Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    2 weeks, 3 days ago

    বিভ্রম ও একটি বটের ফল

    মেঘনা পাড়ের এই সবুজ বনটায় জ্যৈষ্ঠের দুপুরগুলো অন্যরকম এক নিস্তব্ধতা নিয়ে আসে। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য, আর নিচে গাছের ঘন ছায়ায় একধরণের মায়াবী অন্ধকার। এই বনের এক প্রাচীন, জটলা পাকানো বটগাছের নিচে বসেছিল তিতাস—বনের সবচেয়ে চঞ্চল আর কানপাতলা খরগোশ। তিতাসের স্বভাবটাই এমন, চেনা পৃথিবীর সামান্যতম পরিবর্তনও তাকে ভীষণ আন্দোলিত করে। বাতাসে পাতার খসখস শব্দে সে অদ্ভুত কোনো সুর খোঁজে, আবার মেঘের ডাকে চমকে উঠে ভাবে অন্য কিছু।

    সেদিন দুপুরেও বাতাসটা ছিল ভারী আর থমথমে। হঠাৎ সেই নৈঃশব্দ্য ভেঙে মাথার ওপর থেকে একটা গভীর, ভারী শব্দ হলো—‘ধপ!’

    একটি অতি-পাকা বটের ফল মগডাল থেকে খসে পড়েছিল শুকনো পাতার বিছানায়। কিন্তু তিতাসের অবচেতনে তখন হয়তো অন্য কোনো মহাজাগতিক ভাবনার খেলা চলছিল। সেই আকস্মিক শব্দে তার মনে হলো, এ কোনো সাধারণ পতন নয়; এ যেন অনন্ত আকাশের বুক চিরে এক খণ্ড নীল ধুলো হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল!

    সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। নিজের কল্পিত আতঙ্কের তীব্রতায় সে চিৎকার করে উঠল, “আকাশ ভেঙে পড়ছে! দিগন্ত আর আস্ত নেই!”

    বনের ধূলি উড়িয়ে সে অন্ধের মতো ছুটতে শুরু করল। তার চোখের সেই আদিম ভয় আর উন্মাতাল দৌড় দেখে বনের হরিণ চিত্রা থমকে দাঁড়াল। চিত্রা জিজ্ঞেস করল, “কীসের এত তাড়া তিতাস? কাকে এড়াতে চাও?”

    তিতাস থামল না, শুধু দূরগামী ট্রেনের মতো অবাধ্য গলায় বলল, “থামার সময় নেই চিত্রা! ওপরের নীল চাদরটা খণ্ড খণ্ড হয়ে ঝরে পড়ছে। বাঁচতে চাইলে ছোটো!”

    ভয় এক সংক্রামক ব্যাধি। চিত্রার মনে হলো, তিতাসের চোখের ওই আতঙ্কের চেয়ে বড় সত্য আর কিছু হতে পারে না। সে-ও তার খুর চঞ্চল করে বাতাসের বেগে ছুটল। দেখতে দেখতে এই অলীক ভয়ের হাওয়া বনের শিয়াল, বুনো শুয়োর আর ভাল্লুকের বুকেও কাঁপন ধরালো। একের পর এক বন্যপ্রাণী সেই মিছিলে যোগ দিল। যুক্তি যেখানে স্তব্ধ হয়ে যায়, সেখানে গুজব ডানা মেলে। কেউ দেখল না, কেউ বুঝল না, শুধু একটা অন্ধ বিশ্বাসের স্রোতে ভেসে পুরো বনের পশুপাখি ছুটে চলল এক অনিশ্চিত আশ্রয়ের খোঁজে।

    হুলস্থুলের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা এসে পৌঁছাল বনের সবচেয়ে প্রবীণ ও গম্ভীর সিংহ ‘কেশর’-এর গুহার সামনে। কেশর তখন পাথরখণ্ডে মাথা রেখে বনের গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করছিল। একদল প্রাণীকে এভাবে দিশেহারা হয়ে নিজের দিকে ধেয়ে আসতে দেখে সে মহাকালের মতো গম্ভীর এক গর্জন ছাড়ল। সেই গর্জনে থমকে গেল পুরো মিছিল।

    কেশর উঠে দাঁড়িয়ে তার প্রখর চাবুকের মতো চোখ দুটো সবার ওপর বুলিয়ে বলল, “তোমাদের চোখে কিসের এত কুয়াশা? এই ভরদুপুরে কার ভয়ে তোমরা নিজেদের অস্তিত্বকে এভাবে বিলিয়ে দিচ্ছ?”

    ভাল্লুক কাঁপতে কাঁপতে বলল, “মহারাজ, মাথার ওপরের আকাশটা নাকি ভেঙে পড়ছে! আমরা ধ্বংসের মুখোমুখি!”

    কেশর শান্ত চোখে আকাশের দিকে তাকাল। সেখানে জ্যৈষ্ঠের রোদে নীল আকাশটা এক অপার প্রশান্তি নিয়ে হাসছে। সে জিজ্ঞেস করল, “এই ভাঙনের সংবাদ প্রথম কে এনেছে?”

    খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সূত্রটা সেই তিতাস। কেশর তখন তিতাসের সামনে এসে দাঁড়াল। তিতাস তখন নিজের দীর্ঘ কানের নিচে মুখ লুকিয়ে থরথর করে কাঁপছে।

    কেশর অনুচ্চ কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “তিতাস, তুমি কি নিজের চোখে আকাশকে খসে পড়তে দেখেছ?”

    তিতাস আমতা আমতা করে বলল, “আমি… আমি সেই প্রাচীন বটগাছের নিচে বসে শব্দ শুনেছি মহারাজ। ও শব্দ কোনো পার্থিব জিনিসের হতেই পারে না। ওটা নিশ্চিত আকাশের ভাঙন।”

    কেশর কোনো মন্তব্য করল না। সবাইকে সাথে নিয়ে সে শান্ত পায়ে হেঁটে চলল সেই পুরোনো বটবৃক্ষের দিকে। বনের অধিবাসীরা পেছনে পেছনে চলল এক অদ্ভুত কৌতূহল আর সংশয় নিয়ে।

    বটতলায় পৌঁছে দেখা গেল চারপাশটা আগের মতোই নিঝুম। কেশর তার বিশাল থাবা দিয়ে মাটির শুকনো পাতাগুলো একটু সরালো। দেখা গেল, সেখানে লেপ্টে আছে একটা মস্ত বড়, অতি-পাকা লাল বটের ফল।

    কেশর ফলটি তুলে ধরে সবার উদ্দেশ্যে বলল, “এই তোমাদের ভেঙে পড়া আকাশ! একটি ফলের পতনকে তোমরা মহাপ্রলয় ভেবে বসে আছ? চোখ যখন বন্ধ থাকে, তখন সামান্য শব্দও মনের ভেতর অলীক আতঙ্ক তৈরি করে।”

    বনের পশুপাখিরা নিজেদের এই সামষ্টিক বোকামির দিকে তাকিয়ে লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। তারা বুঝল, সত্য যাচাই না করে কোলাহলে মেতে ওঠার চেয়ে বড় বোকামি আর কিছু নেই। আর তিতাস বটের একটা ঝুরি ধরে মৃদু বাতাসে দুলতে দুলতে ভাবল—বাস্তবের চেয়ে মানুষের মনের ভেতরের অমূলক আশঙ্কাই কত বেশি শক্তিশালী!

    সহায়ক তথ্যঃ এটি একটি ইউক্রেনের রূপকথা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা হল।

    4
    2 Comments
Skip to toolbar