মা: নিজস্ব সিনেমা হলে একা একা
এক তলা বাড়িটার উঠান থেকা কখনোই দূরের আকাশটারে অতটা দূরের মনে হইতো না, তখনো সাবেকী আমলের এক তলার ছাদে খাড়াইলে লক্ষ্মীবাজারের হলিক্রস চার্চের ক্রসটা দেহা যায়। সকালে বিকালে চার্চের ঘণ্টার আওয়াজও হুনা যায়। এক তলার উঠান থেকা ৪ ধাপের মই বায়া পাকের ঘরের চালে, চাল থেকা দেয়ালের উপর দুই পা দিয়া পার হয়া দাদাভাই এর ঘরের চাল থেকা এক তলার ছাদে গিয়া আমার মাস্তানির আখড়া। পরিবারের চাইরদিকে ছোটকাল থেকা কবুতর বাজ গো ইনফ্লুয়েন্সে সেই ছোটকালেই কবুতরের নেশা পায়া গেছিলো। বাপ আর মা এর কবুতর প্রীতির কারণে কোনোদিন কবুতর পালতেও সমস্যা হয় নাই, আরামসে কবুতরের বাচ্চা উঠাইতাম আর উড়াইতাম।
গিরিবাজের যাতনা বহুত, অনেক উড়ে। ভালো জাত হইলে একবার উঠলে ৬ ঘণ্টার আগে নামনের নাম নাই। আমার জিন্দেগির এইরকমই এক স্মৃতিময় গিরিবাজের গল্প আমারে ঘিরা আছে ছোটকাল থেকা। যেন একটা কবুতর না, আমার পরিবারের সদস্য সে। সকালে ছাড়লেই সে তার পরিবার নিয়া উইঠা যাইতো চাঙ্গে, কবুতর বাজরা যারে কয় পিন হয়া যাওন্তিস। আসমানে উড়তে উড়তে একটা কবুতর যখন একটা সুই-এর মাথার মতন বিন্দু দেহা যায় ওইটারেই পিন কয় আর কি। তার সমস্ত পরিবার পরিজন হাপায়া নাইমা যাওনের পরও সে নামতো না, সকালে ৭ টায় উড়লে দশটার আগে নামার নাম নাই। আর আসমান যদি ঘন নীল আর বাতাস যদি ফুরফুরা থাকতো তাইলে নির্ঘাত বারোটা। চাইরদিকের সমস্ত বড় কবুতর বাজগো মনে হিংসা জ্বালায়া দিয়া লাল গলাআলা সেই মর্দা গিরিবাজ কারো দিকে না তাকায়া নাইমা আইতো এক তলার ছাদে আর আমার আয় আয় ডাক পাইলে ছাদ থেকা চাল, চাল থেকা উঠানে নাইমা হাপুস হুপুস গম,ধান আর মুসুরির দানা খায়া নিতো পেট ভইরা। আর আমি না থাকলে ও তার কোনো সমস্যা হইতো না। পাকঘর থেকা ঝাল ঝোলের বাগাড়-এর গন্ধ আর ধোঁয়ায় হয়তো সে বুইঝা যাইতো আমার মা আছে! বাড়িওয়ালীর গন্ধটা সে ঠিকই বুঝতো। একটা বোবা পাখিও বুঝে মা-এর ছায়া! অদ্ভুত এক সংযোগ দুইজনের।
যখনি তার সঙ্গিনী ডিম দিতো দেখতাম আমার মা নিজেই খোপের মধ্যে ডিমে আরামে বইসা তা দেওয়ার লেগা খড় কিংবা নারিকেলের শুকনা ছোবা গুইঞ্জা দিতো আর তারা একদম সাদরে পুরা ব্যাপারটা মাইনা নিতো। কিন্তু আমি গেলেই খাইতাম ঠোকর আর পাখনার বারি।
সারাদিন খাওয়ায়া কিংবা দেখভাল কইরাও মন পাওয়া দায়, আমার গিরিবাজ আমারেই পুছে না। এক সময় আর তারা আমারও রইলো না, হয়া গেলো বাড়িওয়ালীর। তারা আমারে দেখলে ডরায়, উড়াল দেয়। মর্দার সংসারে তখন সন্তানের গরম, সব মিলায়া তার ৮ থেকা দশ সন্তানের পরিবার পুরা বাড়িঘর জুইড়া। পুরা সংসারের খাওনের চালান আইসা পরে মাসে কাপ্তান বাজার থেকা; খাওনের অভাব নাই। একেকজনের পাখে ঝিলিমিলি জেল্লা । আমি কই? আমি চায়া চায়া দেহি আর মনে মনে ভাবি—যাউক গা থাক, বেইচা দিমু আরেকটু বাড়লে।
এর মধ্যে সিন সিনারি আরো পাল্টায়, আমিও দেহি আর দাঁত কিড়মিড় করি। আমি আয় আয় কয়া ডাক দিলে যেই কবুতর এক ফাল দিয়া ছাদ থেকা উঠানে আইতো, সেই কবুতর আমারে চিনে না, আমার ডাকে কোনো সাড়া শব্দ নাই; অথচ বাড়ি ওয়ালি উঠানে খাড়াইলে পুরা পরিবার হুড়মুড় কইরা উঠানে আইসা জড়ো হয়া বাড়িওয়ালীরে ঘিরা ধরে। আমার কোনো অস্তিত্বই আর থাকে না! আমি দেখতেই থাকি।
তখনো আমার মা আমারে ভাত খাওয়ায়া দেয়। ভাত খাওয়ায়া দিলেও বকে, নিজে খাই না দেইখা। আমিও সেই বকা কানে নেই না, চামে চামে খাই আর তিন গোয়েন্দা পড়ি, রকি বিচের আবহাওয়ায় কিংবা জাংক ইয়ার্ডের চিপায়। সেই ডাইল দিয়া মাখা ভাতরে মনে হয় লস এঞ্জেলসের ফ্রাইড রাইস আর স্যুপ। এমন আরামে যদি বই পড়তে পড়তে খাওন যায় তো কে বকাঝকা কানে দেয়, আপনেরাই কন !
ছোটকালের স্মৃতিরা বড়ই প্রখর। এরা মৃত্যু পর্যন্ত খেদায়া বেড়ায় জংলা বাইসনের মতন শিং-এর ডগায় চোখা বিষাদ নিয়া। এই বিষাদ বড়ই মধুর, যেন আল মাহমুদের কবিতার লাইন গুলায়। এই বিষাদের বাইসন তার চোখা শিং-এর খোঁচায় মনে করায়া দেয় দুই লাইন, তিন লাইন, কিংবা কবিতার নির্যাসে যে ৫ টা কমলার থেকা এক মগ জুস বাইর হয়, সেই জুস টার স্বাদ।
মনে পইড়া যায়—
কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।
এইসব স্মৃতির বাইসনের গুঁতায় গুঁতায় মনে পড়লো এক ভর দুপুরের কবুতর সম্পর্কিত দুর্ঘটনা। আমার বাড়ির এক বাড়ি পরে দুদু মাম্মার বাড়ি। আগের কালের ডুপ্লেক্স , সেই বাড়িতেও কবুতর পালতো আমার মামাতো ভাই। তার কাছে আমার আনাগোনা উঠানের এক পার থেকা আরেক পারে যাওনের মতন। সেই দুপুরেও আমি বরাবরের মতন দুই লাফ তিন লাফ মাইরা বাপ্পি ভাই-এর কাছে গিয়া উনার কবুতর দেখতাছি আর দুপুর বেলায় বেশির ভাগই জেমস নাইলে আজম খানের গান বাজতো সেই গানের ফিলিংসে আছি। ঝাঁ ঝাঁ রোইদ্যের মধ্যে ভাত খাওয়ার লেগা নিচে নামুম, তো আরেক লাফ দিছি দুই তলার বারান্দা থেকা মাঝখানে বাহাউদ্দিন মাম্মা গো ছাদে আর পাওটা ফসকায়া সোজা দেয়াল ছ্যাঁচড়ায়া নিচের উঠানে, আমি নাইমাই লোড়।
খালি পিছে হুনা গেলো আমার মামির চিল্লান,–হায়ম হায়, রবিনের মা তোমার পোলায় পইড়া গেছে! অই ছ্যারা অই খাড়া, হাত পাও ভাংছস নি? (রবিন আমার বড়ভাই, আমি ডাকি দাদাভাই)
আমি নাই! আমি সোজা গেট দিয়া বাইর হয়া বাইত।
বাইত ঢুইকা দেহি আমার চেহারা থেকা নিয়া পেট গলা সব ছিলা গেছে দেয়ালের ঘষায়, আমি লুকায়া রইলাম দাদাভাই এর ঘরে। এর মধ্যে মামী হাজির।
–হায় হায়, তোমার পোলায় পইড়া গেছে রহিমা। বাহাউদ্দিনগো ছাদে ফাল দিতে গিয়া পিসলায়া আমাগো সিঁড়িতে পড়ছে। এই কবুতরেই অগোরে খাইবো। আমার বাইত আছে একটা বুইড়া, আর ঐ বুইড়ার লগে গিয়া গিয়া আরেকটা হইতাছে তোমার বিচকা পোলায়। এগিনিরে লয়া কই যাই, হায় হায় রহিমা!
এই ছিলা চেহারা—হাত, গলা, পেট লয়া দুই দিন জ্বরে ভুগলাম আর এর মধ্যে আমার সব কবুতর লোকজনরে ডাইকা দিয়া দেওয়া হইলো! মাগার সেই জাঁদরেল কর্তা তার সঙ্গিনীরে নিয়া তার খোপে আগের মতন বাকবাকুম কইরা ক্ষমতা টিকায়া রাখলো। তার কোনো চিন্তা নাই। কবুতর সম্পর্কিত সমস্ত কিছুতে আমার আর কোনো ক্ষমতা রইলো না এই বাড়িতে।
মর্দা গিরিবাজ সেই লাল রঙা গলা ফুলায়া আরেক ধাপ আগায়া আমার মা-এর পাকঘর আর শোয়ার ঘরে যাতায়াত আরম্ভ করলো, এবং মা খাইতে বইলে যতক্ষণ না তার পাত থেকা উঠানে ভাত আইতো ততক্ষণ দরজার চৌকাঠে তার আনাগোনা; এমন কি ঘরেও ঢুইকা যাওয়ার নজির দেখতে শুরু করলাম। দিনে দিনে সে তার রাজত্ব বাড়ায়া নিতে থাকলো। এর মধ্যে তার সন্তান সন্ততি যাগোরে দিয়া দিছিলাম, তাগো কাছ থেকা কয়েকজন আবার ভাইগা আমার উঠানে আগের মতন উড়াউড়ি করতে দেখলাম। কি আরামের রাজত্ব।
এইটারে আমি এখন ভাবি, সেই ২৫ বছর আগের কাহিনীরে এখন আমি জাজ করি একটা আত্মিক কিংবা আধ্যাত্মিক কোনোকিছুও হয়তো আছে। হয়তো সেই গিরিবাজ আমার মায়ের হারায়া যাওয়া সন্তানদের কেউ।
আমরা দুই ভাই। আমার মা-এর গর্ভে আরো দুই সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই এই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে, তারা আর কোনোদিনই তাদের মৃত মায়ের কোলে আসে নাই। হয়তোবা তারা কেউ, যাদের আমি দেখি নাই; যাদের সাথে আমার রুহের মোলাকাত হয় অজান্তে, হয়তো তারা আমার আশে পাশেই রয়া যায়।
এইসব অবলা জীবেরা আমার মায়ের আদরে আদরে একাকার। এইসব বলতে কবুতরের পর আমার কালো ল্যাব্রাডর জিউ। কি মায়াময় একটা কালো পশমি বাচ্চা, এখনো আমি তার ছোঁয়া টের পাই। মর্দা গিরিবাজের পর সে আরেক লাই পাওয়া সন্তান এই পরিবারের।
মর্দা গিরিবাজ বেজায় উদ্যমে যখন পাকের ঘরের চুলার নিচে পইড়া থাকা লবণ ঠুকরায়া ঠুকরায়া খাইতো আর আমার মা পাকঘরে ঢুইকা ‘অই, যা যা’কইলেই সে এক লাফে আইসা পড়তো উঠানে আর করতো বাকবাকুম।
দিনে দিনে লাই পাওয়া লাল গলার মর্দার লাই পাওয়ার শেষ সিনারি এখনো আমার মনে আছে। কোনো এক শুক্রবারে উঠানে বইসা মা চাল বাছতেছে আর আমি ঘরে পড়তেছি, হঠাৎ সে চালের উপর থেকা পাখনা ভাজ কইরা এক উড়াল দিয়া আইসা আমার মা-এর কান্ধে বইসা পড়লো আর তার পাখনার ঝাপটায় মা-এর ঘোমটাটা সইরা গেলো। আমার মা নির্বিকার ভঙ্গিতে চাল বাছতেছে আর মর্দা সমানে তার কান্ধে বইসা তার চিকচিকা লাল গলা ফুলায়া ডাকতেছে—বাক বাকুম, বাক বাকু্ বাক বাকুম।
তার সুখকর স্মৃতি এটুকুই লেখা যায়, এটুকুই দিলের মাঝখানে প্রোজেকশন কইরা দেখি বার বার নিজস্ব সিনেমা হলে একা একা।
আমার আর কোনো মালিকানা থাকার কথা না! রাখি ও নাই আর মালিকানা। গিরিবাজের স্বত্ব রয়া যায় মা-এর কাছে, আমি চায়া চায়া দেখি।
বড় হয়ে যাই, এক স্কুল ড্রপড বখাটে হিসেবে। বড় হই আর বড় হই। আমাদের এক তলা বাড়িটাও আর ছোট থাকতে চায় না। সময়-এর চাপে ১০ ইঞ্চি মোটা মোটা দেয়াল গুলারে ভাইঙ্গা নিচের ভিত শক্ত করতে পাথরের ঢালাই দেয়া এক ৪ তলা বাড়ি দাঁড়ায়া যায়। অনেক দিন ভাড়া বাসায় থাকার পর দেশ স্বাধীন করার ফিলিংস নিয়া মা তার নিজের বাড়ি ফেরে। নিজের মত থাকে আবার নিজের বাড়িতে। জীবনের অনেক সময় কেটে গেছে বাড়ির বাইরে বাইরে। রাতের পর রাত রাস্তায়, এখানে ওখানে কি জানি খুঁজছি কিন্তু পাই নাই! আমার মনে হয়, কেউ ই পায় না; খোঁজাখুঁজির ফল হয়তো নিজ গৃহকোণেই অযতনে পইড়া থাকে।
“আমার বাড়ির নিচ তলায় গ্যারেজ থাকা লাগবো।গাড়ি নাই তো কি হইছে? আমার বাড়ির পোলাপান খেলাধুলা করবো আর আমি মারা গেলে আমার লাশটা যাতে নিচে রাখন যায়। পুরান ঢাকায় চিপা চিপা বাড়িঘর, প্রতিবেশীগো কেউ মরলেও যাতে নিচে লাশ রাখতে পারে। তরা লাশ রাখতে দিস।” এই কথাটুকুই এই বাড়ি বানানোর ব্যাপারে তার একমাত্র চাওয়া পাওয়া আছিলো। গাড়িবিহীন এই বাড়িতে বাড়িওয়ালীর হুকুম অনুযায়ী গ্যারেজ রাখা হইছিলো প্ল্যানিং-এ।
বাড়িওয়ালীর বাড়িতে সেই কথাই রাখা হইছিলো, বাড়িওয়ালীর লাশটা সেই গ্যারেজেই গোসল করাইছিলো আমার লিনা আপা আর হ্যাপি আপা। এইটাও করা হইছে বাড়িওয়ালীর কথা মাইনাই। লিনা আর হ্যাপি আমার দুই বোন, একজন খালাতো বোন, আরেকজন মামাতো বোন। এক ভাগ্নি আর এক ভাতিজির সাথেই বাড়িওয়ালীর শেষ দেখা তার ইচ্ছের গ্যারেজে। গাড়ি বিনা গ্যারেজ থেকা তার শেষ যাত্রার গোসল সাইরা সাদা ধবধবা চেহারাটা নিয়া চইলা যাওয়া আমারে রাইখা, যে দুনিয়ায় আমার কেউ নাই।
এইটা যেহেতু বিচ্ছেদের গল্প না, এইটা একটা সম্পর্কের গল্প। এই রূহানী সম্পর্ক সবাই ধারণ করতে পারে না।
সম্পর্কের গল্প বইলা যাওয়াই উচিত, সম্পর্কের মধুরতম স্মৃতিগুলাই ছড়ায়া ছিটায়া থাক এই জীবনের গ্যালারিতে।
নতুন বাড়িতে উঠার পর বহুবছরের শখ পূরণ করতে চাইলাম। একটা কুকুর পালার শখ বহুবছরের। শখের তোলা আশি টাকা মাইনা একটা কালো ল্যাব্রাডরও যোগাড় হইলো। কি লক্ষ্মী একটা বাচ্চা, কালো তুলতুলে একটা আত্মা। কি সুন্দর আছিলো তার চোখ, এই জগতের সব মায়া তার চোখে। আমার দিকে তাকায়া থাকতো, আর আমার পায়ে পায়ে ঘুরতো সে; নাম দিলাম ‘জু’। পরহেজগার মানুষের যা সমস্যা, কুত্তা আমার ঘরে ঢুকাবি না।
আমার উপর হুলিয়া জারি, আমার ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘরে ঢোকা বারণ। এই পাক আর নাপাকের বেড়াজালে আমি আর জু বন্দী। দুইজন অসহায়-এর মতন বাড়ির এক কোণায় থাকি, কেউ নাই মনে হয় আমাগো।
একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিনদিন পার হয়া অনেকদিন চইলা যায়। আমি আর জু এক ঘরে থাকার পরেও পরিবারের কাছে জু-এর মায়াভরা চোখের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। জুলজুল চোখের চাউনিতে বাড়িওয়ালী ঘায়েল হইতে থাকে। “বোবা জানোয়ার আনছস, এহন খাওন দিবার পারস না।” এই রকম কথা দিয়া বিছানো শুরু হয় তার মায়াজালের চাদর। সকালে ঘুম থেকা উঠলে দেহা যায় জু-এর সামনে জাউ এর বাটি আর দুপুরের পর হাড্ডি, কাটা, ভাত আর মাঝখানে বাড়িওয়ালী।
এমন মায়ার শীতল পাটি যদি কেউ বিছায়া দেয়, সেই পাটি থেকা উইঠা যাওয়া কঠিন। মায়ের দিল-এ সেই মায়াই রয়া যায় , যেই মায়ার সামনে এমনিতেই ভালোবাসায় মাথা নত হয় আমার আর জু এর। আমি কিংবা জু, কেউই আলাদা নই তার ভালোবাসার কাছে । আমি এক বোহেমিয়ান আত্মা, দুই তিন দিন অথবা এক সপ্তাহ দেখা যায় বাড়ি তেই নাই। আমার জু রে খাওয়ায় কে ? এক বাড়িওয়ালী ছাড়া কেউ নাই আমাগো খাওয়ানের মতন, বাড়িওয়ালীর আজ্ঞায়ই আমরা খাইতে পাই। এমন বোহেমিয়ান জীবনে নিজের কাছেই নিজে অপরাধী হয়া যাই, জু রে ঠিকঠাক দেখভাল না করতে পারার একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে নিজের ভেতরে। সেই অপরাধবোধে ভুগতে ভুগতে একদিন এক বন্ধু তারে নিয়া যায়। তার খোলামেলা বাড়িতে জু ভালো থাকবো সেই আশায়, আমিও দিয়া দেই।
আমার ভালো লাগে নাই জু রে দিয়া দিতে, খালি খালি লাগতো আমার ঘরটা। গভীর রাতে এই কালো তুলতুলা বাচ্চাটা আমার চেয়ারের নীচে শুইয়া থাকতো আর আমি কম্পিউটারে গেম খেলতাম। আমার পায়ে পায়ে হাইটা ছাদে যাইতো, বিছানায় উঠলে মৃদু ইশারায় নিচে নাইমা তার তোশকে শুইয়া পড়তো। এমন সব স্মৃতিময় জু আমার। বাড়িওয়ালীও জু-এর চইলা যাওয়াটা মাইনা নেয় নাই! তার মায়া পইড়া গেছিলো। আমি জানতামও না যে জু-এর খাবারের জন্য ফ্রিজে আলাদা পোটলায় মাছ মাংস রাখা শুরু হইছিলো এই মায়াময় সংসারে।
বন্ধুর খোলামেলা বাড়ি তে অবুঝ জু আমার নতুন করে বাঁচে। খবরাখবর নেই মাঝে মাঝে, ভালোই থাকে সেখানে। এই ভালো থাকার মাঝে দুই মাস পরে এক দুঃসংবাদে মনটা ভাঙে। বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে হাওয়া খেতে যাওয়া জু রাস্তার এক কুকুরের কামরে আহত হয়ে শরীরের পেছন দিক অবশ হয়ে পরপারে চলে যায় আমারে অপরাধী কইরা। মাইনা নেয়া যায় না এমন খবর, যেন মৃত সন্তান এর আত্মা কোনো এক দূরের হোস্টেলে একা একা ডাকে আমারে। বাড়িওয়ালীর বকা শুনি, “বোবা জানোয়ারটারে নিজেও রাখলি না, কুন বেজন্মার কাছে দিলি মাইরা ফালাইলো।” আমি দোষী হই, সমস্ত দায়ভার কাঁধে নিয়া চুপ হয়া থাকি। নিজেরে নিজের কাছে এক সন্তান হত্যাকারী মনে হয় । এই বাড়িতে কোনো পশুপাখি পালন করা আমার জন্য নিষেধ হয়।
আমি মাঝে মাঝে খুবই অবাক হই বাড়িওয়ালীর এহেন মায়া মমতা দেইখা, এই বাড়ির সব পশুপাখিই একসময় তার মায়ার বশীভূত হয়া সন্তানে পরিণত হয়া যায়।
একটা সাদা মোরগ ঠোকরায় আমারে
ভালোবাসে ভাতের দানা
সকালে ডাকে কুক্কুরে কুক
রাগে ঝাপটায় ডানা।
সাদা মোরগের গল্প রয়া যায় সেই গ্যারেজের এক কোণায়। বাড়িওয়ালীর বাড়িতে আমার পশুপাখি পালা নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও একদিন গ্রামের বাড়ি থেকা কয়েকটা মুরগির সাথে এক সাদা মোরগের বাচ্চা আইসা হাজির হয়। এই মোরগ পালা শুরু হয় আমার মায়ের মালিকানায়, আমার কোনো সত্ত্ব নাই। এই সাদা মোরগের ডানায় লেখা থাকে আমার মায়ের গল্প।
এক বেয়াদব মোরগ, কাছে গেলেই ঠোকরায়। আমার মা বাদে সবাই তার আক্রমণের শিকার। সকাল নাই বিকাল নাই সময়ে অসময়ে ডাকাডাকি করে বেয়াদব মোরগটা, দিন দিন ভালোমন্দ খায় আর তাগড়া শরীর নিয়া বড় হয়। কুচি কুচি কইরা কাঁটা পালং শাক ঠোকরায় বেয়াদব মোরগে আর ডানা ঝাপটায়। বাড়িতে ঢুকলে গ্যারেজ থেকা “তেড়ে মেরে ডাণ্ডা, করে দেবো ঠাণ্ডা”এই ভাব নিয়া ডানা দুইদিকে ছড়ায়া দৌঁড় দিয়া আসে; পাহারাদার সে। নিজের বসতবাড়িতে আমি এক আগন্তুকের মতন পলায়া সিঁড়ি দিয়া উঠি দুই তলায়। সাদা মোরগের ফজিলত আমার জানা না থাকলেও বাড়িওয়ালীর কাছ থেকা শুনি। সাদা মোরগের দাবড়ানিতে নাকি বাড়িঘরে শয়তানের আনাগোনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। মোরগের ডাকের ভাইব্রেশনে শয়তানেরা দৌঁড় দেয়, এইরকমই নাকি হাদিস-এ বলা।
এক নীরব দুপুরের দৃশ্য মনে পড়ে। দুই তলার দরজায় ঠক ঠক ঠক শব্দ হইতে থাকে, মনে হয় কেউ টোকা দিতেছে। আর আমি ই দরজা খুলি, দাঁড়ায়া আছে বেয়াদবটা, দরজায় ঠোকরা ঠুকরি করতেছে। আমারে দেইখাই ডানা ঝাপটায়া ঠোকর দিতে চায়। বাড়িওয়ালী দেইখাই আওয়াজ দেয়, অই রাখ খাওন দেই। বেয়াদব মোরগও বাধু পোলার মতন পিছায়া দাঁড়ায়। আরে আজব কাহিনী, বাড়িওয়ালী কি যাদু জানে নাকি! ঠিকই দেখলাম তার খাবারের পাত্র দেয়ার পরই ঘাপুস ঘুপুস কইরা খায়া নিচে চইলা গেলো। মায়ার বাঁধন বুঝি এমনই। মায়ার শীতল পাটিতে বইলে বুঝি উঠা যায় না, এই মায়া অস্বীকার কইরা।
এই নশ্বরের দুনিয়ায় সবই চইলা যায়, রাইখা যায় শুধু মায়া। সেই মায়ার গল্পই আমি কিংবা আপনে ঝোলায় নিয়া ঘুরি। একটা আংটি কিংবা একটা একটা পাথর চোখের মোরগের মায়া ও সারাজীবনের গল্পে রয়া যায়।
বেয়াদবের মায়া ছাড়ানোর গল্প ও মর্মাহত করে আমারে, নবী আব্রাহামের কথা মনে করায়। পারিবারিক আর্থিক দীনতার কারণে একসময় গ্যারেজটা ভাড়া দেয়া হয়, বেয়াদব মোরগের বাসস্থান হয় না। এক সকালে শুনি আমার বাপ তারে গলায় ছুরি দিয়া জবাই কইরা ফালাইছে। চোখে ভাসে নবী আব্রাহাম, মারওয়ার বুকে কুরবানির বেদিতে শানানো ছুরি হাতে নিজ সন্তানের কুরবানি করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এক আল্লাহর দিওয়ানা। মনে হয়, আমার কিংবা আমার ভাইদের কারো গলায় শানানো ছুরি বসানোর বদলে সাদা মোরগের এই আত্মত্যাগ।
ভালো ্না লাগা সেই দিনটা, বাসায় কিছু খাই নাই; বাড়িওয়ালীও সেদিন ভাত খাইছে ডাইল দিয়া, তার মাংস খাইতে পারে নাই।
মনে পরে আমাজনের গহীনের সেই গুয়াজাদের কথা, যারা প্রকৃতির সন্তান, হরিণ শাবক কিংবা শুকর ছানাকে নিজের সন্তানের মতন যারা বুকের দুধ খাইয়ে বড় করে। এমনই এক অনুভূতি জন্মায় আমার ভেতরে। আমার মৃত দুই ভাইকে মনে করি, হয়তো তারাই বার বার ফিরে আসে মর্দা গিরিবাজ, ল্যাব্রাডর জু কিংবা সাদা মোরগের ডানায় ভর করে।
বেদনার তাবিজ বান্ধা থাকে বাড়িওয়ালীর কলিজায়, কেউ চিরজীবনে রয় না কাছে। মায়া বাড়ায়, চইলা যায়।
ভোরের আলোর বান্দরেরা কিচ মিচ কলরবে জাগায় আমারে কালে। বহিরাগত এক ভালোবাসার টান নিয়া আসে তারা। দূর থেকা ভালোবাসার জাল ছুঁইড়া মারে আমারে আর বাড়িওয়ালীরে । বসন্তের আম গাছে গুটি ধরলেই পাশের আম গাছে শুরু করে বান্দর ফ্যামিলি আনা গোনা। আমি ছোটবেলা থেকাই এদের প্রকৃত বংশধর; কোনোদিনই এদের বলি নাই “বান্দর বান্দর ভেচকি, লাল পুটকি দেখছি” এই রকম অপমানজনক কথাবার্তা; নিজের পূর্বপুরুষরে বলা ঠিক বইলা মনে করি না। আমার জানালার পাশ দিয়া আসা যাওয়ার সময় আমি এদের সাথে কথা বলি। পরিবারের কর্তা আগে আগে যায় আর পিছে পিছে জানেমান তার বাচ্চা কাচ্চা নিয়া। আমি সবসময়ই কর্তারে জিজ্ঞেস করি, দিনকাল কেমন যায়! জানালা দিয়া খাওন দেই, যা থাকে। এক সময় কর্তা আমারে চিনতে পারে তার কোনো দিব্যজ্ঞানে, এই বুঝি সেই উত্তরসূরি। আমার জানালায় আসে আপেল, কমলা, কলা, টমেটো কিংবা টোস্ট বিস্কুট খায়।
এরপর একদিন ভোরে ঘুম ভাঙে কিচির মিচির আওয়াজে সম্ভবত গ্রীষ্মের শুরুতে।
“আমার জানালায় কর্তা মহাশয়, কি জানি কয়
কিচির মিচির কর্ত্রী তার, ধমক ধামক সয়।”
চোখ টা খুলতেই কর্তার ধমক
কর্তা- কিচ মিচ কিচ
আমি- কি ব্যাপার?
কর্তা- কিচ কিচি কিচ মিচি
আমি- খুদা লাগছে?
কর্তা- কিচি কিচি
আমি- অপেক্ষা করুন, দেখি কি আছে ঘরে।
এইটা আমাগো কথোপকথন, এক ফোঁটাও চাপা না। তসবি পড়তে থাকা বাড়ি ওয়ালিরে বান্দর কর্তার দাবি দাওয়ার কথা কইতেই আমারে ঘরের আপেলটা , কমলাটা কিংবা টমেটো আর কিছু না থাকলে টোস্ট বিস্কুটের ডিব্বা দিয়া কইতো “যা খাওন দেগা, এই শহরে গাছ পালা নাই অরা কি খাইবো” আমি অবাক হই না বাড়িওয়ালীর কথায়, আমি জানি সে এমনই। তসবি গুণতে গুণতে হাতে দিয়া দিতো টমেটো কিংবা টোস্ট বিস্কুটের টিন।
বান্দর পরিবারও বঙ্গ সন্তানের চেয়ে অনেক সভ্য। বঙ্গ সন্তানেরা বাস, ট্রেন, লঞ্চ, প্লেন থামলেই গাট্টি বোচকা নিয়া নামার জন্য হুড়াহুড়ি করে; বুফেতে ডিনার করতে গিয়া মাংসের ট্রের সামনে মারামারি করে কিন্তু বান্দর পরিবারও চলে তার চেইন অফ কমান্ডে। প্রথমে কর্তা আসবেন জানালায়, এরপর কর্ত্রী, তারপর একে একে বাচ্চারা। এই একই নিয়মে প্রতিদিন খাবার নেয়ার লাইন চলতো ভোরের হাওয়ায়। আমি খাবার দিতাম আর বাড়িওয়ালী দূর থেকা তাকায়া দেখতো। একটা আত্মিক সম্পর্কের সেতুর মত ভাবি আমি বাড়িওয়ালী, আমি, বান্দর। আমি যেন একটা সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড়ায়া সম্পূর্ণ কইরা তোলার দায়িত্বরত এক সাঁকো মাত্র। আসলে সম্পর্কটা সেই বান্দর আর বাড়িওয়ালীর মাঝেই। হয়তো তার ই মৃত দুই সন্তানের কেউ আসছে পরিবার নিয়া তার বাসায় বেড়াইতে, জিগাইতেছে “আম্মা আজকে কি রানছো?”
![]()
1 Comment
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Drako Shajib
স্মৃতিময় দিনগুলো সিনেমার মতই লাগলো!