Profile Photo

মো. মিকাইল অাহমেদOffline

  • Mekail2
  • মহাপ্রাচুর্য্যে মহাশূন্যতা

    গভীর রজনী। চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ। কোন সাড়া শব্দ নেই। গ্রন্থাগারের ভেতরের পরিবেশটার মতো। পিনপতন নীরবতা। এত রাত হয়েছে তবু কিছুতেই ঘুম অাসছে না প্রফেসর সালাম সাহেবের। ঢাকার নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। এখন অবসর জীবনযাপন করছেন। ছেলেমেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করে সারাজীবনের সঞ্চয় অার পেনশনের টাকায় ঢাকায় বানিয়েছেন বিলাসবহুল অালিশান বাড়ি। সারাদিন কর্মব্যস্ত, মানুষের পদচারণায় মুখরিত প্রাচীন এ শহরটাকে অাজ বড় অচেনা লাগছে। হ প্রাচীন শহরই। ঢাকার বয়স তো অার কম হয়নি। সেই চারশ বছরের পুরনো শহর। মনে হচ্ছে যেন এ শহরে অার কেউ বাস করেনা; শুধু তিনি একা। অার জেগে অাছেন তিনি একাই৷ পরক্ষণেই মনে হলো তার ধারণা ভূল। কর্ম জীবনের একটা সময়ে তিনি পরিবার নিয়ে পুরান ঢাকায় থেকেছেন। ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য অনেক কিছুই জানেন তিনি। চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও গিয়েছিলেন কয়েকবার। সেই থেকে তিনি জানেন ঢাকা মেডিকেল কখনো ঘুমায় না। কেউ না কেউ জেগে থাকে। প্রতি মুহূর্তে এ হাসপাতালে রচিত হয় কতশত সুখ দুঃখের গল্প। কেউ কাঁদে, কেউ হাসে। কালের সাক্ষী ঢাকা মেডিকেল। কর্ণফুলী পেপার মিলের কাগজ শেষ হবে তবুও ঢাকা মেডিকেলে রচিত সুখ দুঃখের গল্প শেষ হবেনা। সারাদিনই এ হাসপাতালে থাকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অাগত অসংখ্য মানুষের অানাগোনা।

    হঠাৎই অাবার মনে পড়লো তার বাড়ির দারোয়ান মতি মিয়ার কথা। বরিশালের মতি মিয়া। পুরো নাম মতিউর রহমান। মতি মিয়াও তো ঘুমায় না। রাত জেগে বাড়ি পাহারা দেয় সে। থাকে বিশাল এ বাড়ির গেট সংলগ্ন ছোট্ট একটা রুমে। জীবিকার তাগিদে ঢাকা শহরে এসেছিলো মতি মিয়া চল্লিশ বছর আগে। এখন বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। প্রথম যখন ঢাকায় এসেছিলো তখন সে টগবগে তরুণ। পরিবার নিয়ে থাকতেন ঢাকার এক বস্তিতে। রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনিদের নিয়ে তার সুখের সংসার। টাকার অভাবে ঢাকা শহরে স্থায়ী কোন অাবাস গড়তে পারেননি তিনি। কখনো থেকেছেন বস্তিতে। কখনোবা বেদে পল্লীর মতো যাযাবর জীবন কাটিয়েছেন যখন যেখানে এক টুকরো জায়গা পেয়েছেন পরিবার নিয়ে থাকার মতো। মাঝে অবশ্য সাতশো টাকা দিয়ে একটা বাসা ভাড়াও নিয়েছিলেন। পরে অর্থাভাবে সেই বাসাটাও ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এখন একটা বস্তিতেই থাকেন তিনি পরিবার নিয়ে।

    গরীব মানুষ। শখ পূরণের কতটুকুই বা সাধ্য অাছে তার। কোনরকমে দিন চলে যাচ্ছে। দিন চলে যায়ও। কারণ সময় কারো জন্য অপেক্ষা করেনা। বয়সও বাড়ছে দিনদিন। জীবনে শখ, অাহ্লাদ সবই ছিলো। ছিলো কিছু স্বপ্নও। টাকার অভাবে স্বপ্ন পূরণ না হলেও জীবনে কোন অাক্ষেপ নেই মতি মিয়ার। কারণ তিনি জানেন মরতে একদিন হবেই। পৃথিবী কারো অাসল ঠিকানা নয়। মৃত্যু একদিন মুছে দিবে সকল রঙিন পরিচয়। তাই ঈমান নিয়ে মরতে পারাটাই তার কাছে সফলতা। বাপ-দাদা যে রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন মতি মিয়াও চলছেন সেই পথ ধরে। নামাজ, রোজা, কুরঅান তেলাওয়াত, জিকির-ফিকির। এই চলছে বেশ।

    যখনই একটু সময় পান কুরঅান তেলাওয়াত করতে ভুলে যান না তিনি। অার অাল্লাহর জিকির তো করেনই। কুরঅানে তেলাওয়াত অার জিকিরে যে প্রশান্তি তিনি ক্বলবে লাভ করেন সেটা অার কিছুতেই খুঁজে পাননা তিনি। পড়ালেখা বেশিদূর না করলেও গভীর জীবনবোধ অাছে মতি মিয়ার। নবী সাল্লাল্লাহু অালাইহি ওয়াসাল্লাম উপর গভীর ভালোবাসা তার। তাই দরুদ পড়েন বেশি বেশি। গোপন একটা বাসনাও অাছে মনে। দরুদের উছিলায় হয়তো কোন একদিন স্বপ্নযুগে নবী সাল্লাল্লাহু অালাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিদার মিলতেও পারে কপালে। একবার যদি পাইতেন নবী(সা.) এর দিদার। অাহ! কলিজাটা শান্তি পেতো। গভীর ভাবনায় হারিয়ে গেছেন তিনি। অাল্লাহই ভালো জানেন। সব কিছুতেই অাল্লাহর উপর ভরসা তার।

    জীবনে একবার হলেও মক্কা মদিনা যাওয়ার ইচ্ছা মতি মিয়ার। টাকার অভাবে যেতে পারেননি। কিন্তু হতাশ নন তিনি। বিশ্বাস করেন অাল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব। কোন একদিন হয়তো ইচ্ছাপূরণ হবে। কারণ তিনি জানেন অাল্লাহ তাঅালা কারো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন না।
    প্রফেসর সালাম সাহেবের ধানমন্ডির দোতলা অালিশান বাড়ি পাহারা দেয় সে। এত বড় বাড়িতে সালাম সাহেব একা থাকেন। প্রিয়তমা স্ত্রী গত হয়েছেন বছর কয়েক অাগে। সালাম সাহেবের ছেলে-মেয়েরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। জীবিকার তাগিদে ছেলেরা পাড়ি জমিয়েছেন কেউ কানাডায়, কেউ অামেরিকায়। একমাত্র মেয়েটাও থাকে শ্বশুরবাড়িতে। সেও ব্যস্ত মানুষ। ঘর-সংসার অাছে। ছেলেরা বললেও সুদূর অামেরিকা-কানাডায় যেতে রাজি নন তিনি। জীবনের শেষ দিনগুলো প্রাণের শহর ঢাকাতেই কাটাতে চান। কতকিছু অাছে, কতকিছু নেই তারপরও এ শহরের মায়া ছাড়তে পারেননা। শৈশব, কৈশোর সব কাটিয়েছেন তিনি এ শহরে। এ শহরের মায়া ছাড়া কি সহজ কথা!
    যখন প্রফেসর সালাম সাহেবের বাড়ির পাহারাদার এর চাকরিটা পেয়ে যান তখন থেকে মতি মিয়া এ বাড়িতেই থাকেন। চাকরির উপার্জিত টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তাই বস্তিতে না থেকে উপায় নেই। তারপরও অাত্মতৃপ্তি বোধ করেন। সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রকাশ করেন অশেষ কৃতজ্ঞতা। এক জীবনে যা কিছু পেয়েছেন সবকিছুর জন্য। তিনি মনে করেন চাহিদা যত কম, দুনিয়াবি দুশ্চিন্তা পেরেশানিও তত কম। এই ষাট বছর বয়সেও অাল্লাহ সুস্থ রাখছেন এতেই খুশি তিনি। হালাল টাকায় বাজার সদাই যা ই করতে পারেন কোন অাফসোস নেই তার। বড়লোকের বিশাল বাড়ি পাহারার দায়িত্ব তার কাঁধে তাই পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ খুব একটা পান না। ছুটি পেলেই চলে যান পরিবারের কাছে। স্ত্রী-সন্তান অাছে। অাছে বৃদ্ধ মা-বাবাও।
    মা-বাবার খেদমত করতে পেরে ভীষণ খুশি তিনি। এবার মা-বাবার জন্য পছন্দের রসগোল্লা কিনে এনেছেন। বৃদ্ধ মা-বাবা দুজনই মিষ্টি খেতে পছন্দ করেন। রসগোল্লা খেয়ে মতি মিয়ার জন্য প্রাণভরে দোয়া করেছেন মা-বাবা দুজনই। ওদিকে তিনশো টাকা দামের লাল শাড়িটা পেয়ে তার স্ত্রীও বেজায় খুশি। মতি মিয়া ভাবেন একজীবনে অার কি চাই।
    নিজের পরিবারটাকে মনে হয় এক টুকরো জান্নাত। তার ছেলেরা কেউ ঢাকা শহরে রিকশা চালায়, কেউ করে কমলাপুর রেলস্টেশনে কুলির কাজ। অর্থকষ্টে সংসার চলে তাই সন্তানদের পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। বৃষ্টির সময় ঘরের চালার ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। অারেকবার ছুটিতে এসে ঘরের চালার মেরামত করবেন বলে গেছেন তিনি। অাজ যেতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই। ওদিকে সালাম সাহেবও একা মানুষ। অশীতিপর বৃদ্ধ।

    এখন অনেক রাত। মতি মিয়া তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়েছেন। অার এদিকে সালাম সাহেবের চোখে ঘুম নেই। কিছুতেই ঘুম অাসছেনা তার। অদ্ভুত শুন্যতায় ছটফট করছেন তিনি। শতচেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছেন না। বিশাল এ বাড়িতে ফ্রিজ, টিভি, এসি, দামি অাসবাবপত্র, সাজানো ফুলের বাগান, মনোরম বারান্দা, দামি গাড়ি কোনকিছুরই অভাব নেই। তারপরও নিজেকে খুব একা লাগছে তার। মনে হচ্ছে সব থেকেও যেন কিছুই নেই। একটা কথা বলার মানুষ পর্যন্ত নেই। মতি মিয়াও অালিশান এ বাড়িতে থাকেন না। মতি মিয়ার জায়গা বাড়ির গেটের একপাশে ছোট রুমটাতে।

    যখন স্ত্রী ছিলো সালাম সাহেব প্রায়ই বেড়াতে যেতেন কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, নীলগিরি, নীলাচল। পাহাড়-সমুদ্র খুব ভালো লাগে তার। ঘুরতেও ভালোবাসেন তিনি। দেশের বাইরে গিয়েছিলেন ভারতের অাগ্রায়। তাজমহল ভ্রমণের স্মৃতি এখনো চোখে ভাসে তার। শীমলা-মানালি-কাশ্মির সবই ভ্রমণ করেছেন প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে। এখন সবই অতীত। নীলাচলের কথা মনে পড়তেই প্রফেসর সালাম সাহেব একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন মতি মিয়া নীলগিরি, নীলাচল গিয়েছ কখনো? মতি মিয়া জবাবে বলেছিলো সাহেব অামরা গরীব মানুষ। সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। নীলাচল যাইনি কখনো। অামার মায়ের অাঁচলই অামার কাছে প্রিয়।

    ক্লাস, ভার্সিটি, থিসিস, পিএইচডি, গবেষণা এসবেই সালাম সাহেবের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে। কোন না কোন কাজে সারাবছরই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। ধর্মকর্ম তেমন কিছু করা হয়নি। রাতেরও যে একটা সুন্দর দিক অাছে সেটা তিনি জানেন না। যদি জানতেন তাহলে তিনি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন তাহাজ্জুদে। নিজেকে একা মনে হতো না। শুন্যতায় ছটফট করতেন না। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন তিনি খুব একা। ভীষণ একা। অথচ একসময় পরিবার পরিজন সবই ছিলো। এখন যে যার মতো চলে গেছে।

    এক অাজব শহর ঢাকা। কোটি কোটি মানুষের বসবাস এ শহরে। মানুষে গিজগিজ করছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় গড়ে উঠেছে অাকাশচুম্বী সব অট্টালিকা। মানুষ এ শহরে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে প্রতিদিনই সংগ্রাম করছে। এদিকে সালাম সাহেবের কাছে মনে হচ্ছে ঢাকা শহরে কোন মানুষ নেই। সবদিকে শুনসান নীরবতা। এ যেন মহাপ্রাচুর্যের মাঝে মহাশূন্যতা। ফজরের সময় হয়ে এসেছে। কাছের এক মসজিদ থেকে ভেসে অাসছে মুয়াজ্জিনের অাজানের ধ্বনি ‘অাসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ (ঘুম হইতে নামাজ উত্তম)।

    3
    3 Comments

Friends

Profile Photo
Md. Deloar Hossen
@md-deloar-hossen
Profile Photo
সৃষ্টি
@premdevota
Profile Photo
Pritam Biswas
@pritam-biswas
Profile Photo
Sirazam-Munira
@sirazam-munira
Profile Photo
Redwan Khan
@redwan-khan
Profile Photo
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
Profile Photo
AdabenTatali
@adabentatali
Skip to toolbar