-
শৈশব থেকে অনন্তকাল
ঠিকানাহীন অরণ্যতখন তো আর আজকের মতো এতো ঘন ঘন ঘর বাড়ি ছিলোনা, আজকে যাকে শহর বলা হয় সেটা তখন গ্রামই ছিলো।
আমরা প্রায় ষোল কুড়িজন ছেলে মেয়ে এক সাথে ছোয়াছুয়ি, লুকোচুরি, আর গাছের ডালে উঠে ঝোলাঝুলি খেলতাম।
লোডশেডিং তখন আশির্বাদ মনে হতো। এই বাহানায় পড়ালেখা ছেড়ে রাতে রিক্সার পেছনে ঝুকে পাচ মাইল খেলতাম,কখনও লুকোচুরি তো কখনও জংগলে ঝোপ ঝাড়ের ভেতর সাপের মণি খোজার জন্য কয়েক ঘন্টা দল-বল বেধে দিব্যি কাটিয়ে দিতাম।
এই সাপের মনির চিন্তার জোগান দিতো আলিফ লায়লা নামক খুব জনপ্রিয় আরব্য রজনী টিভি সিরিয়াল হতে। সেখানে সাপের মনি দিয়ে কত কি করা যেতো তা মাথায় ঢুকে পড়েছিলো আমাদের।
তাছাড়া নাগ-নাগিনী সিনেমাতেও যখন দেখতাম তখন এটাই বিশ্বাস ছিলো যে রাতে সাপ মাথায় করে মণি নিয়ে আসে, মণিতে নাকি আলো জলে আর সেই আলোতে সাপ পথ দেখে, রাতে যখন ঘুমায় তখন পাশে রেখে ঘুমায়, জংগল বা ডোবার আশে পাশে এরা ঘুমায় মানব চক্ষুর আড়ালে। আমরা ছালা বা পাতিল নিয়ে যেতাম এই বিশ্বাসে যে মণিটা ঢেকে দিলে সাপ আলো না পেয়ে খুজতে খুজতে মরে যাবে। রাতে পাহারা দিতে হবে, কারন অন্য কেউ যদি মণির খোজ পায় তাহলে বড়লোক হয়ে যাবে।সে মণি কোনদিন পাওয়া হয়ে উঠেনি!
পরীক্ষার সময়ে মা হারিকেন জালিয়ে দিতেন, পাশে ছোট ভাই ও পড়তো। হ্যা, আমরা দু ভাই, আমার ছোট ভাই আমার একদম পিঠাপিঠি – তবু বড় হবার সুবাদে এক ক্লাশ উপরে পড়তাম। তখন হয়তো ক্লাশ থ্রি-ফোরে পড়ি। হাতপাখাই সম্বল। তখন তো মুঠোফোন, নেট আর এতো গিজগিজ ছিলোনা তাই হারিকেন, হাতপাখা আর বাইরের হাওয়াই ছিলো ভরসা।
পরীক্ষার দিনগুলোও ছিলো মজার, আমরা দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম, দুষ্ট মানে আজেকার ল্যাক্টোজেন বা ব্রয়লার প্রজন্মের মতো ওলে ওলে কিংবা অপদার্থ না। আজকে পরিবারে নৈতিক শিক্ষা নাই, ছোট্ট বেলায় মকতবে আদব শেখানো হতো -সেটাও নাই, আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর সাথে সদ্ভাব ও একটা সম্মানের বিষয় ছিলো- এখন সেটা তো দূর ছোট থেকেই একটাই লক্ষ্য ঠিক করে দেয়া চাকুরী বা অর্থ কামাইয়ের জন্য পড়ো, মানুষ হিসেবে মরো!
চোখ না ফুটতেই কিন্টার গারটেন, পাহাড়সম প্রেসার, উম্মত্ত জাগতিক প্রতিযোগিতা, জড়বাদি সফলতার বিষাক্ত যান্ত্রিক সমীকরণ। তারপর কোচিং, ভর্তি, অর্থ ব্যয়, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, আত্মহত্যা
বাবা-মায়ের চোখে ঘুম নেই, পড়ার পয়সা জোগাতে শরীরে আরাম নেই, আরামের সময়ে শরীরে শক্তি নেই। কি এক অদ্ভুত কিছু পাওয়ার ফানুশ উড়িয়ে জীবনের ক্ষনিকের ক্ষণগুলোকে নিঃশ্বেষ করে দেয়া যেন জীবনের কোন উদ্দেশ্য নেই।এখন কেউ কাওকে চেনেনা, কেউ কাওকে মান্য করেনা, কেউ রাস্তায় বয়স্কদের সাথে কিভাবে কথা বলবে জানেনা- কারন তাদের সামনে এক সফলতার স্বপ্ন।
এক পুচকে ছেলে বাবার গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো, তা দেখে মায়ের কি হাসি, ‘দেখেছো! বাবাটা কি ফাস্ট হয়েছে?’
এই ফাস্ট বাবাদের কৈশোর ও যৌবন চলে যায় সফলতার ঢেকি ভাংতে ভাংতেই, একদিন চাকুরী হবে, বিয়ে করবে ব্যাস তারপর? জীবন কি সেখানেই শেষ?
জীবনের যান্ত্রিকতাকে আধুনিকতা, জীবিত মরে যাওয়াকে সফলতা, আর অনিয়ন্ত্রিত প্রজন্মকে এগিয়ে চলা সমাজ মেনে নিয়েই দিব্যি ছুটে চলছি আমরা
–
জানিনা গন্তব্যের শেষ কোথায়?একটা একটা করে পরীক্ষা শেষ হয়ে যেতো। প্রথম সাময়িক, দ্বিতীয় সাময়িক, বার্ষিক- তারপর ছুটি। পরিবারের সাথে অমুক কাকুর বাড়ি যাও, অমুক মামার বাড়ি, ঘুরাঘুরি, শীত হলে পিঠে খাওয়া, গরমের ছুটিতে আম খাওয়া, জাম খাওয়া।
আজ মনে হয় সুখ গুলো কেড়ে নিয়ে সেগুলোর ছবি মুঠোফোনে ঢুকিয়ে মুলো ধরিয়ে দিয়েছে আমাদের।
সময় নেই কারো কাছে।পুকুরে দল বেঁধে সাতার শেখা, ডুবে ডুবে জল খেয়ে খেয়ে একদিন পুরো পুকুরে রাজত্ব করা। গাছের ফল চুরি করা, হাড়ি-পাতিল নিয়ে এসে একটু গাছ গাছালির ফাঁকে সহপাঠীরা মিলে ফিস্ট খাওয়া।
সে কি যে মুহুর্ত গুলো।রান্না তো করতো মুরুব্বী মহিলারা, আমরা ব্যস্ত দৌড়াদৌড়িতে, গাছে চড়া, লুকোনোতে
মেয়েরা দল বেঁধে কুত কুত খেলতো।
একটা ছক মাটিতে কষে একটা ছোট চার কোনা চ্যপ্টা পাথর বা ইটের টুকড়ো ছুড়ে মারতো, যে ঘরে পড়তো তা একদমে খেলার ব্যকরন মেনে নিয়ে আসতে হতো। ব্যকরনটা ভুলে গেছি কিন্তু সবাই একটাই দাবী করতো যে মেয়েটা একদমে আনতে পেরেছে সে নাকি মাঝখানে শ্বাস নিয়েছে। আর সে কসম-বিদ্যা করে বলতো সে নেয়নি।খাবারের সময় খিচুড়ি, ডিম ভুণা, মুরগী।
বড়রাই পাতে তুলে দিতেন।
সব কিছুর মুল কেন্দবিন্দু এই খাওয়াটাই।
কি ছোট কি বড়, কি বেড়াল, কি ইদুর- কি আচার কি অনুষ্ঠান, কি মেহমান, কি সভা
আকর্ষণ একটাই খাবার।
কোথাও কাংগালী ভোজ, কোথাও আপ্যায়ন, কোথাও তাবারুক, তো কোথাও খানা।পেট আছে ক্ষুধা আছে তো খাবেই, কিন্তু বাচার জন্য খাওয়া আর খাওয়ার জন্য বাচা দুটোতে বিস্তর ফারাক আছে। আগের মানুষদের জীবনের আদর্শ ছিলো, লক্ষ্য ছিলো জীবন ও মানবিকতা কেন্দ্রিক, বীরত্ব ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী।
আজকে ফটকাবাজী করে খাওয়া হচ্ছে চালাকী, ভেলকীবাজী করে খাওয়া হচ্ছে মানবতা, ধান্দা করে মারার নাম ব্যবসা, খাবারের জন্য বাচা হচ্ছে সফলতা।সে সাথে যুক্ত হয়েছে যুক্তিহীন যান্ত্রিকতা, বানিজ্যিক চিন্তা ভাবনা, এবং স্বার্থপর সম্পর্ক।
আগে যে ধোয়া তুলসীপাতা ছিলো তা নয়, তবু সমাজে কিছু আদর্শবান সুপুরুষ ছিলো যারা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলো, শিক্ষার জন্য পড়তো চাকুরীর জন্য নয়, জীবন ধারনের জন্য খেতো, খাওয়ার জন্য নয়, পরিবার ও আত্মীয়তার জন্য সম্পর্ক করতো, রুপ আর অর্থের জন্য নয়, আদর্শের জন্য জীবন গড়তো, বিলাসিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়, মরনের পরের জীবন সুন্দর করাই লক্ষ্য হতো কেবল একটা চাকুরী, একটা পদবী, আর একটা বউ এর জন্য নয়।
জীবন এখানেই শেষ নয়,
একজন হুট করে পয়সাওয়ালা মেরুদণ্ডহীন হাইব্রিড প্রজন্ম অভিজ্ঞদের সামনে কথিত সফলতার চেয়ারে বসে জীবনের মানে ও সফলতা বোঝানো এটা সত্যিই এ বিশ্বের জন্য হুমকীস্বরুপ।ছোটবেলা থেকেই একটু বেয়াড়াই চলতাম, সেটা মাস্তানী বা বখাটে ছেলের মতো নয় বরং দুষ্ট ও ডানপিটে ছেলের মতো। পড়াশোনা তো কয়েকটা বই, আজকাল এতো গাদা গাদা বই একটা শিশুদের ব্যাগে থাকে যা আমাদের সময় ভাবাই যেতোনা।
আগে শিক্ষা ছিলো জাতি গড়তে, কিন্তু এখন শিক্ষা হলো শিক্ষকের খাই খাইয়ের জীবন গড়তে- কমারসিয়াল!
ক্লাশের পড়া শেষে সারাদিন খালি ঘুরাঘুরি, এদিক সেদিক, দিক- বিদিক(চলবে)
5 Comments

ঠিকানাহীন অরণ্য -
লেখক
আমি স্বত্মা সম্বলিত আত্মাবাহক মানুষ
কষ্ট চাষ করে শব্দ ভেদ করে সাহিত্য রস বের করা আমার কাজ
প্রেম আমার ধর্ম, ন্যায়বিচারের কথা আমার যুদ্ধ
আমি চোখের ভেতর সাগর চষি উম্মাদ উম্মত্য হয়ে
জাগতিকতার যান্ত্রিকতা কি করবে আমায় নিয়ে?
আমি ভবঘুরে, আনমনে, বণ্য এক অরণ্য---
Friends
Md.Khaladur Rahman (অনল)
@wanol
পরিমল রায়
@parimal-roy
Rejwana Khan
@rejwana-khan
Shovan Khan Sabuz
@methopath
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Reazul Kabir
@reazul-kabir


দারুণ ও মোহনীয়