-
রিলসের সংসার
________________________________________
নতুন দম্পতি মেঘলা আর রাকিবের সংসারটা শুরু থেকেই ছিল ঝলমলে—ডিজিটাল ঝলমলে বলতে পারেন। বিয়ের আগেই দুজনের ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার ছিল হাজার হাজার। বিয়ের ছবি দেখে অনেকে ভেবেছিল, “এরা বুঝি রিলসেই প্রেম করেছে, রিলসেই বিয়ে করেছে, এখন রিলসেই সংসার করবে।” এবং সত্যি কথা বলতে, ধারণাটা ভুল ছিল না।
প্রথম কয়েক মাসে মেঘলা দিনে চারটা করে রিলস বানাতো—কখনো গলায় ওড়না জড়িয়ে ‘প্রেম মানে তোর চোখে চোখ রাখা’ টাইপ সংলাপ বলে, কখনো টিফিনবক্স খুলে ‘শাশুড়ি কেমন রান্না করে’ স্টাইলের ভিডিও করত। রাকিবও কম যেত না। সে স্টাইল করে সোফায় বসে একেকটা ‘husband expectations vs reality’ রিল বানাতো।
কিন্তু বিয়ের একবছর যেতে না যেতেই একটা সমস্যা দেখা দিল—দুজনেই রিলস বানায়, কিন্তু কেউ কারোটা দেখে না।
মেঘলা রাগ করে বলে,
— “তুমি আমার আজকের রিলসটা দেখোনি, অথচ আমি তোমারটা লাইক দিয়ে কমেন্টও করেছি!”
রাকিব গম্ভীর মুখে উত্তর দেয়,
— “তুমি যে গত দুই সপ্তাহে একটাও শেয়ার করোনি আমার রিলস!”
এভাবে দিনের পর দিন রিলসের অভিযোগে সংসারটা ভারী হয়ে উঠছিল।
এর মাঝেই তাঁদের সংসারে এলো একটি নতুন অতিথি—ছোট্ট এক ছেলে, নাম রাখা হলো ‘রোহান’। মেঘলা প্রথম কিছুদিন রোহানের সঙ্গে একটা দুটো স্নেহমাখা রিল বানানোর চেষ্টা করেছিল, যেমন “আমার জান রোহান আজ কী খাবে?” টাইপ ভিডিও। কিন্তু রোহান দ্রুতই বুঝে গেল যে সে মূলত ক্যামেরার জন্যই হাসছে, খেলছে—বাস্তবে মা–বাবার মনোযোগ তার দিকে নেই।
রোহানের বয়স যখন এক বছর, তখন তাকে চুপ করানোর জন্য মেঘলা একদিন তাকে ইউটিউবে “Baby Shark” ছেড়ে দেয়। এরপর যা হওয়ার তাই হলো—একদিন বেবি শার্ক, পরদিন মটু পাতলু, তারপর খুদে গেমারদের ভিডিও… আর এখন সে চার বছর বয়সে দিনে গড়ে পাঁচ ঘন্টা স্ক্রিন টাইম উপভোগ করে।
রোহানের অভ্যাস এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এখন সে মোবাইল ছাড়া খায় না, মোবাইল ছাড়া ঘুমায় না, এমনকি মোবাইল ছাড়া বাথরুমেও যায় না!
একদিন এক আত্মীয় আসলেন দেখতে—
— “এই রোহান তো বেশ বড় হয়েছে! কী করে এখন?”
রোহান দৌড়ে এসে বলে,
— “আমি টয়লেটে মোবাইল নিয়ে যাই। ফ্রি ফায়ার খেলি। আর মেসির সব গোল জানি ইউটিউব থেকে!”
আত্মীয় চমকে উঠে বললেন, “বাহ! কিন্তু স্কুলে যাও না?”
রোহান গম্ভীর মুখে বলে, “স্কুলে তো আর ফোন ইউজ করতে দেয় না! আমি মায়ের ফোন না থাকলে ক্লাস করবো না।”
এদিকে মেঘলা রোহানের এই অবস্থা নিয়ে মাঝে মাঝে চিন্তিত হয়, তখন ইনস্টাগ্রামে “Positive Parenting” ভিডিও খুঁজে দেখে।
একদিন সে রাকিবকে একটা ভিডিও ফরোয়ার্ড করল—
“স্বামীর উচিত সন্তান প্রতিপালনে স্ত্রীর পাশে থাকা।”
রাকিব সেটা না দেখে তিন ঘন্টা পর ফরোয়ার্ড করল আরেকটা ভিডিও—
“স্ত্রীর কর্তব্য কীভাবে স্বামী ও সন্তানের যত্ন নেওয়া।”
দুজনেই মনে মনে ভাবল, “বাহ, ভালোই বলেছে”, কিন্তু কেউ কারো কথাই শোনে না।
রোহানের অবস্থা ক্রমে ভয়াবহ হতে থাকল। একদিন মেঘলা রান্না করছিল, রাকিব অফিসের জুম মিটিংয়ে, আর রোহান চুপচাপ মোবাইলে ভিডিও দেখছিল বাথরুমে বসে। আধাঘণ্টা কেটে গেছে, মেঘলা ডেকে বলছে,
— “রোহান, বের হও! তুমি তো কিচ্ছু করনি!”
রোহান উত্তর দেয়,
— “মা, এই একগেমটা শেষ করি, তারপর করব!”
একদিন দুপুরে রাকিব ল্যাপটপে কাজ করছে, হঠাৎ সে মেঘলাকে বলে,
— “তোমার ফোনে ‘Parenting Crisis’ নিয়ে একটা কোর্স দেখছিলাম, ১০% ডিসকাউন্টে দিচ্ছে। কিনব?”
মেঘলা ব্যস্ত গলায় বলে,
— “এই মুহূর্তে না। আমি একটা নতুন ট্রেন্ডিং রিল বানাতে যাচ্ছি—‘Child tantrum vs Mom reaction’। রোহানকে একবার না করো, দেখি কেমন রিঅ্যাক্ট করে!”
এমন একদিন, রোহান চুপচাপ বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছিল। কিন্তু আচমকা একটা বিজ্ঞাপন দেখে সে চোখ বড় করে চিৎকার দিল,
— “মা! বাবু কই? আমার ভাই লাগবে, তবেই সাবস্ক্রাইব করব!”
মেঘলা আর রাকিব একসঙ্গে বলে উঠল,
— “ভাই লাগবে মানে?”
রোহান গম্ভীরভাবে বলল,
— “এই ভিডিওতে বলেছে ‘যাদের ভাই-বোন নাই তারা অসহায়’। তাই আমাকে ভাই দিতে হবে। আর হ্যাঁ, আমি চাই যেন ওরও মোবাইল থাকে।”
রাকিব আর মেঘলা তখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ মেঘলা বলে ওঠে,
— “আমরা কি একটু রোহানের দিকে মনোযোগ দিতে পারি? রিলস পরে হবে।”
রাকিব একটু নরম হয়ে বলল,
— “চলো, আজ থেকে রোহানের সঙ্গে আমরা এক ঘণ্টা মোবাইল ছাড়া থাকি?”
মেঘলা মুচকি হেসে বলে,
— “না হয় একটা রিল করি—‘Mobile Detox Challenge with Baby’!”
রাকিব হাত নেড়ে বলে,
— “আরে না! সত্যিকারের সময় কাটাই না হয়?”
রোহান চিৎকার করে উঠে,
— “তা হলে আমিও খেলবো তোমাদের সঙ্গে। কিন্তু আগে একটা ছবি তুলি—Snapchat ফিল্টার দিয়ে!”
এভাবেই একদিন, রিলসের দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া পরিবারে নতুন এক সূর্যোদয় হলো—সাময়িকই হোক কিংবা স্থায়ী, অন্তত সেই বিকেলটা তিনজন মিলে একসঙ্গে খেলল, হাসল, মোবাইল ছাড়া।
আর ওদিকে মেঘলার ফোনে ইনস্টাগ্রাম রিমাইন্ডার দিল—
“Your audience misses you. Upload something today!”
মেঘলা একবার তাকিয়ে হাসল, তারপর ফোনটা সাইলেন্ট করে দিয়ে বলল,
— “আমার আসল দর্শক তো এখন আমার সামনে—এই দুজন।”1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

স্ক্রিন টাইমের আগ্রাসনে সত্যিকারের কোয়ালিয়াটি টাইম ভুলতে বসেছি। গল্পের মতই শুভ সমাপ্তির প্রত্যাশা।