Profile Photo

Fahmida-Reea-Fahmida-ReeaOffline

  • Fahmida-Reea-Fahmida-Reea
  • Profile picture of Fahmida-Reea-Fahmida-Reea

    Fahmida-Reea-Fahmida-Reea

    4 years ago

    #ছোট গল্প
    #ক্ষত

    ছুটির দিনে এমনিতেই আয়েশ করে ঘুম ভাঙ্গে নিবিড়ের । আজ চোখ মেলতেই মাথার কাছে রাখা ছােট্ট ত্রিপায়ার ওপর জিইয়ে রাখা টকটকে গােলাপটাকে দেখে চেয়ে চেয়ে ।
    তারপর চুলােয় চায়ের পানি বসিয়ে খুব ফুরফুরে মেজাজে হাত – মুখ ধুয়ে দু’খানা বিস্কিট পিরিচে সাজিয়ে চায়ের কাপ হাতে দখিনের জানালাটা খুলে দুলুনি চেয়ারটায় গা এলিয়ে বসে । এক ঝলক হাওয়া এসে চিলেকোঠার এই ছােট্ট ঘরটায় আদর ছুইয়ে যায় দুলে দুলে । ইট , কাঠ আর আকাশ ছোঁয়া দালান ছাপিয়ে বিস্তৃত দিগন্ত মনটায় ভােরের পরশ বুলায় । জানালা ঘেঁষে উঠে আসা মাধবীলতা ঝাড়ের ফাঁক গলিয়ে নরম আলােয় দৈনিকটায় চোখ বুলায় নিবিড় । শুক্রবারের এই আলস্যি ভরা সকালটার প্রতি এক ধরনের মােহ অনুভব করে নিবিড় সপ্তাহের শুরু থেকেই । আপনাতে আপনি বিভাের গােছর প্রশান্তি নিয়ে গুনগুন করে দু’লাইন গানের কলি ভাজে ।
    “এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না মন উড়েছে, উড়ুক নারে মেলে দিয়ে গানের  পাখনা”………

    —– ভাইজান নাস্তা পানি কি করতে হইব কন তাড়াতাড়ি , বাজার সদাই কইরা রান্না সাইরা বহতা আপাগাে বাড়িত যামু । ও বেলায় আইতে পারুম না।

      ঠিকে ঝি আয়মুনার বাজখাই গলায় সুরচ্ছেদ হয় নিবিড়ের ।
    —– কি ব্যাপার বুয়া , এই সাত সকালে তােমার এত তাড়া যে ।
    ঘর ঝাট দিতে – দিতেই ব্যস্ত আয়মুনা যা বললাে তার সার কথা- আজ বহতার বিয়ে । গতরাতে হঠাৎ করেই পাত্রপক্ষ দেখতে এসে এনগেজমেন্ট রিং পরিয়ে গেছে । আজ সন্ধ্যায় বিয়ে । ছেলের খুব তাড়া , প্রবাসী ছেলে ছুটি শেষ । এই শেষ বেলাতেই মেয়ে যখন পছন্দ হয়ে গেল , কাজটা সেরে ফেলতে চায় তাই তাড়াতাড়ি ।

    নিবিড়ের এতক্ষণে খেয়াল হলাে, তাইতাে ওপাশ থেকে পায়রার বাকুম বাকুম শব্দ  ছাপিয়ে শোরগােলের হালকা আওয়াজ আসছে । জানালার গ্রীল ধরে নিচে দৃষ্টি পড়তেই দেখলাে, ব্যস্ত চলাচল ওপাশে ।
    বহতা আর উদিতা । দুই বোন আর বাবা – মার ছোট্ট সংসার ওদের । প্রায় বছর তিনেক হলাে নিবিড় এ এলাকায় । চাকরির মাস দুই পরে মেসের কষ্টকর জীবন ছেড়ে এক কলিগের সহায়তায় তিন তলার এক চিলেকোঠার খোঁজ পেয়েছিল নিবিড় । সেই থেকে দিব্যি নিরিবিলি জীবনটা নিজের মতাে করে সাজিয়ে নিয়েছে । ঢাকার অন্যান্য জায়গার তুলনায় এ এলাকাটায় যান্ত্রিকতার দাপট নেই । পুরাে আবাসিক এলাকা বলেই হয়তােবা । ছোট্ট এক কামরায় একদিকে লাগােয়া রান্নাঘর অন্যদিকে বাথরুম পেছনে খােলা ছাদ অনেকখানি জুড়ে ।

    সেবার দেশ থেকে মা দিন পাঁচেক থেকে যাবার সময় বলে গেলেন ,
    —–ভাল চাকরি করছিস , পদোন্নতি হচ্ছে, বড় দেখে বাসা – টাসা নে , ঘর দোর গুছিয়ে বােস। সংসার করতে হবে না ?

    কথাটা সত্যি । নিবিড়ও আজকাল প্রায় ভাৰে একটা সংসার গড়ার কথা । লাল বেনারসীতে ঘােমটা মুড়ি দিয়ে লাজরাঙা একটা বউ আসবে – তার একাকীত্বের কষ্ট দূর করতে । ঘুরবে, ফিরবে, হাসবে আর মাঝে – মধ্যে খুনসুটি করে রাগিয়ে দেবে, মান ভাঙ্গাবে । দুর্মুল্যের বাজারে হিসেব – নিকেশ করে দুজনে কখনও ভয়ানক ঝগড়া বাঁধাবে,বিরহের সমঝোতার পর মিলনের আনন্দে ঘুরে বেড়াবে – বয়ে যাওয়া নদীর পাশ দিয়ে মেঠো পথ ধরে পাহাড় ঘেঁষা কোনাে গ্রামের প্রান্তরে ।

    দু’চারটে বাসাও দেখেছে এর মধ্যে । কিন্তু জোছনা রাতের এই খােলা স্থানে জীবনানন্দ আবৃত্তি কিংবা দখিনের জানালা খুলে বর্ষা রাতে বৃষ্টি পড়া সুর ‘ “রিমিঝিমি রিমিঝিমি নামিল দেয়া ‘ সুরের আবেশ এই ঢাকা শহরের কোনাে বাড়িতেই যে পাওয়া যাবে না । আসলে এই তিনটে বছরেই চারপাশের সাথে খুব বেশি একাত্ব হয়ে গেছে নিবিড় । বাড়ি বদলের ভাবনা ঝেড়ে ফেলে সান্ত্বনার বাণী খুঁজে ভেবেছে- “ ঘরণীর সন্ধান মিলুক তবেই তো।

    নিচ থেকে উদিতার কষ্ঠ কানে আসতেই নিচে তাকালাে নিবিড় –
    —–“বাবা ডাকছেন চলে আসুন , কাজে হাত লাগাতে হবে “।
    নিবিড় হাত তুলে সম্মতি জানিয়ে সরে এলাে জানালা থেকে । আয়মুনা এরই মধ্যে নাস্তা টেবিলে দিয়েছে ।খেয়েই মােড়ের লন্ড্রিতে কাপড় টা নিয়ে ফেরার পথে উদিতাদের বাসায় একবার ঢু মেরে যাওয়া দরকার । উদিতার মুখে সারাক্ষণ লেগে থাকা হাসিটা আজ যেন আরও বেশি উজ্জ্বল মনে হলাে । হবেই তাে – সিরিয়াল যে এমন চট জলদি পেয়ে যাবে ভাবেনি ।
    বেরুনাের জন্য তৈরি হতে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে আপন মনেই হাসে নিবিড় । উদিতার চেয়ে তার খুশিই কি কম । এটা তাে অস্বীকার করার উপায় নেই । আয়মুনার কাছ থেকে বহতার বিয়ের খবর শােনার পর জানালায় দাঁড়িয়ে নিবিড় এক প্রস্থ স্বপ্ন দেখে ফেলেছে উদিতাকে ঘিরে ।
    টুং – টুাং শব্দে কলিং বেল বেজে উঠতেই আয়মুনা তার স্বভাবসিদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠে,
    —–ভাইজান ও ভাইজান – ঐ বাড়ির চাচাজানে আপনেরে ডাকতে লােক পাঠাইছে ।

    আয়মুনাকে ছুটি দিয়ে নিবিড়ও নেমে আসে নিচে । এরই মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে বাড়িটায় । ছাদে সামিয়ানা টাঙানাে । রান্নাঘরের পেছনের ফাঁকা জায়গায় জারুল গাছের নীচে বড় বড় দুটি উনুন বানানাে হয়েছে ইট দিয়ে । ছােটখাট আয়ােজন । জনা – পঞ্চাশেক লােক আসবে বরযাত্রীতে । ঘরােয়া ভাবে খুব স্বল্প সময়ে সারতে হচ্ছে শুভ কাজটা ।
    নিবিড়কে ডেকোরেশনের দায়িত্ব দিয়ে উদিতার বাবা ছুটলেন আরেক কাজে । টানা বারান্দার এক কোণে গায়ে হলুদের তত্ত্ব সাজানাে হয়েছে । এক গাদা ফুলের ডালা নিয়ে উঠোনে মােড়া পেতে বসেছে উদিতা ফুলের গয়না বানাতে । মাঝে মাঝে খবরদারি করছে আশপাশের কাজের ।
    নিবিড়ের সাথে চোখাচোখি হতেই হাসি ছড়িয়ে বলে- —–গােলাপটা পুরাে ফুটলে আজ খোঁপায়
    পরতাম ।
    নিবিড় জবাবে হেসে বলে,
    —– ফুটেছে , অপেক্ষা করুন ।

    চোখে – মুখে হাসি ঝরা এই উদিতাকে যেদিন প্রথম দেখে নিবিড় কি ভয়ার্ত মুখই না ছিল সেদিন । তখন বছর দেড়েক হয়েছে নিবিড়ের এ – এলাকায় । জানালা খুললেই চারদিকের গাছ – গাছালিতে ভরা পাশের একতলা বাড়িটির ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ‘ দেখে মফস্বল শহরের তাদের বাড়িটির কথা মনে পড়ে যায় । পুই – লাউয়ের বেড়ে ওঠা ডগা রান্নাঘরের চাল ছুঁয়ে যাওয়া টসটসে সবুজ পাতাগুলি চোখ জুড়িয়ে দেয় । তার উপর চারটে বাঁশের খুটিতে উঁচু করা পায়রার খােপে দিন – রাত বাকুম বাকুম আওয়াজ ঢাকার বুকে দুর্লভ শান্তির সন্ধান যেন । মাঝে মাঝে উঠোনে সর্ষে ছড়িয়ে পায়রা ডাকতে দেখা যেতাে উদিতা কিংবা বহতাকে । ব্যস ঐ পর্যন্তই মুখ চেনা পরিচয় ।

    রাত দশটার খবর শুনে প্রতিদিনের মতাে খাবার গরম করার জন্য চুলাে জ্বালতেই কলিং বেলের মুহুর্মুহু শব্দে খানিকটা বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে নিবিড় । এত রাতে উস্কোখুস্কো চেহারা আর দু’চোখে রাজ্যের আতংক নিয়ে দাঁড়িয়ে উদিতা , সংগে কাজের বুয়া । কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই উদিতার রুদ্ধ কণ্ঠ শােনা যায়-
    —–আমাদের বাসায় একবার আসবেন ? খুব বিপদে পড়েছি । বাবা বাসায় নেই , নিরুপায় হয়েই এসেছি । প্লিজ আসুন , আমার সাথে ।

    নিবিড় কোনাে কথা না বাড়িয়েই উদিতার পিছে পিছে নেমে আসে । গেট খােলাই ছিল । ড্রইংরুম পেরিয়ে করিডাের দিয়ে একেবারে অন্দর মহল।বয়স্ক এক মহিলার কোলে মাথা রেখে অসুস্থ এক তরুণী ।
    উদিতা অনেক পরিচিতের মতাে করে নিবিড়কে দেখিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাে ,
    —– অবস্থা তাে দেখলেন । এম্বুলেন্স কি এত রাতে পাওয়া যাবে ?
    বয়স্ক মহিলাটি ক্রমাগত অধীর হয়ে মেয়েটির মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে রােদনের সুরে ডাকছেন, —–বহতা ……. বহতা …….
    বহতার নিঃসাড় দেহে  মুখে ফেনা দেখে অবস্থার দিক নির্ণয়ে সময় নষ্ট না করে গলির মােড় থেকে একটা স্কুটার নিয়ে ফিরে এলাে নিবিড় ।
    উদিতার সাথে ধরাধরি করে স্কুটারে তুলে সােজা ইমারজেন্সী ওয়ার্ড ।
    ডাক্তার আর যমের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বহতার নাকে – মুখে নল ঢুকিয়ে এ যাত্রা থেকে তাকে উদ্ধার করে আনে নিবিড় – উদিতা । রাতদিন পালা করে পাহারা দিয়েছে দু’জনে । কেন এই আত্মহত্যার পথ নিবিড় জানতে চায়নি । উদিতা অবশ্য বলতে চেয়েছে , নিবিড় বাধা দিয়ে বলেছে – উনি আগে পুরােপুরি সুস্হ হয়ে উঠুন – আপনি নিজেও ক্লান্ত ।

    উদিতার বাবা অফিসের ট্যুর সেরে ফিরেছেন এর সপ্তাখানেক পর । ও বাড়ির বুয়া এসে খবর দিয়েছে, উদিতার বাবা নিবিড়কে ডেকে পাঠিয়েছেন ।

    সেই শুরু । এরপরে দু’চারবার যখনই নিবিড় ওবাড়ি গিয়েছে , উদিতার বাবা – মার কাছে থেকে সহজ স্বাভাবিক আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারই পেয়েছে ।

    বহতার সাথে অবশ্য কখনই কোনাে কথা হয়নি । টানা – টানা গভীর কালাে চোখ দু’টিতে শীতল দৃষ্টিই দেখেছে সব সময় ।
    আর উদিতা ? বহতার উল্টো পিঠ । ওর মুখে লেগে থাকা হাসিটি দেখে মনেই হবে না ও মেয়ে কখনাে মন খারাপ করতে পারে , জ্বলজ্বলে চোখ দু’টিতে লােনা পানি কখনই আসতে পারে না বুঝিবা । এ বছরই বিএসসি পাস করে একটা স্কুলে ঢুকেছে । সারাক্ষণই আনন্দ খুঁজে কথা বলে রসিকতা করে , যেন সিরিয়াস কিছুই নেই জগতে ।

    নিবিড়ের কল্পনা বিলাসী মনে এক সময় কখন যেন ঠাঁই করে নেয় উদিতার হাসি মাখা মুখ , চপলতা আর উচ্ছলতা ।
    ষ্টাফ বাস থেকে নামতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় উদিতার সাথে ফুলের দোকানের সামনে । নিবিড় ঠোঁট টিপে হেসে বলে,
    —– কি ব্যাপার ? কার জন্যে ফুল ?

    চোখের তারা নাচিয়ে হাসে উদিতাও, বলে
    —— কোন ব্যাপার হয়নি এখনও । তবে যদি হয় তাই অর্ডার দিয়ে রাখলাম ।
    নিবিড় দুষ্টুমি করে
    —–যদির অপেক্ষায় খালি হাতে ফিরবেন ? তারচে ‘ আমি আপনাকে গিফট করি ? কোন ফুল পছন্দ আপনার ? তােড়া বানাতে বলি ।
    —–সর্বনাশ ভুলেও এমন সখ করবেন না । আমার বােন বহতার মতাে ডুববেন , একেবারে ইমারজেন্সী ওয়ার্ড । বহতার শুরু তাে এই ফুলের তােড়ার মাঝে , মন যে কখন চালান হয়ে গেছে নিজেও টেরটি পায়নি ।
    নিবিড় শান্ত শান্ত স্বরে বলে ,
    —–বহতার মনের মূল্য এক নির্বোধ বােঝেনি বলে কি এত এত মনগুলাে সব মূল্যহীন হয়ে যাবে ? কই বললেন না তাে কি ফুল আপনার পছন্দ । এতক্ষণ ফুলের দোকানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি কিছু একটা না কিনলে কেমন দেখায় বলুন তাে ।
    উদিতা স্বাভাবিকভাবে বলে ,
    —– তা বেশ তাে কিনতে হয় কিনুন।কালচে রঙা ঐ গােলাপ কুঁড়িটা নিন । দু’একদিনে ফুটে যাবে , পানিতে জিইয়ে রাখবেন । একেবারে টকটকে লাল গোলাপ হবে ।
    নিবিড় তাই কিনে । বলে
    —– চলুন এগােই । এটা কিন্তু আপনার জন্য ।

    উদিতা হাঁটতে হাঁটতে বলে
    —–উঁহু , আমি ওসব বােধ নির্বোধের মনের দর কষাকষিতে নেই ।
    —–কিন্তু কেউ যদি যে কোনাে মুল্যে ও মন কিনতে চায় ।
    উদিতা এবার চলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে । সরাসরি চোখে চোখ রেখে বলে ,
    —–আপনিই বলুন কত দামে দেয়াটা উচিত হবে ?

    নিবিড় একটু চমকে যায়, উদিতার চোখের তারায় ছলকে ওঠা প্রশ্ন দেখে । নিজেকে সামলে নিয়ে বলে —–নিজের মনের উপযুক্ত দামের মন পেলেই দেয়া উচিত ।
    উদিতা রহস্যময় হাসি হেসে বলে ,
    —–বেশতাে দিলাম ।
    ততক্ষণে বাড়ির গেটে এসে পড়ছে ওরা । নিবিড় বার দুই ঢােক গিলে অনেক কষ্টে জিভের আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে বলে
    —–ফুলটা নেবেন  না?
    —–নেব । কিন্তু এখন নয় । কারণ কথা তাে সবই ব্যক্ত । গােলাপ কুঁড়ির অব্যক্ত উপমা বেমানান এখন । প্রস্ফুটিত গােলাপটা আমারই জানবেন ।

    নিবিড় আর দাঁড়াতে পারে না । কিছু  না বলেই চিলেকোঠার উদ্দেশ্যে সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতে শুনতে পায় উদিতার কণ্ঠ- ‘
    —– আরে আরে চলে গেলেন যে , এক কাপ চা খেয়ে যান অন্ততঃ, বাড়ির দরজা থেকে চলে গেলেন কিন্তু…….

    সামনে গায়ে হলুদের আসনে বহতা গাঁদা ফুলের গয়নায় ফুলপরীর মত বসে আছে ।
    মেয়েলী সংস্কারে হলুদ ছুঁইয়ে দিচ্ছে একে একে । কনের পাশে বসা উদিতার লাল রঙা তাঁতের শাড়ি , কপালে রাঙা টিপ ছাপিয়ে কাঁধের ওপর এলাে খোঁপায় নিবিড়ের দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় – লাল গোলাপের অপেক্ষায় ।

    চিলেকোঠা থেকে তখনই ফিরে আসে নিবিড় । উদিতার মুখােমুখি দাঁড়িয়ে বাড়িয়ে দেয় লাল গোলাপ । মুগ্ধ হয়ে দেখে উদিতার মুখের হাসির সাথে তাল মিলিয়ে হাসছে খােপায় গোঁজা টকটকে গােলাপটিও তক্ষুনি । চোখাচোখি হতেই ফিসফিসিয়ে শুধায় উদিতা –
    —– কি মনে হচ্ছে ?
    নিবিড় আড় নয়নে তাকিয়ে বলে
    —–হিসেবে গড়মিল ।
    —–কোথায় ?
    —–সুন্দরে সুন্দরে । আপনার মুখের হাসি নাকি ফোটা গােলাপের হাসি ? সমান সমান ।
    —–কি করে ? মুল্য দিয়ে ফোটা ফুল তাে মনেরই ব্যক্ত কথা । আর হাসি? সে তাে বহিঃপ্রকাশ।
    ——মনেরই সম্মতির। 
    —–ডুবেছেন বলুন ।
    –—তার মানে ইমারজেন্সী ? উদিতা  হাসির দমকে আঁৎকে ওঠে বলে।
    নিবিড় চোখ নাচিয়ে হাসে
    —– -উহু , আমি নির্বোধ নই ।
    —–বেশ তাে বহতা বিদেয় হলেই আপনার বুদ্ধির দৌড় দেখাবেন ।
    চোখে মুখে লাজ ছড়িয়ে আবারাে ব্যস্ততায় মিশে যায় উদিতা । তদারকি সম্পন্ন করে বিকেলের দিকে রুমে ফিরে এলাে নিবিড় । একটু গড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই তৈরি হয়ে পৌছুবে বিয়ের আসরে । এরই মধ্যে কখন যে নিবিড় ঘুমিয়ে পড়েছিল।

    কলিং বেলের একটানা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে চেয়ে দেখে রুম অন্ধকারে ছেয়ে গেছে । লাফিয়ে উঠে আলাে জ্বেলে দরজা খুলতেই দেখে আয়মুনা দাঁড়িয়ে । নিবিড় অপরাধী কণ্ঠে বলে
    —— ওরা ডাকছে বুঝি ? ছিঃ ছিঃ কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । বরযাত্রী এসে পড়েছে ? গিয়ে বলাে আমি আসছি এক্ষুনি ।

    আয়মুনা মেঝেতে বসে পড়ে ক্লান্ত ভংগিতে
    —–আর গিয়া কি হইব ভাইজান । বিয়া হইলে তাে ? বহতা আপার এইডা উচিত হইছে কন ? আগে যদি অন্য পােলার লগে বিয়া রেজষ্ট্রি কইরাই রাখছস, তয় এত ভান ধরবার কি দরকার আছিলো । বাপেরে কি অপমানটাই না করলাে , চাচাজান আর বাঁচাবাে না ভাইজান , এত বড় শোক আল্লায় সওয়াইলে অয় ।

    নিবিড় যখন উদিতাদের বাসায় উপস্থিত হলাে কোলাহল থেমে গেছে ততক্ষণে । পাগড়ি আর শেরওয়ানী পরা বর যথারীতি আসরে বসে । কাজী সাহেবের সাথে বরপক্ষ ও কনপক্ষের লােকদের কি সব লেখাজোখার কাজ চলছে । ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা লােকজন কেমন যেন নীরব , নিশ্চুপ । সবই আছে শুধু প্রাণের স্পন্দন নেই যেন ।

    এদিক – ওদিক তাকিয়েও উদিতাকে চোখে পড়ে না নিবিড়ের । ভেতরে মেয়েদের ভিড়ের জটলা , অতিথিদের জন্য রাখা চেয়ারগুলাের দিকে পাড়ার রাজীবকে দেখে এগিয়ে গেল নিবিড় । রাজীবের পাশের চেয়ারটায় বসতেই গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাে
    —–ওদিকে কি খবর নিবিড় ভাই ? ভালয় ভালয় কাজ সারা হলেই হয় এখন ।
    নিবিড়  কিছু না বুঝেই জিজ্ঞেস করে
    —–বহতাকে নিয়ে কি সব গন্ডগােল শুরু হয়েছে শুনলাম ।
    রাজীব অবাক স্বরে বলে- শুরু কি বলেছেন ? গন্ডগােলের তাে শেষ ঘটালাে রাজকুমার এসে । কি চাপা স্বভাবের মেয়ে দেখুন । বছর দুই আগে চুপিসারে কোট ম্যারেজ করে রেখেছে , কাকপক্ষী টেরটিও পায়নি । তারপর কি সব ঘটনা । দু’জনের মধ্যে মনােমালিন্য, যােগাযােগের বিচ্ছিন্নতায় বহতা তাে কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে গিয়েছিল। ঘরকুনাে বনে গিয়েছিল একেবারে । আর তাই বিয়ের সম্বন্ধটা আসতেই সময়ের স্বল্পতায় সাত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গিয়েছিল বহতার বাবা । কিন্তু ভাগ্যের লিখন দেখুন , ঘন্টা খানেকের মধ্যে পট পরিবর্তন হয়ে গেল যার যার ভাগ্যের । বিয়ের জমজমাট আসরে বহতার সেই বর হাজির প্রামাণ্য দলিলের আট ঘাট বেধে । সরাসরি কাবিননামা দেখিয়ে বহতার হাত ধরে নাটকীয় কায়দায় সবার সামনে বেরিয়ে গেল , পলকহীন দৃষ্টি নিয়ে দেখলাম শুধু ।

    নিবিড় অস্ফুট স্বরে বললাে
    তাহলে বরপক্ষের লােকেরা দেখে শুনে এখনও ……….।
    কথা কেড়ে নিয়ে রাজীব আবারও বলা শুরু করলাে ——বহতার বাবাকে তাে স্বয়ং বরই বাঁচালাে । নাটক বলে নাটক , আপনি তাে শেষ অংকে এলেন । বহতার বাবা ভরা আসরে করজোড়ে দাঁড়িয়ে অপমানে , লজ্জায় উত্তেজিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন । বর স্বয়ং উঠে এসে বহতার বাবার দু’হাত ধরে প্রস্তাব দিলেন, যা ঘটবার তাতে ঘটেছেই ভাগ্যের লিখন অনুসারে । আমরাও খালি হাতে ফিরতে চাই না । আপনার আপত্তি না থাকলে ছােট মেয়েটির জন্য প্রস্তাব রাখছি । যদি রাজি থাকেন আর দেরি করবেন না ।
    নিবিড়  কথার মাঝে উৎকণ্ঠিত স্বরে বলে ওঠে হঠাৎ —— উদিতারও তাে মতামত থাকতে পারে ।
    —–আর মতামত ? এত বড় একটা ঘটনার পর সমাধানের পথ , যেখানে ওর বাবার বাঁচা মরার প্রশ্ন সেই অসহায় বাবা যখন উদিতার দু’হাত ধরে ঝরঝর করে কেঁদে বললেন ‘ আমাকে বাঁচা মা । ‘

    নিবিড় স্থির কণ্ঠে শুধু বললাে – তারপর ?
    —–যেমন দেখছেন , একটু আসি ওদিকটা দেখে ।

    হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া বাড়িটা আবারও হঠাৎই যেন ব্যস্ততা বেড়ে গেলো।ক্যাসেটে সানাইয়ের সুর । ঘটনার আকস্মিকতায় এতক্ষন খেয়ালই করেনি নিবিড় পরিস্থিতির পরিবর্তন ।

    বরযাত্রীর গাড়ি দুটো সরগরম হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে । লাল হলুদ সবুজে সাজানাে দুধসাদা গাড়িটিকে ঘিরে ছেলেমেয়েদের জটলা সরিয়ে পাগড়ী পরা বরের পিছু পিছু ঝকমকে উড়নায় ঘােমটা ঢাকা উদিতা। বধু সাজে সাজানাে দু’চোখের ব্যাকুলদৃষ্টির ভাষা দূর থেকে নিবিড় টের পায় গভীরভাবে ।
    এ ব্যাকুলতায় লেখা কাংক্ষিত মুখের অনুসন্ধানের ভাষা। নিবিড় পড়ে ফেলে অন্তদৃষ্টি দিয়ে। আর বাইরের দৃষ্টিতে দেখে খোঁপায় গোঁজা বিকেলের টকটকে লাল গােলাপের পাপড়ি গুলাে ছড়িয়ে পড়েছে পথে , যে পথ মাড়িয়ে উদিতাকে ওরা সাজানাে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছে ।

    এক সময় গাড়িটা চলতে শুরু করলো । নিবিড়ের খুব পাশ দিয়ে যাবার সময়, মুহূর্তের জন্য উদিতার চোখের সেই দৃষ্টিতে নিবিড়ের চোখ ধরাও পড়লো। সেটা বিদায়ের নাকি ভালবাসারই ঘায়ে মাড়িয়ে যাবার উপযুক্ত মুল্যের , নিবিড় বুঝে উঠতে পারলো না , কারণ তার দু’চোখ তখন পানিতে ঝাপসা ।

    ————————-
    ফাহমিদা রিআ
    ————————-

    5
    4 Comments
Skip to toolbar