-
কান্না দিবস…
মকবুল সাহেব পরিবার পরিজন নিয়ে জনমঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। আজকে ‘জাতীয় কান্না দিবস’। এইদিন দেশের সব মানুষকে বাধ্যতামূলক জনমঞ্চে আসতে হয়, আর সাবেক সরকার প্রধানের কবরের চারপাশ ঘিরে কান্না করতে হয়। মকবুল সাহেবের বয়স হয়েছে, শক্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত তিনি এলাকায়। সেই লোকটাই হু হু করে কাঁদবে আজ। মকবুল সাহেবের কপালে বিরক্তির ভাজ পড়ে গেলো।
মকবুল সাহেবের স্ত্রী অসুস্থ, বিছানায় পড়ে গেছেন। তিনি আছেন মকবুল সাহেবের কাঁধে। পুরোনো শাড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে, পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এইদিন সুস্থ অসুস্থ, ধনী গরীব, ছোট বড় সবাইকেই এখানে আসতে হয়। না আসলে নাগরিকত্ব বাতিল। নেতার জন্য যে দুই ফোটা চোখের জল ফেলতে পারেনা, সে দেশদ্রোহী না তো কি?
মকবুল সাহেবের দুই ছেলে। বড় ছেলে আর্মিতে ছিলেন, স্ত্রী-বাচ্চা সমেত বর্ডার দিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। জেলে আছেন না মেরে ফেলা হয়েছে, সেই খবর মকবুল সাহেবের কাছে নেই। ছোট ছেলে রেস্টুরেন্টে রান্নার কাজ করেন। সেও এসেছে অবশ্যই, তবে আলাদা। মকবুল সাহেবের সাথে ছোট ছেলের সম্পর্ক ভালো না।
হাজার হাজার মানুষ থইথই করছে। দুপুরের কড়া রোদে মানুষদের কপাল আয়নার মত চিকচিক করে উঠছে। কিছুক্ষণ পরেই ধস্তাধস্তি শুরু হবে, মানুষ ছুটবে কবরের সামনে। এই ধস্তাধস্তি শুরু, কবরের দিকে যাওয়া, আইডি কার্ড দেখিয়ে গ্রীন জোনে ঢোকা, পাঁচ মিনিট মাথা ঠুকে, গড়াগড়ি করে কান্না, তারপর বের হয়ে আসা, পুরো সময় কাঁদতে হবে। আর্মির চোখে কান্না করছে না এমন কেউ পড়লে, আর ক্ষমা নেই। শুধু রেড জোনের মানুষ ছাড়া, কারন এতদুর কেউ কান্না না করে আসতে পারে না। যারা আসে, তাদের আলাদা একটু সুযোগ দেয়া হয়।
একজন বিশালদেহী লোক মাইক হাতে উঁচু পিলারে দাঁড়ালেন। তিনি ভাষণ দিবেন। কিভাবে কি করতে হবে তা বলবেন, না কাঁদলে কি শাস্তি হবে, কাঁদছে অথচ চোখে পানি নেই, এমন হলে কি হবে, সবচেয়ে আবেগীয় কান্নার জন্য কি পুরষ্কার আছে, গতবছর কত লোক পদদলিত হয়ে মারা গেছে, সব বলবেন তিনি। এই জিনিস শুনতে শুনতে মকবুল সাহেবের কান পচে গেছে এখন।
‘ আর কতক্ষণ? ‘ মকবুল সাহেবের স্ত্রী নরম কন্ঠে প্রশ্ন করলেন।
‘ পিলারে লোক মাইক নিয়ে উঠে গেছে। ভাষণ শেষ হলেই আমরা এগুবো। আমরা আগে আগেই আছি। বেশিক্ষণ লাগবে না। ‘
মকবুল সাহেব মোটেও আগে আগে নেই। তিনি একজন দেশদ্রোহীর জন্মদাতা। তাকে রাখা হয়েছে ব্ল্যাক জোনে। এরপর আসবে হোয়াইট জোন। এইটা সবচেয়ে বড় জোন, নিউট্রাল জোন। এরপর আসবে ইয়েলো জোন। অবস্থাসম্পন্ন লোকেরা এখান থেকে শুরু করেন। রেড জোন হচ্ছে আর্মিদের আত্বীয়-স্বজন, সরকারের লোক ও তাদের আত্বীয়-স্বজনদের জন্য। রেড জোনের পরেই গ্রীন জোন। মকবুল সাহেবেরা একসময় রেড জোন থেকেই শুরু করতেন। এখন তাদের ব্ল্যাক জোনের শেষ স্তর থেকে শুরু করতে হয়। হোয়াইট জোনের আগে ব্ল্যাক জোনের ৪ টা ভাগ আছে। সবচেয়ে কালো, আলকাতরা দিয়ে মাখা জায়গাটাতে দেশদ্রোহীদের পরিবার, সরকারবিরোধীদের পরিবারেরা দাঁড়িয়ে থাকে। পরের স্তরে থাকে চোর, ডাকাত, চোরাকারবারি, এরা। এরপর থাকে নেশাগ্রস্থ, মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষগুলো। তারপরের স্তরে থাকে প্রতিবন্ধীরা। এরপর থেকে হোয়াইট জোন শুরু।
গরমে ব্ল্যাকজোনের আলকাতরা নরম হয়ে গেছে। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। মকবুল সাহেব একটা বাঁশের উপর ভর দিয়েছেন। তার স্ত্রী পানি খেতে চাইছে, কিন্তু আশেপাশে কোথাও পানি নেই। খাবার নিয়ে এইখানে প্রবেশ নিষেধ। পানির বোতল ভেতর থেকেই দেয়া হয়, ব্ল্যাক জোনের লোকেরা সেই পানিটুকুও পান না। একমাত্র বের হওয়ার সময় যদি পানির বোতল থেকে যায়, তাহলে মিলতে পারে।
পিলারের বিশালদেহী লোক মাইকে কথা বলতে শুরু করলেন,
‘ হ্যালো মাইক টেস্টিং… প্রিয় জনগণ। আজ আমাদের শোকের দিন। আমাদের কান্নার দিন। আজ আমাদের নেতার কবরের পাশে গিয়ে আমরা কাঁদবো। নেতা এমন মানুষ ছিলেন, তার কথা ভাবতেই আমার কান্না চলে আসছে… ’
কথাটা বলার সাথে সাথে তিনি ভ্যা ভ্যা করে কান্না করতে শুরু করলেন। দুই মিনিট তিনি এভাবেই কাঁদলেন। তারপর শুকনো চোখে টিস্যু ঘসে, তিনি আবার ভাষণ শুরু করলেন,
‘ আজ এই নিদারুণ কান্নার দিনেও দেখা যাবে, কিছু দেশদ্রোহীর চোখে পানি নেই। বেঈমান, শুয়োরের বাচ্চা এগুলো। এদের আজ কোনও ক্ষমা নেই। কবরের পাশে কান্না করতে পারবে না, এদের সবাইকে ব্ল্যাক জোনে ক্রসফায়ার করা হবে। এছাড়াও আমরা গতবছর দেখেছি, অনেকে পানির বোতল থেকে পানি নিয়ে চোখ ভিজিয়েছেন। আবার দেখা গেছে যে হুড়োহুড়িতে অনেকে পানির বোতল মাটিতে ফেলে দিয়েছেন, পানি মাটি মিলে কাঁদা হয়েছে, সেখানে পিছলা খেয়ে আরও মানুষ পড়ে মরেছে। তাই এই বছর পানির বোতল দেয়া হবে না। আমি এখন এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনবো। গোনা শেষ হওয়া মাত্র সবাই কান্না করতে করতে এগুবেন। হাজার হাজার মানুষের ভীরে আপনি কাঁদবেন না, আর আমাদের নজরে পড়বেন না, তা হবে না। পিলার থেকে সবাইকে নজরে রাখা হবে। এক… দুই… তিইইইইইইন!!! ’
মানুষেরা হাহাকার করতে শুরু করলো। হাহাকার করতে করতে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ, কোটি কোটি মানুষ। কিছুদুর এগুতেই মকবুল সাহেব বুঝতে পারলেন, তার পায়ের নিচে রক্তের স্রোত বইছে। প্রতিবছর যত মানুষ পদদলিত হয়ে মারা যায়, তার বেশিরভাগ থাকে প্রতিবন্ধী। রক্ত দেখে মকবুল সাহেবের গা গুলিয়ে উঠলো। তিনি হাঁটছেন। একটু একটু করে এগুতে এগুতে, ব্ল্যাক জোন পেরিয়ে হোয়াইট জোনে পা রাখলেন তিনি।
মকবুলের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে চোখ ভিজিয়ে ফেলেছেন। তার হাহাকার করার শক্তি নেই, নীরবে কেঁদে যাচ্ছেন। তিনি পানির তৃষ্ণায় কাতর। কেউ পানির বোতল দিচ্ছে না কেন? মকবুল সাহেবের স্ত্রী এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন আর কান্না করছেন।
হোয়াইট জোন পার হতে হতে দুই ঘন্টা লেগে গেলো। ইয়েলো জোনে এসে থামতে হলো মকবুল সাহেবকে। সামনে অনেক লোক পদদলিত হয়ে মারা গেছে, লাশ সরাতে হবে। পানি না দেয়ায় হিতে বিপরীত হয়ে গেছে। দশ মিনিটের বিরতি। বিরতিতে কান্না থামানোর নিয়ম নেই। মকবুল সাহেব কুই কুই করে কান্না করতে লাগলেন।
‘ চাচা, কষ্ট হইতেছে নাকি? বাঁশ দেয় নাই এইবার? ’
মকবুল সাহেব মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন, মধ্যবয়স্ক একটা লোক ভেজা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চেহারায় কঠিন একটা ভাব রয়েছে তার। এমন একটা চেহারার মানুষের চোখে পানি মানাচ্ছে না। অবশ্য মকবুল সাহেবের চোখেও পানি মানায় না, কথাটা মকবুল সাহেবের স্ত্রী বলেছেন।
‘ ও চাচা, খারাপ লাগতেছে নাকি? আমার হাত ধইরে দাঁড়ান, পইড়া গেলে উপায় আছে? উপায় নাই। ’
‘ না আমি ঠিক আছি, সমস্যা নেই। ’
‘ কি যে বলেন চাচা, কিছুই ঠিক নাই। মানুষ না খাইয়া মরতেছে, আর এরা করে নাটক। কিছু বললেই জেলে ঢুকায়, পিটায়। দুইদিন ধইরা না খাইয়া আছি। জেলের ভিতর আমাদের খাইতে দেয় নাই। না খাওয়াইয়া দুর্বল বানাইয়া এখানে ছাইড়া দিলো মরার জন্য। কিছুই ঠিক নাই। ’
মকবুল সাহেব দেখলেন, কঠোর চেহারার মানুষটা তার বাহু ধরে রেখেছে। তার চোখ ভর্তি পানি। এই পানি ওই কবরের জন্য না, সেইটা বোঝা যায়।
ইয়েলো জোন খুলে দেয়া হলো। সামান্য বিশ্রাম হোক বা দ্রুত মুক্তির জন্যই হোক, মানুষ আগের চেয়ে দ্রুত ছুটছে। ধাক্কাধাক্কি বেশি কান্নাকাটি কম হওয়াতে সাথেসাথেই বেশ কয়েকজনকে ভিড় থেকে সরিয়ে, পাশেই ক্রসফায়ার করা হলো। সেই দৃশ্য দেখে মানুষ হাহুতাশ করে কান্না করতে থাকলো। সে এক নরকযাপন। কোটি কোটি মানুষ কাঁদছে, হাহাকার করছে। সেই শব্দ কানে লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পায়ের নিচে তাজা রক্তের বন্যা বইতে লাগলো। মকবুল সাহেবের হাত ধরে থাকা লোকটা ছিটকে পড়ে গেলো, মকবুল সাহেব চেয়ে দেখলেন শুধু।
গ্রীন জোনের সামনে চলে এসেছেন মকবুল সাহেব। দুইজন অফিসার তার কাছে থাকা কার্ড দেখতে চাইলেন। মকবুল সাহেব কার্ড দেখানোর জন্য উতলা হলেন না। তিনি নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখে পানি নেই, তার মুখে কান্নার শব্দ নেই। একজন অফিসার ঠাস করে মকবুল সাহেবকে চড় মারলেন। চড় খেয়ে চমকে উঠলেন মকবুল সাহেব।
‘ এই বেঈমানের বাচ্চা, কাঁদছিস না কেন? না কেঁদে এতদুর এসেছিস কিভাবে? ’
‘ সরি। ’
‘ চুপ! এই অবস্থা কেন তোর, এইটা কি পড়েছিস? পুরুষ মানুষ হয়ে শাড়ি জড়িয়েছিস কেন? ’
‘ স্ত্রীকে পিঠে বেঁধে এনেছিলাম। ভিড়ে গিট খুলে কোথায় পড়ে গেলো, টের পাই নি। ’
‘ ও আচ্ছা। কার্ড দেখা আর ভিতরে যাওয়ার আগে পা ধুয়ে নিবি। রক্ত মাখা পা নিয়ে ঢুকলে ক্রসফায়ার করে দিবো। ’
মকবুল সাহেব গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। একজন তার পায়ে পানি ঢালতে লাগলো। বাইরে কত মানুষ পানি না পেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেলো, আর এখানে পা ধোয়া হচ্ছে। মকবুল সাহেব কিছুই বলতে পারলেন না। তিনি ধীরে ধীরে কবরের সামনে গিয়ে বসলেন। পাঁচ মিনিট তিনি এক ফোঁটাও কাঁদতে পারলেন না। একজন অফিসার সাথে সাথে গেটের বাইরে পজিশন নিয়ে নিলো। মকবুল সাহেব বুঝলেন, অর্ডার হয়ে গেছে। একটু পরেই তাকে ক্রসফায়ার করা হবে। যেই লোক নেতার কবরে সম্মান দিতে জানে না, তার মৃত্যু অবধারিত।
তবুও একটা খটকা থেকেই যায়। যদি জেলে ঢুকিয়ে দেয়? মেরে হাত পা ভেঙ্গে ছেড়ে দেয়? তাহলে তো হবে না। মকবুল সাহেবের বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই। তিনি মরতে চান। এসব হয়তো নিয়ে ভাববার সময় আছে নাকি?
হাজার হাজার মানুষ অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে লাগলো লোহার ব্যারিকেডের ওপাশে দাঁড়িয়ে। পুরো জনমঞ্চে পিনপতন নীরবতা। পায়ের নিচের রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করেছে, হাতেগোনা কয়েকজন হো হো করে হেসে উঠলো। অফিসারেরা থতমত খেয়ে গেছে। একজন শাড়ি পড়া বৃদ্ধ পুরুষ, নেতার কবরে পেশাব করছে। যেই দৃশ্য কেউ কল্পনাও করতে পারে না, তাই হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে, হতভম্ব বিশালদেহী লোকটার হাত থেকে মাইক নিচে পড়ে গেলো।
8 Comments
Friends
Nh Naiem
@nh-naiem
পিঞ্জারা খাঁচা
@pingu
Soubarno Badhan
@badhan15th
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
Foyzur Khan
@foyzur-khan
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Shohag arnob
@shohagarnobgmail-com
Nipun Chandra
@nipunch
Pranto Sarkar
@pranto-sarkar




সুন্দর।