Profile Photo

ফয়সাল মোরশেদOffline

  • foysalmorshed
  • আব্বার নাক ডাকার আওয়াজ অনেকটাই কম। হালকা শীতের বিকেল। দুপুরের ভাতঘুমে তিনি। কোলবালিশে পা জড়িয়ে পশ্চিমের দিকে মাথা আব্বার। নাক ডাকার মৃদু আওয়াজ কখনো গতি পায়।

    “ ঘোঁ… ঘোঁও…. ঘোঁওওও…..”

    আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে। নিচে অপেক্ষা করছেন রাইডার সাহেব। আমার দৃষ্টি সময়ে। আর অপেক্ষার উপায় নেই। পকেট শূণ‍্য আমার।

    বাইরে দারুণ রোদ। বারান্দার টবে হলদে আগুন জ্বলেছে গাঁদা॥ বারান্দা পেরিয়ে আসা বাতাসে উড়ছে পাঞ্জাবী। আব্বার।

    আমার চোখ ঘোরে রান্না ঘরে। আম্মা মাছ ভাজছেন। চেউয়া। হাতিয়া থেকে পাঠানো। চুপি চুপি ঘাড় এলিয়ে আম্মাকে দেখে আবার চোখ আব্বার বালিশে।

    পা নড়ে ওঠে। কাঁথা হালকা সরে যায় মুখ থেকে। নাকডাকার আওয়াজ কিছুটা ক্ষীণ হয়। আব্বা ওপাশ থেকে এপাশ হলেন।

    আমি ঠায় দাঁড়িয়ে। চোখ আব্বার চোখে। এই বুঝি নড়ে উঠবে পাতা। ঘুম বুঝি ভেঙেই গেলো।

    আব্বা পা এপাশ থেকে ওপাশ ফিরেন এবার। বর্ষপ্রাচীন খাটে আওয়াজ ওঠে আমার বুকে বয়ে চলা হৃদয়ের তালে। হাতুড়ির মতো। তালে তালে।

    “ধ্বক… ধ্বক… ধ্বক….”

    আব্বার নাক ডাকার আওয়াজ অনেকটাই কমে আসে এবার। ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে জড়ালেন তিনি। রাস্তা লাগোয়া মসজিদের মাইকে আসরের আজান দিবেন মুয়াজ্জিন। কানেকশান চেক করছেন তিনি। যান্ত্রিক একটা শব্দ কানে এলো।

    “ক‍্যাংংংংংংংংংংংংংংং”

    দ্রুতগতিতে আমার হাত ছোটে আব্বার পকেটে। সেখানে থাকা শ’টাকার নোট নিয়ে পুরি আমার হাতে। মুহূর্তেই। এখনো লজ্জা লাগে। তবে আব্বার মতো আমিও বুড়ো হয়ে গেছি।

    আজ চারশ টাকা নিয়ে গেলাম একটা মিটিং এ। হাত খালি আমার। আগের মতোই। যখনই খালি হয়। বাবাই ভরসা। মুখ ফুটে চাইতে আমার ভীষণ লজ্জা লাগে। আড়ষ্টতা কাজ করে।

    তবে আব্বার পকেট থেকে চুরি করতে এখনো ভালো লাগে। শৈশবের মতো। খুব ছোট বেলায়। আমি দোকানে বাকি খেতাম। আব্বা নগদ টাকা দিতেন না। শিক্ষক মানুষ কতো টাকাই বা বেতন পান।

    সে দোকানে মিলতো গরম সিঙ্গারা। সারা মাস খেয়ে যেটাকা হতো, আব্বা পরিশোধ করতেন। নগদ টাকা চোখে দেখতাম না।

    পাঁচ ভাই বোনের সমৃদ্ধ সংসার আমাদের। আব্বা পড়াশুনো করিয়েছেন আমাদের। আমরাও পেয়েছি। যতবার পড়তে চেয়েছি। বরং সেখানেও চুরি করেছি।

    অনার্সের সময় তখন। প্রাইভেট পড়বো বলে বাবার কাছ থেরে টাকা নিতাম মাসে হাজার বার’শ । আজন্ম চোর আমি। তবে ধরা যে পড়িনি তা নয়। তাও হাতে নাতে। এই বছর তিরিশ আগে।

    ভোর হবে হবে করছে। আম্মা নামাজ শেষে খোঁয়াড়ের দরজা খুলতে গেলেন। মোরগের শবাদ কানে আসছে । শীতের সতাল। জানা ঝাপটে আসছে জীবনের উচ্চারণ। নতুন দিনের আহবান।

    “কুক্কুরুক কউউউউক”

    সেই ভোর। আব্বার রুমের জানালা গলে হালকা আলো আসছে। পা টিপে টিপে আমি আব্বার আলনার সামনে। ঝুলছে সাদা জামা।

    আমার হাত দ্রুত ছোটে শার্টের পকেটে। আলনায় তখনো আলো তেমন ভাবে পড়েনি। আধো আলো আধো অন্ধকার। আব্বার ঘুম তখনো গভীর।

    আমার আঙ্গুলে আব্বার টাকা। বেশকয়েকটা নোট। পঞ্চাশ। একশো। কখনো কখনো পাঁচশো। আমি খুঁজছি দশ টাকা।

    অবশেষে । মিললো। আঙুল ছুঁলো ১০ টাকা। আমার ঠোঁটে প্রাপ্তির হাসি। ঠিক তখনই।

    “খপপপ”

    বাম হাত বাধা পড়লো আম্মার হাতে। চুপিচুপি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আম্মা। আব্বার ঘুম যেন না ভাঙে। আম্মা কঠিন ভাবে বলেছিলেন।

    আর যুদি কোনদিন দেই, আঁই ডাইরেক তোর বাপেরে কই দুমু

    আহারে আমার আম্মা। এখন টাকা চুরি করে আম্মাকে গিয়ে দেখাই ।
    আম্মা মুখ টিপে হাসে।

    অন হেতের পকেটে কিচু রাইকসোনি। বেচারা গুমেত্তেন উডি দেয়ানে যাই চা খাইলে, টিঁয়া দিতাইরবোনি? হরে নি আবার চিল্লাচিল্লি করে।

    আম্মার কথা আমি শুনি। আম্মা জানেন। আমিও জানি। আমাদের বাবা ছেলের এই রসায়নে তিনি মূল উপাদান।

    মা। অন যাই। আঁর দেরি অই যা। আম্নে হেতেনেরে কইয়েন। আঁই চাইশ্শো টিঁয়া নিসি।

    আমি দরজা ভিজিয়ে বিদায় নেই। লিফটের আয়নায় নিজেকে দেখি। আমি বোধয় এমন জীবনই চেয়েছিলাম।

    অফিস শেষে বাসায় ফিরি। আব্বা হাসিমুখে তাকিয়ে থাকেন। ক্ষনিক পরেই আম্মার দিকে তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।

    তা, তঁর জাদু আইজ্জা কতো নিসে? “

    আঁই কেম্নে কমু। হিয়ান আমনেগো বাপ হুতের ব‍্যাফার। আঁই কিজানি। কিরবেন। অন হেতের আত খালি। বেতন হাইলে আমনের টিঁয়া হেতে আমনেরে দি হালাইবো।

    তই, আঁই কি কিসু কইসি ন‍্য। হেতের নগদে টিঁয়া সাতশ হাডাইসি। গেসেনি? এক্কানা জিজ্ঞাইও চাই।

    আম্মের হুতেরে আম্নে জিজ্ঞান। ঐ তো, হেতে আচে রুমে। বাপের টিঁয়া হুতে ন‍্যা। হুতের টিঁয়া বাপে ন‍্যা। ইয়ান আর নতুন কি।

    আম্মার উত্তরে আব্বা চুপসে যান। আব্বা বরাবরই আমার কাছে হেরে যান। শুরু থেরেই। কখনো মারেননি আমাকে। এজীবনে। একবারের জন‍্যও না। তাও ভয় পেতাম । ভীষণ।

    স্কুলের কড়া হেড়মাস্টার আব্বা। তার কাজকারবার বাইরের জগতে । তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি কথা বলেন রাজনীতি নিয়ে। হাসিনা-খালেদার রাজনীতির নানান পাঠে তার অনবদ‍্য বিচরণ।

    তখন আব্বা আমার বয়সী ছিলেন। এই আটত্রিশ কিংবা চল্লিশ। ভুড়িটাও ছিলো বেশ। মাথায় চুলের আধিক‍্য নেই। কালো গোঁফে একটা বিস্ময় ছিলেন তিনি। আমার কাছে।

    আব্বা ঘুমাতেন মধ‍্যরাতে। তার আগ অবধি রাজনীতির নানান সমীকরণ নিয়ে কথা বলতেন বন্ধুদের সাথে। মোবাইলে। কখনো একাত্তর। কখনো নব্বই। কখনো আগষ্ট।

    নানান কথার ব‍্যাকরণ আমার কানে আসতো। বাঁশের বেড়ার ফাঁক গলে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আব্বার কথা। কী দারুণ বলতেন বাবা। কী দারুণ তার উচ্চারণ।

    আব্বা শুনতেন বিবিসি প্রবাহ। ন‍্যাশনালের কালো পেট মোটা রেডিও। রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা খেলাধুলা। আমি সব শুনতাম মনোযোগ দিয়ে।

    আহা সেই সময়। আম্মা পান বানিয়ে দিতেন আব্বাকে। রাত বাড়তো। আব্বা আম্মা কথা বলতেন সারাদিনের। সব। কোথায় কি হয়েছে। কীভাবে হলো।

    বিবিসি প্রবাহ তখন শেষের দিকে। গানের সুরে জীবনে হাহাকার তৈরী হলো ভীষণ। নচিকেতা তখন গাইছেন। দরদ নিয়ে। নিদারুণ আবেগে।

    “ছেলে আমার
    আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
    আমারই ঠিকানা তাই
    বৃদ্ধাশ্রম”

    গ্রামের রাত। ন‍্যাশনালের ভলিউম শুধু নয়। হাজারো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মাঝে বিবিসির গান। নানান দ‍্যোতনায় ধরা পড়লো যেন।

    আব্বা আম্মা চুপি চুপি নানা কথা বলছেন। কানে যেন শুনতে পেলাম। অজানা আশংকার দীর্ঘশ্বাস।

    “হাহহহহহহহহ”

    একছেলে আমি। আমার চার বোন। সারাদিন কতো কতো খবর। কদিন যেতে না যেতেই। বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এলো ছেলে। কিংবা নয় সনেতানের জননী ঘুরছেন রাস্তায়।

    আমি দেখি সব খবর। পাতার পর পাতা। বাবা-মা আর সন্তানদের নানান সমীকরণ আমাকে ভাবায় তখন। ছোট আমি । অনেক ছোট। সাথে ভীষণ ভীতু। এখনো।

    গান শেষ হয়। আমি ভাবছি ভিন্ন কিছু। আমি আব্বাকে চাই। চাই আম্মাকেও। দুজনকেই। সারাদিন ধরে। জীবনের তরে। একেবারে দখলসত্বে।

    বড় পরিবার আমাদের। আম্মার সময় থাকেই না। সবার সারাদিনের খাবারের আয়োজন করতে। আম্মা মানে তখন মাটির চুলা। হাঁড়ি পাতিল। মাছপাগল আমরা এখনো।

    তবে আব্বা বাজার করতেন তখন। খুবই কম দাম। কেজি খানেক চিংড়ি কতই বা টাকা। আম্মা করতেন সব।

    আমার লোভ হতো। বোনেরা যখন বিয়ে করে নিজেদের সংসার গড়বে। তখন।

    তখন আমি আব্বা আর আম্মা। আমাদের তিন জনের একটা ছোট্ট সংসার হবে। ছোটবেলার না পাওয়া সময়গুলো পাওয়া হবে। আমার যখন পকেট খালি থাকবে।

    তখন মন চাইলেই আব্বার পকেট কাটতে পারবো। চুরিবিদ‍্যার এই খেলায় উৎরে যাই আমি। পুরোপুরি ভাবে। বুদ্ধি একেবারেই খারাপ নয়। আব্বা আমাকে কোন কিছুতেই বাধা দিতে পারেন নি এজীবনে।

    আমি নাছোড়বান্দা। ছোটবেলা থেকেই। যা চাই। তার পেছনে ছুটি । অনবরত। সেহেরী খাচ্ছি। আম্মা নামাজ পড়ছেন তখনো। আমি আর আব্বা মুখোমুখি।

    আব্বা, ভাইবতেসি, একটা মাস্টার্স করি ফেইলবো। টাকা দেন।

    কতো লাইগবো? খোঁজ নিচো নি? আর কোন সাবজেক্টে কইরবা?

    আইচ্ছা। খোঁজ খবর লই জানাইতেসি। জারনালিজমে করবো।

    তো করো। যা বালো বুজো। হোয়া ল‍্যার লাই বাপে আপুত্তি করসি নি কোনদিন?

    খাওয়া শেষে হাতের আঙুল চাটছি। ঘড়ির কাঁটা এগুচ্ছে ফজরের আজানের দিকে। আম্মাও ততক্ষণে নামাজ শেষে এসে খেতে বসলেন। আমি আব্বার দিকে তাকালাম।

    আম্মার প্লেটে চেঁউয়া মাছ ভাজি তুলে দিলেন আব্বা। কড়া ভাজির ঘ্রাণ এসে লাগছে নাকে।

    মসজিদের মাইকে সেহেরীর সময় ভেসে বেড়াচ্ছে। শুরু তবে, পবিত্র মাহে রমজান। আমি উঠে পানি ভরলাম। একমগ। খাচ্ছি। দেখছি। আব্বা আম্মাকে।

    আব্বার খাওয়া তখন শেষের দিকে। আম্মা পরে বসেছেন বলেই দেরী। ঘড়িতেই চোখ তার। খাওয়া শেষে একটা পান চিবুতে হবে তার।

    আব্বা উঠে বেসিনের সামনে। উপরের ঘড়িতে তখন ভোরের সময়। পাঁচের ঘর ছোঁবে ঘণ্টার কাঁটা। বাজছে হিসেবের ঘড়ি।

    “টিক…টিক….টিক…..”

    আব্বার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন আম্মা। এমন একটা জীবনই আমি চেয়েছি। জীবনভর।

    না। বাবা আপত্তি কখনোই করেন নি। এখনো করেন না। আমার শূন‍্য পকেটে তাই আজও এসে জমা হয়। বাবার উত্তরীয়। জীবন সুন্দর।

    1
    2 Comments
Skip to toolbar