দেশের কোনো চেনা বন্ধু ?
- মনন আমার বন্ধু ছিলনা। 
শান্ত কন্ঠে জবাব দেয় বারতা।
হেসে বলে আসিফ।
- শত্রুও নয় নিশ্চয়।
- আমি দিনে যখন গানগুলো শুনছিলাম তখন শিল্পীর নাম জানা ছিলনা। কিন্তু ঐ কন্ঠই আজ বহুদিন পর মনন রায়হান কে মনে করিয়ে দিল। বারতার কথা কেড়ে নিয়ে সেই চিরাচরিত উৎফুল্লতার সুরে বললো আসিফ
- এক সময় খুব ভালবাসতে এর গান তাইতো।

গানের দেশের মানুষেরা কল্পনার জগতে বাস করতে ভালবাসে। নানা রঙের দিনগুলিতে বিচরণও করে। আর এটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ যেমন চলছিল, চলবে।
- আর কিছু শুনবেনা ?
- জানিই তো ?
- কি জানো ?
- হয় তুমি না হয় সে, যে কোনো একজনের অথবা দুজনের কারনেই তোমাদের পথ দুদিকে বেঁকে গেছে, ঠিক বলেছি ?

বারতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন রাখে আসিফ।
- ঠিক। তোমার রাগ হচ্ছেনা ?
- নাহ্। লাভবান হয়েছিতো আমি। কারন মনন তোমার ভাল লাগা, গানের জন্য আর আমি তোমার ভালবাসা সারা জীবনের জন্য। যুক্তিটা কি ঠিক হল ?

জবাব দেয় না বারতা। অপলকে তাকিয়ে থাকে আসিফের মুখের দিকে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে আসিফ এত বেশি সহজ করে দেয় মুহুর্তে যেন “সহজই সুন্দর” এর চেয়ে সত্যি আর কিছু হতে পারেনা।
বারতার নৈশব্দতাকে ভেঙ্গে দিয়ে আসিফ হো হো করে হেসে ওঠে, বারতার চিবুক তুলে ধরে 
- কি হল তোমার ভান্ডারে শব্দের চাষ নেই যে।

কথাকটি বারতার কানে পৌছুলো কিনা বোঝা গেল না। তার সারা মন জুড়ে যে অস্বস্তির আঁধার চেপে বসেছিলো, আসিফের কথার আবেশে যেন আঁধার কেটে উষার আলোতে  সবকিছুকে সহজ আর সুন্দর মনে হতে লাগলো। অনেকদিন আগে গাওয়া রবিন্দ্রনাথের  ঐ গানটির চরণ ঘুরপাক খেতে থাকলো বারতার মনের গহীনে,
“নিভিয়া বাঁচিল নিশার প্রদীপ / ঊষার বাতাস লাগি............. 

এবং বিশ বছর পর আবারো অনুভব করলো বারতা সেদিনের মতই আঁধার কেটে যাওয়া ঊষার বাতাসের স্বস্তিটুকু।

---------------------
ফাহমিদা রিআ
--------------------</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/204346/</link>
				<pubDate>Mon, 28 Aug 2023 14:42:53 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>﻿নিভিয়া বাঁচিল নিশার প্রদীপ</p>
<p>কন্ঠটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। এমন কি ভঙ্গিমাটাও বড্ড পরিচিত। কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে গাছগুলির পরিচর্যা করতে করতে বেডরুম থেকে ভেসে আসা গানে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল বারতা।  থেমে যাচ্ছিল হাত বার বার। সেই ভরাট কন্ঠে  &#8211;<br />
“গোপন কথাটি রবেনা গোপনে<br />
উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে &#8211; -”<br />
অনেক দিন পর আজ কেনই বা এ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-204346"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/204346/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">3d6d97d96e82b32ae6d38b60f3f5f1a5</guid>
				<title>﻿অবসান


বাড়ির নাম্বার মিলিয়ে নিশ্চিত হয়ে এবার ডোর বেলে পরপর দুটো চাপ দিয়ে মিনা আর মেঘ মুখোমুখি দাঁড়ায়। চোখে চোখ রাখে।
- মেঘ
- হুঁউ
- তোমার কি খুব নার্ভাস লাগছে ?
- একটু একটু।
ঠিক এমনি সময় ঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন স্নিগ্ধ সুন্দর মায়াবী চেহারার পঞ্চাশ পেরুনো এক মহিলা। নীল পেড়ে ঘিয়ে রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি পরনে। দুহাতে দুগাছি চুড়ি, গলায় হালকা চেইনের সাথে ছোট্ট লকেট ঝোলানো।  ঢেউ খেলানো কোঁকড়া চুলগুলোতে মাঝে মাঝে রূপালি আভা। ছিপছিপে গড়ন, বয়সের বাড়তি মেদের বাহুল্য নেই এতটুকু। বিস্ময়মাখা চোখের দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন
- কে ? কাকে চাই ?
মিনার সালাম জানিয়ে বললো
- এখানে কি সিতারা বেগম থাকেন ?
- আমিই সিতারা
দুকদম এগিয়ে এলো মিনার
- আমরা ঢাকা থেকে আসছি। শুধু আপনার সাথে দেখা করবো বলে। 
- কোনো প্রয়োজন ?
আমতা আমতা করে বললো মিনার
- ভেতরে বসে বলি ?
আর একবার তাকালেন সিতারা মিনারের দিকে। দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেই বললেন
- আসুন।
সাজানো গোছানো ছোট্ট ঘরটির দেয়াল ঘেসে
এক সেট সোফা আর অনতি দুরে একটা ডিভান। সেন্টার টেবিলে রাখা ছোট্ট ফুলদানিতে কয়েকটি সাদা ফুলের গুচ্ছ। 
ওদের মুখোমুখি বসলেন সিতারা বেগম। মিনার অবাক বিস্ময়ে মেঘের নীরবতা দেখছে। মাথা নিচু করে ওড়নার কোনে আঙ্গুল জড়িয়ে চলেছে। অথচ এই সিতারা বেগমকে খুঁজে পাওয়ার জন্য কি ব্যতিব্যস্তই না করেছে মিনারকে প্রতিটা দিন। এবার চোখ তুলে চাইলো মেঘ।
সিতারা বেগমও যেন বাকহারা হয়ে পড়েছেন। মেঘের  সামনে বসে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে দেখছেন শুধু। মিনার মৌনতা ভেঙ্গে বললো মেঘকে উদ্দেশ্য করে
- সময় কিন্তু হাতে বেশি নেই। ফিরতি ট্রেনেই আমরা যাবো। 
ঘোরটা কেটে যায় সিতারা বেগমের। ভ্রু কুঁচকে তাকান মিনারের দিকে কথার জের লক্ষ্য করে। মিনার আবার বলে
- ঠিকানাটা খুঁজতে বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। তাই সময়ের কিছুটা অপচয়। আমার ভুমিকা এপর্যন্তই। এবার মেঘের পালা। সিতারা বেগমের মলিন নিস্প্রভ চোখদুটি মুহুর্তে ঝলমল করে উঠলো। 
- মেঘ !!!
একাধারে নিশ্চুপ থাকা মেঘের ঠোটের কোনে এবার বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। ধীর কন্ঠে বললো 
- হ্যাঁ মেঘ, ইমরান কন্যা মেঘ, মীর্জাপুরের মেঘ। অনেক অনেক বছর আগে যাকে পায়ে মাড়িয়ে চলে এসেছিলেন। সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে কতটা সুখে আছেন দেখার বড্ডো সাধ ছিল। দেখলাম।
সিতারা বেগমের চোখদুটো মেঘের ভর্ৎসনায় ম্লান হবার বদলে আনন্দে চকচক করে উঠলো। ত্বরিতে উঠে দাঁড়িয়ে মেঘের চিবুক তুলে অপার আনন্দে বলতে লাগলেন
- মেঘ, এসেছিস। আমি তো এদিনটির অপেক্ষাতেই ছিলাম। এতো বড়টি হয়ে গেছিস। 
মেঘের বুকের ভেতরের জমানো কষ্টগুলো যেন গলে গলে পড়তে চাইছে সিতারা বেগমের স্নেহের স্পর্শে। লুটিয়ে পড়তে চাইছে মুখটি সিতারা বেগমের বুকের মধ্যে। অনেক কষ্টে সংবরণ করলো নিজেকে। না, এতো অল্পতে হেরে গেলে চলবে নাতো। তার পঁচিশ বছরের বিড়ম্বনা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য এক নিমিষেই উবে যেতে দেয়া যাবেনা। মেঘ কিছেুতেই ভুলবেনা, ভুলতে চায়না। ঠোঁটে দাঁত চেপে ঢোক গিলে গলায় অটকে থাকা কষ্টের দলাটাকে আবার বুকে ভেতর রেখে দিল। চিবুক থেকে সিতারা বেগমের হাতটি সরিয়ে দিতে দিতে বললো
- এমন স্নেহের স্পর্শে আমি অভ্যস্ত নই। 
এরপর হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে মিনারকে তাড়া দেয়
- এবার চলো ফিরতি ট্রেনটা ধরতে হবে যে।
সিতারা বেগমের দুচোখে অঝোর ধারা নামে। কাঁপা কন্ঠে অনেক কষ্টে উচ্চারণ করেন
- এই কটি মুহুর্তে আমার সুখের পরিমাপ কি সত্যি করতে পারলি মেঘ ? ভিতর থেকে ঠেলে আসা উত্তেজনায় ঘেমে নেয়ে উঠেছে মেঘ ততক্ষণে। সিতারা বেগমের প্রশ্নকে পিছনে ফেলে বেরিয়ে আসে দ্রুত। তারচে দ্রুত গতিতে এসে পথ আগলে দাঁড়ালেন সিতারা বেগম কান্না ভেজা কন্ঠে বললেন
- প্রশ্ন যখন করেছিস তার জবাব না নিয়েই চলে যাবি ? আমি তো তা হতে দিতে পারিনা মেঘ।
মেঘ কিছু বুঝে উঠবার আগেই এক রকম হ্যাঁচকা টেনেই ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলেন সিতারা বেগম। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে মিনারও তাদের অনুসরণ করলো উপায়ান্তর না দেখে। হালকা চাদর গায়ে শুয়ে আছেন বিছানায় কোনো একজন। চারপাশের পরিস্থিতি দেখে সহজেই ধারনা করা যায় তিনি অসুস্থ। শরীরের বিভিন্ন অংশে নলের সংযোগ। পাশের সেলফগুলিতে বিভিন্ন ডাক্তারি সরঞ্জাম সাজানো যেন ছোটখাটো একটি ক্লিনিক। সিতারা বেগম নিশব্দে চোখ মুছলেন শাড়ির আঁচলে। সামনের সোফাটা দেখিয়ে বসতে ঈশারা করলেন। বললেন
- মেঘ তুই আমার কাছে আজ যে কৌতুহল নিয়ে ছুটে এসেছিস আমিও একদিন এই মানুষটির জন্য ছুটে এসেছিলাম অন্তরের তাড়নায় আর কর্তব্যবোধে। পঁচিশটা বছর তোর অপেক্ষা আর আমার অপেক্ষা একই। শুধু প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। 

মিনার মন্ত্রমুগ্ধের মত সিতারা বেগমের ফেলে আসা দিনগুলির কথা শুনতে শুনতে নিজেও ফিরে যায় সেই দিনগুলিতে যখন থেকে সে মেঘকে চিনতে শুরু করেছিল।
ভার্সিটিতে ফাইনাল ইয়ার তখন আর দশটা ক্লাশমেটের মত মেঘও ছিল একজন। ভার্সিটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যে প্রকৃতিকে ভালবেসে দল বেধে উঁচু টিলা বা শাপলা ফোটা পুকুরের ঘাটলায় হামেসা আড্ডায় মেতে উঠতো ওরা। কখনো বা মুক্ত মঞ্চের বিশাল খোলা আঙিনায় বন্ধুদের সাথে বাদামের খোসা ভাংতো কোলাহলে মুখরিত হতে হতে। 
ফাইনাল পরীক্ষার আগের কটি মাস ক্লাশ সাসপেন্ড। দল ছুট হয়ে মুখ বুজে পড়া আর পড়া। গ্রুপের সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছিল মিনার। নোট আর প্রশ্ন সিলেকশান করতে গিয়ে দেখে অগোছালো, অসম্পূর্ণ। সিলেবাস মিলাতে গিয়ে টের পায়  ফোর্থ পেপার তো বেমালুম হাওয়া। একটা নোটও তেমন ভাবে তৈরি নেই। চাঁদির চুল খাড়া হবার জোগাড়। পরদিন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী। বই ঘাটতে ঘাটতেই দিন পার। চোখে সরষের ফুল। অনুপ, শাহিদ, রত্না, জয়ন্ত কাউকেই পাওয়া গেলনা হলে। সবাই নোট পত্র গুছিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান নিয়েছে। মায়ের হাতের রান্না আর যত্ন আত্তিতে আয়েস করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে বলে। মিনারের মেজাজটা খিচিয়ে ওঠে -
ধুত্তোরি তার কপালে হলের প্লেট ধোয়া ডাল আর কড়কড়ে ভাতই বরাদ্দ। ঐ খেয়ে খেয়েই পেটে চড়া ফেলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে, নাহয় সব ছেড়ে ছুড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে গ্রামের বাড়ি রওনা। এসব ভাবতে ভাবতেই আনমনে হলের দিকে যাচ্ছিল মিনার। 
- এই মিনার, দাঁড়া।
পেছন থেকে চেনা ডাক এবং হাতে চাঁদ পাওয়ার মতই তড়াক করে ঘুরেই চিৎকার।
- মেঘ তুই ? এখনো হলে আছিস, বাড়ি যাসনি ? 
- কেন দেখে চিনতে পারছিসনা ?
- কথা পেঁচাসনা মেঘ, খুব বিপদের মধ্যে আছি।
ভ্রু বাঁকিয়ে মেঘ তাকায় মিনারের মুখের দিকে। এবার সত্যি সত্যি সিরিয়াস হয়। লাল সুরকি বিছানো পথ থেকে সবুজ গালিচা মোড়া ঘাস মাড়িয়ে আর একটু এগোয়। ছায়া সুনিবিড় গাছ গাছালির এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে জুটিরা কিংবা বন্ধুদের নিয়ে অনেকে। কড়ই চাতালটা ফাঁকা দেখে নিজে বসে পড়লো মেঘ। 
- মিনার বস। এবার শুনি কি সব বিপদ টিপদ বলছিলি।
মিনার বাধ্য ছেলের মত পাশে বসে হাতের ফাইল খুলে সিলেবাসটা মেলে ধরলো। যার বেশির ভাগ চ্যাপ্টারের পাশে লেখা “অসম্পূর্ণ”। মেঘ দুচোখ কপালে তুলে বললো
- করেছিস কি এতদিন ? 
- জ্ঞান দিবিনা মেঘ। পারলে নোট পত্র দে। ফটো কপি করে নেব। নাহলে চল্লাম গ্রামে চাষাবাদ করে খেতে হবে। 
মিনারের বলার ভঙ্গি দেখে মুখটিপে হাসে মেঘ
- আহা কি আবদার।
এরপর প্রায়ই ওদের দেখা হয়, কখনোবা প্রতিদিনই। মেঘের রুমমেট দুজন চলে যাবার পর পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে যে একাকিত্বে মেঘের দিনগুলি কাটছিল, মিনারকে পেয়ে তা যেন পুষিয়ে গেল। শুধু পুষিয়েই গেলনা, এক সময় ওরা দুজনেই আবিস্কার করলো - দিনে অন্তত একবার দেখা না হলে মনটা বড় উচাটন থাকে। আর কি আশ্চর্য একটানা খাটাখাটুনির পর মিনার কিছুদিনের মধ্যে পড়াশোনার গতিটা মেঘের কাছাকাছি করে ফেললো। যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি বিষয়ের ওপর নতুন নোটগুলি পেল চমৎকার আঙ্গিকের ধারা। 
সেদিন লাইব্রেরীর সিঁড়িতে বসে একটা বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মিনার হঠাৎ উল্লসিত হয়ে বললো
- আর ভবনা নেই। মেঘ চল বাড়ি ঘুরে আসি। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলে তো ম্যারাথন চলবে।  মেঘ ব্যাগের নোটগুলো গুছাতে গুছাতে বললো
- এমন ভাবে বলছিস যেন তোর আমার একটাই বাড়ি।
- কথাতো সেটা নয়। যে যার বাড়ি গিয়ে গুরু জনের দোয়া নিয়ে আসি। 
- তুই ঘুরে আয় মিনার।
- আশ্চর্য তুই যাবিনা ?
- নাহ্ , দোয়া ছাড়াই যখন এতোদুর এসেছি বাকিটাও যেতে পারবো।
পরে মিনার সব জেনেছে মেঘের কাছ থেকে একে একে। মেঘের বাড়িতে আছেন বাবা, বিমাতা আর বৈমাত্রেয় দুটি ভাই বোন। সেই ছোট্টটি থেকে সৎ মায়ের অবহেলা বিরক্তি আর অযত্ন সাথে করে বড় হয়েছে মেঘ। বাবা সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে এড়িয়ে চলেছেন। মাস শুরুতে টাকা পাঠান আর মাস শেষে মেঘ চাহিদার কথা জানায়। বাবা মেয়ের সম্পর্ক এতেই সীমাবদ্ধ। ঈদ পার্বনে কিংবা অঘোষিত ছুটির ঘন্টায় হল ভ্যাকেন্ট হয়ে গেলে মেঘ বাড়ি যেতে বাধ্য হয়। গাত্র দাহ শুরু হয় সৎ মা এবং ভাই বোনদের। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সময়গুলো অতিবাহিত করে মেঘ। এক সময় ফিরেও আসে তার একার ঠিকানায়। এই হল মেঘের বর্তমান জীবন নামচা। ধীরে ধীরে মিনার দূর্বল হয়ে পড়ে মেঘ নাকি মেঘের কষ্টের জীবনটার প্রতি। এক সময় অনুভব করে মেঘও পরম নির্ভরতায় তাকে আঁকড়ে ধরেছে অবচেতনে। 
পরীক্ষা শেষ হয়। এবার ফেরার পালা। না, ঐ যন্ত্রনা পুরিতে আর ফিরতে চায়না মেঘ। ফিরতে দেবেনা মিনারও। খুব সাধারণ ঘরের ছেলে মিনার। টিউসনি করে নিজের খরচ চালায়। গ্রামে মামাদের সংসারে থাকা বিধবা মায়ের হাতে কিছু গুঁজেও দেয় উদ্বৃত্ত থাকলে। মিনার মেঘের সম্পর্কটা বন্ধু মহলে রাষ্ট্র হয়ে গেলে ওদের সহায়তায় একটা বিদেশি কম্পানিতে চাকরি জুটে যায় মিনারের পরীক্ষার পরপরই। কোর্ট ম্যারেজটাও চট জলদি সেরে ফেলে। আবাসনের সমাধান হয়ে যায় একই ছাদের নিচে। রেজাল্টের পর চাকরিতে আর এক ধাপ উন্নতি। আরও একটু বাড়তি সুখ আরও স্বাচ্ছন্দ্য। একটু একটু করে সংসারটা সেজে ওঠে। তারপর একদিন আরও নতুন কিছু নতুন খবর। রিপোর্টটা হতে নিয়ে মিনার খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। মেঘের কানের কাছ মুখ অথচ চিৎকার করে বলে ওঠে 
- “মেঘ তুমি মা হচ্ছো !”
মেঘও মিনারের কানটা টেনে ফু দিয়ে বলে
- আর তুমি বাবা।
হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ে দুজনে। “নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়” এভাবেই কাটছিল দিন। কিন্তু নতুন খবরের আগমনে মেঘের শরীরটা আজকাল ভাল থাকেনা, তার চেয়েও ভাল থাকেনা মন। মিনার যতটুকু পারে শাসনে সোহাগে সঙ্গ দিয়ে মেঘের কষ্টগুলো শেয়ার করতে চেষ্টা করে। কিন্তু মেঘ বদলে যেতে থাকে একটু একটু করে। ছুটির দুপুরে পাশ ফিরে মেঘ শুয়েছিল চুপচাপ। বালিশে ছড়ানো কালো কোকড়ানো চুলগুলির ফ্যানের বাতাসে উড়াউড়ি দেখতে দেখতে মিনার টের পায় মেঘের দীর্ঘশ্বাস চাপা কান্না। মিনার ব্যস্ত হয়ে মেঘের দুবাহু চেপে নিজের দিকে ফেরায়
- মেঘ কি হয়েছে দুঃস্বপ্ন নাতো ? 
মেঘ উঠে বসে। মুখটা তুলে ধরে মিনার
- শরীর বেশি খারাপ লাগছে ?
না সূচক মাথা নাড়ে মেঘ। ওর কান্না ধোয়া ফুলো চোখ দুটি জানান দিচ্ছে অনেকটা সময় ধরে কান্নার উপস্থিতি। নিজের কাছে টেনে নেয় মেঘকে। 
- কি হয়েছে মেঘ আমাকে বলবে না ? বাবার কথা মনে পড়ছে ? বাবা আমাদের বিয়েটা মেনে নেননি বলে কষ্ট পাচ্ছো।
- না মিনার, ফলাফল তো এমন হবে জানাই ছিল। অনেক আগেই ওবাড়ির দরজা আমার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটা শুধু ঘোষনা মাত্র। 
- তাহলে মন খারাপ করছো কেন এসময়ে ?
- এসময় বলেই তো। তুমি যেদিন রিপোর্টটা জানালে সেদিনই যেন আমি আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে মা হবার পুরো অনুভুতিটাই অর্জন করে নিলাম। আমার মধ্যে আমার মাকে অনুভব করলাম। মায়ের নাজানা সুখ গুলো দুঃখগুলো আমাকে অহরহ তাড়িত করছে। আমার মানস চোখে সারাক্ষণ মায়ের অদেখা অবয়ব দেখতে পাচ্ছি। 
- মায়ের কোনো ছবিও তুমি দেখোনি কখনো ?
- দেখবো কি করে, মা চলে যাবার পর আমি ছাড়া তার সমস্ত অস্তিত্ব, জিনিস পত্র কাপড় চোপড় ছবি সমস্ত স্মৃতি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন বাবা। 
- অদ্ভুত তো ! একটা মানুষ মারা যাবার পর সাথে সাথে নিশ্চিহ্ন করে দিলেন ?
- হ্যাঁ নিশ্চিহ্ন করে দিলেন আমার বাবা। কিন্তু নিশ্চিহ্ন হননি আমার মা। তিনি বেঁচে আছেন।
দুহাতে মুখ ঢেকে আবার হু হু করে কাঁদতে থাকে মেঘ। মিনার যেন বিশাল একটা শক খেয়ে সামলে নিলো নিজেকে। কন্ঠে রাজ্যের বিস্ময় ঢেলে বললো
- মেঘ তুমি ঠিক আছ তো ?  
- হ্যাঁ এটাই সত্যি। বাবা সব মুছে দিয়ে আবার নতুন মা আনেন। আমি জ্ঞান হবার পর থেকে এটাই দেখেছি, আর বাবার কাছে জেনেছি আমার মাও দ্বিতীয় সংসারি। শুধু ঘৃণা ক্ষোভ আর মন্দ টুকুই অন্তরে নিয়ে ছিলাম। এতটা বছর কখনোই আগ্রহ বা সাহস হয়নি মায়ের কথা জানবার বা মাকে দেখবার। আর তাই তোমার কাছেও এ প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেছি। কিন্তু এখন বাবার অবহেলার কারনে হোক কিংবা তোমার ভালবাসার উষ্ণতার কারনেই হোক কেন জানি বার বার নিজেই বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি এই যে এতটা অপেক্ষা, এতটা অধীরতা, কষ্ট, আনন্দ সব সামলে একটা মা তার জঠরের ধনকে ফেলে কেন চলে যায়। কোন সুখের আশায় ? 
মিনার নির্বাক স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেঘের কষ্টবিদ্ধ নত মুখটার দিকে। ধীরে ধীরে বললো মিনার
- মেঘ তুমি কি চাও প্রশ্নগুলি মাকে সরাসরি করতে ? 
মুখ তুলে চাইলো মেঘ।
- তুমি কি বলছো মিনার  আমি কিছুই বুঝছিনা
- তবে সহজ করেই বলি। মায়ের সাথে দেখা করতে চাও ? আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। 
- কিন্তু আমিতো ঠিকানা জানিনা।
- মায়ের নামটা জানো তো ? বাকিটা আমি খুঁজে নিব।
মেঘের এই প্রতিক্ষাও একদিন শেষ হয়। 
মিনারের অদম্য চেষ্টায় চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এঘাট ওঘাট ঘুরে অবশেষে সিতারা বেগমের সন্ধান মেলে। তারপর একদিন ঢাকা থেকে দুঘন্টার ট্রেন জার্নি শেষে ওরা সিতারা বেগমের বাড়ি পৌঁছে।
শুরু হয় নতুন প্রেক্ষাপট। সিতারা বেগম আর ইমরানের গল্প। মাতৃহারা সিতারা ছিলেন বাবার বড় আদরের একমাত্র সন্তান। পারিবারিক উদ্যোগেই ব্যাবসায়ী ইমরান চৌধুরীর সাথে বিয়ে হয়। কয়েক দিনের মাথায় টের পায় সিতারা ভীষণ একগুয়ে আর জেদি মানুষের সাথে সে ঘর বেঁধেছে। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হলেও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে নিজের মধ্যে অন্য প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করার পর। এরই মাঝে মেঘের জন্ম। ওর আধো আধো বোল আর মধুর ব্যস্ততায় সিতারা এক নতুন জগৎ খুঁজে পায়। হঠাৎ এক দুপুরে খবর আসে সিতারার বাবা সড়ক দূর্ঘটনায় মরনাপন্ন অবস্থায়। ব্যবসার কাজে ইমরান তখন শহরের বাইরে। সিতারা ফোনে জানালে আদেশজারি হয় তিনি না ফেরা পর্যন্ত কোথাও যাওয়া যাবে না। অধৈর্য্য আর অস্থিরতায় বারন শোনার মত মানসিক অবস্থা ছিলনা সিতারার। মেঘকে নিয়ে এক কাপড়েই গাড়িতে উঠে বসে। যমে মানুষে টানাটানির এক পর্যায়ে বাবা প্রাণে বেঁচে যান তবে পঙ্গুত্বকে মেনে নিয়ে। স্থিরতার এক পর্যায়ে সিতারা খেয়াল করে এরই মধ্যে বাইশ দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি ইমরান। ফোন করলেও রিং বেজে বেজে থেমে যায়। একবার, দুবার, বহুবার। কোনো অঘটন ঘটলোনাতো। অজানা আশংকায় ছুটে যায় সিতারা। 
মানুষ যে কত নির্মম আর নিষ্ঠুর হতে পারে জানা ছিলনা তার। চরম পরিনতি অপেক্ষা করছিল। সিতারা যখন বাসায় গিয়ে ঢুকলো, ইমরান খুব স্বাভাবিক ভাবে মেঘকে কোলে টেনে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় সিতারাকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। সিতারা রাগের মাথায় তার বিবেকের দিকে অঙ্গুল তুলে বেশ কয়টি কথা বললেন। মারমুখি হয়ে উঠলো ইমরান। সত্যি সত্যি গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। কল্পনাতীত এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলনা মোটেও সিতারা। লজ্জায় অপমানে সন্তানকে না নিয়েই ফিরে এলো বাবার বাড়ি আবার। এক দিকে অসুস্থ বাবা আর একদিকে দুধের শিশু। দিন কতক পরেই পাগল প্রায় হয়ে আবার ছুটে গেল সিতারা তার সংসারে। বিশাল এক চপেটাঘাত অপেক্ষা করছিল সিতারার জন্য। ইমরান মেঘের জন্য নতুন মা এনেছেন। হায়রে ঠুনকো সংসার। নিজ হাতে সাজানো ঘরদোর আসবাবপত্র এমন কি পেটের সন্তানও কেড়ে নেয়া যায়। ফিরে আসে সিতারা। আত্মীয় স্বজনেরা পরামর্শ দেয় আইনের আশ্রয়ে যেতে। কি করবে মনস্থির করতে করতেই সিতারার চারিত্রিক কুৎসার কারন দর্শিয়ে ইমরানের ছাড়পত্র এসে পৌঁছে। আইনি লড়াইয়ের যথেষ্ট কারণ থাকলেও মন সায় দেয়নি ঐ ঘৃন্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের। অপমান লাঞ্ছনা পুষে অপেক্ষার প্রহর পার করেছেন দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে।
মেঘের ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দে মিনারের চিন্তাচ্ছেদ ঘটে। দেখে সিতারা বেগম মেঘকে বিছানায় অবস্থানরত রোগীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন
- ইনি আমার বাবা। গত পঁচিশটা বছর যাকে আগলে রেখেছি জীবনের সাথে বহু সংগ্রাম করে। 
সংসার মানুষ একবারই সাজায়। আমার সাজানো সংসারের একমাত্র সন্তান আজও তুই। এবার তোর প্রশ্নের জবাব কি তুই পেয়েছিস।
এতক্ষণে মিনারের দিকে মনোযোগী হলেন সিতারা বেগম। বললেন
- দুঃখিত, ট্রেনটা বোধহয় তোমাদের মিস্ হয়েই গেল।
মেঘ কিছু না বলে সিতারা বেগমের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে। সিতারা বেগমের চোখের অঝোর ধারাও মিশে যায় সেই সাথে।
আর মিনারের মনটা পরম তৃপ্তিতে ভরে যায়। স্বগতোক্তি করে 
- একটা ট্রেন মিস্ করে পঁচিশ বছরের অপেক্ষার অবসান তো ঘটলো।



 ****************
   ফাহমিদা রিআ
 *****************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/204259/</link>
				<pubDate>Sat, 26 Aug 2023 08:05:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>﻿অবসান</p>
<p>বাড়ির নাম্বার মিলিয়ে নিশ্চিত হয়ে এবার ডোর বেলে পরপর দুটো চাপ দিয়ে মিনা আর মেঘ মুখোমুখি দাঁড়ায়। চোখে চোখ রাখে।<br />
&#8211; মেঘ<br />
&#8211; হুঁউ<br />
&#8211; তোমার কি খুব নার্ভাস লাগছে ?<br />
&#8211; একটু একটু।<br />
ঠিক এমনি সময় ঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন স্নিগ্ধ সুন্দর মায়াবী চেহারার পঞ্চাশ পেরুনো এক মহিলা। নীল পেড়ে ঘিয়ে রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি পরনে। দুহাতে দুগাছি চুড়ি, গলায় হাল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-204259"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/204259/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>1</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">1020be673821db4b45a37da18bee1aa8</guid>
				<title>#সখী ভালোবাসা কারে কয়........


মেলার ভীড়ের মধ্যে নিজের  নাম শুনে তাকালো মিথুন। 
সামনে তাকাতেই বিস্ময়ে মুক হয়েগেলো। নিজের মনেই বললো, &quot; কত বছর ধরে এ ডাকটার জন্য অপেক্ষা করছি। সত্যিইতো সে? নাকি মনের ভুল।
ততক্ষনে সানজানা ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
----- মিথুন ভাই দেখোতো চিনতে পারো কিনা।
-----  সানজানা তোকে জীবনের ওপারে গেলেও ঠিক চিনে নিবো।
----- একটুও বদলাও নি।
----- তাই কি হয়, বদলেছি অনেকটাই। ভালো করে দেখ, মাথায় চুল হাল্কা হয়ে কাঁচায় পাকায় হাতে গোনা। এক মুখ দাঁড়িও  সাদা কালোর সহাবস্হানে। আর এই দেখ মধ্যপ্রদেশ, ভুড়ি গজিয়েছে হা হা হা.......
সানজানাও হাসে।  মনে মনে বলে,&quot; বয়সের সৌন্দর্যে এখনও তুমি তেমনি  নজরকাড়া।&quot;
----- কি হলো, থমকে গেলি যে সানজানা। এতটা বদলানো আশা করিসনি, তাইতো?
----- আশাহতও হই নি।  নইলে ভীড় ঠেলে তোমার এত কাছটিতে নিশ্চয়ই আসতে পারতাম না।
মিথুন ভাই দাঁড়িয়ে কথা বলবে, নাকি কোথাও বসবে?
----- তুই সময় দিলেতো আমি বর্তে যাই, জানিসইতো সানজানা।
----- মিথুন ভাই, তোমার কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে মাঝের সময়গুলো নেই, সেই সময়ে ফিরে গেছি।
----- নাহয় ফিরলামই, ফিরে গেলে খুব কি ক্ষতি হবে?
----- হয়তো হবে, হয়তো হবে না।
----- নির্দিষ্ট করে আজও বলতে শিখলি না সানজানা। সত্যি তুই বদলাস  নি।
----- বদলাতে চাইলে কি বদলানো যায় মিথুন ভাই?

সানজানা আর মিথুনের আচরনে সাবলীল স্বাভাবিকতা দেখে যে কারো মনে হতে পারে ওদের প্রায়শঃই দেখা হয়। অথচ তেইশ বছর পেরিয়ে গেছে এক এক করে ওদের অদর্শনের।  বছর কয়েক আগে ট্রেনে হঠাৎ করে  বন্ধু অমিতের সাথে দেখা হওয়ায় অনেক বন্ধুদের খোঁজ খবরের সাথে মিথুনেরও খবর পেয়েছিলো সানজানা। সমাজ কল্যান অধিদপ্তরে চাকরীর খবর, কন্যা নুশাইবার খবর জেনেছিলো সানজানা। এটুকুতেই স্বস্তিও পেয়েছিল খুব।  বুকের খুব গহীনে অদৃশ্য একটা কাঁটার খচখচানি থেমে গিয়েছিলো সেদিন থেকেই। মিথুন ভাইয়ের  সাথের আড়ালটাও মন থেকে ঘুচিয়ে দিয়েছিল মুহুর্তে।  সত্যি কথা বলতে কি, অনেক দিন পর মিথুনের মুখোমুখি দাঁড়াবার প্রবল ইচ্ছেটা শুরু হয়েছিল সেই থেকেই। 

বিকেলের ম্লান আলোয় চমৎকার একটা আাভা ফুটে ওঠেছে সামনের জলাধারটিতে। সিমেন্ট বাঁধানো আসনে পাশাপাশি বসে দৃষ্টিটা সামনের টলটলে জলে ছু্ঁড়ে দিয়ে মেতে ওঠলো সানজানার মন পুরনো দিনগুলোর স্মৃতিচারণে।

সানজানাকে অবাক করে দিয়ে মিথুন হঠাৎ  জিজ্ঞেস করে বসলো,
-----  সেই জয়ীর খবর কি বলতো?
মাঝে মাঝে মনে হয় জয়ীর কথায় সায় দিলেই ভালো হতো,অন্ততঃ তোকে এভাবে পুরোটা হারিয়ে ফেলতাম না।
----- মিথুন ভাই এতগুলো বছর পরে অমন ছেলেমানুষী দর্শন আর নাই বা আউড়ালে। আমার মনে হয়, জয়ী&#039;পা আজও তোমাকে ফিল করে। হন্যে হয়ে খুঁজে। তুমি ছিলে তার প্রথম ভালোবাসা,এটা শতভাগ ঠিক।
----- জয়ীর প্রথম ভালোবাসা বুঝেছিলি, আমারটা বুঝিসনি কেন? নিজেকে খুব বেশি উদার দেখাতে চেয়েছিলি, মানিস সেটা?
দু&#039;পাশে মাথা দোলায় সানজানা। বলে,
----- মোটেই না। এখানে আমার কোন দোষই ছিল না। পরিস্হিতির স্বীকার হয়ে আমাকে আড়াল হতে হয়েছিলো,  নাক কান বুঁজে নাকানি চুবানি খাবার সাধ তোমার হয়েছিলো, খেয়েছো , আমার কিছু করার ছিল না সেদিন, বিশ্বাস করো।
----- সেদিন ছিলো না,কিন্তু আজও নেই তাইতো?
----- মানে?এ বয়সে ভীমরতি ধরলো নাকি, হা হা হা.........
----- সানজানা, তুই কি করে এখনও সেই আগের মত,ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকিস বলতো? আমি তোকে সত্যিই শ্রদ্ধা করি। 
----- হুম, বয়স যে আমাদের শিক্ষাগুরু, যতই বাড়ছে, ততই শিখছি মিথুন ভাই।
ঠোঁটের কোনের হাসিটির দিকে তাকিয়ে মিথুন তেইশ বছর আগের সানজানা মুখর দিনগুলোতে ফিরে গেলো মুহুর্তে। 

ছোট্ট শহর। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল না তখন। দুতিনটে পাড়া মিলে একটা ক্লাব। 

বর্ষবরন,ঈদানুষ্ঠান, পূজা পার্বন,আর একুশে ফেব্রুয়ারী এই ছিলো তখনকার দিনে ক্লাবের সমবেত হবার উপলক্ষ্য  । মাসখানেক আগে থেকে চলতো জল্পনা কল্পনা, রিহার্সেল আর সাজ সজ্জার তোড়জোড়। খেলাধুলা আর সাংস্কৃতি আয়োজনটা ছিল লম্বা সময়ের প্রস্তুতির। মিথুন গ্রামের কলেজ থেকে ইন্টার করে শহরের কলেজে গ্রাজুয়েশনের জন্য যে বছর ভর্তি হলো সানজানা তখন সবে ইন্টারের ছাত্রী। টিন এজ চপলতা চোখেমুখে। মিথুন মামাবাড়ি থেকে কলেজ যাতায়াত করতো,সানজানাদের পাশের পাড়া হওয়ায় একই ক্লাবে যোগদানের সুত্রে দেখা এবং পরিচয়।
মিথুনের সাথে প্রথম প্রোগ্রামটাও ছিলো ডুয়েট গানের মঞ্চে। 
যেহেতু পুরনো গান তাই রিহার্সেলও একদিনেই উৎরে যাওয়া। মিথুনযে এতটা পারদর্শী গ্রামের ছেলে হয়েও, এটা সানজানার ধারনাই ছিলো না।
&quot; মোরা আর জনমের হংস মিথুন ছিলাম, ছিলাম নদীর তীরে
যুগল রূপে এসেছিগো,  আবার মাটির ঘরে&quot;..........

নতুন জুটির এই ডুয়েটটা খুব গ্রহনীয় হয়েছিলো খুব, দর্শকদের কাছে। &quot;ওয়ান মোর&quot; &quot;ওয়ান মোর&quot;ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশের কোলাহলে স্ক্রিনের আড়াল থেকে মিথুনেরর এ্যানাউন্সমেন্ট ভেসে এসেছিল, সুপ্রিয় দর্শক মন্ডলি ক্ষমা করবেন, আপাততঃ আর জনমের সাথীর সাথে আর কোন গান  আপাতত ঝুলিতে নেই। আগামীতে এ জনমের সাথী হয়ে নিশ্চয়ই গাইবো আপনাদের দোআ পেলে। 
হৈ হৈ সাড়া পড়েছিলো দর্শকদের সারিতে। সানজানা আচমকা পরিস্হিতে কিছুটা বিব্রত হলেও মিথুনের হাত জোড় ভঙ্গিমা সামনে দেখে হেসে ফেলেছিলো তখনই। পরে সানজানা সহ সবাই বুঝেছিল কথায় কথায় রসিকতা করা মিথুনের  নিত্য অভ্যাস। আর তাই খুব অল্প সময়েই সবার সাথে সখ্যতা হয়ে গিয়েছিলো মিথুনের। সানজানা তার থেকে বয়সে ছোট বলে প্রথম দিন থেকেই নির্দ্বিধায় তুই তুকারির সম্পর্কে  সহজ আর সাবলীল ছিল মিথুন।  সানজানাও স্নেহের পাশাপাশি বন্ধুত্বের বাঁধনে জড়িয়ে পড়লো স্বভাবতই, খুব দ্রুত সুন্দর বোঝাপড়ার সম্পর্ক  তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। যেন কতকালের আত্মীয়তা ওদের।

এরপরে যখনই দেখা হয়েছে কলেজ কিংবা ক্লাবে মিথুন ডেকেছে জনসম্মুখেই, &quot; পূর্ব জনমের সখি&quot;। রাখ ঢাক সম্পর্ক ছিল না বলে ওদের নিয়ে কারো আড়ালও ছিলো না কখনও।

ছোট মামার বিয়েতে সব আত্মীয়রা যখন নানা বাড়িতে জড়ো হলো সেবার,সানজানার এক  কাজিন জয়ী আপু মিথুনের গল্প শুনে সানজানাকে রসিকতা করে বললো,  &quot; আমি তোর মিথুনের জন্য খুব দিওয়ানা বোধ করছি,  আমার মনটা তোর মাধ্যমেই তার কাছে পাঠাতে চাই। পৌঁছে দিবি সানজানা?
হৈহৈ করে ওঠলো সানজানা, আরে ব্যস। মনি কাঞ্চন যোগ। তোমার পাশে একমাত্র মিথুন ভাইই পারফেক্ট। একবার চলে এসো আমাদের শহরে।এক্কেবারে সযতনে সঠিক স্হানে পৌঁছে দিবো জয়ী&#039; আপু।
দারুন হবে কিন্তু।
শুরুটা এভাবেই হাল্কা কথায়।
জয়ীর ফোনে চিঠিতে, সানজানাও এসবের জবাবে চালিয়ে যায় দুষ্টুমির ধারাবাহিকতায়। ক্লাবে মিথুনের সাথে জড়তাহীন  সখ্যতা সানজানার। জয়ীকে গল্পের মাঝখানে রেখে দিব্যি ওরা পার করে দেয় কটা মাস, গড়ায় বছরও। বন্ধুত্ব হয় নিঃস্বার্থ। মাঝে মাঝে হেসে গড়িয়ে পড়ে সানজানা, বলে  &quot; আচ্ছা মানুষতো বাপু,  তুমি। গল্প শুনে জয়ী&#039;পার সাথে প্রেম করছো। যাও একবার ঢাকা গিয়ে নিজ চোখে দেখে এসো। চোখে চোখটা অন্ততঃ রেখে এসো। হা হা হা......
কখনও জয়ীকেও বলতো ফোনে &quot; মিথুন ভাইয়ের  ফোন নাম্বার, ঠিকানা দিচ্ছি মানুষটার একটিবার দর্শন করো।  আমি মধ্যবর্তীনি থেকে পদত্যাগ করতে চাই। ডাইরেক্ট এ্যাকশনে প্রেম পর্ব তোমরাই চালাও বাপু। আমাকে নিস্তার দাও।

মিথুনও পাল্টা জবাব দিয়েছে বরাবরের মত হেঁয়ালি করে, শুনে হাসিতে যোগ দিয়েছে সানজানা সরল মনেই। জয়ীর কাছেও পৌঁছে  দিয়েছে বাড়তি দুষ্টুমিসহ।
বছর ঘুরে আসার আগেই সানজানার নিস্তার পর্ব সত্যিই এসে গেলো। বিয়েটা হুট করেই ঠিক হয়ে যায় প্রবাসী পাত্রের সাথে।
অন্যান্য বন্ধুদের সাথে মিথুনকেও খবরটা দেয় সানজানা।বলে,
------ বি সিরিয়াস মিথুন ভাই,  আর ফাজলামু নয়। তুমি জয়ী&#039;পুর সাথে কিভাবে যাগাযোগ করবে আমি না থাকলে। এসো ফোনে আলাপটা হয়ে যাক।
মিথুন সত্যি সিরিয়াস হয়,  হেসে উড়িয়ে দেয় না আগের মত। বলে,
------ সবার কথা ভাববার চাকরীটা তোকে কে দিয়েছিলো বলতো? কখনও কখনও নিজের কথাও ভাবতে হয়। ভাববি আজ থেকে, এই মুহুর্ত  থেকে, আমার সবটুকু ভালোবাসা বুঝার অক্ষমতা নিয়ে তুই অন্যের হয়ে যাচ্ছিস। তোর এই ব্যার্থতা বয়ে বেড়াতে হবে আমাকে আজীবন।
তারপর এক মুহুর্তও দাঁড়ায়নি মিথুন। কিছু বুঝে ওঠবার আগেই হাওয়া। হাওয়াতো হাওয়াই।

সানজানা ভ্রু কুঁচকে থাকে কিছুক্ষন। ভাববে কি? ভাবার সময় পেলেতো।
পাত্র পক্ষের  তাড়া থাকায় চটজলদি বিয়েটাও হয়ে যায় ছোট খাটো আয়োজনের মধ্যেই। 

নতুন জীবনের উচ্ছলতায় সাগর পাহাড় বেড়িয়ে সানজানার বর উড়াল দিলো মাস খানেক পর। কাগজপত্র পাঠালো আরও দ্রুত। সানজানা যাবার আগে ব্যস্ততার ভীড়ে মিথুনকে খুঁজে বের করার সময়ই পেলো না। আবার অভিমানও হলো। শেষ মুহুর্তে এসব অন্তরের সংলাপ আউড়ানোর কি দরকার ছিলো? জয়ী&#039;পু বিয়েতে এসে কতবার জানতে চেয়েছে মিথুনকে নেমতন্ন করেছি কিনা। আসলে জয়ী&#039;পু  ভেতরে ভেতরে বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছিলো মিথুন ভাইয়ের ওপর,  সানজানা বুঝতে পেরে  নিজের ওপরই রাগ হলো। আহারে জয়ীপুকে স্বপ্ন দেখাতে গেলো কেন অমন ঠাট্টাচ্ছলে? এখন যে চুরমার হলো মিথ্যে আশ্বাস।  মিথুন ভাইএর ওপরও খুব রাগ হলো।  যদি মনে এই ছিলো তবে এতটা সময় কেন জয়ী&#039; পার গল্পে তাল ঠুকলো। জয়ী&#039;পা  বেচারী  সানজানার বিয়ের আসরে এসে বেশ কবারই জানতে চেয়েছে মিথুনের খবর, ঠিকানা। নেমতন্ন করেছি কিনা ঠিক ঠিক, জিজ্ঞেসও করেছে। সানজানা  মাথা নেড়েছে শুধু। বলতে পারে নি, জয়ী&#039; পা তোমাকে মধ্যবর্তীনি করে মিথুন ভাই আমার অন্তরেই ঢু মেরেছে এতটা সময়। বিশ্বাস করো আমি জানতে পারি নি তা। অনুভব করিনি  কখনো নিজের ভালো লাগাটাও। তুমি স্বপ্ন বুনেছো মিথুনকে নিয়ে, আর মিথুন ভাই স্বপ্ন দেখেছে ভুল জায়গায়। তুমি আমাকে ভুল বুঝোনা জয়ী&#039;পা,কখনও যদি মিথুন ভাইয়ের অন্তরটা দেখার সুযোগ হয়ে যায়, ক্ষমা করো আমাকে।

সানজানার অব্যক্ত এই কথাগুলো জয়ী না জানলেও সানজানার হাবভাবে এমন কিছু অনুমান করেছে যে, যথেষ্ট সন্দিহান হয়ে নিজেই খোঁজ করে হতাশ হয়েছে এ নামটার অস্তিত্ব না পেয়ে। তবে কি সবটাই সানজানার মজার গল্প? তা কি করে হয়?
এত কথকতা, এত সংলাপের পিঠে সংলাপ, সৌম্যকান্তি, দীর্ঘদেহী সুদর্শন চেহারার বর্ণনা এত জীবন্ত হয় কি করে? তবে মিথুন কোথাও নেই কেন? 

এ জবাবতো সানজানা আর মিথুন ছাড়া জানা নেই কারো। মিথুন যে সানজানার হংস মিথুনেরই অংশ বিশেষ।  সর্ব সাধারনের মাঝে এ নামের অস্তিত্ব নেই। পোশাকি পিতৃপ্রদত্ত নামে স্বাভাবিক পরিচিতি তার। শুধু প্রথম ডুয়েট গানের রেশ ধরে সানজানা মিথুন নামের আবরণে ঢেকে রেখেছিলো তাকে। জয়ীপুর কাছে সানজানার দেয়া মিথুন নামেই তাই ধীরে ধীরে কল্প পুরুষ হয়ে ওঠেছিলো মিথুন জয়ীর প্রভাবিত মনটায়।

সানজানা উড়াল দিয়েছে রহস্য রেখেই। জয়ী&#039;পা  কষ্ট পেয়েছিল খুব। আর তাই নিজ বিয়ের খবরটাও জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি এক সময়ের সবার প্রিয় কাজিন সানজানাকে। সানজানা লোকমুখে  জেনেছে, অবাক হয় নি। বরং অপরাধবোধে মিইয়ে থেকেছে। আর মনে প্রাণে প্রার্থনা করেছে, সুখি হও জয়ী&#039;পা, অনেক সুখি।

ছুটিতে দেশে এলেও প্রথম প্রথম জয়ী&#039;পার সামনে পড়েনি নিজ সন্তর্পন চলাচলে। পরে অবশ্য একটু আধটু দেখা হয়েছে। ঢাকা পড়ে গেছে মিথুন পর্ব সময়ের ধুলোয়।

সানজানা বর্তমানে ফিরে মিথুনের ডাকে
------ যাবি আমার নীড়ে?
সানজানা মিথুনের বলার ভঙ্গিমায় একটু চমকে ওঠে,পরক্ষনেই হেসে সায় দেয়। বলে,
------ নুশাইবা আর ওর মায়ের সাথে আলাপের লোভেতো যেতেই চাই। তবে আজ নয় আর একদিন।
----- বেশ খবর রাখিস দেখি।  তবে পুরোটাই বলি, নুশাইবার মায়ের সাথেতো আলাপ হবে না। নুশাইবার মা নেই রে।
চমকে তাকাই,বিস্ময়ের ঘোর লাগা কন্ঠে বলি,
------- কবে মারা গেছেন তোমার স্ত্রী?
সামনের  শান্ত জলাধারে ছোট একটা ঢিল ছুঁড়ে ওঠে দাঁড়ালো মিথুন হঠাৎই, একরাশ নীরবতা সাথে নিয়ে সানজানাও  এক পা দুপা করে এগোতে লাগলো মিথুনের সাথে সাথে।
মেলার গেটটা ক্রশ করতে গিয়ে  মিথুন বললো এতক্ষনে, 
------আজ তবে এটুকুই। এবারতো দুজনের দুটি পথ দুদিকে.....
সানজানা একটু যেন অপ্রস্তুত হলো, বললো
------ মিথুন ভাই, আমি তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য নুশাইবার মায়ের প্রসংগ তুলিনি।
মিথুন এবার হেসে ওঠলো সশব্দে
------ আরে ধ্যাত, ওসবে আমার দুঃখ হতে যাবে কেন? আমি নিজেইতো জানি না নুশাইবার মা কবে মারা গেছে। ও আসলে পিতৃমাতৃহীন, পরিচয়হীনও। সোজা কথায়, আমরা দুজন দুজনের ওপর নির্ভরশীল পিতা আর কন্যার মোড়কে সাজানো সংসারের বাসিন্দা।

------তার মানে তুমি বিয়েই করনি মিথুন ভাই?
প্রশ্নটা মিশে গেলো বাতাসে। কারন সানজানা চেয়ে চেয়ে দেখলো মিথুন ভাই ততক্ষণে অনেকটাই এগিয়ে গেছে পিছনে দাঁড়ানো সানজানাকে রেখেই।

************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/158300/</link>
				<pubDate>Sat, 08 Oct 2022 05:45:10 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23সখ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#সখ</a>ী ভালোবাসা কারে কয়&#8230;&#8230;..</p>
<p>মেলার ভীড়ের মধ্যে নিজের  নাম শুনে তাকালো মিথুন।<br />
সামনে তাকাতেই বিস্ময়ে মুক হয়েগেলো। নিজের মনেই বললো, &#8221; কত বছর ধরে এ ডাকটার জন্য অপেক্ষা করছি। সত্যিইতো সে? নাকি মনের ভুল।<br />
ততক্ষনে সানজানা ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।<br />
&#8212;&#8211; মিথুন ভাই দেখোতো চিনতে পারো কিনা।<br />
&#8212;&#8211;  সানজানা তোকে জীবনের ওপারে গেলেও ঠিক চিনে নিবো।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-158300"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/158300/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cd06f0d74bda920e8a100bfffd45fd10</guid>
				<title>#ছোট গল্প
 #বাবা



সেবার হঠাৎ করেই বাবা মায়ের আগমন ঘটলো সুতপার বাড়িতে। মেঘ না চাইতেই জল যেন। তার এই বিশ বছরের গড়া সংসারটিতে বাবা মা তেমন আসেন নি বললেই চলে।  যাওবা এসেছেন  হাতে গুনে ক&#039;বার। তাও  স্বল্প সময়ের জন্য । 

প্রথম দিকে বলতেন----- &quot;চাকুরীজীবনটা ফুরোলে অঢেল সময়ে শুধু বেড়াবো। এখন সংসারের বেড়াজাল টপকানো বড্ড ঝক্কি। &quot;

বাবা মা দুজনেই কর্মজীবী  বিধায়  যুক্তিটা অকাট্য মনে হতো। এর মধ্যে সুতপা উড়াল দিল।  বেশ কটি বছর সংসার পাতলো প্রবাসী স্বামীর কর্মস্হলের সাগর ঘেঁষা বাংলোয়।

ফিরলো ছেলেমেয়েদের নিয়ে, লেখাপড়ার দৌড়ঝাঁপের প্রতিযোগিতায়। ও দেশটায় বাংলা ইংরেজি মাধ্যম দুটোর অপ্রতুলতার কারনে।
ততদিনে অবসরে বাবা মা দুজনেই। তাঁদের সন্তানেরাও  সবাই প্রতিষ্ঠিত আপন আপন কর্মজীবনে। স্বভাবতই তাদের  সংসার জীবন গড়ে দেবার দায়গুলোও সম্পন্ন করলেন সুচারুভাবেই বাবা মা।

সব দায় সেরে ভাবলেন নিজেদের সংসারের জোয়ালটা এবার নামাবেন কাঁধ থেকে। প্রস্তুতিটা নিতে না নিতেই নতুন প্রজন্মের মেহমানের আগমনী ঘোষনা।
আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে মেহমানও যথাসময়ে হাজির। দাদা দাদীর পদোন্নতিতে বিভোর হলেন তাঁরা।
না হয়েও উপায় কি। ছেলে - ছেলে বৌ  কর্মজীবী হওয়ায়  দাদা দাদীর উপস্হিতি দিনমান অপরিহার্য।

দিন বদলায় এক সময়। সোনামনি  হাঁটিহাঁটি করে একপা দু&#039;পা চলতে শিখে। সুতপা অধীর হয় দূরের শহর থেকে, ফোনে ভেসে যায় তার আহ্বান। 

-----কবে আসবে বাবা? কবে আসবে মা তোমরা?&quot;
বাবা আশা জাগিয়ে বলেন, 
------যাব রে তপা, যাব। ঠান্ডা লেগে বুকটা কেমন যেন ভার ভার লাগে মা। একটু স্বস্তি মিলুক, যাব তোর কাছে।
মাও তাই।
----&quot;কোমরের ব্যাথাটা কেমন যেন বেড়েই চলেছে দিনে দিনে। একটু না কমলে জার্নি করা খুব কষ্ট রে তপা। &quot;
কমে না কিছুই, আরও যোগ দেয় চোখের ছানি, হাঁটুর হাড় ক্ষয় ইত্যাদি  আরও কত কি।

সুতপা সন্তানদের ছুটিতে  ঈদ, পার্বন কিংবা আনুষ্ঠানিকতায় ঠিক হাজির হয়, আশৈশব বেড়ে ওঠা ছোট্ট শহরটার প্রিয় বাড়িটায় তার বাবামায়ের স্নেহের ছায়াতলে।

তারপর একটা সময় আসে সুতপা ক্রমেই ডুবতে থাকে ছেলেমেয়েদের  ভাবনার অতলে। স্কুল, কোচিং,  প্রাইভেট, পরীক্ষা----- একের পর এক। সময়গুলো যেন পৃথিবী চেঁছে মুছেও কুলোয় না। আরও, আরও সময় চাই। বাবা মায়ের সাথে ফোনের নাম্বারটা ঘুরিয়ে কথাটা বলবারও যেন ফুরসত মেলে না দু,চারদিন কিংবা সপ্তাহান্তে। 

অবশেষে পথ চেয়ে চেয়ে ফোন করেন বাবা, কখনো বা মা।
------- খুব ব্যস্ত নাকি মাগো? ভাল আছিসতো?
ওদের পড়তে বসিয়েছিস বুঝি, নাকি রান্না ঘরে?
তোর দেরি করাবো না তপা। একটুখানি কথা বলেই রেখে দিবো।
-------না, না সেকি। রাখবে কেন? তোমরা ভাল আছোতো?
এভাবেই কুশলটা জানা হতো প্রায়ই।

কখনোবা সুতপা বলতো---- কতদিন তোমাদের দেখতে যেতে পারি না, চলে এসো তোমরা।
বাবা মায়ের জবাব ছিল বরাবরই একই।
------- অত ব্যস্ত হোস নাতো। ওদের পরীক্ষাটাতো হোক।&quot; 
কিন্তু পরীক্ষা ফুরোয় না। একের পর আরেক।

সুতপাকে অবাক করে দিয়ে এই প্রথম এমন বিনা নোটিশে বাবা মায়ের হঠাৎ আগমন। সেই ছেলেবেলার মত উচ্ছল প্রাণবন্ত হয়ে ওঠলো সুতপা।  অন্তরাত্মা যে কত তৃষ্ণার্ত ছিল এই স্নেহমাখা পরশের জন্য, তা নিজেও বুঝে নি সুতপা এতগুলো দিন। এবার বাবা মাকে আর যেতে দিবেনা সহজে,  মনে মনে প্রতিজ্ঞা  করে মেয়ে।

সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে বিষয়টা পরিস্কার হলো।
বাবা পাশের চেয়ারে বসা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
------ তপা,একটা ইচ্ছের কথা বলবো। &#039;না&#039; করবি না কিন্তু। তোকে একবার রহনপুর যেতে হবে আমাদের সাথে।
------- রহনপুর?কেন বাবা?
------- শরীরটা ভাল যায় না আজকাল। দায়বদ্ধতাগুলো শেষ করতে চাই।
------ শরীর ভাল না লাগলে ডাক্তার দেখাতে হবে। চলো ডাক্তার দেখাই। 
সুতপার  ব্যস্ত কন্ঠ তাগাদা জানায়।

হাসলেন বাবা।
----- বোকা মেয়ে আমার।  গন্তব্য কি আটকানো যায় রে। ডাক আসলে কার সাধ্যি আটকায়।
যা বলছিলাম, যা পেরেছি দিয়েছি যার যা প্রাপ্য।তোর ভাগে আমি ফসলি জমিটুকু দিতে চাই। যৎসামান্য এই তোর বাবার। সুষ্ঠ বন্টন করতে চাই মা।
------- বাবা, তুমি কি আমার ইচ্ছেগুলো ভুলে
গেছো? আমি হার মানি নি। মানতে চাইও না বাবা।
------ ভুলি নি বলেইতো অনুমতির জন্য আমাদের আসা তোর কাছে।
মা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
------ মাগো,  বাবা মার দায় বাবামাকে সারতে হয়। আগে অবুঝ থাকলেও এখনতো মা হয়েছিস বুঝিস না, সন্তান কি?

সুতপার অবুঝ সময়টা ভেসে ওঠে মুহূর্তে। কি জেদ ই না ছিল সুতপার। পড়াশুনা শেষে করে সবে কলেজটায় জয়েন করেছে তখন। দেখতে এসে বিয়েটা পাকা হয়ে গেলো। ছেলে প্রবাসী। হাতে ছুটি কম। ক&#039; মাস পর  এসে বিয়ে।

বাবা মা প্রবল উৎসাহে আয়োজনের লিস্ট তৈরিতে  ব্যস্ত।
মা সোজা সাপটা আহ্বান করলেন,
------ তপা বিকেলে আমার সংগে একটু বেরুতে হবে অলংকার নিকেতনে। হাতের মাপটা লাগবে ক&#039; গাছি চুড়ি আর একজোড়া বালার জন্য।
ফোঁশ করে ওঠে সুতপা।
------ মানে, যৌতুক? ক ভরি  চেয়েছে ওরা?
ছি মা, তুমি জানো না আমি ওজনে বিক্রি হতে চাই না।আইবুড়ো হয়ে বসে থাকবো তবু এ বিয়েতে রাজী না,  রাজী না।

মাও হাড়ে হাড়ে চেনেন এই গোঁয়ার মেয়েকে। আত্মীয় স্বজনের মধ্যে এমনটি ঘটলেই ও প্রতিবাদ করে বরাবর। বলে, 
-----&quot;মেয়েদেরকে মেয়ের  বাবা মাই ছোট করে। কাঠখড় পুড়িয়ে  উপযুক্ত করে গড়ে তোলার পরেও সদ্য জাতে ওঠা পাত্র পেলে অর্দ্ধেক রাজত্বসহ রাজকন্যা দান । আমি বাপু নিজ যোগ্যতায় কেউ নিলে যাব নইলে নিজের পায়ে ভর করেই জীবন কাটিয়ে দিব। বাবা মাকে নিঃস্ব করে যৌতুকের বলি হতে চাই না।&quot;

মা কথাগুলি মনে করে আর দ্বিতীয়বার ঘাটালেন না ওকে।

নির্ধারিত দিনে বিয়ের আসরে পাত্রপক্ষের গা ভরা গহনার উপর চাপিয়ে দিলেন নিজের বানানো গহনার বেশ কয়েকটি পদ। সাড়ম্বরে আয়োজন হলো, অতিথিরা এলো,প্রাণ ভরা দোআ রেখে গলো।
কনে সাজে বসে নতমুখি সুতপার জল ভরা চোখ মুছিয়ে দিয়ে নিচু কন্ঠে  মা বললেন,
----- রাগ করিস না মা। এটাই রীতি। বাবা মায়ের মানটাও যে  রাখতে হবে। শুধু জেনে রাখ্,  ওদের কোন দাবী দাওয়া নেই, তোকে ভাল লাগাতেই ওরা নিয়ে যাচ্ছে। সুখে থাকবি তপা, মা আমার।
কপালে চুমু এঁকে আঁচলে চোখ মুছলেন মা।

সুখেই আছে সুতপা বাবা মার এত এত দোআ আর বুক ভরা ভালোবাসায়।
কিন্তু এতকাল পরে আবার তার নীতি বিরুদ্ধ  প্রসংগের আবির্ভাব কেন? সেই কবে বিয়ের বাজারতো সে সম্মানের সাথেই অতিক্রম করেছে। 
সেই ছেলেমানুষী আচরণ আর এখন মানায় না, তারপরও বাবা মাকে যুক্তি তর্কে বুঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলো বার কয়েক। 
বাবা শেষতক বুঝাতে সক্ষম হলেন, আমার দায়টা আমাকে মিটাতে দে মা। তারপর নাহয়, তোর যাকে খুশি দিয়ে দিস।

সুতপাও একটা সিদ্ধান্তে মনকে বুঝালো, বাবা তার কর্তব্য করে শান্তি খঁুজছেন, খুঁজুন। সুতপাও না হয় পরে তা পৌঁছে  দেবে কারো প্রয়োজনের ঘাটতিতে।

কার্য সমাধার পরে ছেলেবেলার মত গাল ফুলিয়ে বাবাকে বললো সুতপা,
-----বেশতো জিৎ তোমারই হলো বাবা।
বাবা চিরাচরিত সরল হাসিটি সারা মুখে ছড়িয়ে বললেন,
------- মাগো, মাঝে মাঝে বাবা মাদেরও জিততে হয়, দায়ভার থেকে মুক্ত হবার জন্য।

বাবা  তাঁর জীবনের সব কর্তব্য সুনিপুনভাবে সাঙ্গ করে বছর দুয়েক পরেই নিশ্চিত গন্তব্যে পাড়ি জমালেন অনেকটা হঠাৎ করেই।  সুতপাকে পাই পাই করে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলেন, কিন্তু  সুযোগ দিলেন না বাবার জন্যে একটা কানা কড়িও ব্যয় করার, দুটো দিন শয্যাশায়ী থেকে যত্ন আত্তি নেবার।
নিজ পায়ে হেঁটে  ডাক্তার দেখাতে গাড়িতে বসলেন,  ফিরলেন কদিন পরে নিঃশ্চুপ নিঃশ্চল হয়ে।

সুতপার শেষ মুহুর্তে  আসাটা নিরর্থক মনে হয়। সে যদি ঘুনাক্ষরেও টের পেতো, এ যাওয়াটা বাবাকে বিদায় দেবার, কক্ষনো যেত না সে,  কক্ষনো না। বড় বেশী কষ্ট এ দৃশ্য আমরণ আগলে রাখার। বাবার এমন চলে যাওয়াটা নষ্টালজিয়ায় ভোগায় সুতপাকে অনুক্ষন।

মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হয়ে চাওয়ার আগে কোন কিছু  সুতপার হাতে আসে নি ঠিকই, তবে চাওয়ার পরে বাবা মা  যে কোন মুল্যেই  তা সুতপার হাতে তুলে দিয়েছেন আজীবন।

হিসেব নিকেশের এই দোলাচালে সুতপা টুকরো স্মৃতিতে আপ্লুত হয় বার বার। বাবার ফেলে যাওয়া গন্ডিতে শান্তি খুঁজে ফেরে। মনে পড়ে রহনপুরের কথাও। 

পৌঁছে যায় সেই দিগন্ত জোড়া সবুজে একদিন।  অবারিত ফসলের মাঠ। দূরে আকাশ আর মাটির মিলে যাওয়া দেখতে দেখতে অভিভুত হয়।  ওটাই কি তবে গন্তব্য?
কতটা পথ পাড়ি দিলে পৌঁছানো যাবে ওখানে? যে গন্তব্যটায় পৌঁছে গেছেন তার প্রিয় বাবা। 

আধিয়ার লোকমান এক জমি থেকে আরেক জমি চেনায়। ক্ষেতের আল ধরে ধরে অনভ্যস্ত পা ফেলে সুতপা একের পর এক। 
একসময় উঁচু টিলাটায় দাঁড়িয়ে পড়ে লোকমান। অদূরে আঙুল তুলে ঘাড়ের গামছাটায় ঘামে ভেজা মুখটি মুছতে মুছতে বলে, 
পাশের এই জমিটাও একদিন সুতপার বাবার ছিল।সবচেয়ে ভাল জমি। সেচ লাগেনা তেমন, উর্বর, দোফসলা। অনেক দিন আগে বিক্রি করে দিয়েছেন জমিটা মেয়ের বিয়েতে প্রয়োজন পড়ায়।

তড়িতাহতের মত ফ্যাকাশে হয়ে যায় সুতপার শ্যামা বরন মুখখানি। কর্ণকুহরে এক গাদা গরম সীসা যেন হিস হিস করে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, বিক্রি করে দিয়েছেন জমিটা মেয়ের বিয়েতে প্রয়োজন পড়ায়।
সুতপার ক্ষীণ কন্ঠ জানতে চায়,
------ কতদিন আগে মনে করতে পারেন?

আপাদমস্তক কৃষক লোকমান তার শীর্ণ মুখটিতে বয়সের বলিরেখা ফুটিয়ে ভ্রু কুঁচকিয়ে হাঁ সুচক মাথা নেড়ে বলে,
------  তা বিশ বছরতো হবেই।
  
সুতপার হিসেবটা এবার মিলে যায়। বিশ বছর ধরে লালন করা তার মিছে অহমিকাটা মুখ থুবড়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত সংসারের একটি শিক্ষিত বোধ সম্পন্ন মেয়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি প্রচলিত সংস্কার ভেঙ্গে। পারে নি বাবা মায়ের অসহায়ত্বকে জিতিয়ে দিতে।  বাঁধ না মানা কান্নার ধারায় ঝাপসা চোখে সুতপা দেখে বাবা মার তিলে তিলে গড়া সঞ্চয়গুলো এই সবুজের মাঝে সৌন্দর্য্যের হানি ঘটিয়ে গহনার বেঢপ বাক্সটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভেতর থেকে ভেংচি কাটছে গলার সীতাহার, কানের ঝুমকা, মাথার জ্বলেজ্বলে টিকলি, অঙ্গুরীয়, চুড়ি আর বকুল বালা।

অবাধ্য অশ্রু লুকাতে দুহাতে মুখ ঢাকে সুতপা।
কৃষক লোকমানের চোখে মুখে সদ্য পিতৃহারা কণ্যার জন্য সহানুভুতি জাগে। কন্ঠে দ্বিধা নিয়ে বলে, -----মাগো চলেন। গরীবের হাড়িতে দুটো ডাল ভাতের বন্দোবস্ত হয়েছে, খেয়ে তবেই যাবেন।&quot;

সুতপা কোন জবাব দেয় না। লোকমানকে অনুসরন করে এগোয় ক্ষেতের সরু আল ধরে।
দূরের দিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া আকাশ মাটির মিলনস্হল থেকে ভেসে আসে বাবার হাস্যোজ্বল মুখের কথাকটি------
&quot; মাগো মাঝে মাঝে বাবা মা দেরও জিততে হয়। দায়ভার থেকে মুক্ত হবার জন্য।&quot;

একটু দাঁড়ায় সুতপা।  কথাগুলি বাতাসে ভাসছে নাকি তার কানে বাজছে ঠাউর করতে পারে না। শুধু মন গহীনে থাকা  জমাট কষ্টের বরফটা আর একটু গলে যায়, নোনা পানি জ্বালা ধরায় চোখে। 
একটা প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস মনের কোনে অব্যক্ত সুর ছড়ায়,
------ তুমিই জিতে গেলে বাবা। যুগ যুগ ধরে অসহায় বাবারা যেভাবে জিতে যায়, ঠিক সেভাবেই।
  
**************                         
ফাহমিদা রিআ</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/121460/</link>
				<pubDate>Mon, 20 Jun 2022 18:15:59 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ব" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ব</a>াবা</p>
<p>সেবার হঠাৎ করেই বাবা মায়ের আগমন ঘটলো সুতপার বাড়িতে। মেঘ না চাইতেই জল যেন। তার এই বিশ বছরের গড়া সংসারটিতে বাবা মা তেমন আসেন নি বললেই চলে।  যাওবা এসেছেন  হাতে গুনে ক&#8217;বার। তাও  স্বল্প সময়ের জন্য । </p>
<p>প্রথম দিকে বলতেন&#8212;&#8211; &#8220;চাকুরীজীবনটা ফুরোলে অঢেল সময়ে শুধু বেড়াবো। এখন সংসারের বেড়াজাল টপকানো বড্ড ঝক্কি। &#8221;</p>
<p>বাবা মা দুজন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-121460"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/121460/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">e583d03ffb9e9d8eb622aee6cbed7b4c</guid>
				<title>#বৌমাও কন্যা হতে পারে......


ঘুম ভাঙতেই কিচেন থেকে পানি পড়ার শব্দ কানে আসে মাসুদার।  এত সকালে বুয়া? চটজলদি চোখে মুখে পানি দিয়ে বাসি চুলে চিরুনি বুলিয়ে কিচেনে ঢুকেন। 

তুলি গ্লাসের স্টান্ডটা হাতে ঝুলিয়ে ডাইনিং এ যেতে যেতে একটু হাসি দিলো মাসুদাকে দেখে।  যেন এমনটিই হয়ে আসছে এতদিন। অথচ সপ্তা খানেক হয়েছে, তুলির এ বাড়িতে বৌ হয়ে আসবার। বিয়ে, বৌভাত, ফিরানি শেষে গতকাল থেকেই অতিথ স্বজন বিদায় নেয়ায় বাড়িটা স্বাভাবিক হয়েছে।

----- মা, বুয়ার কাছে পানির মাপটা জেনে  আটা খমির করে ফেলেছি। ঠান্ডা হতে হতে আপনাকে এক কাপ চা দিবো?
----- আমারতো খালি পেটে চা এর অভ্যেস নেই বৌমা।

কদিনেই মেয়েটাকে কেমন যেন আপন আপন লাগে মাসুদার।

অথচ, বৌ শাশুড়ির চিরাচরিত সম্পর্ক টা নিয়ে একটা ছবি তৈরি ছিল মনে। তার চুয়ান্ন বছরের জীবনে সে মোটামুটিভাবে নিজেকে একটা অবস্হানে দাঁড় করিয়েই ফেলেছিল নিশ্চিতভাবে।
বৌমা যে তাকে পছন্দ করবে না এটা যেমন ঠিক, তিনিও বৌমাকে ভালবাসতে পারবেন না এটাও ঠিক। মোদ্দা কথা, দুজন দুজনের প্রতিপক্ষ হবেন, এটাই যেন নির্ধারিত।  নিজের মন গড়া কিছু ভয়  থেকে মনের তাগাদা অনুভব করেন নি ছেলের বিয়ে দেবার। 
ছেলের যা ইচ্ছে তাই করবে। তিনি কে?

আর তাই একমাত্র ছেলে অয়ন  যখন নিজ পায়ে দাঁড়ানোর পর ওর পছন্দের কথা জানালো, একটুও অমত করেন নি মাসুদা। অয়নের বাবা সাদাসিদে মানুষ। ছেলের পছন্দে  অমত নেই তারও। 

ক&#039;দিনের মধ্যেই উনি মাসুদা আর অয়নকে নিয়ে এনগেজমেন্ট রিং পরিয়ে  এলেন তুলিকে।  মাস খানেকের মধ্যে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে তুলিকে বৌ করে তুলেও আনলেন সাধ্যমত অনুষ্ঠান সেরে।

মাস ছয়েক যখন নির্বিবাদে পার হয়ে গেলো মাসুদা নিজেও অবাক হয়ে খেয়াল করলেন শাশুড়ি হিসেবে তিনি নেহাৎ খারাপ নন। নইলে তুলির যত্ন আত্তিতে  ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন কি করে।
মেয়েটা দুদিনের জন্য বাবার বাড়ি গেলে ওষুধ খেতে ভুল হয়ে যায় কেন? কেনই বা এত বছরের রুটিন মাফিক কাজ  মশারি টাঙানোতে আলসেমি ভর করে।
তবে কি মাসুদা ধীরে ধীরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন তুলির উপর?

অথচ তুলির আসার আগ পর্যন্ত মাসুদা জানতেন, তার অপারগতার কথা। পরকে আপন করতে না পারার অপারগতা। পূর্ব  অভিজ্ঞতাতো তাই বলে।

বাবার বাড়ির একমাত্র মেয়ে হিসেবে তার পছন্দেই তিন ভাইয়ের বৌ আনা হলেও পরবর্তীতে তার সাথে কারো সম্পর্কই ভালো হয় নি।  বৌরা আড়ালে আবডালে বলে বেড়ায়, বড় আপা যা জটিল মনের মানুষ ছেলের বৌ নিয়েও চলতে পারবে না ভবিষ্যতে। 
পরের বাড়ি চলে যাওয়ার পরও বাবার বাড়ির খবরদারি ছাড়তে পারলো না বড় আপা। আর সেই মানুষ কিনা ছেলের বৌকে নিজ সংসারের চাবি ধরতে দিবে, হুঁউ।

মাসুদার তখন বয়স কম, অভিজ্ঞতা আরো কম। দু&#039; কথা শোনাতে গিছয়ে দুশো কথা হজম করতে হতো। ভাইদের কাছে বিহিত করতে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে শুনেছে বৌদের বলা হুবহু উপদেশমুলক রেকর্ড গুলো।
বাড়ির একমাত্র মেয়ে হয়ে আশা ছিল ভাইদের বৌরা এলে তিনটি বোন পাবে।
আশায় ছাই দিয়ে  দিনে দিনে টের পেলো মাসুদা, পরতো আপন হলোই না,
উপরন্তু নিজ ভাইরাও পর হয়ে গেলো।

,আগে নিজ সংসার থেকে বাবার বাড়ি গেলে ফিরতে মনই চাইতো না। অথচ ধীরে ধীরে কখন থেকে যেন বাড়িটা আকর্ষন কমতে লাগলো। 
প্রথম ধাক্কাটা এলো, বুয়ার কথায়। কিছু করতে বললেই বৌদের অনুমতির বাহানা করে। শুরুতে হুলুস্হুলও বাঁধে। বড় ভাইয়ের হস্তক্ষেপে ঠিক হয়, আদর আপ্যায়নে ত্রুটি না হলেই হলো। দুদিনের অতিথি রান্নাঘরে ঘেমে নাইতে যাবার দরকার কি।

মাসুদা প্রথমদিকে খুব কষ্ট পেতো ভাইদের আচরণে। তার আশৈশব বেড়ে ওঠা ঘর দোর উঠোন কিছুই আর তার নেই। না থাকুক। কিন্তু সেতো  এ বাড়ির মেয়ে, মেহমান হতে যাবে কেন?

একসময় মান অভিমানগুলো গা সওয়া হতে হতে অনুভুতিটাই হারিয়ে গেলো। সংসার বাড়লো, বাড়লো ব্যস্ততা। ভাইবোনের সম্পর্ক হয়ে গেলো লৌকিকতার। আচার অনুষ্ঠান ছাড়া যাওয়া হয় না, দেখাও না।

কয়েক বছর থেকে শারীরিক অসুস্হতার বাহানায় মাসুদা নিজেকে আরও খানিকটা গুটিয়ে নেয়। পা মাড়ায় না ভাই আর ভাই বৌদের  আলোচনার বস্তু হতে।
সবার আদরে, সম্মানে, ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা মাসুদা কিছুটা বিপর্যস্তও হয়ে পড়ে মানসিকভাবে।

মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী তুলি , শাশুড়ি মায়ের এই ভীতিটাকে বুঝতে সক্ষম হয়েছে অল্প কিছুদিনেই। হঠাৎ  পাওয়া দুঃখগুলো কারো সাথে শেয়ার করার কেউ ছিল না মাসুদার। মা কিংবা বোন অথবা  মেয়ে কেউ একজনও থাকলে হয়তো দিনের পর দিন অব্যক্ত কষ্টগুলো কঠিন বরফে রূপান্তরিত হতো না।
জমাট বাঁধতো না নিজের প্রতি ব্যর্থতার গ্লানি।

তুলি যতটা সম্ভব  সময় দিতে লাগলো শাশুড়ি মাকে। সেদিন সকাল বেলায় নাস্তার টেবিলে রঙিন কাগজে মোড়ানো প্যাকেটটি মাসুদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে  টুপ করে পা ছুঁয়ে বললো,
----- শুভ জন্মদিন মা।
ভীষন অবাক চোখে তাকালেন মাসুদা প্রথমে স্বামীর দিকে,তারপরে অয়নের দিকে। ওদের স্বাভাবিক মুখ দেখে মনে হলো ব্যাপারটা পরিকল্পিত।

তুলির হাসি মুখটার দিকে তাকিয়ে প্যাকেটটি খুলতেই এ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন বেরিয়ে এলো।
মাসুদা সেটি তুলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
------ এটার কিছুই বুঝি না আমি। তার&#039; চে বরং তুমি যেমন করে  ফেসবুকের গল্প শোনাও আমাকে, তেমনি শুনিও।
----- উঁহু এটা আপনার জন্য মা।  আপনি নিজেই এখন থেকে আপনার ইচ্ছেমত গল্প পড়বেন, গান শুনবেন, মজার মজার রেসিপি দেখে আমাকে নতুন নতুন রান্না শেখাবেন।

----- পাগল মেয়ে একটা। এসব আমার কম্মো নয়। আমার দ্বারা সম্ভবও নয়।
----- অবশ্যই সম্ভব। চটজলদি নাস্তা সেরে আপনি আর আমি ক্লাশে বসবো এখন।  যতদিন আপনার  শিক্ষানবীস কাল চলবে ততদিন রান্না হবে শর্টকাট। আমি  আজ থেকেই  বুয়াকে নিয়ে বিষয়টা এগিয়ে রেখেছি মা। বাবা আর অয়নেরও সায় আছে এতে।

মাসুদা অপলকে দেখেন তুলির অনর্গল বয়ে যাওয়া  আনন্দগুলোকে। 
অয়ন আর অয়নের বাবা নিজ নিজ চায়ের কাপ নিয়ে স্হান ত্যাগ করে তুলির কর্মকান্ডের সাক্ষ্য দেবার ভয়ে। ভাবখানা এমন যেন ক্লাশরুমে ছাত্র শিক্ষক ছাড়া বাকিরা বেমানান।


মাসুদা মনোযোগী ছাত্রীর মত রপ্ত করে ফেলেন অনেক কিছুই।
একদিন লম্বা সময় ধরে ছোট্ট  স্ট্যাটাস লিখে পোস্ট দেন,
&quot; বৌমাও কন্যা হতে পারে&quot;।

তুলি কমেন্টে লিখে বড় করে,
&quot;হুম্, যদি  সেই বৌমা কন্যা হতে চায়। আর কন্যা হবার শর্ত একটাই কথায় কথায় অভিযোগ বাক্সে ( স্বামীর কর্ণ দ্বয়) মন্তব্য ছোঁড়া থেকে বিরত থাকা।
ব্যস।&quot;
--------------------------------
ফাহমিদা রিআ
--------------------------------</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/120674/</link>
				<pubDate>Thu, 16 Jun 2022 04:18:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ব" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ব</a>ৌমাও কন্যা হতে পারে&#8230;&#8230;</p>
<p>ঘুম ভাঙতেই কিচেন থেকে পানি পড়ার শব্দ কানে আসে মাসুদার।  এত সকালে বুয়া? চটজলদি চোখে মুখে পানি দিয়ে বাসি চুলে চিরুনি বুলিয়ে কিচেনে ঢুকেন। </p>
<p>তুলি গ্লাসের স্টান্ডটা হাতে ঝুলিয়ে ডাইনিং এ যেতে যেতে একটু হাসি দিলো মাসুদাকে দেখে।  যেন এমনটিই হয়ে আসছে এতদিন। অথচ সপ্তা খানেক হয়েছে, তুলির এ বাড়িতে বৌ হয়ে আসবার।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-120674"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/120674/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">5e03e300224b5e7b41ddd5a611f34983</guid>
				<title>#উক্তি


বেলি ফুলের মিষ্টি সৌরভ ছড়ানো ঘরময়। অসংখ্য ফুলের অপরূপ সজ্জাবিন্যাস। ছাদ অবধি সযতনে টাঙ্গানো ফুলে ছাওয়া চাঁদোয়া। সারা খাট জুড়ে নকশি ফুলের বাহার ঝোলানো। খাটের একপাশে মস্ত আয়নায়  নববধূর বেশে আড় চোখে বারবার চেয়ে চেয়ে দেখে সাজিয়া। 
বিয়ে বাড়ির কোলাহল তখনও পুরোটা থেমে যায়নি। ঘরের বাইরের ব্যস্ত চলাচল ছাপিয়ে এই বাসর ফুল রাজ্যে কেমন যেন একাকীত্বে পেয়ে বসে সাজিয়াকে। ঘরের এক কোনে রাখা ত্রিপায়ার মস্ত ফ্লাওয়ার ভাসে টকটকে গোলাপ আর মাথার উপর হালকা গতিতে ঘোরা পাখায় ভর করে কি এক অদ্ভুত ফুলেল মাদকতা বয়ে আনছে। বুক ভরে শ্বাস নেয় সাজিয়া, বেলি আার গোলাপের মিষ্টি গন্ধে মনটা যেন ভুলে যেতে বসেছে নববধূর বাসর ঘরে সে। ঘরের মাঝখানের ক্রিষ্টালের ঝাড়বাতির নরম আলোয় নিজেকে ছেলেবেলার প্রজাপতির পিছে ঘুরে বেড়ানো সময়টার মত মনে হচ্ছে। এই বুঝি প্রজাপতিটা হাত ফসকে বেরিয়ে যাবে আর সে বাগান থেকে ছিটকে কোলাহলে মিশে যাবে।
হঠাৎ দরজার মৃদু শব্দে চোখ তুলে। তাকায় সাজিয়া। মাত্র মাস দুয়েক আগে দেখতে আসা অপরিচিত সেই মানুষটি তার সামনে এখন। সেদিনই হবু শাশুড়ি অনামিকায় আংটির বাঁধন এঁকে পাকাপাকি করে ফেলেন বিয়ের দিনক্ষন। লাজমাখা দৃষ্টি বিনিময়ের ঐটুকু সম্বল করে এই মানুষটির সাথে তিন কবুলে আবদ্ধ হয়েছে কয়েক ঘন্টা আগে। দুরুদুরু বুকে সারাক্ষনই বেজেছে কি জানি কেমন মন মানসিকতার সাথে জোট বাঁধলো তার কল্পনাবিলাসী স্বচ্ছ সহজ মনটা। প্রথম পদক্ষেপের সবটুকু এমন মন ছোঁয়া হবে ভাবেনি এটিও।
----- তোমার পুরো নামতো সাজিয়া সুলতানা  তাই না?
ভরাট কন্ঠের এমন প্রশ্নে একটু যেন হকচকিয়ে যায় সাজিয়া। চোখ না তুলে হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে শুধু।
আর ভাবে  এ কেমন তরো প্রশ্ন। নাম জিজ্ঞেস  করার ধরন যে চাকরির ইন্টাভিউ বোর্ডের মতো। বিয়ের প্রথম রাতে কত রোমান্টিকতার গল্প শুনেছে বান্ধবীদের কাছে। আর তার এতগুলো বছরের জালে বোনা স্বপ্নমাখা আলাপনগুলো প্রথম এক বাক্যেই যেন সুতো ছিড়ে যাবার উপক্রম।
গুরুজনদের কথানুযায়ী  বরের পা ছুঁয়ে সালাম করার ব্যাপারটা কখন কিভাবে সম্পন্ন করবে ভেবে গলা শুকিয়ে আসছিলো।
ততক্ষনে তার স্বামী ভদ্রলোকটি পাশে এসে বসে। না, চিবুক তুলে ফিসফিসিয়ে কোন আবেগের বুলি নয়, সহজ স্বাভাবিকভাবে পকেট থেকে মলিন খামটি বের করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলে-
------ দীর্ঘ পাঁচটি বছর আগলে রেখেছি, আজ খুলবো বলে। যদিও স্রেফ কথার কথা। তবুও আবীর ভাইকে দেয়া কথা রেখেছি আমি। আবীর ভাই কতটুকু পেরেছে তা জানার সময় এখন।

সাজিয়ার নতমুখি মনটায় তখন এলোপাথাড়ি ভাবনা। গলার কাছটায় কষ্টগুলো আছড়ে পড়ছে একটু একটু করে।          

এমন নিরুত্তাপ হবে আজীবনের সংগী ভাবেনি সাজিয়া ঘুনাক্ষরেও। নববধূর নিটোল ছবির মত মুখখানা চিবুক তুলে ধরে দেখার সাধও হলো না একবার। এই বুঝি কোথাকার কোন আবীর ভাইকে স্মরণ করার সময়? তা স্মৃতি আগলে রাখার মাহেন্দ্রক্ষণ?
------ কই কিছু বলছো না যে। শিরশিরিয়ে ওঠে সাজিয়ার অশ্রুভেজা দুচোখের সাজানো পাপড়ি, অনুভব করে কোলের ওপর রাখা কারুকার্যময় হাত দু&#039;খানা রাজীবের শক্ত হাতের মুঠোয়। রাজীব চোখে হাসি ছড়িয়ে বলে এবার,
------ অন্তত একবার তাকাও আমার চোখের দিকে। যে চাহনি দেখে তোমার মনের সবটুকুই দেখেছিলাম সেদিন আমার চাওয়ার মত করে।
চোখ তুলে সাজিয়া। সামনে ঝুঁকে পড়া রাজীবের চোখের তারায় আটকা পড়ে আবার ত্বরিতে নামিয়ে নেয়  সলাজ দৃষ্টি।
আলতো করে সাজিয়ার কারুকার্যময় ওড়নাটা তুলে নেয় রাজীব। চিবুকে হাত রেখে বলে
------ সাজিয়া সাজিয়া সাজিয়া। এর চেয়ে বড় সত্যিতো আমার কাছে এ মুহূর্তে আর কিছু হতে পারেনা। অথচ এই কাগজটিতে দেখো---
খামের ভিতর থেকে এক টুকরো কাগজ মেলে ধরে রজীব সাজিয়ার  চোখের সামনে। ছোট দুটি অক্ষর পড়ে ফেলে সাজিয়া অস্ফুট স্বরে, &#039;মি    নু&#039;।
রজীব তখনো বলে চলেছে,  আবীর ভাই হয়তো নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না বলেই বলেছিলেন, &quot; অন্তত প্রথম অক্ষরটা মিলবেই।&quot; শুধু শুধু আমাদের  অপেক্ষার প্রহর গোনা কাঙ্খিত রাতে ভুয়া ভবিষ্যৎ বানী টেনে অপচয় করলাম অনেকটা সময়।
----- ভবিষ্যৎ বানী! অস্ফুট কন্ঠ আবারও সাজিয়ার।
------ ঐ যে বল্লাম ভুয়া। আমার নববধূর নামের ভবিষ্যৎ বানী। তাও আবার দু&#039; চার মাস আগে নয়, পাক্কা পাঁচটি বছর আগে এই খামের মুখ বন্ধ করে তিনি যা লিখেছিলেন তা আর কেউ জানতো না কি লেখা আছে।
------ অদ্ভুততো! সলাজ দৃষ্টির সবটুকুতে এখন কৌতুহলি দৃষ্টি সাজিয়ার।
সাজিয়ার মেহেদী আঁকা আঙ্গুলগুলোতে চোখ বুলিয়ে বলে রাজীব, ----- থাক না এখন আবীর ভাই প্রসংগ এটুকুই।নিতান্তই এক ছেলেমানুষী কৌতুহল পুষেছি পাঁচটি বছর। বাসর রাতে নববধূর  সামনে খামটি খুলে দেখার কথা দিয়েছিলাম, রেখেছি।

কিছুক্ষন আগের লাজনম্র চাহনি, জড়ানো কন্ঠ আর দ্বিধা দ্বন্দ্বে দোলানো মন, সবকিছু ভুলে  চেহারায় উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠলো সাজিয়ার কি জানি কোন যাদুবলে। 
রাজীব অবাক বিস্ময়ে শোনে সাজিয়ার হঠাৎ কন্ঠ পরিবর্তনের উচ্ছাস--
------আবীর ভাই কই? কোথায় এখন?
মেয়েলি কৌতুহল ভেবে সাজিয়ার আগ্রহে সায় দেয় রাজীব। নড়েচড়ে বসে বলতে শুরু করে আবীর ভাই উপাখ্যান।  সাজিয়া সব জড়তা ভুলে রাজীবের মুখের দিকে চেয়ে থাকে নিষ্পলকে

রাজীব বিস্মিত হয়, সাজিয়ার আগ্রহ ভরা চোখে চোখ রেখে। যেন কত দিনের চেনা এই দৃষ্টি। যুগ যুগ ধরে কত কথাই যেন বলা হয়ে গেছে দুজন দুজনাকে। জন্ম জন্মান্তরের চেনা এক জোড়া চোখ অধীর আগ্রহ নিয়ে তার জীবনের আর এক গল্প শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষারত সামনে।
------- কই কিছু বলছো না যে?
সাজিয়ার মৃদু কন্ঠের তাড়ায় ধৈর্য্যচ্যুতি অনুমান করে রাজীব বলতে শুরু করে-----
------তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী আমি। মেসে থাকতাম। আাশে পাশের দু&#039;চার রুমের সিনিয়র ভাইদের সাথে বেশ সদ্ভাব হয়ে যায়। এমনি একজন ছিলেন আবীর ভাই। এম এ পরীক্ষা শেষ করে বিভিন্ন চাকরীর ইন্টারভিউ দিতেন আর তিন / চারটে টিউশনি করতেন। আমার পড়াশোনার ব্যাপারে কখনও সহযোগীতা চাইলে নিরাশ করেন নি।খুব স্নেহ করতেন উনি আমাকে। আরও একটা ব্যাপারে উনার খুব ভক্ত ছিলাম আমি। খুব সুন্দর বাচনভংগি ছিল উনার। যে কেউ একবার কথার শুরুতে উপস্হিত থাকলে, শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরে যেত পারতো না। আকর্ষনীয় লাগতো উনার মুখের বর্ননায় যে কোন সাধারন ঘটনাও। রসিকতার ছলে এক একদিন এক একজনকে টার্গেট করে ভবিষ্যদ্বানী আওড়াতেন। কখনও কোনটা কাকতালীয় ভাবে মিলেও যেত। আমি প্রায়ই ইয়ার্কিচ্ছলে বলতাম, আবীর ভাই আমার ভবিষ্যদ্বানী করেন না একটা।
হেসে বলতেন ----- সময় হলে ঠিক বলে দেব।
এক সময় পরীক্ষা শেষ করে বেডিংপত্র বেঁধে দেশের বাড়িতে চলে আসার সময়ও হলো। দেখা করতে গিয়ে বল্লাম--
----- আবীর ভাই দোআ করবেন। আপনার কথা ভুলবো না কখনই।
নিজের পাশে বসিয়ে মাথায় হাত রেখে সস্নেহে বল্লেন, 
------একটা ভবিষ্যদ্বানী চাইছিলি না?
চটপট বল্লাম, 
------বলেনতো কোন ডিভিশন পাবো?
------ যেমন পরীক্ষা দিয়েছিস, তেমনি পাবি।
------ এটা কোন ভবিষ্যদ্বানী হলো না আবীর ভাই।

উনি কিছু না বলে ড্রয়ার থেকে এক টুকরো কাগজে খসখস  করে কি যেন লিখে খামে পুরলেন। তারপর মুখবন্ধ করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, 
----- এটা রাখ রাজীব। লেখাপড়া শেষ করে যখন বিয়ে করবি, ঠিক বাসর রাতে নববধূর সামনে খামটা খুলবি। তোর বৌএর নাম লিখে দিলাম এতে, শুধু মিলিয়ে নিবি। তারপর একটু থেমে বললেন, যদি হুবহু নাও মিলে  তবে প্রথম অক্ষরটা মিলবেই। তবে কথা দে,  বাসর রাতের আগে খুলবি না যেন কৌতুহলি হয়ে।
সেদিনের একেতো কৌতুহলি মন, তদুপুরি আবীর ভাইয়ের স্নেহাধিক্যের দৌর্বল্য। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সেই যে সার্টিফিকেটের ফাইলে খামটি রেখেছি আর খুলিনি কখনো।
প্রথম প্রথম অবশ্য খামটা নেড়ে চেড়ে দেখতাম,  কেমন যেন একটা অনুভুতি জাগতো। ভার্সিটিতে পড়ার সময় কোন মেয়েকে ভাল লাগলেই মনে হতো এর নামটি বুঝি আবীর ভাই লিখে রেখেছেন মুখবন্ধ ঐ খামটিতে। তারপর একসময় জীবনের বাস্তবতায় পেপারকাটিং, দরখাস্ত, ইন্টারভিউ, চাকরী, ট্রেনিং, পোষ্টিং একের পর এক ছুটোছুটিতে ভুলেও গিয়েছি।
হঠাৎ সেদিন মায়ের সাথে তোমাকে দেখতে গিয়ে যখন মা আমার মত নিয়ে দিনক্ষন পাকা করে ফেল্লেন, অনেকদিন পর খামটি কৌতুহলি করে তুলেছিলো হঠাৎ কয়েকটি মুহূর্ত। পরক্ষনে আর দুটো মাসের জন্য কথা খেলাপ করবো ভেবে স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি আবীর ভাই খামটির ভিতর &#039; সাজিয়া&#039; লিখেছেন অবশ্যই। উনার ভালোবাসা কিংবা যে কোন কারনেই হোক,  গাঢ় একটা বিশ্বাস  যেন গেঁথে বসেছিল মনে। ওখানে সাজিয়া ছাড়া আর কিছু লেখা থাকতে পারে না। অথচ কেমন ঠক খেলাম দেখলেতো।

অপলক চোখে এতক্ষন সব শুনছিলো সাজিয়া। এবার বললো--
----একটু ভুল ছিল শুধু তোমার ভাবনায়,  তাই হয়তো এটুকু তোমার পাওনা ছিল।

রাজীব বিস্ময়াভিভুত হয়ে সাজিয়ার কথা বলার ধরন দেখছিল। নববধূর এতটুকু জড়তা ছাড়াই সাজিয়া নির্বিকার কন্ঠে, আর সহজ ভংগিতে হাসছিল কেবল।
রাজীব এবার সেই হাসির খেই ধরে বললো,
----- ঠক আবার কারো পাওনা হতে পারে নাকি। এতো আবীর ভাইয়ের ভুয়া বানী। আরতো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না, কি বলো?

সাজিয়া ওঠে দাঁড়ায়। মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে নীচু কন্ঠে বলে-
---- এমন চমকপ্রদ  একটা কাকতালীয় ব্যাপার যে,  আজকের পরিবেশটাই কেমন পাল্টে গিয়েছে।অবস্হানটাই প্রায় ভুলতে বসেছিলাম এতক্ষন। 
মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে বললো সাজিয়া----- একটু দাঁড়াবে?
পা ছুঁয়ে সালাম শেষে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুকে টেনে নেয় রাজীব সাজিয়াকে।
আবেগ জড়ানো কন্ঠে বলে----- কি দোআ করবো
বলোতো?কি চাই তোমার?
সাজিয়া নিজেকে সবটুকু সঁপে দিয়ে বুকের মাঝখানে মুখ রেখে বলে---- সারাটা জীবন তোমার মিনুকে এমনি আগলে রেখো।
রাজীব হেসে বলে -
---ওরে দুষ্টু মেয়ে, ওসব চলবে না। আমার পাঁচ বছরের লালন করা অজানা মুখবন্ধ খামটি নিয়ে ফাজলামু হচ্ছে?

মাথা তুলে রাজীবের  চোখে চোখ রেখে হাসে সাজিয়া-
------মোটেও না।পরম শ্রদ্ধেয় আবীর ভাই তার স্নেহের রাজীবকে নিয়ে ফাজলামু করতে দিতে পারেন না। আমার জীবনসংগী কোন ভুলেরও স্বীকার হতে পারে না। তুমি পাঁচ বছর ধরে মনের অজান্তে লালন করা মিনুকেই পেয়েছো।

রাজীব থ&#039; হয়ে তাকায় সজিয়ার কথায়। কোনমতে বলে,
----- মা....... নে???
---- মানে অতি সহজ। অতি প্রাকৃত এই ঘটনাটি আমার নাম নিয়েই। আমার ডাক নাম মিনু। পারিবারিকভাবে এ নামেই আমাকে ডাকে সবাই।
                      
**************
ফাহমিদা রিআ 
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/120316/</link>
				<pubDate>Mon, 13 Jun 2022 15:10:33 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23উক" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#উক</a>্তি</p>
<p>বেলি ফুলের মিষ্টি সৌরভ ছড়ানো ঘরময়। অসংখ্য ফুলের অপরূপ সজ্জাবিন্যাস। ছাদ অবধি সযতনে টাঙ্গানো ফুলে ছাওয়া চাঁদোয়া। সারা খাট জুড়ে নকশি ফুলের বাহার ঝোলানো। খাটের একপাশে মস্ত আয়নায়  নববধূর বেশে আড় চোখে বারবার চেয়ে চেয়ে দেখে সাজিয়া।<br />
বিয়ে বাড়ির কোলাহল তখনও পুরোটা থেমে যায়নি। ঘরের বাইরের ব্যস্ত চলাচল ছাপিয়ে এই বাসর ফুল রাজ্যে কেমন যে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-120316"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/120316/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ac84212e1aa54503b290a0d106b4ccc6</guid>
				<title>#যেতে যেতে

পূর্বাকাশে সূর্যের উঠি উঠি ভাবটা তখনও কাটেনি পুরােপুরি । হাতে মার্জিনাল সময় নিয়ে নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে উঠে টিকিটের নাম্বার মিলাতে না মিলাতেই ট্রেনটা বিশাল দেহ নড়িয়ে চলতে শুরু করলাে । সাউন্ড বক্সে ভেসে এলাে সুরেলা কণ্ঠে যাত্রা শুরুর এনাউন্সমেন্ট । নির্ধারিত আসনে রিসিতাকে বসতে বলে বাংকারে ব্যাগ - ব্যাগেজ তুলে এতক্ষণে সুস্থির হয়ে বসলাে রতন রিসিতার পাশটিতে । এই শীতের সকালেও কেমন ঘেমে উঠেছে । টাইয়ের নটা আলগা করতে করতে রিসিতার দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে - তােমার জন্যই তাে । রিসিতা ততক্ষণে হাতব্যাগটিকে কোলের উপর ফেলে গায়ের শালটা কাঁধের একপাশে টেনে হাফ ছেড়ে বসেছে । রতনের দিকে মৃদু চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করে -আমার জন্য মানে ? ছুটে চলা গাছ - গাছালির পানে জানালার কাঁচের শার্সি গলিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে তন - মানে হয়রানি , সাতসকালে ছুটোছুটি । -বেশ তাে , পরের ষ্টেশনে নেমে ফিরে যেও তুমি । -আর তুমি ? 
-আমার জন্যেই আমার হয়রানি , ছুটোছুটি , সহজ হিসেব । রতন রিসিতার চোখে চোখ রেখে হেসে ফেলে এবার , বলে - হিসেব যদি এত সহজই হতাে তবে বছরে একটি বার নয় , প্রতিমাসেই এমনি হয়রানি আর দুটোছুটি করতে সাধ -গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়া হচ্ছে বুঝি ? পায়ের কাছে রাখা বেতের ঝুড়ি থেকে লম্বা ফ্লাটা বের করে দুধসাদা প্লাষ্টিকের কাপ দুটোতে চা ঢালতে ঢালতে মৃদু হাসে রিসিতা । -যাত্রার অব্যাহতি যখন মিলছে না মশাই , দাম্পত্য কলহের অব্যাহতি দিয়ে গলাটা ভিজানােই বােধ হয় ভাল । যথা আজ্ঞা , বলে রতন হাত বাড়িয়ে চায়ের ধূমায়িত কপি তুলে নেয় রিসিতার হাতের দু’গাছি চুড়ির রিনরিনে সুরের সাথে । ততক্ষণে সূর্যের লাল আভায় চলন্ত ট্রেনের কামরায় অদ্ভুত এক আলাে - আঁধারির যাওয়া - আসা শুরু হয়েছে । সেই নরম আলােয় নতুন করে দেখে রতন রিসিতাকে - কাজল টানা চোখের পাতায় খুশির ঝিলিক , কপালের জুলজুলে টিপটিও হাসছে যেন । অনর্গল কথা বলে যাওয়ায় ঠোঁট দুখানায় ফিলপষ্টিকের চকচকে ওজ্জ্বল্য । চিকন পাড়ের ধানী রং শাড়ির আঁচল লুটোপুটি খাচেই পায়ের কাছটায় । কানে ঝোলানাে মিনা করা কুমকো জোড়া আর বুকের মাঝে লম্বা চেনে দোলানাে পান পাতার লকেট খানি রিসিতার কথা আর হাসির সমকে কেপে উঠছে বারবার । &quot; চা জুড়িয়ে যাচ্ছে যে । ” ককঝকে দাঁতের সাবি মেলে মােহনীয় হাসি ফুটলে বিসিত , রতন গলাটা কেড়ে নিল । একই সুইমি করতে গিয়ে বাধা পেল । সামনে সীটে বা ভ্রলােকের দিকে চোখ পড়তেই সামলে নিল নিজেকে । চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে আবার তাকালাে সামনের লােকের পানে । কি অস্বস্তিকর ! এতক্ষণ কি তবে এতবেই তাকিয়ে তাকিয়ে দু&#039;জনার কথাবার্তা উপভোগ করছিল লোকটা ? দৃ&#039;জনাইবা হয় কি করে । কামরার হালকা আলােয় লােক ইতিমত সুখ দৃষ্টিতে বিসিতাকেই পর্যবেক্ষণ করে চলেছে ।এ ক্ষেত্রে কি করা উচিত বতনের । বিসিতও কি ব্যাপারটা খেয়াল করছে না ? গায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে বিসিতার দিকে তাকাতেই বহস করে হাসলাে বিসিতা ক্লান্ত এবং কাপ দুটো বুড়িতে গুছিয়ে রেখে সরাসরি তাকালাে লােকের দিকে । লােক যেন অপেক্ষায় ছিলেন এমনি কি খানিকটা স্বস্তি গলায় চেলে বললেন এক্সকিউজ মি - আপনাকে ... রিসিতা কথা কেড়ে নিয়ে ঠেষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বললাে - খুব চেনা শাগ ? -জী - মানে ঠিক মনে করতে পারছি না । -মনে থাকার কথাও নয় অবশ্য । বছর তিনেক আগের কথা । চৌঠা অগ্রোবৱ আপনার । আমাদের বাসায় এসেছিলেন । ভদ্রলােক চোখ সরু করে দু কুঁচকিয়ে আটকালেন একবার - তোষা অক্টোবর  । বিসিতা ভদ্রলােকের স্মরণশক্তির সাহায্যার্থে বলে চলেছে তখনও । হ্যা , তার দিন সাতেক পরে অর্থাৎ বার তারিখে কথানুযায়ী আবার এলেন , সংগে ... 
লােক আচমকা আহত স্বরে উচ্চারণ করলেন - থামুন , প্লিজ ! রিসিতা কষ্ঠের সেই স্বাভাবিকতা নিয়েই বললাে - আমি সেদিনের সেই রিসিতা । ও হ্যা - আলাপ করিয়ে দেই - আমার হাজবেন্ড রতন । দ্রলােকের চোখে তখন বিস্ময় না - কি বিরক্তি বােঝা গেল না চাহনীতে । রতনের বাড়ানাে হাতে হাত রেখে বললেন - আমি জামিল । সস্ত্রীক রওয়ানা হয়েছি চাকরির বদলি অর্ডার রক্ষার্থে । রিসিতা এবং রতন দু&#039;জনেই এতক্ষণে খেয়াল করলাে , জামিলের পাশে বসা গল্পে বইয়ে গভীর মনােনিবেশ করা ভদ্রমহিলাকে । ক্লিপ আটকানাে ছােট রিডিং ল্যাম্পটা বইয়েন মলাটে গেথে স্বল্প আলােতেই দু&#039;চোখ পাতায় আটকে মিশে গেছে অন্য জগতে , দেখলেই বােঝা যায় । জামিল সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে মনােযােগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে তাকালাে রতনে দিকে । পূর্বের অস্বস্তিটুকু কাটাতেই হয়তবা জিজ্ঞেস করে -তা , আপনারা মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছেন বুঝি ? রতন হাসলাে - তা বলতে পারেন । বছরের এই একটিবার সংসারের বেড়ী খুলে দিন কয়েকের জন্য বেরিয়ে পড়ি চোখ মেলে দেশটাকে দেখতে । আক্ষরিক অর্থে মদুচন্দ্রিম সেরেছি অনেক আগেই । কিন্তু ঘরছাড়লেই সেই আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে পদে পদেই
for বতন খেয়াল করে দেখে - রিসিতা পরিচয় করিয়ে দেবার পর জামিল আর একটিবার ও বিসিতার মুখপানে তাকিয়ে কোন কথা বলেনি এপর্যন্ত । রিসিতাও না । জামিলের কথা শুনে মনে হলাে , রিসিতাকে প্রথমটায় চিনে উঠতে পারেনি , রিসিতা কিন্তু চিনে ফেলেছে প্রথম দেখাতেই । যাই হােক- বছর তিনেক আগের চৌঠা অক্টোবর মানে রিসিতার জীবনে রতনের আগমনের আগের ঘটনা অর্থাৎ অতীত । আগমনের অতীতে রতনের কিইবা যায় - আসে । এমনি রিসিতারও না । বরাবরের মত কানে এয়ারফোন লাগিয়ে ওয়াকম্যান শুনছে জানালায় চোখ রেখে - ওর প্রিয় গানগুলির সুরের দোলায় হারিয়ে যায় ভালবাসার ভুবনে । জামিল সিগারেটের প্যাকেট খুলতে গিয়ে কি মনে করে উঠ দাঁড়ায় এগিয়ে যায় সামনের কান ফাকা কামরাকে উদ্দেশ করে । রতন তাকায় চারপাশে । জামিলের স্ত্রী বই বন্ধ করে উপরে মালামালে চোখ বুলিয়ে জামিলের ফাকা সীটটায় হেলান দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে তন্দ্রায় চোখ দুটি খুঁজে রাখে । রিসিতা সেদিক পানে রতনকে ইশরায় বলে ফিসফিসিয়ে -যদিও ব্যাপারটা অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মত - তবু বলি , উনাকে দেখে আমার কি মনে হচ্ছে জানাে - পৃথিবীর যাবতীয় রূপ - রঙ - রস থেকে চোখ ফিরিয়ে রয়েছেন উনি । রতন রিসিতার কোলের উপর রাখা ওয়াকম্যানের সুইচটা অফ করে দিয়ে এয়ারফোন দুটো কোন থেকে খুলে নিতে নিতে গলা নামিয়ে বলে - আর আমার প্রেয়সী যে আমার কাছ থেকেই বেরিয়ে অন্যের ব্যাপারে নাক গলাননা কেন ? ওয়াকম্যানটা হাতব্যাগে পুরে , শাড়ির আঁচল সামলিয়ে শালটা গায়ে জড়াতে জড়াতে উঠে দাঁড়ায় রিসিতা
-হাত - পা ধরে গেছে , চলাে হেঁটে আসি । পা টিপে টিপে ব্যালান্স বজায় রেখে ও ঐনে হটতে ভারী মজা পায় বিসিতা । প্রেমে বা বাসে উঠতে এই কারণেই ওর ঘাের আপত্তি সারাটাক্ষন কেমন উপভোগ করতে করতে যাওয়া যায় । রতন যদি বলে ট্রেন জার্নিতে সময়ের অপচয় । বিসিতা তক্ষুণি এর যুক্তি খাড়া করে বলবে - অপচয় কোথায় ? সংসারের গণ্ডিটা এড়িয়ে ট্রেনে চেপে বসা মানেই তাে বেড়ানাে শুরু সংসারের হক বাঁধা নিয়মের ফাঁকে অফিসের কর্মব্যস্ততার ফাঁকের কয়টা মুহূর্তইবা কাটে এমন পাশাপাশি । এই যে হাতে হাত রেখে চলন্ত ট্রেনে হাঁটা , বুফে কারে মুখোমুখি বসে চোখ চোখে রাখা , পাশাপাশি সিটে গায়ে গা ছুঁয়ে বসে খুনসুটি করা - এগুলো তো বোনের বাড়তি বােনাস । রিসিতার যুক্তির কাছে রতন হার মানে । সত্যিকথা বলতে কি , বিয়ের তিনটে বছর হয়ে গেল কিন্তু প্রথমবারের অর্থাৎ বিয়ের দিন তিনেকের মাথায় মধুগ্রন্থিমাৰ মনলােই যেন বার বার ফিরে আসে , অনেক দূরের আকাশ আর মাটির খুঁয়ে যাওয়া দেখলেই । সেবার ঘােমটায় আড়াল করা নববধু রিসিত- জাফলঙের সবুজের খেয়ায় অন্যরকম হয়ে গেল কিছুক্ষণেই মাত্র দিন চারেক আগের লেখা অজানা - অচেনা লাঙ্গ বিধুর মেয়েটা এমন করে চেনাব হবে , জানার হবে । বিস্ময়ের ঘাের লাগা চোখে রতন শুধু অনুভব করছিল বিসিতার উচ্ছলতা , থিলতা ।

পরের বার সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে খােলা গলায় তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রেণে রবীন্দ্রনাথের দু&#039;কলি রিসিতার কণ্ঠে সুর ছড়ালাে যখন , রতনের বহুবার দেখা সমুদ্রকে আরাে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।ফেরার পথে ফয়েজ লেকের গভীর কালাে পানি কি ভীষণ মগ্নতা এনে দিয়েছিল বিসিতার চোখে । পড়ন্ত সূর্যটা পানির ছায়ায় দেখতে দেখতে পাশে দাঁড়ানাে রতনের হাতটা আঁকড়ে গভীর - আবেগে বলেছে - এর পরের ম্যারেজ ডে তে আমরা কুয়াকাটায় যেতে পারি না ? সাগর মেহনায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত নাকি দারুন লাগে দেখতে । রিসিতার আঁকড়ে ধরা হাতে রতন পরম ভালবাসায় অন্য হাতটি রেখে বলেছে - নিশ্চয় যাব । ম্যারেজ ডে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কেন - তার আগেই যাৰ । রিসিতা এবার সরাসরি চোখ রেখেছে রতনের চোখে । বলেছে , উহ - আগে নয় । আমাদের জীবনের বিয়ের দিনটি যতবার আসবে ততবারই শুধু নতুন করে দেখবাে আমাদের অচেনা চার পাশ কে । সংসার ধর্ম আগে , বুঝলে মশাই ! অর্থ - সময় দুটোই তাে সংসার থেকে নিয়ে সঞ্চয় করতে হবে । তারপর বুফে কারে জানালার পাশ ঘেঁষা খালি আসনগুলােয় চোখ বুলাতেই সৌজন্যতার হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়ালাে জামিল । রতন - রিসিতা কিছু বলবার আগেই সিগারেটে শেষ টান দিয়ে জানালা গলিয়ে এগিয়ে গেল নির্দিষ্ট কামরার দিকে । সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লাে রতন , অন্যটায় রিসিতাকে বসতে বলে । শীতের হিমেল হাওয়ায় রিসিতার খোঁপায় ছড়ানাে আলগা হয়ে যাওয়া চললি চােখে

নল পালিয়ে এগিয়ে গেল নষ্ট করার দিকে । সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লাে রতন , শীতে হলে হ ss বসতার খোঁপয়ে ছড়ানাে আলগা হয়ে যাওয়া চুলগুলি চোখে মুখে বরই হড় পড়ছে । ওদিক সামাল দিতে দিতে রিসিতা তাকালাে রতনের ঢিলে টাইয়েরনটের দিকে আঙুল তুলে ইশারা করতেই রতন ত্বরিতেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে কম কল শর্টর সংগে মেরুন রঙা টাই , ধুপছাই রঙ স্যুট পরিহিত রতনের দিকে তাক বসত ভূমিকা হড়াই বললাে - পূর্বে যাহা দেখা যায় নাই অর্থাৎ অ - পূর্ব । ‘ একটি বলেই মুচকি হেসে রতন পকেট থেকে চিরুণীটা বের করে ব্যাক ব্রাশ সেরে তকালে বস্তির মুখে - এর ? হ সকল সময় দেখা যায় - অতি সাধারণ । অর্থ এখন তোমার হাজবেন্ড । -তৰ এতক্ষণ আর কি ছিলে ? কারণ তোমার চোখের তারায় ছিলাম এতক্ষণ । প্রেমিকদের অবস্থান প্রেমিকাদের দুধের তারায় একতরফা । তা কতজনের চোখের তারায় এমন ছবি দেখেছেন মশাই ? -একজনের চোখে । তাও আবার সারা বছর নয় , বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে । যখন
- আমাদের বিয়ের দিন আসে , মনে পড়ে অনেকগুলাে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের যােগফল এলাে , আকাশ ভরা কত জোছনা গড়িয়েছে এই যােগফলে , বুক ভরে নেয়া মুক্ত হাওয়ায় ভেসে বেড়ানাে রিসিতাকে দেখা প্রথম দিনটি মনে পড়ে । -খুব হয়েছে রােমান্টিকতা । এবার অন্য রকম একটা গল্প শােন । --গল্প ? -হ্যা , একজন মানুষের হিসেবের গল্প । তিন ভাই আর পাঁচ বােনের মধ্যে সবার ছােট যে বােনটি তার তখন অনার্স ফাইন্যালের দু&#039;মাস বাকি । নােটপত্র গুছিয়ে বাড়িতে এসে হাজির , মন দিয়ে পড়বে বলে । পড়ার টেবিলে মনটা যখন প্রায় গেঁথেই ফেলেছিল , মেঝ ভাবী বলে গেলেন ফিসফিসিয়ে খবরটা - ননদিনী ড্রয়িং রুমে নতুন হাওয়া বইছে । খুব ভাল প্রপােজাল এসেছে । সরকারী চাকুরে ছেলে - কিছুদিন পর পর বদলি , কোয়ার্টার , আয়া , বাবুর্চি , ড্রাইবার - সব ফ্রি । মেয়েটি নােট বন্ধ করে ভাবীর চোখে তাকায় - বলে দাও আমি রাজি , ঘুরতে আমার খুব ভাল লাগে । ভাবী বন্ধ নােটটি খুলে দিয়ে বলেন - সামনে চার তারিখে ওরা দেখতে আসবে । পছন্দ হলে আক - এর দিন ঠিক হবে । এখন তুলে নিবে না , পরীক্ষা দিতে হবে । অতএব , ননদিনী মন দাও পড়ায় ।ফেলটেল মারলে শ্বশুর বাড়ীতে প্রেষ্টিজের ব্যাপার । নির্দিষ্ট তারিখে পড়ার টেবিলে কান্টের থিউরির বিশ্লেষণ নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিল যখন মেয়েটি , মেঝ ভাবী এসে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে । ওয়্যারড্রোব থেকে সমুদ্রনীল শাড়িটা মুখের কাছটিতে ধরে বললেন - খুব মানাবে । পরা হলে আমায় ডেকো । মেয়েটি নিজের মত করে কাজল আঁকলাে চোখে , কপালে পরলাে টিপ , শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে রান্নাঘরে ভাবীর হুলস্থুল কাজের মধ্যে হাজির । ভাবীর চোখ তাে ছানা বড়া । 
-সে কি , একেবারে রেডি যে । খুব তাড়া ? ভাবী সংগে করে নিয়ে গিয়ে সামনের সােফাটায় বসিয়ে দিলেন । তিনজনের হয়টি চোখ নিবন্ধ হলাে মেয়েটি মুখমন্ডলে । পাত্র , পাত্রের ফুপা এবং মামা । দু&#039;চারটে কথার এক পর্যায়ে পত্রের মামা ছােট লাল রঙা বন্ধুটি পকেট থেকে সেন্টার টেবিলে রেখে বললেন - একটা তবে সেরে ফেলা যাক আজই । পরীক্ষার আগে তাে আর অনুষ্ঠান হচ্ছে না । মেয়েটির বাবা এবং বড় ভাই বাধ সাধলেন । এভাবে হয় কি করে । পঙ্গু হয়ে থাকলে কথা চুান্ত হতে পারে , আদ্ - এর জন্য অন্ততঃপক্ষে সাতটি দিন তাে সময় দরকার আমার । পাত্র স্বয়ং সেন্টার টেবিলে রাখা বাক্সটি হাতে তুলে নিয়ে জবাব দিল - বেশ তাহলে তাই হােক । আসছে বার তারিখ দিন - ক্ষণ পাকা হলাে।মেয়েটির পড়া মাথায় উঠলো । আবীয় - স্বজন , বন্ধু - বান্ধব , পাড়া - প্রতিবেশী ঘিরে রইল মেয়েটিকে । গায়ে হলুদের রাতে হাতে রাখী বাঁধতে বাঁধতে ছােট ভাৰী সাবধান করলেন - কাল রাতে তোমার বর খুলবে এটা । তার আগে খুলে ফেলাে না যেন । হাতে মেহেদীর নক্সা আর &#039; রাখী বেঁধে বিয়ের পাটিতে বসে বসেই জনা ত্রিশেক বর যাত্রীসহ বর আগমনীর সংবাদ পেল মেয়েটি ।

হৈ - চৈ করে মেয়েরা সবাই বিয়ের কনে সাজিয়ে ফেললাে মেয়েটিকে । খাবার রেডি বরযাত্রীদের কেউ আসছে না টেবিলে । ছেলেরাও ডাকতে গিয়ে আটকা পড়েছে । বাবা তদারকি হেড়ে নিজেই চলে এলেন মজলিশে । কাজী সাহেবকে ঘিরে ছােটখাট একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছে । বিষয়টাও স্বাভাবিক । মােহরানার পরিমাণ কত হবে আর কত হবে না - এ নিয়ে দু’পক্ষে মত বিরােধ । বাবা বললেন - ঠিক আছে , ওসব পরে হবে । খাবার রেডি , আসুন , আগে খাওয়া - দাওয়ার ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলা যাক । বর দাঁড়িয়ে জবাব দিল - খাওয়া - দাওয়ার পর এ সবের ফয়সালা হয় নাকি কখনন ? আগে কথা ঠিক না হলে খাওয়া যাবে না । আমাদের অংকে আপনারা রাজি কিনা বলুন । মােহরানার দরদামের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক , কিন্তু পাত্র স্বয়ং হিসেবের কঠগড়ায়।এটা কি স্বাভাবিক ? বাবা নীরব হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ । তারপর দু&#039;হাত তুলে সবাইকে থামতে ইশারা করে বললেন- আমি অনুরােধ করছি - আপনারা খাবার টেবিলে অসুন । কথা দিচ্ছি , আপনাদের হিসেবের ক্ষতি আমরা করবাে না । খাবার পরে এ নিয়ে আর কোন কথা হবে না । সুষ্ঠুভাবে খাবার পালা চুকলাে যখন , বাবা মজলিশে দাঁড়িয়ে বরযাত্রীদের সামনে দু&#039;হাত জোড় করে বললেন - আমাদেরকে মাফ করবেন । মেয়ের বিয়ে আমি দেব না । ইস্পতে কঠোর বাবা সেই যে নিজের ঘরে গিয়ে বসলেন খাটে , আর নামানাে গেল না কোন কিছুতেই । বড় ভাই , মেঝ ভাই বুঝালেন , স্বজনরা বুঝালেন - আপনার একটা জেদের জন্য মেয়টার ভাগ্য পােড়াবেন না । বাবা হাসলেন বেদনাবিধুর । শান্ত , ধীর - স্থির কণ্ঠে বললেন - মেয়েটা আমার অনাদরের নয় । পােড়াবাে না বলেইতাে ঐ ছেলের হাতে জ্বলতে দিতে পারলাম না । মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়নি , সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়েছি । এ নিয়ে আর কোন কথা বলে লাভ হবে না । আর মেয়েটি নিজের হাতের রাখী খুলে ফেললাে নিজেই । বেসিনের আয়নায় নিজের বধূ সাজ দেখলাে , ঠান্ডা পানির ঝাপটায় একে একে ধুয়ে ফেললাে সমস্ত সজ্জা । মস্ত খোঁপায় জড়ানাে ফুলগুলি একটা একটা করে ছিড়লাে । তারপর নােটপত্র আর কাপড় চোপড় ব্যাগে গুছিয়ে পায়ে পায়ে এগেলাে বাবার ঘরের দিক পাশে খবরের কাগজটা পড়ে রয়েছে , বাবা শূন্যদৃষ্টি মেলে জানালায় চেয়ে । মাথায় হাত রেখে ডাকলাে মেয়েটি - বাবা বসবাে তােমার কাছে একটুখানি ? মাথা থেকে হাতটা তুলে নিয়ে নীরবেই বসালেন পাশে । -বাবা , আমার পরীক্ষা আর মাত্র ক&#039;টা দিন । বাসায় ভাল করে পড়বাে বলে এসেছিলাম কিন্ত হচ্ছে না । আমি কালই হলে চলে যেতে চাই । সবার সাথে কমপেয়ার করেই বােধ হয় ভাল হবে পড়াটা । বাবা ব্যাস্ত হলেন- এসে না বললি পরীক্ষার দু&#039;দিন আগে যাবি এবার ? - বলেছিলাম তাে । কিন্তু পড়া এগােচ্ছে না যে , তুমি আমাকে কিছু টাকা দাও বাবা- কাল সকালের ট্রেনেই রওয়ানা হবে , সব গুছিয়ে ফেলেছি । -

মেয়ের স্বাভাবিকতায় বুকের পাথরটা হাল্কা হয় অনেকখানি । শুধু ভেতরে খচখচ করতে থাকে কাঁটাটা । মেয়ের মতটা পর্যন্ত নেয়া হলাে না জেদের বশে । নিজের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে অপরাধী হয়ে রইলেন না তাে মেয়ের কাছে । -বাবা কিছু বলছে না যে । মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন বাবা অন্যকথা আমার উপর তাের কি খুব রাগ হচ্ছে মা ? -কেন বাবা ? মাথায় হাত রেখে উঠে দাঁড়ান বাবা- সব ব্যাপারে এত স্বাভাবিক থাকিস কি করে তুই ? আমার মতামত তাের ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দিলাম যে । -না বাবা , এমন করে এখনই দায় ঘাড়ে নিতে বললাে না । জীবনটা আমার সত্যি কিন্তু ওটিকে তুমি সাজিয়ে না দিলে আমি বুঝবাে না যে কিছুই । ঠিকই তাে হয়েছে বাবা । ঝরে যাবে জেনে কি তােমার ফুল তুমি এমন কোথাও রাখবে , নাকি সেখানেই দেখে - শুনে রাখবে , যেখানে সতেজ থাকবে । বাবার দু&#039;চোখ ঝাপসা হলাে বটে , আবেগে অধীর হলেন না । শুধু বললেন- কাল সকালের ট্রেনে আমিই তােকে রাখতে যাব । টানা দু&#039;মাস ধরে অনার্স ফাইন্যাল শেষে মেয়েটি দেখে বাবা হল গেটে দাঁড়িয়ে । -বাবা তুমি নিতে এসেছাে ? বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন - নিতে আসিনি । তবে তুই যদি যেতে চাস , অবশ্যই নিতে এসেছি -ব্যাপারটা কি বাবা ?
টানা দু&#039;মাস ধরে অনার্স ফাইন্যাল শেষে মেয়েটি দেখে বাবা হল গেটে দাঁড়িয়ে -বাবা তুমি নিতে এসেছাে ? বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন - নিতে আসিনি । তবে তুই যদি যেতে চাস , অবশ্যই নিতে এসেছি । ব্যাপারটা কি বাবা ? -খুব সুন্দর । ডিপার্টমেন্টে তারা তােকে দেখেছে , জেনেছে । এখন তাের মতামত পেলে , .. গম্ভীর হয়ে যায় মেয়েটি - বাবা এ ক&#039;মাসে তুমি কি হন্যে হয়ে পাত্র খুঁজে বেড়িয়েছ বাবা ? -হন্যে হবাে কেন রে ? আমার ফুলের মত মেয়ে , সৌরভ চিনেই তাে ওরা এসেছে । তুই তাে বলেছিলি , আমার ফুলটাকে সতেজ রাখার ঠাঁই আমাকেই খুঁজতে হবে । -ঠাই কি তােমার সঠিক মনে হয়েছে বাবা ? -নিশ্চয় । -আমায় কবে নিয়ে যেতে চাও আমি সেভাবেই তৈরি থাকবাে বাবা । রতন গালে হাত দিয়ে রিসিতার একটানা কথা শুনছিল মুগ্ধ হয়ে । রিসিতার হাত আপন হাতের মুঠোয় তুলে নেয় এবার । গভীর আবেগে বলে , তারপর বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের করুণ সুরের মূর্ধণায় মেয়েটির বাবা প্রিয় ফুলটি আমার হাতে তুলেদিলেন । তাই তাে ভাবছি এ তিন বছরে এতটুকু ম্লান হয়ে যায়নি তাে ? দেখি দেখি , রতন হাত বাড়িয়ে রিসিতার চিবুক তুলে ধরার পূর্ব মুহূর্তেই ওয়েটার এসে স্থান - কাল মনে করিয়ে দিয়ে ব্যবসায়িক কণ্ঠে শুধালাে চা দেব ? রিসিতা রতনের চোখের তারায় চোখ স্থির করে মুখ টিপে হেসে জবাব দিল -- না &#039; ।

************
ফাহমিদা রিআ
*************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/120134/</link>
				<pubDate>Sun, 12 Jun 2022 15:48:36 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23য" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#য</a>েতে যেতে</p>
<p>পূর্বাকাশে সূর্যের উঠি উঠি ভাবটা তখনও কাটেনি পুরােপুরি । হাতে মার্জিনাল সময় নিয়ে নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে উঠে টিকিটের নাম্বার মিলাতে না মিলাতেই ট্রেনটা বিশাল দেহ নড়িয়ে চলতে শুরু করলাে । সাউন্ড বক্সে ভেসে এলাে সুরেলা কণ্ঠে যাত্রা শুরুর এনাউন্সমেন্ট । নির্ধারিত আসনে রিসিতাকে বসতে বলে বাংকারে ব্যাগ &#8211; ব্যাগেজ তুলে এতক্ষ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-120134"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/120134/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c9c433193217b2bf8731f3f3bbbed79f</guid>
				<title># ছোট গল্প
 #সমান্তরাল


আজও এলো না বুয়া।  টানা পাঁচ দিন। মোবাইলটাও অফ। অসুখ বিসুখ যে করে নি তা অন্তত নিশ্চিত। নইলে রিং হবার সাথে সাথে বুয়া ফোনটা ধরতো। আর কোঁকানোর সুরে মিনমিনে কৈফিয়ত দিতে দিতে বলতো---- মাথার বিষ ওঠসে খালাম্মা। মাথা তুলতে পারতেসি না। চক্ষে আন্ধার দেখতাছি। বিষ না কমলে কামে যাওন যাইবো না।&quot;
রেবেকা বেগম  প্রতিবারই ছুটি মন্জুরের আবেদন গলাধকরণ করেন নিরুপায় মনে। 

দু&#039;চারদিন  শর্টকাটে চালিয়ে নেন একার সংসার।
আসলে শরীরের চেয়ে মনটাই আজকাল দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিজের জন্য দু&#039; খানা রুটি বেলতেও যেন আলসেমি লাগে। অথচ এইতো ক&#039; বছর  আগেও  তিন ছেলে আর স্বামীর জন্য কাক ডাকা ভোরে ওঠে একা হাতেই হটপট ভরে রুটি বেলেছেন সেঁকেছেন। ধোঁয়া ওঠা সব্জির পেয়ালা  আর  রাতে আগে ভাগে তৈরি করে রাখা ঘন দুধের পায়েশের বাটিতে টেবিল সাজিয়েছেন। নাস্তার সাজিয়ে চটজলদি শুরু করতেন রান্নার আয়োজন। দুই চুলাতে রান্নার ফাঁকে ফাঁকে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে সেরে নিতেন খাওয়া।
ছেলেদের পোশাক আশাক এগিয়ে, বই খাতা গুছিয়ে  স্বামীর অফিসের খাবার হট ক্যারিয়ারে সাজিয়ে  যে সময়টুকু পেতেন নিজের জন্য তার প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতেন দৌড় ঝাঁপের উপর।
নিত্য নৈমত্তিক এভাবেই একটা একটা করে দিন পেরিয়ে চাকুরী জীবন শেষ করলেন রেবেকা বেগম। ছেলেরা বড় হলো, নিজের পায়েও দাঁড়ালো। ওদের বাবার বড় সাধ ছেলে বৌ দেখার। রেবেকা বেগম উৎসাহ দেখান না। বলেন, কটা বছর নিজেকে গড়ে নিক। তাছাড়া ছেলের বৌ আনতে গেলে যে বাড়ি লাগবে। নইলে শ্বশুরবাড়ি সে আসবে কেন? ভাড়া বাড়িতে নিজেদের জীবন কাটালাম, বৌরা কাটাবে ভেবেছো?
----- তুমিওতো বৌ হয়েই এসেছিলে একদিন।
----- ভুলে গেলে? এসেছিলাম আমার শ্বশুর বাড়ির বৌ হয়ে। কিন্তু আজতো আর সেটি নেই। বহু শরীকের ভাগে টুকরো টুকরো হয়ে বিলীন এখন অন্যের মালিকানায়। 
রেবেকা বেগম মনে মনে একটা ছক এঁকে রেখেছেন নিজের মত করে। ছোট বড় মিলিয়ে তিন ছেলেই রোজগেরে। ওরা বাঁধাধরা কিছু দিক আর নাই দিক, ওদের খরচ অন্তত বহন করার দায়টা নেই আর। স্বামী স্ত্রী মিলে এ ফান্ড ওফান্ড যা জমিয়েছেন আর গ্রামের ফসলি জমির যেটুকু আছে বছরান্তে ফসলের যৎসামান্য আশায় না থেকে বিক্রি করে শহরতলীতে দু&#039; কাঠা জমি নিতে পারলেই ছেলেদের উপর দায় বর্তাবেন একেক জনকে একেক ফ্লোরের।
ভাবনার সাথে কাজের মিল রেবেকা বেগমের জীবনে খুব কমই হয়েছে। এটাও তাই হলো। বলা নেই কওয়া নেই দুরারোগ্য রোগে একটা বছরের মধ্যেই স্বামী জোড় ভেংগে পরপারে পাড়ি জমালেন।  চিকিৎসার ব্যয়ভারে শুন্যের কোঠায়  সঞ্চয়।  জীবন ধারনের অবলম্বন বলতে পেনশন আর তিন সন্তানের উপর নির্ভরতা।
এ নির্ভরতা যে কতটা অকল্পনীয় , কতটা কঠিন আর কতটা বাস্তবতার চিরন্তন চিত্র- তা আগে থেকে অনুমান করা কোন স্নেহময়ী মায়ের পক্ষে  অসম্ভব। বড় দুজন দু চার বছর অতিক্রম করলেও ছোটটা সবে রোজগেরে হয়েছে।
মেজোর নিজ পছন্দের মেয়েকে স্বীকৃতি দিয়েছেন রেবেকা খুব অল্প সময়ের নোটিশে। হ্যা নোটিশইতো। একসাথে লেখাপড়া শেষ করেছে ওরা। স্বভাবতই মেয়ের বাবা মা মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভালো প্রপোজালগুলি ঠেলে ফেলার সময় নয় এটা। মেয়েকে চাপ দেন। সে চাপ মেজোর মাধ্যমে মায়ের উপর বর্তায়।
রেবেকা বেগম বড় ছেলের আগে মেজোর বিয়ে দিতে ইতস্তত করেন নি যে তা নয়। কিন্তু ধোপে টেকে নি। আর টিকবেই বা কেন। বড়লোক বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। সুন্দরী এবং শিক্ষিতা। সবচেয়ে বড় কথা, দুজন দুজনকে পছন্দ করে রেখেছে ভার্সিটি জীবনের শুরু থেকেই।

রীতি অনুযায়ী রেবেকা বেগম প্রস্তাব নিয়ে গেলেন
মেয়ের বাড়ি। অনামিকায় আংটি পরিয়ে এনগেজমেন্ট টাও সেরে নিলেন।  সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবার পর মেয়ের বাবা উত্থাপন করলেন একটি মাত্র আবদার। আর  আবদারটা নেহাৎ অযৌক্তিকও নয়। রেবেকা বেগম তাই মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। তিন তিনটি পুত্র রত্ন তাঁর। একটি যদি শ্বশুরালয়ের বাসিন্দা হয়ে ভবিষ্যতের আখেরটা গুছাতে পারে মন্দ কি।  অর্ধেক রাজত্ব নয়, পুরো রাজত্ব সহ রাজকণ্যা লাভ। 
অমত করে নিজস্ব কোন  ঠিকানাটায় তিনি এমন রাজকন্যাকে  যত্ন আত্তিতে রাখতে পারবেন।

অতঃপর বড় ছেলে।  মাস দুয়েকের মধ্যে চটজলদি মেয়ে দেখে দুই ছেলের বিবাহত্তোর সংবর্ধনা এক আয়োজনেই সেরে ফেললেন রেবেকা।
মেজো বৌ ফিরানিতে বাবার বাড়ি গিয়ে আর এলো না। ছেলেও নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র  একটা দুটো করে নিয়ে যেতে যেতে শ্বশুরালয়ের সদস্য পদ নিয়েই ফেললো।

বড় বৌমা চাকুরীজীবী মেয়ে। মাস দুই কাটতে না কাটতে বদলীর অর্ডার এলো অন্য শহরে। যথারীতি মাস ছয়েকের মধ্যে বড় ছেলেও চেষ্টা তদবীর করে নিজের বদলীটা নিয়ে জয়েন করলো এবং ওদের নতুন সংসারটা পাতলো অন্য শহরেই।

ছোট ছেলের বিয়ে দেবার সাধ অন্তত ক&#039;বছর নেই রেবেকা বেগমের। ঈদে উৎসবে দুই ছেলে ছেলেবৌরা আসে, আবার যায়। ছোট ছেলেকে নিয়ে  রেবেকা বেগমও ছেলেদের সংসারে বেড়াতে যান। দেখে শুনে ফিরে আসেন। 
মনের মধ্যে দুঃখবোধটা তখনও গেঁথে বসেনি। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে যখন ছোট ছেলেটা কোর্ট ম্যারেজ করে বৌ নিয়ে এসে হাজির হলো সমস্যার শুরুটা হলো তখন থেকেই।

সংসারের নিত্য অশান্তিতে রেবেকা বেগম হাঁপিয়ে ওঠলেন রীতিমত। সেদিন ছেলেও যখন বৌকে শাসন করা বাদ দিয়ে মাকেই বুঝাতে এলো &quot;আর একটু সহ্য করো মা&quot;।  রেবেকার সহ্যের সীমা লংঘিত হলো সেদিনই। ফুঁসে ওঠে তর্জনি তুলে বললেন, বেরিয়ে যা, বেরিয়ে যা এক্ষুনি বৌকে নিয়ে।

শেষতক সমাধান হলো। তিন ছেলেই যেহেতু  স্বনির্ভর জীবন এবং জীবিকায়। তাই আপন আপন আবাসই অধিক শ্রেয়। অবসর জীবনে রেবেকা বেগমের একা একটি বাড়ির ভাড়া টেনে বেড়াবার কোন যুক্তি নেই। চার মাস করে করে তিন ছেলের কাছেই উনি ঘুরবেন ফিরবেন, থাকবেন।নিশ্চিন্ত, নির্ঝন্ঝাট জীবন।

সারাটা জীবন কষ্ট সয়ে যাওয়া স্বনির্ভর স্বাধীনচেতা মা প্রথম ক&#039;দিনেই বুঝে নিলেন চারমাস কতটা দীর্ঘ কঠিন সময় তার জন্য।
বছর ঘুরা পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গোনা সম্ভব হলো না আর। তিন পুত্রের প্রত্যেকের আশ্রয়ের ছায়া যে তার জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত, হাড়ে হাড়ে অনুভব করলেন তিনি অল্প ক&#039;দিনেই।

ফিরলেন নিজ কর্মজীবন কাটানো পরিচিত মুখগুলোর শহরে। কর্ম ব্যস্ততার পায়ে পায়ে যে শহরে কাটিয়েছেন তিনি জীবনের অনেকগুলো সময়। আটশো স্কয়ার ফুটের ভাড়াবাড়ির ছোট্ট গন্ডিতে একার সংসার পাতলেন। বাতাসে মিশে গেলো  দীর্ঘশ্বাস ---এই একটি গর্ভে তিন জনের ভার বহন করলেও , এক মায়ের ভার তিন জনে বইতে পারলো না। কি বিচিত্র  সময়ের চাকা।কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যায়, কেউ জানে না। শুধু জানে,সময়ের কাছে বড় অসহায় মানুষ। ছেলেরা যে যার প্রয়োজনে আসে। মায়ের পেনশন, বোনাস যেমন আছে দিব্যি চলতে পারেন মা। ভাবনা ওদের মায়ের পুরো কর্মজীবনের আগলে রাখা ধন গুটিকতক সঞ্চয় পত্রের দিকে। প্রয়োজন পড়লেই বড্ড বেশি মনে পড়ে যায় একমাত্র সহায়ক হিসেবে।

কলিং বেলের আওয়াজে চিন্তা ছিন্ন হলো রেবেকা বেগমের। তিনতলার ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়াতেই দেখলেন বুয়াকে। 
যাক এসেছে তাহলে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রেবেকা। রশি বাঁধা চাবির থলেটা গ্রিলের ফাঁকে নামিয়ে দিলেন।
বাড়িতে ঢুকেই চাবিটা টেবিলে রেখে ডাইনিং এর মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসলো বুয়া।
রেবেকা বেগম  সরাসরি জিজ্ঞেস  করলেন,
----- মাথা ব্যাথা সারলো?
----- মাতা ব্যাথার চাইতেও বড় ব্যাথা আম্মা। এক্কেরে দিলে চোট পাইসি, অন্তরে চোট , বহুত কষ্ট পাইসি আম্মা, কমুনে।
বিকেলটার একাকীত্বটা বুয়াকে দেখেই যেন কেটে গেছে রেবেকা বেগমের। গল্প করার আয়েশি ইচ্ছে নিয়ে বসলেন জানালা লাগোয়া মোড়াটায়।
----- তোমার অন্তরে আবার কে চোট দিলো বুয়া?
----- কে আবার? ঘরের মাইনষেই দিছে, নিজের পুতেই দিছে। খায়া না খায়া যাগোরে মানুষ করলাম তারাই আজ বোবা কালা সাইজা বইসা মজা দেহে, মায়েরে চিনে না।
আঁচলের খুঁটে দু&#039; চোখের কোন মুছে বুয়া বলে চলে অবিরাম,
-------গত মাসে বড় পুতে মোবাইল কইরা কইলো, মা এক হাজার ট্যাকা বিকাশে পাঠায়ে দাও,বিপদে আছি। সামনে মাসে দিমুনে।
ক&#039;দিন থাইক্যা বাড়িওয়ালি ঘর ভাড়ার জন্যি চাপ দিতাছে।  কি আর করা,পোলারে ফোন দেই, পাই না। দুই পোলার কেউ মোবাইল ধরে না। মনে কু ডাকলো। হ্যারা ভালা আছেতো? সকালের আলো ফুটতে না ফুটতে বাসে চাইপ্যা গাঁয়ের বাড়ি গ্যালাম। গিয়া দেহি সব ভালাই আছে। পোলারে ট্যাকার কথা তুলতেই বড় বৌ মুখ ঝামটা দিয়া কইলো,&quot; মা হইয়া কয়ডা ট্যাহা না হয় দিছেনই, তয় হেইডা আবার দিতে হইবো।
বুঝায়া কইলাম, শহরে ঘর ভাড়া দিয়া থাকতে হয়।  খাওয়া পরায় লাগে। নিজেরটা নিজেই করি। তোমাগো কাছে এক পয়সাওতো কখনো চাই না। নিজের রক্ত পানি করা পয়সা টাই চাইতেছি।
বৌ অমনি মুখ ঝামটা দিয়া কইলো, পোলাতো আপনেরই। না হয় মায়েরটাই নিছে একবার, তয় কি হইছে?  ফ্যারত দেওনই লাগবো?তাজ্জিব কথা।
আমার রাগ উডলো মাথায়,কইলাম--- ব্যাদ্দপের ঘরের ব্যাদ্দপ চুপ থাক্।  আমার পোলার দায় রইছে আমারে দেখ ভাল করার। কি করে আমার জন্যি তারা, কি করে?
ছোড বৌটা ফাল দিয়া আইসা কয়,  ওরে আমার দরদের মারে, পোলার কামাই খাউনের সখ কত। পোলার কামাই খাইতে গ্যালে পোলারে লেহাপড়া শিখাইয়া মানুষ করন লাগে। করছোনি মানুষ। বিদ্যা দিছো প্যাডে? আবার কামাই খাওনের হাউস।

আম্মাগো বিশ্বাস যান আমি একটা কথাও কই নাই আর। সোজা বাইর হইয়া আইস্যা পড়সি। গাড়িতে উঠছি। ভাবছিলাম পোলারা আমারে ডাইকা নিবো। বৌগো বকা দিয়া কইবো মার লগে ব্যাদ্দপি করছো, মাফ চাও। পিছন চ্যায়া চ্যায়া দেহি, নাহ্ কোন পোলাই আইলো না।  একবার&#039; মা&#039; কইয়া আটকাইতেও আইলো না।
আম্মা, আপনিই কন, আমাগো মতন গরীব মাইনষে কেমনে পড়ালেহা শিখামু। নিজে না খাইয়া ওগো মুখে খাবার তুইলা দিছি, নিজে ছিড়া কাপড় পিন্দা ওগো নতুন কাপড় পিন্দাইছি আর ওগো সামনে ওগো বৌরা কয় মানুষ না কইরা পোলার রোজগার খাওনের হাউস করছি। এই কথা শোনার আগে আমার মরণ হইলো না ক্যান আম্মা।

বুয়ার দু&#039;চোখ ভেসে যাচ্ছে অঝোর ধারায়। ভিজে ওঠছে  রেবেকা বেগমের চোখও। অন্তরে বইছে ঝড় প্রবলবেগে। সে ঝড়ে নিজের অবস্হান আবিষ্কার করেন রেবেকা নতুন করে। স্পষ্ট দেখতে পান একই সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন দুই অবহেলিত&quot; মা&quot;। যেখানে শিক্ষিত অশিক্ষিতর কোন ভেদাভেদ নাই। দুই মা চলেছেন আপন আপন গন্তব্যে। যে পথ সমান্তরাল, পাশাপাশি।

**************                                  
ফাহমিদা রিআ 
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/118092/</link>
				<pubDate>Fri, 03 Jun 2022 06:42:43 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p># ছোট গল্প<br />
 <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23সম" rel="nofollow ugc">#সম</a>ান্তরাল</p>
<p>আজও এলো না বুয়া।  টানা পাঁচ দিন। মোবাইলটাও অফ। অসুখ বিসুখ যে করে নি তা অন্তত নিশ্চিত। নইলে রিং হবার সাথে সাথে বুয়া ফোনটা ধরতো। আর কোঁকানোর সুরে মিনমিনে কৈফিয়ত দিতে দিতে বলতো&#8212;- মাথার বিষ ওঠসে খালাম্মা। মাথা তুলতে পারতেসি না। চক্ষে আন্ধার দেখতাছি। বিষ না কমলে কামে যাওন যাইবো না।&#8221;<br />
রেবেকা বেগম  প্রতিবারই ছু&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-118092"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/118092/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">3feb6c14baf68fe0b72f9ea03396abbd</guid>
				<title>#ছোট গল্প
#﻿ পৌনঃপুনিক


খবরটা শোনার পর থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া অনুভব করলেন তারানা নিজের মনে। শোনা অবধি কেমন যেন একটা দায়বদ্ধতা চেপে বসে তারানার কাঁধে। নিজের অবস্থানটাকে মাঝ পথে কল্পনা করে প্রথমেই ভেবে নেন শুরুটা করবেন কোত্থেকে ? ব্যাপারটা যখন মিজান সাহেবের, নিশ্চয়তাটা নিতে হবে সেখান থেকেই আগে। আবার খুব বেশি নিশ্চিত হবার পর মীনা ভাবি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলেতো পন্ডশ্রম সবটুকুই। সাত পাঁচ ভেবে মীনা ভাবির জন্যই মনটা উচাটন হল তারানার। 
ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো পেশায় নিয়োজিত তারানা আগাগোড়া। বর্তমানে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেছেন। এক মাত্র মেয়ে নাফিসার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাড়িটাই কেমন ধু ধু করে। ব্যবসায়ী স্বামী আজ দেশে তো কাল বিদেশে। আজ এ শহর তো কাল ও শহর। মিটিং সেমিনার কনফারেন্স নিয়ে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। তারানা বেগম কখনো কখনো সঙ্গী হন সাগর পাহাড় কিংবা অভয়ারন্যের হাতছানিতে। তবে ইদানিং ডায়াবেটিস ভর করায় নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে নিয়ম মাফিক চলা ফেরাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ল্যাপটপে বসে নাফিসার সঙ্গে মন চাইলে যে একটু গাল পল্প করবেন তা হয় না। একে তো দুই দেশের সময়ের অমিল তারপর আবার মাস তিনেক হল জবে ঢুকেছে নাফিসা। খবরের কাগজে হেডিং এ চোখ বুলিয়ে দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে টেলিফোনে নাম্বার ঘুরালেন তারানা। ওপ্রান্তে মিনার কন্ঠ
- হ্যালো।
- মীনা ভাবি কেমন আছ ?
- তারানা ভাবি যে, দেশে আছ তুমি ?
কৃত্রিম অভিমানে বলে মিনা।
- আছি ভাবি, দেশেই আছি। সেদিন কি আর আছে, শরীরটা একটু অনিয়ম হলেই বিদ্রোহ করে বসে। আমার কথা থাক আজ। তোমার কথাই বলি।
এরপর তারানা ভুমিকা ছাড়াই যা বললেন মীনার মাথা থেকে পা পর্যন্ত শিরশিরে একটা ঢেউ বয়ে গেল। সারা চেতনা যেন মুহুর্তের মধ্যে অবশ হয়ে গেল। কি জবাব দেয়া উচিৎ কিংবা উচিৎ নয় কিছুই জোগালো না মাথায়। তারানা ফোনের ওপ্রান্তে ব্যাপারটা ঠিক আঁচ করলো। দীর্ঘ সময়ের বন্ধুত্ব। দুজনে এক সময় পাশাপাশি ফ্লাটে বিশটি বছর পার করেছে পারিবারিক ঘনিষ্টতায়। ওপ্রান্তে মীনার অনড় মুর্তি কল্পনা করে আবার কথা বলে তারানাই
- হ্যালো ভাবি তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি। এখুনি কিছু বলতে হবেনা। তুমি ফোন রাখ। আমি সন্ধ্যে নাগাদ আসছি, কথা হবে। 
নীরবে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন মীনা।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের সামনে। ছোট্ট টুলটায় বসলেন আয়নার মুখোমুখি। একটু কি চমকে উঠলেন ? নাকি দীর্ঘ দশটি বছর পর নিজেকে নুতন করে আবিস্কার করলেন। এক সময়ের সবার নজর কাড়া সুন্দরি মীনার টান টান চেহারায় আজ বয়স অতিক্রান্তের ছাপ স্পষ্ট।  তিন তিনটি কচি মুখের বড় হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে আর এ বড় করবার পেছনে সংগ্রাম রত মীনা রাত দিনের ফারাক না রেখেই পার করছেন বহু দিন মাস বছর। আজ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে সেই মুখ তিনটির জন্যই  জীবনের হিসাব মিলাতে বসেছেন। নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবার কিই বা আছে আর। তবে কি সন্তানদের তিনি বঞ্চিত করছেন পিতৃস্পর্শ থেকে। তার মতামতের কি আজ সত্যিই প্রয়োজন ?
ত্রিশ বছর আগের সেই দিনটাকে মনে পড়লো হঠাৎ। এতো অস্থিরতার মাঝেও হাসি পেলো মীনার। হায়রে সময়, সেদিন আর এদিন। স্কুল ডিঙিয়ে সবে কলেজের গন্ডিতে প্রবেশ করেছে তখন মীনা। রাতের খাবার দিতে দিতে মা-ই প্রথম তুললেন কথাটা। ভুমিকা ছাড়াই বাবা বললেন - আমার বন্ধুর ছেলে মিজান ভাল চাকুরিতে প্রতিষ্ঠিত। তোমাকে কলেজে দেখে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি আগাতে চাই। তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমার মাকে জানিয়ো।
ব্যস এটুকুই। অথচ মীনার অনেক কিছু ঘটে গেল অন্তরে বাহিরে। শত চেষ্টাতেও একটি ভাতও আর গলা দিয়ে নামলো না। ঘামতে থাকলো অনর্গল। শেষ মেষ খাওয়ায় ইস্তফা দিয়ে পালিয়ে বাঁচলো আপাতত। নিজ ঘরে দরজা ভেজিয়ে আয়নার সামনে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো নিজেকে। লজ্জায় লাল হয়ে অদেখা অচেনা বাবার বন্ধুর ছেলেটির মুখটি কল্পনায় আঁকতে বৃথা চেষ্টাও করলো। সিদ্ধান্ত জানাবার আর কোনো প্রশ্নই উঠলোনা।

যথারীতি ছেলের বাবা মা আংটি পরিয়ে দিয়ে তারিখ নির্দ্ধারণ করে গেলেন। বলার অপেক্ষা রাখেনা চুড়ান্ত দিনটিতে লাল বেনারসি ঘোমটা মুড়ি দিয়ে বাবার বন্ধুর বাড়িতে বধু সাজে পদার্পন করলো মীনা । দিন কয়েক পরে মিজানের কর্মস্থল ঢাকা শহরে মিজানের কোয়াটারের একচ্ছত্র গিন্নি পদে যোগদান করে ঘরকন্নায় ব্রতী হল। বদলির চাকরির সুবাদে দুচার বছর পর পর এ শহর ও শহর ঘুরা ঘুরিও হল অনেক। একে একে সংসার ও মুখরিত হয়ে উঠতে লাগলো পর পর তিনটি সন্তানের কলকাকলিতে। প্রাইমারি পর্যন্ত তেমন অসুবিধে মনে হয়নি। কিন্তু বড় ছেলেটা যখন উপরের ক্লাস গুলোয় স্কুল পরিবর্তনে বিব্রত হতে লাগলো মীনার পরামর্শে মিজান সংসারটাকে ঢাকাতেই থিতু করে ফেললেন। অফিস লোন আর নিজের পৈতৃক সম্পত্তির যোগসাজসে ছোট একটা এপার্টমেন্টের মালিকানাও দিয়ে ফেললেন মীনাকে। 
এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। মিজান সপ্তাহান্তে মাসান্তে আসা যাওয়া করতেন বদলির চাকরির দুরত্বভেদে। শহর থেকে শহরের দুরত্ব বাড়ে, মিজানের ও দুরত্ব বাড়ে মনের। একটু একটু করে অনেকটাই বেড়ে যায় এক সময়। সন্তানদের পড়ালেখা স্কুল কলেজ কোচিং প্রাইভেট ইত্যাদির বেড়াজালের অচ্ছন্নতায় বড় দেরিতেই টের পান মীনা ব্যাপারটা। ততদিনে মিজান কলিগ সোনিয়ার মোহে আবিষ্ট হয়ে পড়েছেন পুরোপুরি। অভিমানি মীনা অভিমান আর অপমানে মিজানের কাছ থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে নেন মনের দিক থেকে। একই ছাদের নিচে বাস করলেও দুরত্ব তৈরি হয় যোজন যোজন। অনেক শুভাকাংখীরা মীনাকে অনমনীয় মনোভাবের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু মীনার সব সময় মনে হয়েছে জোর করে কিছু ঠেলে গিলিয়ে উগলানোর চাইতে সেটাকে উপেক্ষা করাই ভাল। করেছেও তাই। দিনের পর দিন দুজন দুজনের প্রতি উদাসীন থেকেছে। কেউ কারে সঙ্গে কথা বলেনি, কেউ কারো চোখের দিকে তাকিয়ে দুরত্বটা কমানোর প্রয়োজন মনে করেনি। দিন তো আর এভাবে গড়াতে থাকবেনা, এক সময় স্থির হবে। বিশটি বছরের দাম্পত্য জীবনের ভালবাসাগুলো মিজানের অনুভবে অনুরণন তুলবে একদিন না একদিন। সন্তান তিনটির মুখের দিকে তাকিয়ে ওদের মায়ের প্রয়োজনীয়তা টুকু মনের কোনে উঁকি তো দেবেই। বড়টা স্কুল ডিঙিয়ে সবে কলেজে বাকি দুজনও প্রাইমারী পার করেছে। বাবা মায়ের শীতল সম্পর্কটা টের পায় ওরা। ভাবে বড়রা এতো কিছু বোঝে, ছোটদের মনটা বোঝেনা কেন। বাবা মা না হাসলে যে বাচ্চাদের কান্না পায়, বাবা মা শাসন না করলে যে পড়াতে মন বসেনা। মায়ের হাতের প্রিয় রান্নাগুলিও যে বিস্বাদ লাগে। পেটে ক্ষিধে রেখেও খাবার ঠেলে উঠে যেতে হয়। বড় ছেলে শিমুল এদের মত করে ভাবে কিনা কে জানে। তবে একদিন কলেজ থেকে ফিরে মার চোখের দিকে তাকিয়ে সারাসরি জিজ্ঞেস করে - মা, বাবার খবর কিছু রাখো? 
- না।
- এক কথায় জবাব দিয়ে আর শেষ করোনা মা। 
মীনা যথা সম্ভব স্বাভাবিক থকার চেষ্টা করে বললেন 
- কেন, কী হয়েছে ?
- বাবাকেই জিজ্ঞেস করো।
না আর জিজ্ঞেস করতে হয় নি। ডোর বেলের আওয়াজে নিজে এগিয়ে যান দরজা খুলতে। খুলেই দেখেন, সামনে দাঁড়িয়ে মিজান। পাশে দাঁড়ানো সোনিয়া হাতে ছোট একটা সুটকেস। ধৈর্য্যরে সীমা ছাড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন মীনা 
- বাইরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে এখন ঘরে মেহমানকে আনা হয়েছে ?
মিজান কিছু বলে ওঠার আগেই সোনিয়া বলে ওঠে ধীর কন্ঠে
- সংযত হয়ে কথা বলেন, সরে দাঁড়ান। ঘরের মেহমান নই, আপনার মতই সমান অধিকার নিয়ে এসেছি। 
তারানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিমুল একছুটে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সোনিয়ার হাতে ধরা সুটকেসটি ছিনিয়ে সামনে রাস্তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে অংগুলি নির্দেশ করে চেঁচাতে থাকে সারা শরীর কাঁপিয়ে
- চলে যান এখুনি, এই মূহুর্তে। আমার মায়ের বাড়িতে প্রবেশের কোনো অধিকার আপনার নেই। 
তারপর মা’কে এক ঝটকায় ঘরের ভেতরে নিয়ে সশব্দে দরজা এঁটে দিয়ে মাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শিমুল। 
- এ কাজটা না করলে তোমার অবশিষ্ট সম্মানটুকুও ধুলায় মিশে যেতো। ছেলে হয়ে পুরোটাই দেখতে পারলামনা মা।
কঠিন অথচ ধীর কন্ঠে বললো মীনা
- কিন্তু তার আশ্রয়ে আমি থাকবোনা আর।
- কিসের আশ্রয়, কার আশ্রয় ? ঐ লোকটাকে তুমি আশ্রয়দাতা ভাবছো এখনো ? তার ঠাঁই তো আর এখানে হতে পারেনা। এতটা বছরতো তুমি এবাড়িতে শুধু স্ত্রীর পরিচয়েই ছিলেনা, মায়ের পরিচয়েও ছিলে। যে স্ত্রীর পরিচয় তার মর্যাদাতো লেস মাত্র নেই আর। তুমি এখন এবাড়ির সন্তানদের মা। তোমার আশ্রয়ে আমরা। এই কঠিন সত্যটাকে না মানলে আমাদের মাথার ছায়াযে সরে যাবে। তুমি বাস্তবের মুখোমুখি হও মা প্লিজ।
মীনা এবার ছেলের চোখে চোখ রাখলেন, বড্ড অচেনা কেউ যেন। এই অগোছালো নির্লিপ্ত ছেলেটা এতো কথা কবে শিখলো, এতো ব্যথা শেয়ার করতে কে শেখালো ওকে। অদুরে দাঁড়ানো ছোট ছেলে দুটো অসহায় বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। কাছে ডাকলেন ওদের। পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়ে বললেন
- যাদের মাথার ওপর এমন বড় ভাইয়ের ছায়া, তাদের এমন সামান্য ব্যাপারে ভয় পাবার কি আছে ? শিমুল হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে তাকায় মার দিকে, বলে
- এই ছায়ার শক্তির উৎস যে তুমিই মা। আমাদের দিকে তাকাও, শুধু ভেঙ্গে পড়োনা। 
তারপর যেন কিছুই হয়নি, কন্ঠে এমন স্বাভাবিকতা এনে তাড়া দেয় মাকে 
-সেই কখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। চা দিবেনা মা ?
বাইরের সমাধান এভাবে হলেও মীনার অন্তর পুড়তে থাকে নিভৃতে নীরবে।
স্বজনদের কেউ কেউ সমবেদনা জানালো, কেউবা এমন অনড় সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালো, কেউবা আবার মিজানকে নারী নির্যাতন আইনে ফাঁসিয়ে দেবার পরামর্শ দিল। উল্লেখ করার মত ব্যাপার হল মিজান সেই যে নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে চলে গেল আর কখনোই এলোনা। মীনা ছেলেদের নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন কঠিন সংগ্রামে। এই দশ বছরে অনেকটাই সামলে উঠেছেন চাপা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে কর্তব্যে কর্মে সচেতনতায় অভ্যস্থ হতে।
কিন্তু আজ সকালে তারানা ভাবির ফোন পাবার পর থেকে মনের মাঝে এ ঝড়কে বস করা যাচ্ছেনা কিছেুতেই। ঝড়ের দমকা বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে মনকে ত্রিশ বছর আগে সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। 
- মা তুমি এখানে ?
আয়নায় ছেলের প্রতিবিম্ব আর কর্নকুহরের চিরন্তন ডাকে চিন্তাচ্ছেদ ঘটে মীনার।
- আয় শিমুল বোস, কথা আছে। 
শিমুল মার সামনে বসে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে 
- তুমি কি কিছু নিয়ে খুব ভাবছো মা ?
- হ্যাঁ 
- আমি অনুমান করতে পারছি। তারানা চাচী আমাকেও ফোন করেছিলেন। সেই মহিলা মারা গেছেন। উনার ধারনা বাবা এবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় দগ্ধ হবেন। আমরা রাজি থাকলে তারানা চাচী বাবাকে ফিরিয়ে আনতে চান, আমাদের আবার আগের মত করে দিতে চান। 
মীনা তাকালেন শিমুলের দিকে।
- চাইলেই কি আগের মত হওয়া যায় ? হতে পারে কখনো ? তোর বাবা ফিরিয়ে দিতে পারবে আমার ধুলায় মেশা সম্মান ? ফিরে পাবো আমি আমার সন্তানদের জীবন থেকে হারানো শৈশবের দশটি বছর ? আমার সন্তানদের কষ্টে ভেজা দুহাতে ঠেলে পার করা দিনগুলির যন্ত্রনা ? 
- মা তোমার সন্তানদের জন্য কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তুমি একাই তা এতোদিন চিনে এসেছো। আমরা শুধু তোমার দেখানো পাথ চলেছি, চলবো। তোমার বাড়িতে ঢোকার অধিকার সর্ম্পূণ তোমার সিদ্ধান্ত। তারানা চাচীকে এই কথাগুলোই আমি ফোনে বলেছি। 
এরপরে আর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে হয়নি মীনাকে। সন্ধ্যে নাগাদ তারানা ভাবি এসেছেন, চা নাস্তা সেরে প্রতিবারের মত চলেও গেছেন। ছেলেরা শুধু চেয়ে দেখেছে তাদের মা যে একটা সিদ্ধান্তহীনতায় বেসামাল হচ্ছিলেন, চাচী যাবার পরে সে ভাবটা একেবারেই নেই আর। নিত্যকার মতই রান্নাঘর আর ছেলেদের ঘরে তদারকিতে ব্যস্ত হয়েছেন। টিভির খবর দেখেছেন। টালি খাতার হিসেবে ভ্রুকুচকে চোখও বুলিয়েছেন। 
রাতে ছেলেরা যে যার ঘরে ঘুমিয়ে গেলে নিজ ঘরের লাগোয়া এক চিলতে ব্যালকনিতে চেয়ারে গা এলিয়ে বসলেন মীনা। সারা দিনের বুকের জমাট বাঁধা বরফগুলো কষ্টের উত্তাপে গলিয়ে নিজেকে হালকা করতে। তারানা ভাবির কথাগুলো আবার বিছিয়ে দেখেন মীনা। মিজান সোনিয়ার দাম্পত্য জীবন ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে মনের মত করে সেজেছিল ঠিকই। ক’বছর বাদে সংসারে নতুন মুখও এসেছে কিন্তু তার পর থেকেই সোনিয়ার অসুস্থতা বেড়ে যেতে লাগলো। ধরা পড়লো কিডনি সমস্যা একেবারে শেষ ধাপে। প্রথমটায় ঘাবড়ে গেলেও নিজেকে সামলে নেয় সোনিয়া একমাত্র কন্যা শিশুটির দায়ীত্ব মিজানের হাতে সপে দিয়ে অদ্ভুত একটা অবদার করে বসে - শত্রুপুরিতে যেন কখনই তার সন্তানকে নিয়ে মিজান না যায়। তারই নির্বাচিত পাত্রীর সাথে মিজানের বিয়েটা সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়ে মরতে চায়। 
ফলাফল যা হবার তাই হল। সোনিয়ার মৃত্যু সংবাদে যারাই মিজানের ভেঙ্গেপড়া দেখবে বলে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিল, তারাই অকল্পনীয় আর একটি নতুন সংসারের ভিত্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে ফিরে এলো। 

*************
ফাহমিদা রিআ 
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/116735/</link>
				<pubDate>Mon, 30 May 2022 10:03:38 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
#﻿ পৌনঃপুনিক</p>
<p>খবরটা শোনার পর থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া অনুভব করলেন তারানা নিজের মনে। শোনা অবধি কেমন যেন একটা দায়বদ্ধতা চেপে বসে তারানার কাঁধে। নিজের অবস্থানটাকে মাঝ পথে কল্পনা করে প্রথমেই ভেবে নেন শুরুটা করবেন কোত্থেকে ? ব্যাপারটা যখন মিজান সাহেবের, নিশ্চয়তাটা নিতে হবে সেখান থেকেই আগে। আবার খুব বেশি নিশ্চিত হবার পর মীনা ভা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-116735"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/116735/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">90016fb3b34bf3cf067d08423086532a</guid>
				<title>#ছোট গল্প
#﻿তিয়ানের জন্য

                                                                     
                                                                     
                                   অপারেশন থিয়েটারের মস্ত দরজার সামনে এসে শুভ্র বসনা সেবিকা থামলো একটু। অনুসরন করে আসা তিয়ান আর তার বাবাও দাঁড়িয়ে গেল অনতিদূরত্বে।
ট্রলিতে শুয়ে থাকা মা তাঁর চুড়িবিহীন হাতটা ইশারা করতেই ওরা এগিয়ে গেলো ট্রলির একেবারে পাশটিতে। বাপ ছেলের হাত দুখানা দুজনের মধ্যে ধরিয়ে দিয়ে মা কিছু একটা বলার আগেই সেবিকা ঝড়ের গতিতে ট্রলিটা ঠেলে ঢুকে গেলো এবং মুখের উপরেই মস্ত পাল্লাটা বন্ধ করে দিল ভিতর থেকে।
অসহায় মুখ করে তিয়ানের হাতটা আঁকড়ে ধরলেন বাবা। দুর্বল কন্ঠে বললেন,
- তোর মা ফিরে আসবেতো তিয়ান?
- আসবে বাবা। আমার জন্যে আসবে। আমি কিছু চাইলে মা যে কখনো না করেন নি।
মনের অনুচ্চারিত কথাগুলো বাবাকে না বলে আঁকড়ে ধরা হাতটা নিয়ে অদূরে পেতে রাখা চেয়ারের সারিতে পাশাপাশি বসে তিয়ান। সারা
অন্তর জুড়ে তখন মায়ের মুখটা শুধু।
বাবার চোখের পুরু লেন্সের চশমা ভেদ করা দৃষ্টি কোন এক সুদূরে। 
নিশ্চুপ, স্থির । উস্কোখুস্কো চুল। চিরুনি পড়েনি দিনমান। কদিনের খোঁচা খোঁচা কাঁচা পাকা দাড়ি। মলিন শুকনো মুখ।
তিয়ান পাশে বসে আড় চোখে বারবারই বাবাকে অনুসরন করছে। নিজেও খুব চিন্তামুক্ত আছে তা নয়। তারপরও বাবাকে এতটা উদ্বেগ,
শঙ্কাপূর্ণ দেখতে তার ভাল লাগছে না। সদা উৎফুল্ল সহজ সরল মানুষটা ক মাস থেকে আপাদমস্তক এক চিন্তায় ডুবে আছেন। 
অথচ ছোট থেকে এত বড় হওয়া অবধি বাবাকে সে কখনও সিরিয়াস হতে দেখেনি কোন ব্যাপারেই। মার ভাবনার রাজ্যে সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বাবা মুক্ত থেকেছেন বরাবরই। এমনকি নিজের পছন্দ অপছন্দগুলোও মার প্রতি ছেড়ে দিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন।
চলছিল দিনগুলি এভাবেই বাবা মা আর তিয়ানের। বাবার সকাল সন্ধ্যা অফিস আর মা ঘর দোর সামলে তিয়ানকে নিয়ে স্কুল কলেজ কোচিং প্রাইভেট ছুটতে ছুটতে একসময় থামলেন। তিয়ান যখন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে হোষ্টেলেই থাকার মনস্থির করলো।
সপ্তাহান্তে রুচি ফিরাতে মার রান্না ছাড়া তার চলতোই না।ক্লাশের ফাঁকে হুটহাট হাজির হতো সোজা ডাইনিং টেবিলে। বাড়তি চাবি বাবা ছেলে দুজনের পকেটে দিয়েই রেখেছিলেন মা,যেন এদিক ওদিক গেলে ক্ষনিক অনুপস্থিতিতে বাড়ির বাইরে অপেক্ষার সময় গুনতে না হয়।
সেদিন তিয়ান দুপুরে বাড়িতে ঢুকে মাকে সামনে না দেখে কিচেনে উঁকি দেয়। সকালের নাস্তার এঁটো প্লেট, চায়ের কাপ সিঙ্কে অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে খটকা লাগে মা কি কোথাও গেছেন?
ডাইনিং ঘুরে বেডরুমে উঁকি দেয়। মা এ অবেলায় শুয়ে। শরীর ঠিক আছেতো, জ্বর টর এলো নাকি?
মার মাথায় আলতো করে হাত রাখতেই মা চমকে তাকালেন।
- তিয়ান তুই? কখন এলি?
- এখনই। কি হয়েছে মা? শরীরটা ভালো নেই নাকি?
- না, না ঠিক আছি আমি। চল খাবার দেই।
এমনি সময় মাথার কাছে রাখা ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠতেই তিয়ান রিসিভ করে, 
- হ্যালো। বাবা?
- তিয়ান কখন এলি? আজ থাকবি?
- না বাবা। দুপুরে খেয়েই চলে যেতে হবে।
- ও আচ্ছা। তোর মা আশেপাশে থাকলে দেতো।
- হ্যাঁ, এইতো।
মা ততক্ষনে ওঠে বসেছেন। রিসিভারটা মার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের রুমে যায় তিয়ান ফ্রেশ হতে।
বেশ কদিন পরেই আজ বাড়িতে এলো। অগোছালো টেবিলে মায়ের হাতের ছোঁয়া যে পড়েনি তা স্পষ্ট। বেডকভারে টান টান করে ঝাড়া ভাবটা নেই। ওয়ারড্রবের ড্রয়ার খোলা। মোট কথা চিরাচরিত তাড়ায় তিয়ান সেদিন যেভাবে রেখে বেরিয়েছিল ঠিক তেমনি আছে। যা এর আগে কখনই এমনটি হয় নি। মা নিশ্চয় জ্বর বাঁধিয়ে বসেছেন। একা হাতে সারাটা ক্ষন পানির কাজ করতে করতে ঠান্ডা লাগানোটাই স্বাভাবিক, নিজের মনেই উত্তর খুঁজে নেয় তিয়ান।
ডাইনিং এ চেয়ারটা টেনে বসতেই ঘর থেকে মায়ের ফোনের কথোপকথনে কানে এলো।
- এ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছো তাহলে। অফিস শেষে তুমি নিচে এসে গাড়ি থেকেই কল দিও। আমি তৈরি থাকবো বিকেল পাঁচটায়।
হ্যাঁ পারবো, একা নামতে পারবো।
ফোনটা রেখে খুব স্বাভাবিকতার সাথেই
মা ডাইনিং এ টেবিল ম্যাট সাজিয়ে খাবার বাড়তে লাগলেন। জানালার এক টুকরো রৌদ্রের ছটা মায়ের মুখে পড়ছে। একি চেহারা হয়েছে কদিনে।কান্না ধোয়া ফুলো চোখ। ক্লান্ত অবসন্ন বিধ্বস্ত চেহারা। 
তিয়ান ব্যস্ত কন্ঠে বলে,
- কোন ডাক্তারের এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছেন বাবা? তোমার কি অসুবিধা লাগছে মা? আমাকে কিছু বলছো না কেন?
- তুই এসব নিয়ে ভাবিস নাতো। তেমন কিছু না। তোর বাবার কান্ড, কদিন আগে একটু ঠান্ডা লেগেছিল, এই আর কি।
মাছের পেটিটা প্লেটে দিতে দিতে বললেন মা,
- তিয়ান খাচ্ছিস না যে। সামনে তোর ইয়ার ফাইনাল। মনোযোগ দে। অন্য কোন ব্যাপারে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।
মা তিয়ানের কাছে লুকোতে চাইছেন কিছু, তিয়ান আঁচ করতে পারে এতক্ষনে।
মুখ নিচু করে খেতে খেতে ভাবনায় ডুব দেয়। মার মলিন মুখটা দেখে খারাপ লাগছে খুব। দুরারোগ্য কিছু হলো নাতো? 
সিদ্ধান্ত নেয়, খাওয়া শেষে বাবাকেই ফোন করবে। না জেনে চলে গেলে মার কথা ভেবে ভেবে পড়া হবে না একটি অক্ষরও।
মা কথাও বলছেন না রোজকার মত। প্লেট গুছিয়ে কিচেনে চলে গেলেন যেন তাড়াহুড়ো খুব।
খাওয়া শেষ করে তিয়ান বেসিনে হাত ধুয়ে মার রুমে এগোয়।। বাবাকে ফোনটা করতে গিয়ে মনে পড়ে নাম্বারটা কত যেন। আজকাল মোবাইলে নাম্বার সেইফ করতে করতে জানা নাম্বারও মুখস্ত থাকে না আর।
টেলিফোন ইনডেক্সটা খুলতেই একটা কাগজ খসে পড়লো নিচে। হ্যাঁ প্রেসক্রিপশনইতো। দুদিন আগের তারিখ। মায়ের নাম, বয়স লেখা। প্রেসক্রিপশনটা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান দেওয়ান কাকুর নয়। ডাঃ ফৌজিয়ার রাইটিং প্যাডে।
তিয়ান দুরু দুরু বুকে চোখ বুলায়। ভ্রু যুগল কুঁচকিয়ে ঠোঁটে দাঁত চেপে ধরে। এক মুহূর্ত ভেবে, ওভাবেই প্রেসক্রিপশনটা ভাঁজ করে ইনডেক্সে রেখে দেয়। বাবাকে ফোন দেয়া হয় না আর।
লম্বা ধাপ ফেলে নিজ ঘরে গিয়ে ঢুকে।
পড়ার টেবিলে রাখা মোবাইলে রুমমেটকে কল দিয়ে বলে,
- আজ ফিরবে না, একটা জরুরী ব্যাপারে আটকে পড়েছে। 
রকিং চেয়ারটা টেনে ব্যালকনিতে বসে গেটের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো তিয়ান।
বাবার গাড়িটা লনে এসে থামতেই বাবার নাম্বারে চাপ দেয়। 
ওপ্রান্ত থেকে বাবার কন্ঠ ভাসে
- কিরে তিয়ান কল দিলি যে। কি মনে করে?
- কথা আছে বাবা। তোমার সামনেই বলবো।আমি এক্ষুনি নামছি।
গাড়িতে বাবার পাশটিতে বসে বলে, 
এবার মাকে ফোন দিয়ে বলো,
আজ মার ডাক্তারের কাছে যাবার দরকার নেই।
তারপরের ঘটনাগুলো ঘটলো যেমন দ্রুত, তেমনি অপ্রত্যাশিত। তিয়ান বাবার সাথে সোজা ডাঃ ফৌজিয়ার চেম্বার। তার আগে বাবার সাথে বোঝাপড়া খানিক করেছে যদিও।
ডাক্তারও বিষয়টা খোলাসা করলেন। এ অবস্থায় অপারেশন থিয়েটার কোন সমাধান নয়। হিতে বিপরীত হতে পারে।
কোন ঝুঁকিই এখন নিরাপদ না, গম্ভির মুখে বললেন ডাঃ ফৌজিয়া। ভবিতব্য মানতে হয়, হবেই। ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই। 
কঠিন সময়টুকুর সারমর্ম বুঝিয়ে বাবাকে রীতিমত নার্ভাস করে দিলেন। তারপরও আশা যোগালেন, সাহস দিলেন। আসার সময়
আদেশ নিষেধ এবং ওষুধপথ্যের উপর জোর দিয়ে বললেন, নেগেটিভ কিছু বলা যাবে না তার সামনে। আর চেক আপটাও জরুরী নিন্দিষ্ট সময়ে। বাকি উপরঅলার ইচ্ছা।
বাপ ছেলের সহযোগিতায় বাস্তবকে মেনে নেন মা ধীরে ধীরে। সময় গুনে গুনে পেরোয় দিন মাস।এক দুই তিন করে করে
মা দুর্বল হতে থাকলেন ততটাই। কখনো কখনো কঠিন সময় মনে হলেও তিয়ানের সাহসে আশার আলোটা নিভে যায় না। বরং জ্বলে ওঠে উজ্জ্বল শিখার হাতছানিতে।
তিয়ানের চিন্তাচ্ছিন্ন হয় ওটির ভারী দরজাটার ক্র্যাচ শব্দে। যেন দূর সাগরের ওপার থেকে কে একজন বেরিয়ে এলো আপাদমস্তক ধোপ দুরস্ত শুভ্র সাজে।
দু হাত বাড়িয়ে মুখে অসম্ভব সুন্দর হাসি ফুটিয়ে বললো,
- এই নিন পরী। একেবারে ফুটফুটে একটা পরী।
বাবা আশাতীত আনন্দে নাকি মায়ের দীর্ঘ ন মাসব্যাপী কষ্টের সমবেদনায় অন্তরের ভীত বিহ্বলতা কাটাতে না পেরে নিজের হাত দুটো বাড়াতে গিয়েও কাঁপনটাকে থামাতে পারলেন না।
পারলেন না নিয়ন্ত্রন করতে কন্ঠটিকেও। কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন,
তিয়ান তোর মা? 
- মা মেয়ে দুজনেই সুস্থ আছে, বলতে বলতে
তোয়ালে পেঁচানো টুক টুক করে তাকানো পরীটাকে তিয়ানের বুকের মধ্যে একরকম গুঁজে দিয়ে চলে গেল শুভ্র বসনা। 
তিয়ান তার দীর্ঘ অপেক্ষাগুলিকে বুক ভরা ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়ে বুকে লেগে থাকা তোয়ালের পরীটার মায়াভরা মুখটির কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, 
- আর একটু হলেইতো তোকে হারিয়ে ফেলতাম। সেদিন যদি রিপোর্টটা চুপ করে না পড়তাম তবে যে সারাজীবনের জন্য বোনহীন একলাটি হয়ে থাকতাম রে।
তুই শুধু আমার জন্যে।

-***********
ফাহমিদা রিআ 
*************

 </title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/115947/</link>
				<pubDate>Sat, 28 May 2022 18:34:16 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
#﻿তিয়ানের জন্য</p>
<p>                                                                    <br />
                                                                    <br />
                                   অপারেশন থিয়েটারের মস্ত দরজার সামনে এসে শুভ্র বসনা সেবিকা থামলো একটু। অনুসরন করে আসা তিয়ান আর তার বাবাও দাঁড়িয়ে গেল অনতিদূরত্বে।<br />
ট্রলিতে শ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-115947"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/115947/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2e29df6815dd9fae9f9514b9d68b756f</guid>
				<title>#ছোট গল্প
 #সে কি তুমি........


অবশেষে ছোট্টুনির কথাই খাটলো। সেই আদ্যি যুগের মত করে মেয়ে দেখতে যাওয়া। বর্তমানের ধ্যান-ধারনায় মানুষ আমি। বড় একটা ফার্মে ভাল চাকরিও করছি আজ দুবছর। এরই মধ্যে মায়ের তোড়জোড় ছেলের বৌ আনবার। 

আমার অবশ্য তেমন আপত্তি নেই। কারন নিজের পছন্দের কেউ নেই বর্তমানে। তবে অতীতের একটা স্মৃতি আছে। ছাত্র জীবনে দু’চারজনকে যে ভাল লাগেনি তা নয়। তবে আমার উঠতি বয়সের প্রথম ভালবাসার নাম বেনু। সম্পর্কে আমার খালাতো বোন। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবে পা রেখেছি। হঠাৎ বেনুর ভেঙ্গে পড়া কান্না আমায় স্তব্ধ করে দেয়। ওর বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে অন্যত্র। আমার কিই বা করার ছিল তখন। ফিরিয়ে দিলাম বেনুকে। 

তার পরের প্রতিটি বিকেল পানসে হয়ে গেছে আমার। যে বিকেলের সোনালী রোদে গা এলিয়ে পদ্মা পাড়ে জন্ম জন্মান্তরের কত কথা বলেছি বেনুকে। কিংবা কখনো দুরে নদীর বুকে ছোট্ট পানসিতে ভেসে ভেসে শুনেছি বেনুর সুরেলা গান। 
এর কিছুদিন পর স্বাভবিক নিয়মে বেনু ঘটা করে অন্যের ঘরণী হয়ে চলে গেল। 
আমি আমার মায়ের একমাত্র ছেলে, বাবাকে কোন ছেলে বেলায় হারিয়েছি। মার উৎসাহ আর ছোট বোন টুনির মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আবার সহজ হয়েছি। পূর্ণিমার উপচে পড়া চাঁদের হাসি হয়তো কখনো ছাদে বেরিয়ে দেখা হয়নি। তবু রাতের পর দিন আর দিনের পর রাত আমার জীবনে স্বভাবিক হয়ে গেছে এক সময়। চলছিল সেভাবেই ছোট্টুনির চঞ্চলতায় আর মায়ের আশা ভরা চাহনির খুশির আভাতেই।

এরই মাঝে মায়ের তোরজোড় আর আমার নতুন ভাবনা অতীতকে টানে কেবলই। নাস্তার টেবিলে মা পাড়লেন কথাটা - আজাদ আগামী রোববার কোথাও প্রোগ্রাম করবি না, ওদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। রোববার বিকেলে আমরা যাব বলে দিয়েছি। মেয়েটি আমার খুব পছন্দ, তোর খারাপ লাগবে না দেখিস। 

আমি বললাম ভালই যখন বুঝেছো, ব্যাস। অযথা ঘটা করে আদ্যি যুগের মত আর অনুষ্ঠান কেন মা ?
-----সেকিরে, তোর জন্যইতো যাওয়া। আমার পছন্দে কি যায় আসে। তোর একটা পছন্দ আছে না ? আর আদ্যি যুগ কিরে টুনিতো মহা খুশী, ও নাকি কনে দেখা অনুষ্ঠান দেখেনি।

টুনি আমার ছোট বোন। খুনসুটি করি ওর সাথে অহরহ। আমি ডাকি ছোট্টুনি বলে। পাশ থেকে ফোড়ন কাটে ও- 
-----হ্যাঁরে তুই অমত করিস না ভাইয়া।এই দেখ আমি কেমন শাড়ী পরে প্রাকটিস করছি। একটু মুরুব্বী মুরুব্বী না দেখালে প্রশ্ন-টশ্ন জিজ্ঞেস করা যাবে নাতো।
বলে বিজ্ঞের মত মাথা ঝাঁকিয়ে হাসলো। ওর লম্বা বিনুনিটা টেনে ওকে চেয়ার থেকে তুলে দাঁড় করাই। সত্যিই তো টুনি কত্তো বড়োটি হয়ে গেছে। বুটিদার শাড়িতে ওকে মানিয়েছে বেশ। আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বলি -
----- তা বেশ তো ছোট্টুনি, কদিন পর নিজেই তো ওভাবে বসবি তখুনি দেখিস। 
গাল ফুলিয়ে আনুযোগ করে টুনি মার কাছে । আমি ভেংচি কেটে ওকে আর এক প্রস্থ রাগিয়ে দেই। 
মা কিন্তু একই উৎসাহে বলে চলেন শিমুল নামের মেয়েটির কথা। 

অফিসের গাড়ির হর্ণ শুনে বেরিয়ে আসি, রওনা হই অফিসের পথে। সারা পথ মায়ের আগ্রহের কথা গুলো ভাবি। অনেক দিন পর কেন জানিনা আজ বেনুকে খুব মনে পড়ছে। একই শহরে থাকি অথচ তেমন করে কেন দেখা হয় নি। ভেবে আশ্চর্য হই। বেনুর চোখে মুখে কি সুখি সুখি ছাপ আছে ? কিশোরী বেলার ছল ছল চোখ দুটি হাসির আভায় চিক চিক করে কি এখনো ? কি জানি এসব বড্ডো মনে হচ্ছে আজ। 

মেয়েটির নাম শিমুল, আমার ভাবি বধু। আচ্ছা শিমুল ওতো বেনুর মত কারো মন-মানসী হতে পারে। আর যদি তাই হয় আমার ছেলে বেলার পোড় খাওয়া কচি মন টায় ব্যথার  চিন চিনে ভাবটা আবারো অনুভব করলাম যেন। অসহনীয় সেই সময় গুলো আজও যন্ত্রনার হুল ফোটায়। ছোট্ট মনের বড় আশার প্রদীপ টা ফুৎকারে যেন বেনুর উচ্চ শিক্ষিত স্বামী ব্যক্তিটি নিভিয়ে দিয়েছিল।

ভদ্রলোককে সে অবধি ধূর্ত শিকারী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি। আথচ পড়ার টেবিলে কাগজে আঁকি-বুকি এঁকে বিনিদ্র চোখে বসে থাকা ছাড়া কিই বা করার ছিল। শিমুলকে আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে কিছু দামি ডিগ্রীর বলে কারো মন থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছি নাতো ? কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠলাম। কাউকে অসহায় বোবা যন্ত্রনায় আটকের আসামী মনে হল নিজেকে। আমার যোগ্যতার হুল ফুটিয়ে শিমুলের উজ্জ্বল মুখ যদি বিবর্ণ হয় ওর মনের আকাংখার মৃত্যু ঘটে যদি। না না এসব কি ভাবছি। সবার বেলা একই হতে যাবে কেন ? এমন ওতো হতে পারে এসব কিছু নয়। শিমুল স্রেফ শিমুল। কারো কেউ নয়। তার চেয়ে এই ভাল নয় কি শিমুলের সাথে দেখা করে সারা জীবনের ভাবনা জেনে নেই নিজেই। নইলে মার কথা মেনে নেয়া ছাড়া কিছু করার নেই। 

কেমন যেন জেদে পেয়ে বসলো হঠাৎই। ঘড়ির দিকে তাকালাম দুপুরের লাঞ্চ বিরতিতে। কিযেন পড়ে মেয়েটা, শেষ বর্ষ মনো বিজ্ঞান। মা তো তাই বলেছিলেন। ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যাবে নিশ্চয়। ঝোকের মাথায় ভর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে, অতপর মনো বিজ্ঞান বিভাগের সামনে। যদিও দুপুর তবুও গাছের চাতালে চাতালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হাস্যোজ্জ্বল জুটি। দেখলে মনে হয় পৃথিবীর শুরুতে আদম হাওয়ার মতই এদের অস্তিত্ব। কোথাও কেউ আছে বা কোথাও কিছু হচ্ছে এসব ওরা জানে না বা জানতে চেয়ে মুহুর্ত গুলো হারাতে চায়না। এতক্ষণে খেয়াল হল এভাবে হুট করে চলে আসাটা মোটেও ঠিক হয়নি। কোথায় পাবো অজানা অদেখা শিমুলকে আর পেলেই বা বলবো কি ? 

------ আরে আজাদ ভাই যে, এখনে ? 
সাত পাঁচ ভাবনার মাঝে সম্বিৎ ফিরে পাই অরুর কথায়। আমাদের পাশের বাড়ির ছেলে। খেয়াল হল অরু এবছর মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছে।
ভীষণ লজ্জায় পড়ে যাই। আমতা আমতা করে বলি
----- হ্যাঁ - মানে এক জনকে খুঁজছি। 
অরু নাম ধাম জেনে নিয়ে এক ছুটে ডিপার্টমেন্টে আবার। মিনিট দশেক পর ফিরে এল সঙ্গে দুটো মেয়ে। অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললো
----- - আজাদ ভাই, ঐ যে শিমুল আপা। আমি আসি সাবসিডিয়ারি ক্লাশ আছে এখনি। 
সহ পাঠির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে অদৃশ্য হল অরু। 
আমার অবস্থা বলির পাঁঠার মত। কি বলবো কাকে বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। নীরবতা ভঙ্গ করলো শ্যামলা মেয়েটি - 
-----আপনি কে ? শিমুলকে কেন খুঁজছেন ? 

-----আমি আজাদ, মানে একটা জরুরী দরকারে শিমুলের কাছে এসেছি। মেয়েটি ভ্রুকুঞ্চিত করে তাকালো, তারপর বললো - 
-----এক মিনিট। 
দুজনে চলে গেল। ফিরে এল সে মেয়েটি একা। হেঁসে বললো - 
-----আমাকে অনায়াসে বলতে পারেন, আমি শিমুলের বান্ধবী মিলি। অক্ষরে অক্ষরে পৌছে দেব সবটুকু। গাফিলতি হবেনা একটুও। 
----- না, মানে তাকে আনা যায় নাকি ?       
হাসলো মেয়েটি - 
-----ও ভারি লাজুক। আমাকে না বলতে চাইলে থাক। তবে আমি কিছু বলবো।
- আপনি ? বিস্ময়ে থ বনে যাই। 
- মানে শিমুল যা বলতে বলেছে আর কি। শুনেছি বেনু আপার কাছ থেকেই শিমুল আপনার কথা জেনেছে। আপনি হয়তো জানেন না এই বিয়ের ঘটকালিটা তারই। শিমুল অবশ্য এমনটাই ভাবছিলো, অর্থাৎ আপনার অমতের ব্যপারটা। 

আমি ঢোক গিলে বললাম - অমত ? কেন ? 
শ্যামলা মুখে একটুকরো হাসি খেলে গেলো মিলির। বললো - 
-----কখনো ভেবে দেখেছেন এসব আপনার এক তরফা তৃপ্তি।
- তৃপ্তি ? প্রশ্ন করলাম আমি ? 
- নয়তো কি ? আপনি কি সত্যি চান বেনু আপা সুখী হোক সুখে থাকুক। হারাবার ব্যথায় কুকড়ে থেকে কেউ ভাল থাকতে পারে না। 
- বেনুকে আপনি সত্যিই চেনেন ? বেনু ভালো নেই ?
- তাহলে শুনুন, বেনু আপার সংসার বাগানে প্রস্ফুটিত সব ভাল লাগা আর ভাল থাকার ফুল। শুধু একটি পুরোনো কাঁটা উঠাতে পারে না কিছুতেই। যখন তখন তা বিঁধতে থাকে চরম ভাবে। বেনু আপার ধারনা সে কাঁটা আপনি। তার ফাঁকি তেই আপনি আজও একা। বেনু আপা তাই নিজেকে অপরাধির কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে মনের কাছে জবাব দিহি করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে।
শিমুলকে বেনু&#039;পা খুব ভালবাসে। সেই বেনু’পার কাছেই শিমুল শিখেছে ভালবেসে দুঃখকে কাঁধে নেবার সাহস। অবশ্য শিমুলের ভয়ও কিছুটা ছিল। 
এখন মনে হচ্ছে তা মোটেও অমুলক নয়। তা হচ্ছে জোর করে কাউকে রুগী ভেবে ওষুধ খাওয়াতে গেলে তাতে অসুখেরই সম্ভাবনা।  বেশতো আপনার তৃপ্তি আপনারই থাক। বেনু’পা জ্বলছে জ্বলবে।

আমি অবাক হয়ে মেয়েটির কথা বলে যাওয়া দেখছি আর ভাবছি বেনু সত্যিই সুখী ? শিমুল তবে আমার সব কথা জানে ? কিন্তু ওর মুখে তো কিছু শোনা হল না। ইশ এই মেয়েটাই যদি শিমুল হত। ছি ছি কি ভাবছি আমি। মেয়েটিতো শিমুলের বান্ধবি। শিমুল তো তার নিজের কথা গুলোয় মেয়েটিকে দিয়ে বলিয়েছে। 
আমার নীরবতা ভাংলো মেয়েটি - 
-----আপনি তো শিমুলকে না পেয়ে যা বলতে এসেছিলেন বললেন না। আমিই না হয় অনুমানে বলে দিব আপনার অমতের কথাটা। 

এতক্ষণের দ্বিধা সংকোচ সব মুহুর্তেই উবে গেল। হেসে বললাম 
-----আপনার বান্ধবী না হয় তার কথা আপনাকে বলবার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু আমি আপনাকে তেমন কোন অধিকার দেইনি যে আমার অনুমান আপনার মন গড়া হতে হবে। 
একটু যেন মিইয়ে গেল মেয়েটি। কিন্তু হারবার পাত্র নয় সে। বললো 
------ আমিতো স্থিরতা আনিনি কথায়। যাচাই করার জন্য বলেছি। বেশ বলুন আপনার কথা শিমুলকে কি জানাবো ? 
- না আমি আর বিব্রত করবো না। শুরুটা যখন জানেন শেষটা হোক আপনাকে দিয়েই। শিমুলকে বলবেন আগামী রবিবার মাকে নিয়ে ওদের বাড়ি যাচ্ছি। এনগেজমেন্টের কাজটা আগেভাগেই সারতে চাই। তাই শিমুলকে বলতে এসেছিলাম অন্য কোন অঙ্গুরী হাতে নেইতো ? অতীত কে মুছতে চাই আমিও। ভাবতে চাই দুরের অতীত ঢাকা পড়েছে সত্যি জীবনের প্রলেপে। 

মেয়েটির তর্কবাগিশ চোখ দুটো হঠাৎ করে যেন লাজুক হল। আঙ্গুলে আঁচল জড়াতে জড়াতে বললো -
----- শিমুলকে তাই ই বলবো।
তারপর কি যেন বলতে গিয়ে কিছু না বলে এবং আমাকে বলবার সুযোগ না দিয়ে এক রকম পালিয়ে গেলো। আমি ওর চলে যাওয়া পথে চেঁচিয়ে ডাকলাম - 
-----আরে শোনেন শোনেন। আমি যাওয়ার পরেই না হয় বলবেন। 
এতক্ষণ এক নাগাড়ে কথা বলতে বলতে কেমন যেন চেনা হয়ে গিয়েছিলো মেয়েটি।      
নাহ ভারি ছটফটে মেয়ে তো, চলেই গেলো। আলগোছে বাঁধা এলো খোঁপা ভেঙে লুটিয়ে পড়লো পিঠের ওপর, হাওয়ার কাঁপনে গাছপাতা রং শাড়ীর আঁচল উড়িয়ে মেয়েটির চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আবারো মনে হল - শিমুল এমনটি হলে মন্দ হতনা। 

বিকেলে মায়ের হাতের তৈরি ডালপুরি মুখে দিয়ে বলি - 
-----মা তোমার কি খুব ইচ্ছে ঐ মেয়ে তোমার পুত্রবধু হোক ? 
মা চায়ের কাপে চিনি মেশাতে মেশাতে  বললেন  - -----কেন রে আজাদ, তোর কি মত নেই ? পছন্দ না হলে না হবে কিন্তু ওদের কথা দিয়েছি যাওয়াটা উচিৎ। আমি বললাম - বেশ তো মা যাবো। তোমার যখন এত পছন্দ একটা আঙটি কিনে রেখ। এনগেজমেন্টের ব্যপারটা সেরে নিও এই সাথে।

মা বিস্ময়ের সুর তুলে বললেন - 
-----সে কি তুই কি অভিমানে একথা বলছিস ?  তোর অপছন্দ হলে আমি জোর করবো না। 

ছোট্টুনি লাফিয়ে ওঠে - ভাইয়া অপছন্দ করবেই না। এনগেজমেন্টটাই করে ফেলো। 
মা ধমকে উঠলেন -
----- তুই থামতো টুনি। সেদিনের মেয়ে স্কুল ছেড়ে কলেজে পা দিতে না দিতেই বড্ডো বুঝতে শিখেছে। যাকে আজাদ দেখলোনা ছবিটায় পর্যন্ত চোখ তুলে তাকালোনা। আর আমি কিনা আংটি পরিয়ে কথা পাকা করে বোকা সাজি আর কি।

আমার কৌতুহল জাগলো হঠাৎ। বললাম - আমি তো বলেছি মা তোমার পছন্দে আমার আস্থা আছে। তা ছবিটা কোথায় ? 
টুনি এক লাফে ছবিটা বের করে নিয়ে আসে। চোখের সামনে মেলে ধরতেই অবাক বিস্ময়ে দেখি এযে শিমুলের বান্ধবীর দুষ্টমি মাখা গভীর দৃষ্টি। 
মা আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন
----- - কিরে আজাদ, পছন্দ আমার খারাপ হয়েছে কি ?
আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। অস্ফুট স্বরে বলে ফেললাম এতো মিলির ছবি।
- না রে, মেয়েটির নাম শিমুল। কিছু বুঝে উঠবার আগে চোখে ভেসে উঠলো, নির্মিলিত চোখে হঠাৎ চপলা পায়ে  পালিয়ে যাওয়া।

অবশেষে রোববারের বিকেলে লৌকিকতার পর্যায় শেষ করে সামনের সোফায় কনেকে বসানো হলো। মা এনগেজমেন্ট রিং বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন -
----- আজাদ তুই পরিয়ে দে।

আমি ধীরে ধীরে ওর হাতটা তুলে নিলাম। অনামিকায় পরিয়ে দিলাম আমার নতুন বাঁধনের বন্ধন। মিলির ভুমিকায় অনর্গল কথা বলে যাওয়া ঠোঁট জোড়া আলতো কাঁপিয়ে চোরা দৃষ্টি ফেললো সে আমারই চোখের পরে।
আমার লুকানো দৃষ্টি ভেজা চোখের পরে ওর চোখের তারা ধরা পড়ে গিয়ে ঐ শ্যামা বরণ মিষ্টি মুখ খানিতে ছড়িয়ে পড়লো লজ্জার রঙে রাঙানো সবটুকু আভা। তাই দেখে আমার অনেক আগের হারিয়ে যাওয়া, নজরুলের সেই গানটি মন ছাপিয়ে ভেসে উঠলো 
&quot;- তোমার আখিঁর মতো আকাশের দুটি তারা / চেয়ে থাকে মোর পানে - / নিশিথে তন্দ্রা হারা সে কি তুমি, সে কি তুমি। &quot;.........

************
ফাহমিদা রিআ 
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/115805/</link>
				<pubDate>Sat, 28 May 2022 07:26:28 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23স" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#স</a>ে কি তুমি&#8230;&#8230;..</p>
<p>অবশেষে ছোট্টুনির কথাই খাটলো। সেই আদ্যি যুগের মত করে মেয়ে দেখতে যাওয়া। বর্তমানের ধ্যান-ধারনায় মানুষ আমি। বড় একটা ফার্মে ভাল চাকরিও করছি আজ দুবছর। এরই মধ্যে মায়ের তোড়জোড় ছেলের বৌ আনবার। </p>
<p>আমার অবশ্য তেমন আপত্তি নেই। কারন নিজের পছন্দের কেউ নেই বর্তমানে। তবে অতীতের একটা স্মৃতি আছে। ছাত্র জীবনে দু’চা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-115805"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/115805/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">8d72504b139ad3464195fea4041f3e03</guid>
				<title>#ছোট গল্প
 #প্রতীক্ষা......

কাগজে কলমে হিসেব করলে পাক্কা সতেরো বছর।
 এত বছর বয়স পর্যন্ত সুপ্তিতো জানতোই না যে তার মা বেঁচে আছে।
জ্ঞান হওয়া অবধি সে দেখেছে তাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটায় দাদীর সাথে তার বসবাস। পাশে আরও দুটো রুম। একটায় বাবা এবং মা আর অন্যটায় রাশেদ থাকে। রাশেদ ওর চেয়ে বছর দুয়েকের ছোটো। সুপ্তির বয়স যখন তিন বছর তখন   ওর বাবা নতুন মা নিয়ে আসেন।  তারপর একটু বড় হয়ে সুপ্তি  সবে বাড়ির লাগোয়া প্রাইমারী স্কুলে  কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে যাওয়া শুরু করেছে, তখন রাশেদের জন্ম। এসব কিছুই সুপ্তি দাদীর কাছে শুনেছে। ওর মনে পড়ে না কিছুই। শুধু জানে আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশিরা তার অবুঝ মনটাকে বারবার প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করতো বিরামহীন। সৎমা খেতে দেয় কিনা, চড় থাপড় মারে কিনা, চোখ রাঙিয়ে ভয়  দেখায় কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। 
সুপ্তি বুদ্ধি হবার পর থেকে এসবের কোন জবাব দেয় না আর। কারন সে জানে, মায়ের বিকল্প মাই।
গর্ভধারিনী মায়ের সাথে অন্যকে মিলাতে যাওয়াতো বোকামি। 
দাদী প্রায়ই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, সুপ্তি লেখাপড়া শিখে বড় হ&#039;সোনা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। নাহলে পরের ঘরে গিয়েও শান্তি নেই। খাওয়ার খোঁটা, কাজের খোঁটা চলতেই থাকবে।
তোকে নিজের পায়ে দাঁড়ানো না দেখে যে আমি মরেও শান্তি পাবো না। 
কিছুদিন থেকে দাদীর শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না । বাবা মোড়ের ডাক্তার চাচার কাছে থেকে বারবারই ওষুধ যোগ করছিলেন বেলায় বেলায়।
দাদী শুকনো মুখে  শুধু বলছিলেন, অত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেইরে। সময় হয়ে গেলে ধরে রাখা যায় না।

হঠাৎ সেদিন দুপুরে খাবার পর সুপ্তিকে কাছে ডাকলেন।শিয়রে বসিয়ে হাতটা টেনে নিয়ে বললেন,
----- সুপ্তি, তোর কি মায়ের কথা মনে আছে?
----- একটুও না। মাতো একটা দুধের বাচ্চাকে রেখেই মরে গেলো। অতটুকুন বয়সের কথা কি মনে থাকার কথা?
-----তোর মা মরে যায় নি সুপ্তি। খুঁজলেই পাবি। এটা বলবার জন্য  অনেকদিন থেকে অপেক্ষায় আছি যে। আমি মরে গেলে সত্যটা জানাই হবে না তোর। তুই যে আমার অনেক ভালোবাসার।  তোর সাথে প্রতারণা মানে আমার ভালোবাসাকে ঠকানো। 
তোর  আরও বড় হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে চেয়েছিলাম।   শরীরের যা অবস্হা এরপরে আর সময় নাও পেতে পারি। তাই......... 

সুপ্তি দাদীর হাতটা ধরে টের পেলো এতক্ষণে, অস্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন দাদীর হাতে। থিরথিরে কাঁপন যেন।  কি জানি দাদী স্বাভাবিক আছেন তো?
দাদীর কপালে হাত রাখে সুপ্তি। নাহ্ জ্বর নেইতো। 

তারপর সুপ্তি যা শুনলো নিজেকে সম্পুর্ন অচেনা এক পৃথিবীর মানুষ বলে মনে হতে লাগলো। চোখের তারায় সতেরো বছর আগের অদেখা  দিনগুলো যেন স্পষ্ট দেখতে পেলো দাদীর স্মৃতিচারণে। 

সুপ্তির বাবা আরিফ তখন সদ্য চাকরীতে জয়েন করেছেন, নিজ বাসভুম  থেকে অনেক দূরের পাহাড়ী অঞ্চলে। বিধবা মার কাছে শাসনবিহীন মানুষ হওয়া আরিফ ছোট থেকেই ছিলো একগুঁয়ে আর একরোখা। যখন যা মনে হয়েছে নিজের মতকেই প্রাধান্য দিয়েছে।
মার একার সংসারের ঘানি টানা থেকে মাকে হাল্কা করতে দূরত্বটাকে কঠিন মনে না করে দূর প্রান্তের চাকরীর পোস্টিংটাকে লুফে নিয়েছিল আরিফ।
মাসান্তে মাকে টাকা পাঠানো, চিঠিতে কুশল বিনিময়, এভাবে নির্বিঘ্নে দুটো বছর যেতে না  যেতে বাঁধালো গোল। বলা নেই, কওয়া নেই আরিফ রাতের গভীরে একদিন হাজির হলো পলাতক দৃষ্টির ভাঙ্গাচোরা চেহারা নিয়ে। সংগে টোপা গালের  ফুলো ফুলো চোখের মাখনের মত মোলায়েম রঙের এক পাহাড়ী কন্যা।  যেন মোমের পুতুল।

আর এই পুতুলটিকে বিয়ে করে পালিয়ে আসা ছাড়া আরিফের গত্যন্তর ছিলো না। ওদের গোত্রের কেউ এটা মেনেতো নিবেই না, উপরন্তু হাতের কাছে পেলে একেবারে প্রাণনাশ করে ছাড়বে।
পুতুল কন্যটির ভালোবাসায় এমনই ডুবে গিয়েছিল আরিফ যে, ওকে পাওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য ছিলো।
মা  কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও ধীরে ধীরে আশাহত হতে লাগলো আরিফ এবং বৌ উভয়েই। অন্য সংস্কৃতি, অন্য ভাষা, অর্থনৈতিক সংকটে হাঁপিয়ে ওঠতে লাগলো দুজনেই।

ধীরে ধীরে বৌটি মনমারা হতে থাকলো দিনের পর দিন। তারও আশা ভঙ্গের করুণ পরিণতি হয়েছিলো এই মফস্বলের সাদাসিধে সংসারটায় এসে। 

বছর ঘুরতে না ঘুরতে কোল জুড়ে সন্তান এলো। আর্থিক টানাপোড়েনে আরিফ ছুটোছুটি করতে লাগলো এক কাজ থেকে আরেক কাজে অন্য শহরে। সপ্তাহান্তে বাড়িতে এসে  বৌয়ের বিরূপ শীতল মনোভাবে সময় ক্ষেপন করে নিজেদের অজান্তেই  দূরে সরতে লাগলো  ক্রমশই। সন্তান জন্মদানের লম্বা সময়টায় স্বাভাবিক খাবার ওষুধের  অপর্যাপ্ততায় আর মানসিক চাপে  ক্লান্ত হতে হতে অসুস্হ হয়ে পড়লো বৌ।  শাশুড়ি সেবা শশ্রুষার দায় কাঁধে নিয়ে  হাঁপিয়ে ওঠলেন কদিনেই।   
ফলশ্রুতিতে উপায় খুঁজলেন।  আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি রফাটা হলো বৌ শাশুড়ির একান্ত চেষ্টায়। বৌমা নিজের বাবার নাম ঠিকানা শাশুড়ির হাতে দিয়ে বললো,  আমি এভাবে নীরবে শেষ হবো না মা।আমার বাবার অঢেল  সম্পত্তির একমাত্র উত্তরসুরী আমি। বিনা চিকিৎসায় মরে গিয়ে আমার সন্তানকে মা হারা করার চেয়ে বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে  অধিকার আদায়টাই জরুরী। আরিফ জানলে বাধ দিবে, আমার বাবাও হয়তো আটকে রাখতে চাইবে। কিন্তু সন্তানের টানে আমি ফিরতে পারবোই যেভাবেই হোক।ততদিন সুপ্তিকে কাছ ছাড়া করবেন মা, আগলে রাখবেন।
এই ঘটনাগুলো এত দ্রুত একের পর এক ঘটে যেতে লাগলো যে আরিফ সপ্তাহান্তে এসে নিরব শ্রোতা হয়ে শুধু শুনলো। 
ওদের তাচ্ছিল্য আর অহংকারী মনোভাব সম্পর্কে আরিফ আগেই জানতো তাই  কিছু একটা আঁচ করে নিতে অসুবিধা হলো না। তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করলে সরাসরি হুমকি এলো, এই পর্ব ভুলে যেতে। কষ্টের সংসারে তাদের কন্যাকে আর ফিরতে দিবেন না তারা।  নিজেদের পাহাড়ি এলাকাতেই আবার সংসারী হবার তোড়জোড় চলছে, এও জানালেন। এ অবস্হায় কোন রকম আবেগকে  প্রশয়তো দিবেই না,  আরিফকে পেলে ফলাফল হবে ভয়াবহ।

সব শুনে বিধবা মা তাঁর একমাত্র সন্তানকে ওদের রোষানল থেকে মুক্ত করতে আরিফকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিন কয়েকের মধ্যে বিয়ে দিলেন দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ার সাথে। 

আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশিরা জানলো চিকিৎসাধীন অবস্হায় মারা গেছে  পুতুল বৌটি পিতৃগৃহেই।

কিন্তু সতেরো বছর আগের সেই স্বল্পকালীন পর্বটা  মুছে ফেলাটা অতটা সহজ ছিল না বলেই আজ সেই রেশ ধরে সুপ্তি হাজির হয়েছে। 

দাদীর মুখ নিঃসৃত ঠিকানায় দুর্গম এলাকায়, সে সময়ের  নাম করা ব্যক্তির নাম আর স্হানের নামের উপর আস্হা রেখে  অনেক  কাঠ খড়  পুড়িয়ে সুপ্তি পৌঁছুলো বটে, ভেবেছিলো  ব্যস্ত হাতে সংসার আর এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের মাঝে ঠিক চিনে নিবে তার পুতুল সদৃশ্য মাকে। কিন্তু এমন দৃশ্যের জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। 
অশীতিপর বৃদ্ধ  কাঁপা হাতে জড়িয়ে ধরলেন সুপ্তিকে। একসময়ের রাশভারী ভীষন দেমাগি অহংকারী লোকটির দুচোখে গড়িয়ে পড়া অশ্রু দেখে সুপ্তির বুক কেঁপে ওঠলো। ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে যা বললেন তার অর্থ বুঝে সুপ্তির এত চেষ্টা আর আগ্রহ গুলো মিইয়ে গেলো মুহুর্তে। 
উনি মেয়ের অসম্মতিতেই  বিয়ে দেয়ার দুদিনের মাথায় সেই যে ফিরে এলেন আর ও মুখো হননি।  ধীর স্হির অনড় অচল হয়ে যেতে থাকলেন একটু একটু করে। ডাক্তার বললেন, মেন্টালি শকড্। জোর করে কিছু করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। হয়তোবা  আপন মনেই
স্বাভাবিকতায় ফিরে আসবেন একদিন।

সেই প্রতীক্ষা নিয়ে দিন গুনছেন বৃদ্ধ আজ সতেরোটা বছর।  

বৃদ্ধকে অনুসরন করে এগিয়ে গেলো সুপ্তি কয়েকটা সিঁড়ি ডিঙিয়ে কাঠের তৈরি চমৎকার ঘরটায়। শিকের গরাদে দু হাত রেখে জানালায় দৃষ্টি ছুঁড়ে চেয়ে আছেন এক মহিলা। পিঠ ছড়ানো কাঁচা পাকা হাল্কা হয়ে যাওয়া চুলের গোছা।
বৃদ্ধ আঙুল নির্দেশ করে বললেন,
----সুপ্তি,ঐ আমার মেয়ে। তোমার মা।

সুপ্তির কি যেন হয়ে গেলো হঠাৎ।  অচেনার সব পর্দা সরে গিয়ে গলা চিরে বেরিয়ে এলো তীব্র চিৎকার 
--------- মা আ আ আ আ আ আ আ.........
ফিরে তাকালেন মা। খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
------- এসেছিস?

******************

*ফাহমিদা রিআ*</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/115409/</link>
				<pubDate>Fri, 27 May 2022 04:13:44 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23প" rel="nofollow ugc">#প</a>্রতীক্ষা&#8230;&#8230;</p>
<p>কাগজে কলমে হিসেব করলে পাক্কা সতেরো বছর।<br />
 এত বছর বয়স পর্যন্ত সুপ্তিতো জানতোই না যে তার মা বেঁচে আছে।<br />
জ্ঞান হওয়া অবধি সে দেখেছে তাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটায় দাদীর সাথে তার বসবাস। পাশে আরও দুটো রুম। একটায় বাবা এবং মা আর অন্যটায় রাশেদ থাকে। রাশেদ ওর চেয়ে বছর দুয়েকের ছোটো। সুপ্তির বয়স যখন তিন বছর তখন   ওর বাবা নতুন ম&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-115409"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/115409/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">4f4334121c042db2142b97ba1587c880</guid>
				<title>#ছোট গল্প
 #ক্যামেলিয়া



নতুন বৌ হয়ে যখন মিনু এলো এ বাড়িতে, পরদিন থেকেই  কোমরে আঁচল জড়িয়ে নেমে পড়লো সংসারের কাজে। একেতো নতুন বাড়ি, তার উপর পুরোই ফাঁকা। 
শ্বশুর শাশুড়ির বরন ডালা জুটলো না তার ভাগ্যে। পরিবারের সর্ব কনিষ্ঠ পুত্রের বধু হয়ে মিনুর যখন আগমন ঘটলো, শ্বশুর শাশুড়ি তার বহু আগেই বিদায় নিয়েছেন জগত সংসার থেকে। ভাসুর ননাসদের আপন আপন গন্ডিতে আপন আপন সাজানো সংসার।  আপ্যায়নের কোন ত্রুটি নেই, নেই আন্তরিকতারও। কিন্তু যৌথ পরিবারের মত এক হাঁড়ির অন্নে অনেকগুলো ভাইবোনদের যে বাড়তি আনন্দের একটা ব্যাপার থাকে, মিনুর কল্পনায় তা অপুরনীয়ই রয়ে গেলো। নিজে একক পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় খানিকটা স্বপ্ন ছিল বৈকি শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সবার সঙ্গ উপভোগের। কিন্তু আশায় গুড়েবালি।  

পৈত্রিক ভিটা থেকে বেশ কিছুটা দূরে শহরের আরেক প্রান্তে মিনুর হাসবেন্ড ছোট্ট খাটো একটা দ্বিতল বাড়ি সম্পন্ন করে তবেই বিয়ের পাত্র সেজেছেন। সদ্য নির্মিত বাড়িটিতে নববধূ মিনুও নতুন সাজে সাজিয়ে চলেছে ।দোতলার ব্যালকনিতে গোটা কতক ছোট ছোট টবের গাছ  শিকায় ঝুলাতে গিয়ে সামনের বাড়িটির খোলা আঙ্গিনায় দৃষ্টিটা আটকে যায়। পিঠ ছড়ানো এলো চুল পড়ন্ত বেলার নরম রোদে ছড়িয়ে বিস্ময়ের চাহনী মেলে তাকেই দেখছে একটি মেয়ে। কি যে মায়াময় চোখের চাউনি। চাপা গায়ের রঙ ঠেলে অপরূপ শ্রীময়ী মুখখানা। কমনীয় ঢলোঢলো মুখাবয়বে জ্বলজ্বল করছে লাল পাথরের নাকফুল।

গ্রীলের ফাঁকে মুখ লাগিয়ে সৌজন্যের হাসি দেয়। মেয়েটিরও চিকন দুঠোঁটের ফাঁকে এক চিলতে হাসি খেলে যায়। 
শহুরে পরিবেশে একটা গ্রামীন ভালোলাগা ছুঁয়ে দেয় যেন মিনুকে।

ধীরে ধীরে প্রতিবেশিদের অনেকের সাথেই আলাপ হয়, হয় সখ্যতাও।

দূর থেকে দেখা মেয়েটাকেও জানা হয়। নাম শেফালি।বয়সে ওর বেশ ছোটই  হবে। বিয়ে হয়েছে মাস কয়েক আগে। 
একই শহরের এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির আশ্রিতা হয়েছে। তবে আগের বাড়িতে ছিল সংগিহীন, এখানে সংগীসহ।
কোন ছেলেবেলায় গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিল ওদের গাঁয়ের চৌধুরী সাহেব তার মেয়ের বাড়িতে। সাহায্যকারী হয়ে থাকবে, কাজ কর্ম শিখবে। মাসে মাসে মায়ের কাছে হাতখরচটাতো যাবেই, উপরন্তু বিয়ের জন্য যা যা ব্যয়ভার সব দায় ওদেরই রইবে।
শেফালির বিধবা মা অনেক ভেবে রাজী হয়েও গেলেন, কন্যার ভবিষ্যৎ দায় মুক্তির আশায়।

বেগম সাহেবা মানুষটিও মন্দ ছিলেন না। কথা রেখেই এগুচ্ছুলো সময়। সাহায্যকারী থেকে সংসারের পুরো দায় শেফালি কাঁধে নিলো নিজ দক্ষতায়। তার  উপরেই পুরো নির্ভরশীল হয়ে গেলেন কর্ত্রী একসময়। 

কিন্তু চারপাশ ঠিক থাকলেও মনের একান্ত ছোট্ট কোনটুকুতে বাঁধলো গন্ডগোল। ওখানে আর নিজের নিয়ন্ত্রন নেই শেফালির। কখন কোনদিন যে ওর মন পুরোটাই বেদখল হয়ে গিয়েছে নিজেও জানে না। যখন জানলো বিনা বাক্যব্যয়ে এতদিনের আশ্রয় ছেড়ে মানুষটির হাতে হাত রেখে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন এর কাগজে সীল ছাপ্পড় দিয়ে পাকাপোক্ত ভাবে নতুন পরিচয়টা মাথা পেতে নিলো।

  শেফালি আর ফিরলো না পুরনো ঠিকানায়। নতুন আশ্রয় জুটে নতুন মানুষের ঠিকানায়, এটাইতো জানে সে।  মানুষটিও যে এ শহরে আশ্রিত। শেফালির  ঐ বাড়ির বেগম সাহেবার আত্মীয়ের  বাড়ি সেটা।  এ বাড়ি ও বাড়ির এটা সেটা আদান প্রদানে এবেলা ও বেলা আসার সুত্র ধরেই মানুষটির প্রতি ভাব ভালোবাসার উৎপত্তি শেফালির। 

এ বাড়ির মালিক মুটামুটি স্বচ্ছল ব্যবসায়ী। এটারই দেখভাল করে শেফালির  মানুষটি বহুদিন যাবৎ।  নীচতলার পুরোটাই এসব কাজের গুদাম ঘর আর জনা কতক শ্রমিক গোছের পরিশ্রমী মানুষের ঢালাও থাকা খাওয়ার ব্যবস্হা। তারই এক পাশে রান্নাঘর,ভাড়ার ঘর লাগোয়া ঘরটিতে শেফালির নতুন জীবনের শুরু। 

বৌ নিয়ে যখন ও বাড়িতে ওঠলো মানুষটি অন্যান্য শ্রমিক বা বাড়ির কেউ তেমন অবাক হলো না। যেন এমনই কথা ছিলো। কিন্তু ব্যাপারটা ঘোলাটে হলো তখনই যখন শেফালি মানুষটির আহ্বানে পিছু পিছু এ বাড়ির কর্ত্রীকে সালাম করতে গেলো দোতলায়। 
-------  কে?   শেফালি না? 
ভুত দেখার মত চমকে ওঠলেন এ বাড়ির বেগম সাহেবা। আত্মীয়তার সুত্রে ও বাড়িতে যাতায়াত।শেফালি বহু আগে থেকে চেনা। শেফালির মানুষটি উনাদের বেতনভুক  কর্মচারী। জিজ্ঞেস করলেন,
----শেফালিকে বিয়ে করেছো, তোমার বউ জানে?

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো শেফালির। সব্বোনাশ। এত বড় প্রতারণা করলো মানুষটি তার সাথে?
অগত্যা ফয়সালা হলো দুই বাড়ির সাহেব আর বেগম সাহেবাদের আলোচনার মাধ্যমে।
গাঁয়ের বাড়িতে বড় বউ যেমন ছিল তেমনি থাকবে, এখানে থাকবে শেফালি।
আগের বাড়ির মত এ বাড়িরও যাবতীয় দায় দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিলো শেফালি। হা ভাগ্য। বাড়ি বদলালো, কপাল বদলালো না। পিছন ফেরার সব পথই যে বন্ধ।  একটু একটু করে অল্পে খুশি হওয়া সারল্যে ভরা মনটা একসময় সুখেই ভেসে বেড়াতে লাগলো। ভুলে গেলো মনের মানুষটির প্রতারণা, বিশ্বাস জন্মানো ভালোবাসায় তার নিশ্চিন্ত অবগাহন হলো নির্দ্বিধায়।

এসব জেনে মিনুর কেমন যেন মায়া জাগে শেফালির জন্য। যতবার ব্যালকনিতে দাঁড়াতো, সামনে বাড়ির খোলা আঙিনায় অনেকের ভীড়ে শেফালিকেই খুঁজতো। আর চোখ পড়লে মায়াবী মুখটা দেখে একই  মুগ্ধতায় বিভোর হতো বারবার।

কিছুদিন পর। মিনুর মাতৃত্বের নতুন আয়োজন তখন। বাবার বাড়ি থেকে নিতে এসেছে মিনুকে। লম্বা সময় কাটিয়ে ফিরবে মিনু নতুন মেহমান নিয়ে। যাবার বেলায় দাঁড়ালো ব্যালকনির পূব কোনে, মানিপ্লাটের শিকায় ঝোলানো পাতাগুলো ছুঁয়ে দিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে খুঁজে পেলো শেফালিকে। এক গাদা কাপড় ভিজানো গামলা নিয়ে বসেছে মোড়া টেনে। খানিকটা ক্লান্তও দেখাচ্ছে ওকে।
বরাবরের মত চোখে চোখ পড়তেই মিনু জানালো  কিছুদিনের অনুপস্হিতির খবরটা। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠলো শেফালি কিছুক্ষন আগের অবসন্নতা আর ক্লান্তি ঝেড়ে।
------ তাইলে আমার সুখবরটাওতো  বলতি হয় আপনেরে। হা হা হা..... 
হাসির তোড়ে বাকিটুকু বলা হয় না শেফালির। 
মিনুর মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। কেমন যেন একটা তৃপ্তি  জাগে মনে। অসম বয়স,  সম্পর্কের বৈপরীত্য , অবস্হানগত অসামঞ্জস্যতা সব কিছু ছাড়িয়ে কোথায় যেন একটা মিল ছুঁয়ে দেয় মিনুর অন্তরাত্মায়। 

কেটে যায় সময়। মিনু নিজ সংসারে ফিরে আসে বিষন্নতায়। নতুন অতিথিকে হারিয়ে। গর্ভস্হ সন্তানকে মাটির গর্ভে প্রতিস্হাপন করে শুন্য কোলেই ফিরে। 

জীবন চলে খুঁড়িয়ে। উৎফুল্লতাগুলো খুঁজে পায় নাআর। উচ্ছল পদচারনা নেই। জীবনকে টেনে বেড়ায় মিনু। অভ্যসবশে এসে দাঁড়ায় পূব কোনে কখনও। শেফালিকে তেমন চোখে পড়ে না আজকাল। কখনওবা একটু দেখা মিললেও ভারী শরীরটা হাঁপাতে হাঁপাতে বয়ে বেড়াতে দেখে। কথা হয় না। চোখাচোখিও না।

তারপর হঠাৎ  করেই কোলাহল একদিন। গ্রীলের বাইরে দৃষ্টি ছুড়ে দিতেই বিস্মিত হয়ে দেখে হাসপাতাল ফেরত  শেফালিকে। পিছনে ওর স্বামীর বুকের সাথে লেপ্টে থাকা তোয়ালে জড়ানো নবজাতক। 
তরতর করে নেমে আসে মিনু। এক্কেবারে বড় গেইট ডিঙিয়ে সোজা ওদের উঠোনে। দুহাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেয় শেফালির সদ্যজাত সন্তান।  পিটপিটে চাউনি, তুলতুলে গাল আর রেশম কোমল নরম চুল ভর্তি মাথাটা দেখে আবেগের আতিশয্যে স্মৃতিকাতর মনটা হু হু করে ওঠে। অঝোর ধারায় মিনুর দুচোখে বর্ষা নামে, শত চেষ্টাতেও আড়াল করতে পারে না তা।

মমতার গোড়াপত্তন সেই থেকে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মিনুর তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি শুধু শেফালি কণ্যাকে দেখে। 
শীতের রোদে তেলপাট করে শেফালি পরম যত্নে। রোদ গরম পানিতে গা ধুয়ে দেয়, ডাগর চোখ দুটিতে কাজল এঁকে দেয়,কপালের কোনায় দেয় মস্ত কালো টিপ। জংলি ছাপের ছোট্ট ফ্রকটা মাথা গলিয়ে পরিয়ে দিয়ে টোপা গালের ফোকলা হাসিতে টসটসে কন্যার ছিটকে পড়া আলোয় মিনুর কন্যা শোক উথলে ওঠে।
শেফালি কতকটা বুঝে হয়তো। বাচ্চার নাক টিপে দিয়ে বলে, আর এট্টু বড় হোক,ঠিক চলে  যেতি চাইবে পুটি আপনের বাগানে।
----- উঁহু, পুটি নয়।অমন পুতুল পুতুল মেয়েটাকে সুন্দর নামে ডেকো।
----- কালো মেয়ের আবার নাম। সাড়া দেয়া নিয়ে কথা।  তবে  এ যুগের ছাওয়ালতো।&quot; ক্যামেলিয়া&quot; নাম ধইরে উপরের খালাম্মায় ডাক দিলে কান খাড়া কইরে এদিক ওদিক খোঁজে।
মিনুও গলা বাড়িয়ে বলে,
-----  সুন্দরতো। ক্যামেলিয়াই ওর নাম।


এরপরের দৃশ্যপট পাল্টায় দ্রুত। মিনুর হাসবেন্ডের 
স্কলারশীপটা হয়ে যাওয়ায় উড়াল দেয় ওরা সাত সমুদ্র পারে। প্রবাস জীবনে এক এক করে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। মিনু ফিরে আসে সন্তান সন্ততি নিয়ে আপন ঘরে লম্বা অবকাশে।

আবারো সাজে বাড়িটা। ঘর গেরস্হালিতে মনোনিবেশ করে মিনু পূর্ণ উদ্যোমে।
পূবের ব্যালকনিতে নার্সারি থেকে আনা গাছগুলি সবুজাভ ভালোবাসায় ভরে ওঠে লতায় পাতায়,ফুলে ফুলে। পরিচর্যার ফাঁকে ফাঁকে ব্যস্ত দৃষ্টি ঘুরায় মিনু সামনের বাড়ির অপরিবর্তনীয় উঠোনটিতে।  নতুন মুখের শ্রমিকদের ছুটোছুটি দেখে।  কল পাড়ে ট্যপের অঝোর ধারায় বড় বড় গামলায় কাপড় ধোয়া দেখে, বাসন মাজা দেখে। কিন্তু শেফালির ভেঙ্গে পড়া স্বাস্হ্য, বিরস চেহারা সর্বোপরি এতবছর পর মিনুর সাথে একটি বারও চোখাচোখির ব্যাপারটা ঘটে না। তবে একটি নতুন দৃশ্য মনোযোগ কাড়ে মিনুর। ছাদের চিলেকোঠার এক চিলতে বারান্দায়, সানসেটের আড়ালে,নীচতলার করিডোরে অষ্টপ্রহর মুঠোফোন কানে লাগিয়ে এক অষ্টাদশীর কথোপকথন। চেহারাটা চেনা চেনা  মনে হলেও ও বাড়ির কে হতে পারে অনুমান করতে পারে না মিনু দীর্ঘ অদর্শনের কারনে। পুবের ব্যালকনি থেকে মেয়েটির হাত নেড়ে কথা বলার ভংগিটা খুব মজা লাগে মিনুর। কি মিষ্টি যে লাগে দূর থেকে। বিশেষ করে গোলগাল মুখটায় নাকে দোলানো নথটা চমৎকার মানিয়েছে। 

ঠিক দুদিন পরেই বিষয়টা খোলাসা হলো মিনুর কাছে। ক্যামেলিয়ার বিয়ে হয়েছে কদিন আগে। ফিরানিতে এসেছে মায়ের কাছে।

মিনু ভেবেছিলো প্রতিবেশিদের সাথে কদিনের মধ্যেই দেখা করতে যাবে হাতের কাজগুলো গুছিয়ে নিয়ে।  কিন্তু দূর থেকে দেখা সৌন্দর্য্য গলে পড়া অষ্টাদশীই যে ক্যামেলিয়া,  শুধু তাই নয় তার হারিয়ে যাওয়া কন্যার বয়সী ক্যামেলিয়া শ্বশুর বাড়ির বধূও। 
পরদিনই খামে কিছু টাকা নিয়ে ছুটলো মেয়েটিকে একটু আদর ছুঁয়ে দিয়ে  দোআ করে আসবে।
কিন্ত কোথায় শেফালি? ক্যামেলিয়াইবা কই? 

এগিয়ে ঢুকলো একেবারে অন্দরে। রান্না বসিয়ে চুলার আগুনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে শেফালি। মিনু উচ্ছ্বসিত গলায় ডাকলো,
----- শেফালি, এই শেফালি।
অবশেষে সজাগ হলো শেফালি।
আগের মত হই হই করে ওঠলো না। হাত ধরে বসালোও না। মিনু ভাবলো, হতেই পারে অনেকটা সময়ের  না দেখার আড়ষ্টতা।
খামটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
----- ক্যামেলিয়ার বিয়ে দিলে জানি নাতো।
ওকে ডাকো, দোআটা করে যাই।
তর্জনিতে আঙ্গুল পেঁচাতে পেঁচাতে মাথা নীচু করে ক্ষীন কন্ঠে বললো শেফালি,
----- ভালো ছেলে পালাম, তাই ওর বাবা তাড়াহুড়ো কইরে বিয়েটা সেইরে ফেল্লো।
পুটিতো খানিক আগে চইলে গেলো ওর শ্বশুরবাড়ি।

মিনু খামটা বাড়িয়ে দিলো এবার। বললো,
-----এটা ধরো। ক্যামেলিয়াকে কিছু কিনে দিও। আবার যখন আসবে, জামাইসহ বেড়িয়ে আসতে বলো আমাদের ওখানে।
মাথা নেড়ে সায় জানালো  শেফালি।
কন্যা বিদায় দেয়া কষ্টমাখা শেফালির মুখখানা দেখে আর বিরক্ত না করে মিনু চলে এলো।

সপ্তা খানেক পর এক রিলেটিভের এনগেজমেন্ট অনুষ্টান শেষে পদ্মা পাড়ের বাঁধের পথটা দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরছিলো মিনু হাসবেন্ডের সাথে। পুরনো স্মৃতি রোমন্হনও বলা যায়।
হঠাৎ  পরিচিত কন্ঠ আর আঞ্চলিকতার চেনা সুরটা কানে যেতেই  লক্ষ্য করলো, বটমুলের কাছে জনা কতক লোকের জটলা শেফালিকে ঘিরে।
দাঁড়িয়ে পড়লো মিনু।
    শেফালি বলে চলেছে কোনদিকে খেয়াল না করেই,
----- হ্যা হ্যা পুটি ওর নাম।আমার মেয়ে। ভাবগতিক ভালো না বুইঝেতো তাড়াহুড়ো কইরে বিয়া দিলাম। কিন্তুক শয়তান মিইয়ে ( মেয়ে) যে এমনটা করবার পারে বুঝি নাই।
আপনারা কি কতি পারেন এই মহল্লার কোন বাসাটা ওদের? আমি শুধু দেইখে চইলে যাবো, কোন স্বর্গে সে আছে?
দুহাতে মুখ ঢেকে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকলো শেফালি।
মিনু এগিয়ে গেলো। জটলার মাঝ থেকে শেফালির হাতটা ধরে টেনে নিয়ে বটমুলের বেদীতে বসালো। 
বললো
----- শেফালি, কান্না থামাও। তাকাও আমার দিকে।
এবার বলোতো কি হয়েছে? মেয়ের শ্বশুরবাড়ি না দেখেই বিয়ে দিয়েছো?
শেফালি মিনুর দু হাত ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে যা বললো তা হলো, পুটি মানে ক্যামেলিয়া কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মেনে নেয়া সম্ভব নয় বলে চটজলদি ক্যামেলিয়ার মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিপদ কেটে গেছে মনে করে নিশ্চিন্ত হয়।
কদিন যেতে না যেতে খবর আসে ক্যামেলিয়া তার ভালোবাসার ছেলেটির সাথেই আইনানুযায়ী পাকাপোক্ত সংসার পেতেছে।
মিনু সব শুনে বললো,
----- প্রথমে যখন সামাল দিতে পারো নি, জোর করে অন্য জায়গায় বিয়ে না দিয়ে ওর পছন্দটাকেই মেনে নিলে না কেন?
এবার কান্না থামিয়ে মাথাটা নীচু করে কিছুক্ষন  চুপ থাকলো শেফালি। তারপর ধীরে ধীরে যা বললো তার সারমর্ম হলো, ক্যামেলিয়ার প্রেমটা একই ধর্মাবলম্বীর নয়। দুই ধর্মের দুজন হওয়ায় দুপক্ষের অভিভাবকেরাই বাঁধ সেধেছেন সঙ্গতভাবেই।
নিরুপায় হয়ে ক্যামেলিয়াকে শক্ত  বাঁধন দিতে গিয়ে দড়ি ছিঁড়ে গিয়েছে পুরোই।
মিনু দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেফালির হাতটা ধরে বললো, যে নিজেই হারিয়ে গেছে তাকে এভাবে পথে পথে খুঁজে বেড়ানোর কোন মানে নেই। চলো বাসায় চলো আমার সাথে।

আস্তে করে হাতটি সরিয়ে নিলো শেফালি। 
------ আপনি চইলে যান।  পুটির কারনে এতকালের আশ্রয় থেইকে আমাদের বাহির হতি হয়েছে। মালিকের বাড়িতে কোন অধর্ম মেইনে নিতে নারাজ তারা। 
তাইতো তারে দেখতি বেরোইছি। দুধেভাতে বড় কইরে, লেখাপড়া শিখায়ে, নিজেরা খেয়ে না খেয়ে দামী মোবাইলটা, পোশাকটা, ঘড়িটা কিইনে দিয়েছি তার  সমাজ রক্ষা করার এই শাস্তি সে কোন জ্ঞানে দিতি পারলো?
পাড়ার বৌ ঝিরা একে একে ওকে ঘিরে ধরেছে ততক্ষনে। অদূরে দাঁড়ানো হাসবেন্ডকে লক্ষ্য করে মিনু পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবলো, ভুলটা যে তোমাদেরই শেফালি। ওর অবস্হানটা ওকে বুঝতে দাওনি বলে ও তোমাদের একজন হতে পারে নি। লেখাপড়া শিখিয়েছো, শিক্ষা দিতে পারো নি। দামী জীবনে অভ্যস্ত করিয়েছো, কিভাবে যোগাড় করতে হয়, জানাও নি। 
বাস্তবতা থেকে এত দূরে ঠেলে দিয়েছো বলেই ও  স্বর্গটাকে হাতের মুঠোয় ধরতে চেয়েছে।
হয়তো সেদিনও বেশি দূরে নয়। বাস্তবতার ঘা খেয়ে সেও পথে পথে আশ্রয়হীন বাবামাকে খুঁজে ফিরবে জনে জনে।



***************
ফাহমিদা রিআ 
***************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/115260/</link>
				<pubDate>Thu, 26 May 2022 05:50:10 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ক" rel="nofollow ugc">#ক</a>্যামেলিয়া</p>
<p>নতুন বৌ হয়ে যখন মিনু এলো এ বাড়িতে, পরদিন থেকেই  কোমরে আঁচল জড়িয়ে নেমে পড়লো সংসারের কাজে। একেতো নতুন বাড়ি, তার উপর পুরোই ফাঁকা।<br />
শ্বশুর শাশুড়ির বরন ডালা জুটলো না তার ভাগ্যে। পরিবারের সর্ব কনিষ্ঠ পুত্রের বধু হয়ে মিনুর যখন আগমন ঘটলো, শ্বশুর শাশুড়ি তার বহু আগেই বিদায় নিয়েছেন জগত সংসার থেকে। ভাসুর ননাসদের আপন আপন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-115260"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/115260/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">90950e55fb0da1f3948cc1f36740c43e</guid>
				<title>#ছোট গল্প
 #মোহনায়


প্লেট দুটো সেন্টার টেবিলটায় রাখতে রাখতে মিনুর নরম মোলায়েম কন্ঠের ডাকটা রাহেলা বেগমের অন্তর ছুঁয়ে দিলেও সাড়া দিলেন না ইচ্ছে করেই। আবার শোনবার অপেক্ষায় রইলেন। 
দুহাতে আনা পানির গ্লাসদুটো ঠক্ করে টেবিলে রেখে তাকালো মিনু অদূরে খাটে বসা রাহেলা বেগমের দিকে। 
----- আন্টি, জলদি জলদি। এই মহা ভোজ ঠান্ডা হলে কিন্তু আর গলা দিয়ে নামবে না। 
কল কল হাসির আবেশে মিনুর মুখটা কি উচ্ছল যে লাগছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত পায়ে পায়ে এগিয়ে আসেন রাহেলা বেগম। বেসিনে হাত ধুয়ে টেবিলের  দিকে এগুতেই মিনু  চেয়ারটা টেনে বসিয়ে দিল পরম যত্নে।

সামনে ধোঁয়া ওঠা ভাতের প্লেট টা এগিয়ে দেয় মিনু। প্লেটের এক কোনে পুঁই চচ্চড়ি আর মসুর ডালের ভর্তা। 
মুখোমুখি আর একটা চেয়ারে বসে অন্য প্লেটটা টেনে নেয় মিনু নিজের দিকে।
রাহেলা বেগমের দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে। গলার কাছে দলা পাকানো কষ্টটা মিনুর কাছে ধরা পড়ার ভয়ে গ্লাসে মুখ লাগিয়ে ঢক ঢক করে কিছুটা পানি খেয়ে নেন প্রথমেই।
------শুরুতেই পানি খেলে ভাত খাবেন কি করে ? গলা শুকিয়ে আসছে বুঝি। আসলে দিনকাল যেন কেমন হয়ে গেলো। হাট বাজার বন্ধ, বাইরে যাওয়া বন্ধ। এসব শাক পাতা আর কতদিন খাওয়া যায়। 
রাহেলা বেগম ভাতের প্রথম লোকমা মুখে তুলেছেন সবে। মিনুকে হাত ইশারায় থামতে বলে আঁচলে মুছতে মুছতে বললেন,
------- মাগো, তুমি এমন করে বললে যে আমি আমার কাছেই ছোট হয়ে যাই। দুনিয়াটাকে যে আমি অনেক খারাপ ভাবতাম তোমার দেখা না পেলে।

একটু হাসি খেলে যায় মিনুর সারল্যমাখা মুখ খানিতে।
------- দুনিয়ার সবাই খারাপ হলে আমি আপনার মত ভালো মানুষ  আন্টিকে কি করে পেলাম। হা হা হা.....
খাওয়া শেষ করে আমরা আজ অনেক গল্প করবো আন্টি। ভালো ভালো মানুষদের ভালো মনের।
গতরাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি, দিনে খানিকটা গড়িয়েছিলাম বলে। আপানাকেও উশখুশ করতে দেখেছি, ঠিক না আন্টি?
------- সত্যি মাগো ঠিক, এক্কেবারে ঠিক। খাওয়া তবে শেষ করি। আহা কি চমৎকার রেঁধেছো মা। পুই চচ্চড়ির এই স্বাদ মাছ মাংসকেও হার মানায়।
------- আসলে ব্যাপারটা হলো কি জানেন আন্টি, ক্ষুধায় সবই অমৃত। জিভও বুঝে এটা দুর্দিনের সময়। হা হা হা...... 
রাহেলা বেগমও সে হাসিতে সংক্রমিত হোন। 

আজ গুনে গুনে এক মাস  হতে চললো রাহেলা বেগমের এখানে পদার্পনের।  অথচ মনে হয় যেন কত যুগ ধরে তাঁর মিনুর সংগে সম্পর্ক।  যে সম্পর্ক রক্তের বাঁধনকেও হার মানিয়েছে।

কি সুক্ষনেই যে রাহেলা সেদিন ছোট্ট ব্যাগটায় দুখানা কাপড়  ভরে আর ঘরে লুকোনো বেশ কিছু টাকা কোমরের পেটিতে আড়াল করে রওনা দিয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। বড় ভাবী বা ছোট ভাইয়ের বউ ভাবলেশহীন হয়ে উঠোনের এক কোনে বসে যেমন  সব্জি কুটছিল নির্বিকারভাবে তেমনিই রইলো। ছোট ভাই বসে ছিল বারান্দায়। রাহেলার হাতের  ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে শুধু বললো, কোথাও  চললি মনে হচ্ছে?
রাহেলা  দরজা ঠেলে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, দেখি কতদূর যাওয়া যায়।

&quot; যাবার জায়গা থাকলেতো? আসবে ঘুরে ফিরে আবারো....
সামনে একটা খালি রিকশা আসতেই ভাবীর বাকি কথাগুলো আর শুনতে হলো না রাহেলাকে। 
হনহন করে এগিয়ে চললো রিকশা সোজা বাস স্ট্যান্ড।

বাস মালিক সমিতি হঠাৎ  ঢাকার গাড়ি বন্ধ ঘোষনা করেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। রাহেলা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন। বাড়ি ফিরে গেলে আবারো পিছিয়ে পড়বেন তাঁর লক্ষ্য থেকে। একটা মুহূর্তও আর ওখানে থাকার ইচ্ছে নেই।  চাকুরী থেকে অবসরের প্রায় বছর হতে চললো, জীবনের কিনারায় এসে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না যদি ভবিষ্যৎ ভাবনাটা আগেই ভাবতেন। যাক যা হবার হয়েছে। আর একটা দিনও নষ্ট করার সময় হাতে নেই।  পায়ে জোর থাকতে থাকতেই থিতু হয়ে বসতে হবে একটা ছায়াতলে নইলে চোখ কান মেলে শুধু যন্ত্রনার প্রহর গুনতে হবে চলৎশক্তিহীন হয়ে শুয়ে থেকে।

ব্রেক জার্নির সিদ্ধান্ত নিয়ে হাটিকুমরুল পর্যন্ত টিকিট নিলেন তিনি। বাস নির্ধারিত সময়েই রওনা হলো। হাতের কব্জি উল্টে হাতঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে হিসেব কষেন। চার ঘন্টা লাগলেও আবারো আর এক লোকাল গাড়িতে উঠে  সন্ধ্যে নাগাদ পৌছুতে পারবেন। নোট বুকে লেখা ঠিকানা মিলিয়ে ঠিক পৌঁছুতে পারবেন&quot;গোধুলি&quot; র ঠিকানায়।
ভাগ্যিস অফিস সহকর্মী নিলুফার খোঁজ খবর নিয়ে তাকে সেদিন মোবাইলেই উপায়টা বলেছিলেন, ফাইনাল করার আগে নিজে এসে দেখে শুনে যাওয়াটাই ভালো।

হাটিকুমরুল আসতে তখনো দুটো স্টপেজ বাকি। ভীড় ঠেলে রাহেলার সিটের পাশে দাঁড়ালো একটি ২৫/৩০ বয়সের মেয়ে।
গাড়ির ব্রেক কষলেই বারবার হুমড়ি খেয়ে রাহেলার দিকে ঝুঁকে পড়ছে হাতের ফাইলটা সামলে  নিয়ে। রাহেলার সাথে চোখাচোখি হতেই বললেন, এই মেয়ে, ফাইলটা আমাকে দিয়ে শক্ত হাতে রড ধরে দাঁড়াও, নইলে পড়ে যাবে তো।। তাই করলো মেয়েটি, কিন্তু  পরের স্টপেজ আসতেই গুন্জন মোবাইলে মোবাইলে। আগামীকাল থেকে গনপরিবহন বন্ধ। কয়েকটি শহর লকডাউন।  অদৃশ্য ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে লোকালয়ে। 
যাত্রীদের অনেকেই নেমে গেলো। সিট খালি হওয়ায়  মেয়েটি রাহেলার পাশে এসে বসলো এতক্ষনে। কন্ঠে ব্যকুলতা ঝরিয়ে বললো, আপনি কোথায় যাবেন আন্টি? মানে জানতে চাইছিলাম মাধবপুর অবধি আছেনতো?
---- মাধবপুর ছাড়িয়ে আরও দূরে আমার গন্তব্য সুবর্ণপুর।
বললেন রাহেলা।
----- যাক স্বস্তি পেলাম। আসলে আজকাল কি সব খবর শুনি। একা বাসে যেতে তাই ভয় করে। 

কিছুটা ঝিমুনিমত এসেছিলো গাড়ির দুলুনিতে হয়তো।হঠাৎ মেয়েটির ডাকে তন্দ্রা কেটে যায়, 
----- আন্টি, কি করা যায় বলেনতো? গাড়িতো আর যাবে না। যে কটা লোকজন ছিলো, সব নেমে পড়ছে এক এক করে।
আমার স্টপেজ এর পরেরটাই ছিলো।

রাহেলা এবার নোট বুকটা মেলে মোবাইলে নাম্বার টিপেন।
---- হ্যালো, গোধূলি থেকে বলছেন? জ্বি আমি রাহেলা বেগম। কদিন আগে আপনাদের সাথে কথা বলেছিলাম। আমি পথে একটু অসুবিধায় পড়েছি।  
জ্বি, কি বললেন? বন্ধ?  হঠাৎ নোটিশে? তাহলে...

রাহেলার মাথাটা দুলে ওঠে।ঝোঁকের মাথায় হুট করে বেরিয়ে আসাটা ঠিক হয় নি। তাঁদের মফঃস্বল শহরটায় থেকে,  নাকি ঘরের এক কোনের বাসিন্দা হয়ে থাকায় দেশের এই পরিস্হিতির কিছুই আঁচ করতে পারেননি তিনি।
কতদিন টিভির সামনেও বসা হয় না মনে করতে পারছেন না। কি করবেন এখন? ফিরে যাবেন?

মেয়েটির ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়লো রাহেলার।
------ আন্টি,  আমি নেমে যাচ্ছি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। ভ্যান খুঁজে দেখি বাকি পথটুকুর জন্য।

রাহেলার মাথা ততক্ষনে চিন্তায় এলোমেলো। বললেন, আমারওতো  সামনে এগিয়ে কোন লাভও নেই।  তোমার সাথে নেমে  বরং ফিরবার গাড়ির খোঁজ করি।

কিন্তু বিধি বাম। এমন নিরিবিলি জায়গাটায় দুটো সাইকেল মেকারের ঝুপড়ি দোকান ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেলো না।   সেখানকার একজন মাধবপুর  যাওয়ার একটা ভ্যানের সন্ধান দিলো বটে কিন্তু অন্য কোন যাত্রী না থাকায় বেশি ভাড়া দিয়ে রিজার্ভ করতে হবে।  এ অবস্হায় এখান থেকে রাহেলা বেগমের শহরতো দূরঅস্ত।  পরিস্হিতি যে কারো জন্যই মঙ্গল নয়, টের পেলো দুজনেই।

মেয়েটি রাহেলার মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলেই ফেললো,
----- আন্টি কিছু মনে না করলে আপনি বরং আমার সাথেই চলেন। আমারও একা কেমন ভয় লাগছে। রাতটা থেকে কাল সকালে মাধবপুর স্ট্যান্ড থেকে  বাড়িতেই ফিরে যান। অফিসের কাজ কর্ম তো এখন সব বন্ধের নোটিশ দিয়েছে। চালু হলে আসবেন।

রাহলা বেগম মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলেন,
------ বড্ড বিপদে পড়ে গেলাম মনে হচ্ছে, তোমাকেও  ফেল্লাম সমস্যায়। তোমার বাড়ির লোকেরা কি ভাববেন অপরিচিত আমাকে নিয়ে গেলে।
এই দুর্যোগেও একটু হাসলো মেয়েটি
----- ওসবের কোন ঝামেলা নেই আন্টি। আমি একা মানুষ। ছোট খাটো একটা চাকুরী করি। বাসে করে পাশের শহরে যাতায়াত করে অফিস করি প্রতিদিন।
চিলেকোঠার এক রুমের বাসায় ভাড়া থাকি। বাড়িওয়ালি খালাম্মা ভাড়াটা একটু বেশি নিলেও নিরাপত্তা আর স্নেহের ছায়াটা বড়ই নির্ভরতার। বছর পাঁচেক টানা আছি, নিজের বাড়িই মনে হয়।
আমাকে বিশ্বাস হলে নিশ্চিন্তে যেতে পারেন।

শুরুটা এভাবেই। লকডাউনে কাটতে লাগলো
একটা দুটো করে অনেকগুলো দিন। মাসও কেটে গেল। সম্পুর্ন  অপরিচিত দুজন অসম বয়সের মানুষ একই ছাদের নীচে আপনজনের মত। 
বিনিময় হতে থাকলো দুঃখগুলো। এই একটা জায়গায়  দুজনের বড্ড মিল। তাই দুঃখিনী মানুষ দুটোর একাকীত্ব যেন খোলস ভেঙ্গে সরব হলো দুজন দুজনকে পেয়ে।

পিতৃ-মাতৃহীন মিনু চাচাদের করুনায় বড় হয়ে তাঁদের নির্বাচিত পাত্রের সাথেই নিজ সংসারে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু লোভী মানুষটি প্রথম থেকেই শ্বশুরের সম্পত্তির খোঁজ খবরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিরোধ বাধায় মিনুর চাচার সাথে। চাচারও সাফ কথা, লেখাপড়া শিখিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন আর কি পাওনা থাকতে পারে? 
মিনুর বরও জানিয়ে দিলো,  ঘটক জানিয়েছিল মৃত বাবার মোটা অংকের উত্তরাধিকারী মিনু। চাচার দ্বিতল বাড়িটিতেও মিনুর ভাগ আছে।

যাচ্ছেতাই কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে মিনু উপলব্ধি  করে, পুরো বিষয়টাই লাভ লোকসান কেন্দ্রিক।  মায়া মমতা রক্তের টান কিংবা বৈবাহিক সুত্রের ভালোবাসার ছিটেফোটাও নেই দুপক্ষের কারোরই তার জন্য।

জগত সংসারটাকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। একার জীবনটাকে আর কারো সাথে স্বার্থের পঙ্কিলতায় জড়াতে ইচ্ছে হয় না। দুমাসের সংসার জীবনটার ইতি টেনে  ফিরে যায় না আর স্বার্থের স্বজনদের কাছেও। পরিচিতদের সহায়তায়  ঢাকা ছেড়ে ছোট্ট মফস্বল শহরটিতে জুটে যায় চাকুরীটা। মাথা গোঁজার ছোট্ট ঠাঁইও সেই সাথে।

রাহেলা শুনেন আর কষ্টে ভিজে যেতে যেতে বিস্মিত চোখ তুলে বলেন, আহা এটুকু বয়সেই একাকীত্বকে বেছে নিলে? একজন লোভীর কারনে নিজেকে গুটিয়ে নিলে আমারই মত?
জীবন অনেক বড়। শেষটা আরও বড়। এত বড় যে, এ বয়সে তুমি তা ভাবতেও পারবে না মিনু। 
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

মিনু অবাক হয়ে শোনে রাহেলা বেগমের পিছনের গল্প। বাবাকে নিয়ে পাঁচ ভাইবোনের জমজমাট সংসার। মা সেই ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন। তেমন করে মনে পড়ে না রাহেলার। সবার ছোট  সে। বড় দুবোনের যখন বিয়ে হয়, রাহেলা তখন স্কুল ফাইনালে। বড় দু ভাইও লেখাপড়ায় তেমন এগোতে না পেরে বাবার ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। বাবার ইচ্ছা ছোট মেয়েটা পড়ুক যতদূর চায়। কিন্তু কলেজ শেষ হতে না হতে বাবার হঠাৎ   চলে যাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেংগে পড়ে রাহেলার।

গ্রাজুয়েশনটা নিতে না নিতেই লেখাপড়ার দায় নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভাইয়েরা। বাবার অবর্তমানে ব্যবসাতেও মন্দা নামে। এমন সময় পত্রিকার খবরটা চোখে পড়ে। আবেদন, ইন্টারভিউ এবং চাকুরীতে জয়েন। পর পর এত দ্রুত ঘটতে থাকে যে রাহেলা নিজেও যেন ঘোরের মধ্যে চলতে থাকে। বড় শহরের কর্মজীবি হোষ্টেলে শুরু হয় চাকুরী জীবন। 

ছুটি ছাটায় বাড়ি আসে। কলহ দেখে দুই ভাই ভাবীদের। একসময় উঠোনে দেয়াল ওঠে। হাঁড়ি আলাদা হয়। রাহেলা ভাগের মানুষ হয়। দুপুরে বড় ভাইয়ের বাসায় খাওয়া দাওয়া হলে রাতে ছোট ভাইয়ের বাসায় ডাক পড়ে।
নিজেকে বাড়তি মনে হতে থাকে ক্রমশ। নিজের আশৈশশব বেড়ে ওঠা ঘর দোর সব যেন অচেনা ঠেকে,  টুকরো টুকরো হতে থাকে উঠোন, ঘর, কলতলা সব।
বিয়ের সমন্ধ আসে রাহেলার। ভাইয়েরা সাফ জানিয়ে দেয়, বোনকে যেহেতু টাকা পয়সা ঢেলে লেখাপড়া শিখিয়েছেন বাবা,  তাই  এক কানাকড়িও মেয়ের জন্য বরাদ্দ নেই বাবার সম্পত্তির।

পাত্র সরাসরি বললো,  মেয়েকেতো আর খালি হাতে বিদায় করা যায় না। কিছু একটা অংকতো অবশ্যই লাগে। 

বড়ভাই বললেন, চলমান অর্থটাই যৌতুক। রাজী নাহলে আসতে পারেন।
পাত্র বললো---- বেশতো,  এসেই যখন পড়েছি। কি আর করা।
রাহেলা বেগম বেঁকে বসলেন এবার। পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, 
---- বিয়ে যদি করতেই হয় তবে চাকুরী করবেন না। হয় সংসার, নয় চাকুরী।
পাত্র আর কোন কথা বলার প্রয়োজন মনে করে নি। চটজলদি নিরাপদ দূরত্বে গমন। 

বলাই বাহুল্য, কিছুদিনের মধ্যে  এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে বিয়ে নামক বিষয়টাকে আর আমলে না নিয়ে রাহেলা নিজের ভবিষ্যতের একটা ছক এঁকে ফেললেন নিজের মত করে।
সিদ্ধান্ত নিলেন জীবনটাকে স্বনির্ভর করার। শহরে বাসা ভাড়া নেন। বোনেরাও পরামর্শ দিলেন, বিয়ে মানেই অধীনতা। লেখাপড়া শিখে স্বনির্ভর হয়েছিস। দরকার কি অন্যের দয়ার? আমরা নিরুপায়,পেটে বিদ্যে নেই বলে।

সত্যিইতো, রাহেলাও পায়ের নীচের মাটিকে শক্ত করেন। বোনের ছেলেকে মেস থেকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। লেখাপড়া শেষ করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। ওর পছন্দের মানুষের সাথে বিয়েও দেন।  কটা দিন যেতে না যেতে ভাগনে বৌ আপন সংসার সাজিয়ে আলাদা হয়ে যায়। 
প্রথমটায় বড় একটা ধাক্কা খেলেও বাস্তবতাকে মেনেও নিলেন একসময় রাহেলা। 

এবার শুরু হলো ভাই ভাবীদের তোষামোদি। আজ বড় ভাইয়ের ছেলের চাকরীর ঘুষতো, কাল ছোট ভাইয়ের মেয়ের বিয়ের যৌতুক। কারো অসুস্হতাতো, কারো দুর্ঘটনায় পড়ার বেহাল অবস্হা থেকে উদ্ধার।। সামাল দেয়ার দায় শুধুই রাহেলার। 
ভাগনের দেয়া অবহেলার ক্ষতটা সামাল দিতে অন্যান্য ভাসতে ভাসতিদের দায়ভারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেতে থাকলেন দিনের পর দিন।

সহকর্মীরা অবাক বিস্ময়ে দেখে সংসারহীন মানুষটার কঠিন কঠোর বাস্তবতাকে। একটা দামী  শাড়ি কিংবা সখের কিছু ভোগ করেননি নিজের জন্য।  সবার প্রয়োজন মিটানোর পর যা সামান্য থাকতো তা দিয়েই চালিয়ে নিতেন নিজের জীবন ধারন কোন মতে।

অবশেষে, অবসর জীবন। শুভাকাঙ্ক্ষীরা পরামর্শ  দিলো, ভবিষ্যৎ  এর একটা খুঁটি দরকার। এক চিলতে ঠাঁই অন্তত গড়তে, শহরের বুকে   নিজের চলার জন্য গুছিয়ে নিতে।
সঞ্চিত অর্থগুলোর অপচয় ভেবে পাত্তাই দিলেন না রাহেলা ওসবে কান দিয়ে।

গাট্টি বোঁচকা নিয়ে হাজির হলেন বাবার ভিটেতে।  চেনা মুখগুলি এত অচেনা হয়ে গেল রাতারাতি। মনে করিয়ে দিলো যেমনটি হয়েছিলো তাঁর বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর।
বড় ভাবী ছোট ভাবীর কথা ছোঁড়াছুড়ির এক পর্যায়ে, কোনের ছোট ঘরটিতে ঠাঁই মিললো বটে। রাতে খাবার টেবিলে মাসকাবারি প্রতিদানটাও খাওয়া খরচ বাবদ নির্দিষ্ট হলো। 
অন্তরে চোটটা এবার টের পেলেন রাহেলা জোরেই। মাতৃসম দায় বহন করলেন যাদের আপদে বিপদে। আজ সন্তানসম দায়টায় তাদের এত আপত্তি কেন?
তবুও সয়ে নিয়েছিলেন রাহেলা।

কিন্তু যখন প্রকাশ্যেই সবাই তাঁর আগলে রাখা সঞ্চয়ে হাত বাড়ালো এবং সদুত্তর না পেয়ে মানসিক যন্ত্রনার কথা ছুঁড়তে থাকলো অহরহ,তখন নিজ ঘরে পরবাসীর মত রাহেলা বেগম ছটফট করতে লাগলেন এখান থেকে মুক্তির। সবচেয়ে কষ্টটা তখনই হতে থাকলো, যখন ওরা ওদের পারিবারিক কোন্দলগুলো ডিঙিয়ে একজোট হয়ে রাহেলাকে কোনঠাসা করলো। এক ঘরে করে রাখার মত প্রতিটা বিষয় থেকে দূরে রাখেলো।

শারিরীকভাবে অচল হবার আগেই এই মানসিক অচলতা কুরে কুরে খেতে থাকলো অনুক্ষন রাহেলাকে। ভয় জাগলো আগামীর। নিরুপায় হয়ে সময় থাকতে শেষ চেষ্টাটা করতে গিয়ে গোপনে দীর্ঘ দিনের শুভাকাঙ্খী সহকর্মীদের স্মরনাপন্ন হলেন মোবাইলে।

তাঁদের সহায়তায় কদিনেই কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানার খোঁজ খবর করে যোগাযোগ করলেন রাহেলা। অবশেষে ঢাকার অদূরে &quot; গোধুলি&quot;তেই মন স্হির করলেন নিজের ভবিতব্যের। এ যাত্রাতেও বাঁধা পেয়ে সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই রাহেলার।

মিনু নিজের আঁচলে রাহেলার চোখের পানির বাঁধ ঠেকিয়ে বলে, ভাগ্যিস সেদিনই বেরিয়ে পড়েছিলেন নইলে কি যে হতো। আর একটু দেরী হলেই.......

সদ্য কান্না ধোয়া বিষন্ন মুখটিতে বিস্ময় নিয়ে রাহেলা বললেন,
----- আর কি হতে বাকি থাকলো বলোতো? গোধূলিতেতো পৌঁছুতেই পারলাম না।
---- পারলেন না বলেইতো আমার ভাগ্যটা আজ প্রসন্ন হলো। এই দুঃসময়ে আমি মাথার উপর মায়ের ছায়া পেলাম। 
সেদিনের  এমন যোগসাজশটার কিন্তু বড্ড দরকার ছিল আন্টি।
----- যোগসাজশ? কিসের?
----- নয়তো কি। এই যে মা মেয়ের। 

একটু বুঝতে সময় লাগলো কথাটা রাহেলা বেগমের। খানিক আগের বিষন্ন মুখটায় যেন এক টুকরো আলোর ঝলকানি খেলে গেলো। 
দুহাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন কাছে দাঁড়ানো জল ছলছল চোখের মিনুকে।
রাহেলার কান্নায় জড়িয়ে যাওয়া অস্পষ্ট কথাগুলো স্পষ্ট উচ্চারনে মিনুর কানে আছড়ে পড়লো এতদিনের না পাওয়া সবগুলো ভালোবাসার সংমিশ্রনে,  &quot; তাহলে আমাকে আন্টি ডেকে আর একটা মুহূর্তও নষ্ট করিস না মিনু। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে হয়ে গেছে।

ঠিক তখুনি রাহেলার বুকের মাঝে মিনুর কান্নার দমকে ফুলে ওঠা কন্ঠে উচ্চারিত হলো&quot;মা&quot; ডাকটি  পৃথিবীর সবটুকু সুধা নিয়ে।

************
ফাহমিদা রিআ
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/114826/</link>
				<pubDate>Wed, 25 May 2022 05:19:43 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ম" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ম</a>োহনায়</p>
<p>প্লেট দুটো সেন্টার টেবিলটায় রাখতে রাখতে মিনুর নরম মোলায়েম কন্ঠের ডাকটা রাহেলা বেগমের অন্তর ছুঁয়ে দিলেও সাড়া দিলেন না ইচ্ছে করেই। আবার শোনবার অপেক্ষায় রইলেন।<br />
দুহাতে আনা পানির গ্লাসদুটো ঠক্ করে টেবিলে রেখে তাকালো মিনু অদূরে খাটে বসা রাহেলা বেগমের দিকে।<br />
&#8212;&#8211; আন্টি, জলদি জলদি। এই মহা ভোজ ঠান্ডা হলে কিন্ত&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-114826"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/114826/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">67e7b00bfcdb960f1c63981c1e395726</guid>
				<title># ছোট গল্প
 #পরিনয় পরিনতি......

ভোরের আলো আঁধারীর মাঝেই ঘুম থেকে জাগা অভ্যেস নাজমার। শীত বা গ্রীষ্ম যাই হোক না কেন নিয়মের হেরফের নেই একটুও। ঘর থেকে বেরিয়ে টানা বারান্দার ক&#039; ধাপ পেরুলেই সবুজ গাছ গাছালিতে ঘেরা উঠোনটাকে খুব ভালোবাসেন তিনি। 
প্রতিদিনের মত সেদিনও গাছগুলোয় পানি দিতে দিতে ঝরা বেলীগুলো কুড়িয়ে ছোট্ট পেয়ালায় সাজিয়ে সদর দরজার তালাটা খুলে ভেজিয়ে দিলেন পাল্লাটা।  কিছুক্ষনের মধ্যেই ঠিকা কাজের বুয়াটা এসে পড়বে। রান্নাঘরের জানালাটা খুলে চুলোটা অন করলেন। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের মগ হাতে বারান্দার সিঁড়িতে এসে বসলেন মুড়ি  মাখানো বাটিটা হাতে। এই  সময়টুকু নাজমা বেগমের একান্ত নিজের। সুখ দুঃখের ডালা খুলে বসেন। আপন মনে নাড়াচাড়া করেন। নিভৃতে চোখের পানি ফেলেন। তারপর সারাটা দিন কাটে  সংসারের ব্যস্ততায়, হাসি কান্নার ফুরসত কোথায় আর?
হাসতেতো ভুলে গেছেন সেই কবে। সময় পেলে কান্নাতেই ভাসেন সবার অগোচরে। অগোচরেই কাঁদতে হয়, এ কান্না যে লজ্জার। 

কদিন আগে যদিও স্বস্তির একটা বিষয় ঘটেছে। বুকের মাঝে বিঁধে থাকা কাঁটাটার ব্যাথার উপশম হয়েছে, উপড়াতে পারেননি। পারবেনও না। মাতৃস্নেহ কিংবা পিতৃস্নেহটাও একটা সাগর।জগতের সব কিছু ধুয়ে যেমন সাগরে গিয়ে মিশে যায়,  বাবা মায়ের হৃদয়টাও তেমনি দূর্বল জায়গা। সন্তানের দেয়া কষ্ট  দুঃখ লাজ অপমান সব কিছুই মিশিয়ে ফেলে, সন্তানের অসহায় পরাজিত কষ্ট দগ্ধ মুখটা একবার দেখলে সব কিছু ভুলে গিয়ে সাগর সমান বিশাল হৃদয়ে ঠাঁই দেন বার বার।

অথচ বছর  চার আগেও নাজমা বেগমের সাজানো গোছানো সংসার দেখে আশেপাশের প্রতিবেশীরা, স্বজনেরা খানিকটা ঈর্ষাই করতো। হিমু হাইস্কুলে বড় ক্লাশে ওঠাবার পর নাজমার ছুটোছুটিটা কমে গিয়েছিল অনেকটা।  প্রাইভেট টিউটর আর কোচিং এর দৌড়ঝাঁপটা হিমুর একার উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন ক্লাশ নাইনের পর থেকে।  দিনগুলিতে ছিল নানা বৈচিত্র।
নাজমার বাবার বাড়ি  কিছুটা দূরে, অন্য শহরে। মা নেই, ভাই বোনদের আপন আপন সংসার।

নাজমার সময়গুলো এ বাড়ির আনন্দে, এ বাড়ির আবর্তেই বেশ কেটে যেতো এতদিন স্বামী সংসার আর সন্তানদের নিয়ে। কোন অভিযোগ ছিল না চার দেয়ালের ওপারে মুক্ত স্বাধীন হয়ে ঘুরবার।
এই ঘরকুনো অভ্যেসটাই হয়তো তাকে বর্তমানের অনেক কিছুই জানতে দেয়নি কিংবা অজ্ঞ করে রেখেছিল।
চা খাওয়া শেষ করে মগটা একপাশে রেখে পানির পাইপটা ট্যাপের মুখে লাগিয়ে অপর প্রান্ত দিয়ে সিক্ত করতে থাকেন দেয়াল ঘেঁষে থাকা ফুল আর সব্জির ছোট্ট বাগানটা।
বছর চারেক আগে এ সময়টা কাটাতেন বাড়ির অনতিদূরের ঐ পার্কে হেঁটে বেড়িয়ে। প্রতিবেশি ভাবীরাতো বটেই দূর পাড়ার জনা কয়েক বান্ধবীও   জুটে গিয়েছিলো এই সুত্রে। জমজমাট আড্ডা বসতো ছুটির সকালগুলোতে। বাচ্চাদের স্কুল বা কোচিং এর সাপ্তাহিক ছুটি, কর্তার অফিস বন্ধ। বেলা করে ঘুমান পড়ে পড়ে। আর ছেলেও ক্লাশ টেনে ওঠার পর নিয়ম পাল্টেছে। দিনভর প্রাইভেট,  স্কুল, কোচিং এ ছুটোছুটি আর রাত হলে নাকে মুখে দুটো খেয়ে  মুখ গুজে পড়ার টেবিল। অনর্গল কথার খই ফোটা ছেলেটি যেন পড়ার চাপে পাল্টে যেতে থাকলো হঠাৎই।
নাজমা প্রথমটায় একটু আপত্তি  জানালেও ছেলের পড়ার অগ্রসর শুনে মানিয়ে নিয়েছিলেন। 
পার্কে হাঁটার সাথী ছিলেন নাজমার বাড়ির ঠিক বিপরীতের  বাড়িটির গৃহিনী। প্রতিবেশি এবং সম্পর্কে সমবয়সী এক  মামী।  ভারি উচ্ছল আর প্রাণবন্ত মামী মানুষটি নাজমার মনের মত একেবারে। এ বাড়ি ও বাড়ির খাবার মেনুর অবাধ যাতায়াত ছিলো দু বাড়ির মধ্যে। 
মামীর মেয়ে নুশাইবা ছিল হিমুর সহপাঠি।পড়তো ভাল স্কুলে। নাজমা খেয়াল রাখতো ওর পরীক্ষার প্রশ্ন বা গাইডগুলোর সহযোগীতায় হিমুকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে।
একসময় ওরা নিজেরাই লেখাপড়ার লেন দেন করতে শুরু করলো। ওদের খালা ভাগনের বন্ধুত্বের যৌথ সহযোগে  সামনের ফাইনাল পরীক্ষা চরম সফলতা আনবে এমনটাই আশা জাগিয়েছিল নাজমা এবং মামী দুজনেরই বিশ্বাসে।
পরীক্ষাটা একসময় শেষও হলো ভালয় ভালয়।  নাজমা নিশ্চিন্ত হয়ে যেই  গায়ে একটু হাওয়া লাগাবেন বলে আয়েশ করে শুয়ে দুপুরের ভাতঘুমটা দিয়েছেন, অমনি ডোর বেলে মুর্হুমুহু &quot;টি টং টিং টং&quot; আওয়াজে চোখ মেলে দেখেন চারপাশ আঁধারে ঘেরা। গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিলেন এতটা সময়। সুইচ অন করে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে মেইন গেটটা খুলে দেন।
----- কি ব্যাপার? অফিস থেকে ফিরে কারো সাড়া শব্দ না পেয়ে একটু ঘাবড়ে গেলাম বাড়ি এত সুমসাম দেখে। ভাবলাম মা ছেলে পরীক্ষা শেষে ঘুরতে বেরুলে নাকি বাড়ি লক দিয়ে।
----- ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হিমু দুপুরে খেয়ে সেই যে বেরুলো এখনও ফিরে নি, নাকি বেল টিপে আমার সাড়া না পেয়ে মামীর বাড়িতেই আড্ডা দিচ্ছে এখনও।
----- তাই হবে। খুব ধকল পোহালো পড়ালেখার। কটাদিন রিল্যাক্সে থাক।তারপর আবারতো শুরু হবে পড়াশুনার জোয়াল কাঁধে নিয়ে ছুটাছুটি।

সন্ধ্যার চায়ের টেবিলেও হিমু এলো না যখন, হিমুর বাবা টিভিটা অন করে বললেন,  ভাল্লাগছেনা  ফাঁকা ফাঁকা। নাজমা তুমি বরং মামীর বাসায় গিয়ে হিমুকে ডেকে আনো। অনেকদিন পর একসাথে খেলা দেখবো বাপ বেটা।

নাজমাও এমনটাই ভাবছিলেন। খোলা চুলগুলো হাত খোপায় জড়াতে জড়াতে সিঁড়িতে রাখা স্যান্ডেলে পা গলিয়ে দরজাটা ভিড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ওবাড়ির উদ্দেশ্যে। 

অকল্পনীয়  অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ফিরে এলেন তক্ষুনি কোনমতে নিজেকে ঠিক রেখে।  চেস্টার ড্রয়ারে চাবি খুঁজে পেলেন না। ঐতো আলমারিতেই ঝুলছে। সশব্দে পাল্লা খুলে ছোট ড্রয়ার হাতড়ে দেখেন খামটা নেই। 
ডালা খোলা ছোট্ট অর্নামেন্ট বক্সটারও।
ধপ্ করে বসে পড়েন বিছানায়। 
&quot; সর্বোনাশ হয়ে গেছে হিমুর বাবা।
হিমুর বাবার মাথায় বজ্রাঘাত ঘটিয়ে নাজমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
হিমু নেই। নেই নুশাইবাও। দুপুরেই পালিয়েছে ওরা।
---- মানে? তুমি কি বলছো, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বুঝেনি কেউই। সবে স্কুল পেরুনো অসম সম্পর্কের মায়ের আঁচলে মুখ লুকানো ছেলে মেয়ে দুটি কখন  এতটা বুদ্ধি জমিয়েছে, এতটা পরিপক্ক হয়েছে বুঝতে পারে নি যেমন হিমুর মা বাবা, বুঝতে পারে নি নুশাইবার মা বাবাও। নুশাইবা ওর মাকে চিঠি লিখে রেখে গেছে, 
মা, 
আমি আর হিমু চলে যাচ্ছি অনেকদূরে। কারন আমরা দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতে পারবো না। কিন্তু তোমরা কেউ আমাদের এমন উল্টা পাল্টা  সম্পর্কটা মেনে নিবে না জানি। মানা যায় না তাও জানি। আমাদের খুঁজো না। আমরা ভালোই থাকবো।
                নুশাইবা।
                              
চিঠিটা ছিল ওর পড়ার টেবিলেই ক্যালকুলেটরে চাপা দেয়া। ওদের যাওয়ার কতক্ষন পরে হবে তা অনুমান করা না গেলেও খুব বেশি সময় যে পার  হয়নি এটা নিশ্চিত। এক দন্ড সময় নষ্ট না করে নুশাইবার বাবা মন খারাপ করবার মত সময়টুকুও না নিয়ে ত্বরিত গতিতে চারিদিকে লোক লাগিয়ে দিয়েছেন ওদের ধরে আনতে। প্রতিটি ষ্টেশন টার্মিনালে পুলিশ চেকিং ও বাদ রাখেন নি। কিন্তু কি আশ্চর্য  ওদের কোন হদিস করতে পারলো না কেউ। যেন মিলিয়ে গেল বাতাসে জলজ্যান্ত ছেলেমেয়েদুটো। এক মাস দু&#039; মাস। বছরও পার হলো। পেরুলো একে একে চারটি বছর। 
নুশাইবার বাবা মার সাথে তারপর থেকে আর কখনই মুখোমুখি হয়নি নাজমা। হয়তো ওরা অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে বছরের পর বছর।কিন্তু নাজমা বা ওর স্বামী একটিবারের জন্যও খোঁজ করে নি হিমুর। যে নিজেই হারিয়ে যায় তাকে খুঁজলেই কি পাওয়া যায়? এমন অকৃতজ্ঞ  নরাধম ছেলের জন্য এ বাড়ির দরজা বন্ধ চিরতরে। লজ্জা লজ্জা। কতদিন মুখ তুলে হাঁটতে পারেননি হিমুর বাবা। কারও সাথে যোগাযোগও রাখেন নি সামাজিকতার। আর নাজমা গুটাতে গুটাতে লোকচক্ষুর আড়ালেই নিজেকে ঢেকে ফেললো। কিন্তু মন? অবাধ্য মন, ছুটে চলে দিক বিদিক। হিমুর ছোট্ট ঘরটায় বিছানায় গিয়ে বসেন। বেডকভারে হাতের পরশ বুলান। হ্যাঙ্গারে ঝোলানো শার্ট, জ্যাকেটের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকেন। পড়ার টেবিলে বসে থাকেন একটানা।অবচেতনে শুনতে পান হিমুর ডাক,মা কোথায় তুমি? আমাদের প্রাকটিকাল ক্লাশ শেষ মা। মা আজ কি মেনু দুপুরের।  মাগো দুশোটা টাকা দিতে পারবে, বন্ধুরা মিলে বাইরে খাবো আজ।
দু&#039; চোখ জ্বালা করে ওঠে নাজমার। মাথাটা ঝিম ধরে। তারপর আর কিছু মনে থাকে না।
হিমুর বাবা মনকে শক্ত করেন।  নিজেকে স্বান্তনা দেন। জীবনটাকেতো ঐ অকৃতজ্ঞ  অমানুষ ছেলেটার জন্য শেষ  করে ফেলা যাবে না। যতদিন  বাঁচার কোটা নির্ধারিত ততদিনতো টিকে থাকতে হবে।
নাজমার হাত নিজের মুঠিতে শক্ত করে ধরেন। চলতে শেখান নিজের মত করে। সময় দুহাতে ঠেলে পার করা নয়, সময়কে সময়ের সাথেই পেরুতে হয়।
সেই থেকে নাজমার শুন্য উঠোন ভরে ওঠেছে এক এক করে সবুজে সবুজে। 
সব গাছগুলোয় পানি দিয়ে যখন ফিরলেন পাইপটা খুলতে গিয়ে দেখেন উঠোনের দরজাটা হাট করে খোলা । নিশ্চয় বুয়া ঢুকে  দরজাটা লাগাতে ভুলে গেছে।
----- ওটা কি? এগিয়ে গেলেন জিনিসটাকে লক্ষ্য করে।  আবার দুপা পিছিয়ে এলেন আৎকে ওঠে।কাঁথায় কাপড়ে জড়ানো  শিশু যে। বয়স মাস তিনেকের হবে হয়তো। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চোখে তাকিয়ে আছে। কান্নার পুর্বাভাস কচি ঠোঁট দুটিতে।
কোলে তুলে নেন অবাক বিস্ময়ে। বুয়া এসে পড়ায়  নাজমা যেন অথৈ জলে খড় কুটা ধরার অবলম্বন পান।
হৈ হৈ করে বলে ওঠেন---- দেখেছো কান্ড আকাশ থেকে পড়ার মত বাচ্চাটা এখানে এলো, আমি টেরটিও পেলাম না।
বুয়া গভীর কৌতুহল নিয়ে নাজমার কাছে এসে। গলা নামিয়ে বলে,  ---- আকাশ থেকে নয় খালা।  ঘরের ছেলে ঘরে এসেছে। দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে, দেখেন।

নাজমা ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন এক মুহূর্ত।  ত্বরিত গতিতে দরজা পেরুতেই দেখলেন, দ্রুত গতিতে সামনে বাড়ির গেটে ঢুকে গেল অনেক চেনা মানুষটি।   &quot;নুশাইবা&quot; জোরে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো নাজমার কন্ঠস্বর।
সবটুকু শক্তি হারিয়ে কোনমতে বুয়ার কোলে বাচ্চাটাকে দিয়ে উঠানের সিঁড়িতে বসে পড়লেন নাজমা পিলারে মাথাটা এলিয়ে।
তার স্বরে কাঁদতে লাগলো বাচ্চাটা বুয়ার কোলে।

ততক্ষণে জেগেছে কদিন আগে ফিরে আসা হিমু। জেগেছেন ওর বাবাও। এগিয়ে এসে
নাজমার কপালে হাত রেখে বললেন, এভাবে বসে আছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ঘরে চলো শোবে।
সামনে দাঁড়ানো বুয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই সকালে বাচ্চা নিয়ে কেন, বাসায় রেখে এসো। নাস্তা বানাতে হবে। দেখছো না তোমার খালার শরীর ভাল নেই।
ঘরের জানালায় দাঁড়ানো হিমু একছুটে বুয়ার কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো।
---- বাবা, ও কোথাও যাবে না বাবা। ওর কোথাও যাবার জায়গা নেই যে।

এ যেন চোখের সামনে একটু একটু করে বেড়ে ওঠা বাবা মায়ের সেই হিমু নয়,অন্য কেউ। এক নাগাড়ে মেলে ধরলো বিগত চার বছরের দিনগুলি একের পর এক।
অপরিণত বয়স, অন্ধ মোহ আর অদূরদর্শী জ্ঞান নিয়ে অনেক চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে দূর শহরের ভীড়ে মিশে ছিল ওরা প্রথম কিছুদিন। কাজী অফিসে বিয়েটা বাধ সাধলো যখন বয়স কমের কারনে। তখন স্হানীয় হুজুরের মাধ্যমে বিয়ের কবুল পড়ে দুজনে। 
মায়ের গয়না চুরির টাকা আর খামে সঞ্চিত  টাকায় বস্তিতে শুরু হয় সংসার। দিনভর এটা ওটা  কাজের বিনিময়ে চলে দুটি জীবন যাপন। তিন বছরের মাথায় নতুন অতিথির আগমনি  সূচনায় দিশেহারা হয়ে পড়ে ওরা। কাজে যেতে অপারগ নুশাইবা। হিমুর একার অস্হায়ী আয় মেটাতে পারে না চাহিদা দৈনন্দিন  হিসাবের।  বস্তিবাসীদের সহায়তায় জন্ম নেয় ফুটফুটে সন্তান। কিন্তু দিন কাটে অনেক কষ্টে। অবর্ণনীয় অভাবে জর্জরিত  হতে থাকে তিনটি প্রাণী। নিজেদের কষ্টগুলো চোখের পানিতে সয়ে নিলেও বাচ্চার কষ্টে অস্হির হয়ে পড়ে ওদের সদ্য বাবা মা হওয়া অনভিজ্ঞ দুটি মন।  প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করে নিজেদের বাবা মাকে দেয়া অসহনীয় যন্ত্রণা।
বাবা মাকে দেয়া অপমান আর লজ্জার চপেটাঘাত করে অহরহ,  হৃদয় রক্তাত হয় পলে পলে। বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করে দুজনের প্রতি দুজনার সেই মোহ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুধু একটা জায়গায় ওদের ভালোবাসা স্হির। তা হলো সন্তানটির প্রতি সীমাহীন মায়া। 

অভাবের সাথে পরাজিত হয়ে পুরো চার ছর পর
নুশাইবা ওর মায়ের সাথে যোগাযোগ করে ফোনে। মা শর্ত দেন হিমুকে মানতে পারবেন না তারা কখনই। ওকে ত্যাগ করে ফিরতে পারলে দুয়ার খোলা সব সময়।
হিমুও যেন জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে এমনটিই চাইছিলো। নুশাইবাকে কিছু না বলে না কয়ে উধাও হয়ে যায় একদিন। পথে পথে ঘুরে। এ শহর ও শহর। ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ভাবে, নাহ আর ফিরবে না ঐ অনিশ্চিতের দিকে।
নুশাইবা ওর মাকে নিশ্চয় ফোন করবে, মায়ের কাছে ফিরে যাবে বাবুকে নিয়ে। অনেক যত্নে থাকবে সোনামনিটা। হিমু ওদের কাছে থাকলে ওদের কষ্ট কোনদিন ফুরাবে না। 
পরাজিত সৈনিক অবশেষে ফিরে আসে মা বাবার কোলেই। যে কোলকে লজ্জা অপমান আর যন্ত্রনায় দগ্ধ করে দু&#039; পায়ে দলিয়ে মাড়িয়ে চলে গিয়েছিল একদিন হিমু।

নাজমা ওঠে দাঁড়ান স্বামীর বাড়ানো হাতে ভর দিয়ে। বুয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও বুয়া, নুশাইবাকে আমরাও মানতে পারবো না। হয়তো আমাদের মন ভুলিয়ে বাবুকে নিতে আসবে।
হাসে বুয়া। পান খাওয়া লাল দাঁতগুলি বের করে খিস্তি করে বলে ওঠে,
------ আহারে খালা এখনও বুঝতে পারলেন না। আমি ওদের বাড়িতেও কাজে যাই। বাবুটাকে এতিম খানায় রেখে নুশাইবাকে আবার বিয়ে দিবে ওরা।নুশাইবা আমাকে বলেই  এই বুদ্ধি টা  করেছে। বাবুকে এতিমখানায় দিতে  চায় না, মায়ের মন। নুশাইবা কেঁদে কেঁদে এসবই আমাকে বলেছে। আর একটু আগে আমার সাথেই এসেছিলো বাবুকে চুপ করে রাখতে।

হিমুর কাছ থেকে ওর বাবা বাচ্চটাকে নিয়ে নাজমার কোলে তুলে দিয়ে বলেন, একবার যেমন সমস্ত লজ্জা অপমান অবজ্ঞা হজম করেছিলে প্রিয়জনকে হারিয়ে আজ আবারো সেই লজ্জা অপমান আর সমাজের ভ্রুকুটি সইবার জন্যে প্রস্তুত হও আর এক প্রিয়জনকে গ্রহন করে।
নাজমা অশ্রুসিক্ত চোখ না মুছেই জল টলমল দৃষ্টিতে এবার ভালোভাবে তাকান ছোট্ট পুতুল পুতুল বাচ্চাটার দিকে।  একুশ বছর আগের প্রথম সন্তান কোলে নেয়ার মতই সেই আনাড়ি হাত দুটোর কাঁপা কাঁপা অনুভুতি যেন। আর ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা চোখ দুটোতে সেই চেনা পরশ। ছোট্ট দুটি টানা চোখে এক্কেবারে ছোট্ট হিমুর চাহনি। 

************
ফাহমিদা রিআ 
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/114535/</link>
				<pubDate>Tue, 24 May 2022 12:02:59 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p># ছোট গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23পর" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#পর</a>িনয় পরিনতি&#8230;&#8230;</p>
<p>ভোরের আলো আঁধারীর মাঝেই ঘুম থেকে জাগা অভ্যেস নাজমার। শীত বা গ্রীষ্ম যাই হোক না কেন নিয়মের হেরফের নেই একটুও। ঘর থেকে বেরিয়ে টানা বারান্দার ক&#8217; ধাপ পেরুলেই সবুজ গাছ গাছালিতে ঘেরা উঠোনটাকে খুব ভালোবাসেন তিনি।<br />
প্রতিদিনের মত সেদিনও গাছগুলোয় পানি দিতে দিতে ঝরা বেলীগুলো কুড়িয়ে ছোট্ট পেয়ালায় সাজিয়ে সদর দরজার ত&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-114535"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/114535/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>9</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">e31299c0f3eba8e37d163a943ea96c8a</guid>
				<title>﻿

 #অপরাহ্নে
 #ফাহমিদা রিআ


ধূসর বিবর্ণ সাদাকালো ছবিটা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের করে দেখে আবারো পূর্ণতা। দুটি চোখের শান্ত দৃষ্টি, নির্বিকার ভাবলেশহীন চেহারা। দু’হাতে ক’গাছি চুড়ি আর গলায় মোটা চেইনে গাঁথা পান পাতার লকেট। পাশে হাস্যোজ্বল চেহারার এক যুবক। 
-আপা এসে গেছি। 
ড্রাইভারের ডাকে এবং ক্যাঁচকরে ব্রেক করার ঝাঁকুনিতে চিন্তাচ্ছেদ ঘটে পূর্ণতার। হঠাৎ করে ঝির ঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে খেয়ালই করেনি পূর্ণতা। ক্রমাগত ওয়াইপারে গাড়ির কাঁচের পানি মুছে চলেছে। জানালার গ্লাসটা তুলে সামনে তাকায় পূর্ণতা। ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়। গাছগাছালির ঘন সবুজে ছেয়ে থাকা চারপাশ। মস্ত গেটটা পেরুলে বিশাল কালো সাইন বোর্ড আঁটা। তাতে সাদা অক্ষরে লেখা “অপরাহ্নে”। 
বৃষ্টিটা একটু ধরে আসতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে পূর্ণতা। ইয়া মোটা ভুড়িওলা দারোয়ান অর্ধেকটা গেট জুড়ে মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। পূর্ণতাকে দেখে বিরস বদনে হাত তুলে সালাম ঠুকে রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ায়। পূর্ণতা কব্জি উল্টে সময়টা দেখে নেয়। ইশ্ অনেক খানি দেরি করে ফেলেছে। অফিস রুমে নামটা সিগনেচার করে এগিয়ে যায় দুই নাম্বার ওয়ার্ডের দিকে, মহিলা ওয়ার্ড। ধবধবে সাদা নিজ নিজ বিছানার ওপর কেউ শুয়ে কেউ বা বসে। পূর্ণতা রুমে ঢুকতেই সবার মুখগুলি কেমন মায়াবতি হয়ে উঠলো। সেই ছেলে বেলায় মাকে হারিয়েছে পূর্ণতা। মা বেঁচে থাকলে এমন বয়সই হতো। ডাক্তারি পাশ করার পর ওল্ড হোমের এই অফারটা সে লুফে নিয়েছে। অন্তত কয়েক ঘন্টাতো সে মায়েদের সাহচার্য পাবে। এর আগের দুটো ওল্ড হোম সে ঘুরে এসেছে বিশেষ কারনে মাস খানেক আগে তৃতীয় বিচরণ। তৃতীয় হলে কিহবে পূর্ণতার কাছে সব গুলোই এক ক্ষেত্র, একই অনুভুতি। পৃথিবী যেমন একটাই, মায়ের জাতও একটাই। আর তাই পৃথিবীতে এক মায়ের আঁচলের ছায়ায় পূর্ণতার যথেচ্ছা বিচরণ। কার কত রকমের সুখ দুঃখের ঘনঘটা পূর্ণতার সাথে শেয়ার সবারই। অনেক সময় এমন হয় যে, ডিউটির বাইরেও কত সময় পেরিয়ে যায় এই মায়েদের মাঝেই আটকা পড়ে, উপভোগ করে মাতৃ¯েœহের ওম।  
শওকত আরার কথাই ধরা যাক। কোনো ছেলে নেই উনার। তিন তিনটি কন্যা সন্তান। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া সুন্দর দ্বিতল বাড়ি আর নিজের ব্যাংকের চাকুরি এই দিয়েই তিন মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। এক সময় তিনি যখন অবসরে গেলেন মেয়েরা মাকে নিয়ে চিন্তায় বসলো। চাকুরিতো শেষ এখন আর একা একা এতো বড় বাড়ি আগল বসে থাকার কোনো মানে হয়না। তারচে বরং তিন বোনেরই আবাস যখন ঢাকায় তখন ওখানেই আড়াই তিন কাঠার প্লট কিনে ডেভলাপারকে দিলে তিন মেয়েই একাধিক এপার্টমেন্টের মালিকানা পাবে। মা থাকবেন সবার কাছেই পালা করে। শওকত আরা চাকুরিরত অবস্থায় একাকিত্বের যন্ত্রনা কি টের পাননি ঘরে বাইরের ব্যস্ততায়। অবসরে যাওয়ার পর থেকেই বুঝতে শুরু করলেন সবারই সময়ের অভাব, শুধু তারই অফুরন্ত সময়, কাটতেই চায়না। মেয়েদের জানালেন ঢাকায় প্লট খুঁজো। এবাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করছি। ব্যস্, তিন জামাই অফিস ব্যবসা স্থগিত রেখে সরাসরি হাজির শ্বশুর বাড়ি কদিন বাদেই। পার্টিও রেডি। কথা অনুযায়ী সুন্দর প্লটও রেজিষ্ট্রি হল যথা সময়ে। ডেভলাপাররা পাঁচ বছরের চুক্তিকে সাত বছর গড়িয়ে হস্তন্তরও করলো। কিন্তু ততদিনে শওকত আরা সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে আশা আকাংখা জলাঞ্জলি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন মেয়েদের সঙ্গে আর নয়। আজ এমেয়ের বাড়ি তো কাল ওমেয়ের। নিজ ইচ্ছে মত  তেলাওয়াত কিংবা টেলিফোনে পুরোনো কলিগদের সাথে আলাপনে মেতে উঠবেন তার কোনো উপায় নেই। ওদের বাচ্চার পড়ার টিচার, গানের টিচার অতিরিক্ত রুমটা দখল করে ফেলে। আর বাচ্চা ঘুমালে ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখা তো দুরে থাক হঁটা চলা এমন কি পানির গ্লাসটা টেবিলে রাখতে গেলেও হিসাব করে রাখতে হয়। জামাইরা শাশুড়ির এতদিনের চাকুরির পেনশানটা বিক্রি নাকি থাকবে এই নিয়ে তিন জনে তিন মত পোষন করে শাশুড়িকে স্বপক্ষের যুক্তি তুলে ধরে। অগত্যা নিজের স্বামীর ভিটার বিনিময়ে তৈরি করুনার আবাস স্থলে বাসিন্দা হবার আগেই নিজ সঞ্চেয়ের যেটুকু ছিল পুরোটা বন্টন এর খাতায় যাবার আগেই শওকত আরা “অপরাহ্নে”র বাসিন্দা হয়েছেন। কোনো মেয়ে বা জামাই একবারও এখানে উঁকি দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
পাশের বেডেই থাকেন জেবুন্নেছা। সাত সাতটি সন্তানের জননী তিনি। সন্তানেরা সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সরলতা মাখা মুখশ্রী স্বল্প শিক্ষিতা । অল্প বয়সে সংসারি। স্বামী ছিলেন সরকারি বড় কর্মকর্তা। প্যারালাইজড হয়ে  যাবার পর তিন বছর টানা শয্যাশায়ী। একে একে অঙ্গ প্রতঙ্গগুলি নিঃসাড় হয়ে যেতে লাগলো। বন্ধ হয়ে গেলো কথাও। সাত সস্তানকে বড় করার পরও নিজের অর্জিত অর্থ আর পৈত্রিক সম্পত্তির যোগফলে বিশাল বাড়ি জমি আর ব্যাংক ব্যালান্স ছিল মোটা অংকের। জেবুন্নেসা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে অনুধাবন করলেন ছেলেরা ্েকউই অর্থ সম্পত্তি ব্যয় করতে চাইলোনা চিকিৎসায়, ভাগে কম হয়ে যাওয়ার আশংকায়। উনি যতটুকু পারলেন স্থানীয় ডাক্তারের চিকিৎসা আর নিজের মনপ্রাণ ঢেলে দেয়া সেবায় আশার আলো দেখতেন, সুস্থ্য হয়ে উঠলে বাড়িটা আবার আগের মত হয়ে যাবে। না, বাড়িটা আর আগের মত হলোনা। ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে কখন কাগজে কলমে। তিনি ঘুনাক্ষরেও টের পাননি। স্বামী মারা যাবার পর জানা গেল ছেলেরা এক জোট হয়ে বন্টননামা তৈরি করে অসুস্থ বাবার টিপ সই নিয়ে কাগজপত্র কমপ্লিট করে রেখেছে সুচারু ভাবেই। ছেলেরা বাবার মৃত্যুর পর আপন আপন অংশ বিক্রি করে ফ্ল্যাট কিংবা প্লটের মালিক হয়েছে। মা নীরবে চোখ মুছেন আঁচলে। স্বজনেরা হায় হায় করেছে - নিজ হাতে সাজানো নিজ বাড়িটার কিছুই অবশিষ্ট নেই মায়ের জন্য ? 
ছেলেরা বিস্ময়ের সুর তুলে বলেছে - মা একা একা বাড়িতে থাকতে পারেন নাকি ? আমাদের সবার কাছেই থাকবেন পর্যায়ক্রমে। হ্যাঁ পর্যাক্রমে আসবাব তৈজসপত্র সবই হল ভাগাভাগি, কিছু হল পরিত্যাক্ত। মার হাতের সম্বল ছোট্ট সুটকেসখানি নিয়ে আজ এবাড়ি তো কাল ওবাড়ি। আজ ওর ছেলের পরীক্ষা তো কাল ওর বাসায় মেহমান। কিংবা ছেলে বৌ দুজনেরই অফিসের তাড়া, কাজের ছেলেটাও অনুপস্থিত। বাচ্চাকে স্কুলে আনা নেয়ার জন্য দরকার মাকে। অথবা প্রেগনেন্ট বৌমা শরীরটা খুব খারাপ। রান্নার বুয়ার বেতন বাড়ানোর অভিযোগে লাপাত্তা। ছেলে আর নাতির খুব অসুবিধা। কটা মাস ওখানেই মায়ের অবস্থান জরুরী। 
শেষতক আঘাতটা এসে পড়লো যতেœ রাখা তিনপদ গহনার ওপর। স্বামীর নিজ পছন্দের ডিজাইনে গড়ে দেয়া একজোড়া বালা আর পুরোনো কালের ‘সীতাহার’। নাড়াচাড়া করেন আবার কৌটোয় তুলে রাখেন। ছেলে বৌদের মধ্যে ঠা-া লড়াই  কিজানি কখন কে হাতিয়ে নেয়। সেজ ছেলের পালা আসতেই নিজেই চেয়ে বসে ডিজাইনগুলো দেখিয়ে অর্ডার দিবে বলে। এরপর একদিন সেজ ছেলের কাছে আসতেই ছেলে আহলাদী কন্ঠে বলে - বুঝলে মা তোমার নাতনি সীতাহারটা রেখে দিয়েছে দাদীর স্মৃতি রাখবে বলে। আর বালা জোড়া তোমার বৌমার হাতে। হাত খালি করে তোমাকে দেই কি করে। এক জোড়া বানিয়ে তারপর তোমারটা ঠিক দিয়ে দেব।  চোখ জ্বালা করে ওঠে জেবুন্নেসার। রক্তক্ষরণ হয় অন্তরে, আস্ত দাদীর বদলে দাদীর অলংকারের স্মৃতি, হায় ভালবাসা। অন্যান্য বৌ আর নাতনিদের মাঝে বিষয়টা ছড়াতে সময় লাগলোনা। ওরাই যদি এতো ভালবাসার তবে পালা করে থাকার কি দরকার। সেজ ছেলের বাড়ি স্থায়ী করে নিলেই তো হয়। অস্থায়ী ছুটাছুটি আর নয়। ভেবে চিন্তে স্বামীর পেনশানের টাকা কটি নিজ সুটকেসে সন্তর্পনে জমিয়ে রাখা সঞ্চয় যোগে এক আত্মীয়ের সহায়তায় এই আশ্রয় “অপরাহ্নে।”
আরো কত মন উতলা করা কাহিনীতে মিশে যায় পূর্ণতা। মিনতি দাস, রহিমা আখতার কিংবা সুফিয়া আমিন দের কথকতাও একই। শুধু মঞ্চটা ভিন্ন। পুরুষ ওয়ার্ডেও তাই। এক কালের দ-মু-ের কর্তা, বাড়ি কাঁপানো হুকুম দাতা মানুষগুলোর কি করুণ উপাখ্যান। পূর্ণতা আজ নুরুন্নাহারের কাছে বসেছে। তার সবটুকু জানা হয়নি। একেতো স্বল্পভাষী তার ওপর চোখের কঠিন অসুখে ভুগছেন। পূর্ণতা উনার মাথায় হাত রেখে চোখে টর্চের আলো ফেলে বলে - চোখটা দেখবো মা। ¯িœগ্ধ হাসি ফুটিয়ে পূর্ণতার হাতটা ধরে পাশে বসান। অপনজন কে আছে মা আপনার ? 
- কেউ নেই।
স্ট্রেইট জবাব নুরুন্নাহারের।
- আপনার চোখের কন্ডিশনটা একটু অন্য রকম। অপারেশন লাগবে। নিয়ম অনুযায়ী আপনজনকে জানাতে হবে। তাই বলছিলাম--
পাশের বেড থেকে জেবুন্নেসা বলে উঠলেন 
- ওভাবে বলছেন কেন নুরুন্নাহার আপা ? আমরা নেই ওদের কাছে কিন্তু আমাদের মাঝে তো ওরা আছে। থাকুক সুখে শান্তিতে।
নুরুন্নাহার মাথা দোলালেন। 
-আছে মা, আমার দুই ছেলে আছে। তুমি খবর পাবে কি করে ওদের। আমার স্বামী মারা যাবার সময় স্থাবর অস্থাবর সবকিছুই ছেলের নামে করে দিয়ে গেছেন মাকে দেখভাল করার শর্তে। 
- সেই দেখভালটাই বুঝি এই ‘অপরাহ্নে’ হচ্ছে।
- না রেখে কী করবে ? নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য স্বপরিবারে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে যে।
- এতো গেল এক জনের কথা। আর এক জন ?
- তাকে পাবো কোথায় ? আমিই তো তাকে হারিয়ে ফেলেছি।
এটুকু বলেই দুহাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে থাকেন নুরুন্নাহার। পরিবেশটা ভারি হয়ে ওঠে। অন্যান্য মায়েরাও আঁচলে চোখ মুছেন। পূর্ণতা ফিরে আসে অফিস রুমে। একটু পরেই লাঞ্চ আওয়ার। 
চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দেয় শোফাটায় পূর্ণতা। কোথায় যেন একটা যোগসূত্র উঁকি দিচ্ছে মনের কোনে। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছেনা। 
একমাসের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি একের পর এক সাজাতে থাকে। 
আরিফ টগবগে এক যুবক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে জয়েন করতে না করতেই বাবা মায়ের শখ একেবারে উপচে উঠলো। ঘরের লক্ষি চাইই চাই। আপত্তিরও কিছু নেই। নির্দিষ্ট ভাল লাগা বা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যও নেই। মোটামুটি সুন্দরি এক মেয়ে দেখে বাবা মায়ের পছন্দেই আরিফের বিয়ে ঠিক হল। তিন কবুলে বৌ ঘরেও নিয়ে এলো। বাবা মাতো মহা খুশি। খুশি আরিফও। কিন্তু বৌ আনত দৃষ্টিতে সারাক্ষণ বিষন্ন। 
আরিফ অফিসের জন্য তৈরি হয় মা পূর্বের মত জামাটা ঘড়িটা এগিয়ে দেন। টিফিন বক্স সাজিয়ে দেন। মেরুন সূতোয় বোনা কারুকাজময় কমলা রঙা শাড়ির আঁচল রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখা যায় কুটনা কুটায় কিংবা বাটনা বাটায় ব্যস্ত। মা ভাবেন ভারি লজ্জাবতি মেয়ে কদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে। দিন গড়ায় কিন্তু নতুন বৌ নতুনই থাকে। বৌয়ের লজ্জা ভাঙ্গেনা। আরিফ অফিস থেকে ফেরার পথে জানালার গ্রীলটায় প্রতিক্ষীত কোনো মুখ দেখতে পায়না। কাঙ্খিত চোখ জোড়ায় লাজ বিধুর কোনো হাসিও খেলা করেনা। নাহ - অত মন গড়া ভাবনা আরিফ আর ভাববেনা। বৌ যত খুশি চুপ করে থাকুক। আরিফও চুপ করে থাকবে। কিন্তু তা হলোনা। বৌ হঠাৎ শয্যা নিল। রান্না ঘরেও যায় না খায়ও না। শাশুড়ি মাথায় হাত রেখে বললেন বৌ আমার দিকে তাকাও। শরীর গুলায় ? বমি বমি লাগে ? বৌ নিঃশ্চুপ। আরিফ জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তারের সহাস্য জবাব - এই টেষ্টগুলো করে নিয়ে আসেন। টেষ্টের পর আবারো সহাস্য জবাব - অভিনন্দন, বাবা হচ্ছেন। আরিফতো খুশিতে আত্মহারা, পারেতো তখনই ছোটে দোলনা আর খেলনা কিনতে। কিন্তু বৌয়ের শুকনো মুখ আর নিরুৎসাহী মনোভাবে বাসায় ফিরতে বাধ্য হল। বংশধরের আগমন বলে কথা। বেয়াই বাড়িতে খবর পাঠান আরিফের বাবা। সে অঞ্চলের রীতি অনুযায়ী প্রথম সন্তান মাতুলালয়েই হয়। তাতেও বৌয়ের উচ্ছাসের কোনো চিহ্ন নেই। যেন হুকুমের বলি। যখন যেখানে যেমন। 
যথা সময়ে ঘর আলো করে ফুটফুটে ছেলে এলো। সাত দিনে দাদা জোড়া খাসি কেটে আকিকা দিলেন ‘আহনাফ আরিফ’ নামকরন করলেন। আরিফ তার ঘরটা শুধু যেন আহনাফের বাস যোগ্য করে সাজালো। দোলনা পান্ডা পুতুল ভেপু বাঁশি কিছুই বাদ গেলনা। রঙিন সুতায় ফুল পাখি নক্সা তোলা দাদীর হাতের তৈরি কাঁথা আর ছোট ছোট ফতুয়া জামায় ভরে গেল কাপড়ের আলমারি। এবার পিতৃগৃহে আহনাফের ফেরার সময় হল। আরিফ আনতে গেল এবং ফিরে এলো শুধু মাত্র শিশু আহনাফকে নিয়ে। আরিফের মা আঁতকে উঠলেন বৌ কোথায় ! আরিফ শুধু বললো - নেই। আরিফ কাউকে কিছুই না বললেও ঘটনাটা জানাজানি হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। বৌ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না গেলেও, সন্তান স্বামী এবং বাবা মায়ের মান সম্মানকে ধূলায় লুটিয়ে দিয়ে পূর্ব প্রেমিকের হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়েছে। এক সময় প্রেমিক পুরুষটির প্রস্তাবকে তাচ্ছিল্যভরে তার বাবা মা প্রত্যাখান করে।  মেয়ের প্রচ- অমত সত্ত্বেও আরিফের সাথে বিয়ে দিয়ে ভেবেছিলেন কিছুদিন শ্বশুর বাড়িতে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। নিজেরাও মেয়ের কাছ থেকে দুরে দুরে থেকেছেন প্রথম প্রথম। বেশ কমাস পর মেয়ের সন্তান আগমনের খবরে মেয়ের ওপর ¯েœহের টানটা অনুভব করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এই মাতৃকালিন সময়টাকে কাজে লাগিয়েছে মেয়ে সবার বিশ্বাসের দুর্বলতা নিয়ে। 
কিছুদিন পর স্বাভাবিক ভাবেই আরিফের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। আরিফ অটল অনড় কন্ঠে বলেছে - আমাকে এমন কথা আর কখনোই বলবেনা। 
আহনাফের মা নেই। আমিও যদি পর হয়ে যাই ওর কী হবে ? তারপর একে একে আরিফের বাবা মাও মারা যায়। আরিফ বাবা মা উভয়েরই ভুমিকায় সুনিপুন যতেœ আদরে শাসনে হাঁটি হাঁটি পা পা ছেড়ে নিজ পায়ে আহনাফকে দাঁড় করিয়ে দেয়, স্কুল কলেজ এবং মেডিকেলের গ-ি পাড়ি দিয়ে। ঢাকার অদুরে এক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জয়েন করে আহনাফ। আরিফের চাকরি প্রায় শেষের দিকে। জীবনের এতোটা সময় একা একা ক্লান্তিহীন ছুটাছুটি করে আজকাল কেমন যেন একটুতেই অবসন্নতা ঘিরে ধরে। 
আহনাফের পছন্দের ক্লাশ ফ্রে- পূর্ণতাকে বৌ এর মর্যাদা দিয়ে ঘরে তোলেন। অল্প কিছুদিনেই পূর্ণতা অরিফের সার্বক্ষণিক কেয়ারটেকার হয়ে ওঠে। আরিফের শরীরটা কিছুদিন থেকে ভাল যাচ্ছিলনা। পূর্ণতাকে একা পাশে বসিয়ে বললেন 
- আমি একটা দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে চাই। তুমি কী আমাকে সাহায্য করবে বৌমা ?
- কী সাহায্য বাবা ? 
- একটা মেসেজ তোমার কাছে রাখছি। তুমি যেভাবে পারো আহনাফকে বলবে।
- বলুন বাবা।
- আহনাফের মা মারা যায়নি, আজও বেঁচে আছে।
- তড়িতাহত হয় পূর্ণতা, বেঁচে আছে ! কোথায় আছে ?
- শুনেছি তার স্বামী মারা যাবার আগে তাকে সব কিছু থেকে বঞ্চিত করে কপর্দক শুন্য অবস্থায় নিজ সন্তানকে সবটুকু দিয়ে গেছে। সন্তানও মাকে তার আশ্রয়ে না রেখে কোনো এক বৃদ্ধশ্রমে রেখে গেছে।
ঠিক এসময়ে আহনাফের আগমনে আরিফ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলেন
- তোমরা দুজনকেই বলি, আমি কাল দেশের বাড়ি যাবো ভাবছি। 
আহনাফ এবং পূর্ণতা দুজনেই বাবার শরীরের এ অবস্থায় রাজি হয়না। আর কি অশ্চর্য ব্যপার এর কদিন পরেই আরিফ হঠাৎ করে স্ট্রোক করলেন, আর উঠলেন না।
পূর্ণতা আহনাফকে খবরটা এ অস্বভাবিকতার মধ্যে কিভাবে বলবে ভাবতে থাকে আর বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে বিভিন্ন বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় খুঁজতে থাকে তার শাশুড়িকে। কিন্তু নামহীন ব্যক্তিকে খুঁজবে কিভাবে। কমাসের অদমনীয় প্রচেষ্টায় এক স্থান থেকে আর এক স্থানে এভাবেই চষে বেড়ায় পূর্ণতা। বিশেষ প্রয়োজনে শ্বশুরের ফাইল খুঁজতে গিয়ে অনেক পুরোনো একটা ফাইলে বিবর্ন একটি ছবি আবিষ্কার করে কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনা। শশ্রুম-িত যে শ্বশুরকে সে দেখেছে তার দৃষ্টির সঙ্গে ছবির যুবকের দৃষ্টির কিছু মিল খুঁজে পায়। তবে কী - - ভেবে, ছবিটি রেখে দেয় হাত ব্যাগে। 
ঝিমুনি কাটিয়ে সোজা হয়ে বসে পূর্ণতা। ছবির মহিলাটিকে পর্যবেক্ষণ করে এবার। এক মুহুর্ত। এক ছুটে নুরুন্নাহারের কাছে। দুবাহু তুলে নুরুন্নাহারকে সোজা করে বসিয়ে ছবিটা মেলে ধরে। 
- মা এদের চিনতে পারেন ?
নুরুন্নাহারের কোটোরাগত বসে যাওয়া চোখদুটি উজ্জ্বল হয়
- এ ছবি তুমি কোথায় পেলে ?
পূর্ণতা কোনো জবাব না দিয়ে ছবির মেয়েটির ভাসা ভাসা দৃষ্টির সাথে নুরুন্নাহারের দৃষ্টির সাথে কোনো মিল খুঁজে পায়না। কিন্তু কপালের বাঁ পাশের কালো তিলটা আর ডান ভ্রুতে কাটা দাগটি হুবুহু এক। আর বলে দিতে হয়না কিছু। নুরুন্নাহারের শীর্ণ হাত পূর্ণতাকে চেপে ধরে
- আরিফের ছবি তুমি কোথায় পেলে ?
- উনার কাছেই।
- তবে তুমি কে মা ?
জবাবটা না দিয়েই বেরিয়ে যায়, আর দেরি করেনা পূর্ণতা। আহনাফকে জানাতে হবে যে এখনি, মা বেঁচে আছেন।

**********
ফাহমিদা রিআ        
************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/113911/</link>
				<pubDate>Sun, 22 May 2022 07:13:00 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>﻿</p>
<p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23অপর" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#অপর</a>াহ্নে<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ফ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ফ</a>াহমিদা রিআ</p>
<p>ধূসর বিবর্ণ সাদাকালো ছবিটা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের করে দেখে আবারো পূর্ণতা। দুটি চোখের শান্ত দৃষ্টি, নির্বিকার ভাবলেশহীন চেহারা। দু’হাতে ক’গাছি চুড়ি আর গলায় মোটা চেইনে গাঁথা পান পাতার লকেট। পাশে হাস্যোজ্বল চেহারার এক যুবক।<br />
-আপা এসে গেছি।<br />
ড্রাইভারের ডাকে এবং ক্যাঁচকরে ব্রেক করার ঝাঁকুনিতে চিন্তাচ্ছেদ ঘটে পূর&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-113911"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/113911/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">553cf18c9f95e3ae16671debfef7a784</guid>
				<title>﻿ #ছোট গল্প
 #একা

রখসানা কাঁদছে। আমি অবাক বিস্ময়ে ওর ফুলে ফুলে ওঠা কান্না দেখছি। কোমরে গোঁজা চাবির গোছাটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলি - বাবা তো মেয়ে কে দেখতে আসবেই । আগে বাসায় ঢুকতে দে, কথা বলি। 
- না খালাম্মা খুলবেন না। আমার বেতনের টেকা নিতি আসতিছে, আমার মায়ের জন্যি রাখা শাড়ি নিয়ে যাবে, আমারেও নিবে। কলিং বেলটা বেজেই চলেছে। চাবি হাতে নিজেই নেমে আসি।

কলাপসিবলের ওপারে দাঁড়ানো এক লোক। ষাটের কাছাকাছি বয়স। মাথায় স্বল্প ক’গাছি চুলে মেহেদির রঙের লাল আভা। ফতুয়া টাইপের শার্ট আর আধ ময়লা চেক লুংগি পরনে। পান খাওয়া দাঁতগুলোতে হাসি ছড়িয়ে বলে - বুবু আমি রুখসানার বাপ, মেয়েরে দেখতি আসছিলাম। তালা খুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ডাকি রুখসানাকে।
- তোর বাবাকে ঘরটা খুলে বসতে দে। 

রুখসানা নিঃশব্দে আমার পাশে এসে দাঁড়ায় বাবাকে বসতে দিয়ে। ওর বাবা গার্ডেন চেয়ারে বসে অনবরত পা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে এবার সরাসরি চাইল আমার পানে। 

- অনেক অভাব বুবু। আজ আট দিন হতিছে বড় মেয়েডার বিয়া দিছি। বিশ’হাজার টেকা ডিমান্ড। দশ’হাজার শোধ কইরে বিয়া পইড়েছে। বাকি তিন হাজার জামাইরে তুলি দিতি পারলি মেয়েডারে শ্বশুর বাড়ি নে যাবে। দুই/চার কানি জমি জিরাত যা ছিল হগলডি বেইচে ফেলতি হয়েছে। এখন আপনারা যা দিবেন। রুখসানার ক’মাসের বেতনডাও তুলতি চাইছিলাম।

রুখসানা ফুপিয়ে ওঠে আবারো - না দিব না। কিছু দিব না। আমি কষ্ট কইরে কইরে জমায়ে রাখছি মায়ের জন্যি। মায়ের অনেক কষ্ট। 

মিনমিনে কন্ঠেই গর্জে ওঠে লোকটি - কি কইলি মায়েরে দিবি ? তোরে কাজে পাঠায়ে ছিলাম তো আমি। কে তোর মা ? 
- মার কাছ থেকে কেইড়ে এনেছেন আপনি আমারে। ঠোঁট ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে রুখসানা। 
- কি ! এত বড় কথা ? বেইশ তবে চল আমার সাথে মায়ের কাছে ফেইলে রেইখে আসবো, মার খেইয়ে খেইয়ে পাঁজরের হাড় বারাবে সেইটেই তোর ভাল। 
- না আমি যাবো না। খালাম্মা একা থাকতি পারে না।

- আমার মেয়েরে আমি নিয়ে যাতি এসেছি। কঠিন মুখ করে বলে লোকটি আমাকেই। কোন বাধা মানতি চাইনা। 
রাগ হল আমারও।
- নিতে এসে থাকলে নিয়ে যাবেন। ওভাবে কথা বলছেন কেন ?

একটু মিইয়ে গেল লোকটি। আমতা আমতা ভঙ্গিতে বলতে থাকলো - আমি ঠিক তা কতিছি না। কি আর কবো বুবু ওর মা বড়ই উচ্ছৃংখল ম্যায়া মানুষ। ঘরে রাখলি বংশে চুন কালি দেয় এমন। তালাক দিয়েছি কি সাধে ? শুনতি চান সে কাহিনী ? 
- না। আপনি কেন এসেছেন তাই বলেন ? কঠিন মুখ করেই শুধাই।
- রুখসানারে নিতি এসেছি। ওর দেনা পাওনা মিটায়ে দেন, চইলে যাই। 
- না খালাম্মা, আমি যাবো না। 

আমার হাত চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রুখসানা। এতটা সময় ও আমার কাছে আছে, এমন করে কখনও কাছে আসবার সাহস তো দেখিনি এর আগে। 
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বলি - ভয় নেই, আপনার মেয়ে আপনার কাছেই যাবে। অন্যের মেয়েকে আমি আটকাবই বা কেন ?
- খালাম্মা আপনার মেয়েটা যে নেই, আপনি তো একা থাকতি পারেন না খালাম্মা। আমারে যেতি দিয়েন না, আমি যাব না। কান্নার দমকে অজস্র কথা বলে চলে রুখসানা। 

আর কথা বাড়াতে মন চাইলো না। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চেয়ারটা টেনে বসলাম। ওরা বাবা মেয়ে যা সিদ্ধান্ত নেবার নিক। রুখসানার স্থায়িত্ব যে চির দিনের নয়, তাতো সব সময়ই জানি, তবু বুকের মধ্যে এমন চিন চিনে কষ্টটা জাগছে কেন।

দশ/এগারো বছরের এই একরত্তি মেয়েটা আজ হঠাৎ করেই যেন কেমন বড় হয়ে উঠেছে। আমার দুর্বল জায়গায় নাড়া দিয়ে সে থাকবার প্রাণপন চেষ্টা করছে। কিন্তু অবুঝ মেয়েকে কি করে বোঝাই, পেটে ভাতে কাজ করতে আসা তোকে কোন ঐশ্বর্যের বলে আটকাবো বলতো ? অবিচ্ছেদ্য রক্তের দাবির কাছে কিছু টেকে নাযে । 

সেই যে আমার মেয়েটা আমার সারা মনে হাহাকার তুলে চলে যাবার পর মেয়ের বাবাও কদিন থেকে আপন কর্মস্থল প্রবাসে পাড়ি জমালেন প্রতি বারের  মত। যজ্ঞের ধনের মত আগলে মস্ত ফাঁকা বাড়িটায় পড়ে রইলাম আমি। আত্মীয় স্বজনরা প্রথম প্রথম এলো-গেলো, সংগো দিল যথাসাধ্য তারপর এক সময় আপন আপন ব্যস্ততায় ব্যস্ত হল সবাই।

সন্তানরা ফিরলো বাবা মায়ের কাছে। বাবা মায়েরা সন্তানের কাছে। আমি হিসেবের অতিরিক্ত ’মা’ হয়েই রইলাম শুধু কোল শুন্য হয়ে। 

ঠিক এমনি সময় আগমন রুখসানার। আমার ঠিকা বুয়াটি একদিন সঙ্গে করে নিয়ে এসে যা জানালো তার সারমর্ম হল - মেয়েটা গ্রাম সম্পর্কে তার নাতনী। বাড়িতে সৎমায়ের যন্ত্রনায় বাবা কাজে পাঠিয়েছে এক বাসায়। সেখান থেকে মারধরের ভয়ে চলে এসেছে ক’দিন হল। আমি মেয়েটিকে রাখতে পারি চাইলে। 

অগতির গতি বলে কথা। বেহাল অবস্থা তখন আমারও, ওরও। আর তাই টিকে গেল মেয়েটি সবাইকে তাক করে দিয়ে। নইলে এর আগে দু’দিনের জন্য এক পিচ্চি কাজের জন্য এসে এই বিরান বাড়িটায় থাকতে পারবেনা বলে চলে গেছে। 

প্রথম দিনেই রুখসানা এসে গুছিয়ে নিলো ওর জায়গাটাকে। আমার ঘরের লাগোয়া এক চিলতে বারান্দার কোনে ফেলে রাখা ছোট চৌকির ওপর জামা কাপড়ের ছোট পুটলি খুলে ওর ক্ষুদ্র সংসারটাকে সাজিয়ে নিলো। পড়ে থাকা আইসক্রিমের বাক্সে সাজ সজ্জার বহরও ছিলো। ভাঙ্গা আয়না, অর্ধেক চিরুনির টুকরো, লিপিষ্টিকের অংশ, রংচটা ইমিটেশনের চুড়ি, দুল আরো অপ্রয়োজনীয় কত কি। দেখে শুনে মনে হলো - 

ক’দিনে নিজের মনটাকে নিজেই বসাতে সচেস্ট।
তারপর এক এক করে দিন গড়ায়। একটু একটু করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ি আমি ওর ওপর। ঘরে বাইরে সর্বত্র সঙ্গী হয়ে যায় রুখসানা। ধীরে ধীরে ঠিকে বুয়ার অনুপস্থিতিতে ও দুটো একটা দিনের জন্য বেশ চালিয়ে নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভুলতেই বসেছিলাম ওর দাবিদার সত্যিকারের মানুষ গুলোর কথা। তারপরই এই বিপত্তি। আর বিপত্তিই বা বলছি কেন ? সন্তানের কাছে বাবা তো আসবেই।

কিন্তু বিপত্তিটা ঘটিয়েছে রুখসানা নিজেই। বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ির সংসার। উভয়ের আলাদা আলাদা জীবনে রখসানা দেখে মায়ের ঘরে, বাবার ঘরে তার জন্য বরাদ্দ ভালবাসা নেই। আছে বাড়তি হবার যন্ত্রনা। অত্যধিক অবহেলা অত্যাচারে এই বয়সেই আপন পর চিনেছে। দ’ুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করেছে সে নিজের কর্মের বিনিময়ে। কারো দয়া বা করুণা নিতে সে নারাজ। অপ্রয়োজনীয় হয়েও নয়। এই বোধ ওর এসেছে কি-না জানি না তবে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বার বার সে উচ্চারণ করছে ওর বাবার সামনে -  দেশে গিয়ে আমি কি করবো ? আমি চলে গেলে খালাম্মার কাছে থাকবার কেউ নেই যে।

স্বল্পকালীন এই সংসারটায় বাঁধা পড়েনি কেউ আমার মায়ারডোরে। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে রুখসানা এসে দাঁড়ায় এ সময়। বলি - কিরে বাপ-মেয়ের বোঝাপড়া হলো ? হাতের নখ খুটে মাথা নিচু করে মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে বলে - টেকা চায়। টেকা পেলেই চলি যাবি, আর আসবেনা বলতিছে। 
- আর তুই ?
- আমারেও নিবে না ।
- নাকি যাবি না ? হেসে তাকাই ওর পানে।
আবার মাথা নিচু করে চুপ মেরে যায়। কিছুক্ষণ আগের কান্নার দমক থামেনি তখনও। থেকে থেকে ফুলে ফুলে উঠছে ছোট্ট শরীরটা।
- আয় আমার সঙ্গে। ড্রয়ার খুলে ক’টি টাকা ধরিয়ে দেই রুখসানার হাতে। 
- তোর বেতনের টাকা তোরই থাকলো। এটা তোর বোনের বিয়ের জন্য সাহায্য করলাম। 
- আমার বোন না তো আপন। প্রতিবাদী সুর করে কচি গলায়। 

হাসতে হাসতে বলি - বেশ তো তোর সৎবোনের জন্য সাহায্য করলাম। 
আর কিছু না বলে টাকা ক’টি হাতে এগিয়ে গেল বাবার কাছে। খানিক পরে ফিরে আসে আবার দু’চোখ ভরা পানি নিয়ে। একটু বিরক্ত হয়েই শুধাই - কি হলো আবার ?
- খলাম্মা, আপনি বাবারে চলি যেতে বলেন আমি আমার মায়ের জন্যি রাখা শাড়ী দিব নানে। 
- একি জ্বালাতনে ফেললিরে তুই। 
এগিয়ে ঘরে ঢুকি। রুখসানার বাবা তেমনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে।
বল্লাম - ওর যখন এতই ইচ্ছে শাড়ীটা মাকে দেবার। আপনি বাধ সাধছেন কেন অযথা ? এবার আসেন।

উঠে দাঁড়ালো লোকটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও। এদিক ওদিক তাকিয়ে মেয়েকে খুঁজলো কি না জানি না। গলা নামিয়ে বললো - বড্ড উচ্ছৃংখল। একটা কথা আপনাকে দিতি হবি আমারে। ওর মা এলি যেন মেয়েরে দিবেন না। মেয়ে আমার উচ্ছন্নে যাবে। ও ছাওয়াল মানুষ, বুঝে না। আপনার দায়িত্বেই রেইখে গেলাম। 

আমার যে কি হয়ে গেল। প্রচন্ড জেদ আলোড়ন তুললো হৃদয়ে। মা সেতো মা-ই। দশ মাস গর্ভে বয়ে বেড়ানোর সুখ দুঃখের মিশ্র অনুভুতি সে তো আর কেউ জানে না। এরপরে যদি সে মা সন্তানের দায়িত্ব পালনে অপারগও হয়। তবুও মায়ের অপরিসীম ঋণ শোধ করতে পারে না সেই সন্তান। সন্তান হারা মা আমি। শোক-তাপ বয়ে বেড়ানোর ভার একা আমারই শুধু। এ সত্যতা অনুভব করছি আমি তিলে তিলে। নিচে গেট বন্ধের শব্দ মিলাতে না মিলাতেই রুখসানা ছুটে এলো।

- আমার বাবা চলি গেছে ? ওর কান্না ধোয়া ছোট মুখটায় বিপদ কেটে যাবার অবোধ প্রসন্নতা দেখে দীর্ঘশ্বাস চেপে বলি, কিরে, আজ চা খাওয়াবি না ? চোখ-মুখ ধুয়ে চট পট চা করে নিয়ে আয় । আমি ব্যালকনিতে বসছি। 

অর্ধসমাপ্ত বঙ্কিম রচনাবলিতে চোখ বুলাই বসে বসে। কঠিন শব্দের লাইন দুটো পর পর দু’বার আউড়িয়েও কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে না পেরে দৃষ্টি ছুড়ে দেই সামনের গ্রীল গলিয়ে এক টুকরো আকাশটাতে। উদাস হয়ে যায় মনটা হঠাৎ। দৃষ্টির সীমানায় ঐ আকাশের কোল ঘেঁসে ভেসে বেড়াতে দেখি সোনা মেয়েকে আমার। পেঁজা পেঁজা সাদা তুলোর মত নায়ে ভেসে ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা আমার দূর থেকে দূরে- বহু দুরে সরে যাচ্ছে ত্রমশ। মোচড় দিয়ে ওঠে বুকটা।

- খালাম্মা চা। রুখসানার ডাকে বর্তমানে ফিরি। ধুমায়িত চায়ের কাপে ছোট্ট ট্রেটা সামনের ত্রিপায়ায় রেখে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে রুখসানা। মুখে খই ফোটায় শত কথার।
কতক কানে যায় কতক যায় না।
ওর কিছুক্ষণ আগে কান্নাকাটি করা ফোলা ফোলা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে মনটা কেমন করে ওঠে। কটা মাসইবা হলো ওর আসার। অথচ আমার মেয়ে হারানো মত ফাঁকা জায়গাটার এক কোনে জুবুথুবু হয়ে ও ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে নিজেরই চেষ্টায়। 
ঠিকে বুয়ার পিছনে পিছনে বাকুমবাকুম করে সব কাজ কেমন গুছিয়ে নিয়ে টেবিলে খাবার রেখে প্রতিটি বেলা আদেশের সুরে বলে - খালাম্মা ভাল করে খাবেন, নানী বলে দিয়েছে। শোবার আগে দুধ গরম করে গ্লাসে ঢেলে দিতে দিতে বলে প্রতিদিনই - এখনই খান তো খালাম্মা ঠান্ডা হয়া যাবি। 
নির্ঘুম চোখে বিছানায় শুয়ে শুয়ে খাতা কলমে আঁকিবুকিতে আমার মেয়ের অজস্র কথা লিখতে লিখতে মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে যায়। অঝোর ধারায় টলোমলো হয়ে ওঠে মনটা। অবুঝ আর অশান্ত হৃদয়ে ক্লান্ত শান্ত হয়ে দু’চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে এক সময়। ভোরের আলোয় ঘুম ভেঙ্গে যখন দেখি চারপাশ সযতনে মশারী গোজা। হাল্কা কাঁথাখানি গায়ে জড়ানো এলো চুলগুলি বেনিতে জড়ানো। এমনি কত রাত যে ভোর হয়। আর এমন রাতগুলোতে আমাকে না জাগিয়ে সনিপুন গৃহিনীর মত দায়িত্ব সেরে পেছনের তক্তপোসের ওপর থেকে ছোট্ট বিছানা তুলে আমার খাটের পাশে কার্পেটের ওপর বিছিয়ে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে রুখসানা। শুধু কি শুশ্রুষা ? ওর পিছনে এটা বোঝতে ওটা উপদেশ দিতে দিতে ভাঙ্গা রেকর্ডের মত চলে আমার নিত্য দিনের বকবকানি। ওর বয়সসুলভ চপলতায় সুযোগ পেলেই ছাদের রেলিংয়ে ঝুকে পড়ে কাপড় তোলার অজুহাতে, আচারের বৈয়াম রোদে দিতে গিয়ে পর্চের কিনারা বেয়ে হাটবার, অতি আগ্রহে সময়ে অসময়ে চেচিয়ে গান গেয়ে পাড়া মাথায় করাতে, টিভির সামনে বসলে ওঠবার গড়িমসিতে, স্বরবর্ণের চারটি অক্ষর চারশোবার পড়েও মনে রাখবার অপারগতায়, অজস্র বকুনি শোনে সারাদিনমান। ফলাফল অপরিবর্তনীয়।

অতএব, পুনরাবৃত্তি। চক্রবৃদ্ধিহারে নীরব বাড়ির সরবতা বাড়ে আরো। প্রতিটি দিন গড়ায় এমনি করে, একটু একটু করে রুখসানার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি ত্রমশ, টের পাই।

- খালাম্মা, এবার আমার বাবা এলে কিন্তু গেট খুলবেন না কলাম। এবার এসে আমারে নিয়ে যাবে শাসায়ে গেছে। মনে মনে বলি, লোহার গেটের সাধ্য কি রক্তের সম্পর্কে বাধা দেয়। মুখে বলি - মার কাছে যাবি রুখসানা ? হঠাৎ এমন প্রসঙ্গে কথা বলা থামিয়ে অবাক চোখে তাকায়। আবার বলি - যাবি, মার কাছে ? 
- এখন না তো খালাম্মা। খালু বিদেশ থেকে এলে তারপর। আপনি যে একা থাকতি পরাবেন না।
- বোকা মেয়ে। অন্যের জন্য কেউ ভাবে না। নিজের জন্য ভাবতে শিখ - এটাই নিয়ম জগতের। আপন মনেই বলি। মুখে বলি - সেই যে কবে তোকে মার কাছ থেকে তোর বাবা কেড়ে নিয়ে এসেছিল । তারপর তো মাকে দেখিসনি আর। এখন মাকে দেখলে চিনবি তো ? সজোরে মাথা দোলায় রুখসানা। উচ্ছল হাসিতে উদ্ভাসিত হয় সারামুখ - এই এত বড় একটা নোলকবালি পরে আমার মা। দেখলেই চেইনে নেব। তায়, এখন কিন্তু যাবে নানে খালাম্মা। সন্দেহ আর ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে আমার চোখে চোখ রাখে রুখসানা। দৃষ্টি সরিয়ে নেই ওর দুচোখ থেকে। ছোট্টুনি এক অপরূপ সুন্দর মুখ এসে ভর করে দৃষ্টিতে। ও চোখের নির্মীলিত দৃষ্টি পড়তে চাই মন হাতড়ে, পারি না। বন্ধ দুটি চোখেও কি আর্তি ছিল আমার মেয়ের - মা যাব না যাব না। । জানি না কিছু জানি না। অসহায়ের সারিতে আমার পাশে রুখসানার মাকে আবিস্কার করি। মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। আমার মত দুঃখী মানুষের দলে রুখসানার মার তো থাকবার কথা নয়। আমার ডাক না হয় সেই সৃদুরে পৌছায় না। কিন্তু রুখসানার মার আর্তনাদ যে চারপাশে বাজছে। সেদিনের পর থেকে বাড়িটা পাল্টাতে থাকে তাড়াতাড়ি। আমার আর বকুনির সুযোগ হয় না। রুখসানা নিজে স্থির হয়ে আমাকেও স্থির করে দিয়েছে। চোখের পলকে ছাদ থেকে নেমে আসে কাপড় তুলে, আচারের বৈয়াম বেলা পড়বার আগেই তাকে সাজিয়ে রাখে, গান ভুলে ফাঁক পেলেই বর্ণমালার বই নিয়ে বসে চারটি অক্ষর মুখস্ত করে, পরবর্তী চারটিও শিখে ফেলে, মেঝেতে কিছু পড়তে না পড়তে মুছে তুলবার জন্য ব্যস্ত হয়। আমার অপছন্দের কোন কাজে আর আগ্রহ দেখায় না। সংকটাপন্ন আমি ছল করি। দু’দিনের জন্য বেড়াতে বলে ওর আত্মীয়টির হাতে তুলে দিই রুখসানার সমস্ত দেনা পাওনা মিটিয়ে। আমি ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চলে যাই সেই স্বর্ণপুর। দক্ষিণের ব্যালকনি নয়, চালা তোলা ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকা সেই মা, যে নাকে নোলকবালি দুলিয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রম শেষে ঘরে ফেরে। স্পষ্ট দেখি আমার হাতের কারুকার্যময় কাঁকন জোড়া মিলিয়ে দুটো কাঁচের চুড়ি হয়ে যায়, কাঁঠালিচাপার আভা ছড়ানো পরনের শাড়িটা হয়ে যায় ধান ক্ষেতের মত সবুজ রঙা শাড়ি। আর ক’টি ঘন্টা পেরুলেইঅপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মায়ের বুকের মাঝখানটায় পৌঁছে যাবে রুখসানা। অকারনে ভিজে ওঠে চোখের পাতা। দৃষ্টি ঝাপসা হয়। আর সেই আবছায়ার মধ্যে পথের অনেক বাঁক আর দুরত্ব ঘুচিয়ে রুখসানার মায়ের কাছে পৌঁছানোর দৃশ্যটা দেখতে পাই, রুখসানার কণ্ঠ 

ইথারে ইথারে ভেসে বেড়ায় - মা আমি আসছি।
রুখসানার মায়ের হাহাকার করা বুকের ঘাটতি পূরণের উচ্ছ্বাসের জোয়ার আমার বুকের টের পাই।
গরম পানির ধারা গাল বেয়ে নামে, ঝাপসা দৃষ্টি পরিস্কার হয়, আর সেই পরিস্কার আলোয় দেখি আমি একা। শুধুই একা।

-**********
ফাহমিদা রিআ 
***********



 </title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/113495/</link>
				<pubDate>Fri, 20 May 2022 16:07:03 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>﻿ <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a target="_blank" href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23এক" rel="nofollow ugc">#এক</a>া</p>
<p>রখসানা কাঁদছে। আমি অবাক বিস্ময়ে ওর ফুলে ফুলে ওঠা কান্না দেখছি। কোমরে গোঁজা চাবির গোছাটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলি &#8211; বাবা তো মেয়ে কে দেখতে আসবেই । আগে বাসায় ঢুকতে দে, কথা বলি।<br />
&#8211; না খালাম্মা খুলবেন না। আমার বেতনের টেকা নিতি আসতিছে, আমার মায়ের জন্যি রাখা শাড়ি নিয়ে যাবে, আমারেও নিবে। কলিং বেলটা বেজেই চলেছে। চাবি হাতে নিজেই নেমে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-113495"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/113495/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c033e83326a9c9bce1247b59573ca5c4</guid>
				<title>#ছোট গল্প
 #ক্ষত 

ছুটির দিনে এমনিতেই আয়েশ করে ঘুম ভাঙ্গে নিবিড়ের । আজ চোখ মেলতেই মাথার কাছে রাখা ছােট্ট ত্রিপায়ার ওপর জিইয়ে রাখা টকটকে গােলাপটাকে দেখে চেয়ে চেয়ে ।
তারপর চুলােয় চায়ের পানি বসিয়ে খুব ফুরফুরে মেজাজে হাত - মুখ ধুয়ে দু&#039;খানা বিস্কিট পিরিচে সাজিয়ে চায়ের কাপ হাতে দখিনের জানালাটা খুলে দুলুনি চেয়ারটায় গা এলিয়ে বসে । এক ঝলক হাওয়া এসে চিলেকোঠার এই ছােট্ট ঘরটায় আদর ছুইয়ে যায় দুলে দুলে । ইট , কাঠ আর আকাশ ছোঁয়া দালান ছাপিয়ে বিস্তৃত দিগন্ত মনটায় ভােরের পরশ বুলায় । জানালা ঘেঁষে উঠে আসা মাধবীলতা ঝাড়ের ফাঁক গলিয়ে নরম আলােয় দৈনিকটায় চোখ বুলায় নিবিড় । শুক্রবারের এই আলস্যি ভরা সকালটার প্রতি এক ধরনের মােহ অনুভব করে নিবিড় সপ্তাহের শুরু থেকেই । আপনাতে আপনি বিভাের গােছর প্রশান্তি নিয়ে গুনগুন করে দু&#039;লাইন গানের কলি ভাজে । 
&quot;এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না মন উড়েছে, উড়ুক নারে মেলে দিয়ে গানের  পাখনা&quot;.........

----- ভাইজান নাস্তা পানি কি করতে হইব কন তাড়াতাড়ি , বাজার সদাই কইরা রান্না সাইরা বহতা আপাগাে বাড়িত যামু । ও বেলায় আইতে পারুম না।

  ঠিকে ঝি আয়মুনার বাজখাই গলায় সুরচ্ছেদ হয় নিবিড়ের । 
----- কি ব্যাপার বুয়া , এই সাত সকালে তােমার এত তাড়া যে । 
ঘর ঝাট দিতে - দিতেই ব্যস্ত আয়মুনা যা বললাে তার সার কথা- আজ বহতার বিয়ে । গতরাতে হঠাৎ করেই পাত্রপক্ষ দেখতে এসে এনগেজমেন্ট রিং পরিয়ে গেছে । আজ সন্ধ্যায় বিয়ে । ছেলের খুব তাড়া , প্রবাসী ছেলে ছুটি শেষ । এই শেষ বেলাতেই মেয়ে যখন পছন্দ হয়ে গেল , কাজটা সেরে ফেলতে চায় তাই তাড়াতাড়ি । 

নিবিড়ের এতক্ষণে খেয়াল হলাে, তাইতাে ওপাশ থেকে পায়রার বাকুম বাকুম শব্দ  ছাপিয়ে শোরগােলের হালকা আওয়াজ আসছে । জানালার গ্রীল ধরে নিচে দৃষ্টি পড়তেই দেখলাে, ব্যস্ত চলাচল ওপাশে । 
বহতা আর উদিতা । দুই বোন আর বাবা - মার ছোট্ট সংসার ওদের । প্রায় বছর তিনেক হলাে নিবিড় এ এলাকায় । চাকরির মাস দুই পরে মেসের কষ্টকর জীবন ছেড়ে এক কলিগের সহায়তায় তিন তলার এক চিলেকোঠার খোঁজ পেয়েছিল নিবিড় । সেই থেকে দিব্যি নিরিবিলি জীবনটা নিজের মতাে করে সাজিয়ে নিয়েছে । ঢাকার অন্যান্য জায়গার তুলনায় এ এলাকাটায় যান্ত্রিকতার দাপট নেই । পুরাে আবাসিক এলাকা বলেই হয়তােবা । ছোট্ট এক কামরায় একদিকে লাগােয়া রান্নাঘর অন্যদিকে বাথরুম পেছনে খােলা ছাদ অনেকখানি জুড়ে । 

সেবার দেশ থেকে মা দিন পাঁচেক থেকে যাবার সময় বলে গেলেন , 
-----ভাল চাকরি করছিস , পদোন্নতি হচ্ছে, বড় দেখে বাসা - টাসা নে , ঘর দোর গুছিয়ে বােস। সংসার করতে হবে না ? 

কথাটা সত্যি । নিবিড়ও আজকাল প্রায় ভাৰে একটা সংসার গড়ার কথা । লাল বেনারসীতে ঘােমটা মুড়ি দিয়ে লাজরাঙা একটা বউ আসবে - তার একাকীত্বের কষ্ট দূর করতে । ঘুরবে, ফিরবে, হাসবে আর মাঝে - মধ্যে খুনসুটি করে রাগিয়ে দেবে, মান ভাঙ্গাবে । দুর্মুল্যের বাজারে হিসেব - নিকেশ করে দুজনে কখনও ভয়ানক ঝগড়া বাঁধাবে,বিরহের সমঝোতার পর মিলনের আনন্দে ঘুরে বেড়াবে - বয়ে যাওয়া নদীর পাশ দিয়ে মেঠো পথ ধরে পাহাড় ঘেঁষা কোনাে গ্রামের প্রান্তরে ।

দু&#039;চারটে বাসাও দেখেছে এর মধ্যে । কিন্তু জোছনা রাতের এই খােলা স্থানে জীবনানন্দ আবৃত্তি কিংবা দখিনের জানালা খুলে বর্ষা রাতে বৃষ্টি পড়া সুর ‘ &quot;রিমিঝিমি রিমিঝিমি নামিল দেয়া &#039; সুরের আবেশ এই ঢাকা শহরের কোনাে বাড়িতেই যে পাওয়া যাবে না । আসলে এই তিনটে বছরেই চারপাশের সাথে খুব বেশি একাত্ব হয়ে গেছে নিবিড় । বাড়ি বদলের ভাবনা ঝেড়ে ফেলে সান্ত্বনার বাণী খুঁজে ভেবেছে- “ ঘরণীর সন্ধান মিলুক তবেই তো। 

নিচ থেকে উদিতার কষ্ঠ কানে আসতেই নিচে তাকালাে নিবিড় - 
-----&quot;বাবা ডাকছেন চলে আসুন , কাজে হাত লাগাতে হবে &quot;। 
নিবিড় হাত তুলে সম্মতি জানিয়ে সরে এলাে জানালা থেকে । আয়মুনা এরই মধ্যে নাস্তা টেবিলে দিয়েছে ।খেয়েই মােড়ের লন্ড্রিতে কাপড় টা নিয়ে ফেরার পথে উদিতাদের বাসায় একবার ঢু মেরে যাওয়া দরকার । উদিতার মুখে সারাক্ষণ লেগে থাকা হাসিটা আজ যেন আরও বেশি উজ্জ্বল মনে হলাে । হবেই তাে - সিরিয়াল যে এমন চট জলদি পেয়ে যাবে ভাবেনি । 
বেরুনাের জন্য তৈরি হতে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে আপন মনেই হাসে নিবিড় । উদিতার চেয়ে তার খুশিই কি কম । এটা তাে অস্বীকার করার উপায় নেই । আয়মুনার কাছ থেকে বহতার বিয়ের খবর শােনার পর জানালায় দাঁড়িয়ে নিবিড় এক প্রস্থ স্বপ্ন দেখে ফেলেছে উদিতাকে ঘিরে ।
টুং - টুাং শব্দে কলিং বেল বেজে উঠতেই আয়মুনা তার স্বভাবসিদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠে,
-----ভাইজান ও ভাইজান - ঐ বাড়ির চাচাজানে আপনেরে ডাকতে লােক পাঠাইছে । 

আয়মুনাকে ছুটি দিয়ে নিবিড়ও নেমে আসে নিচে । এরই মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে বাড়িটায় । ছাদে সামিয়ানা টাঙানাে । রান্নাঘরের পেছনের ফাঁকা জায়গায় জারুল গাছের নীচে বড় বড় দুটি উনুন বানানাে হয়েছে ইট দিয়ে । ছােটখাট আয়ােজন । জনা - পঞ্চাশেক লােক আসবে বরযাত্রীতে । ঘরােয়া ভাবে খুব স্বল্প সময়ে সারতে হচ্ছে শুভ কাজটা । 
নিবিড়কে ডেকোরেশনের দায়িত্ব দিয়ে উদিতার বাবা ছুটলেন আরেক কাজে । টানা বারান্দার এক কোণে গায়ে হলুদের তত্ত্ব সাজানাে হয়েছে । এক গাদা ফুলের ডালা নিয়ে উঠোনে মােড়া পেতে বসেছে উদিতা ফুলের গয়না বানাতে । মাঝে মাঝে খবরদারি করছে আশপাশের কাজের । 
নিবিড়ের সাথে চোখাচোখি হতেই হাসি ছড়িয়ে বলে- -----গােলাপটা পুরাে ফুটলে আজ খোঁপায় 
পরতাম । 
নিবিড় জবাবে হেসে বলে,
----- ফুটেছে , অপেক্ষা করুন ।

চোখে - মুখে হাসি ঝরা এই উদিতাকে যেদিন প্রথম দেখে নিবিড় কি ভয়ার্ত মুখই না ছিল সেদিন । তখন বছর দেড়েক হয়েছে নিবিড়ের এ - এলাকায় । জানালা খুললেই চারদিকের গাছ - গাছালিতে ভরা পাশের একতলা বাড়িটির ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় &#039; দেখে মফস্বল শহরের তাদের বাড়িটির কথা মনে পড়ে যায় । পুই - লাউয়ের বেড়ে ওঠা ডগা রান্নাঘরের চাল ছুঁয়ে যাওয়া টসটসে সবুজ পাতাগুলি চোখ জুড়িয়ে দেয় । তার উপর চারটে বাঁশের খুটিতে উঁচু করা পায়রার খােপে দিন - রাত বাকুম বাকুম আওয়াজ ঢাকার বুকে দুর্লভ শান্তির সন্ধান যেন । মাঝে মাঝে উঠোনে সর্ষে ছড়িয়ে পায়রা ডাকতে দেখা যেতাে উদিতা কিংবা বহতাকে । ব্যস ঐ পর্যন্তই মুখ চেনা পরিচয় । 

রাত দশটার খবর শুনে প্রতিদিনের মতাে খাবার গরম করার জন্য চুলাে জ্বালতেই কলিং বেলের মুহুর্মুহু শব্দে খানিকটা বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে নিবিড় । এত রাতে উস্কোখুস্কো চেহারা আর দু&#039;চোখে রাজ্যের আতংক নিয়ে দাঁড়িয়ে উদিতা , সংগে কাজের বুয়া । কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই উদিতার রুদ্ধ কণ্ঠ শােনা যায়- 
-----আমাদের বাসায় একবার আসবেন ? খুব বিপদে পড়েছি । বাবা বাসায় নেই , নিরুপায় হয়েই এসেছি । প্লিজ আসুন , আমার সাথে । 

নিবিড় কোনাে কথা না বাড়িয়েই উদিতার পিছে পিছে নেমে আসে । গেট খােলাই ছিল । ড্রইংরুম পেরিয়ে করিডাের দিয়ে একেবারে অন্দর মহল।বয়স্ক এক মহিলার কোলে মাথা রেখে অসুস্থ এক তরুণী । 
উদিতা অনেক পরিচিতের মতাে করে নিবিড়কে দেখিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাে ,
----- অবস্থা তাে দেখলেন । এম্বুলেন্স কি এত রাতে পাওয়া যাবে ? 
বয়স্ক মহিলাটি ক্রমাগত অধীর হয়ে মেয়েটির মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে রােদনের সুরে ডাকছেন, -----বহতা ....... বহতা ....... 
বহতার নিঃসাড় দেহে  মুখে ফেনা দেখে অবস্থার দিক নির্ণয়ে সময় নষ্ট না করে গলির মােড় থেকে একটা স্কুটার নিয়ে ফিরে এলাে নিবিড় ।
উদিতার সাথে ধরাধরি করে স্কুটারে তুলে সােজা ইমারজেন্সী ওয়ার্ড । 
ডাক্তার আর যমের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বহতার নাকে - মুখে নল ঢুকিয়ে এ যাত্রা থেকে তাকে উদ্ধার করে আনে নিবিড় - উদিতা । রাতদিন পালা করে পাহারা দিয়েছে দু&#039;জনে । কেন এই আত্মহত্যার পথ নিবিড় জানতে চায়নি । উদিতা অবশ্য বলতে চেয়েছে , নিবিড় বাধা দিয়ে বলেছে - উনি আগে পুরােপুরি সুস্হ হয়ে উঠুন - আপনি নিজেও ক্লান্ত ।

উদিতার বাবা অফিসের ট্যুর সেরে ফিরেছেন এর সপ্তাখানেক পর । ও বাড়ির বুয়া এসে খবর দিয়েছে, উদিতার বাবা নিবিড়কে ডেকে পাঠিয়েছেন । 

সেই শুরু । এরপরে দু&#039;চারবার যখনই নিবিড় ওবাড়ি গিয়েছে , উদিতার বাবা - মার কাছে থেকে সহজ স্বাভাবিক আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারই পেয়েছে ।

বহতার সাথে অবশ্য কখনই কোনাে কথা হয়নি । টানা - টানা গভীর কালাে চোখ দু&#039;টিতে শীতল দৃষ্টিই দেখেছে সব সময় । 
আর উদিতা ? বহতার উল্টো পিঠ । ওর মুখে লেগে থাকা হাসিটি দেখে মনেই হবে না ও মেয়ে কখনাে মন খারাপ করতে পারে , জ্বলজ্বলে চোখ দু&#039;টিতে লােনা পানি কখনই আসতে পারে না বুঝিবা । এ বছরই বিএসসি পাস করে একটা স্কুলে ঢুকেছে । সারাক্ষণই আনন্দ খুঁজে কথা বলে রসিকতা করে , যেন সিরিয়াস কিছুই নেই জগতে । 

নিবিড়ের কল্পনা বিলাসী মনে এক সময় কখন যেন ঠাঁই করে নেয় উদিতার হাসি মাখা মুখ , চপলতা আর উচ্ছলতা । 
ষ্টাফ বাস থেকে নামতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় উদিতার সাথে ফুলের দোকানের সামনে । নিবিড় ঠোঁট টিপে হেসে বলে,
----- কি ব্যাপার ? কার জন্যে ফুল ?

চোখের তারা নাচিয়ে হাসে উদিতাও, বলে 
------ কোন ব্যাপার হয়নি এখনও । তবে যদি হয় তাই অর্ডার দিয়ে রাখলাম । 
নিবিড় দুষ্টুমি করে 
-----যদির অপেক্ষায় খালি হাতে ফিরবেন ? তারচে &#039; আমি আপনাকে গিফট করি ? কোন ফুল পছন্দ আপনার ? তােড়া বানাতে বলি । 
-----সর্বনাশ ভুলেও এমন সখ করবেন না । আমার বােন বহতার মতাে ডুববেন , একেবারে ইমারজেন্সী ওয়ার্ড । বহতার শুরু তাে এই ফুলের তােড়ার মাঝে , মন যে কখন চালান হয়ে গেছে নিজেও টেরটি পায়নি । 
নিবিড় শান্ত শান্ত স্বরে বলে , 
-----বহতার মনের মূল্য এক নির্বোধ বােঝেনি বলে কি এত এত মনগুলাে সব মূল্যহীন হয়ে যাবে ? কই বললেন না তাে কি ফুল আপনার পছন্দ । এতক্ষণ ফুলের দোকানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি কিছু একটা না কিনলে কেমন দেখায় বলুন তাে । 
উদিতা স্বাভাবিকভাবে বলে ,
----- তা বেশ তাে কিনতে হয় কিনুন।কালচে রঙা ঐ গােলাপ কুঁড়িটা নিন । দু&#039;একদিনে ফুটে যাবে , পানিতে জিইয়ে রাখবেন । একেবারে টকটকে লাল গোলাপ হবে । 
নিবিড় তাই কিনে । বলে
----- চলুন এগােই । এটা কিন্তু আপনার জন্য ।

উদিতা হাঁটতে হাঁটতে বলে 
-----উঁহু , আমি ওসব বােধ নির্বোধের মনের দর কষাকষিতে নেই । 
-----কিন্তু কেউ যদি যে কোনাে মুল্যে ও মন কিনতে চায় । 
উদিতা এবার চলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে । সরাসরি চোখে চোখ রেখে বলে , 
-----আপনিই বলুন কত দামে দেয়াটা উচিত হবে ?

নিবিড় একটু চমকে যায়, উদিতার চোখের তারায় ছলকে ওঠা প্রশ্ন দেখে । নিজেকে সামলে নিয়ে বলে -----নিজের মনের উপযুক্ত দামের মন পেলেই দেয়া উচিত । 
উদিতা রহস্যময় হাসি হেসে বলে , 
-----বেশতাে দিলাম । 
ততক্ষণে বাড়ির গেটে এসে পড়ছে ওরা । নিবিড় বার দুই ঢােক গিলে অনেক কষ্টে জিভের আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে বলে 
-----ফুলটা নেবেন  না? 
-----নেব । কিন্তু এখন নয় । কারণ কথা তাে সবই ব্যক্ত । গােলাপ কুঁড়ির অব্যক্ত উপমা বেমানান এখন । প্রস্ফুটিত গােলাপটা আমারই জানবেন ।

নিবিড় আর দাঁড়াতে পারে না । কিছু  না বলেই চিলেকোঠার উদ্দেশ্যে সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতে শুনতে পায় উদিতার কণ্ঠ- &#039;
----- আরে আরে চলে গেলেন যে , এক কাপ চা খেয়ে যান অন্ততঃ, বাড়ির দরজা থেকে চলে গেলেন কিন্তু....... 



সামনে গায়ে হলুদের আসনে বহতা গাঁদা ফুলের গয়নায় ফুলপরীর মত বসে আছে ।
মেয়েলী সংস্কারে হলুদ ছুঁইয়ে দিচ্ছে একে একে । কনের পাশে বসা উদিতার লাল রঙা তাঁতের শাড়ি , কপালে রাঙা টিপ ছাপিয়ে কাঁধের ওপর এলাে খোঁপায় নিবিড়ের দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় - লাল গোলাপের অপেক্ষায় । 

চিলেকোঠা থেকে তখনই ফিরে আসে নিবিড় । উদিতার মুখােমুখি দাঁড়িয়ে বাড়িয়ে দেয় লাল গোলাপ । মুগ্ধ হয়ে দেখে উদিতার মুখের হাসির সাথে তাল মিলিয়ে হাসছে খােপায় গোঁজা টকটকে গােলাপটিও তক্ষুনি । চোখাচোখি হতেই ফিসফিসিয়ে শুধায় উদিতা -
----- কি মনে হচ্ছে ?
নিবিড় আড় নয়নে তাকিয়ে বলে 
-----হিসেবে গড়মিল । 
-----কোথায় ? 
-----সুন্দরে সুন্দরে । আপনার মুখের হাসি নাকি ফোটা গােলাপের হাসি ? সমান সমান । 
-----কি করে ? মুল্য দিয়ে ফোটা ফুল তাে মনেরই ব্যক্ত কথা । আর হাসি? সে তাে বহিঃপ্রকাশ। 
------মনেরই সম্মতির।  
-----ডুবেছেন বলুন । 
--—তার মানে ইমারজেন্সী ? উদিতা  হাসির দমকে আঁৎকে ওঠে বলে। 
নিবিড় চোখ নাচিয়ে হাসে
----- -উহু , আমি নির্বোধ নই । 
-----বেশ তাে বহতা বিদেয় হলেই আপনার বুদ্ধির দৌড় দেখাবেন । 
চোখে মুখে লাজ ছড়িয়ে আবারাে ব্যস্ততায় মিশে যায় উদিতা । তদারকি সম্পন্ন করে বিকেলের দিকে রুমে ফিরে এলাে নিবিড় । একটু গড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই তৈরি হয়ে পৌছুবে বিয়ের আসরে । এরই মধ্যে কখন যে নিবিড় ঘুমিয়ে পড়েছিল। 

কলিং বেলের একটানা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে চেয়ে দেখে রুম অন্ধকারে ছেয়ে গেছে । লাফিয়ে উঠে আলাে জ্বেলে দরজা খুলতেই দেখে আয়মুনা দাঁড়িয়ে । নিবিড় অপরাধী কণ্ঠে বলে 
------ ওরা ডাকছে বুঝি ? ছিঃ ছিঃ কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । বরযাত্রী এসে পড়েছে ? গিয়ে বলাে আমি আসছি এক্ষুনি ।

আয়মুনা মেঝেতে বসে পড়ে ক্লান্ত ভংগিতে 
-----আর গিয়া কি হইব ভাইজান । বিয়া হইলে তাে ? বহতা আপার এইডা উচিত হইছে কন ? আগে যদি অন্য পােলার লগে বিয়া রেজষ্ট্রি কইরাই রাখছস, তয় এত ভান ধরবার কি দরকার আছিলো । বাপেরে কি অপমানটাই না করলাে , চাচাজান আর বাঁচাবাে না ভাইজান , এত বড় শোক আল্লায় সওয়াইলে অয় । 

নিবিড় যখন উদিতাদের বাসায় উপস্থিত হলাে কোলাহল থেমে গেছে ততক্ষণে । পাগড়ি আর শেরওয়ানী পরা বর যথারীতি আসরে বসে । কাজী সাহেবের সাথে বরপক্ষ ও কনপক্ষের লােকদের কি সব লেখাজোখার কাজ চলছে । ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা লােকজন কেমন যেন নীরব , নিশ্চুপ । সবই আছে শুধু প্রাণের স্পন্দন নেই যেন । 

এদিক - ওদিক তাকিয়েও উদিতাকে চোখে পড়ে না নিবিড়ের । ভেতরে মেয়েদের ভিড়ের জটলা , অতিথিদের জন্য রাখা চেয়ারগুলাের দিকে পাড়ার রাজীবকে দেখে এগিয়ে গেল নিবিড় । রাজীবের পাশের চেয়ারটায় বসতেই গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাে 
-----ওদিকে কি খবর নিবিড় ভাই ? ভালয় ভালয় কাজ সারা হলেই হয় এখন ।
নিবিড়  কিছু না বুঝেই জিজ্ঞেস করে
-----বহতাকে নিয়ে কি সব গন্ডগােল শুরু হয়েছে শুনলাম । 
রাজীব অবাক স্বরে বলে- শুরু কি বলেছেন ? গন্ডগােলের তাে শেষ ঘটালাে রাজকুমার এসে । কি চাপা স্বভাবের মেয়ে দেখুন । বছর দুই আগে চুপিসারে কোট ম্যারেজ করে রেখেছে , কাকপক্ষী টেরটিও পায়নি । তারপর কি সব ঘটনা । দু&#039;জনের মধ্যে মনােমালিন্য, যােগাযােগের বিচ্ছিন্নতায় বহতা তাে কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে গিয়েছিল। ঘরকুনাে বনে গিয়েছিল একেবারে । আর তাই বিয়ের সম্বন্ধটা আসতেই সময়ের স্বল্পতায় সাত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গিয়েছিল বহতার বাবা । কিন্তু ভাগ্যের লিখন দেখুন , ঘন্টা খানেকের মধ্যে পট পরিবর্তন হয়ে গেল যার যার ভাগ্যের । বিয়ের জমজমাট আসরে বহতার সেই বর হাজির প্রামাণ্য দলিলের আট ঘাট বেধে । সরাসরি কাবিননামা দেখিয়ে বহতার হাত ধরে নাটকীয় কায়দায় সবার সামনে বেরিয়ে গেল , পলকহীন দৃষ্টি নিয়ে দেখলাম শুধু ।

নিবিড় অস্ফুট স্বরে বললাে 
তাহলে বরপক্ষের লােকেরা দেখে শুনে এখনও ..........। 
কথা কেড়ে নিয়ে রাজীব আবারও বলা শুরু করলাে ------বহতার বাবাকে তাে স্বয়ং বরই বাঁচালাে । নাটক বলে নাটক , আপনি তাে শেষ অংকে এলেন । বহতার বাবা ভরা আসরে করজোড়ে দাঁড়িয়ে অপমানে , লজ্জায় উত্তেজিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন । বর স্বয়ং উঠে এসে বহতার বাবার দু’হাত ধরে প্রস্তাব দিলেন, যা ঘটবার তাতে ঘটেছেই ভাগ্যের লিখন অনুসারে । আমরাও খালি হাতে ফিরতে চাই না । আপনার আপত্তি না থাকলে ছােট মেয়েটির জন্য প্রস্তাব রাখছি । যদি রাজি থাকেন আর দেরি করবেন না । 
নিবিড়  কথার মাঝে উৎকণ্ঠিত স্বরে বলে ওঠে হঠাৎ ------ উদিতারও তাে মতামত থাকতে পারে । 
-----আর মতামত ? এত বড় একটা ঘটনার পর সমাধানের পথ , যেখানে ওর বাবার বাঁচা মরার প্রশ্ন সেই অসহায় বাবা যখন উদিতার দু&#039;হাত ধরে ঝরঝর করে কেঁদে বললেন ‘ আমাকে বাঁচা মা । &#039;

নিবিড় স্থির কণ্ঠে শুধু বললাে - তারপর ? 
-----যেমন দেখছেন , একটু আসি ওদিকটা দেখে ।

হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া বাড়িটা আবারও হঠাৎই যেন ব্যস্ততা বেড়ে গেলো।ক্যাসেটে সানাইয়ের সুর । ঘটনার আকস্মিকতায় এতক্ষন খেয়ালই করেনি নিবিড় পরিস্থিতির পরিবর্তন ।

বরযাত্রীর গাড়ি দুটো সরগরম হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে । লাল হলুদ সবুজে সাজানাে দুধসাদা গাড়িটিকে ঘিরে ছেলেমেয়েদের জটলা সরিয়ে পাগড়ী পরা বরের পিছু পিছু ঝকমকে উড়নায় ঘােমটা ঢাকা উদিতা। বধু সাজে সাজানাে দু&#039;চোখের ব্যাকুলদৃষ্টির ভাষা দূর থেকে নিবিড় টের পায় গভীরভাবে । 
এ ব্যাকুলতায় লেখা কাংক্ষিত মুখের অনুসন্ধানের ভাষা। নিবিড় পড়ে ফেলে অন্তদৃষ্টি দিয়ে। আর বাইরের দৃষ্টিতে দেখে খোঁপায় গোঁজা বিকেলের টকটকে লাল গােলাপের পাপড়ি গুলাে ছড়িয়ে পড়েছে পথে , যে পথ মাড়িয়ে উদিতাকে ওরা সাজানাে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছে । 

এক সময় গাড়িটা চলতে শুরু করলো । নিবিড়ের খুব পাশ দিয়ে যাবার সময়, মুহূর্তের জন্য উদিতার চোখের সেই দৃষ্টিতে নিবিড়ের চোখ ধরাও পড়লো। সেটা বিদায়ের নাকি ভালবাসারই ঘায়ে মাড়িয়ে যাবার উপযুক্ত মুল্যের , নিবিড় বুঝে উঠতে পারলো না , কারণ তার দু’চোখ তখন পানিতে ঝাপসা । 

-------------------------
ফাহমিদা রিআ 
-------------------------</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/112363/</link>
				<pubDate>Tue, 17 May 2022 18:49:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ছ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ছ</a>োট গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ক" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ক</a>্ষত </p>
<p>ছুটির দিনে এমনিতেই আয়েশ করে ঘুম ভাঙ্গে নিবিড়ের । আজ চোখ মেলতেই মাথার কাছে রাখা ছােট্ট ত্রিপায়ার ওপর জিইয়ে রাখা টকটকে গােলাপটাকে দেখে চেয়ে চেয়ে ।<br />
তারপর চুলােয় চায়ের পানি বসিয়ে খুব ফুরফুরে মেজাজে হাত &#8211; মুখ ধুয়ে দু&#8217;খানা বিস্কিট পিরিচে সাজিয়ে চায়ের কাপ হাতে দখিনের জানালাটা খুলে দুলুনি চেয়ারটায় গা এলিয়ে ব&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-112363"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/112363/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">dd2692aff6fe57e6679087855e9bbeeb</guid>
				<title># গল্প 
 #প্রতিচ্ছবি


ভোরের দিকে ঘুমটা ভেঙ্গে যেতেই তনিমার মনে পড়ে আজ সকাল আটটায় ওর একটা ইন্টারভিউ আছে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে । এম , এ , পরীক্ষার পর গত ছয় মাসে এই নিয়ে তার চতুর্থ ইন্টারভিউ । দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকারের সেও একজন । দীর্ঘ ছাত্রীজীবনের শেষে পড়াশােনার সার্টিফিকেট ক&#039;খানা , নাগরিকত্বের সনদপত্র আর নিজের জীবন - বৃত্তান্ত সম্বলিত ফাইলটা প্রায় প্রতিদিনই তনিমাকে খুলতে হয় । আবশ্যক আর নিয়ােগ বিজ্ঞপ্তির পেপার কাটিং নিয়ে আসেন বাবা অফিস থেকে । কখনাে ইন্টারভিউ কার্ড । সময় মত দুরু দুরু বুকে বাের্ডে হাজিরা দেয় তনিমা । কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আর আসে না । আদৌ আসবে কিনা তাও জানে না ।

শুয়ে শুয়ে এসব সাত - পাঁচ ভাবনার মধ্যে মার গলা ভেসে আসে রান্নাঘর থেকে। 
-----তনি , তাের আজ ইন্টারভিউ খেয়াল আছে ? উঠ শিগগির । কি কপাল নিয়ে যে এসেছিলি , পয়সা ঢেলে ঢেলে লেখাপড়া শিখালাম অথচ একটা চাকরি জোটে না । যা দিনকাল পড়েছে বাপের পয়সায় পারওতাে হতে পারবি না । আসলে দোষ তাের কপালের না , দোষ বংশের । সেদিনই বুঝেছিলাম , হতভাগী ফুফুর পুরাে চেহারাটা নিয়ে জন্মেছিস । তাের দুর্ভাগ্য ছাড়বে কেন ? 

বাবারও গলা শােনা যায় , 
-----সাত সকালে কি শুরু করলে বলাে তাে । ফুফুর মত দুর্ভাগ্য ওর হতে যাবে কেন - বালাই ষাট । ও- হতভাগী তাে নিজের হাতে গড়েছিল দুর্ভাগ্যকে ।

তারপর তনিমাকে উদ্দেশ্য করে গলা বাড়িয়ে বলেন ,
----- তনি উঠ মা । তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে , আমি অফিস যাবার পথে তােকে নিয়ে ওদিক হয়েই যাব ।

তনিমা সব শােনে । কন্যাদায়গ্রস্ত মায়ের জ্বালাটাও টের পায় । সারাটা জীবন সংসারের সাথে উদয়াস্ত যুদ্ধ করতে করতে মার মেজাজটা অমনি হয়ে গেছে । তনিমা ঠিক করে আজ মা যখন দুপুরের কাজ সেরে গোছল করে খেয়ে দেয়ে এক চিলতে ঐ অবসরকুটুতে খিলি পান মুখে দিয়ে নকশী কাঁথা নিয়ে বসবেন ঐ ফাঁকে ফুফুর অজানা দুর্ভাগ্যটা শুনবেই শুনবে । জ্ঞান হবার পর থেকে শুনে আসছে সে ফুফুর হুবহু আদল পেয়েছে । দুর্ভাগ্যেরও ভাগীদার হয়েছে । কি এমন ভাগ্য যে সদা আতঙ্কগ্রস্হ থাকেন বাবা মা । ফুফুর নামটা পর্যন্ত কেউ বলে না , বলে হতভাগী । জানতে চাইলে অব্যক্ত ব্যথায় চুপ করে থাকেন বাবা মা দু&#039;জনই । তবে তনিমা এটুকু জানে তার হতভাগী ফুফুর নাম পূরবী । জোর করে বিয়ে ঠিক হওয়ায় পূরবী আত্মহত্যা করে হতভাগী হয়ে যায় । বাবার একমাত্র বােনতাে , হয়তাে সেই অনুশােচনায় বাবা দগ্ধ হন অনুক্ষণ । আবার মার গলা ভেসে আসতে চমক ভাঙ্গে তনিমার । টেবিলে রাখা ঘড়িটা টিক টিক করে সাতের কাঁটা ছুঁই ছুঁই প্রায় । তড়িঘড়ি করে তৈরী হয়ে রান্নাঘরে মােড়া টেনে বসতেই মা সস্নেহে নাস্তার প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলেন,
----- - ভাল করে খেয়ে নে তনি , কখন ইন্টারভিউ শেষ হয় তা তো ঠিক নেই । 
তনিমা খেতে খেতে ভাবে , বাবা মা হয়ত ভাবছেন এবার তনিমার চাকরিটা হতে পারে । কিন্তু তনিমা খুব ভাল করেই জানে , গত তিনবারের মত ফলাফল হবে এবারও । ইন্টারভিউ বাের্ডে স্বজনের সুপারিশ আর ওপরওয়ালার একটা ফোনেই যােগ্যতা যাচাই হয় প্রার্থীর । তবু ইন্টারভিউ হয় , তনিমাদেরও যেতে হয় । বেরােবার সময় বরাবরের মত মাকে কদমবুসি করে ছােট বােনটার দিকে তাকাতেই মুরুব্বীর মত মাথা নেড়ে বলে
----- - এবার কিন্তু চাকরিটা হওয়া চাই , ভাল করে পরীক্ষা দিবি আপা । 
তনিমা হেসে বাবার পিছে হাঁটা দেয় । রাস্তায় মােড়ে গিয়ে রিকশা নেয় । সারাটা পথ কতবার বলে দেয়া একই উপদেশগুলাে বাবা বারবার বুঝিয়ে বলেন ।

ওয়েটিং রুমে কত রকমের প্রার্থী এসে জড়াে হয়েছে । কার বয়স চলে যাচ্ছে , কার সংসার চলছে না , কারও বিয়ে নির্ভর করছে , কারও বা অসুস্থ বাবা বা মার চিকিৎসা নির্ভরশীল । প্রয়ােজন যে কার চেয়ে কার বেশী ভাবা দায় । ইন্টারভিউ শুরু হয়ে গেছে । এক একজন বাের্ড থেকে বেরােচ্ছে আর মৌচাকের মত ঘিরে ধরছে তাকে অন্যান্য প্রার্থী । কি প্রশ্ন করলাে , বাের্ডে ক’জন আছে ইত্যাদি ইত্যাদি । কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত খবরও সাপ্লাই করছে - এই প্রতিষ্ঠানের মালিক স্বয়ং ইন্টারভিউ বাের্ডে বসেন । অকৃতদার ভদ্রলােক , ভারী খিটখিটে মেজাজের । এক সময় বেয়ারা এসে ডাক দেয় ৪০৬ ’ তনিমা শিকদার&#039; ।

হাত ব্যাগ থেকে কলমটা বের করে ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে তনিমা । বাের্ডের উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে আদাব দেয় । সামনে রাখা চেয়ারে বসতে বলেন একজন । চারজনের চারজোড়া চোখের সামনে তনিমা সহজ হতে চেষ্টা করে । তার পাঠানাে সার্টিফিকেট কপি , আবেদন পত্র , ছবি নিরীক্ষণ করছেন মাঝের 
ভদ্রলােক । টুকিটাকি প্রশ্ন চলতে থাকে । তনিমা কতক পারে না , কতক পারে । 
হঠাৎ কাগজপত্র নিরীক্ষণকারী মাঝের ভদ্রলােক পুরুলেন্সের চশমা ভেদ করে তাকান তনিমার দিকে । ধীর কণ্ঠে বলেন , 
-----সবার ইন্টারভিউ শেষ হলে আপনি অপেক্ষা করবেন । এখন আসুন । 
তনিমা রুমে ঢােকবার সময় যে কাঁপন নিয়ে ঢুকেছিল তার চেয়েও দ্বিগুণ কাঁপন নিয়ে বেরিয়ে এল । তার মানে কি তার চাকরিটা হবে ? ধুত্তোর তাই বা হয় কি করে , তেমন ইন্টারভিউ তাে হয়নি । সবাই চলে যাচ্ছে , অথচ তার বেলায় অন্য আদেশ কেন ? কেমন যেন ভয়ও করে । কোন বিপদ টিপদের আলামত নয় তাে ? একবার ভাবে , না বাপু ওসব অপেক্ষায় কাজ নেই , চলেই যাবাে । আবার ভাবে চাকরিটা যদি হয় , দেখাই যাক না । ঘুষটুস চাইবে নাকি । আজকাল এসবের জোরেই চাকরি হয় । হা কপাল , ঘুষ দেবার মত টাকা থাকলে সে চাকরিই খুঁজতে বেরােতাে না । কখন যে পুরাে ওয়েটিং রুম খালি হয়ে গেছে তনিমা খেয়ালই করেনি । পিয়নটা এসে ডাকতেই ভাবনায় ছেদ পড়ে তনিমার । 
-----বড় সাহেব ডাকছেন । 
পিয়নকে অনুসরণ করে অফিসের সবার কৌতুহলী দৃষ্টির সামনে দিয়ে বড় সাহেবের রুমে ঢুকে তনি । অত্যাধুনিক সাজসজ্জা আর পুরু কার্পেটে মােড়ানাে চমৎকার ঘরখানা । রিভলভিং চেয়ারে বসে নেভী ব্লু
রংয়ের শার্টের ওপর বাদামী টাই আটা , শনের মত এক মাথা সাদা চুল ব্যাক ব্রাশ করা । পঞ্চাশাের্ধ এই বয়সেও কি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কণ্ঠ- ‘ বসাে&#039; ।
ফাইলপত্রে চোখ রেখেই তনিমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন ।
দু’পায়ের কাঁপুনিকে যথাসাধ্য রােধ করে তনিমা বসে জড়াে সড়াে হয়ে। এসি লাগানাে রুমেও ঘামতে থাকে প্রচন্ডভাবে । চশমাটা খুলে এবার সরাসরি তাকিয়ে কথা বলেন বড় সাহেব
----- - তােমাকে আমি চিনতে পেরে চাকরিটা দিচ্ছি , কিন্তু আমাকে চিনতে পেরে তুমি কি চাকরি করবে ? 

তনিমা ঢােক গিলে বার দুয়েক , 
-----মানে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনার কথা।  
ভদ্রলােক তেমনি ধীর স্বরেই বলেন ,
----- দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর একই চেহারা দেখে আমিও প্রথমটায় কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । তােমার আবেদন পত্রে বায়ােডাটা দেখে বুঝলাম , ভুল আমার হয়নি । তুমি পূরবীর প্রতিচ্ছায়াই বটে ।

তনিমা সে মুহূর্তে ভুলে যায় অফিসের বসের সামনে বসে আছে । এক রকম চেঁচিয়েই ওঠে , 
-----পূরবী ? আমার ফুফু । কিন্তু আপনি ... 
-----হ্যাঁ, তােমার বাবার নাম তাপস শিকদার । তােমার স্থায়ী ঠিকানায় লেখা শ্যামনগর ।ঐ শ্যামনগর জুনিয়র হাইস্কুলে পড়তাে তাপস আর তার দু&#039;বছরের বড় বােন পুরবী ।শ্যামনগরে চৌধুরী বাড়িতে লজিং থেকে পড়তাে আর একজন , জাফর । 
তনিমা অস্ফুট স্বরে বলে - জাফর ? 

ভদ্রলােক বক্র হাসি হাসেন , 
-----আমিই জাফর । বর্তমানে অনেক বিত্ত - বৈভবে গড়া এই প্রতিষ্ঠানের মালিক কিন্তু আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে উনিশ বছরের একটা নিঃসহায় দরিদ্র ছেলে , পরের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশুনা করে , সেই জাফরের কথা তােমাকে শােনাবার জন্যই বসিয়ে রেখেছি । 
তারপর তনিমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন ,
----- তুমি কি অবাক হচ্ছাে ? কিন্তু ত্রিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে আজ আমি ইমােশনাল হয়ে পড়েছি হয়তবা । আমার সব কথা শেষ হবার পর তুমি চাকরিটা করতে চাইলে আগামী কাল অফিসে যােগদান করবে । 
তনিমা অপ্রত্যাশিত খবরের আনন্দে নাকি রহস্যে মুগ্ধ হয়ে যায় । অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে জাফর সাহেবকে । অনর্গল বলে যাওয়া জাফর সহেবের কথাগুলাে তার চোখে ছবির মত আসতে থাকে একটার পর একটা । 
-----সেই পথের পাঁচালির দুটি ভাইবােন - এর মতাে ছিলাে তােমার ফুফু আর বাবা।বইখাতা নিয়ে গাঁয়ের এক মাথায় স্কুলে যায় ভাইবােন দুটি । ছুটি শেষে স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতে গিয়ে রােজ রােজ দেরী করে তাপস । গাছের পেয়ারাটা , জলপাইটা দিয়ে বােনকে পটিয়ে ফেলে তাপসও । উপরের ক্লাশের ছেলে জাফরের দৃষ্টিতে পড়ে ব্যাপারটা । পিঠের ওপর দুই বেনী ঝােলানাে বড় বড় চোখে তাকানাে মেয়েটিকে ভাল লেগে যায় । সাহসে ভর করে একদিন আলাপ করে । এভাবে ধীরে ধীরে গ্রাম্য সরলতায় ভরা কিশােরী পূরবীর একাকীত্ব ভরে দেয় জাফর কত শত কথায় ।

কিছুদিন পর স্কুল বন্ধ হয়ে যায় পূরবীর । মার সঙ্গে ঘরকন্নার কাজ শেখে । ভাল রেজাল্ট করে জাফর পাশের মফস্বল শহর আনন্দপুর কলেজে ভর্তি হয় । কলেজ হােষ্টেল থেকে ট্রেনে চেপে কখনাে কখনাে ছুটে আসে শ্যামনগরে পূরবীর কাছে । সকলের চোখ এড়িয়ে ভর দুপুরের কত যে সাবধানতায় জাফর পূরবীর দেখা হয় কদাচিৎ । কখনাে বা পাতার পর পাতা কথা আদান - প্রদান হয় তাপসের ডাকপিয়নের ভূমিকায় । ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভাের হয়ে ওরা ভুলে যায় বর্তমানের কথা , ওদের দুজনের দুই মেরুতে অবস্থানের কথা । পূরবীর বয়স বাড়ছে । অভিভাবকদের শত চিন্তার অবসান ঘটিয়ে সুপাত্রস্থ করবার সুযােগ এলে হঠাৎই । শুভক্ষণ দেখে বিয়ের তারিখও স্থির হয়ে গেল । পূরবী দুচোখ ভাসিয়ে কেঁদেও কাউকে বলতে পারলাে না তার ভালোবাসার কথা । দিন যত এগিয়ে আসতে থাকে পূরবী ততই অনুভব করে জাফরকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না । আর মাত্র একটা দিন ।

জাফরের সাথে দেখা নেই বেশ কিছুদিন । মরিয়া হয়ে চিঠি লিখে পূরবী । আগামী কাল সকাল নটার ট্রেনের অপেক্ষা করবে পূরবী । জাফর সে ট্রেনে আসবে , তারপর নিরুদ্দেশ হবে দু’জনে - অনেক অনেক দূরে চলে যাবে তারা , কেউ চিনবে না , জানবে না , খুঁজেও পাবে না তাদের এমন গােপন তথ্য তাপসের হাতে দিতে সাহস হয় না পূরবীর । যদি পড়ে ফেলে , বাধা দেয় কিংবা সবাইকে জানিয়ে দেয় । অনেক ভেবে বাড়ির রাখাল ছেলেটিকে চুপিসারে রাতের ট্রেনে পাঠিয়ে দেয় আনন্দপুরে , জাফরের কাছে চিঠি নিয়ে । 

পরদিন সকাল থেকে সারা বাড়ি হুলুস্হুল , কাজে অকাজে বাড়িময় ছুটোছুটি । ব্যস্ত সবাই । পূরবীর চোখের পাতা বারবার ভারী হয়ে যায় লােনা পানিতে । কিছুক্ষণ পরেই বিয়ে ওর । আবাল্যের পরিচিত ঘরদোর উঠোন পেরিয়ে খিড়কি দুয়ার গলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে পূরবী । পেছনে পড়ে থাকে তার প্রিয় বাবা মা , আদরের তাপস । শাড়ীর খুটে চোখের পানি মােছে বারবার । মাথার ঘােমটাটা সামনে টেনে নিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে হাঁটতে থাকে ক্ষেতের আল ধরে ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে । ছাউনির এককোণে জুবুথুবু হয়ে ঘােমটার আড়াল থেকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায় রেল লাইন বরাবর , ট্রেন আসছে না কেন , নটা বাজতে কত বাকি আর ? 

হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটা জানান দিল দূর থেকে । ষ্টেশনের ঘড়িতে ঢং ঢং করে সময় সংকেত দেয় । চোখের নিমিষে  হুশ হুশ শব্দে ট্রেনটা ষ্টেশনে এসে দাঁড়ায় । পূরবীর বুকে মুক্তি ঘন্টা বাজে যেন । এতক্ষণে নীরব ষ্টেশনটাই হৈ চৈ শুরু হয় । তড়িঘড়ি করে যাত্রীর উঠছে , নামছে । পূরবী ঘােমটার ফাঁক দিয়ে বারবার ভুল করে এই বুঝি জাফর নামছে । নাহ , ট্রেনটা এক সময় আবারও হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় । প্লাটফর্মটা শান্ত হয়ে যায় ধীরে ধীরে । দু &#039; একজন লােক আড় চোখে ঘােমটা ঢাকা মহিলাটিকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌতুহলী দৃষ্টি ফেলে । পূরবী দাঁড়াতে পারে না আর , বসে পড়ে মাটিতেই । জাফর তার এতদিনের বিশ্বাস ভেঙ্গে দিয়েছে , জাফর এড়িয়ে গেছে তাকে । কিন্তু পূরবী কি করবে এখন ? জাফর নটার ট্রেনে এলে দু’জনে নিরুদ্দেশ হবে ঠিক করেছিল পুরবী কি জাফর না এলে কি করবে এটাতো ভাবেনি একটিবারের জন্যও।
বিয়ের সময় পেরিয়ে গেছে এতক্ষণে । শেষে বরযাত্রীরা বাবা মাকে যাচ্ছে তাই অপমান করে ফিরে গেছে নিশ্চয় । কোন মুখে সে ফিরে যাবে বাবা মার কাছে । কিন্তু না ফিরেই বা কোথায় যাবে । এতদিনের বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল জাফর তাকে ঠকিয়েছে । সামনে পেছনে কোথাও খােলা নেই পথ । এভাবে ঠাঁয় বসে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায় পূরবীর । ক্লান্ত আর অবসন্ন দেহটা বড় ভার লাগে যেন । এ ভার কি করে বইবে , পূরবী ভাবে বিদিশা হয়ে । হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল শােনা যায় , ট্রেন আসছে আবারও । ত্বরিতেই শরীরটাকে টেনে তুলে পুরবী । হ্যাঁ , এই ট্রেনই তার ষ্টেশনে পৌছে দেবে , সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে পূরবী , এগুতে থাকে সামনে দ্রুত পায়ে । 

জাফর ট্রেন থেকে নামে । এদিক ওদিক তাকায় । না পূরবী নেই হয়ত নটার সময় এসে ফিরে গেছে । কিন্তু পূরবীদের রাখাল ছেলেটা রাতের ট্রেনে আনন্দপুর না গিয়ে আজ ভােরের ট্রেনে গিয়ে জাফরকে চিঠিটা দিয়েছে । চিঠির ভয়ংকর তথ্যে জাফরও ষ্টেশনে ছুটি আসে । পৌছায় পরবর্তী ট্রেনে । জাফর অস্থির হয়ে ভাবে বিয়ের আগে শিকদার বাড়ি পৌঁছুতে পারবে তাে ? 
ট্রেন থেকে নেমে উদভ্রান্তের মত পূরবীদের বাড়ির উদ্দেশে দ্রুত পা চালাতে গিয়ে লােকজনের ছুটোছুটি লক্ষ্য করে এগিয়ে যায় ওদিকটায় । এত তাড়ার মাঝেও জটলা থেকে হাতছানি আসে যেন । রেল লাইনের উপরের ভিড় ঠেলে উঁকি মারে ।

দু’পাশে থাকা ট্রেনে কাটা পড়া দ্বিখন্ডিত দেহ । লােকেরা গুনগুন করে। অনেকক্ষণ আগে ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি । কোন গাঁয়ের মেয়ে কে জানে । কে একজন ঘােমটা সরিয়ে চেঁচিয়ে ডাকে এ যে দেখছি আমাদের গাঁয়ের শিকদার বাড়ির মেয়ে । জাফর সাহেব এ পর্যন্ত বলেই থেমে যান চুরুট ধরিয়ে রিভলভিং চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে চোখ বুঁজে চুরুটে টান দেন।

তনিমার চোখ দুটো অসম্ভব জ্বালা করে । গলার কাছটায় অস্বস্তিকর ব্যাথায় দলা পাকায় । ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় । 
-----গল্পের শেষটুকু আমাকেই করতে হবে ? আমি এখন উঠবাে । 
জাফর সাহেব যন্ত্রণাকাতর চোখ দুটি মেলে তাকান । 
-----তনিমা অপরিমিত জিনিসের শেষ নেই । সেই যে সেদিন শ্যামনগর ছেড়েছি , তারপর কত দেশ - বিদেশ ঘুরেছি , বিত্ত - বৈভব গড়েছি কিন্তু ত্রিশ বছর আগের সেই খন্ডিত পূরবীর চেহারাটাকে বুকের গহীনে লুকিয়ে রেখেছি  সবার আগােচরে । কিন্তু আজ বুঝতে পারছি বুকের মাঝে কতটা অনুশোচনা বয়ে বেড়াচ্ছি। পূরবীর প্রতিচ্ছায়া নিয়ে তুমি আমাকে ত্রিশ বছর আগের ফেলে আসা সেই দিনগুলােতে নিয়ে গিয়ে ভালই করেছ । সেদিনের সেই অসহায় জাফরের হৃদয়ের সবটা জুড়ে যে পূরবী ছিল , আজও ঠিক তেমনি আছে বিত্তবান জাফরের পুরাে মনজুড়ে । অনেক হাল্কা লাগছে আজ আমার । 

তনিমা বসে পড়ে আবারও । তার প্রথমে যে ভয় করছিল তা আর করছে না । এমনি কি রাগও হয়েছিল অহেতুক তাও আর নেই । তার কেবলই মনে হতে থাকে জাফর সাহেব তার ত্রিশ বছরের একনিষ্ঠ সাধনায় তনিমার সবটুকু শ্রদ্ধায় ভরা মানুষ । বাবা - মার কাছে কখনো শুনতে পায়নি ফুফুর দুর্ভাগ্যের বর্ণনা । কিন্তু আজ ঘটনাচক্রে সব জানার পর মনে হচ্ছে ফুফু তার দুর্ভাগ্যের শিকার সত্যি । কিন্তু সৌভাগ্যবতীও কম নয় । জাফরের সঙ্গে তার ঘর বাঁধা  হয়নি ঠিকই , কিন্তু জাফরের মনের মণিকোঠায় সুদীর্ঘ ত্রিশটা বছর ধরে পাকাপােক্ত আসন গেড়ে বসে আছে , জাফর সাহেবের জীবদ্দশা পর্যন্ত থাকবেও । 
জাফর সাহেব তনিমার নীরবতা লক্ষ্য করে বললেন স্নেহসিক্ত কণ্ঠে, 
-----তােমার অনেকটা সময় নিয়ে ফেলেছি ইমােশনাল হয়ে । আর দেরী করাবাে না ।

বাবার কষ্ঠ যেন ভাসে জাফর সাহেবের কন্ঠে । পূরবীর চেহারা নিয়ে জন্মে পূরবীর মায়াজালে সত্যি আমায় বেঁধে ফেলেছিলে এতক্ষণ । 
তনিমা সহজ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়  বলে 
-----মায়াজালই যদি হবে তবে তাতে জড়িয়ে পড়েছি আমিও । 
জাফর সাহেব বিস্ময়ের চাহনি ছুঁড়ে বলেন , 
-----গল্পের শেষ টানতে চাইছাে ? তনিমা হাসে ,
----- অমন অসীমের শেষ করে কার সাধ্য ? আমি শুধু বলতে চাইছি , পূরবী মায়াজাল সৃষ্টি করে চলে গেছে সত্যি , কিন্তু তার প্রতিচ্ছবি নিয়ে তার ভাইঝি এসেছে মায়া বাড়াতে এটাও সত্যি ।
ছোট্ট আদাব দিয়ে সাবলীল ভঙ্গিতে জুতাের হিলে আওয়াজ তুলে জাফর সাহেবের বিস্ময়ের ঘােরের মাঝেই তনিমা রুম থেকে বেরিয়ে আসে । জাফর সাহেব অসমাপ্ত আধ খাওয়া চুরুটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিয়ে ভাবে , সেদিনের সেই তাপসটা এমন একটা মিষ্টি মেয়ের বাপ হয়েছে , বেশ আছে সে । 

তনিমা বাড়ি ফেরার পথে রিকশায় বসে ভাবে কতকিছু । চাকরিটা হয়ে গেছে শুনে বাবা মা খুব খুশী হবেন প্রথমটায় । তারপর যখন শুনবেন , তখন কি ভাববেন , পূরবীর হতভাগ্যের জন্য দায়ী সেদিনের সেই জাফর তার দায়মুক্তি হিসেবে শিকদার বাড়ির আর এক মেয়েকে চাকরিটা দান করেছে না কি ভাববেন হতভাগী ফুফুর হুবহু চেহারার আদল পেয়ে তনিমার এই সৌভাগ্য দেখা দিয়েছে ?
এতদিনের সাধনার চাকরি প্রাপ্তির আনন্দের চেয়ে, ভাগ্যের এই দুঃখ সুখের হিসেবেটা  বড় গােলমেলে ঠেকে তনিমার ।

*************
ফাহমিদা রিআ 
**************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/111803/</link>
				<pubDate>Mon, 16 May 2022 18:44:38 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p># গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23প" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#প</a>্রতিচ্ছবি</p>
<p>ভোরের দিকে ঘুমটা ভেঙ্গে যেতেই তনিমার মনে পড়ে আজ সকাল আটটায় ওর একটা ইন্টারভিউ আছে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে । এম , এ , পরীক্ষার পর গত ছয় মাসে এই নিয়ে তার চতুর্থ ইন্টারভিউ । দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকারের সেও একজন । দীর্ঘ ছাত্রীজীবনের শেষে পড়াশােনার সার্টিফিকেট ক&#8217;খানা , নাগরিকত্বের সনদপত্র আর নিজের জীবন &#8211; বৃত্তান&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-111803"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/111803/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">6f5ccaf5dc0c50020d9e79ddc5fe614a</guid>
				<title># ছোট গল্প
 #যেতে যেতে 


পূবাকাশে সূর্যের উঠি উঠি ভাবটা তখনও কাটেনি পুরােপুরি । হাতে মার্জিনাল সময় নিয়ে নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে উঠে টিকিটের নাম্বার মিলাতে না মিলাতেই ট্রেনটা বিশাল দেহ নড়িয়ে চলতে শুরু করলাে । সাউন্ড বক্সে ভেসে এলাে সুরেলা কণ্ঠে যাত্রা শুরুর এনাউন্সমেন্ট । 

নির্ধারিত আসনে রিসিতাকে বসতে বলে বাংকারে ব্যাগ - ব্যাগেজ তুলে এতক্ষণে সুস্থির হয়ে বসলাে রতন রিসিতার পাশটিতে । 
এই শীতের সকালেও কেমন ঘেমে উঠেছে । টাইয়ের নটটা আলগা করতে করতে রিসিতার দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে - তােমার জন্যই তাে । 
রিসিতা ততক্ষণে হাতব্যাগটিকে কোলের উপর ফেলে গায়ের শালটা কাঁধের একপাশে টেনে হাফ ছেড়ে বসেছে । রতনের দিকে মৃদু চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করে 
-আমার জন্য মানে ? 
ছুটে চলা গাছ - গাছালির পানে জানালার কাঁচের শার্সি গলিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে রতন 
- মানে হয়রানি , সাতসকালে ছুটোছুটি ।
-বেশ তাে , পরের ষ্টেশনে নেমে ফিরে যেও তুমি । 
-আর তুমি ? 
-আমার জন্যেই আমার হয়রানি , ছুটোছুটি , সহজ হিসেব ।

রতন রিসিতার চোখে চোখ রেখে হেসে ফেলে এবার , বলে 
- হিসেব যদি এত সহজই হতাে তবে বছরে একটি বার নয় , প্রতিমাসেই এমনি হয়রানি আর ছুটোছুটি  করত সাধ জাগে।
-গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়া হচ্ছে বুঝি ?

পায়ের কাছে রাখা বেতের ঝুড়ি থেকে লম্বা ফ্লাস্কটা বের করে দুধসাদা প্লাষ্টিকের কাপ দুটোতে চা ঢালতে ঢালতে মৃদু হাসে রিসিতা ।
-যাত্রার অব্যাহতি যখন মিলছে না মশাই , দাম্পত্য কলহের অব্যাহতি দিয়ে গলাটা ভিজানােই বােধ হয় ভাল । 
-----যথা আজ্ঞা। 
বলে রতন হাত বাড়িয়ে চায়ের ধূমায়িত কাপ তুলে নেয়, রিসিতার হাতের দু’গাছি চুড়ির রিনরিনে সুরের সাথে । 

ততক্ষণে সূর্যের লাল আভায় চলন্ত ট্রেনের কামরায় অদ্ভুত এক আলাে - আঁধারির যাওয়া - আসা শুরু হয়েছে । সেই নরম আলােয় নতুন করে দেখে রতন রিসিতাকে। কাজল টানা চোখের পাতায় খুশির ঝিলিক , কপালের জ্বলজ্বলে টিপটিও হাসছে যেন । অনর্গল কথা বলে যাওয়া ঠোঁট দুখানায় লিপিষ্টিকের চকচকে ঔজ্জ্বল্য । চিকন পাড়ের ধানী রং শাড়ির আঁচল লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ের কাছটায় । কানে ঝোলানাে মিনা করা ঝুমকো জোড়া আর বুকের মাঝে লম্বা চেনে দোলানাে পান পাতার লকেট খানি রিসিতার কথা আর হাসির দমকে কেঁপে উঠছে বারবার ।
----- &quot; চা জুড়িয়ে যাচ্ছে যে । ”

ঝকঝকে দাঁতের সারি মেলে মােহনীয় হাসি ছুঁড়লো রিসিতা , রতন গলাটা ঝেড়ে নিল । একটু দুষ্টুমি করতে গিয়ে বাধা পেল । সামনে সীটে বা ভ্রলােকের দিকে চোখ পড়তেই সামলে নিল নিজেকে । চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে আবার তাকালাে সামনের লােকের পানে । কি অস্বস্তিকর ! এতক্ষণ কি তবে এতবেই তাকিয়ে তাকিয়ে দু&#039;জনার কথাবার্তা উপভোগ করছিল লোকটা ? দু&#039;জনাইবা হয় কি করে । কামরার হালকা আলােয় ভদ্রলােক রীতিমত সুক্ষ দৃষ্টিতে রিসিতাকেই পর্যবেক্ষণ করে চলেছে ।এ ক্ষেত্রে কি করা উচিত রতনের । রিসিতাও কি ব্যাপারটা খেয়াল করছে না ? চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে রিসিতার দিকে তাকাতেই সাহস করে হাসলাে রিসিতা। 
ফ্লাস্ক এবং কাপ দুটো ঝুড়িতে গুছিয়ে রেখে সরাসরি তাকালাে লােকটির দিকে । ভদ্রলােক যেন অপেক্ষায় ছিলেন। খানিকটা অস্বস্তি গলায় ঢেলে বললেন, 
-----এক্সকিউজ মি - আপনাকে ... 

রিসিতা কথা কেড়ে নিয়ে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বললাে ----- খুব চেনা লাগছে ? 
-----জী - মানে ঠিক মনে করতে পারছি না । 
-----মনে থাকার কথাও নয় অবশ্য । বছর তিনেক আগের কথা । চৌঠা অক্টোবৱ আপনারা আমাদের বাসায় এসেছিলেন । 
ভদ্রলােক চোখ সরু করে দু ভ্রু কুঁচকিয়ে আউড়ালেন একবার - চৌঠা অক্টোবর  ।
রিসিতা ভদ্রলােকের স্মরণশক্তির সাহায্যার্থে বলে চলেছে তখনও । 
----হ্যাঁ , তার দিন সাতেক পরে অর্থাৎ বার তারিখে কথানুযায়ী আবার এলেন , সংগে ... 
ভদ্রলােক আচমকা আহত স্বরে উচ্চারণ করলেন - -----থামুন , প্লিজ ! 
রিসিতা কন্ঠের সেই স্বাভাবিকতা নিয়েই বললাে - -----আমি সেদিনের সেই রিসিতা । ও হ্যাঁ
- আলাপ করিয়ে দেই,  আমার হাজবেন্ড রতন ।

ভদ্রলােকের চোখে তখন বিস্ময় নাকি বিরক্তি বােঝা গেল না চাহনীতে । রতনের বাড়ানাে হাতে হাত রেখে বললেন
---- - আমি জামিল । সস্ত্রীক রওয়ানা হয়েছি চাকরির বদলি অর্ডার রক্ষার্থে । 
রিসিতা এবং রতন দু&#039;জনেই এতক্ষণে খেয়াল করলাে , জামিলের পাশে বসা গল্পে বইয়ে গভীর মনােনিবেশ করা ভদ্রমহিলাকে । ক্লিপ আটকানাে ছােট রিডিং ল্যাম্পটা বইয়েন মলাটে গেঁথে স্বল্প আলােতেই দু&#039;চোখ পাতায় আটকে মিশে গেছে অন্য জগতে , দেখলেই বােঝা যায় । জামিল সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে মনােযােগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে তাকালাে রতনে দিকে । পূর্বের অস্বস্তিটুকু কাটাতেই হয়তবা জিজ্ঞেস করে
---- -তা , আপনারা মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছেন বুঝি ?
রতন হাসলাে।
----- - তা বলতে পারেন । বছরের এই একটিবার সংসারের বেড়ী খুলে দিন কয়েকের জন্য বেরিয়ে পড়ি চোখ মেলে দেশটাকে দেখতে । আক্ষরিক অর্থে মধূচন্দ্রিমা সেরেছি অনেক আগেই । কিন্তু ঘরছাড়লেই সেই আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে পদে পদেই।

রতন খেয়াল করে দেখে,রিসিতা পরিচয় করিয়ে দেবার পর থেকে জামিল আর একটিবার ও রিসিতার মুখপানে তাকিয়ে কোন কথা বলেননি এপর্যন্ত । রিসিতাও না । জামিলের কথা শুনে মনে হলাে , রিসিতাকে প্রথমটায় চিনে উঠতে পারেনি , রিসিতা কিন্তু চিনে ফেলেছে প্রথম দেখাতেই । যাই হােক- বছর তিনেক আগের চৌঠা অক্টোবর মানে রিসিতার জীবনে রতনের আগমনের আগের ঘটনা অর্থাৎ অতীত । আগমনের অতীতে রতনের কিইবা যায় - আসে । 
এমনকি রিসিতারও না । বরাবরের মত কানে এয়ারফোন লাগিয়ে ওয়াকম্যান শুনছে জানালায় চোখ রেখে - ওর প্রিয় গানগুলির সুরের দোলায় হারিয়ে যায় ভালবাসার ভুবনে । 
জামিল সিগারেটের প্যাকেট খুলতে গিয়ে কি মনে করে উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে যায় সামনের কোন ফাঁকা কামরাকে উদ্দেশ্য করে । রতন তাকায় চারপাশে । জামিলের স্ত্রী বই বন্ধ করে উপরে মালামালে চোখ বুলিয়ে জামিলের ফাঁকা সীটটায় হেলান দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে তন্দ্রায় চোখ দুটি খুঁজে রাখে ।

রিসিতা সেদিক পানে তাকিয়ে রতনকে ইশরায় বলে ফিসফিসিয়ে
---- -যদিও ব্যাপারটা অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মত - তবু বলি , উনাকে দেখে আমার কি মনে হচ্ছে জানাে - পৃথিবীর যাবতীয় রূপ - রঙ - রস থেকে চোখ ফিরিয়ে রয়েছেন উনি ।

রতন রিসিতার কোলের উপর রাখা ওয়াকম্যানের সুইচটা অফ করে দিয়ে এয়ারফোন দুটো কোন থেকে খুলে নিতে নিতে গলা নামিয়ে বলে
----- - আর আমার প্রেয়সী যে আমার কাছ থেকেই বেরিয়ে অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো শুরু করেছে। 

ওয়াকম্যানটা হাতব্যাগে পুরে , শাড়ির আঁচল সামলিয়ে শালটা গায়ে জড়াতে জড়াতে উঠে দাঁড়ায় রিসিতা
-----হাত - পা ধরে গেছে , চলাে হেটে আসি । 

পা টিপে টিপে ব্যালান্স বজায় রেখে ছুটন্ত ট্রেনে হাঁটতে ভারী মজা পায় রিসিতা । প্লেনে বা বাসে উঠতে এই কারণেই ওর ঘাের আপত্তি। ট্রেনে সারাটাক্ষন কেমন উপভোগ করতে করতে যাওয়া যায় । রতন যদি বলে ট্রেন জার্নিতে সময়ের অপচয় । রিসিতা তক্ষুণি এর যুক্তি খাড়া করে বলবে - অপচয় কোথায় ? সংসারের গণ্ডিটা এড়িয়ে ট্রেনে চেপে বসা মানেই তাে বেড়ানাে শুরু। সংসারের ছক বাঁধা নিয়মের ফাঁকে অফিসের কর্মব্যস্ততার ফাঁকের কয়টা মুহূর্তইবা কাটে এমন পাশাপাশি । এই যে হাতে হাত রেখে চলন্ত ট্রেনে হাঁটা , বুফে কারে মুখোমুখি বসে চোখ চোখে রাখা , পাশাপাশি সিটে গায়ে গা ছুঁয়ে বসে খুনসুটি করা - এগুলো তো বেড়ানোর বাড়তি বােনাস । 
রিসিতার যুক্তির কাছে রতন হার মানে । সত্যিকথা বলতে কি , বিয়ের তিনটে বছর হয়ে গেল কিন্তু প্রথমবারের অর্থাৎ বিয়ের দিন তিনেকের মাথায় মধুচন্দ্রিমার দিনগুলোই যেন বার বার ফিরে আসে। 

সেবার ঘােমটায় আড়াল করা নববধু রিসিতা- জাফলঙের সবুজের ছোঁয়ায় অন্যরকম হয়ে গেল কিছুক্ষণেই।  মাত্র দিন চারেক আগের লেখা অজানা - অচেনা লাজ বিধুর মেয়েটা এমন করে চেনার হবে , জানার হবে । বিস্ময়ের ঘাের লাগা চোখে রতন শুধু অনুভব করছিল রিসিতার উচ্ছলতা , চঞ্চলতা ।

পরের বার সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে খােলা গলায় &quot;তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রেণে&quot; রবীন্দ্রনাথের দু&#039;কলি রিসিতার কণ্ঠে সুর ছড়ালাে যখন , রতনের বহুবার দেখা সমুদ্রকে আরাে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।ফেরার পথে ফয়েজ লেকের গভীর কালাে পানি কি ভীষণ মগ্নতা এনে দিয়েছিল রিসিতার চোখে । 

পড়ন্ত সূর্যটা পানির ছায়ায় দেখতে দেখতে পাশে দাঁড়ানাে রতনের হাতটা আঁকড়ে গভীর - আবেগে বলেছে - এর পরের ম্যারেজ ডে তে আমরা কুয়াকাটায় যেতে পারি না ? সাগর মেহনায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত নাকি দারুন লাগে দেখতে ।
রিসিতার আঁকড়ে ধরা হাতে রতন পরম ভালবাসায় অন্য হাতটি রেখে বলেছে - নিশ্চয় যাব । ম্যারেজ ডে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কেন - তার আগেই যাৰ । 
রিসিতা এবার সরাসরি চোখ রেখেছে রতনের চোখে । বলেছে , উহ - আগে নয় । আমাদের জীবনের বিয়ের দিনটি যতবার আসবে ততবারই শুধু নতুন করে দেখবাে আমাদের অচেনা চার পাশ কে । সংসার ধর্ম আগে , বুঝলে মশাই ! অর্থ - সময় দুটোই তাে সংসার থেকে নিয়ে সঞ্চয় করতে হবে ।

তারপর, 

বুফে কারে জানালার পাশ ঘেঁষা খালি আসনগুলােয় চোখ বুলাতেই সৌজন্যতার হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়ালাে জামিল । রতন - রিসিতা কিছু বলবার আগেই সিগারেটে শেষ টান দিয়ে জানালা গলিয়ে এগিয়ে গেল নির্দিষ্ট কামরার দিকে । সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লাে রতন , অন্যটায় রিসিতাকে বসতে বলে । 
শীতের হিমেল হাওয়ায় রিসিতার খোঁপায় ছড়ানাে আলগা হয়ে যাওয়া চুলগুলি চােখে মুখে বারবারই ছড়িয়ে পড়ছে। ওদিক সামাল দিতে দিতে রিসিতা তাকালাে রতনের ঢিলে টাইয়ের নটের দিকে, আঙুল তুলে ইশারা করতেই রতন ত্বরিতেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বসলো।
ক্রীক কালার শার্টের সংগে মেরুন রঙা টাই , ধুপছাই রঙ স্যুট পরিহিত রতনের দিকে তাকিয়ে ভূমিকা ছাড়াই বললাে, 
----- পূর্বে যাহা দেখা যায় নাই অর্থাৎ অ - পূর্ব । ‘ &quot;একমিনিট&quot; বলেই মুচকি হেসে রতন পকেট থেকে চিরুণীটা বের করে ব্যাক ব্রাশ সেরে তাকালো রিসিতার৷ দিকে। 
----- এবার ? 
---- যাহা সকল সময় দেখা যায় - অতি সাধারণ ।

----- অর্থাৎবএখন তোমার হাজবেন্ড । 
------তৰ এতক্ষণ আবার কি ছিলে ?
-----প্রেমিক।
কারণ তোমার চোখের তারায় ছিলাম এতক্ষণ । প্রেমিকদের অবস্থান প্রেমিকাদের চোখের তারায় থাকে একতরফা । 
-----তা কতজনের চোখের তারায় এমন ছবি দেখেছেন মশাই ? 
------একজনের চোখে । তাও আবার সারা বছর নয় , বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে । যখন
আমাদের বিয়ের দিন আসে , মনে পড়ে অনেকগুলাে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের যােগফল এলাে , আকাশ ভরা কত জোছনা গড়িয়েছে এই যােগফলে , বুক ভরে নেয়া মুক্ত হাওয়ায় ভেসে বেড়ানাে রিসিতাকে দেখা প্রথম দিনটি মনে পড়ে । 
------খুব হয়েছে রােমান্টিকতা । এবার অন্য রকম একটা গল্প শােনো।
------গ-ল্প ? 
-----হ্যা , একজন মানুষের হিসেবের গল্প । 
তিন ভাই আর পাঁচ বােনের মধ্যে সবার ছােট যে বােনটি তার তখন অনার্স ফাইন্যালের দু&#039;মাস বাকি । নােটপত্র গুছিয়ে হল থেকে বাড়িতে এসে হাজির , মন দিয়ে পড়বে বলে । পড়ার টেবিলে মনটা যখন প্রায় গেঁথেই ফেলেছিল , মেঝ ভাবী বলে গেলেন ফিসফিসিয়ে খবরটা - ননদিনী ড্রয়িং রুমে নতুন হাওয়া বইছে । খুব ভাল প্রপােজাল এসেছে । সরকারী চাকুরে ছেলে - কিছুদিন পর পর বদলি , কোয়ার্টার , আয়া , বাবুর্চি , ড্রাইবার - সব ফ্রি ।

মেয়েটি নােট বন্ধ করে ভাবীর চোখে তাকায় 
----- বলে দাও আমি রাজি , ঘুরতে আমার খুব ভাল লাগে । 
ভাবী বন্ধ নােটটি খুলে দিয়ে বলেন
----- সামনে চার তারিখে ওরা দেখতে আসবে । পছন্দ হলে আকদ- এর দিন ঠিক হবে । এখন তুলে নিবে না , পরীক্ষা দিতে হবে । অতএব , ননদিনী মন দাও পড়ায় ।ফেলটেল মারলে শ্বশুর বাড়ীতে প্রেষ্টিজের ব্যাপার । হা হা হা.....

নির্দিষ্ট তারিখে পড়ার টেবিলে কান্টের থিউরির বিশ্লেষণ নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিল যখন মেয়েটি , মেঝ ভাবী এসে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে । ওয়্যারড্রোব থেকে আকাশ নীল শাড়িটা মুখের কাছটিতে ধরে বললেন - খুব মানাবে । পরা হলে আমায় ডেকো । 
মেয়েটি নিজের মত করে কাজল আঁকলাে চোখে , কপালে পরলাে টিপ , শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে রান্নাঘরে ভাবীর হুলস্থুল কাজের মধ্যে হাজির । ভাবীর চোখ তাে ছানা বড়া । 
------সে কি , একেবারে রেডি যে । খুব তাড়া ? 

ভাবী সংগে করে নিয়ে গিয়ে সামনের সােফাটায় বসিয়ে দিলেন । তিনজনের ছয়টি চোখ নিবদ্ধ হলাে মেয়েটি মুখমন্ডলে । পাত্র , পাত্রের ফুপা এবং মামা । দু&#039;চারটে কথার এক পর্যায়ে পত্রের মামা ছােট লাল রঙা বক্সটি পকেট থেকে সেন্টার টেবিলে রেখে বললেন, 
----- আকদ্ টা তবে সেরে ফেলা যাক আজই । পরীক্ষার আগে তাে আর অনুষ্ঠান হচ্ছে না ।

মেয়েটির বাবা এবং বড় ভাই বাধ সাধলেন । এভাবে হয় কি করে । পছন্দ হয়ে থাকলে কথা চুড়ান্ত হতে পারে। আকদ্ - এর জন্য অন্ততঃপক্ষে সাতটি দিন তাে সময় দরকার আমার । 
পাত্র স্বয়ং সেন্টার টেবিলে রাখা বাক্সটি হাতে তুলে নিয়ে জবাব দিল - বেশ তাহলে তাই হােক । 
আসছে বার তারিখ দিন - ক্ষণ পাকা হলাে।মেয়েটির পড়া মাথায় উঠলো । আত্মীয় - স্বজন , বন্ধু - বান্ধব , পাড়া - প্রতিবেশীরা ঘিরে রইল মেয়েটিকে । 
গায়ে হলুদের রাতে হাতে রাখী বাঁধতে বাঁধতে ছােট ভাৰী সাবধান করলেন, 
----- কাল রাতে তোমার বর খুলবে এটা । তার আগে খুলে ফেলাে না যেন । 

হাতে মেহেদীর নক্সা আর &#039; রাখী বেঁধে বিয়ের পাটিতে বসে বসেই জনা ত্রিশেক বর যাত্রীসহ বর আগমনীর সংবাদ পেল মেয়েটি ।

হৈ - চৈ করে মেয়েরা সবাই বিয়ের কনে সাজিয়ে ফেললাে মেয়েটিকে । খাবার রেডি।
বরযাত্রীদের কেউ আসছে না টেবিলে । ছেলেরাও ডাকতে গিয়ে আটকা পড়েছে । বাবা তদারকি ছেড়ে নিজেই চলে এলেন মজলিশে । কাজী সাহেবকে ঘিরে ছােটখাট একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছে ।

বিষয়টাও স্বাভাবিক । মােহরানার পরিমাণ কত হবে আর কত হবে না - এ নিয়ে দু’পক্ষে মত বিরােধ । 
বাবা বললেন, 
- ঠিক আছে , ওসব পরে হবে । খাবার রেডি , আসুন , আগে খাওয়া - দাওয়ার ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলা যাক । 
বর দাঁড়িয়ে জবাব দিল - খাওয়া - দাওয়ার পর এ সবের ফয়সালা হয় নাকি কখনো ? আগে কথা ঠিক না হলে খাওয়া যাবে না । আমাদের অংকে আপনারা রাজি কিনা বলুন ।
মােহরানার দরদামের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক , কিন্তু পাত্র স্বয়ং হিসেবের কঠগড়ায়।এটা কি স্বাভাবিক ? 
বাবা নীরব হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ । তারপর দু&#039;হাত তুলে সবাইকে থামতে ইশারা করে বললেন-,
-----আমি অনুরােধ করছি - আপনারা খাবার টেবিলে অাসুন । কথা দিচ্ছি , আপনাদের হিসেবের ক্ষতি আমরা করবাে না । খাবার পরে এ নিয়ে আর কোন কথা হবে না । 
সুষ্ঠুভাবে খাবার পালা চুকলাে যখন , বাবা মজলিশে দাঁড়িয়ে বরযাত্রীদের সামনে দু&#039;হাত জোড় করে বললেন - আমাকে মাফ করবেন । মেয়ের বিয়ে আমি দেব না । 

ইস্পাত কঠোর বাবা সেই যে নিজের ঘরে গিয়ে বসলেন খাটে , আর নামানাে গেল না কোন কিছুতেই । বড় ভাই , মেঝ ভাই বুঝালেন , স্বজনরা বুঝালেন - আপনার একটা জেদের জন্য মেয়টার ভাগ্য পােড়াবেন না । 
বাবা হাসলেন বেদনাবিধুর । শান্ত , ধীর - স্থির কণ্ঠে বললেন, 
------ মেয়েটা আমার অনাদরের নয় । পােড়াবাে না বলেইতাে ঐ ছেলের হাতে জ্বলতে দিতে পারলাম না । মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়নি , সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়েছি । এ নিয়ে আর কোন কথা বলে লাভ হবে না । 

আর মেয়েটি নিজের হাতের রাখী খুলে ফেললাে নিজেই । বেসিনের আয়নায় নিজের বধূ সাজ দেখলাে , ঠান্ডা পানির ঝাপটায় একে একে ধুয়ে ফেললাে সমস্ত সজ্জা । মস্ত খোঁপায় জড়ানাে ফুলগুলি একটা একটা করে ছিড়লাে । 

তারপর নােটপত্র আর কাপড় চোপড় ব্যাগে গুছিয়ে পায়ে পায়ে এগেলাে বাবার ঘরের দিকে। পাশে খবরের কাগজটা পড়ে রয়েছে , বাবা শূন্যদৃষ্টি মেলে জানালায় চেয়ে । মাথায় হাত রেখে ডাকলাে মেয়েটি,
----- - বাবা বসবাে তােমার কাছে একটুখানি ?
মাথা থেকে হাতটা তুলে নিয়ে নীরবেই বসালেন বাবা পাশে । 
------বাবা , আমার পরীক্ষা আর মাত্র ক&#039;টা দিন । বাসায় ভাল করে পড়বাে বলে এসেছিলাম কিন্ত হচ্ছে না । আমি কালই হলে চলে যেতে চাই । সবার সাথে কমপেয়ার করেই বােধ হয় ভাল হবে পড়াটা ।

বাবা ব্যাস্ত হলেন।
----- এসে না বললি পরীক্ষার দু&#039;দিন আগে যাবি এবার ? -
----- বলেছিলাম তাে । কিন্তু পড়া এগােচ্ছে না যে , তুমি আমাকে কিছু টাকা দাও বাবা- কাল সকালের ট্রেনেই রওয়ানা হবো, সব গুছিয়ে ফেলেছি । -

মেয়ের স্বাভাবিকতায় বুকের পাথরটা হাল্কা হয় অনেকখানি । শুধু ভেতরে খচখচ করতে থাকে কাঁটাটা । মেয়ের মতটা পর্যন্ত নেয়া হলাে না জেদের বশে । নিজের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে অপরাধী হয়ে রইলেন না তাে মেয়ের কাছে? 

----- -বাবা কিছু বলছে না যে । 
মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন বাবা অন্যকথা,
-----আমার উপর তাের কি খুব রাগ হচ্ছে মা ?
---- -কেন বাবা ? 
মাথায় হাত রেখে উঠে দাঁড়ান বাবা
------ সব ব্যাপারে এত স্বাভাবিক থাকিস কি করে তুই ? আমার মতামত তাের ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দিলাম যে । 
------না বাবা , এমন করে এখনই দায় ঘাড়ে নিতে বলাে না । জীবনটা আমার সত্যি কিন্তু ওটিকে তুমি সাজিয়ে না দিলে আমি বুঝবাে না যে কিছুই । ঠিকই তাে হয়েছে বাবা । ঝরে যাবে জেনে কি তােমার ফুল তুমি এমন কোথাও রাখবে , নাকি সেখানেই দেখে - শুনে রাখবে , যেখানে সতেজ থাকবে ।

বাবার দু&#039;চোখ ঝাপসা হলাে বটে , আবেগে অধীর হলেন না । শুধু বললেন,
----- কাল সকালের ট্রেনে আমিই তােকে রাখতে যাব । 

টানা দু&#039;মাস ধরে অনার্স ফাইন্যাল শেষে মেয়েটি দেখে বাবা হল গেটে দাঁড়িয়ে ।
----- -বাবা তুমি নিতে এসেছাে ? বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, 
------ নিতে আসিনি । তবে তুই যদি যেতে চাস , অবশ্যই নিতে এসেছি।
----- -ব্যাপারটা কি বাবা ব্যাপারটা কি বাবা ? 
------খুব সুন্দর । ডিপার্টমেন্টে তারা তােকে দেখেছে , জেনেছে । এখন তাের মতামত পেলে , .. 

গম্ভীর হয়ে যায় মেয়েটি 
------ বাবা এ ক&#039;মাসে তুমি কি হন্যে হয়ে পাত্র খুঁজে বেড়িয়েছ বাবা ? 
------হন্যে হবাে কেন রে ? আমার ফুলের মত মেয়ে , সৌরভ চিনেই তাে ওরা এসেছে । তুই তাে বলেছিলি , আমার ফুলটাকে সতেজ রাখার ঠাঁই আমাকেই খুঁজতে হবে ।
----- -ঠাই কি তােমার সঠিক মনে হয়েছে বাবা ? -নিশ্চয় ।
----- -আমায় কবে নিয়ে যেতে চাও আমি সেভাবেই তৈরি থাকবাে বাবা । 

রতন গালে হাত দিয়ে রিসিতার একটানা কথা শুনছিল মুগ্ধ হয়ে । রিসিতার হাত আপন হাতের মুঠোয় তুলে নেয় এবার । গভীর আবেগে বলে , 
------তারপর বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের করুণ সুরের মূর্ছনায় মেয়েটির বাবা প্রিয় ফুলটি আমার হাতে তুলেদিলেন । তাই তাে ভাবছি এ তিন বছরে এতটুকু ম্লান হয়ে যায়নি তাে ? দেখি দেখি , রতন হাত বাড়িয়ে রিসিতার চিবুক তুলে ধরার পূর্ব মুহূর্তেই ওয়েটার এসে স্থান - কাল মনে করিয়ে দিয়ে ব্যবসায়িক কণ্ঠে শুধালাে,-- চা দেব ? 

রিসিতা রতনের চোখের তারায় চোখ স্থির করে মুখ টিপে হেসে জবাব দিল -- না &#039; ।

************</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/111165/</link>
				<pubDate>Sun, 15 May 2022 15:03:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p># ছোট গল্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23য" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#য</a>েতে যেতে </p>
<p>পূবাকাশে সূর্যের উঠি উঠি ভাবটা তখনও কাটেনি পুরােপুরি । হাতে মার্জিনাল সময় নিয়ে নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে উঠে টিকিটের নাম্বার মিলাতে না মিলাতেই ট্রেনটা বিশাল দেহ নড়িয়ে চলতে শুরু করলাে । সাউন্ড বক্সে ভেসে এলাে সুরেলা কণ্ঠে যাত্রা শুরুর এনাউন্সমেন্ট । </p>
<p>নির্ধারিত আসনে রিসিত&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-111165"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/111165/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">a089d410dc45ce44ad181ac352dd9868</guid>
				<title>﻿
 #উত্তরণ
 #ফাহমিদা রিআ


বড় গেটের সামনে স্কুটার থামতেই সেমন্তি অবাক চোখে চেয়ে দেখলো সমস্ত বাড়ি জুড়ে সাজ সাজ রব। ডেকোরেশানের লোকেরা গেট সাজাতে ব্যস্ত। বাড়ির দেয়াল জুড়ে রঙ-বেরঙের আলোর ঝিকিমিকি। সন্ধ্যার আঁধার নামেনি তখনো। শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় বাতিগুলো ফড়–ৎ ফুড়–ৎ জ্বলছে আর নিভছে।
- সেকি সেমন্তি আপু, চলো, দাঁড়িয়ে রইলে যে। একে তো ট্রেন দু’ঘন্টা লেট, বাড়ির লোকজন চিন্তায় পড়ে গেছে এতোক্ষণে।
রন্তুর কথার জবাব না দিয়ে সামনের গেটে পা বাড়ালো সেমন্তি। কিন্তু গেট না খুলে দাঁড়িয়ে পড়লো আবার । রন্তু ভাড়া মিটিয়ে একহাতে সুটকেস আর অন্যহাতে ট্যাভেল ব্যাগটা ঝুলিয়ে সেমন্তির নীরব দাঁড়ানো দেখে হেসে ফেললো - লজ্জাবতী লতা হলে যে সেমন্তি আপু। শ্বশুরবাড়ি নয়তো এটা। বড় আপুর বাড়ি তো কনেরই বাড়ি। কাল যখন বড় ভাইয়ার বাড়ি যাবে ঘোমটা মুড়ি দিয়ে, তখন এমন গুটি শুটি মেরে থেকো। এখন চলো তো প্লিজ। 
সেমন্তি শাড়ির আঁচল টেনে রন্তুর পিছে পিছে গেট ঠেলে ঢুকতেই ব্যস্ত ভঙ্গিমায় চাঁপা এগিয়ে এলো।
- এলে তাহলে, এদিকে আমরা বাড়ি সুদ্ধ লোক চিন্তায় অস্থির। রন্তু গতকাল ফোনে জানালো দু’টো নাগাদ পৌঁছুবে, কিন্তু এখন বেলা যায় যায়। সন্ধ্যার পরেই গায়ে হলুদ। বড় ভাবী তো ডালা নিয়ে এসে হাজির কোন বিকেলে। কনে এখনো এসে পৌঁছায়নি কেন। সবার কাছে জবাবদিহি করতে করতে বড় আপুর জান শেষ। ছেলে পক্ষ তো। মুডই আলাদা।
বড় আপু ওপর থেকে সিড়িঁর মুখে ওদের দেখতে পেয়ে নেমে এলেন তড়ি ঘড়ি। রন্তুকে তার পাশের ঘরটি দেখিয়ে বললেন - লাগেজ গুলো ও ঘরে রাখ, সেমন্তির জন্য সারাদিন ধরে সাজিয়েছে চাঁপা। আর চাঁপা, তুই হলুদের ওদিকটা দেখ। আমি ততক্ষণে সেমন্তির চা নাস্তার ব্যবস্থা করি। সময় তো বেশি নেই। একটু জিরিয়ে নিয়ে হলুদের পাটিতে বসতে হবে। এজন্যই বলছিলাম, ক’দিন আগেই চলে আয়। তা রন্তুও আনতে গিয়ে আটকা পড়লো। 
রন্তু এসে দাঁড়িয়েছে ততোক্ষণে লাগেজ রেখে। বললো, কৈফিয়তের সুরে - আগে আসার উপায় আছে ? আমি যাবার পর থেকেই শুরু হয়েছে পরিবহন ধর্মঘট। এবেলা-ওবেলা মিটমাট হবে-হচ্ছে করে করে শেষ পর্যন্ত গতকাল সন্ধ্যায় ট্রেনে চেপেছি। এঘাট ওঘাট করে যে অবশেষে কনে পৌছে দিতে পেরেছি, এজন্য আমাকে ধন্যবাদ দাও। কি বলো সেমন্তি আপু। এখন টায়ার্ড কেন, দু’একবার মূর্ছা গেলেও ক্ষতি নেই। পানির ঝাপটা ছিটিয়ে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে অ্যাটে- তো করতে পারছো। 
রন্তুর দিকে তাকিয়ে সেমন্তি হেসে ফেললো। বড় আপু নিজেও হাসলেন আঁচল চাপা দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে তাড়া দিলেন। 
- সেমন্তিকে আনার ফাঁকে আর ধর্মঘটের ছুতোয় ক’দিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে খুব তো ঘুরলি, এবার বক বক না করে কাজে হাত লাগা। সন্তু একা কি করছে না করছে, দেখ ওদিকটায়। 
বড় ভাবী দেখতে না দেখতে ফুলপরীর মতো সাজিয়ে ফেললো সেমন্তিকে। চওড়া পাড়ের বাসন্তি রাঙা আটপৌরে করে জড়ানো শাড়ি আর হলুদ- লালে মেশানো ফুলের গহনায় কী যে মায়াময় লাগছে ! সেমন্তির টুকটুকে রাঙা ঠোটজোড়া মৃদু কাঁপন তুলছে গভীর ভাবাবেগের অজানা শিহরণে।
জ্ঞান হবার পর চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে ঘটনার ঘনঘটায় প্রথম দেখা হলেও এই যৌথ পরিবারেই জন্মেছিল সেমন্তি। বছর চারেক যখন ওর বয়স, রোড এক্সিডেন্টে মারা যান বাবা-মা। নানা বাড়িতেই মানুষ হয়েছে সেই থেকে। চাচা-চাচী যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতি বছর ছোট ভাইয়ের একমাত্র চিহ্ন সেমন্তিকে দেখতে যেতেন। তাদের মৃত্যুর পর আপন আপন বলয়ে ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত থেকেছে। দুরত্ব বেড়েছে মনেরও। এক সময় প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সবাই সেমন্তি নামে তরফদার বাড়ির দলছুট মেয়েটির কথা।
আঞ্চলিক জটিলতায় রূপক হঠাৎ জড়িয়ে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে একটা ভুলের আবর্তে। হূলিয়া জারির আতংকের তাড়নায় দিক বিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে পালিয়ে বেড়ায় এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত। এমনি ভাবেই বড় আপু একদিন হাতে ধরিয়ে দিলেন দেশের সীমান্ত এলাকার ঠিকানা। আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হতেও পারে। শহরের ব্যস্ততা, কোলাহল ছাড়িয়ে ঘুরে ঘুরে পৌঁছুলো রূপক ছোট নিরিবিলি শহরটায়। ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগের স্বল্পপরিসরে খান কয়েক কাপড় আর পায়ের চটি জোড়া সম্বল করে ঠিকানা মিলিয়ে পুরনো নোনা খসেপড়া বাড়ির দরজায় ঝোলানো শিকলে নাড়া দিল রূপক ঠুক, ঠুক, ঠুক। ভেতর থেকে মেয়েলি কন্ঠে সাড়া এলো- কে ?
- আমি তরফদার বাড়ি থেকে এসেছি।
খিড়কি খোলার সঙ্গে সঙ্গে কৌতুহলি চোখে আগন্তুককে না চিনেই চেচিয়ে উঠলো মেয়েটি -
- তরফদার বাড়ি ? মানে, আপনি কি দীপক ভাই ?
- দীপককে খুব চেন বুঝি ?
লজ্জা পেলো মেয়েটি - না, ঠিক চিনি না, তবে ও বাড়ির সবার নাম জানি না তো।    
- শুধু বড় ছেলে দীপকের নামটাই জানো, এই তো। আমি সেই দীপকের ছোট রূপক। আর আমার ভুল না হয়ে থাকলে তুমি ছোট চাচার মেয়ে সেমন্তি অবশ্যই।
বড় বড় চোখে মাথা দোলালো সেমন্তি।
হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি নিজের হাতে নিতে নিতে বললো - ভেতরে আসেন। টানা লম্বা বারান্দায় চেয়ার টেনে দিয়ে বসতে বলে চেঁচিয়ে ডাকলো - নানী, তরফদার বাড়ির মেহমান এসেছেন।
ঘরের দরজা ঠেলে মোটা কাঁচের চশমা চোখে এগিয়ে এলেন বৃদ্ধা। সামনের চেয়ারটায় বসে রূপকের সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বললেন - বড় তরফদারের ছেলে বুঝি ?
- জ্বী, লেখাপড়া শেষ তো, ঘুরতে বেরিয়েছি সারাদেশ।
- ভালো করেছো এসে। সেমন্তি তো মাঝেমধ্যেই জেদ করে আজকাল পিতৃপুরুষের ভিটে দেখবে। আপন বংশের সবাইকে দেখবে। কিন্তু কে নিয়ে যাবে বলো। আমি তো তিন কাল যাওয়া মানুষ। তোমার নানাও চোখে দেখে না বছর কয়েক থেকে। একমাত্র ছেলে, মানে সেমন্তির মামা বছর দুই হলো দেশের বাইরে। সেমন্তি মেয়ে, যার তার সাথে পাঠাতেও পারি না। শুধু বলতাম - বংশের টানে ওরাই আসবে রে তোকে দেখতে। তাই তো হল রে সেমন্তি।
- তোর মামার ঘরটা খুলে রফিকের মাকে দিয়ে সাফ সুতরো কর আগে। কতটা পথ ভেঙে এসেছে, পরে গল্প হবে। আমি রান্না ঘরটা দেখছি।
সেমন্তিকে অনুসরণ করে উঠান পেরিয়ে দক্ষিণের উঁচু বারান্দা ছাওয়া ঘরখানায় ঢুকলো রূপক। জানলা দুটো খুলে দিতেই এক ঝলক আলো সারা ঘর ভরিয়ে দিলো। আলমারি খুলে বালিশের কভার আর বেডশিটটা পাল্টে রফিকের মাকে বললো - কলতলাটা পরিস্কার করে বালতি ভরে রাখো। তারপর রূপকের দিকে চেয়ে তাড়া দিল -  আনেক কথা শুনবো রূপক ভাই। তার আগে ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে জার্নির ধকলটা কাটান তাড়াতাড়ি। 
কোমরে ওড়না জড়াতে জড়াতে উঁচু বারান্দার দু’সিঁড়ি লাফিয়ে চলে গেল সেমন্তি। যেন এবারি প্রথম দেখা নয়। কি ভীষণ সাবলীল আর সহজ। যাক, একেবারে নতুন পরিবেশে দিনগুলো নিয়ে যতটা আশংকা করেছিল রূপক, এখন মনে হচ্ছে ভালই কাটবে। 
বাপ-মা হারা মেয়েটি নানা-নানীর অনেক আদরে মানুষ হলেও ভারি চটপটে, হাসি খুশি হয়েছে। সবে স্কুল পেরিয়ে কলেজে পা রেখেছে, অথচ এরই মধ্যে বাড়ি সামলানোর গিন্নীপনাও রপ্ত করে নিয়েছে চমৎকার। 
কাকডাকা ভোরে সেমন্তির কোলাহলে দিনের শুরু। পিঠের ওপর বাসি বেনী দুলিয়ে বাড়িময় ব্যস্ততা তার। হাঁস মুরগির ঘরে ছোট্ট দোরের কাঠটুকরা সরিয়ে ডাকে - আয় আয়, তই তই, তি তি। গোয়াল ঘরের খড়-বিচালি রাখাল ছেলে এত বড় করে কাটলো কেন ? খানিক গজগজ করে কালো ছাগলটার শরীর ঘেসে থাকা ছানাটিকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁড়ায় রান্না ঘরের সামনে। গোলট্রেতে কাপ-পিরিচ সাজিয়ে রফিকের মা সাত তাড়াতাড়ি লম্বা বারান্দার কোনে রাখা টেবিলটায় হাজির হয় বাষ্পায়িত কেটলি নিয়ে। 
নানা-নানী তসবী হাতে ততক্ষণে হাজির সেমন্তির খবরদারির ভয়ে। কোল থেকে ছাগল ছানাকে নামাতেই তিড়িং তিড়িং লাফিয়ে পৌঁছে যায় ছানাটি মায়ের ওমে। সেদিকে তাকিয়ে সেমন্তি চায়ের কাপে টুং-টাং শব্দ তোলে। 
নানা-নানীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে নিজেও চুমুক দেয় সিঁড়িতে পা দুলিয়ে। রফিকের মাকে নাস্তার পাট বলে দিতে দিতে কোলের ওপর বইটি মেলে মৃদু দুলে দুলে ক্লাশের পড়া সারে। প্রাণবন্ত সকাল হওয়া অনুভব করে রূপক আলস্যিভরা আধো জাগরণে জানালার পাশটিতে শুয়ে শুয়েই। অবাক বিস্ময়ে ভাবে জগৎ সংসারে একা হয়েও মেয়েটি কেমন ভরিয়ে রেখেছে নিজেকে। 
রাতের খাওয়া দাওয়া পাট চুকিয়ে নানীর পানটা সাজিয়ে দিতে দিতে কিংবা নানার অম্বলের ত্রিফলা ভিজাতে ভিজাতে রূপকের কাছে তরফদার বাড়ির গল্প  শুনেছে গভীর আগ্রহ নিয়ে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছে সবাইকে। নিজ কল্পনায় গড়েছে এক এক করে চেহারা গুলোও। 
সপ্তাহ দু’য়েকের মাথায় বড় আপুর চিঠি পেয়ে চিন্তা মুক্ত হল রূপক। ঝামেলা মিটে গেছে। সত্যিকার দোষীরা ধরা পড়েছে, আর ভয় নেই। রূপকের চাকরীর ইন্টারভিউ কার্ড এসেছে, সামনেই তারিখ। কোন ভাবেই মিস করা ঠিক হবে না। তাগাদা দিয়ে বড় আপু যেতে লিখেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। নানা সব শুনে বললেন - এতদিন পর নতুন করে যোগাযোগ যখন করলে ভাই, মাঝে মাঝে চলে এসো। আর একটা দায়িত্বও ভেবো। তোমাদের বাবা-মা থাকলে তারাই ভাবতেন। বলছিলাম সেমন্তির কথা। আমরা বুড়ো বুড়ি মানুষ। কখন কি হয়ে যায়। তোমরা ভাই বোনেরা সেমন্তির জন্য পাত্রটাত্র খুঁজো। আমরাও চেষ্টায় আছি। সুপাত্রস্থ করতে পারলে নিশ্চিন্তে মরতে পারতাম। নইলে যে বোঝা মাথায়, মরেও সুখ নেই। রূপক আশ্বস্ত করে বলে - ভাববেন না নানা, আমাদের সংসারের সব চিন্তার ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বড় আপু ঘোরেন। সেই ঝুড়িতে এই আর্জিটা পৌছে দিলেই হলো। আমাদের বাড়ি থেকে বড় আপুর বাড়ি দশ মিনিটের পথ। বাবা-মার অভাব বড় আপুর জন্যই টের পাই না আমরা। একটুও ভাববেন না নানা, আপনারা শুধু নন, সেমন্তির অনেক স্বজন আছে। আর যোগাযোগের ব্যাপারটা যখন এতদিন পরে চালু হয়েছেই একবার, আর বন্ধ হবে না কথা দিচ্ছি। সেমন্তি ওপাশ থেকে ফোড়ন কাটে - রূপক ভাই, আপনি কি কথা দিলে কথা রাখেন ? 
রূপক হেসে বলে - পরীক্ষা নিতে চাইলে কথা আরো নিতে পারো।
অকারণে লজ্জা পেয়ে ওড়নার আঁচল খুটে সেমন্তি। ধীরে ধীরে বলে - পরীক্ষায় ফেল মারলে ? 
মাথা ঝাঁকায় রূপক - বেশ তো, শাস্তিটা তুমি দিও। কিন্তু পাশ করলে ...।
- কি ?..
- শুনলে না, নানার বোঝা নামানোর অর্জি পেশ করবো বড় আপুর ঝুড়িতে। 
লজ্জায় লাল নীল হয়ে যায় সেমন্তি। 
রূপক ভাবতেই পারেনি, বড় আপুর তদবিরটা এত জোরালো হয়ে আছে আগে থেকেই। এর আগে তিন চারটে ইন্টারভিউ যেমন দিতে যেতে হয়, তেমনি গেছে। চাকরি পাবার নিশ্চয়তা আছে কি নেই, সেটা ভাবারও ফুরসত রাখেনি। গত কিছুদিন ধরে ছুটে বেড়ানো আর মানসিক টেনশানে তেমন করে বই টইও দেখা হয়নি। একশ টাকার ব্যাংক ড্রাফট আর ফাইলভর্তি সার্টিফিকেটগুলোর পয়সা খরচ করা ফটোকপির দাবিতে ইন্টারভিউ কার্ড যেমন প্রতিবার আসে, এবারও এসেছে। মূল কাগজপত্র আর যতেœ ইস্ত্রি করা প্যান্ট-শার্ট পরে ফুলবাবুটি সেজে বের হবার মুখে বড় ভাবী প্রতিবারের মত দোয়া ফুঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন - আমার মন বলছে, এবার চাকরিটা হবেই।
দিন বিশেক পরে বড় আপুর ফোন পেয়েই প্রথম জানতে পারে রূপক, চাকরিটা তার অবধারিত। মিষ্টিমুখ করানোর কাজটাও বড় আপু সেরেছে। অবশ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে রূপক জয়েন করে আসার পর। বড্ড আমুদে আর ব্যতিব্যস্ত মানুষ বড় আপু। কাজ পাগল দুলাভাইকে বিরক্ত না করে নিজেই সব রকমের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে এদিক ওদিক ছুটছেন তো ছুটছেনই। নিজের অবসর বলতে কিছ ুনেই। 
সেদিন বিকেল বেলা বাড়িতে হাজির হয়েই হাঁক ডাক রূপককে।
- কাল ভোরের ট্রেনের দু’টো টিকিট নিয়ে আয়, আর একটা কাগজে ভাল করে ম্যাপ এঁকে দিবি সেমন্তির নানা বাড়ির, যেন হয়রান হতে না হয়।
রূপক কপালে চোখ তুলে বলে - কালই যাচ্ছো ? সঙ্গে কাকে নিচ্ছ ? 
- চাঁপাকে। পরীক্ষার পর থেকে বসে আছে। 
- হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে যে। অবশ্য সেমন্তি তো হা করে বসে বসে আছে তোমার পথ চেয়ে।
- থাকবে না, রক্তের টান। আপন চাচাতো বোন, অথচ কেমন যে ছন্নছাড়া হয়ে দু’দিকে ছিটকে রইলাম আমরা। তোর কাছে ওর কথা শুনার পর বড্ডো অস্থির লাগছে মেয়েটার জন্য। 
তিন দিনের জায়গায় পুরো সপ্তাহ কাটিয়ে বড় আপু ফিরলেন চাঁপাকে নিয়ে। সন্ধ্যেবেলা দুলাভাই সহ মিষ্টির প্যাকেট হাতে বেশ ঘটা করেই এবাড়িতে এলেন বড় আপু। রূপক দরজা খুলতেই হৈ হৈ করে উঠলেন দুলাভাই - অভিনন্দন শালা বাবু। 
মিষ্টির প্যাকেটের দিকে চোখ বুলিয়ে হাসতে হাসতে বললো রূপক - চাকরি পাবার পর এনিয়ে অন্তত দশবার দেখা হয়েছে দুলাভাই আপনার সাথে। আজ নতুন করে অভিনন্দন যে। অবশ্য আপত্তি নেই, সঙ্গে এমন মিষ্টির প্যাকেট থাকলে। 
- বাড়ির মুরব্বিদের ডাকো, মিষ্টির ব্যপারটা খোলাসা করি।
- মানে ?
বড় আপু রূপকের পাশে এসে বসলেন। ভুমিকা ছাড়াই খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন - সেমন্তিকে নিশ্চয়ই খারাপ লাগেনি তোর। এ কটা দিনে কেমন যে মায়া পড়ে গেছে ওর , ওপর। ভারি মিষ্টিও হয়েছে দেখতে। চাকরি-বাকরি হলো, এবার তো তোর গাঁটছড়া বাঁধার পালা। যদি তোর অপত্তি না থাকে সেমন্তিকেই পছন্দ করে এলাম।
রূপক এমন অকল্পনীয় প্রস্তাবে এমনই ’থ’ হয়ে গেল যে, কি বলবে কিছুই খুজে পেল না।
বড় ভাই-ভাবী আসতেই  কী সব হৈচৈ শুরু করলেন। রূপক কিছুই যেন শুনতে পেলো না, দু’কান জুড়ে বড় আপুর প্রশ্নই বাজতে লাগলো - সেমন্তিকে তোর খারাপ লাগেনি নিশ্চয়ই ?
বড় আপুর হঠাৎ ঘটকালির ব্যাপার জানা গেল আদ্যোপান্ত শুনে। চাঁপাকে নিয়ে যেদিন পৌঁছুলেন সেমন্তির নানাবাড়িতে, সেদিন বাড়িজুড়ে মহা শোরগোল। পাশের গ্রামের চালের আড়তদারের একমাত্র পুত্র স্বয়ং দেখতে এসেছে সেমন্তিকে। ঘরভরা লোকের সামনে অনভ্যস্ত শাড়িতে আঁচল জড়িয়ে জুবুথুবু হয়ে নত মুখে বসে রয়েছে সেমন্তি। 
মেয়ে পছন্দ হবার পর নানার সঙ্গে আলোচনায় বসলো ছেলে। বড় আপুকেও ডাকলেন নানা। ছেলেকে দেখে রীতিমত আঁৎকে উঠলেন বড় আপু। তেল জবজবে চুলগুলো কিছুক্ষণ পরপরই পকেটের চিরুনী বুলিয়ে পরিপাটি করছে। পান খাওয়া তরমুজের বিচির মত দাঁতগুলো বের করে নির্লজ্জের মত যৌতুকের দাবী-দাওয়া পেশ করতে থাকলো অনর্গল। আসর থেকে উঠে এলেন বড় আপু। কাছে ডাকলেন সেমন্তিকে। বিকেলের পড়ন্ত ম্লান আলোতে কান্না ধোয়া ঐ মুখখানি দেখলেন চেয়ে চেয়ে। কাজল আঁকা চোখ জোড়াতে কমনীয়তা ঝরে পড়ছে। জোড়া ভ্রুর মাঝখানে কারুকাজ করা টিপ অপরূপা করে তুলেছে। নীলাম্বরি শাড়িতে আঁচল জড়িয়ে অবাক হয়ে সেও দেখছে সদ্য আগত বড় আপুকে। সাদা পাথরে জ্বল জ্বল করা নাক ছবিটা সেমন্তিকে মোহময়ী করে তুলেছে আরো বেশি। চিবুক তুলে ধরে ডাকলেন বড় আপু - সেমন্তি ! এত্ত বড়টি হয়েছিস ? 
কাংখিত ¯েœহের ওমে হু হু করে কেঁদে উঠলো সেমন্তি। বড় আপু তখনই মনে মনে বললেন, না কিছুতেই না, ঐ ছেলের হাতে এই কুসুম কোমল সেমন্তি বড্ড বেমানান। চাঁপার সাথে মনের ভাবটা প্রকাশ করতেই লাফিয়ে উঠলো চাঁপা - খুব ভাল হবে বড় আপু।
ব্যস । নানা-নানী রূপকের গুনমুগ্ধতায় বিভোর হয়ে  মত দিলেন তক্ষুনি।
বড় আপু লেগে পড়লেন কোমর বেঁধে। বড় ভাই ভাবীকে রূপকের গার্জেন করে উনি কনে পক্ষ হয়ে গেলেন বিনা দ্বিধায়। ঠিক হল বড় আপু উনার বাসা থেকে কনে পক্ষের অনুষ্ঠান সারবেন। রাজি হলেন নানা নানী প্রসন্ন মনেই। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতায় উপস্থিত হতে পারবেন না - জানালেন। 
বিয়ের দিন কয়েক আগে ছোট ভাই রন্তুর দায়িত্বে দেয়া হলো কনেকে আনবার। বড় ভাবীও সাড়ম্বরে প্রস্তুতি চালাচ্ছেন ছেলে পক্ষের আয়োজনের। দু’বাড়ি মেতে উঠেছে আর রূপক দো’তলার ঘরে বসে মাত্র ক’টি দিনের দেখা সেমন্তিকে ভাবতে থাকে। একবারও তো মনে পড়েনি, তখন এমন করে কাছে পাবার আকুলতা। অথচ বড় আপুর ইচ্ছেটা জানবার পর থেকে এত বেশি করে মনে পড়ছে কেন শান্ত ডাগর কাজল আঁকা চোখ দুটোকে। বড় আপু সেদিন সময়মত না গেলেতো কোন ভিনগ্রামে সেমন্তি চলে যেতো, আর দেখাই হত না, ভাবতে বুকের মাঝখানটায় কেমন চিন চিন করে উঠছে। নিজের আবেগ দেখে আপন মনেই হাসে রূপক। 
সেবার ফিরে এসে সেমন্তি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে এমন কিছু কি অবচেতনে প্রকাশ পেয়েছিল বড় আপুর কাছে রূপকের, নইলে চট করে অমন একটা সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে ফেললেন কি করে ? আচ্ছা সেমন্তিও কি প্রথমে তার মত হকচকিয়ে যায়নি ? মনের মধ্যে উথাল পাথাল কথার ঢেউ কাউকে বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না রূপক। বড় আপু সব সময়ের সব ব্যাপারের বন্ধু হলেও এ সময় তার কাছে ঘেঁসা যাচ্ছে না- কনেপক্ষের গার্জেন যে।
চাঁপা যে কোন পক্ষের বোঝা দায়। বড় ভাবীর সঙ্গে এই যাচ্ছে গয়না পছন্দ করতে, আবার ছুটছে বড় আপুর ফোন পেয়েই ওবাড়ি, আলপনা আঁকতে। রন্তু সন্তু ছুটছে নিমন্ত্রণ করতে স্বজনদের বাড়ি বাড়ি। আর বড় ভাবীকে এসময় কিছু বলতে যাওয়া মানেই রং-তামাশায় নিজেকে রাঙা করে আহাম্মক হওয়া। কাগজ কলম টেনে ছেলেবেলার বন্ধুকে লিখলো-
রতন,
আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। না আসতে পারলেও চলে আয়। - রূপক।
চিঠির ভাষায় চমৎকৃত হয়েই হোক আর বন্ধুর আহবানেই হোক, রতন বৃহস্পতিবারে ছুটিটা ম্যানেজ করে রওনা হয়ে গেলো বন্ধুর বিয়ের নিমন্ত্রণে।
রূপকদের পরিবারের সঙ্গে স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ রতন। বিশেষ করে বড় আপুর ¯েœহছায়ায় কত দিন চলে এসেছে হুট করে। মাস ছয়েক হল চাকুরিসূত্রে অন্য শহরে আবাস রতনের। হৈ চৈ আর আনন্দ ওর নিত্যসঙ্গী। বাড়িতে আসতে না আসতেই হুল্লোড় শুরু করে দিলো। বড় ভবী দলে টানেন ছেলেপক্ষ হয়ে, বড় আপু কাজ চাপিয়ে নির্দেশ জারি করেন। এরই মধ্যে খবর এলো, সেমন্তি হলুদের পাটিতে বসে বড্ড নার্ভাস ফিল করছে। ক্রমাগত কেঁদেই চলেছে। রতনের ডাক এলো, স্বাভাবিক করতে পারে কিনা ব্যাপারটা হাল্কা করে। রতন সাত-তাড়াতাড়ি হাজির হলো। ব্যাপার যে গুরুতর, টের পেলো সবটুকু দেখে-শুনে। এ পরিবারের একমাত্র মুরুব্বি বড় ফুফু। ছোট-বড় যে কোনো অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সবার কাম্য। স্বতঃস্ফুর্তভাবে হাজিরও হন খবর পেলে। কিন্তু এবার আসা অবধি সবাইকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। সেমন্তি এবং রূপক দু’জনেই তার সমান আপন। আর এই আপনেই বেধেছে গোল। একটাই গোঁ ধরেছেন উনি - এ বিয়ে হতে পারে না, হবে না। বিয়ে বন্ধ কর। সবাই বুঝিয়েছে, আপনার জীবনে যা ঘটেছে , তার পুনরাবৃত্তি সেমন্তির জীবনে ঘটবেই - এ ধারনা ভুল। কিন্তু ফুফুর একই বুলি - আপন চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার তিন মাসের মাথায় উনি বৈধব্যের বেশ পরেছেন, সেই বংশে আবারও একই সম্পর্কে বিয়ে শুভ হতে পারে না এবং অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্নের আতিশয্যে প্রথমে ফুফুর অনুরোধ, পরে আদেশ এবং পরিশেষে অভিমানে-রাগে দু’চোখে অশ্রু ঝরিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতি অনন্দে কিছুটা ঝিমুনি এলেও বড় আপু গোপনে সন্তুকে ফুফুকে অনুসরণ করে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দিয়ে সবাইকে আপন আপন কাজে ব্যাতিব্যস্ত রেখে অটল থেকেছেন। কিন্তু আসল জায়গায় গড়বড় দেখে ঘাবড়ে গেছেন। বড় ফুফু দু’চোখের অঝোর ধারায় সেই যে সেমন্তিকে ভিজিয়ে গেলেন। সেমন্তি ধারাবাহিকতা টেনে শুধুই কেঁদে চলেছে নীরবে। 
রতন বসলো গিয়ে আলপনা আঁকা পাটির একপাশে, সেমন্তির ঠিক পাশটিতে।
- আমি রতন। রূপক আমার কথা বলেনি - তাই না ? ঠিক আছে, আমি তাই তোমার বাবার বাড়ির পক্ষের সংখ্যালঘুত্বের কথা ভেবে তোমার আপনজন হবার চিন্তা সাব্যস্ত করলাম, আপত্তি নেই তো ?
কথার জবাব না দিলে কিন্তু চলে যেতে বলছো ভাববো।
অনড় হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল সেমন্তি।
- কিছু বলছো না যে, চললাম তাহলে।
কান্নাভেজা চোখে চাইলো সেমন্তি এবার।
মৃদু কন্ঠে বললো- আপনজন হলে আবার কেউ চলে যায় বিপদের মধ্যে রেখে ? 
- এইতো ভাল মেয়ের কথা কিন্তু বিপদ কোথায় ? এ যে আনন্দ উৎসব।
- নিশ্চয় সব জানেন আপনি। সত্যি করে বলেন তো নিরপেক্ষ হয়ে, বড় ফুফুর কথা মানতে হলে কি আমার চলে যাওয়া উচিৎ ? উনি মিনতি করে গেছেন বারবার। কিন্তু বড় আপুর ¯েœহের উত্তাপে আমি যে নড়্ার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি। কি হবে আমার ?
- সবার কথাতো হলো। কিন্তু আসল মানুষটির কথা ভাবলে না একবারও ? রূপক যা চাইছে তাতে কি আপত্তি আছে, নাকি থাকতে পারে জিজ্ঞেস করো মনকে, ব্যাস সমাধান তোমার কাছেই।
-রূপক কি চায়, জানেন আপনি ? বলেছে কিছু ?
- হ্যাঁ, জানি, কিন্তু তার আগে বলো, বড় ফুফুর ভবিতব্য কি অন্ধকারের অনুমান নয়, আর বিয়েটা তোমার একার নয়, রূপকেরও।
- মানছি, কিন্তু রূপক কি চায়, বললেন নাতো !
জবাবাটা দেয়া হলো না বড় আপু সাড়ম্বরে চলে আসাতে। হলুদের মঞ্চ ঘিরে জড়ো হলো জনসমাগম। বড় আপু ছোঁয়ালেন প্রথম হলুদ। সেমন্তির কপালে উষ্ণ চুমু দিলেন তার আগে। নিজের কপালে রীতি অনুযায়ী একটা ছোঁয়া দিয়ে ফুলের টায়রা সাজিয়ে সেমন্তির কপালে, গালে, চিবুকে পরম ¯েœহে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। গভীর আবেশে সেমন্তির বিষন্ন মুখটি বদলে গেল যেন মুহুর্তে। ঝিলিক দেয়া সুখদৃষ্টিতে দু’চোখ বন্ধ করলো ঠোঁটে থিরথিরে কাঁপন তুলে।
খুব সন্তর্পণে আড়চোখে রতনের পানে মৃদু হাসির আভা ছড়িয়ে নিচু কন্ঠে বললো - জবাবটা না দিয়ে যাবেন না যেন।
হল্লা সেরে পরের দিন বিয়ের বাসরের সাজসজ্জা সমাপ্ত করে শুয়ে পড়তেই রতনের দু’চোখ এঁটে এসেছে মাত্র। দোরের মৃদু করাঘাতে কান খাড়া করতেই বড় আপুর কন্ঠ ভেসে  এলো - রতন দরজাটা খোল, কথা আছে জরুরি।
তড়িঘড়ি করে লাইট জ্বালিয়ে দোর খুলতেই বড় আপু চিন্তিত মুখে ঢুকলেন। ভেতর থেকে দরজা ভেজিয়ে বসে পড়লেন সামনের চেয়ারে।
- এখন কি হবে বলোতো ? বিকেলের হুলুস্থুল মাত্র ম্যানেজ করে হলুদের ঝক্কি সারতে না সারতে আবারো বিপদ।
- বিপদ ? কিসের ?
তারপর বড় আপু যা বললেন শুনে তো রতনের চক্ষু চড়কগাছ। এর সমাধান যে কিভাবে কি দিয়ে শুরু করবে খুজে পাওয়াই দুস্কর। এদিকে সকাল হতেও দেরি নেই। ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটে প্রায়। সকাল সাতটা নাগাদ বিয়ে পড়ানো সময় নির্ধারিত। একটুও এদিক-ওদিক হবার উপায় নেই। ফিরে এসেছেন বড় ফুফু সন্তুর অনুরোধে পাকড়াও হয়ে। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ফুফু সময়ের হেরফেরে বাড়ি মাথায় করবেন নিশ্চিত। তার আগেই ব্যবস্থা যা করার করতে হবে। 
রাত দু’টোয় নির্ঘুম চোখে ডেকে পাঠিয়েছেন বড় আপুকে, বিয়ের বাজার দেখবেন বলে। বড় আপু ফুফুর আগ্রহে খুশি হয়ে বড় ঘরের তালা খুলে বিয়ের বাজার আনতে গিয়ে দেখেন মস্ত বিপত্তি। 
কিছুক্ষণ আগে সমাপ্ত হয়ে যাওয়া হলুদ অনুষ্ঠানের সরঞ্জামাদি চাঁপা রেখে গেছে এক পাশে তাড়াহুড়োয় জড়ো করে। তালা বন্ধ করে যথারীতি চাবিও দিয়ে এসেছে বড় আপুর আঁচলে। বিয়ের বাজারের বিভিন্ন প্যাকেট রাখা ছিল। তার পাশেই লোড শেডিংয়ের সময় জ্বালানো মোমবাতির চোখ এড়ানো মৃদু আগুন ধিক ধিক করে ছড়িয়ে পড়েছে দু’তিনটে প্যাকেটে। তাড়াতাড়ি ওগুলো টেনে বের করতে গিয়ে দেখেন বড় আপু, বিয়ের বেনারসির প্যাকেটের ভেতরের সবটুকুই আক্রান্ত। ভাঁজে ভাঁজে খুলে পড়ছে লাল বেনারসি। 
আপাতত বড় আপু ঘুমিয়ে পড়েছেন, খবর পাঠিয়ে ফুপুকে থামানো হয়েছে। কিন্তু সকাল বেলা সব জানতে পেরে কুরুক্ষেত্র কি পরিমান বাঁধাবেন তাতো অনুমেয়। জীবনে ঘা খাওয়া ফুফু মনকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েছেন, অন্তর থেকে দো’য়া দরুদ দিয়ে বিয়ের বেনারসি মুড়িয়ে দিবেন এই সান্ত¡Íনায় বুক বেঁধেছেন। আর এমন বিপত্তি শুনলে উনি নতুন করে মুষড়ে পড়বেন। সবচেয়ে বড় কথা, সেমন্তির কচি মনের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বইয়েছেন, আবার উল্টাপাল্টা মাথায় কিছু ঢুকালে ওর মানসিক চাপ বাড়বে, অসুস্থ হয়ে পড়বে মেয়েটা নির্ঘাত। আর জানা জানি হলে পোড়া শাড়ির অপবাদ পোড়া কপালে এসে ঠেকবে পাঁচ মুখেও। 
রতন গায়ে শার্টটা গলিয়ে বড় আপুকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে - ঘাবড়াবেন না বড় আপু। আমাকে বরং সন্তুর সাইকেলের চাবিটা দেন, দেখি কি করা যায়। পোড়া শাড়িটা আড়াল করে ফেলেন ভোর হবার আগেই। 
ফাঁকা রাস্তায় আধ ঘন্টায় পৌছে গেল কাপড়ের বাজারে। সুনসান নীরবতা শাটার ফেলা সারি সারি দোকান গুলোতে। পথের নেড়ি কুকুর গুলো কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে কোথাও কোথাও। প্যাকেট অনুসারে সামনের সাইনবোর্ড সনাক্ত করে শুভেচ্ছা বস্ত্রালয়ের পেছনের গলিতে সাইকেল থেকে নামলো রতন। পেছনের দরজায় বার কয়েক ঘা দিতেই ভেতর থেকে ভারি গলা ভেসে এলো - কে ? এত রাতে কি চাই ?
রতন যতটা পারলো বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই ঘটনার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে  বললো অনুনয়ের সঙ্গে।
জানালা খুলে প্যাকেটটি দেখলো লোকটি, মনে করে বললো - হাঁ, বিয়ের বাজার করে নিয়ে গেছে বেনারসি শাড়ি সহ। কিন্তু লাল বেনারসি একটাই আছে বর্তমানে। অন্য কোয়ালিটি, দাম এটার মত নয়, একটু বেশি।
রতন বুঝলো সবই, সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইছে লোকটি। সাইকেল ঘুরিয়ে আবার এল বাড়িতে। জানালায় অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে বড় আপু। বাকি টাকা কটি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরলো রতন।
অবশেষে নতুন লাল বেনারসি নিয়ে এল রতন আলো আঁধারি ভোরে। শীতের রাতে ঘেমে নেয়ে সাইকেল থেকে নামলো জানালার পাশে। পাল্লা বন্ধ। টুক টুক করে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। প্যাকেটটা জানালা গলিয়ে ভেতরে দিতেই সামনে চেয়ে আঁৎকে উঠলো। স্বয়ং ফুফু দাঁড়িয়ে। পাশে বড় আপু পোড়া শাড়ির অংশ হাতে। 
রতনের কি করা উচিত কিছু মাথায় এলোনা সে মূহুর্তে, ঘামে জবজবে শার্টটা খুলে নিজ বিছানায় গিয়ে অপরাধির মতো শুয়ে পড়লো। আর কান খাড়া করে রেখে ভাবছে এই বুঝি বড় ফুফুর ত্রাহি কান্না শুরু হবে ইনিয়ে-বিনিয়ে। তারপর এক সময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে বেরিয়ে যাবেন।
আর সেমন্তি ? ওর ম্লান মুখটা মনে হতেই কেমন কষ্ট লাগে রতনের। আর ভাবতে ইচ্ছে করে না কিছু। 
হঠাৎ রতনকে অবাক করে দিয়ে বড় আপুর কন্ঠ ভেসে আসে ওপাশ থেকে। না, স্বান্ত¡না নয়, রীতিমত বড় ফুফুর সাথে হাসতে হাসতে কথা বলছেন। বড় ফুফু বড় আপুর নাম ধরে দরাজ গলায় বলে চলেছেন - তুই পারিসও বটে। আমি ফজরের নামাজ সেরে ভাবলাম তুই জেগেছিস নাকি দেখি। হঠাৎ এ ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে দেখি তুই পোড়া শাড়ি হাতে দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করবো কি ব্যাপার, এরই মধ্যে জানালার ধাক্কায় পাল্লা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঐ ছেলেকে দেখি প্যাকেট বাড়িয়ে দিল আমাকে। খুলে তবেই না বুঝলাম।
সবটুকু অশান্তি উবে গেছেরে, আমার সেমন্তির পোড়া কপালের ফাঁড়া শাড়ির ওপর দিয়ে কেটে গেছে। ছেলেটাকে ডাকতো একটু, বড্ড সুন্দর শাড়িটা এনেছে রাত-বিরেতে হয়রান হয়ে। আমি ততক্ষণে সেমন্তিকে উঠাই গিয়ে। নতুন জীবনে পা দেবার দিন, অত ঘুমুচ্ছে কি করে।
- কইরে সেমন্তি উঠ। শুভ দিনের শুরুটা কি চমৎকার দেখবি না ? 
রতনের বুক থেকে ভারি পাথরটা নেমে গেলো অজানা আশঙ্কার। জানালায় তাকিয়ে দেখে লাইট পোষ্টের আলোগুলো নিভে যাচ্ছে একএক করে। পাখির কিচির-মিচির শুরু হয়েছে। সারা বাড়িটাও জেগে উঠেছে কোলাহলে।
রতনের দু’চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমের প্রশান্তিতে। পাশের ঘর থেকে রূপকের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কাকে যেন জিজ্ঞেস করছে - রতনটা ওঠেনি এখনও ? টই টই করে অনেক রাতে শুয়েছে বুঝি ? ডেকে দে ওকে, বাড়িটা জমছে না ওকে ছাড়া।
রতন হাসলো কম্বলটা টেনে নিতে নিতে। মনে মনে বললো, আমার কাজ তো শেষ। দিনের সূচনা বাপু তুই দেখ। আজ তো তোর বিয়ে।
এরপর সমাপ্ত হলো শুভ কাজ কোনো বিপত্তি ছাড়াই। 
কিছুদিন পর হঠাৎ করেই স্কলারশিপ নিয়ে রতন চলে গেছে দেশের বাইরে। চিঠিতে প্রথম প্রথম যোগাযোগ থাকলেও পরে এক সময় যোগাযোগহীন হয়ে পড়েছে। রূপক সেমন্তির সংসারটা দেশে ফিরে গিয়ে এক চোট ঘুরে ফিরে দেখবে, ভেবেছেও মাঝে মাঝে। দেশেও ফিরেছে বছর পাঁচেক পর। কিন্তু অন্য শহরে অফিসের ব্যস্ততা থাকায় হয়ে ওঠেনি।
এক লম্বা জার্নিতে অফিসের কাজে ট্রেনে চেপে এক গাদা ম্যাগাজিন খুলে আয়েশ করে চোখ বুলাচ্ছিল রতন। হঠাৎ কোন এক স্টেশন আসাতে হুড়মুড় করে লোকজন উঠলো কিছু। তার মধ্যে থেকে - রতন ভাই না ?
মেয়েলি কন্ঠে, চমকে তাকিয়ে যাকে দেখলো রতন ঠিক চিনে উঠতে পারলো না। মুখোমুখি সিটটায় বসে চেনা চেনা চেহারার মহিলাটি হাসলো আবারও - আপনজনকে ভুলে গেছেন ?
মনে পড়ে গেল মুহুর্তেই সেদিনের হালকা পাতলা গড়নের দেখা আজকের পরিবর্তিত সেমন্তিকে। 
- কেমন আছো তুমি ? রূপক ? তোমাদের সংসার ?
- বহাল তবিয়তে।
বলে চলে সেমন্তি রূপকের কথা, সন্তানের কথা, সংসারের কথা।
বান্ধবির বাসা থেকে বিশেষ কাজে ফিরছিল সেমন্তি এই ট্রেনে, তা ও বললো।
এক পর্যায়ে বললো - আমাদের সেই বড় ফুফুর কথা মনে আছে রতন ভাই ?
- তা আবার থাকবে না ? উনার আঁধারি ভবিতব্যে কেঁদে সারা হচ্ছিলে তুমি সেদিন। কেমন আছেন উনি ? 
- বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন একেবারে। প্রায় ছুটে আসেন আমাদের সংসারে। মাঝে মাঝে আমার মাথায় হাত রেখে বলেন - তোর ফুপা বেঁচে থাকলে তোর মত সোনার সংসার আমারো হোতোরে।
- যাক উনি খুশি হয়েছেন তাহলে। রতন হেসে বলে।
- শুধু কি খুশি, মাঝে মাঝেই আমাদের তিন বছরের মেয়ে টুম্পাকে আদর করে বলে - দোয়া করি মননের ঘর আলো করিস বড় হয়ে। মননটা কে বুঝলেন কি রতন ভাই ? হাসতে হাসতে প্রশ্ন করে সেমন্তি। জবাবটা দিতে হবে কিন্তু।
জবাবটা দেয়া হয় না। ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটা থেমে যেতেই বাংকারে রাখা ব্যাগটা নামিয়ে তড়িঘড়ি করে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ঠিকানা সম্বলিত কার্ডটা হাতে ধরিয়ে বারংবার আমন্ত্রন জানাতে জানাতে নেমে পড়ে সেমন্তি।
ধীরে ধীরে দুলে উঠে চলতে শুরু করে ট্রেনটা আবারো। রতন চলন্ত ট্রেনের জানালায় দেখে প্লাটফর্মে দাঁড়ানো হাওয়ায় গোলাপি আঁচল উড়িয়ে হাত নাড়ছে হাসিভরা সেমন্তির সুখী মুখখানা।
রতনের মনে পড়ে যায় হলুদের মঞ্চের সেই মৃদু কন্ঠ - জবাব না দিয়ে যাবেন না যেন।
চলন্ত ট্রেনে সেমন্তির দেয়া কার্ডের ঠিকানায় চোখ বুলাতে বুলাতে মনে মনে বলে রতন - মনন ? নিশ্চয় চিনেছি, সুখী হোক আগামী প্রজন্ম একই ধারায়।

*************
ফাহমিদা রিআ 
*************

   </title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/110757/</link>
				<pubDate>Sat, 14 May 2022 15:31:05 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>﻿<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23উত" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#উত</a>্তরণ<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ফ" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ফ</a>াহমিদা রিআ</p>
<p>বড় গেটের সামনে স্কুটার থামতেই সেমন্তি অবাক চোখে চেয়ে দেখলো সমস্ত বাড়ি জুড়ে সাজ সাজ রব। ডেকোরেশানের লোকেরা গেট সাজাতে ব্যস্ত। বাড়ির দেয়াল জুড়ে রঙ-বেরঙের আলোর ঝিকিমিকি। সন্ধ্যার আঁধার নামেনি তখনো। শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় বাতিগুলো ফড়–ৎ ফুড়–ৎ জ্বলছে আর নিভছে।<br />
&#8211; সেকি সেমন্তি আপু, চলো, দাঁড়িয়ে রইলে যে। একে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-110757"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/110757/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2e4d77b00c2176e3d39118151e5d6a65</guid>
				<title>অপু.......

শেষ পর্যন্ত   দুটো টিকিটই ম্যানেজ হলো। হঠাৎ  করেই  মায়ের তোড়জোড়ে অবাক হলো অপু ।  অথচ গত মাসে নিজে থেকে কদিনের ছুটিটা বাবার সাথে কাটাতে চাইলে মায়ের ঘোর আপত্তি দেখে দ্বিতীয়বার বলবার সাহস পায়নি অপু। আসলে অপুর মা শায়লা এখন এত বেশি ব্যস্ত সময় কাটান যে  বাড়ির জোবেদা বুয়া,দারোয়ান নিয়ামত চাচা আর  ড্রাইভার সলিম ভাই এর মত অপুও  মেপে মেপে কথা বলে মায়ের সাথে। সেই পিচ্চিকালের আবদারগুলো এখন স্বপ্নের মত লাগে। শায়লা ঘরে ঢুকেই সেন্টার টেবিলের উপর টিকিট দুটো রেখে সোফাটায় বসলেন গা এলিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে। সামনে টিভিটা চললেও অপুর  মনোযোগ নেই সেদিকে। শায়লা সরাসরি তাকান ওর দিকে,
----- অপু, আমিও কাল তোমার সাথে যাচ্ছি।
অপু স্ক্রীনে চোখ রেখেই বলে,
--- কদিন আগে তুমিইতো বললে সময় হয়নি এখনও। তবে আজ হঠাৎ.......
  মা জল টলমল চোখে ধরা গলায় বললেন, 
----  জীবনের সবকিছু  পরিকল্পনামাফিক হয় না বাবা। কিছু কিছু অপরিকল্পিত ঘটনার কাছে আমরা হেরে যাই।

এরপর নিজেকে সামলিয়ে স্বাভাবিকতার মোড়কে গলার স্বর নামিয়ে বললেন,
----- খাবার টেবিলে এসো। ভোরেই ফ্লাইট। সকাল সকাল রওনা হতে হবে।

স্বল্পভাষী অপু কিছুটা অবাক হলেও কিছু বলার খুঁজে পেলো না।  ওকে বাবার কাছে পাঠাতে হচ্ছে বলে মা কি খুব আপসেট?  হতে পারে।

সেবার বাবার কাছে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করতেই শায়লা  একটুক্ষন চুপ  থেকে ধীর কন্ঠে বুঝিয়ে দিলেন, ইচ্ছে হলেই সব কিছু করা যায় না। চুক্তি অনুযায়ী এতদিন যেভাবে চলে এসেছো, সেভাবেই চলবে। ক্যালেন্ডারের পাতাই জানান দেবে তুমি কখন বাবার কাছে যাবে।

অপু সেবার নিজেও অবাক হয়েছিল নিজের উপর। হুট করে সে কেনইবা এমন আবদার করে বসলো। এমনতো হয় নি এর আগে। সেই যে ছোট্ট শহরের ছায়া ঘেরা একতলা উঠোনঅলা বাড়িটা থেকে মা ওকে ঢাকায় নিয়ে এলেন আলো ঝলমল এই বাড়িটায়।  আসবার আগে শুধু জেনেছিলো মা এখানকার অফিসটা থেকে বদলি হয়ে  ঢাকায় থাকবেন এখন থেকে। বাবা তাঁর নিজের অফিস  নিয়ে ছোট শহরটাতেই থাকবেন।
বাবকে ছাড়া আসতে খুব খারাপ লাগলেও ঢাকায় এসে  সাজানো গোছানো আকাশ ছোঁয়া এ্যাপার্টমেন্টের দশতলায় এসে  প্রথম কদিন খুব আনন্দে হলো অপুর। তারপর ধীরে ধীরে কেমন যেন বন্দী মনে হতে লাগলো নিজেকে। তাদের আলো আঁধারী ঘেরা ছোট্ট বাড়িটায় রেখে আসা বাবার  জন্য মনটা ছটফট করতে লাগলো।  বাবার লোমশ বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাতে ইচ্ছে করলো আগের মত।
মা বুঝালেন, অপু তুমি অনেক বড় হবার জন্য বড় শহরে এসেছো। কদিন পরে নতুন  স্কুলে ভর্তি হবে। 
----- মা বড় হওয়া পর্যন্ত কি আমরা বাবার কাছে যাবো না? একেবারে বড় হয়ে গেলে বাবা যদি চিনতে না পারে?
মা কোন জবাব দেন নি তখন।
জবাবটা অপু নিজেই বুঝে নিয়েছিলো সময়ের সাথে সাথে। 
এত এত চকোলেট আর আইসক্রিমের বক্স নিয়ে পরদিনই হাজির হলেন আসিফ সাহেব। সংগে জোবেদা বুয়া। মাতো এখানে বদলি হয়ে অনেক বড় পদে চাকুরী করবেন এখন থেকে। সারাদিন ব্যস্ততা বড় অফিসের।  কখনও কখনও বিদেশেও যেতে হবে। তাইতো জোবেদা বুয়া অপুর দেখভাল করবে, কোন অসুবিধা হবে না অপুর।

এই নতুন বাড়িটাতো আসিফ সাহেবেরই।  উনি মায়ের অফিসের বড় বস। অপু কতবার দেখেছে, সেই ছোট্ট শহরটা থেকে মা প্রায়ই ঢাকার হেডঅফিসে আসতেন কনফারেন্সে।  
এখানে আসার পর জেনেছে সেই আসিফ সাহেবকেই মা বিয়ে করে বাবাকে একা রেখে চলে এসেছেন। 
আসিফ সাহেব তাই এই বাড়িটা মাকে  দিয়েছেন। উনার আরও অনেক বাড়ি আছে। জোবেদা বুয়া বলেছে আর এক আলিশান বাড়িতে আসিফ সাহেবের  স্ত্রী সন্তানদের কাছেই এতদিন সে ছিলো। ওখান থেকেই জোবেদাকে এখানে আনা হয়েছে পুরনো আর বিশ্বস্ত বলে।

বছরের পর বছর  নতুন ক্লাশে ওঠার সাথে সাথে অপু অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছে। নিজেকে একটু একটু করে বড়ও ভাবতে পারছে। বাবার কাছেও যায় বছরে দুবার।  কি সব চুক্তি হয়েছে উকিলের মাধ্যমে। সময় হলে মা কদিন আগেই প্লেনের টিকিট কেটে অপুর ছোট্ট নীল সুটকেশটা গুছিয়ে দিতে বলেন জোবেদা বুয়াকে। নির্দিষ্ট সময়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসেন ড্রাইভার সলিম। আগে থেকেই বাবাকে ফোন দিতে বলেন মা।
বাবা অনেকের মাঝে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন এয়ারপোর্টে  হাসি হাসি মুখ নিয়ে। অপুর ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপে যেন পথ ফুরোতেই চায় না। একসময় ঝাঁপিয়ে বুকের মাঝে হারিয়ে যায়।
প্রতিবারই একটা আতংক নিয়ে বাবার বাড়ি যায় অপু। 
বাবাও যদি মার মত আবার বিয়ে করেন। জোবেদা বুয়াই এ চিন্তাটা ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। বলেছে, আজ হোক, কাল হোক বাবা বিয়ে করবেনই। সেটা নাকি হবে সৎ মা। আর সৎ মানে যে কি বিভীষিকা তাতো অপু গল্পের বই আর মুভিতে ঢের দেখেছে।

কিন্তু বাবার সাথে বাড়িতে ঢোকার পর যখন দেখে সেই শুন্য ঘর, নিরব চারপাশ তখন মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। 

এতগুলো বছরে যা হয় নি তাই হলো আজ। অপু পার্কিং এ এসে দাঁড়াতেই সলিম ভাই ডিগি খুলে অপু র সুটকেশটা রেখে গাড়ির দরজা মেলে ধরতেই মা ওঠে বসলেন। একইভাবে বিস্মিত হয়ে দেখলো অপু মা প্লেনেও ওর পাশটিতে ওর হাতটা ধরেই বসে রইলেন।

----- আমি কি কয়েকদিন থাকবো মা?
----- না বাবা, আমি তোমাকে নিয়েই ফিরবো। তোমাকে ওখানে নামিয়ে আমি শহরের অন্য প্রান্তেই  থাকবো।
অতর্কিতে অপুর হাতে লোনা জলের ফোটা পড়লো মার চোখের।
মা কাঁদছে।  কেন? তবে কি বাবা সৎ মা নিয়ে এসেছেন?
তাতে মায়ের কি? মাওতো......


অপু এয়ারপোর্ট থেকে যখন বেরুলো,  এদিক ওদিক তাকিয়ে  বাবাকে দেখতে পেলো না ।ধীর স্হির কাঁচা পাকা চুলের শান্ত সৌম্য মুখাবয়বে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বাবা কোত্থাও দাঁড়িয়ে নেই।
----- অপু........উ উ উ...…
এই বুঝি প্রতিবারের মত বাবা দূর থেকে ডাকলেন।

মা যখন ও বাড়ির বড় গেটটায় অপুকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন অপু অবাক চোখে দেখলো, সব সময়ের নীরব বাড়িটায় অনেক লোকের সমাগম। গেট পেরুতেই ইতস্তত ছড়ানো অনেক অনেক আসন পাতা।  নারী পুরুষ শিশুদের  জটলা এখানে ওখানে।  কিন্ত বাবা? বাবা কই?
কে একজন কাঁধে হাত দিয়ে  এগিয়ে নিয়ে গেলো অপুকে সামনে।

সবার অপেক্ষাটা যে এতক্ষন অপুকে ঘিরেই ছিলো।
&quot; অপু এসে পড়েছে&quot; গুঞ্জনটাও সরব হলো।
ছোট্ট অপু, জীবনপথে অনভিজ্ঞ অপু একসময় দেখলো তার চিরদিনের  শান্ত, স্নিগ্ধ ভালো মানুষ বাবাটা সেজে গুজে এক ঝাঁক লোকের সাথে চলেই গেলো। একটিবারও অপুকে দেখে উচ্ছস্বিত হয়ে বললো না, অপু এসেছিস?
অপুও ডাকলো না। অভিমানে গাল ফুলিয়ে বললো না একবারও, বাবা তোমাকে এমন সাজে বড্ড অচেনা লাগছে। 
স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠলো। কেউ কেউ অপুকে পাশে নিয়ে বিলাপ করতে লাগলো। শুভ্র সফেদ ময়ূরপংখিতে রওনা হয়ে গেলো অপুর বাবা, না ফেরার ঐ দেশে। অপুর ছোট্ট মন অব্যক্ত ব্যাথায় কেবলই  তোলপাড় করে বলতে লাগলো সবার অগোচরে আপন মনে,
জোবেদা বুয়া যে বলে, নতুন কাপড় পরে তুমি নাকি একদিন  আমার সৎ মা আনতে যাবে। 
কিন্ত এ তোমার কেমন নতুন পোশাক পরা বাবা। তুমি নাকি আর জাগবেই না।  আর ফিরবেই না তোমার বাড়িটিতে। আমি তাহলে কার কাছে আসবো বাবা। আমাকে নিয়ে তোমার আর মার চুক্তির কাগজটারই বা কি হবে?


**********
ফাহমিদা রিআ</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/109234/</link>
				<pubDate>Tue, 10 May 2022 12:08:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অপু&#8230;&#8230;.</p>
<p>শেষ পর্যন্ত   দুটো টিকিটই ম্যানেজ হলো। হঠাৎ  করেই  মায়ের তোড়জোড়ে অবাক হলো অপু ।  অথচ গত মাসে নিজে থেকে কদিনের ছুটিটা বাবার সাথে কাটাতে চাইলে মায়ের ঘোর আপত্তি দেখে দ্বিতীয়বার বলবার সাহস পায়নি অপু। আসলে অপুর মা শায়লা এখন এত বেশি ব্যস্ত সময় কাটান যে  বাড়ির জোবেদা বুয়া,দারোয়ান নিয়ামত চাচা আর  ড্রাইভার সলিম ভাই এর মত অপুও  মেপে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-109234"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/109234/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">440fb77f10ca9867483089921db69045</guid>
				<title>#গল্প
 #মাতৃত্ব.....

ড্রয়িং রুমের পর্দার ফাঁক গলিয়ে টুকুকে টিভির রিমোট হাতে সোফায় বসে থাকতে দেখে নিপার মুখটা শুকিয়ে গেলো।
হাতের প্লেটগুলো ডাইনিং টেবিলে রেখে দ্রুত পা চালিয়ে টুকুর সামনে এসে দাঁড়ালো।
টুকু কিছু বুঝবার আগেই রিমোটটা টিপে টিভি অফ করে ওর হাতটা ধরে টেনে নিয়ে এলো সোজা রান্নাঘরে।
কোনে রাখা মোড়াটা ঠেলে এক ঝটকায় বসিয়ে দিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠলো নিপা,
-----চুপচাপ বসে থাক এখানে। আর যদি টিভির সামনে দেখেছি। আর কত ছোট করবি আমাকে বলতো? তোর জন্য আর কত কথা শুনতে হবে আমায়? আমার ঘাড়ে চেপেছিস, বেশ করেছিস। অন্যদের চোখের বালি হতে যাস কেন?

----- বৌমা, আর কত দেরি তোমার দুটো ভাত বাড়তে বলোতো? তাগাদা না দিলে কি একটি দিনও ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি  করা যায় না?
কান্না লুকিয়ে গলা বাড়িয়ে জবাব দেয় নিপা,
----- এই যে মা, আসুন টেবিল রেডি করেছি

ছোট দেবর জাহিদ আর নিপার স্বামী জাফরও এসে বসলো মায়ের দুপাশে চেয়ার টেনে, প্রতিদিনের মত।

জাহিদ চারপাশে চোখ বুলিয়ে প্লেটে ভাত নিতে নিতে বললো,
----- ভাবী, টুকুকে দেখছি না যে। 

জাফর গম্ভীর মুখ করে বললো,
----- তার কি কাজের শেষ আছে? ঘরের দেয়ালতো আঁকিবুকিতে ভরিয়ে ফেলেছে। পরের বাড়িতেই যখন থাকবে  তখন এসব শিখে পড়ে পাঠানো উচিত ছিলো।
নিপার শাশুড়ি  চশমাটা নাকের উপরে তুলতে তুলতে বললেন,
----- এখানেই থেকে যাবে? কই আমিতো এসবের কিছুই জানি না।

নিপা আমতা আমতা করে বললো,
----- না মানে,বাবার সেই কলিগকে ফোন দিয়েছি, উনিই নিয়ে যাবে বলেছেন।
শাশুড়ি খাওয়া থামিয়ে তাকালেন নিপার দিকে,
তোমার বাবার আপন জনরা বাড়তি দায় নেবে না হয়তো, কিন্তু  ওর মায়ের কুলের কারো বাসায় গেলেইতো পারতো?

নিপা মাথা নীচু করে খালি গ্লাসগুলোতে পানি ঢালতে থাকে। ভরে আসে নিজের দু&#039; চোখও। যদিও ও ভালোভাবেই জানে, শাশুড়ি মা এই কথাগুলি ওকে নয়, ওর বাবাকেই তাচ্ছিল্য করে বলছেন। বাবার ওপর এমন রাগ অভিমানে ওরও দশ বছর কেটেছে যোগাযোগহীন হয়ে। কিন্ত দিন পনেরো আগে আননোন নাম্বার থেকে যখন কল এলো,নিপা হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
-----  সিরাজ সাহেবের মেয়ে নিপা বলছেন?
----- জ্বি বলছি।
----- আমি আপনার বাবার কলিগ মুনির হোসেন। খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছি  আপনার বাবার কথা রাখতে।  উনার স্ত্রীর স্পট ডেথ হলেও রোড একসিডেন্টের ধকলটা সয়ে দুদিন বেঁচে ছিলেন আপনার বাবা। তখন দেখতে গেলে আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, আপনার সাথে দেখা করে বিষয়টা....
নিপা আবেগহীন কন্ঠে  কথার মাঝেই বললো,
----- জানিতো।  পাঁচ মাস আগের ঘটনা এখন নতুন করে বলার মানে কি?
----- মানে আছে বলেইতো ফোন করেছি।
তারপর যা শুনলো নিপা, পায়ের নীচের মাটি যেন  দুলে ওঠলো। সদ্য পিতৃমাতৃহীন টুপুর সব দায়িত্ব এখন থেকে বড় বোন হিসেবে নিপার উপরই বর্তায়। তাই টুপুকে রাখতে এসেছেন তিনি নিপার কাছে।

টুপুর মা বাবা মারা যাবার পর মুনির সাহেব নিপার শ্বশুরবাড়িতে ফোনে খবরও দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন নিপা পৈতৃক ভিটাতে ছুটে যাবে শোকাচ্ছন্ন হয়ে। অসহায় টুকুকে সেই অপেক্ষায় নিজের বাড়িতে  নিয়ে গিয়েছিলেন। মানবিকতার দিক দিয়ে দেখলে,এছাড়া উপায়ও ছিলো না। এড়িয়ে চলা স্বজনরা ততদিনে পুরোই লা পাত্তা। কদিনের জ্বরে নিজেও খানিকটা অসুস্হ হয়ে পড়েছিলেন মুনির সাহেব। জ্বরের ঘোরে বড্ড মানসিক অস্হিরতায় ভুগেছেন কটা দিন।টুকুর দায়টা তৎক্ষণাৎ  নিলেও  আসল দায়িত্বটা পালন করতে দেরি হয়ে যাওয়ার চিন্তায়। তাই কিছুটা সেরে ওঠতেই টুকুর প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড়, দুচারটে বই খাতা ছোট্ট ব্যাগে ভরে আর আলমারীর ড্রয়ার থেকে সিরাজ সাহেবের ফাইলটা সংগে নিয়ে টুকুর হাত ধরে  ঢাকাগামী ট্রেনে ওঠে বসলেন।
স্টেশন থেকে নিপার মোবাইলে ফোন করে বাড়ির ঠিকানাটা জেনে পৌঁছেও দিয়ে এলেন আর বললেন,
----- সিরাজ সাহেব মুমুর্ষ অবস্হায় দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর রেখে যাওয়া তিন সম্পদকে এক জায়গায় যেন করে দেই।
নিপা দাঁতে দা্ত চেপে ধীর কন্ঠে উচ্চারন করে, 
----- তিন সম্পদ?
----- জ্বি এমনটিই বলে গেছেন সিরাজ সাহেব। এক কন্যা, এক পুত্র আর নিজ হাতে গড়া ভিটে বাড়ি। সর্বস্ব মিলে তাঁর তিন সম্পদ।

ফাইলের উপর নিজের যোগাযোগ নাম্বার আর টুপুকে নিপার হাতে গছিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন মুনির সাহেব।

এমনিতেই সে শ্বশুরবাড়িতে কোনঠাসা হয়ে জীবন যাপন করছে ক&#039; বছর থেকে। প্রথম কটা বছর সব চলছিলো ঠিকঠাক মতই। বাবা মা তাঁদের একমাত্র সন্তানকে পাত্রস্হ করেছেন তাঁদের অর্ধেক রাজত্ব সহ রাজকন্যাকে দান করে। আশা ছিলো, বাকি রাজত্ব মানে বিশাল পৈতৃক বাড়িটিও অদূর ভবিষ্যতে পুত্রবধূ নিপারই হবে। 
কিন্তু নিপার শ্বশুরবাড়ির লোকদের আশায় জল ঢেলে দিলো উদ্ভুত পরিস্হিতির ঘনঘটা। অকস্মাৎ মায়ের মৃতু্্যর মাস দুয়েক যেতে না যেতে বাবার আবার বিয়ে করা নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এত বেশি সমালোচনা হতে শুরু করলো আর ওর মনটাও বাবার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞায় ভরে ওঠলো। ফলাফলে বাবা কন্যার দেখা সাক্ষাত বছরকে বছর বিরতি পড়তে থাকলো। স্বামী  কিংবা দেবর অথবা আত্মীয় স্বজন মারফত খবরও উড়ে আসতে লাগলো মুখরোচক হয়ে। টুকু জন্মানোর খবর, ঘটা করে টুকুর আকীকার অনুষ্ঠানের খবর, স্কুলে হাতেখড়ির খবর। এমনি করেই সেদিন সকালে রান্নাঘরে পরোটা ভাজতে ভাজতে কানে এসেছিলো বাবা এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর রোড একসিডেন্টের খবর।
মুহুর্তেই ঝাপসা চোখ দুটি মুছে অন্তরে পালিত অভিমানে মনকে শক্ত করে ফেললো নিপা, না কাঁদবে না সে,  কিছুতেই কাঁদবে না। তার কাছ থেকে বাবাতো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে সে বাবা মা দুজনকেই হারিয়ে ফেলেছে সেই কবে। আজ আর নতুন করে দুঃখ পেয়ে কি হবে?
অবাধ্য অশ্রুকে নিপা সারাটা রাত সবার আড়ালে আবডালে বশ মানিয়েছে হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় তুলে।
নিপা নিজেকেই গুটিয়ে নিয়েছিলো, স্বার্থপর বাবার কন্যা পরিচয়ের হীনমন্যতায়। অথচ ওর যখন বিয়ে হয়, বাবার একমাত্র সন্তান হিসেবে শ্বশুরবাড়িতে ও বাড়ির ঢেউটা ছুঁয়ে দিয়ে বাবা বলেছিলেন,
-----আমার একমাত্র সন্তানটিকে যতটুকু পেরেছি আদর যত্নে বড় করেছি, এতটুকু কষ্টের আঁচড় লাগতে দেইনি। ভুল ভ্রান্তিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে শিখিয়ে পড়িয়ে নিবেন আমার আদরের মেয়েটিকে।
শ্বশুরবাড়িতে স্বাভাবিকভাবেই কাটছিলো দিন। তিনবছরে দুটো সন্তানের মাও হলো নিপা। কিন্তু ততদিনে তার মায়ের ধরা পড়লো দুরারোগ্য ব্যাধি। দীর্ঘ দুটো বছর মায়ের চিকিৎসার পিছে ছুটে চললেন বাবা। আজ ঢাকাতো,কাল সিরাজগঞ্জ। শেষ পর্যন্ত দেশের সীমানা ডিঙিয়ে প্রথমে চেন্নাই, পরে সিঙ্গাপুর।  শেষ রক্ষা হলো না তবুও। চলে গেলেন মা। নিঃস্ব রিক্ত বাবা শুন্য বাড়িতে না থাকতে পেরে ছুটে এলেন মেয়ের কাছে। তিনটে মাসের ছুটি কাটাতে গিয়ে  মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সবার স্বরূপটা বুঝে ফেললেন বাবা। 
স্ত্রীর ব্যয়বহুল চিকিৎসায় সব বিক্রি করে জামাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে উনি বুঝি আজীবনের মত জেঁকে বসলেন, ওদের এই ধারনাটা বুঝতে পেরে হুট করেই চলে গেলেন নিজের শুন্য বাড়িটায়। ছুটি শেষ না হতেই  যোগ দিলেন চাকুরিতে। 

তারপর তাঁর বিয়ের খবরটা যখন নিপার শ্বশুরবাড়িতে এসে পৌঁছুলো, ফিসফাস করে কথা শুরু হলেও পরবর্তীতে উচ্চবাচ্যেই চলতে থাকলো। নতুন উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবনাও। 

আর হলোও তাই। বছর ঘুরতেই টুপুর জন্মের খবরটা চাউর হয়ে গেলো মহাসমারোহে। নিপার  স্বামী জাফর চিবিয়ে চিবিয়ে শুধু বললেন,
------ বুড়ো বয়সে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন। মেয়েকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবার মোক্ষম অস্ত্র। অথচ সঁপে দেয়ার সময় কত দরদ, আদরের মেয়েকে কষ্টের আঁচড় লাগতে দেন নি। আর এখন? মেয়ে খুব আনন্দে আছে মায়ের জায়গায় আর একজনকে দেখে? যত্তোসব।

নিপা সবই শুনে, মুখে কিছু বলে না। আর বলবেই বা কি। মা চলে যাওয়ার শুন্যতাটা বাবার সাথে ভাগাভাগি করে স্বান্তনা পেতে চেয়েছিলো। কিন্তু ভাবনার সম্পুর্ন  বিপরীতে গিয়ে বাবাকেই ভুলবার জন্য মন কঠিন হয়ে গেলো। সবই নিয়তি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিপা একান্তে। 
শাশুড়িকে খাবার টেবিলে তখন মিথ্যে বলেছে নিপা। মুনির সাহেবকে ফোন করেনি সে, টুপুকে কেউ নিতে আসবে না।
কেনইবা নিবে,টুপুরতো কেউ হয় না মনির সাহেবের। পিতৃ পরিচয়ের দাবীতে তাইতো নিপার কাছে গছিয়ে দিয়ে গেছে টুপুকে। 
হঠাৎই  মনটা ভীষন ফুঁসে ওঠে নিপার। যাকে একটা দিনের জন্য দেখেনি, মন থেকে মেনে নেয় নি একটা মুহুর্তের জন্যও। অথচ শ্বশুরবাড়িতে অহরহ হাসি কান্নার বিব্রতকর পরিস্হিতির স্বীকার হতে হচ্ছে, তার দায় সে এভাবে বইতে পারবে না আজীবন। মুনির সাহেব এত বড় দায় একতরফাভাবে চাপিয়ে দেবার কে?
ত্বরিত গতিতে আলমারীটা খুলে এক ঝটকায় মনির সাহেবের দেয়া ফাইলটা বের করে নিপা।
লেখা নাম্বারগুলো দেখে দেখে দ্রুত আঙুল ছুঁয়ে কল দেয় নিপা। ওপাশে বার বার এনগেজড শোনায়। অপেক্ষা করে নিপা। একটা বিহিত করেই ছাড়বে আজ।
নীল সুতোয় বাঁধা ফাইলটায় চোখ বুলাতে গিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে বাবার নামটা চোখের উপর ভেসে ওঠে বাবারই হস্তাক্ষরে লেখা।
কৌতুহলে ফাইলের ফিতা খুলতেই সাজানো দলিলগুলো চোখে পড়ে। বেরিয়ে পড়ে বাবার হাতের লেখার আত্মকথনের একটি পাতা।

মনটা হঠাৎই ব্যাকুলতায় ভিজে ওঠে নিপার। প্রায় দশ বছর অদর্শন আর যোগাযোগহীন থেকে নিজ জন্মদাতার জন্য হাহাকার করে ওঠে মন।
আকুল হয়ে পরম মমতায় হাত বুলায় বাবার হস্তাক্ষর সম্বলিত লেখাগুলিতে। অনুভব করে কখনও কোন একলা দুপুর কিংবা ঘুম না আসা গভীর রাত বা আলো আঁধারীর মৌন ভোরবেলাতে অশ্রুসিক্ত বাবার ভাবনাগুলোকে, ভালোবাসাগুলোকে।

মুনির সাহেবকে আর ফোন করা হয় না। পরম যত্নে আবার তুলে রাখে ফাইলটা।  যেন কানে বাজতে থাকে বাবার ভাবনাগুলো।  মুখে স্বীকার না করলেও  টুপুর আপনজনতো এ পৃথিবীতে এখন একজনই। রক্তের বাঁধনে বাঁধা আইনেও। টুপুর সব দায় যেমন নিপার, নিপারও সকল ক্ষমতায়ন টুপুর প্রতি। এ জগতে আঙুল তুলে সবাই শুধু দোষ খোঁজে কিন্তু এক বেলা না খেয়ে থাকলে বা অসুখে ভুগলে তপ্ত কপালে মমতার হাত রাখার কাউকে পাওয়া যায় না। তাই সবকিছু উপেক্ষা করে নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী চলতে হয়, হয়েছে। নিজেকে ভালো রাখার নিজ তাগাদাতেই।  এ সমাজে অসহায় নারী বা পুরুষ মর্যাদা পায় না। অসহায়কে অসহায়ের কাতারেই করুণা ভিক্ষা করতে হয়। 

জাফরের হাক ডাকে ফাইল দেখা অসম্পুর্ণ রেখেই বেরিয়ে এলো নিপা ঘর থেকে।
নিশ্চয়ই  টুপুর কোন কর্মকান্ডের অভিযোগ করবে জাফর। 
কিন্ত নিপা কিছু বলার আগেই
জাফর নিপাকে দেখে গলা বাড়িয়ে বললো,
------ কোথায় ছিলে এতক্ষন? মার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে এসো টুপুর রাজ্যজয়।
নিপা ঢোক গিলে বললো,
----- মা- নে?
----- মানেটা তুমিই নিজেই জেনে এসো।
কপট গাম্ভীর্যে টিভির খবরে মন দিলেন জাফর।

গ্রীস্মের ছুটিতে স্কুল হোষ্টেল থেকে কদিন হলো বাড়িতে এসেছে নিপার দুই ছেলে। নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই, বেলা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুম, দুপুরের খাবারে টেবিলে সকালের ডিম পরোটার আবদার,  দুপুরের ভাত খেতে রাজ্যের বিরক্তি। এটা ওটা ভুল ধরা, জেদ করা আরও কত কি। জাফর বাড়িতে থাকলে  ড্রয়িং রুমে টিভি দেখতে যায় না টুপু। তাইতো মাউইমার ঘরের টিভিতে উঁকি দিতে দিতে ফাঁক  বুঝে  মোড়া টেনে নিয়ে এক কোনে বসে কার্টুন দেখে। কিন্তু  ঐ দুইভাই আসার পর সব লন্ডভন্ড। সবগুলো চ্যানেল এলোমেলো করে কার্টুনগুলো কোথায় যে হারিয়ে দিয়েছে, টুপু ভারী বিরক্ত ওদের ওপর।

আজও নিপা আপু ওকে রান্নাঘরের টুলে বসিয়েই মাছ বেছে খাইয়ে দিয়ে যখন ডাইনিং এ বড়দের খাবার দিতে গেছে, সে তখন  প্রতিদিনের মত  নিরিবিলিতে  ঘরের মোড়ায় বসে টিভির রিমোট টিপতে  টিপতে হাত ব্যাথা করে ফেলেছে একটা কার্টুন চ্যানেলও পাচ্ছে না। দুই ভাই মিটিমিটি হেসে ওকে নিয়ে মশকরা করেছে।
নিপার শাশুড়ি ঘরে ঢুকে টুপুকে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখে বললেন,
------ কি ব্যাপার সাহেবের কি অকাম করা হয়েছে? গোমড়া মুখে চুপচাপ যে।
------ খুব রাগ করেছি।
----- তাতো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কেন?
----- ছেলে দুটো খুব দুষ্টু।
-----  কেন?  কি করেছে আমার দাদাভাইরা?
------ ওদের একদম আদর করবে না। খুব দুষ্টু ওরা।কার্টুন চ্যানেলগুলো সব এলোমেলো করে দিয়েছে। ওদের  এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলবে। আগের মত থাকবে ওরা।
----- ওরাতো ওদের মায়ের কাছে কটা দিনের ছুটিতে এসেছে। চলে যেতে বলা কি যায়? যাবেইবা কেন?
----- আমিওতো তোমার কাছে বসে চুপ করে  বসে টিভি দেখি। ওরা কেন আমাকে  চলে যেতে বলেছে?
  শাশুড়িমা হাসলেন একটু মুখ টিপে,
----- তাই বুঝি? কিন্তু আমিতো তোমার কেউ নই। চলে যেতে বলতেই পারে।
টুপু হুট করে শাশুড়ি মার হাতটা নিজের মাথায় চেপে ধরে বলে ওঠে,
-----তোমাকে আজ থেকে আমি আর মাউইমা  ডাকবো না। নিপা আপুর মত শুধু মা বলবো। তাহলেতো  আমাকেও ওরা মায়ের কাছ থেকে চলে যেতে বলবে না। টিভি এলোমেলো করে দিবে না।

নিপা নিজের ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিতে দেখলো, আলগা গাম্ভীর্যের আবরণটা মুহুর্তেই সরে গেলো শাশুড়িমার মুখাবয়ব থেকে। কিছুক্ষন আগের শুকনো চোখদুটি টুইটম্বুর হলো লোনা পানিতে। 
পরম স্নেহে নিজের বুকে টেনে নিলেন টুপুকে, মাতৃত্বের চিরায়ত ধর্মকে মেনে।


---------------------
ফাহমিদা রিআ
----------------------</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/108608/</link>
				<pubDate>Mon, 09 May 2022 06:54:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23গল" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#গল</a>্প<br />
 <a href="https://toulot.com/my_bprs_activity_stream/?s=%23ম" class="youzify-hashtag" target="_self" rel="nofollow ugc">#ম</a>াতৃত্ব&#8230;..</p>
<p>ড্রয়িং রুমের পর্দার ফাঁক গলিয়ে টুকুকে টিভির রিমোট হাতে সোফায় বসে থাকতে দেখে নিপার মুখটা শুকিয়ে গেলো।<br />
হাতের প্লেটগুলো ডাইনিং টেবিলে রেখে দ্রুত পা চালিয়ে টুকুর সামনে এসে দাঁড়ালো।<br />
টুকু কিছু বুঝবার আগেই রিমোটটা টিপে টিভি অফ করে ওর হাতটা ধরে টেনে নিয়ে এলো সোজা রান্নাঘরে।<br />
কোনে রাখা মোড়াটা ঠেলে এক ঝটকায় বসিয়ে দিয়ে চ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-108608"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/108608/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>