-
বড় গেটের সামনে স্কুটার থামতেই সেমন্তি অবাক চোখে চেয়ে দেখলো সমস্ত বাড়ি জুড়ে সাজ সাজ রব। ডেকোরেশানের লোকেরা গেট সাজাতে ব্যস্ত। বাড়ির দেয়াল জুড়ে রঙ-বেরঙের আলোর ঝিকিমিকি। সন্ধ্যার আঁধার নামেনি তখনো। শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় বাতিগুলো ফড়–ৎ ফুড়–ৎ জ্বলছে আর নিভছে।
– সেকি সেমন্তি আপু, চলো, দাঁড়িয়ে রইলে যে। একে তো ট্রেন দু’ঘন্টা লেট, বাড়ির লোকজন চিন্তায় পড়ে গেছে এতোক্ষণে।
রন্তুর কথার জবাব না দিয়ে সামনের গেটে পা বাড়ালো সেমন্তি। কিন্তু গেট না খুলে দাঁড়িয়ে পড়লো আবার । রন্তু ভাড়া মিটিয়ে একহাতে সুটকেস আর অন্যহাতে ট্যাভেল ব্যাগটা ঝুলিয়ে সেমন্তির নীরব দাঁড়ানো দেখে হেসে ফেললো – লজ্জাবতী লতা হলে যে সেমন্তি আপু। শ্বশুরবাড়ি নয়তো এটা। বড় আপুর বাড়ি তো কনেরই বাড়ি। কাল যখন বড় ভাইয়ার বাড়ি যাবে ঘোমটা মুড়ি দিয়ে, তখন এমন গুটি শুটি মেরে থেকো। এখন চলো তো প্লিজ।
সেমন্তি শাড়ির আঁচল টেনে রন্তুর পিছে পিছে গেট ঠেলে ঢুকতেই ব্যস্ত ভঙ্গিমায় চাঁপা এগিয়ে এলো।
– এলে তাহলে, এদিকে আমরা বাড়ি সুদ্ধ লোক চিন্তায় অস্থির। রন্তু গতকাল ফোনে জানালো দু’টো নাগাদ পৌঁছুবে, কিন্তু এখন বেলা যায় যায়। সন্ধ্যার পরেই গায়ে হলুদ। বড় ভাবী তো ডালা নিয়ে এসে হাজির কোন বিকেলে। কনে এখনো এসে পৌঁছায়নি কেন। সবার কাছে জবাবদিহি করতে করতে বড় আপুর জান শেষ। ছেলে পক্ষ তো। মুডই আলাদা।
বড় আপু ওপর থেকে সিড়িঁর মুখে ওদের দেখতে পেয়ে নেমে এলেন তড়ি ঘড়ি। রন্তুকে তার পাশের ঘরটি দেখিয়ে বললেন – লাগেজ গুলো ও ঘরে রাখ, সেমন্তির জন্য সারাদিন ধরে সাজিয়েছে চাঁপা। আর চাঁপা, তুই হলুদের ওদিকটা দেখ। আমি ততক্ষণে সেমন্তির চা নাস্তার ব্যবস্থা করি। সময় তো বেশি নেই। একটু জিরিয়ে নিয়ে হলুদের পাটিতে বসতে হবে। এজন্যই বলছিলাম, ক’দিন আগেই চলে আয়। তা রন্তুও আনতে গিয়ে আটকা পড়লো।
রন্তু এসে দাঁড়িয়েছে ততোক্ষণে লাগেজ রেখে। বললো, কৈফিয়তের সুরে – আগে আসার উপায় আছে ? আমি যাবার পর থেকেই শুরু হয়েছে পরিবহন ধর্মঘট। এবেলা-ওবেলা মিটমাট হবে-হচ্ছে করে করে শেষ পর্যন্ত গতকাল সন্ধ্যায় ট্রেনে চেপেছি। এঘাট ওঘাট করে যে অবশেষে কনে পৌছে দিতে পেরেছি, এজন্য আমাকে ধন্যবাদ দাও। কি বলো সেমন্তি আপু। এখন টায়ার্ড কেন, দু’একবার মূর্ছা গেলেও ক্ষতি নেই। পানির ঝাপটা ছিটিয়ে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে অ্যাটে- তো করতে পারছো।
রন্তুর দিকে তাকিয়ে সেমন্তি হেসে ফেললো। বড় আপু নিজেও হাসলেন আঁচল চাপা দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে তাড়া দিলেন।
– সেমন্তিকে আনার ফাঁকে আর ধর্মঘটের ছুতোয় ক’দিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে খুব তো ঘুরলি, এবার বক বক না করে কাজে হাত লাগা। সন্তু একা কি করছে না করছে, দেখ ওদিকটায়।
বড় ভাবী দেখতে না দেখতে ফুলপরীর মতো সাজিয়ে ফেললো সেমন্তিকে। চওড়া পাড়ের বাসন্তি রাঙা আটপৌরে করে জড়ানো শাড়ি আর হলুদ- লালে মেশানো ফুলের গহনায় কী যে মায়াময় লাগছে ! সেমন্তির টুকটুকে রাঙা ঠোটজোড়া মৃদু কাঁপন তুলছে গভীর ভাবাবেগের অজানা শিহরণে।
জ্ঞান হবার পর চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে ঘটনার ঘনঘটায় প্রথম দেখা হলেও এই যৌথ পরিবারেই জন্মেছিল সেমন্তি। বছর চারেক যখন ওর বয়স, রোড এক্সিডেন্টে মারা যান বাবা-মা। নানা বাড়িতেই মানুষ হয়েছে সেই থেকে। চাচা-চাচী যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতি বছর ছোট ভাইয়ের একমাত্র চিহ্ন সেমন্তিকে দেখতে যেতেন। তাদের মৃত্যুর পর আপন আপন বলয়ে ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত থেকেছে। দুরত্ব বেড়েছে মনেরও। এক সময় প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সবাই সেমন্তি নামে তরফদার বাড়ির দলছুট মেয়েটির কথা।
আঞ্চলিক জটিলতায় রূপক হঠাৎ জড়িয়ে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে একটা ভুলের আবর্তে। হূলিয়া জারির আতংকের তাড়নায় দিক বিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে পালিয়ে বেড়ায় এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত। এমনি ভাবেই বড় আপু একদিন হাতে ধরিয়ে দিলেন দেশের সীমান্ত এলাকার ঠিকানা। আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হতেও পারে। শহরের ব্যস্ততা, কোলাহল ছাড়িয়ে ঘুরে ঘুরে পৌঁছুলো রূপক ছোট নিরিবিলি শহরটায়। ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগের স্বল্পপরিসরে খান কয়েক কাপড় আর পায়ের চটি জোড়া সম্বল করে ঠিকানা মিলিয়ে পুরনো নোনা খসেপড়া বাড়ির দরজায় ঝোলানো শিকলে নাড়া দিল রূপক ঠুক, ঠুক, ঠুক। ভেতর থেকে মেয়েলি কন্ঠে সাড়া এলো- কে ?
– আমি তরফদার বাড়ি থেকে এসেছি।
খিড়কি খোলার সঙ্গে সঙ্গে কৌতুহলি চোখে আগন্তুককে না চিনেই চেচিয়ে উঠলো মেয়েটি –
– তরফদার বাড়ি ? মানে, আপনি কি দীপক ভাই ?
– দীপককে খুব চেন বুঝি ?
লজ্জা পেলো মেয়েটি – না, ঠিক চিনি না, তবে ও বাড়ির সবার নাম জানি না তো।
– শুধু বড় ছেলে দীপকের নামটাই জানো, এই তো। আমি সেই দীপকের ছোট রূপক। আর আমার ভুল না হয়ে থাকলে তুমি ছোট চাচার মেয়ে সেমন্তি অবশ্যই।
বড় বড় চোখে মাথা দোলালো সেমন্তি।
হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি নিজের হাতে নিতে নিতে বললো – ভেতরে আসেন। টানা লম্বা বারান্দায় চেয়ার টেনে দিয়ে বসতে বলে চেঁচিয়ে ডাকলো – নানী, তরফদার বাড়ির মেহমান এসেছেন।
ঘরের দরজা ঠেলে মোটা কাঁচের চশমা চোখে এগিয়ে এলেন বৃদ্ধা। সামনের চেয়ারটায় বসে রূপকের সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বললেন – বড় তরফদারের ছেলে বুঝি ?
– জ্বী, লেখাপড়া শেষ তো, ঘুরতে বেরিয়েছি সারাদেশ।
– ভালো করেছো এসে। সেমন্তি তো মাঝেমধ্যেই জেদ করে আজকাল পিতৃপুরুষের ভিটে দেখবে। আপন বংশের সবাইকে দেখবে। কিন্তু কে নিয়ে যাবে বলো। আমি তো তিন কাল যাওয়া মানুষ। তোমার নানাও চোখে দেখে না বছর কয়েক থেকে। একমাত্র ছেলে, মানে সেমন্তির মামা বছর দুই হলো দেশের বাইরে। সেমন্তি মেয়ে, যার তার সাথে পাঠাতেও পারি না। শুধু বলতাম – বংশের টানে ওরাই আসবে রে তোকে দেখতে। তাই তো হল রে সেমন্তি।
– তোর মামার ঘরটা খুলে রফিকের মাকে দিয়ে সাফ সুতরো কর আগে। কতটা পথ ভেঙে এসেছে, পরে গল্প হবে। আমি রান্না ঘরটা দেখছি।
সেমন্তিকে অনুসরণ করে উঠান পেরিয়ে দক্ষিণের উঁচু বারান্দা ছাওয়া ঘরখানায় ঢুকলো রূপক। জানলা দুটো খুলে দিতেই এক ঝলক আলো সারা ঘর ভরিয়ে দিলো। আলমারি খুলে বালিশের কভার আর বেডশিটটা পাল্টে রফিকের মাকে বললো – কলতলাটা পরিস্কার করে বালতি ভরে রাখো। তারপর রূপকের দিকে চেয়ে তাড়া দিল – আনেক কথা শুনবো রূপক ভাই। তার আগে ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে জার্নির ধকলটা কাটান তাড়াতাড়ি।
কোমরে ওড়না জড়াতে জড়াতে উঁচু বারান্দার দু’সিঁড়ি লাফিয়ে চলে গেল সেমন্তি। যেন এবারি প্রথম দেখা নয়। কি ভীষণ সাবলীল আর সহজ। যাক, একেবারে নতুন পরিবেশে দিনগুলো নিয়ে যতটা আশংকা করেছিল রূপক, এখন মনে হচ্ছে ভালই কাটবে।
বাপ-মা হারা মেয়েটি নানা-নানীর অনেক আদরে মানুষ হলেও ভারি চটপটে, হাসি খুশি হয়েছে। সবে স্কুল পেরিয়ে কলেজে পা রেখেছে, অথচ এরই মধ্যে বাড়ি সামলানোর গিন্নীপনাও রপ্ত করে নিয়েছে চমৎকার।
কাকডাকা ভোরে সেমন্তির কোলাহলে দিনের শুরু। পিঠের ওপর বাসি বেনী দুলিয়ে বাড়িময় ব্যস্ততা তার। হাঁস মুরগির ঘরে ছোট্ট দোরের কাঠটুকরা সরিয়ে ডাকে – আয় আয়, তই তই, তি তি। গোয়াল ঘরের খড়-বিচালি রাখাল ছেলে এত বড় করে কাটলো কেন ? খানিক গজগজ করে কালো ছাগলটার শরীর ঘেসে থাকা ছানাটিকে কোলে তুলে নিয়ে দাঁড়ায় রান্না ঘরের সামনে। গোলট্রেতে কাপ-পিরিচ সাজিয়ে রফিকের মা সাত তাড়াতাড়ি লম্বা বারান্দার কোনে রাখা টেবিলটায় হাজির হয় বাষ্পায়িত কেটলি নিয়ে।
নানা-নানী তসবী হাতে ততক্ষণে হাজির সেমন্তির খবরদারির ভয়ে। কোল থেকে ছাগল ছানাকে নামাতেই তিড়িং তিড়িং লাফিয়ে পৌঁছে যায় ছানাটি মায়ের ওমে। সেদিকে তাকিয়ে সেমন্তি চায়ের কাপে টুং-টাং শব্দ তোলে।
নানা-নানীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে নিজেও চুমুক দেয় সিঁড়িতে পা দুলিয়ে। রফিকের মাকে নাস্তার পাট বলে দিতে দিতে কোলের ওপর বইটি মেলে মৃদু দুলে দুলে ক্লাশের পড়া সারে। প্রাণবন্ত সকাল হওয়া অনুভব করে রূপক আলস্যিভরা আধো জাগরণে জানালার পাশটিতে শুয়ে শুয়েই। অবাক বিস্ময়ে ভাবে জগৎ সংসারে একা হয়েও মেয়েটি কেমন ভরিয়ে রেখেছে নিজেকে।
রাতের খাওয়া দাওয়া পাট চুকিয়ে নানীর পানটা সাজিয়ে দিতে দিতে কিংবা নানার অম্বলের ত্রিফলা ভিজাতে ভিজাতে রূপকের কাছে তরফদার বাড়ির গল্প শুনেছে গভীর আগ্রহ নিয়ে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছে সবাইকে। নিজ কল্পনায় গড়েছে এক এক করে চেহারা গুলোও।
সপ্তাহ দু’য়েকের মাথায় বড় আপুর চিঠি পেয়ে চিন্তা মুক্ত হল রূপক। ঝামেলা মিটে গেছে। সত্যিকার দোষীরা ধরা পড়েছে, আর ভয় নেই। রূপকের চাকরীর ইন্টারভিউ কার্ড এসেছে, সামনেই তারিখ। কোন ভাবেই মিস করা ঠিক হবে না। তাগাদা দিয়ে বড় আপু যেতে লিখেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। নানা সব শুনে বললেন – এতদিন পর নতুন করে যোগাযোগ যখন করলে ভাই, মাঝে মাঝে চলে এসো। আর একটা দায়িত্বও ভেবো। তোমাদের বাবা-মা থাকলে তারাই ভাবতেন। বলছিলাম সেমন্তির কথা। আমরা বুড়ো বুড়ি মানুষ। কখন কি হয়ে যায়। তোমরা ভাই বোনেরা সেমন্তির জন্য পাত্রটাত্র খুঁজো। আমরাও চেষ্টায় আছি। সুপাত্রস্থ করতে পারলে নিশ্চিন্তে মরতে পারতাম। নইলে যে বোঝা মাথায়, মরেও সুখ নেই। রূপক আশ্বস্ত করে বলে – ভাববেন না নানা, আমাদের সংসারের সব চিন্তার ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বড় আপু ঘোরেন। সেই ঝুড়িতে এই আর্জিটা পৌছে দিলেই হলো। আমাদের বাড়ি থেকে বড় আপুর বাড়ি দশ মিনিটের পথ। বাবা-মার অভাব বড় আপুর জন্যই টের পাই না আমরা। একটুও ভাববেন না নানা, আপনারা শুধু নন, সেমন্তির অনেক স্বজন আছে। আর যোগাযোগের ব্যাপারটা যখন এতদিন পরে চালু হয়েছেই একবার, আর বন্ধ হবে না কথা দিচ্ছি। সেমন্তি ওপাশ থেকে ফোড়ন কাটে – রূপক ভাই, আপনি কি কথা দিলে কথা রাখেন ?
রূপক হেসে বলে – পরীক্ষা নিতে চাইলে কথা আরো নিতে পারো।
অকারণে লজ্জা পেয়ে ওড়নার আঁচল খুটে সেমন্তি। ধীরে ধীরে বলে – পরীক্ষায় ফেল মারলে ?
মাথা ঝাঁকায় রূপক – বেশ তো, শাস্তিটা তুমি দিও। কিন্তু পাশ করলে …।
– কি ?..
– শুনলে না, নানার বোঝা নামানোর অর্জি পেশ করবো বড় আপুর ঝুড়িতে।
লজ্জায় লাল নীল হয়ে যায় সেমন্তি।
রূপক ভাবতেই পারেনি, বড় আপুর তদবিরটা এত জোরালো হয়ে আছে আগে থেকেই। এর আগে তিন চারটে ইন্টারভিউ যেমন দিতে যেতে হয়, তেমনি গেছে। চাকরি পাবার নিশ্চয়তা আছে কি নেই, সেটা ভাবারও ফুরসত রাখেনি। গত কিছুদিন ধরে ছুটে বেড়ানো আর মানসিক টেনশানে তেমন করে বই টইও দেখা হয়নি। একশ টাকার ব্যাংক ড্রাফট আর ফাইলভর্তি সার্টিফিকেটগুলোর পয়সা খরচ করা ফটোকপির দাবিতে ইন্টারভিউ কার্ড যেমন প্রতিবার আসে, এবারও এসেছে। মূল কাগজপত্র আর যতেœ ইস্ত্রি করা প্যান্ট-শার্ট পরে ফুলবাবুটি সেজে বের হবার মুখে বড় ভাবী প্রতিবারের মত দোয়া ফুঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন – আমার মন বলছে, এবার চাকরিটা হবেই।
দিন বিশেক পরে বড় আপুর ফোন পেয়েই প্রথম জানতে পারে রূপক, চাকরিটা তার অবধারিত। মিষ্টিমুখ করানোর কাজটাও বড় আপু সেরেছে। অবশ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে রূপক জয়েন করে আসার পর। বড্ড আমুদে আর ব্যতিব্যস্ত মানুষ বড় আপু। কাজ পাগল দুলাভাইকে বিরক্ত না করে নিজেই সব রকমের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে এদিক ওদিক ছুটছেন তো ছুটছেনই। নিজের অবসর বলতে কিছ ুনেই।
সেদিন বিকেল বেলা বাড়িতে হাজির হয়েই হাঁক ডাক রূপককে।
– কাল ভোরের ট্রেনের দু’টো টিকিট নিয়ে আয়, আর একটা কাগজে ভাল করে ম্যাপ এঁকে দিবি সেমন্তির নানা বাড়ির, যেন হয়রান হতে না হয়।
রূপক কপালে চোখ তুলে বলে – কালই যাচ্ছো ? সঙ্গে কাকে নিচ্ছ ?
– চাঁপাকে। পরীক্ষার পর থেকে বসে আছে।
– হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে যে। অবশ্য সেমন্তি তো হা করে বসে বসে আছে তোমার পথ চেয়ে।
– থাকবে না, রক্তের টান। আপন চাচাতো বোন, অথচ কেমন যে ছন্নছাড়া হয়ে দু’দিকে ছিটকে রইলাম আমরা। তোর কাছে ওর কথা শুনার পর বড্ডো অস্থির লাগছে মেয়েটার জন্য।
তিন দিনের জায়গায় পুরো সপ্তাহ কাটিয়ে বড় আপু ফিরলেন চাঁপাকে নিয়ে। সন্ধ্যেবেলা দুলাভাই সহ মিষ্টির প্যাকেট হাতে বেশ ঘটা করেই এবাড়িতে এলেন বড় আপু। রূপক দরজা খুলতেই হৈ হৈ করে উঠলেন দুলাভাই – অভিনন্দন শালা বাবু।
মিষ্টির প্যাকেটের দিকে চোখ বুলিয়ে হাসতে হাসতে বললো রূপক – চাকরি পাবার পর এনিয়ে অন্তত দশবার দেখা হয়েছে দুলাভাই আপনার সাথে। আজ নতুন করে অভিনন্দন যে। অবশ্য আপত্তি নেই, সঙ্গে এমন মিষ্টির প্যাকেট থাকলে।
– বাড়ির মুরব্বিদের ডাকো, মিষ্টির ব্যপারটা খোলাসা করি।
– মানে ?
বড় আপু রূপকের পাশে এসে বসলেন। ভুমিকা ছাড়াই খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন – সেমন্তিকে নিশ্চয়ই খারাপ লাগেনি তোর। এ কটা দিনে কেমন যে মায়া পড়ে গেছে ওর , ওপর। ভারি মিষ্টিও হয়েছে দেখতে। চাকরি-বাকরি হলো, এবার তো তোর গাঁটছড়া বাঁধার পালা। যদি তোর অপত্তি না থাকে সেমন্তিকেই পছন্দ করে এলাম।
রূপক এমন অকল্পনীয় প্রস্তাবে এমনই ’থ’ হয়ে গেল যে, কি বলবে কিছুই খুজে পেল না।
বড় ভাই-ভাবী আসতেই কী সব হৈচৈ শুরু করলেন। রূপক কিছুই যেন শুনতে পেলো না, দু’কান জুড়ে বড় আপুর প্রশ্নই বাজতে লাগলো – সেমন্তিকে তোর খারাপ লাগেনি নিশ্চয়ই ?
বড় আপুর হঠাৎ ঘটকালির ব্যাপার জানা গেল আদ্যোপান্ত শুনে। চাঁপাকে নিয়ে যেদিন পৌঁছুলেন সেমন্তির নানাবাড়িতে, সেদিন বাড়িজুড়ে মহা শোরগোল। পাশের গ্রামের চালের আড়তদারের একমাত্র পুত্র স্বয়ং দেখতে এসেছে সেমন্তিকে। ঘরভরা লোকের সামনে অনভ্যস্ত শাড়িতে আঁচল জড়িয়ে জুবুথুবু হয়ে নত মুখে বসে রয়েছে সেমন্তি।
মেয়ে পছন্দ হবার পর নানার সঙ্গে আলোচনায় বসলো ছেলে। বড় আপুকেও ডাকলেন নানা। ছেলেকে দেখে রীতিমত আঁৎকে উঠলেন বড় আপু। তেল জবজবে চুলগুলো কিছুক্ষণ পরপরই পকেটের চিরুনী বুলিয়ে পরিপাটি করছে। পান খাওয়া তরমুজের বিচির মত দাঁতগুলো বের করে নির্লজ্জের মত যৌতুকের দাবী-দাওয়া পেশ করতে থাকলো অনর্গল। আসর থেকে উঠে এলেন বড় আপু। কাছে ডাকলেন সেমন্তিকে। বিকেলের পড়ন্ত ম্লান আলোতে কান্না ধোয়া ঐ মুখখানি দেখলেন চেয়ে চেয়ে। কাজল আঁকা চোখ জোড়াতে কমনীয়তা ঝরে পড়ছে। জোড়া ভ্রুর মাঝখানে কারুকাজ করা টিপ অপরূপা করে তুলেছে। নীলাম্বরি শাড়িতে আঁচল জড়িয়ে অবাক হয়ে সেও দেখছে সদ্য আগত বড় আপুকে। সাদা পাথরে জ্বল জ্বল করা নাক ছবিটা সেমন্তিকে মোহময়ী করে তুলেছে আরো বেশি। চিবুক তুলে ধরে ডাকলেন বড় আপু – সেমন্তি ! এত্ত বড়টি হয়েছিস ?
কাংখিত ¯েœহের ওমে হু হু করে কেঁদে উঠলো সেমন্তি। বড় আপু তখনই মনে মনে বললেন, না কিছুতেই না, ঐ ছেলের হাতে এই কুসুম কোমল সেমন্তি বড্ড বেমানান। চাঁপার সাথে মনের ভাবটা প্রকাশ করতেই লাফিয়ে উঠলো চাঁপা – খুব ভাল হবে বড় আপু।
ব্যস । নানা-নানী রূপকের গুনমুগ্ধতায় বিভোর হয়ে মত দিলেন তক্ষুনি।
বড় আপু লেগে পড়লেন কোমর বেঁধে। বড় ভাই ভাবীকে রূপকের গার্জেন করে উনি কনে পক্ষ হয়ে গেলেন বিনা দ্বিধায়। ঠিক হল বড় আপু উনার বাসা থেকে কনে পক্ষের অনুষ্ঠান সারবেন। রাজি হলেন নানা নানী প্রসন্ন মনেই। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতায় উপস্থিত হতে পারবেন না – জানালেন।
বিয়ের দিন কয়েক আগে ছোট ভাই রন্তুর দায়িত্বে দেয়া হলো কনেকে আনবার। বড় ভাবীও সাড়ম্বরে প্রস্তুতি চালাচ্ছেন ছেলে পক্ষের আয়োজনের। দু’বাড়ি মেতে উঠেছে আর রূপক দো’তলার ঘরে বসে মাত্র ক’টি দিনের দেখা সেমন্তিকে ভাবতে থাকে। একবারও তো মনে পড়েনি, তখন এমন করে কাছে পাবার আকুলতা। অথচ বড় আপুর ইচ্ছেটা জানবার পর থেকে এত বেশি করে মনে পড়ছে কেন শান্ত ডাগর কাজল আঁকা চোখ দুটোকে। বড় আপু সেদিন সময়মত না গেলেতো কোন ভিনগ্রামে সেমন্তি চলে যেতো, আর দেখাই হত না, ভাবতে বুকের মাঝখানটায় কেমন চিন চিন করে উঠছে। নিজের আবেগ দেখে আপন মনেই হাসে রূপক।
সেবার ফিরে এসে সেমন্তি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে এমন কিছু কি অবচেতনে প্রকাশ পেয়েছিল বড় আপুর কাছে রূপকের, নইলে চট করে অমন একটা সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে ফেললেন কি করে ? আচ্ছা সেমন্তিও কি প্রথমে তার মত হকচকিয়ে যায়নি ? মনের মধ্যে উথাল পাথাল কথার ঢেউ কাউকে বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না রূপক। বড় আপু সব সময়ের সব ব্যাপারের বন্ধু হলেও এ সময় তার কাছে ঘেঁসা যাচ্ছে না- কনেপক্ষের গার্জেন যে।
চাঁপা যে কোন পক্ষের বোঝা দায়। বড় ভাবীর সঙ্গে এই যাচ্ছে গয়না পছন্দ করতে, আবার ছুটছে বড় আপুর ফোন পেয়েই ওবাড়ি, আলপনা আঁকতে। রন্তু সন্তু ছুটছে নিমন্ত্রণ করতে স্বজনদের বাড়ি বাড়ি। আর বড় ভাবীকে এসময় কিছু বলতে যাওয়া মানেই রং-তামাশায় নিজেকে রাঙা করে আহাম্মক হওয়া। কাগজ কলম টেনে ছেলেবেলার বন্ধুকে লিখলো-
রতন,
আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। না আসতে পারলেও চলে আয়। – রূপক।
চিঠির ভাষায় চমৎকৃত হয়েই হোক আর বন্ধুর আহবানেই হোক, রতন বৃহস্পতিবারে ছুটিটা ম্যানেজ করে রওনা হয়ে গেলো বন্ধুর বিয়ের নিমন্ত্রণে।
রূপকদের পরিবারের সঙ্গে স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ রতন। বিশেষ করে বড় আপুর ¯েœহছায়ায় কত দিন চলে এসেছে হুট করে। মাস ছয়েক হল চাকুরিসূত্রে অন্য শহরে আবাস রতনের। হৈ চৈ আর আনন্দ ওর নিত্যসঙ্গী। বাড়িতে আসতে না আসতেই হুল্লোড় শুরু করে দিলো। বড় ভবী দলে টানেন ছেলেপক্ষ হয়ে, বড় আপু কাজ চাপিয়ে নির্দেশ জারি করেন। এরই মধ্যে খবর এলো, সেমন্তি হলুদের পাটিতে বসে বড্ড নার্ভাস ফিল করছে। ক্রমাগত কেঁদেই চলেছে। রতনের ডাক এলো, স্বাভাবিক করতে পারে কিনা ব্যাপারটা হাল্কা করে। রতন সাত-তাড়াতাড়ি হাজির হলো। ব্যাপার যে গুরুতর, টের পেলো সবটুকু দেখে-শুনে। এ পরিবারের একমাত্র মুরুব্বি বড় ফুফু। ছোট-বড় যে কোনো অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সবার কাম্য। স্বতঃস্ফুর্তভাবে হাজিরও হন খবর পেলে। কিন্তু এবার আসা অবধি সবাইকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। সেমন্তি এবং রূপক দু’জনেই তার সমান আপন। আর এই আপনেই বেধেছে গোল। একটাই গোঁ ধরেছেন উনি – এ বিয়ে হতে পারে না, হবে না। বিয়ে বন্ধ কর। সবাই বুঝিয়েছে, আপনার জীবনে যা ঘটেছে , তার পুনরাবৃত্তি সেমন্তির জীবনে ঘটবেই – এ ধারনা ভুল। কিন্তু ফুফুর একই বুলি – আপন চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার তিন মাসের মাথায় উনি বৈধব্যের বেশ পরেছেন, সেই বংশে আবারও একই সম্পর্কে বিয়ে শুভ হতে পারে না এবং অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্নের আতিশয্যে প্রথমে ফুফুর অনুরোধ, পরে আদেশ এবং পরিশেষে অভিমানে-রাগে দু’চোখে অশ্রু ঝরিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতি অনন্দে কিছুটা ঝিমুনি এলেও বড় আপু গোপনে সন্তুকে ফুফুকে অনুসরণ করে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দিয়ে সবাইকে আপন আপন কাজে ব্যাতিব্যস্ত রেখে অটল থেকেছেন। কিন্তু আসল জায়গায় গড়বড় দেখে ঘাবড়ে গেছেন। বড় ফুফু দু’চোখের অঝোর ধারায় সেই যে সেমন্তিকে ভিজিয়ে গেলেন। সেমন্তি ধারাবাহিকতা টেনে শুধুই কেঁদে চলেছে নীরবে।
রতন বসলো গিয়ে আলপনা আঁকা পাটির একপাশে, সেমন্তির ঠিক পাশটিতে।
– আমি রতন। রূপক আমার কথা বলেনি – তাই না ? ঠিক আছে, আমি তাই তোমার বাবার বাড়ির পক্ষের সংখ্যালঘুত্বের কথা ভেবে তোমার আপনজন হবার চিন্তা সাব্যস্ত করলাম, আপত্তি নেই তো ?
কথার জবাব না দিলে কিন্তু চলে যেতে বলছো ভাববো।
অনড় হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল সেমন্তি।
– কিছু বলছো না যে, চললাম তাহলে।
কান্নাভেজা চোখে চাইলো সেমন্তি এবার।
মৃদু কন্ঠে বললো- আপনজন হলে আবার কেউ চলে যায় বিপদের মধ্যে রেখে ?
– এইতো ভাল মেয়ের কথা কিন্তু বিপদ কোথায় ? এ যে আনন্দ উৎসব।
– নিশ্চয় সব জানেন আপনি। সত্যি করে বলেন তো নিরপেক্ষ হয়ে, বড় ফুফুর কথা মানতে হলে কি আমার চলে যাওয়া উচিৎ ? উনি মিনতি করে গেছেন বারবার। কিন্তু বড় আপুর ¯েœহের উত্তাপে আমি যে নড়্ার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি। কি হবে আমার ?
– সবার কথাতো হলো। কিন্তু আসল মানুষটির কথা ভাবলে না একবারও ? রূপক যা চাইছে তাতে কি আপত্তি আছে, নাকি থাকতে পারে জিজ্ঞেস করো মনকে, ব্যাস সমাধান তোমার কাছেই।
-রূপক কি চায়, জানেন আপনি ? বলেছে কিছু ?
– হ্যাঁ, জানি, কিন্তু তার আগে বলো, বড় ফুফুর ভবিতব্য কি অন্ধকারের অনুমান নয়, আর বিয়েটা তোমার একার নয়, রূপকেরও।
– মানছি, কিন্তু রূপক কি চায়, বললেন নাতো !
জবাবাটা দেয়া হলো না বড় আপু সাড়ম্বরে চলে আসাতে। হলুদের মঞ্চ ঘিরে জড়ো হলো জনসমাগম। বড় আপু ছোঁয়ালেন প্রথম হলুদ। সেমন্তির কপালে উষ্ণ চুমু দিলেন তার আগে। নিজের কপালে রীতি অনুযায়ী একটা ছোঁয়া দিয়ে ফুলের টায়রা সাজিয়ে সেমন্তির কপালে, গালে, চিবুকে পরম ¯েœহে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। গভীর আবেশে সেমন্তির বিষন্ন মুখটি বদলে গেল যেন মুহুর্তে। ঝিলিক দেয়া সুখদৃষ্টিতে দু’চোখ বন্ধ করলো ঠোঁটে থিরথিরে কাঁপন তুলে।
খুব সন্তর্পণে আড়চোখে রতনের পানে মৃদু হাসির আভা ছড়িয়ে নিচু কন্ঠে বললো – জবাবটা না দিয়ে যাবেন না যেন।
হল্লা সেরে পরের দিন বিয়ের বাসরের সাজসজ্জা সমাপ্ত করে শুয়ে পড়তেই রতনের দু’চোখ এঁটে এসেছে মাত্র। দোরের মৃদু করাঘাতে কান খাড়া করতেই বড় আপুর কন্ঠ ভেসে এলো – রতন দরজাটা খোল, কথা আছে জরুরি।
তড়িঘড়ি করে লাইট জ্বালিয়ে দোর খুলতেই বড় আপু চিন্তিত মুখে ঢুকলেন। ভেতর থেকে দরজা ভেজিয়ে বসে পড়লেন সামনের চেয়ারে।
– এখন কি হবে বলোতো ? বিকেলের হুলুস্থুল মাত্র ম্যানেজ করে হলুদের ঝক্কি সারতে না সারতে আবারো বিপদ।
– বিপদ ? কিসের ?
তারপর বড় আপু যা বললেন শুনে তো রতনের চক্ষু চড়কগাছ। এর সমাধান যে কিভাবে কি দিয়ে শুরু করবে খুজে পাওয়াই দুস্কর। এদিকে সকাল হতেও দেরি নেই। ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটে প্রায়। সকাল সাতটা নাগাদ বিয়ে পড়ানো সময় নির্ধারিত। একটুও এদিক-ওদিক হবার উপায় নেই। ফিরে এসেছেন বড় ফুফু সন্তুর অনুরোধে পাকড়াও হয়ে। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ফুফু সময়ের হেরফেরে বাড়ি মাথায় করবেন নিশ্চিত। তার আগেই ব্যবস্থা যা করার করতে হবে।
রাত দু’টোয় নির্ঘুম চোখে ডেকে পাঠিয়েছেন বড় আপুকে, বিয়ের বাজার দেখবেন বলে। বড় আপু ফুফুর আগ্রহে খুশি হয়ে বড় ঘরের তালা খুলে বিয়ের বাজার আনতে গিয়ে দেখেন মস্ত বিপত্তি।
কিছুক্ষণ আগে সমাপ্ত হয়ে যাওয়া হলুদ অনুষ্ঠানের সরঞ্জামাদি চাঁপা রেখে গেছে এক পাশে তাড়াহুড়োয় জড়ো করে। তালা বন্ধ করে যথারীতি চাবিও দিয়ে এসেছে বড় আপুর আঁচলে। বিয়ের বাজারের বিভিন্ন প্যাকেট রাখা ছিল। তার পাশেই লোড শেডিংয়ের সময় জ্বালানো মোমবাতির চোখ এড়ানো মৃদু আগুন ধিক ধিক করে ছড়িয়ে পড়েছে দু’তিনটে প্যাকেটে। তাড়াতাড়ি ওগুলো টেনে বের করতে গিয়ে দেখেন বড় আপু, বিয়ের বেনারসির প্যাকেটের ভেতরের সবটুকুই আক্রান্ত। ভাঁজে ভাঁজে খুলে পড়ছে লাল বেনারসি।
আপাতত বড় আপু ঘুমিয়ে পড়েছেন, খবর পাঠিয়ে ফুপুকে থামানো হয়েছে। কিন্তু সকাল বেলা সব জানতে পেরে কুরুক্ষেত্র কি পরিমান বাঁধাবেন তাতো অনুমেয়। জীবনে ঘা খাওয়া ফুফু মনকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েছেন, অন্তর থেকে দো’য়া দরুদ দিয়ে বিয়ের বেনারসি মুড়িয়ে দিবেন এই সান্ত¡Íনায় বুক বেঁধেছেন। আর এমন বিপত্তি শুনলে উনি নতুন করে মুষড়ে পড়বেন। সবচেয়ে বড় কথা, সেমন্তির কচি মনের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বইয়েছেন, আবার উল্টাপাল্টা মাথায় কিছু ঢুকালে ওর মানসিক চাপ বাড়বে, অসুস্থ হয়ে পড়বে মেয়েটা নির্ঘাত। আর জানা জানি হলে পোড়া শাড়ির অপবাদ পোড়া কপালে এসে ঠেকবে পাঁচ মুখেও।
রতন গায়ে শার্টটা গলিয়ে বড় আপুকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে – ঘাবড়াবেন না বড় আপু। আমাকে বরং সন্তুর সাইকেলের চাবিটা দেন, দেখি কি করা যায়। পোড়া শাড়িটা আড়াল করে ফেলেন ভোর হবার আগেই।
ফাঁকা রাস্তায় আধ ঘন্টায় পৌছে গেল কাপড়ের বাজারে। সুনসান নীরবতা শাটার ফেলা সারি সারি দোকান গুলোতে। পথের নেড়ি কুকুর গুলো কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে কোথাও কোথাও। প্যাকেট অনুসারে সামনের সাইনবোর্ড সনাক্ত করে শুভেচ্ছা বস্ত্রালয়ের পেছনের গলিতে সাইকেল থেকে নামলো রতন। পেছনের দরজায় বার কয়েক ঘা দিতেই ভেতর থেকে ভারি গলা ভেসে এলো – কে ? এত রাতে কি চাই ?
রতন যতটা পারলো বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই ঘটনার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বললো অনুনয়ের সঙ্গে।
জানালা খুলে প্যাকেটটি দেখলো লোকটি, মনে করে বললো – হাঁ, বিয়ের বাজার করে নিয়ে গেছে বেনারসি শাড়ি সহ। কিন্তু লাল বেনারসি একটাই আছে বর্তমানে। অন্য কোয়ালিটি, দাম এটার মত নয়, একটু বেশি।
রতন বুঝলো সবই, সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইছে লোকটি। সাইকেল ঘুরিয়ে আবার এল বাড়িতে। জানালায় অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে বড় আপু। বাকি টাকা কটি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরলো রতন।
অবশেষে নতুন লাল বেনারসি নিয়ে এল রতন আলো আঁধারি ভোরে। শীতের রাতে ঘেমে নেয়ে সাইকেল থেকে নামলো জানালার পাশে। পাল্লা বন্ধ। টুক টুক করে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। প্যাকেটটা জানালা গলিয়ে ভেতরে দিতেই সামনে চেয়ে আঁৎকে উঠলো। স্বয়ং ফুফু দাঁড়িয়ে। পাশে বড় আপু পোড়া শাড়ির অংশ হাতে।
রতনের কি করা উচিত কিছু মাথায় এলোনা সে মূহুর্তে, ঘামে জবজবে শার্টটা খুলে নিজ বিছানায় গিয়ে অপরাধির মতো শুয়ে পড়লো। আর কান খাড়া করে রেখে ভাবছে এই বুঝি বড় ফুফুর ত্রাহি কান্না শুরু হবে ইনিয়ে-বিনিয়ে। তারপর এক সময় ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে বেরিয়ে যাবেন।
আর সেমন্তি ? ওর ম্লান মুখটা মনে হতেই কেমন কষ্ট লাগে রতনের। আর ভাবতে ইচ্ছে করে না কিছু।
হঠাৎ রতনকে অবাক করে দিয়ে বড় আপুর কন্ঠ ভেসে আসে ওপাশ থেকে। না, স্বান্ত¡না নয়, রীতিমত বড় ফুফুর সাথে হাসতে হাসতে কথা বলছেন। বড় ফুফু বড় আপুর নাম ধরে দরাজ গলায় বলে চলেছেন – তুই পারিসও বটে। আমি ফজরের নামাজ সেরে ভাবলাম তুই জেগেছিস নাকি দেখি। হঠাৎ এ ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে দেখি তুই পোড়া শাড়ি হাতে দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করবো কি ব্যাপার, এরই মধ্যে জানালার ধাক্কায় পাল্লা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঐ ছেলেকে দেখি প্যাকেট বাড়িয়ে দিল আমাকে। খুলে তবেই না বুঝলাম।
সবটুকু অশান্তি উবে গেছেরে, আমার সেমন্তির পোড়া কপালের ফাঁড়া শাড়ির ওপর দিয়ে কেটে গেছে। ছেলেটাকে ডাকতো একটু, বড্ড সুন্দর শাড়িটা এনেছে রাত-বিরেতে হয়রান হয়ে। আমি ততক্ষণে সেমন্তিকে উঠাই গিয়ে। নতুন জীবনে পা দেবার দিন, অত ঘুমুচ্ছে কি করে।
– কইরে সেমন্তি উঠ। শুভ দিনের শুরুটা কি চমৎকার দেখবি না ?
রতনের বুক থেকে ভারি পাথরটা নেমে গেলো অজানা আশঙ্কার। জানালায় তাকিয়ে দেখে লাইট পোষ্টের আলোগুলো নিভে যাচ্ছে একএক করে। পাখির কিচির-মিচির শুরু হয়েছে। সারা বাড়িটাও জেগে উঠেছে কোলাহলে।
রতনের দু’চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমের প্রশান্তিতে। পাশের ঘর থেকে রূপকের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কাকে যেন জিজ্ঞেস করছে – রতনটা ওঠেনি এখনও ? টই টই করে অনেক রাতে শুয়েছে বুঝি ? ডেকে দে ওকে, বাড়িটা জমছে না ওকে ছাড়া।
রতন হাসলো কম্বলটা টেনে নিতে নিতে। মনে মনে বললো, আমার কাজ তো শেষ। দিনের সূচনা বাপু তুই দেখ। আজ তো তোর বিয়ে।
এরপর সমাপ্ত হলো শুভ কাজ কোনো বিপত্তি ছাড়াই।
কিছুদিন পর হঠাৎ করেই স্কলারশিপ নিয়ে রতন চলে গেছে দেশের বাইরে। চিঠিতে প্রথম প্রথম যোগাযোগ থাকলেও পরে এক সময় যোগাযোগহীন হয়ে পড়েছে। রূপক সেমন্তির সংসারটা দেশে ফিরে গিয়ে এক চোট ঘুরে ফিরে দেখবে, ভেবেছেও মাঝে মাঝে। দেশেও ফিরেছে বছর পাঁচেক পর। কিন্তু অন্য শহরে অফিসের ব্যস্ততা থাকায় হয়ে ওঠেনি।
এক লম্বা জার্নিতে অফিসের কাজে ট্রেনে চেপে এক গাদা ম্যাগাজিন খুলে আয়েশ করে চোখ বুলাচ্ছিল রতন। হঠাৎ কোন এক স্টেশন আসাতে হুড়মুড় করে লোকজন উঠলো কিছু। তার মধ্যে থেকে – রতন ভাই না ?
মেয়েলি কন্ঠে, চমকে তাকিয়ে যাকে দেখলো রতন ঠিক চিনে উঠতে পারলো না। মুখোমুখি সিটটায় বসে চেনা চেনা চেহারার মহিলাটি হাসলো আবারও – আপনজনকে ভুলে গেছেন ?
মনে পড়ে গেল মুহুর্তেই সেদিনের হালকা পাতলা গড়নের দেখা আজকের পরিবর্তিত সেমন্তিকে।
– কেমন আছো তুমি ? রূপক ? তোমাদের সংসার ?
– বহাল তবিয়তে।
বলে চলে সেমন্তি রূপকের কথা, সন্তানের কথা, সংসারের কথা।
বান্ধবির বাসা থেকে বিশেষ কাজে ফিরছিল সেমন্তি এই ট্রেনে, তা ও বললো।
এক পর্যায়ে বললো – আমাদের সেই বড় ফুফুর কথা মনে আছে রতন ভাই ?
– তা আবার থাকবে না ? উনার আঁধারি ভবিতব্যে কেঁদে সারা হচ্ছিলে তুমি সেদিন। কেমন আছেন উনি ?
– বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন একেবারে। প্রায় ছুটে আসেন আমাদের সংসারে। মাঝে মাঝে আমার মাথায় হাত রেখে বলেন – তোর ফুপা বেঁচে থাকলে তোর মত সোনার সংসার আমারো হোতোরে।
– যাক উনি খুশি হয়েছেন তাহলে। রতন হেসে বলে।
– শুধু কি খুশি, মাঝে মাঝেই আমাদের তিন বছরের মেয়ে টুম্পাকে আদর করে বলে – দোয়া করি মননের ঘর আলো করিস বড় হয়ে। মননটা কে বুঝলেন কি রতন ভাই ? হাসতে হাসতে প্রশ্ন করে সেমন্তি। জবাবটা দিতে হবে কিন্তু।
জবাবটা দেয়া হয় না। ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটা থেমে যেতেই বাংকারে রাখা ব্যাগটা নামিয়ে তড়িঘড়ি করে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ঠিকানা সম্বলিত কার্ডটা হাতে ধরিয়ে বারংবার আমন্ত্রন জানাতে জানাতে নেমে পড়ে সেমন্তি।
ধীরে ধীরে দুলে উঠে চলতে শুরু করে ট্রেনটা আবারো। রতন চলন্ত ট্রেনের জানালায় দেখে প্লাটফর্মে দাঁড়ানো হাওয়ায় গোলাপি আঁচল উড়িয়ে হাত নাড়ছে হাসিভরা সেমন্তির সুখী মুখখানা।
রতনের মনে পড়ে যায় হলুদের মঞ্চের সেই মৃদু কন্ঠ – জবাব না দিয়ে যাবেন না যেন।
চলন্ত ট্রেনে সেমন্তির দেয়া কার্ডের ঠিকানায় চোখ বুলাতে বুলাতে মনে মনে বলে রতন – মনন ? নিশ্চয় চিনেছি, সুখী হোক আগামী প্রজন্ম একই ধারায়।*************
ফাহমিদা রিআ
*************6 Comments
Friends
Fahmida Akter
@fahmida420
র. জামিল
@r-jamil
Diponkor Sharma Partho
@parthodip218
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
@ashraful710
Tapan Debbarma
@tanu48
Rahnuma Nira
@tamannahtasneem90
Nahian Hasan
@hasan009
Zahidul Jamy
@zahidul
AdabenTatali
@adabentatali



বেশ ভালো লিখেন আপনি।