Profile Photo

Drako ShajibOffline

  • drako
  • Profile picture of Drako Shajib

    Drako Shajib

    3 years, 7 months ago

    # ডিসেম্বরের শহর

    [গল্প লিখছিলাম অন্য একটি কিন্তু গল্পে গল্পে এই গল্পটা কিভাবে যেন চলে আসলো। সকল লেখক-পাঠকবন্ধুদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কিছু ভুল শব্দ ও বাজে রসিকতার জন্য]

    কাকতালীয়ভাবে যেটা দরকার সেটা ঠিক সময়ে পেয়ে গেলে বেশ অবাক লাগে, তাই না?
    এই ধরুন আপনার আজকে খিচুরী খেতে মন চাইছে বাসায় ফিরে দেখলেন পাশের বাসার ভাবী আপনার বাসায় খিচুরী দিয়ে গ্যাছে। অথবা, ফাঁকা পকেটে ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন আর রাস্তায় বেশ কিছু টাকা কুড়িয়ে পেলেন।
    তবে, আমার এখন আর অবাক লাগেনা। আমার লগে এত হরহামেশা কাকতালীয় ভাবে এত কিছু ঘটে যে আমি এখন মনে মনে নিশ্চিত থাকি, যেই জিনিসটা চাইতাছি তা একটু অপেক্ষা করলেই বা একটু খুজলেই পাইয়া যাব। একটা ঘটনা কই তাইলে বুঝবেন।
    একদিন এক কামে গেছিলাম শালবন। রাস্তা দিয়া যাইতে যাইতে একটা স্টিক বানাইসি। খামু। কিন্তু ম্যাচ নাই। রাস্তা ধইরা হাঁটতে হাঁটতে একটা চা বিড়ির দোকান পাইলাম। একটা ম্যাচ চাইয়া পকেটে হাত দিসি দেখি ভাংতি কোন ট্যাকা নাই। হাজার ট্যাকার নোট। দোকান থিকা যে ধরামু সেই সাহস পাইতাসিনা। অনেক ময়মুরুব্বি বইসা আছে।
    এখন এই বনে বাদাড়ে এত বড় নোট পুরা এক প্যাকেট সিগারেট কিনলেও ভাংতি হইতে কষ্ট হইয়া যাইব। মন খারাপ কইরা দাঁড়াইয়া আছি দোকানের সামনে। কি করুম ভাবতাসি। এমন সময় একটা ট্রাক আইসা থামল দোকানের সামনে। ড্রাইভার বুক পকেট থেকে একটা কাগজ বাইর কইরা দোকানদারের কাছে ঠিকানা জিজ্ঞাস করতেই একটা পয়সা টুপ কইরা ড্রাইভারের কাগজের ফাঁক দিয়া মাটিতে পড়ল। ড্রাইভার খেয়াল করলেও ট্রাক থেকে আর নামল না। কয়েনটা যে মাটিতে পড়ছে দোকানে বইসা থাকা সবগুলো চোখ দেখছে। আমি সবার চোখের সামনে কয়েন তুইলা দেখি পাঁচ ট্যাকা। ম্যাচের দাম বাবদ কয়েনটা দোকানদাররে দিয়ে সোজা হাঁটা দিলাম।

    তাই মনে করতেই পারেন আমি ধন-সম্পদ, সুখ সমৃদ্ধি চাইয়া এত দিনে পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষের তালিকায় নাম লিখাইছি। কিন্তু আমার কপাল যেমন ভালোর ভালো, খারাপের খারাপ।

    একদিন আলুক্ষেতে দাঁড়াইয়া এক ভিক্ষুকের হাত নেই দেইখা ভাবতাছিলাম হাত ছাড়া মানুষের অনুভূতি কেমন হয়? তার কষ্ট কি আমি কখনো বুঝতে পারব? আর ঠিক তখনি, খোদা জানে কই থেকে একটা বাস আইসা ধাক্কা দিল। আমি উইড়া গিয়া পড়তেই একটা হুন্ডা সাই কইরা আমার ডাইন হাতের উপর দিয়া চইলা গেল। হাত হাড়াইলাম একটা। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝি হাত না থাকলে কেমন লাগে।

    খারাপটা যেমন গুরুতর হইছে তেমন যদি ভালোটা হইত তাইলে আর দুঃখ থাকত না। কইতে পারেন জানে বাইচা গেছি, আরো খারাপ কিছুও হইতে পারত কিন্তু জানে এর আগেও বাঁচছি।

    ছোটবেলায় কুমিল্লা গেছিলাম কাকার লগে ঘুরতে। যেখানে গেসিলাম ঐ খানে একটা সুন্দর বাধানো পুকুর ছিল। টলটলা পানি। আমি তখনো সাঁতার পারিনা। হাঁটু সমান পুকুরে নাইমা মন ভিজলোনা তাই মনটারে ভিজাইতে বুক সমান পানিতে নাইমা পড়লাম। দুইটা ডুব দিয়া ভাবলাম আজকে থাক। থাকুম তো আরো কয়দিন। ভাইবা চিন্তা যেই ঘুইরা উঠতে যামু তখনি মনে হইল আমারে পিছন থিকা পানিতে টান দিসে। যতই সামনে পা বাড়াই ততই পিছনে যাইতে থাকি। একসময় পায়ের নিচে আর ঠাই নাই। সাথে সাথে দাপাদাপি শুরু কইরা দিলাম।
    পুকুরে তখন আরো অনেকে গোসল করতাছিলো। আমার নানীও ছিল। কিন্তু কেউ আর বুঝে নাই আমি সাঁতার কাটতাসি নাকি বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টাটুকু করতাসি।
    দাপাদাপি করতে করতে যখন নিশ্বাসের সাথে নাক মুখ দিয়া পানি খাওয়া শুরু করলাম তখন নিজেরেই বলতে লাগলাম কাম সাড়ছে। মায়ে আজকে কঠিন রাগ করব যদি শুনে আমি পানিতে ডুইবা মইরা গেছি।
    যখন চোখে মুখে সূর্যের চোখ ঝলাসানো আলোয় এক অন্য ভুবন দেখতাসি তখন নাকি কাকতালীয় ভাবে এক মহিলার শাড়ির আঁচল ধইরা টান লাগতাসিলো। মহিলা পড়ে নাকি আইসা আমারে বাঁচায়। চোখ মেইলা দেখি নানীর মুখ। যে আমারে বাচাইছিল তারে আর দেখতে পারি নাই। দেখতে পারলেও তখন আর বুঝি নাই কোন মহিলা ছিল। আমি তখন পানিতে ডুইবা যাওয়ার জন্য আমার কি ধরনের শাস্তি হইতে পারে এই চিন্তায় আছিলাম। শাস্তি অবশ্য হইছে, কঠিন এক শাস্তি! বাইচা থাকার শাস্তি!

    আমার কপালগুণে সবসময় এমন কিছু কিছু না ঘটতেই থাকে। সবসময় বলতে কিছু কিছু সময়ে এমন হয় যে পুরা ফাঁপরে পইড়া যাই, এমন অসহায় হইয়া যাই যে করুনায় নিজেরে নিয়া নিজেই হাসি তামাশা করতে থাকি। তখন, কপাল গুণে এমন কোন কারিশমা হইয়া যায় যে সেই সময়টা কোনরকম সামলাইয়া নিতে পারি।

    হাত হাড়াইয়া খুব কষ্টে আছিলাম। কাজ বাজ নাই, টাকা পয়সা নাই। থাকার জায়গা যেদিন হারাইলাম ঐরাতে মন খারাপ কইরা লাভ রোডে বইসা আছি ফুটপাতের উপর এক বিড়ির দোকানের পাশে। এক বদ মাইয়া আইসা আমারে কইল, ঐ আমার একটা কাজ কইরা দিতে পারবি?
    আমি কইলাম কি কাজ?
    — ঐ যে ঐ খানের ঐ গাড়িতে যে বসা আছে তারে গিয়া কইবি লাগবো নাকি রাতের পরী?
    — কইলে আমারে ট্যাকা দিবি?
    — হ দিমুনে।
    আমি সাথে সাথেই ঐ গাড়ির কাছে গিয়া জানলায় চোখ রাইখা দেখলাম এক বুড়া ব্যাটা বইসা আছে। তারে কইতেই বুড়া ব্যাটা কইল রেট কত?
    আমি তো আকাশ থিকা পড়লাম। রেট তো জানা হয় নাই। আন্দাজ কইরা কইলাম পাঁচ হাজার।
    হালায় গাইল দিয়া কইল তোর রাতের রানী কই? দেখি তার মুখখানা। ওরে দেখাইতেই ওয় তিন হাজার টাকা কইল।
    আমি আইসা ঐ মাইয়ারে জানাইতে আমারে একটা চুমা দিয়া গাড়ির দিকে গেল। গাড়ির ভিতরেই ওরা কাম সাড়ল।
    ঐ মাইয়া গাড়ি থেকে বাইর হইয়া আবার আমার কাছে আইল। দুইটা দামী বিড়ি কিন্না একটা আমারে দিল। তারপর জিগাইলো কই থাকি?
    কইলাম থাকার জায়গা নাই।
    ওয় বিড়ি জ্বালাইয়া কইল আমার লগে কাম করবি? থাকতে দিমু, খাইতে দিমু, মাঝে মইধ্যে মুড ভালো থাকলে লাগাইতেও দিমু।
    আমি আবার বইসা পড়লাম ফুটপাতে। বিড়িটা ধরাইয়া চান্দের দিকে তাকাইয়া কইলাম সালা কপালের মায়রে…

    এক হাত হইলেও কোন সুযোগ আমি হাত ছাড়া করিনা। ঐ বদমেয়েরে বিয়া করলাম। বউ খারাপ কাম করে ভাইবা মন খারাপ হইত। মাঝে মাঝে মনের দুঃখে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতাম। একদিন হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর আইছি। ফেরার সময় যেই বাসে উঠছি, উঠতেই বুঝলাম এইডাই সেই বাস যেই বাসে ধাক্কা খাইয়া আমার সব থেকে দরকারি হাতটাই ভোগে চইলা গ্যাছে।
    ড্রাইভার আমারে দেইখা চিনলো। সিগন্যালে বাস দাঁড়াইলে বারবার ঘুইরা ঘুইরা তাকাইতাছিল। ড্রাইভারের পাশের সিট খালী হইতেই সেইখানে গিয়া বসলাম। এই লোকটা সেদিন আমার জন্য অনেক করছিল। হালায় নিজেই ধাক্কা দিয়া, নিজেই হাসপাতালে নিয়া গ্যাছে। ক্ষতিপূরণ হিসাবে এডভান্স সাড়ে সাত হাজার টাকা হাসপাতালের বিল হিসাবে দিয়া তারপর পলাইছিলো। হাত কাঁটা যাওয়া পর নিজের হাতে একদিন গরুর মাংস দিয়া ভাত মাইখা খাওয়াইয়া দিসিলো।

    আমি ওস্তাদরে হালচাল জিগাইলে কইল খুব ঝামেলায় আছে। ঐ এক্সিডেন্টে হেলপার ধরা খাইছিলো। মহাজনে রাগ কইরা ছাড়ানির জন্য কোন টাকা দেয় নাই দেইখ্যা পুলিশে চালান কইরা দিসে। এখন যেই *** পোলায় আছে অয় দুনিয়ার চোর। সারাদিন গাড়ি ভরা যাত্রী থাকে কিন্তু তারে নাকি সবাই কম ভাড়া দিয়ে নাইমা যায়।
    আমি কইলাম আমারে রাখবেন কামে। আট আনাও চুরী করুম না খালী শর্ত একটা গাড়ি সুন্দর মত কইরা চালাইবেন।
    ওস্তাদে কইল বড় কষ্টের কাম কিন্তু তার উপর এক হাত। আর আমার মুখ ভালোনা। গালি দিলে উল্টা গালি দেওয়ন যাইবোনা।
    আমি কইলাম ট্যকা দিবেন ব্যবহার ভালো পাইবেন।
    ওস্তাদ নগদের উপর গাড়ি সাইড কইরা ফারুক নামের কামলাডারে ডাকল। ওস্তাদের গলা শুইনা ভেতরটা কাইপা উঠল।
    ফারুক মনে হয় পিছনে ভাড়া কাটায় ব্যস্ত ছিল। ঐখান থেকে উত্তর দিল কি হইছে? চ্যাচাইতাসেন ক্যান?
    ঐ *** পোলা এই দিকে আয়। কয় টাকা ভাড়া কাটছস?
    টাকা গুনতে গুনতে ফারুক আগাইয়া আইসা কইল ক্যান ত্যাল লাগবো নাকি? সকালেই তো টাংকি ফুল কইরা বাইর হইলাম।
    — এত কথা কস ক্যান? তরে যেইটা জিগাইসি ঐটা ক…
    — ১৩৮০
    — ঐ ট্যাকা এর কাছে দিয়া বাস থিক্কা নাম। তর চাকরী নট!
    ফারুক কতক্ষণ ভেন্দার মত আমার দিকে তাকাইয়া থাকল। তারপর কইল ট্যাকা দিমু ক্যান? সারাদিন কাম করসিনা।

    ওস্তাদ সিট ছাইড়া উইঠা গিয়া ঠাটাইয়া একটা চড় দিল ফারুকের কান বরাবর। এরপর ফারুকের হাত থেকে টাকাগুলো জোর কইরা নিয়া ধাক্কা দিয়া গাড়ি থিকা নামাইয়া দিল।

    সেদিন ওস্তাদের সাথে থাইকা গ্যালাম। গাড়ি শহরের বাইরের। রতনপুরের। সকালে ওস্তাদের সাথে আবার বাইর হইলাম গাড়ি লইয়া। সারাদিনে শহরের এমাথা ওমাথা করে ৪ টিপ। শেষ টিপে আর ওস্তাদের সাথে সেদিন শহর ছাইড়া গ্যালাম না।
    বাসায় যাইয়া দেখি বউ নাই। নিশ্চয়ই **টা বাইর হইসে শরীর ব্যাচতে। আইজকাইল তার মার্কেট বেশ ভালো। গাড়ি কইরাও মাঝে মাঝে তারে নামাইয়া দিয়া যায় বাড়িতে। ছোট্ট একটা এলাকায় কয়েকঘর টিনসেড বাড়ির একঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। পাড়া পড়শি সবাই দেখছে বিষয়টা। অনেকে এসে বলে আপনার বৌ গাড়িতে কইরা ঘোরা ফেরা করে আর আপনারা এই বস্তি থাকেন। অনেকের আবার বিষ্ময় কেটেছে বহু আগেই। তারা আবার সুযোগ পাইলেই ঘরে ঢুকতে চায়।
    এই দিক দিয়া আবার আমার বউ ভালো আছে ঘরে কাউরে চান্স দেয়না। কয় অফিসের কাজ বাসায় করিনা।
    আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে বউ আইলো শেষ রাতে। গায়ে মদের গন্ধ, কথা বার্তাতেও মাদকতা।
    আমি চুপচাপ বইসা শুধু শুনতাসি।
    বউ কয় পুরুষ মানুষ আর কু** বাচ্চার লগে মিল কই জানো?
    আমি নিরুত্তর।
    বউ কয়, যখন এগো মাথায় মাল উইঠা যায় তখন আর *** পোলারা ফুডা খুইজা পায়না।
    আমি কইলাম ঠিক বলছো। আসলে মানুষ জাতটাই খারাপ। পোলা আর মাইয়া বিষয় না।
    বউ শাড়ি খুলতে খুলতে বলে এইটা কি কইলা। এই যে আমি ভালো, তুমি ভালো আমরা কি মানুষের জাত না।
    আমি বউয়ের ছোপ ছোপ লালচে হয়ে যাওয়া শরীর দেখতে দেখতে বলি, মনে হয়না।
    — আমরা তাইলে কিসের জাত?
    — ফক্কিনির জাত।
    বউ আর কথা বাড়াইলোনা কাথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
    আমিও বউয়ের পাশে শুয়ে তার নরমে নিজেরে গরম কইরা ঘুমাইয়া পড়ি।

    ঘুম ভাংলে দেখি বউ নাই ঘরে। আমি বউয়ের ফোন দিয়া ওস্তাদরে ফোন দিয়া কই রতনপুরে আমার জন্য একটা ভালো বাড়ি ঠিক কইরা দিতে। পাড়লে আজকেই দিতে তাইলে আইজ থেকেই বউরে নিয়ে উঠব।
    ফোন রাখার আগেই বউ আইল গোসল কইরা। দেইখা মনটা ভইরা উঠল। এক হাত দিয়াই জড়াইয়া ধইরা কইলাম তরে নিয়ে আমি চান্দে বাসা বাধুম বউ। এই ইটের ভাঁটায় আর থাকুম না। ব্যাগ গুছা।
    বউ কইল, হাত জাগে না, সোনা খারাইয়া দেখি তালগাছ!
    মেজাজটা খারাপ হইয়া গেল। মনটা চাইল হাতটা ওর গলার ভিতর ভইরা দিয়া কইলজাটা বাইর কইরা আনি। পরে মনে হইল জোর খাটাইয়া লাভ নাই, আপোষে থাকতে হইব।
    আর, ওর মুখের ভাষা ছাড়া বাকি সবটাই সুন্দর! ওরে নিয়া ভালোই থাকতে পারুম মন কইতাছে।
    ওরে ময়না, টিয়া, সোনা কইয়া বুঝাইলাম।। কাহিনী শুইনা ওর ছলছল চোখ দেইখা বুঝলাম কাজ হইসে। এই চান্সে আদর দিয়া প্রেমে একটু মশলা দিলাম। ঝাঁঝ বাইর হওয়ার আগেই ফোনটা বাইজা উঠল।
    ওস্তাদ ভাইবা ফোনটা ধরলাম। কানে নিয়া শুনি এক *** *** পোলায় কইতাসে, “কালকের কাস্টমার তরে বাকি জীবনের লাইগা রাইখা দিতে চায়। এর বদলে তুই যা চাইবি তাই তরে দিবো আর মরলে পড়ে ওর সব সম্পত্তি তর। আর আমি খোঁজ নিয়া দেখসি ওর তিনকূলে কেউ নাই। তুই কি কস?”
    আমি ফোনটা কাইটা দিয়া বউরে কইলাম, ফোনটা আমি নিয়ে যাইতাসি তুই ব্যাগ ট্যাগ গুছাইয়া ঘরে থাকিস। কোথাও যাইস না। আমরা আজকেই যামুগা এই শহর ছাইড়া।

    ওস্তাদের লগে দেখা হইতেই ওস্তাদরে জিগাইলাম কিছু পাইছেন?
    — কী?
    — বাড়ি।
    — কাহিনী কি? খুনটুন করছস নাকি?
    — ধুরো হালার! এক হাত দিয়ে নিজের জীবনডা নিতে পারতাসি না আবার আরেকজনের?
    দুপুরে খাইতে খাইতে ওস্তাদরে বিষয়টার গুরুত্ব বুঝাইতে ওস্তাদ কয় বাড়ি একটা আমারি আছে। নদীর লগে। ঝড়-বন্যায় পানি উঠে দেইখা থাকিনা। কিন্তু তর ভাড়া দেওন লাগব।
    আমি কইলাম মাগনা থাকুম ক্যান? তয় কম রাখতে হইব। যতই হোক, আপনার লাইগা আজ আমার এক হাত নাই।
    — তাইলে কি আজকেই উঠবি?
    — তাইলে তো বাইচা যাই।
    — ঠিক আছে তাইলে। আইজকা যাওয়ানের সময় তর মাল সামানা নিয়ে যামুনে।
    — মালছামানা তেমন কিছুই নাই একটা বউ আছে আর বউয়ের কয়ডা শাড়ি।

    রাইতে যাওনের সময় বাসায় আইসা দেখি বউ আর কারেন্ট কোনটাই নাই। ঐদিকে ওস্তাদ বাসস্টান্ডে পুরা বাসটা খালি কইরা আমগো জন্যে বইসা আছে। মন খারাপ কইরা বইসা রইলাম ঘরে। ইচ্ছা করতাছিল গলায় দড়ি দেই। আবার মনে হইল দড়ি তো নাই ঐ *** শাড়ি পেচাইয়া মরতে হইব শ্যাষ-ম্যাষ। নিজের উপর হাসি আসা শুরু হইল। এমন সময় মনে হইল হালার ওরে তো আমি ভালোইবাসি না। খারাপ মানুষরে চাইলেও ভালোবাসা যায়না। আমি একাই থাকুম চান্দে।
    যাওয়ার আগে মনে হইল এই *** ঘরে মুইতা যাই। ঘরের ভিতর মুইতা বাইর হইতেই দেখি বউ আসতাছে। বুকের মইধ্যে ছ্যাৎ কইরা উঠল।
    চিল্লাচিল্লি শুরু কইরা দিলাম। বউ কইল একজনের কাছে কিছু টাকা পাই ঐটা আনতে গেছিলাম।
    আমি শান্ত হইয়া কইলাম চল তাইলে এক্ষুনি আমার লগে। বউ কয় দাঁড়া ব্যাগটা নিয়া আসি। বউয়ের পিছন পিছন মোবাইলের লাইট জ্বাইলা গেলাম। দেখি বউয়ের ব্যাগের উপড়েই মুইতা ভাসাইয়া দিসি।

    বউরে নিয়া ওস্তাদের কাছে ফিরা যাইতেই ওস্তাদ একটা বিড়ি জ্বালাইয়া গাড়ি এক্সেলেটরে পাড়া দিল। রকেটের মতো উড়তে উড়তে যাইতাসি স্বপ্নের দুনিয়ায়। বউরে কইলাম, হালায় এমনে গাড়িটা চালাইয়া আমার হাতটা খাইয়া দিসিলো একদিন।

    কপালটা ভালো, স্বপ্নে যেমনটা চাইছিলাম তেমন একটা বাড়ি পাইছি। নদীর ধারে নিরিবিলি শান্তিতে থাকা শুরু করলাম।
    বউটা সারা দিন নদীতে বড়শি ফালাইয়া বইসা থাকে। সারাদিন যা মাছ-টাছ পায় রাইতে আমি আইলে তাই দিয়া দুইজনে খাইয়া ঘুম দেই।
    দিন দিন বউটা আরো বেশি সুন্দর হইয়া উঠতাছিল। দেশের মানুষ তো জ্বইলা পুইড়া আঙ্গার হইয়া যাইতাছিল আমার মত লুলা ব্যটার বউ দেইখা।

    হিংসার আগুনে না পুড়লেও বাসে সারাদিন গরমে, ঘামে, ধুলাবালি আর মানুষের গায়ে গায়ে ডলা খাইয়া আমার শরীর দিয়াশলাইয়ের প্যাকেটে লেপা বারুদের মত হইয়া থাকে। আমি নিশ্চিত কাঠি দিয়া ঘসা দিলে আগুন ধইরা যাইব।
    এর ভেতর নানা তালের হাজার মানুষ প্রতিদিন বাসে ওঠে নামে। কিছু আছে দুনিয়ার গোয়াড়! উইঠা গেটের কাছে ঘাপটি যে মারব আর নড়া চড়া নাই। যত কই ভাই পিছনে গিয়ে দাঁড়ান তত বাসের হাতল শক্ত কইরা ধরে। অথচ সবাই যদি ঠিক মত দাঁড়ায় আমাগো ডেইলি ইনকাম আরো ২ গুন বাইড়া যাইত।
    কিছু আছে বোবাকালা ৫ টাকা ধরাইয়া দিয়া আর কিছুই দ্যাখে না, শুনেও না। আবার কিছু আছে **পাকনা। ওগোরে তো কিছু বলাই যাইব না। একটা কইলে ১০ টা শুনাইবো, চান্স পাইলে গায়ে হাত দিব।
    এই দিকে আমার হাতটা না থাইকা মনে হয় ভালোই হইছে। প্রতিদিন’ই কেউনা কেউ খুশী হইয়া ভাড়া বাড়াইয়া দেয়। একদিন ভাবতাসি বউয়ের লাইগা একটা দামী কিছু নিয়া যামু ঐদিনি ৫০০ টাকা দিছে একজনে ভালোবাইসা।
    এছাড়া অনেকেই ভাড়া নিয়া আমার লগে বেশী ক্যাচক্যাচ করে না। আমিও অবশ্য সুন্দর কইরা বলার চেষ্টা করি। এইদিক থেকে বলা যায় ভালো ব্যবহার হইল আলাদিনের চেরাগ। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার কইরা সহজেই ভাড়া বেশী নেওয়া যায়। উপড়ি ইনকামের দরকার আছে নাইলে নিতাম না। দেশ ভরা স্টুডেন্ট ওগো হাফ-পাস রাখতে রাখতে ফুল ভাড়া দেওয়ার যাত্রীগুলা হাত ছাড়া হইয়া যায়।
    তারপরে দিন শেষে যদি দেখি ত্যালের খরচ ওস্তাদের পকেটের উপড়ে দিয়া যাইতাসে তাইলে সেদিন ওস্তাদ আর হ্যার বউরে ** না, আমার উপরে দিয়াই যায়। তখন মনে হইত আমার বৌ মনে হয় আমার থিকাও ভালো কাজ করত। পৃথিবীর সবথেকে জঘন্যতম চাকরী হইল বাসের হেলপারী আর কন্ডাক্টটারী করা। দুনিয়ার মানুষের গায়ের স্যাঁতস্যাঁতা ঘামে সারাদিন মাখামাখি কইরা, খালি প্যাটে গালি খাইয়া, ট্যাকার লাইগা চুরী-চামারী কইরা, পচা মাছের মত বোটকা গন্ধ নিয়া রোজ বাড়ি ফিরি।

    তারপরেও শান্তিতেই আছিলাম। বউরে নিয়া রাইতে নদীর জলে রংতামাশা কইরা, পেট ভইরা খাইয়া, নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া সারাদিন ঐ এক হাতে ঝুইলা থাইকাও আনন্দে আছিলাম পুরা দমে। কিন্তু হালার কপাল… বাসে ঐদিন কি নিয়া জানি এক বিশাল গ্যাঞ্জাম বাইধা গেল। গাঞ্জাম থামাইতে যেই কাছে গেছি অমনি পৃথিবীটা আৎকা কাইপা উঠল। উলট পালট হইয়া গেল সবকিছু প্রচন্ড এক বিস্ফোরণে।

    হাইগা পরিষ্কার করার হাতটাও আর থাকলোনা আমার। বোমের চোটে কই উইড়া গিয়া পড়ছে আর খুইজা পাই নাই।

    কপালগুণে হাসপাতালে যতদিন ছিলাম ততদিন পরিষ্কার করার জন্যে লোকের অভাব হয় নাই। ভাবছি বাড়ি গেলে বউ তো আছেই। চিন্তা নাই।

    মাস খানিক পর যখন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম দেখি ওস্তাদ আমার বউরে নিয়া বেশ আনন্দে আছে। আমারে দেইখা কইলো তোগো থাকোন-খাওয়োন আমার। চিন্তার কিছু নাই।
    আমি কইলাম ওস্তাদ তুমি বিশাল মনের মানুষ এতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু আমাগো লাইগা কতদিন’ই বা করবা?
    –আমার মনটা আর দেখলি কই? তর লাইগা আমার পোলারে জেল থিক্কা না ছাড়াইয়া তর হাসপাতলের বিল দিছি। ঐ দিন যেই হেলপাররে পুলিশ ধইরা নিয়া গেছিল ঐ হেলপার আমার আপনা পোলা আছিলো। আমার একমাত্র পোলা।

    আমার হালা কপাল’ই একটা…

    ———————————-আনন্দ আসে দুঃখটাকে সাথে নিয়েই———————————

    22
    21 Comments
    • বাক্‌রুদ্ধ হয়ে বিষ্ফোরিত চোখে পড়ে গেলাম আপনার অসম্ভব সুন্দর জীবনকথনখানি… কতটুকু মমতা নিয়ে, যত্ন ক’রে এটি লেখা তা বুঝতে মোটেই বেগ পেতে হয়নি… শ্রমজীবনের যে ব্যাপক ক্যানভাসটি এখানে অঙ্কিত সেটা আমাদের তৃতীয় বিশ্বের বাস্তব জনপ্রতিনিধিত্ব ক’রলো খুব সাবলীলভাবেই… এত স্বল্প কথায় আমার মুগ্ধতা’র সম্পূর্ণ প্রকাশ হ’বে না, কিছু কিছু লেখা থেকে একটা অদৃশ্য অদ্ভূত ইথার যেন আমার মননে মজ্জায় আবেশিত হয়, পরাগায়িত হয়…! শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অভিনন্দন প্রিয় সজীব…

      • অনেক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা নেবেন কবিপ্রিয়!
        জানিনা কতটুকু আনন্দ দিতে পেরেছি? তবে আমার লেখা কেউ পড়লে আমি ভীষণ আনন্দ পাই! সত্যি! খুব যত্ন করে লিখেছি গল্পটা। কারন গল্পের চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনে খুব অযত্নে বেড়ে ওঠে! এমনকি, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যত্নশীল নয়। যত্ন নেয়ার মত সময় বা ইচ্ছা কোনটাই হয়না বলে আমার ধারণা।
        মজার বিষয় হল আজকে সকালে আপনার কবিতা থেকে “হাংরি মুভমেন্ট” নিয়ে পড়ার পরেই এই গল্পটা এখানে প্রকাশ করার উৎসাহ পাই। তাই এই গল্পটা যতটা আমার ঠিক ততটাই আপনার! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন কবিপ্রিয়!

      • আমি বিপুলভাবে উদ্বেলিত ও প্রীতিমুগ্ধ যে আপনি আমার কবিতা পড়ে উৎসাহিত হয়ে এত দারুন সুন্দর একটি বাস্তবসম্মত লেখা উপহার দিয়েছেন… আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অভিনন্দন জানাই প্রিয়…

    • গল্প হচ্ছে বাক্যের নিপুন খেলা। অভিনন্দন।

      • ধন্যবাদ মঞ্চগুরু এই খেলা আরো আনন্দময় করে তোলার জন্য! ভালোবাসা নেবেন!

    • ভীষণ ভাল লাগল। এমন জীবন ঘনিষ্ঠ লেখা খুব কম দেখা যায়। চমৎকার গল্পের প্লটটি। মনে হচ্ছে গল্পটার সাথে সাথে আমরাও ঘটনাগুলো দেখে আসলাম। আপনার অদ্ভূদ একটা কল্পনা শক্তি আছে। লেখাটা চালিয়ে যান। আপনার পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় থাকলাম বন্ধুপ্রিয়।

      • বাহ! কাকতালীয়ভাবে মিলে গেলো দেখছি! আপনার ঘটনাগুলো জানার আগ্রহ হচ্ছে মঞ্চবন্ধু!
        এই গল্পটা এখানেই শেষ করতে চাইছি। তবে এই গল্পটা যেই গল্পের পিঠে করে এসেছে সেই গল্পটা বুনে চলেছি! শীঘ্রই পোষ্ট করব এমনটাই ইচ্ছে আছে। আনন্দে থাকা হোক সেই পর্যন্ত! অনেক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা নেবেন অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য!

      • পরবর্তী গল্পের অপেক্ষায় রইলাম। দারুণ কল্পনা শক্তি রয়েছে আপনার। লিখে যান। শুভকামনা রইল।

      • ধন্যবাদ! হ্যাঁ, অবশ্যই লিখব! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন!

    • লিখাটা বাস্তবতার সহজ স্বীকারোক্তি… শুভকামনা রইল।

      • লেখাটা পুরোটাই আমার কল্পনা! বাস্তবতার সাথে কোন মিল খুঁজে পেলে বিষয়টি সম্পূর্ণ কাকতালীয়! ভালোবাসা নেবেন মঞ্চবন্ধু!

    • সমাজের অনেকগুলো নির্মম সত্যি প্লট এক সুতোয় গাঁথা খুব দক্ষতার সাথে । সব সময় দূর্বল মানুষজন ই আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয় । গভীরভাবে অবস্থান পর্যবেক্ষন না করলে কেউ এত সুন্দর চিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারেনা । ধন্যবাদ । ভালো লাগছে সমাজে আপনাদের মত বোধসম্পন্ন মানুষজন আছেন ।……💕❗

      • আমার অনেক বড় প্রাপ্তি আপনার এই সুন্দর মন্তব্যখানি! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন কবিপ্রিয়!

    • অসাধারণ হয়ছে

      • অনুপ্রাণিত হলাম খুব!
        অনেক ধন্যবাদ লেখকবন্ধু! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন!

    • শুভকামনা রইলো

    • অসামান্য বুননকৌশল, এক অনন্য উৎকৃষ্ট সৃজন। শ্রদ্ধা ও
      নিরন্তর ভালোবাসা।

      • অনুপ্রাণিত হলাম লেখকবন্ধু!
        অনেক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা নেবেন!

    • Bhai khub valo lagse storyline ta.

      • ধন্যবাদ ভাই! ভালো লাগলো আপনার ভালোবাসা পেয়ে! শুভেচ্ছা নেবেন!

Skip to toolbar