Profile Photo

কাব্যOffline

  • Farvez
  • Profile picture of কাব্য

    কাব্য

    • 1 month, 1 week ago

    উপন্যাস – মৃত্তিকার নির্বাসন
    পর্ব – ১

    তিন দিন ধরে বৃষ্টি।
    এই গ্রামের মানুষ বৃষ্টির সঙ্গে অপরিচিত নয়। বর্ষা এলে নদী ফুলে ওঠে, খাল-বিল পানিতে ভরে যায়, কাঁচা রাস্তা কাদায় মিশে যায়। ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে তবু মানুষ বৃষ্টিকে ভালোবাসে। কারণ এই বৃষ্টিই ধানের শিষে প্রাণ আনে, পুকুর ভরায়, শুকনো মাটির বুক নরম করে।
    কিন্তু সব বৃষ্টি সুখ হয়ে আসে না।
    কিছু বৃষ্টি মানুষের ঘরে ঢুকে চুলার আগুন নিভিয়ে দেয়।এবারের বৃষ্টিটা তেমনই।
    তিন দিন ধরে আকাশের মুখ ভার। ভোর রাইতের কোনো হিসাব নেই। দিনের আলোও যেন কেমন অন্ধকার হয়ে আছে। টিনের চালের ওপর একটানা বৃষ্টির শব্দ ঝমঝম, ঝমঝম।
    চাল বেয়ে পানি নামছে দীর্ঘশ্বাসের মতো
    সুপ্রিয়া ঘরের কোণে বসে খালি হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল। আজ রাতে রান্না বসানোর মতো একমুঠো চাউলও নেই।
    দুপুরে যে কয়টা ছিল, সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে।
    সুপ্রিয়া হাঁড়ির ঢাকনাটা তুলে আবার তাকাল। তলায় দু-একটা ভাতের দানা শুকিয়ে লেগে আছে।বআঙুল দিয়ে একটা দানা তুলে নিল সে।মুখে দিল না।
    আবার হাঁড়ির ভেতর রেখে দিল।
    হে খোদা.. আর কয়দিন না খাইয়া থাকমু।
    কথাটা তার মুখ থেকে বের হলো নিঃশ্বাসের মতো।
    মনুষের বাড়ি কাম কইরা কোনো রকমে সংসারটা টেনে নেয় সুপ্রিয়া। ভোরে ঘুম থেইকা উঠে অন্যের বাড়ি ঝাড়ু দেয়, বাসন মাজে, কারও উঠান পরিষ্কার করে। দিন শেষে যে কয়টা টাকা হাতে আসে, সেই টাকাতেই চাল, ডাল, লবণ, তেল—সবকিছুর হিসাব।
    সংসারে হিসাবের শেষ নেই। শুধু টাকার অভাব আছে।তিন দিনের বৃষ্টিতে তার কাজ বন্ধ।
    যাদের বাড়িতে কাজ করে, তারাও ঘর থেকে বের হয় না। রাস্তা কাদায় ডুবে গেছে। হাঁটু পর্যন্ত পানি কোথাও কোথাও।
    চুলায় আগুন নেই।ঘরে চাউল নেই।
    আর তার ছেলেটার পেটে ক্ষুধা।সুপ্রিয়া নিচু গলায় বলল,
    আমি না হয় না খাইয়া থাকলাম। পোলাডারে কী দিমু?
    পাশের ঘর থেকে সঙ্গে সঙ্গে বিরুর গলা ভেসে এলো
    মাগী আবার শুরু করছস?
    সুপ্রিয়া চুপ করে রইল কিছু বললেই মারতে আসবে।

    বিরু দরজার পাশে বসে তাস খেলছিল। সামনে কয়েকটা ভেজা তাস ছড়ানো। দুপুর থেকে পাশের গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে বসে জুয়া খেলেছে।
    কত টাকা হারিয়েছে, কত টাকা জিতেছে সুপ্রিয়া
    কিছুই জানে না।জানতেও চায় না।
    সে শুধু জানে, ঘরে চাউল নেই অথচ বিরু সারাদিন ঘরে বসে ছিল ।
    সুপ্রিয়া ধীরে বলল চাউল নাই ঘরে। তাইলে?
    পোলাডা খাওন চাইতেছে।
    বিরু তাসের দিকে তাকিয়েই বলল,
    প্রতিদিন একই ঘ্যানঘ্যান! চাউল নাই, ডাল নাই, পোলা খাইবো—এই এক কথা! আমি কি চাউলের গাছ লাগাইয়া রাখছি?
    সুপ্রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
    চাউলের গাছ না লাগাইয়া কামটা করতে পারতা।
    বিরু মারতে এসে ও হাত থেমে গেল।
    সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। বেশি কথা কইস না সুপ্রিয়া।
    বেশি কথা কইতেছি না। পোলাডার খিদা লাগছে।
    তোর পোলার খিদা লাগে, আমার লাগে না? সুপ্রিয়া তাকিয়ে রইল।
    এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তার জানা নেই। বিরু তাসগুলো গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল।
    আমি বাইরে যাইতেছি।কই যাইবা?
    তোরে কইয়া যাইতে হইবো?আবিরু বেরিয়ে গেল।
    সুপ্রিয়া দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
    বৃষ্টির মধ্যে কিছুক্ষণ পর বিরুর ছেহারা ও আর দেখা গেল না।
    এই মানুষটাকে সে একসময় চিনত।
    বিয়ের প্রথম বছর বিরু মাঠে কাজ করত। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরত। হাতে টাকা থাকলে বাজার থেকে সুপ্রিয়ার জন্য কাঁচা মরিচ, শুঁটকি কিংবা কখনো একটা মিষ্টি নিয়ে আসত।
    তখন তাদের ঘরে অভাব ছিল।কিন্তু অশান্তি ছিল না।
    অভাব মানুষকে সবসময় ভাঙে না।
    কখনো কখনো মানুষকে ভাঙে—অভাবের কাছে বারবার হেরে যাওয়ার লজ্জা। বিরু সেই লজ্জাটার কাছে আধা মরা হয়ে গেছে।
    সুপ্রিয়া জানে না, কোথায় থেকে তার স্বামী বদলে গেল।
    শুধু জানে, এখন বিরুর কাছে তাসের শব্দ অনেক সময় তার সন্তানের কান্নার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
    হঠাৎ ছোট ছোট পায়ের শব্দ শোনা গেল।
    রনি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বয়স আট কি নয়। গায়ে পুরোনো একটা গেঞ্জি। হাঁটুর কাছে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট। চুলগুলো এলোমেলো। মা… সুপ্রিয়া তাকাইয়া
    কী হইছে ক ? রনি পেটের ওপর হাত রেখে বলল,
    মা, খাওন দেও। খিদা লাগছে।
    সুপ্রিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

    সে রাগান্বিত হয়ে বললো খাবার কি তোর বাপ আনছে? কই থেকে দিমু আমি।
    রনি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আজ ভাত হইবো?
    সুপ্রিয়া কিছু বলতে যেও আর বলল না।রনি আবার বলল, পেটে জানি কেমন করতেছে মা।
    সুপ্রিয়া ছেলেটাকে কাছে টেনে নিল।একটু থাক বাবা।
    রনি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল বৃষ্টি থামলে আমি নদীর ধারে যামু।
    ক্যান? জাল ফেলমু। বড় মাছ ধরমু।
    সুপ্রিয়া রাগ যেন ক্ষবিকেই মাটি হয়ে গেল মৃদু হেসে বলল,
    তুই মাছ ধরবি? হ। মাছ ধরলে কী করবি?
    রনি খুব স্বাভাবিক গলায় বলল একটা বেচমু। আর একটা তোমারে দিমু।vসুপ্রিয়ার হাসিটা মিলিয়ে গেল।
    রনি বুঝতে পারল না। সে আবার বলল,
    আমি বড় হইলে তোমারে আর কাম করতে দিমু না।
    সুপ্রিয়া ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
    তুই বড় হ। তার গলা কেঁপে গেল।
    রনি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কান্দো ক্যান? কই? কান্দি নাই তো।
    চোখে পানি। সুপ্রিয়া জানালার দিকে তাকাল। বৃষ্টির পানি আইছে।রনি বিশ্বাস করল।
    তারপর মায়ের কোলে মাথা রেখে চুপ করে রইল সুপ্রিয়া রান্নাঘরের দিকে গেল। খালি হাঁড়িটা হাতে তুলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ঘরের পুরোনো কাঠের বাক্সটা খুলল।
    কাপড়ের নিচে একটা ছোট্ট পিতলের নাকফুল।বিয়ের সময় তার মা দিয়েছিল। এইটুকুই এখন তার শেষ সম্বল। নাকফুলটা হাতে নিয়ে সুপ্রিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
    মায়ের কথা মনে পড়ল—
    সংসারে যত কষ্টই হোক এইডা আগলাইয়া রাখিস। মেয়েমানুষের শেষ সম্বল।
    সুপ্রিয়ার চোখ ভিজে উঠল। বসে নাকফুলটা আঁচলের কোণে বেঁধে ফেলল। আজ এটা বিক্রি করবে।
    যেভাবেই হোক, রনিকে ভাত খাওয়াবে। ঠিক তখনই বাইরে কারও গলা শোনা গেল—
    বিরু! ও বিরু!
    সুপ্রিয়া দরজার দিকে তাকাল। বৃষ্টির মধ্যে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
    বিরু ঘরে নাই? সুপ্রিয়া বলল, না। কই গেছে জানি না।
    লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল আইলে কইস, স্বপন আইছিল।
    তারপর লোকটা বৃষ্টির মধ্যে চলে গেল। সুপ্রিয়া নামটা মনে রাখল, স্বপন।
    বিরুর বন্ধু। এর আগে কয়েকবার নামটা শুনেছে।
    কিন্তু লোকটাকে কখনো ভালো করে দেখেনি। বাইরে বৃষ্টি আবার জোরে নামতে শুরু করেছে।
    সুপ্রিয়া দরজাটা বন্ধ করে দিল। রনি তখনও মাটিতে বসে একটা কাঠি দিয়ে কাদার মধ্যে নদী আঁকছে।
    মা, দেখো। এইডা নদী, হুম।
    এইখানে আমি বড় মাছ ধরমু। সুপ্রিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল।
    তারপর খুব আস্তে বলল, আল্লাহ, আমার পোলাডারে তুমি ভালো রাইখো।
    বাইরে নদীর পানি বাড়ছিল। গ্রামের মানুষ তখনও জানত না—এই বৃষ্টির পানি শুধু তাদের উঠানেই ঢুকছে না।
    কোনো এক অদৃশ্য স্রোত ধীরে ধীরে তাদের জীবনগুলোকেও ভাসিয় নিয়ে যাচ্ছে। আর সেই স্রোতের শুরু কোথায় । তা তখনও কেউ জানত না।

    ~ কাব্য

    3
    3 Comments
    • ক্ষুধার সংসারেও মা রয়ে যায় শেষ আশ্রয়, নদীর স্রোতেও ভাসে না মমতা…..🤍

    • আপনার এই উপস্থাপনায় বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের সাথে অভাবের যে নিদারুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা পাঠকের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। বিশেষ করে সুপ্রিয়ার নিঃশব্দে নাকফুল হাতড়ে বেড়ানোর দৃশ্যটি এবং ছোট শিশুর সরল আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বাস্তবধর্মী হয়ে উঠেছে। আপনি চাইলে পরবর্তী অংশগুলোতে এই পরিবারের প্রতিকূল লড়াইয়ের দিকটিকে আরও সংলাপে ও বর্ণনায় ফুটিয়ে তুলতে পারেন, যা আপনার লেখনীকে নিঃসন্দেহে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে।

    • দারুণ, চালিয়ে যান।

Skip to toolbar