Profile Photo

প্রদীপ্ত দে চৌধুরীOffline

  • Pradiptadey12006024
  • *একুশ নম্বর

    রাত ১০ টা। রাসেল মিয়া একটা কলসেন্টারের বাইরে টঙের দোকানে বসে চা খাচ্ছে। চায়ে অতিরিক্ত চিনি হয়েছে, শরবত টাইপের কিছু একটা লাগছে। তবে তাতে রাসেল মিয়ার খেয়াল নেই, সে কলসেন্টারটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে সিগারেটে ফু দিয়ে আবার সুরুৎ করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে।

    রাত দশটায় একটা ব্যাচের কাজ শেষ হল। একপাল অফিসের মানুষ বেরিয়ে আসে কলসেন্টার থেকে। বাড়ি যাবে সবাই, রাত হয়ে গেছে- তাই সবার মধ্যে একটা তাড়াহুড়ো ভাব। এই ভিড়ের মধ্যে গুনগুন আওয়াজ থেকে জোরে “ট্যাক্সি!” বলে আওয়াজ শোনা গেল। একটা মেয়েকন্ঠ- লিজা! একটা ট্যাক্সি পেয়ে রীতিমতো ঝড়ের বেগে ঢুকে পড়েই বলল,”ভাই একটু তাড়াতাড়ি চলেন!” রিটায়ার্ড বাবা, মা অসুস্থ- তাই এতো রাতেও কলসেন্টারে কাজ করা। বাবার পছন্দ নয় লিজার কাজ করাটা, কিন্তু এইসময়ে আসলে বাবার কথা উপেক্ষা করা ছাড়া -লিজারও তো কোন উপায় নেই।

    ট্যাক্সি চলতে শুরু করে, পাশের টঙের দোকানে রাসেল মিয়াও চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে পড়ে।

    চারদিকে একটা ভীষণ বাজে গন্ধ পাচ্ছে লিজা, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার। খুব ক্লান্তভাবে চোখটা খুললো সে। সবদিকে শুধু অন্ধকার, ঘুটঘুটে অন্ধকার; একটা ভ্যাপসা গন্ধ চারদিকে। লিজা খেয়াল করল, সে একটা ট্যাক্সির দরজার বাইরের দিকে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে আছে। লিজা মনে করতে পারছে না, কীভাবে এখানে এল সে। একটু সামনের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখলো সামনে একটা রাস্তা এবং রাস্তার ওপর একটা লোক পায়ের ওপর ভর দিয়ে বসে আছে। অনবরত সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে তার চারপাশে। বুকটা ধক করে উঠল লিজার, অস্পষ্টভাবে মনে পড়লো, সে ট্যাক্সিতে উঠবার পড়ে একটা লোক না বলে কয়ে উঠে পড়ে তার পাশে। তারপরই হঠাৎ কি একটা মুখের ওপর চেপে ধরে; আর কিছু বলতে পারে না লিজা।

    লিজা অস্থির হয়ে ওঠে কিন্তু নড়তে পারে না, ভীষণ, খুব ভীষণ ক্লান্ত। একটু ওঠবার চেষ্টা করতেই অস্ফুট শব্দ করে উঠল সে!
    চোখ ফেরাল রাসেল মিয়া। মেয়েটা নড়াচড়া শুরু করছে। খুব আস্তে আস্তে কিছু একটা বলছে বুঝতে পারল রাসেল। কাছে গিয়ে কান পাততেই শুনতে পেল মেয়েটা বিড়বিড় করছে, ” আমায় যেতে দাও….মায়ের… মায়ের ওষুধ ব্যাগে রয়ে গেছে….ওগুলো দিতে হবে….যেতে দাও…কোথায় এনেছ…কে…কে তুমি…আমায় যেতে দাও..”
    রাসেল মিয়া আরেকবার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল চারপাশে। তারপর দুইটান দিয়েই কি মনে করে মাটিতে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে নিভিয়ে দিল সিগারেটের আগুন। নেভাতে নেভাতেই হঠাৎ বলতে শুরু করল, ” আমার বউটার সাথে বিয়া হয় পাঁচ বছর আগে। কত সুন্দইর আলো চারপাশে……. চোখটা বন্ধ করলেই আর খুলবার ইচ্ছা করে না। মনে পইড়া যায় সে রাইতটার কথা, আমি বউয়ের চোখের দিকে তাকায়া আছি, বউ আমার দিকে….কত সুন্দর আছিল চোখখানা- কত সুন্দর! মনে হইতো….মনে হইতো যেন.. চোখটা একটা সমুদ্দুর, আর আমি ওই সমুদ্দুরে একটা ডুব দিয়া আহি..!

    বউটা ঘোমটা দিয়া আইতো আমার সামনে, কইলজ্যাটা ধইরা যাইতো, ভাবতাম এই জনমে কত ভ্যালা কাজ করছি জানি না, এইরকম সুখের জীবন কেমনে আইলো আমার কাছে! দুই-দুইটা বছর কেমনে যে কাটল বুঝবারই পারলাম না! ”
    রাসেল মিয়া থামে একটু। সময় নেয়, লিজা খেয়াল করলো লোকটার গা কাঁপছে একটু করে। ফের বলতে শুরু করলো সে, গলা থমথমে, ভরাট গলা, ” কিন্তু বেশিদিন টিকলো না এই সুখ….! বউ কইলো চাকরি করবো…. গার্মেন্টসে! আমি না কইরা দিলাম, বাড়ির বউ অন্য মানুষে কেনে দেখবো! সারাদিন ঘোমটা দিয়া থাকবো, ঘরে আইলে স্বামীরে সেবা দিবো….এটাই তো কাজ! কিন্তু না, বউ জেদ ধরলো ও চাকরি করবো, কাপড় সেলাই করবার নাকি ওর শখ! আমি না কইরা দিলাম, না মানে না! কিন্তু বউ কথা শুনলো না, আমার সাথে তর্ক কইরা গিয়া গার্মেন্টসে যোগ দিল….রাগে হুস হারাই ফেললাম আমি! বুঝাইবার চেষ্টা করলাম, বউরে কত হাত পায়ে ধরলাম, কিন্তু ও মানলো না!
    তারপর সেদিন, মান্নাদের দোকানে চা খাইতে গেলে কোথাকার কোন এক ছোকরা আমার বউ নিয়া কথা তুললো, দিলাম শালারে দুই কোপ। তারপর ঘরে আইসা রাগের মাথায় বউরে দিলাম চড়! বউ কান্না করতে করতে চইলা গেল বাপের বাড়ি।
    একটা সময় বুঝলাম, খারাপ করছি, এরকম করাটা ভুল হইছে। গেলাম শ্বশুর বাড়ি,গিয়াই শুনি বউ আমারে তালাক দিবো! হয় গার্মেন্টসে কাজ করা মানমু, নয়তো তালাক! আমার মাথায় আগুন ধইরা গেলো, এত বড় সাহস মেয়েমানুষের? এতখানি সাহস? আমারে তালাক দিবো, শুধু কাজের জন্য- চাকরির জন্য? বিশ্বাস উইঠা গেল আমার মানুষের প্রতি- এত ভালোবাসা দিলাম, আর এই অইলো প্রতিদান? সবকিছু মাইনা ঘরে আইনা সেই রাতেই খুন করলাম বউরে! ঠিক এই জায়গায়… এই জায়গায় আইন্যা…….”

    রাসেল মিয়া থামলো, তার গলার আওয়াজ বেড়ে গেছে, কাঁপছে সে প্রচন্ড রকমভাবে, মাঝে মাঝেই দাঁতে দাঁত ঠেকিয়ে ভয়ঙ্করভাবে আওয়াজ করছে!
    ” হো, খুন করছি আমি, দু হাতে খুন করছি আমি….” বলে খিল খিল করে হাসতে লাগল রাসেল মিয়া। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর জোরে, এরপর ভয়ঙ্করভাবে- প্রচন্ড ভয়ঙ্করভাবে! হাসির সাথে যোগ হল বজ্রের শব্দ। চারদিক কাঁপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল হাসির শব্দ! আকাশটা চিরে ফেটে যাচ্ছে যেন এই অট্টহাসির শব্দে।
    ” শুধু ওরে খুন করি নাই, আরো বিশটা মাইয়ারে খুন করছি…আরো বিশটা! সবগুলায় চাকরি করে। ওত পাইতা থাকতাম দিনের দিন, তারপর শিকার করতাম। তুই…তুই…তুই হলি একুশ নম্বর..একুশ নম্বর! জানিস…জানিস কেমনে খুন করতাম আমি?”

    কাছেই কোথাও বজ্র পড়ে, চারদিকে আলো হয়ে ওঠে। সেই আলোতেই লিজা স্পষ্ট দেখতে পায় তার সামনের লোকটার কুৎসিত বিভৎস মুখটা। শিউরে ওঠ লিজা, তার চোখ বেয়ে উষ্ণ জল বেয়ে পড়ে। খুব অসহায় লাগছে তার, এরকম পরিণতি সে হয়তো কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
    রাসেল মিয়া হঠাৎ চিৎকার করে লিজার চোয়াল শক্ত করে ধরে বলে, “চাকরি করবি না শালী? হা? চিরে কেটে খুন করবো তোকে….বাকি বিশটাকে এভাবেই খুন করছি, কেউ চিনতেও পারে নাই লাশগুলোরে…আরো খুন করমু, সবগুলারে শেষ কইরা দিমু আমি !”

    ফের হাসতে শুরু করে রাসেল মিয়া। লিজাকে ছেড়ে রাস্তায় ওঠে চিৎকার করে বলতে থাকে, “তোর আইজ দিন শ্যাষ শালী। প্রত্যেক অমাবস্যার রাইতে এইখানে খুন অয়, আইজক্যাও অইবো। আইজক্যাও অইবো, আইজক্যাও অইবো…” বলেই হাসতে থাকে। কিন্তু হাসিটা শেষ হয়না পুরোপুরি, তার আগেই তীব্র শব্দে ব্জ্রপাত হয়, আর তারই সাথে দিনের আলোর মতো এক উজ্জ্বল আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই আলোতেই স্পষ্ট দেখা যায়, একটা দৈত্যের মতো দানব আকৃতির ট্রাক কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে তীব্র বেগে সবকিছুকে চিরে ফুঁরে এসে ধুম করে ধাক্কা দেয় রাসেলকে। বজ্রের প্রচন্ড শব্দের সাথে মিশে যায় অস্ফুট তীব্র এক আর্তচিৎকার!

    চারদিকে ঝড়ের বাতাসের তাণ্ডব শুরু হয়, বাতাস বইতে থাকে চারিপাশে। একটা সময় শান্ত হয়ে আসে। পাহাড়ের উপত্যকার ওই রাস্তাজুড়ে বহু আকাঙ্খিত সেই বৃষ্টিটা দিগন্ত জুড়িয়ে নামতে শুরু করে। সেই বৃষ্টির পানির সাথে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা লাশটির রক্ত মিশে যায়। লাল রক্তের পানিতে ভেসে যায় রাস্তার ধারের ঘাসগুলো। রাসেল ঠিক ছিল। সেই অমাবস্যাতেও পাহাড়ের উপত্যকার ওই রাস্তাটায় একুশ নম্বর খুনটা হয়েছিল।

    1 Share
    7
    15 Comments
    • রোমাঞ্চকর এক ছোট গল্প। দারুণ।

    • খুন আদিম প্রবৃত্তি। সুন্দর গদ্যের জন্য অভিনন্দন।

    • রোমহর্ষক বিবরন। শেষে নিয়তির এক অসাধারন বাক সব মিলিয়ে অসাধারণ লেখা।❤️

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 26 July 2021 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তুলতে সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 09 December 2021 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • একটা ঘোরের মাঝে ছিলাম,,,,,,,,

    • অভিনন্দন

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 11 April 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 17 September 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • দারুন রোমাঞ্চকর। ভাল লাগল।অভিনন্দন।

    • শুভেচ্ছা।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 24 June 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 26 March 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 05 January 2025 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Friends

Skip to toolbar