-
#বৌমাও কন্যা হতে পারে……
ঘুম ভাঙতেই কিচেন থেকে পানি পড়ার শব্দ কানে আসে মাসুদার। এত সকালে বুয়া? চটজলদি চোখে মুখে পানি দিয়ে বাসি চুলে চিরুনি বুলিয়ে কিচেনে ঢুকেন।
তুলি গ্লাসের স্টান্ডটা হাতে ঝুলিয়ে ডাইনিং এ যেতে যেতে একটু হাসি দিলো মাসুদাকে দেখে। যেন এমনটিই হয়ে আসছে এতদিন। অথচ সপ্তা খানেক হয়েছে, তুলির এ বাড়িতে বৌ হয়ে আসবার। বিয়ে, বৌভাত, ফিরানি শেষে গতকাল থেকেই অতিথ স্বজন বিদায় নেয়ায় বাড়িটা স্বাভাবিক হয়েছে।
—– মা, বুয়ার কাছে পানির মাপটা জেনে আটা খমির করে ফেলেছি। ঠান্ডা হতে হতে আপনাকে এক কাপ চা দিবো?
—– আমারতো খালি পেটে চা এর অভ্যেস নেই বৌমা।কদিনেই মেয়েটাকে কেমন যেন আপন আপন লাগে মাসুদার।
অথচ, বৌ শাশুড়ির চিরাচরিত সম্পর্ক টা নিয়ে একটা ছবি তৈরি ছিল মনে। তার চুয়ান্ন বছরের জীবনে সে মোটামুটিভাবে নিজেকে একটা অবস্হানে দাঁড় করিয়েই ফেলেছিল নিশ্চিতভাবে।
বৌমা যে তাকে পছন্দ করবে না এটা যেমন ঠিক, তিনিও বৌমাকে ভালবাসতে পারবেন না এটাও ঠিক। মোদ্দা কথা, দুজন দুজনের প্রতিপক্ষ হবেন, এটাই যেন নির্ধারিত। নিজের মন গড়া কিছু ভয় থেকে মনের তাগাদা অনুভব করেন নি ছেলের বিয়ে দেবার।
ছেলের যা ইচ্ছে তাই করবে। তিনি কে?আর তাই একমাত্র ছেলে অয়ন যখন নিজ পায়ে দাঁড়ানোর পর ওর পছন্দের কথা জানালো, একটুও অমত করেন নি মাসুদা। অয়নের বাবা সাদাসিদে মানুষ। ছেলের পছন্দে অমত নেই তারও।
ক’দিনের মধ্যেই উনি মাসুদা আর অয়নকে নিয়ে এনগেজমেন্ট রিং পরিয়ে এলেন তুলিকে। মাস খানেকের মধ্যে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে তুলিকে বৌ করে তুলেও আনলেন সাধ্যমত অনুষ্ঠান সেরে।
মাস ছয়েক যখন নির্বিবাদে পার হয়ে গেলো মাসুদা নিজেও অবাক হয়ে খেয়াল করলেন শাশুড়ি হিসেবে তিনি নেহাৎ খারাপ নন। নইলে তুলির যত্ন আত্তিতে ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন কি করে।
মেয়েটা দুদিনের জন্য বাবার বাড়ি গেলে ওষুধ খেতে ভুল হয়ে যায় কেন? কেনই বা এত বছরের রুটিন মাফিক কাজ মশারি টাঙানোতে আলসেমি ভর করে।
তবে কি মাসুদা ধীরে ধীরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন তুলির উপর?অথচ তুলির আসার আগ পর্যন্ত মাসুদা জানতেন, তার অপারগতার কথা। পরকে আপন করতে না পারার অপারগতা। পূর্ব অভিজ্ঞতাতো তাই বলে।
বাবার বাড়ির একমাত্র মেয়ে হিসেবে তার পছন্দেই তিন ভাইয়ের বৌ আনা হলেও পরবর্তীতে তার সাথে কারো সম্পর্কই ভালো হয় নি। বৌরা আড়ালে আবডালে বলে বেড়ায়, বড় আপা যা জটিল মনের মানুষ ছেলের বৌ নিয়েও চলতে পারবে না ভবিষ্যতে।
পরের বাড়ি চলে যাওয়ার পরও বাবার বাড়ির খবরদারি ছাড়তে পারলো না বড় আপা। আর সেই মানুষ কিনা ছেলের বৌকে নিজ সংসারের চাবি ধরতে দিবে, হুঁউ।মাসুদার তখন বয়স কম, অভিজ্ঞতা আরো কম। দু’ কথা শোনাতে গিছয়ে দুশো কথা হজম করতে হতো। ভাইদের কাছে বিহিত করতে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে শুনেছে বৌদের বলা হুবহু উপদেশমুলক রেকর্ড গুলো।
বাড়ির একমাত্র মেয়ে হয়ে আশা ছিল ভাইদের বৌরা এলে তিনটি বোন পাবে।
আশায় ছাই দিয়ে দিনে দিনে টের পেলো মাসুদা, পরতো আপন হলোই না,
উপরন্তু নিজ ভাইরাও পর হয়ে গেলো।,আগে নিজ সংসার থেকে বাবার বাড়ি গেলে ফিরতে মনই চাইতো না। অথচ ধীরে ধীরে কখন থেকে যেন বাড়িটা আকর্ষন কমতে লাগলো।
প্রথম ধাক্কাটা এলো, বুয়ার কথায়। কিছু করতে বললেই বৌদের অনুমতির বাহানা করে। শুরুতে হুলুস্হুলও বাঁধে। বড় ভাইয়ের হস্তক্ষেপে ঠিক হয়, আদর আপ্যায়নে ত্রুটি না হলেই হলো। দুদিনের অতিথি রান্নাঘরে ঘেমে নাইতে যাবার দরকার কি।মাসুদা প্রথমদিকে খুব কষ্ট পেতো ভাইদের আচরণে। তার আশৈশব বেড়ে ওঠা ঘর দোর উঠোন কিছুই আর তার নেই। না থাকুক। কিন্তু সেতো এ বাড়ির মেয়ে, মেহমান হতে যাবে কেন?
একসময় মান অভিমানগুলো গা সওয়া হতে হতে অনুভুতিটাই হারিয়ে গেলো। সংসার বাড়লো, বাড়লো ব্যস্ততা। ভাইবোনের সম্পর্ক হয়ে গেলো লৌকিকতার। আচার অনুষ্ঠান ছাড়া যাওয়া হয় না, দেখাও না।
কয়েক বছর থেকে শারীরিক অসুস্হতার বাহানায় মাসুদা নিজেকে আরও খানিকটা গুটিয়ে নেয়। পা মাড়ায় না ভাই আর ভাই বৌদের আলোচনার বস্তু হতে।
সবার আদরে, সম্মানে, ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা মাসুদা কিছুটা বিপর্যস্তও হয়ে পড়ে মানসিকভাবে।মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী তুলি , শাশুড়ি মায়ের এই ভীতিটাকে বুঝতে সক্ষম হয়েছে অল্প কিছুদিনেই। হঠাৎ পাওয়া দুঃখগুলো কারো সাথে শেয়ার করার কেউ ছিল না মাসুদার। মা কিংবা বোন অথবা মেয়ে কেউ একজনও থাকলে হয়তো দিনের পর দিন অব্যক্ত কষ্টগুলো কঠিন বরফে রূপান্তরিত হতো না।
জমাট বাঁধতো না নিজের প্রতি ব্যর্থতার গ্লানি।তুলি যতটা সম্ভব সময় দিতে লাগলো শাশুড়ি মাকে। সেদিন সকাল বেলায় নাস্তার টেবিলে রঙিন কাগজে মোড়ানো প্যাকেটটি মাসুদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে টুপ করে পা ছুঁয়ে বললো,
—– শুভ জন্মদিন মা।
ভীষন অবাক চোখে তাকালেন মাসুদা প্রথমে স্বামীর দিকে,তারপরে অয়নের দিকে। ওদের স্বাভাবিক মুখ দেখে মনে হলো ব্যাপারটা পরিকল্পিত।তুলির হাসি মুখটার দিকে তাকিয়ে প্যাকেটটি খুলতেই এ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন বেরিয়ে এলো।
মাসুদা সেটি তুলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
—— এটার কিছুই বুঝি না আমি। তার’ চে বরং তুমি যেমন করে ফেসবুকের গল্প শোনাও আমাকে, তেমনি শুনিও।
—– উঁহু এটা আপনার জন্য মা। আপনি নিজেই এখন থেকে আপনার ইচ্ছেমত গল্প পড়বেন, গান শুনবেন, মজার মজার রেসিপি দেখে আমাকে নতুন নতুন রান্না শেখাবেন।—– পাগল মেয়ে একটা। এসব আমার কম্মো নয়। আমার দ্বারা সম্ভবও নয়।
—– অবশ্যই সম্ভব। চটজলদি নাস্তা সেরে আপনি আর আমি ক্লাশে বসবো এখন। যতদিন আপনার শিক্ষানবীস কাল চলবে ততদিন রান্না হবে শর্টকাট। আমি আজ থেকেই বুয়াকে নিয়ে বিষয়টা এগিয়ে রেখেছি মা। বাবা আর অয়নেরও সায় আছে এতে।মাসুদা অপলকে দেখেন তুলির অনর্গল বয়ে যাওয়া আনন্দগুলোকে।
অয়ন আর অয়নের বাবা নিজ নিজ চায়ের কাপ নিয়ে স্হান ত্যাগ করে তুলির কর্মকান্ডের সাক্ষ্য দেবার ভয়ে। ভাবখানা এমন যেন ক্লাশরুমে ছাত্র শিক্ষক ছাড়া বাকিরা বেমানান।মাসুদা মনোযোগী ছাত্রীর মত রপ্ত করে ফেলেন অনেক কিছুই।
একদিন লম্বা সময় ধরে ছোট্ট স্ট্যাটাস লিখে পোস্ট দেন,
” বৌমাও কন্যা হতে পারে”।তুলি কমেন্টে লিখে বড় করে,
“হুম্, যদি সেই বৌমা কন্যা হতে চায়। আর কন্যা হবার শর্ত একটাই কথায় কথায় অভিযোগ বাক্সে ( স্বামীর কর্ণ দ্বয়) মন্তব্য ছোঁড়া থেকে বিরত থাকা।
ব্যস।”
——————————–
ফাহমিদা রিআ
——————————–5 Comments
Friends
Fahmida Akter
@fahmida420
র. জামিল
@r-jamil
Diponkor Sharma Partho
@parthodip218
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
@ashraful710
Tapan Debbarma
@tanu48
Rahnuma Nira
@tamannahtasneem90
Nahian Hasan
@hasan009
Zahidul Jamy
@zahidul
AdabenTatali
@adabentatali


সুন্দর গদ্য। অভিনন্দন।