Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    3 years, 1 month ago

    রবীন্দ্রনাথঃ ‘‘শক্তির অশেষ উৎস, জীবনের চির অবলম্বন’’
    হাসনাত সৌরভ
    =================================================

    কাগজের নৌকা কতদূর যায়? যেতে পারে? হয়তো বেশিদূর নয়। হয়তো একটু গিয়েই সে টুপ করে ডুবে যায়। কিন্তু নৌকা না যাক, আমাদের মন তো যায়। যেখানে আমরা যেতে পারি না, সেখানে আমাদের মন ভেসে যায় ঠিকই। রবীন্দ্রনাথ আমাদের এমনটাই তো কল্পনা করতে শিখিয়েছেন। আমাদের ভাবনাকে, আমাদের কল্পনাকে এমন করে উসকে দিতে, তিনি ছাড়া আর কে-ই বা পেরেছেন আমাদের ছেলেবেলায়! এমনকি আমাদের বড়োবেলাতেও! তাই কল্পনাপ্রবণ যে মনটা আমি আজও আমার ভিতর বয়ে বেড়াই, তা আসলে রবীন্দ্রনাথেরই শিক্ষা। যা পেয়েছি তাঁর সৃষ্টিকে ছুঁয়ে এবং তাঁর ভাবনাকে অনুভব করে। জেনেছি, কল্পনা সুন্দর। মানুষের জীবনে সেই সুন্দরের আরাধনা করা চাই। তবেই জীবনকে সম্পূর্ণ রূপে গ্রহণ করা যাবে।

    সহজপাঠের দিনগুলোয় আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাই সেই ছোট্টবেলা থেকে রবিঠাকুরের সঙ্গে আমার এক সহজ বন্ধুতা তৈরি হয়েছিল। যিনি সৌন্দর্যের ভিতর দিয়ে সারাটা জীবন খুঁজেছেন মুক্তি। বলেছেন, ‘সৌন্দর্য এবং সুব্যবস্থা মনের জিনিস। সেই মনকে মুক্ত করা চাই।’ শুধু স্কুল নয়। বাড়ির পরিবেশেও ছোটোবেলায় আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার এই বন্ধুটিকে। কত কত দুপুর আমার খোলা জানলার পাশে ‘ডাকঘর’ পড়তে পড়তে কেটে যেত…। জানলা দিয়ে অমলের মতো শুধুই অপেক্ষা করতাম। ভাবতাম, এই বুঝি এলো দইওয়ালা!

    কিন্তু ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের যে চেহারা ছিল, বড়োবেলায় দেখলাম তার অনেকটা বদলে গেছে। ছেলেবেলায় তাঁর লেখা, গান, ভাবনা সব যে বুঝতাম এমনটা নয়। কিন্তু বড়ো হলাম যখন, মনে হল তাঁকে হয়তো আরও বেশি করে বুঝতে পারছি। অনুভব করতে পারছি। তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে আবিষ্কার করলাম একটা নতুন মানুষকে। যে শুধু বন্ধু নয়। যে আমার আশ্রয়।

    আমার এই বড়োবেলার অনেকটা জুড়ে আছে তাঁরই গীতবিতান। সেখানে আমি দেখেছি অন্য এক রবীন্দ্রনাথকে। যে ভালবাসতে শেখায়। শেখায় আত্মত্যাগ। তাই তো বিরহে বিলীন হয়েও বলেছেন ‘যদি আর-কারে ভালোবাস, যদি আর ফিরে নাহি আস, / তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো।’ নিজের ভাগে দুঃখ থাক, সুখ থাক অন্যের ভাগে। এ কথা এত সহজে আর কেউ বলেনি আমাকে। তাই আমার সুখের দিন ছাপিয়ে যত আঁধার এসেছে জীবনে, তত আমি একা একা ফিরে গেছি তার গানের ভিতর। গীতবিতানের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে জীবনের না-পাওয়ার দিকে চেয়ে কতবার যে বলেছি, ‘বড়ো বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে আমার প্রাণে…’ তবু ভরসা থেকেছে রবীন্দ্রনাথেই। জীবনে কত কিছুই না আমরা হারাই! ফুরোয় মুহূর্ত, ছেড়ে যায় মানুষ। কিন্তু এক রবীন্দ্রনাথই আছেন, যার যাওয়া নেই। যে শুধুই থাকতে আসেন। বিজন রাতে আজও তাই অস্ফুটে বলে উঠি, ‘জানি জানি বন্ধু জানি / তোমার আছে তো হাতখানি।’

    বিকেলের নিভে আসা আলোয় এক একদিন অকারণেই আমার সঙ্গী হয়েছে ‘শেষের কবিতা’। কতবার যে নিজেকে মনে মনে ভেবেছি অমিত! লাবনীর সঙ্গে যার চলার পথ বন্ধনহীন গ্রন্থি দিয়ে বাধা। যে ভালবাসাকে কোনও প্রতিষ্ঠানে বা চিহ্নে আটকে রাখতে চায় না। সে কেবল বলে যায়, ‘আমার প্রেম থাক নিরঞ্জন। বাইরের রেখা বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।’ গল্প উপন্যাসের বাইরেও যেন রবীন্দ্রনাথকে পড়তে পড়তে কখনোবা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে পড়েছি! ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায় দেখেছি তাঁর ছেলেবেলা। তাঁর বড়োবেলা পড়ে জেনেছি কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যুই না এসেছে জীবনে! তবু ভেঙে পড়েননি তিনি। মৃত্যুকে জয় করতে করতেই রবীন্দ্রনাথের এগিয়ে যাওয়া। সে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র বারেবারে শেখাতে চেয়েছেন আমাদের। বলেছেন, জীবনে ভালো আর মন্দ, যাই আসুক না কেন, সত্যকে যেন সহজে গ্রহণ করতে পারি।

    আসলে রবীন্দ্রনাথ নেই বলেই বোধহয় তিনি আজও বেশি করে আছেন আমাদের মাঝে। তাই আজও যখন তাঁর লেখায় নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাই অথবা যখন আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে একমাত্র তাঁরই লেখা, তখন তাঁকে বন্ধু বলে ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। এই বন্ধুতার কাছে আমি বড়োবেলায় চুপ করে বসি, আর মনে মনে শুধুই বলি, ‘চিরসখা হে, ছেড়ো না মোরে।’

    সার্বিকভাবে দেখতে গেলে আজীবন সুন্দরের পূজারি মানুষটির ব্যাপ্তি বা বিস্তৃতি ছিল সীমাহীন। অসাধারণ ছিল তাঁর তিতিক্ষা, তাঁর ক্ষমা, তাঁর করুণা, তাঁর মৈত্রী। রবীন্দ্রনাথ থেকে গেছেন আমাদের কাছে, হয়ে উঠেছেন নির্ভর এক আশ্রয়, অফুরান এক আশ্বাস। বুদ্ধদেব বসু কবিতায় বলেছেন-

    “রবীন্দ্র ঠাকুর শুধু আজি হতে শতবর্ষ পরে
    কবি রূপে রহিবেন কুমারীর প্রথম প্রেমিক,
    প্রথম ঈশ্বর বালকের, বৃদ্ধের যৌবনঋতু,
    সকল শোকের শান্তি, সব আনন্দের সার্থকতা,
    শক্তির অশেষ উৎস, জীবনের চিরাবলম্বন। ”

    8
    5 Comments
    • “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
      মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ ।”

      শুভেচ্ছা রবীন্দ্রজয়ন্তীর!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 10 May 2023 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
      মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ ।”

      শুভেচ্ছা রবীন্দ্রজয়ন্তীর!

    • কাগজের নৌকা কতদূর যায়? যেতে পারে?

Skip to toolbar