-
চর সোনারামপুর
এ চরের জেলেদের শৈশবের রঙিন দিনগুলো কেটেছে মেঘনার বুকে জেগে উঠা নরম বালিমাটিতে। আশুগঞ্জ শহরের উত্তর দিকে মেঘনা নদীর বুকে। শুরুর দিকে এ চরে এত ঘনবসতি ছিলো না। এখন কয়েকশ মানুষের বসবাস। বেশিরভাগই গরীব জেলে পরিবার। কয়েক ঘর মুসলমানও আছে। এতকাল বিদ্যুতের কোনো সুব্যবস্থা ছিল না। সৌর বিদ্যুত ব্যবহৃত হতো কিছু পরিবারে। আর যাদের সে সামর্থ্যও ছিলো না, তাদের জন্য মোম কি’বা কুপিবাতিই ছিলো একমাত্র ভরসা। আর পূর্ণিমার রাতে চাঁদের ফকফকা আলো-জোছনা।
রাতভর নদীর বুকে চষে বেড়ায় জেলেরা। ভোর অবধি চলে মাছ ধরা। সেই মাছ সকালে বিক্রি করে বাজারে। ঐতিহ্যবাহী এই মাছের আড়ৎ। শতবছরের পুরনো। গরীব জেলেদের ধরা এই মাছ পরিবেশিত হয় শহুরে বাবুদের খাবার টেবিলে। নদীর তরতাজা ইলিশ, বোয়াল, আইড়, গলদা চিংড়ি, কালিবাউস, রুই ও নানা প্রজাতির মাছ। সুস্বাদু এসব মাছ ভক্ষণে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে সাহেবরা। দেয় প্রশান্তির ঘুম। সারারাত নির্ঘুম জেলেদের অক্লান্ত পরিশ্রমের এই মাছ বড়লোকদের দেহে পুষ্টি যোগায়। নিতান্ত গরীব এই জেলেরা চাইলেও বড়মাছ গুলো খেতে পারে না। নিজেরা খেলে সংসার চলবে কী করে? নিজেদের শখ এভাবেই চাপা পড়ে যায় অসহায়ত্বের কাছে। বিলাসিতা বোধহয় গরীব এসকল জেলেদের জন্য বড্ড বেমানান!
জেলে শিশুদের শৈশব কাটে চরের বুকে শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে। ঘাসফুল আর লতাপাতায় শিশিশের ঘ্রাণ নিয়ে। এই চরে আগে এতো গাছপালা ছিলো না। এখন অনেক গাছপালা লাগিয়েছে জেলেরা। সবুজে সয়লাব। মনে হয় যেন এক টুকরো আমাজন আর পাশেই আমাজন নদী। নাহ। এ নদীর নাম মেঘনা। কত সুখ-দুঃখের গল্প রচিত হয়েছে এ মেঘনার বুকে। সন্ধ্যা হতেই শুরু হয় জোনাক-জ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক। চরের একটু দূরেই ভৈরব-আশুগঞ্জ ব্রীজ। এ ব্রীজের সোডিয়াম লাইটের সোনালী আলোয় ব্রীজটাকে দেখতে লাগে অপূর্ব! নদীর জলে প্রতিফলিত এই আলোর মতোই সোনালী স্বপ্ন খেলা করে জেলে শিশুদের চোখে-মুখে। বাপ-দাদার মতো তাদের ভাগ্য নিশ্চয়ই এরকম হবে না। ভাগ্য পরিবর্তনের মালিক একমাত্র আল্লাহ। কখন কার ভাগ্য খুলে যায় কেউ বলতে পারে না! অবহেলিত এ চরে সরকারি একটি স্কুল হয়েছে এখন। জেলেরা পড়ালেখা করার সুযোগ না পেলেও জেলে শিশুরা পেয়েছে।
এ চরেরই বাসিন্দা মুসলমান মাঝি সলিম। পুরো নাম সলিম উদ্দিন। বাপ-দাদার পেশা ছিলো মাছ ধরা। বংশ পরম্পরায় এ পেশাই বেছে নিয়েছে সলিম। জীবিকার তাগিদে মেঘনার চকচকে রূপালি ইলিশ তুলে দেয় বড় সাহেবদের পাতে আর নিজে খায় পুঁটি মাছ ভাজা সাথে শুকনো মরিচ। তারপরও মনে দুঃখ নেই। মাছের ন্যায্য দাম পেলেই খুশি। চোখদুটোতে খেলা করে আনন্দের ঝিলিক। নির্ঘুম রাত সার্থক হয়। মাঝে মাঝে অবশ্য মন খারাপ হয় মাছের ন্যায্য দাম পায় না বলে।
শান্ত নদী মেঘনার তীরঘেষা সবুজে ঘেরা ও পাখ পাখালির কলরবে মুখরিত ছোট্ট এক মায়ার শহর আশুগঞ্জ। আশুগঞ্জের অপরূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত এ নগরবাসীর যেন মুগ্ধতার শেষ নেই। কেউ বলে জাদুর শহর, কেউ বলে বিদ্যুতের রাজধানী, কেউ বলে বন্দরনগরী। এ শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি নির্গমনের আঁকাবাঁকা চ্যানেলগুলো যেন ইতালির ভেনিস শহরের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আশুগঞ্জে এসেছেন, আশুগঞ্জে থেকেছেন অথচ আশুগঞ্জ এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।
মেঘনার বুকে বয়ে চলা পালতোলা নৌকা, নদীর দুই তীরের সৌন্দর্য, সাদা বক, পানকৌড়ি ও গাংচিল এর উড়াউড়ি যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। সৌন্দর্য যার অঙ্গে অঙ্গে ছোট্ট এই জাদুর শহরে মুগ্ধ মানুষ হবেই! কারণ এ শহর যেন বিশ্বজগৎ এর সৃষ্টিকর্তা ও সুনিপুণ কারিগর মহান আল্লাহ তা’আলার রংতুলিতে আঁকা। এত এত প্রাচুর্যের মাঝে বসবাস করেও এ শহরের মানুষ গুলোর মধ্যেও আছে দুঃখ, বেদনা, বিরহ, যাতনা। আছে হতাশা। আসলে জগতে কে যে প্রকত সুখী একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কেউ অল্পতেই খুশি আবার কেউ বেশী পেয়েও সুখী হতে পারে না। প্রাচুর্যের মাঝেও এক ধরণের হাহাকার বিরাজ করে অন্তরে। তবুও এতসব দুঃখ নিমেষেই হারিয়ে যায়, যখন তাকাই নদীতে ভেসে থাকা চর সোনারামপুরের দিকে।
অল্পতেই সন্তুষ্ট সলিমুদ্দিন। হালাল উপার্জন কম খাইলেও তৃপ্তি আসে। একটু ভালো খাওয়ার, একটু ভোগের শখ, আহ্লাদ গরীব জেলেদেরও আছে কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক। নদীর স্রোতে গতর না ভাসিয়ে বাস্তবতার জালে নিজেকে আটকে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে অহেতুক দুশ্চিন্তা হয় না। নদীর তীরে সারা বছরই নোঙর করা থাকে পাথর, সিমেন্ট, রড ও মালবোঝাই কোনো না কোনো কার্গো জাহাজ। আরো আছে শত শত ধান বোঝাই নৌকা। দূরদূরান্ত থেকে নৌকাগুলো আসে। আয়তনে ছোট হলেও এ বন্দরের খ্যাতি দেশে-বিদেশে। আন্তর্জাতিক নদী বন্দর বলে কথা। এ শহরের আকাশচুম্বী দালান-কোঠা সন্ধ্যা হতেই নানা আলোর ঝলকানিতে ভরে ওঠে। চরের গরীব মানুষগুলোর কখনো দালানকোঠায় থাকার সুযোগ হয়নি। তাই একটু কৌতূহল জাগে বৈকি। তারা থাকে জীর্ণশীর্ণ ঘরে। বৃষ্টির সময় টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে। বিল্ডিংয়ে বসবাস তাদের কাছে নিতান্তই কল্পনার রাজ্যের বসবাস করার মতো।6 Comments-
“নদীর স্রোতে গতর না ভাসিয়ে বাস্তবতার জালে নিজেকে আটকে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে অহেতুক দুশ্চিন্তা হয় না।” অসাধারণ! সুন্দর একটা উপলদ্ধি হল!
-
Friends
রাহেনা বেগম
@rahena-begum
Md. Deloar Hossen
@md-deloar-hossen
সৃষ্টি
@premdevota
Pritam Biswas
@pritam-biswas
Sirazam-Munira
@sirazam-munira
Redwan Khan
@redwan-khan
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
AdabenTatali
@adabentatali
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
@mohammad-shahzaman



খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন সবটা।