-
একটি খসড়া চিঠি
রওনক নাহার রুনুসম্মোধন এর জায়গাটা খালি রেখে শুরু করছি।কারণ সম্মোধনের জায়গাটুকু তুমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছো।
আজ অনেকদিন পর তোমায় লিখতে বসলাম।প্রায় এক যুগ পর।
আমার জন্য নয়।চাচার জন্য।
আজ ক’দিন ধরে বলছে, হ্যাঁরে শানু আমার বাঁদরটাকে একটা চিঠি লিখে দে না।
আমি চাচাকে বকেছি।পারবো না বলে জবাব ও দিয়েছি।
চাচা নাছোড়বান্দা।সেই সকাল থেকে,সন্ধ্যা অবধি ট্যাঁ ট্যাঁ করেই যাচ্ছে।আজ আর না লিখে পারলাম না।তোমাকে লিখতেই হলো।
একসময় তোমায় কত চিঠি লিখেছি!
প্রতিদিন একটা করে চিঠি না লিখলে তুমি আমার বেনী ধরে টানতে টানতে আমার চুলের গোড়া ব্যথা করে দিতে।আর অভিমান করে গাল ফুলিয়ে রাখতে।
সেই অভিমান ভাঙ্গাতে আমাকে দু’বেলা দুটো চিঠি লিখতে হতো সেদিন।
তা ও আবার পৃষ্ঠা ভরে।
আচ্ছা তুমি এমন ক্ষ্যাপা ছিলে কেন?
এখোনো কি তুমি ক্ষাপা আছো?
চাচা বলছিলো,একবার দেশে এসে ঘুরে যেতে।তাঁর নাকি খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমাকে।কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটো প্রায় অন্ধ হতে বসেছে।বার বার আক্ষেপ করে বলে,মরার আগে ছেলের মুখটাও দেখতে পাবোনা শানু?
আমি অবশ্য বলেছি,তুমি অনেক ব্যস্ত থাকো,তোমার কি আর সে সময় আছে?এখন তুমি মস্ত বড় ডাক্তার! কত কত রোগী দেখতে হয়।তোমার কি আর দেশ গ্রামের কথা ভাবলে চলে?
তোমার মনে আছে কিনা জানিনা,,
ভিটেবাড়ি ছাড়া বাকি সব জমিজমা আর চাচির গয়না গুলো বিক্রি করে যেদিন তোমার হাতে টাকাটা তুলে দিয়েছিল,সেদিন তুমি চাচাকে কথা দিয়েছিলে।ফিরে এসে গ্রামে একটা হাসপাতাল দেবে।গরীব অসহায় মানুষদের বিনে পয়সায় চিকিৎসা করাবে।আমি সেদিন আবেগে কেঁদে দিয়েছিলাম।মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান ভেবেছিলাম।আমি ভুল মানুষকে ভালোবাসিনি।আর ঐটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভুল।ও হ্যাঁ ভাইয়া সেদিন বলেছিল,তুমি নাকি এখন কানাডায় নামকরা হাসপাতালের বড় ডাক্তার।
বউ বাচ্চা নিয়ে বেশ ভালোই আছো।বেশ তো! শুনে খুব খুশি হলাম।
গরিব দেশে ফিরে না এসে ভালোই করেছো।এখানে ক”জনেই বা তোমাকে যোগ্য সম্মানী দিতো বলো!যদি সময় করতে পারো, একবার এসো।শেষবারের মত বুড়ো মানুষটাকে চোখের দেখা দেখে যেও।
চাচী তো তোমার অপেক্ষায় থেকে থেকে একসময় সবাইকে অপেক্ষায় রেখে চলে গেলেন পরপারে।
চাচারও সময় হয়ে এসেছে জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার। ডাক্তাররা তাই বললেন।ও হ্যাঁ,আমার কথা একটু বলি।
আমি ভীষন ভালো আছি।আমার স্বামী, তোমার মত অতো বড় ডাক্তার হয়ত নয়।তবে তার মনটা অনেক বড়।চাচার চিকিৎসা, সেবা যত্নের এতটুকু ত্রুটি রাখেনি।
সময় ফুরিয়ে এলে কার সাধ্য বলো, বাঁচিয়ে রাখার?মরে তো গেছে সেই কবে,,,এখন দেহান্তরি হওয়ার বাকী।
গ্রামের মানুষজন আমার স্বামীকে খুব ভক্তি করে।
ওর একটা সুন্দর মন আছে।
খুবি সাধারন ,নিজের শেকড় কে ভুলে সে আকাশে উড়তে চায়নি। মাটির সাথেই তার বসবাস।
আবারও বলি,
আমি বেশ ভালো আছি।আমার ছোট ছোট স্বপ্ন গুলোকে সে নিপুণ হাতে পুরণ করে।আর গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর পাশে থাকতেই সে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
ইতি
শানু।
২৬.০৮.২৬6 Comments-
-
আপনার লেখায় ‘মরার আগে ছেলের মুখটাও দেখতে পাবোনা শানু?’—এই প্রশ্নটির মাঝে যে গভীর বিষাদ ও মমতা ফুটে উঠেছে তা হৃদয়ে সরাসরি আঘাত করে এবং নিজের শেকড় ও স্মৃতির প্রতি এমন নিপুণ টান সত্যিই প্রশংসনীয়, আপনি একইভাবে মনের কথাগুলো লিখে যান।
Friends
Drako Shajib
@drako
শাহরিয়ার।
@shahiar
rifat humu
@rifathumu
বিষণ্ন সুমন
@logolabbd
সোহেল রানা
@rocketmondol
সালমা শিমু
@salmashimu74gmail-com
তাহিন ভুঁইয়া ছায়াপথিক
@tahinbhuiyanchayapothikgmail-com
Syed Farah
@syedfarah
খালেদা আক্তার
@khaledaakhter

রওনক নাহার রুনু, আপনার লেখাটা পড়ে মনের ভেতর কেমন একটা বিষণ্ণতা কাজ করছে। এই চিঠিটা অনেক না বলা কষ্টের কথা খুব সুন্দর কিন্তু বেদনার সাথে তুলে ধরেছেন।