-
বাংলা সাহিত্যে নারী
বাংলা সাহিত্যে কেউ যদি বাঙালি নারীদের কন্ঠস্বর প্রকাশ করতে চায় তাহলে সেই দায়িত্ব সবার আগে নারী সাহিত্যিকদের। একজন পুরুষ সাহিত্যিক তার লেখায় নারীবাদী ধারণা নিয়ে আসতে পারে কিন্তু মূলত সে একজন কল্পিত নারীচরিত্রের অন্তরালে নিজের ধ্যান ধারণাই প্রকাশ করে।
একজন পুরুষ সাহিত্যিক কখনোই নারীর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ করতে পারে না। নারীদের দৈনন্দিন জীবন, তার প্রেম এবং ঘৃণা, তার ধর্ম বিশ্বাস, তার যৌন জীবন, বিবাহিত জীবন, তার ওপর করা নির্যাতন, কর্ম জীবন, পরিবার চিন্তা, নারীর কাছে মাতৃত্বের ধারণা, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে নারীর ভাবনা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারবে একজন নারী সাহিত্যিক। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৭১ এ। অনেক দিন হয়ে গিয়েছে। ফেসবুক বা ব্লগে কিছু নারী লেখকের লেখা পড়েছি। তাদের ভালো লেখার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ নেই। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে মনে হয়েছে তারা নিজেদের আড়াল করে রেখেছেন। নারীর গল্প বলতে হবে নারীকেই। সবার যেমন একটা গল্প থাকে ঠিক একই ভাবে প্রত্যেক নারীর একটি গল্প আছে। আমরা তার মুখ থেকেই তার গল্প শুনতে চাই।
আমার তাই মনে হয়। আমি নিজেও মূর্খ। খুব বেশি লেখাপড়া জানি না।
গভীর রাতে অন্তর্জালে খুঁজতে বসলাম। বাংলা সাহিত্যের কিছু নারী সাহিত্যকের নাম ও কাজের একটা ছোট তালিকা দিলাম। ওপার বাংলার কয়েকজনের নামও দিলাম। কেউ যদি বাদ পড়ে যান এই দীনহীন অধমকে ক্ষমা করবেন।বাংলা সাহিত্য নারী ঔপন্যাসিকদের লেখনীতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে আধুনিক ও সমকালীন যুগ পর্যন্ত বহু নারী ঔপন্যাসিক তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজ, নারীদের অধিকার, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং মধ্যবিত্ত জীবনের নানা গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন।
কালানুক্রমিক ও উল্লেখযোগ্য নারী ঔপন্যাসিকদের পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রথম দিককার ও পথপ্রদর্শক ঔপন্যাসিকগণ
স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫–১৯৩২): বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী ঔপন্যাসিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা ভগিনী স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ (১৮৭৬)। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘মিবার রাজ’, ‘স্নেহলতা’, ‘কাহাকে’ ইত্যাদি।
নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪–১৯০৩): তাঁর রচিত আত্মজৈবনিক উপন্যাসসম রচনা ‘রূপ-জালাল’ (১৮৭৬) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০–১৯৩২): প্রধানত প্রাবন্ধিক হলেও তাঁর রচিত বিজ্ঞানকল্পকাহিনিভিত্তিক বিখ্যাত উপন্যাস ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (Sultana’s Dream) এবং সামাজিক উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী চেতনার শক্ত ভিত গড়ে দেয়।
২. আধুনিক ও ধ্রুপদি যুগের প্রধান ঔপন্যাসিকগণ
আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯–১৯৯৫): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। তাঁর বিখ্যাত ট্রিলজি উপন্যাস—’প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’, এবং ‘বকুলকথা’—বাঙালি নারীর তিন প্রজন্মের সামাজিক রূপান্তরের এক অনবদ্য দলিল। তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কারে ভূষিত হন।
মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬–২০১৬): প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম এবং সামাজিক শোষণ নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কালজয়ী উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘হাজার চুরাশীর মা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (সম্পাদনা পর্ব) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
লীলা মজুমদার (১৯০৮–২০০৭): শিশুসাহিত্যের জন্য অত্যন্ত পরিচিত হলেও বড়দের জন্যও চমৎকার উপন্যাস লিখেছেন, যেমন—’শ্রীমানি’, ‘টং লিং’ ইত্যাদি।
রাণী চন্দ ও প্রতিভা বসু: মধ্যবিত্ত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ও নারীর মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের উপন্যাসে।
৩. বাংলাদেশের বিশিষ্ট নারী ঔপন্যাসিকগণ
সেলিনা হোসেন (জন্ম ১৯৪৭): বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক। সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ তাঁর উপন্যাসের মূল উপজীব্য। বিখ্যাত উপন্যাস: ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘পোকা মাকড়ের ঘরবসতি’, ‘যাপিত জীবন’, ‘নীল ময়ূরের যৌবন’।
রিজিয়া রহমান (১৯৩৯–২০১৯): ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর উপন্যাসের জন্য সুপরিচিত। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘রক্তের অক্ষর’ (যৌনকর্মীদের জীবন নিয়ে লেখা) এবং ‘বংশানুচরিত’।
আনওয়ারা সৈয়দ হক (জন্ম ১৯৪০): পেশায় চিকিৎসক এই ঔপন্যাসিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে অনেক জনপ্রিয় উপন্যাস লিখেছেন। যেমন—’ত্রিপদী’, ‘অস্থায়ীর কাব্য’।
দিলারা হাশেম (১৯৩৫–২০২২): তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঘর মন জানালার’ মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ ও নাসরীন জাহান: নাসরীন জাহানের ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসটি বাংলা কথাসাহিত্যে এক নতুন মাত্রার যোগ করে।
৪. পশ্চিমবঙ্গ ও সমকালীন সময়ের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকগণ
নবনীতা দেবসেন (১৯৩৮–২০১৯): উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ও রসে ভরা উপন্যাসের জন্য খ্যাত। তাঁর ‘আমি অনুপম’, ‘শীতোষ্ণ’ ইত্যাদি উপন্যাস বেশ প্রশংসিত।
বাণী বসু (জন্ম ১৯৩৯): সমসাময়িক সম্পর্কের জটিলতা ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজ নিয়ে লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস: ‘অন্তর্ঘাত’, ‘মৈত্রেয় জাতক’, ‘উত্তরসাধক’।
সুচিত্রা ভট্টাচার্য (১৯৫০–২০১৫): আধুনিক মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন অনন্য। জনপ্রিয় উপন্যাস: ‘কাছের মানুষ’, ‘দহন’, ‘কাঁচের দেওয়াল’, ‘হেমন্তের পাখি’।
তসলিমা নাসরিন (জন্ম ১৯৬২): বিতর্কিত হলেও নারী অধিকার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার লেখনীর জন্য পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লজ্জা’, ‘শোধ’, ‘ফরাসি প্রেমিকের জন্য’ ইত্যাদি।
সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তিলোত্তমা মজুমদার: বর্তমান সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় দুই ঔপন্যাসিক, যাঁরা আধুনিক নারীর মনোজগত ও জটিল অনুভূতিগুলো নিয়ে লিখছেন।
বাংলা উপন্যাসে নারী লেখকদের অবদান কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, সামাজিক সংস্কার ভাঙা এবং নারীবাদী চেতনার বিকাশে তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।8 Comments-
-
এই সুন্দর তথ্যবহুল আর প্রয়োজনীয় লেখাটা এখানে শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানবেন। এক পাতায় এত জনের নাম এক সাথে পাওয়াটা দরকার ছিল। এক ধরণের সচেতন হলাম যেন। মনে পড়ল, উনাদের মধ্যে কিছুটা পড়া হয়েছে সেলিনা হোসেন, আনওয়ারা সৈয়দ হক (সৈয়দ শামসুল হকের স্ত্রী। রহস্য পত্রিকায় এক সময় মনোরোগ বিষয়ে বেশ জনপ্রিয় একটা কলাম ধরণের লিখতেন।) আর তসলিমা নাসরীন। নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী-র লেখা পড়ার আগ্রহ জাগছে। সেই সময়ের পরিস্থিতি / দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানার জন্য মূলত।
-
আপনার এই চমৎকার বিশ্লেষণটি আমাদের সাহিত্যিক আলোচনার ভাণ্ডারকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে এবং নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের আখ্যান তুলে ধরার যে আহ্বান আপনি জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অনুপ্রেরণাদায়ক; আপনার লেখনীর এই ধারা অব্যাহত থাকুক, এই প্রত্যাশা রইল।
-
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ], আপনার এই লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো যে, “নারীর গল্প বলতে হবে নারীকেই।” একদম ঠিক বলেছেন, আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন আমাদের কলমেই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের লেখিকাদের মধ্যে আপনি কি এমন কাউকে দেখছেন যারা এই ধারাকে আরও সাহসের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন?
-
Friends
Nusrat jahan
@shuha
রওনক নাহার "রুনু"
@rodela-dupor
Rupantor Roy
@rupantorroy
কোহিনুর বেগম
@kohinoorbegum
Abdullah Al Ahad
@abdullahalahad
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Kazi Adam
@kaziadam
অসীম রহমান
@ashim_rahman
M. Kamrul Islam
@m-kamrul-islam

বাংলা সাহিত্যের নারী ঔপন্যাসিকদের এই সুবিন্যস্ত ঐতিহাসিক তালিকা সত্যিই প্রশংসনীয়! কালানুক্রমিক বিন্যাসে বাংলা সাহিত্যের নারী কণ্ঠস্বরের বিবর্তনটা এখন বেশ স্পষ্ট আমার কাছে।