Profile Photo

অভিমানী মনOffline

  • ovimanimon
  • Profile picture of অভিমানী মন

    অভিমানী মন

    4 years, 4 months ago

    কেউ জানে না

    কথা ছিলো সন্ধ্যায় জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আসবে; আর শিল্পী সবাইকে বলবে—সে অনিকে ভালোবাসে। কিন্তু অনি আসে না। কেনো এলো না! তবে কী ওকে অনি ভালোবাসে না! বিচিত্র দূর্ভাবনায় মাকে সব খুলে বলে। মা বলে—আজ আসে নি; পরে আসবে।
    শিল্পী কাঁদে—ওর ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি।
    মা সান্তনা দেয় বটে, জন্মদিনের আনন্দটা মাটি হয়ে যায়। শিল্পী ঘুমিয়ে পড়ে এই আশা নিয়ে যে, কাল নিশ্চয় দেখা হবে। কিন্তু মেয়েটা জানেনা, ছেলেটার সঙ্গে ওর কোনদিন আর দেখা হবে না! কারণ ও মরে গেছে।
    কাল সন্ধ্যায় শিল্পীকে গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে অনি টিউশনিতে যায়। ছাত্রের মা-বাবা ওকে ছোট ভাইয়ের মতো জানে। রাতে ভার্সিটির হলে পৌঁছে ভোর পর্যন্ত পড়বে। সকালে মাস্টার্সের শেষ পরীক্ষাটা ছিল। পরীক্ষা দিতে আসে নি। কিকরে আসবে! ওতো রাতেই মারা গেছে।
    ছাত্র পড়িয়ে নির্জন ফুটপাত ধরে ও যখন বাসস্টপেজের দিকে এগুচ্ছিলো তখন অন্ধকার থেকে কয়েকটা যুবক এসে ওকে ঘিরে ফেলে জানতে চায়—তুই অনি?
    তোমরা কে?
    আমরা তোর যম। তারপর ওরা ওনিকে ঘুষি মারে। অনি প্রথমে ব্লক করে, পরে পালটা আঘাৎ হাঁনলে আহত একজন ছুরি মেরে রক্তাক্ত করে দেয়। তাতেও কাবু না হলে অন্য একজন রড দিয়ে মাথায় বারি মারে। তখন ও ফুটপাতে লুটিয়ে পড়ে; আর ছেলেগুলো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
    অনি জানতে চায়—তোমরা কারা? আমাকে মারলে কেনো? কি দোষ আমার? ওর সব কথা গঙ্গানীর মতো হয়ে যায়।
    রাত গড়ায়ে যায় দশটা থেকে এগারোটার দিকে। একটা মাতাল লোক গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলো। পথের পাশে পড়ে থাকতে দেখে একটু দাঁড়িয়ে আলতো লাথি মেরে বুঝতে চায়, মরা না জিন্দা।
    অনি বলে—আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো, ভাই। কিন্তু ওর কন্ঠতো গোঙ্গানীর মতো হয়ে গেছে। মাতালটা হাসে—বাঁইচা আছে মনে হয়। যাউকগা…। লোকটা অনির পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নেয়। টাকা দেখে চোখ চকচক করে ওঠে। অনিকে ধন্যবাদ দিয়ে কেডসজোড়া খুলে নিজের পায়ে পরে গটগট করে এগিয়ে টাকাগুলো পকেটে ঢুকিয়ে মানিব্যাগটা ঝোপের মধ্যে ছুড়ে মারে। অনির কোনোকথা মাতালটার বোধগম্য হয় না। ফুটপাত আবার শুনশান হয়ে যায়।
    অনি বুঝে উঠতে পারে না, কী তার কর্তব্য। ওর চেতনা লোপ পেয়ে যায়। তখন বিড়বিড় করে বলে—মা, মাগো; কারা যেনো আমাকে মেরে ফেলে রেখে গেছে।
    মা বলে—সময় ভালো না, বাছা; আল্লার নাম নে।
    তখন শুভ্র বসন পক্ককেশী কেউ একজন যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায়। অনির মনে হয়—এইতো দেবদূত! নিশ্চয় আমাকে বাঁচিয়ে নেবে।
    লোকটা ঝুঁকে এসে বুঝতে পারে, ছেলেটা এখনো জীবিত। লোকটা ট্যাক্সি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। একটা পেয়েও যায়। লোকটা বলে—দেখো ড্রাইভার, আমি মরতে বেরিয়েছিলাম; অথচ যার সগৌরবে বেঁচে থাকার কথা, সে-ই কিনা মরতে বসেছে! ভগবানের কী অদ্ভুত লীলাখেলা।
    লোকটা ড্রাইভারকে অনেকগুলো টাকা দিয়ে বলে—সব টাকা তোমার; শুধু ওকে হাসপাতেল পর্যন্ত পৌঁছে দাও; যদি বেঁচে যায়…।
    টাকা পেয়ে ড্রাইভার ছোটে ঠিকই; যেতে যেতে ভাবে, কে না কে; আমার ঝামেলায় পড়ার দরকার নাই। সে অনিকে ইমার্জেন্সি গেট পর্যন্ত নিয়ে যায় বটে; নার্সরা স্ট্রেচারে তুলে নিলে গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত কেটে পড়ে।
    হাসপাতেলের ইমার্জেন্সিতে খুব হুড়োহুড়ি। অনি স্ট্রেচারে শুয়ে থাকে অনেক্ষণ। তখনো রক্তক্ষরণ হয়। দুই ডিউটি–ডক্টর একজন আরেকজনকে বলে—এই যে দেখেন, মাথায় আঘাতের দাগ; নিশ্চয় সন্ত্রাসী। সাথে কে এসেছে ডাকো…।
    নার্সরা কাউকে না পেয়ে বলে—লা ওয়ারিশ, স্যার।
    দুই ডক্টর বলাবলি করে—দেখলেনতো; মেরে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে; কিযে হচ্ছে দেশে…।
    ছেলেটা তখনো বেঁচে ছিলো। ডক্টর যখন মাথাটা সোজা করতে যায় তখনি প্রানস্পন্দন থেমে যায়।
    নার্স হাঁক ছাড়ে—হারু, হারু ডোম, ওঠো; ইধার আও।
    মাতাল ডোম হেলেদুলে অনিকে মর্গের দিকে নিয়ে যেতে যেতে জানতে চায়—কোউন হে তু বদনসিব; কৈ নেহি তেরা সাথ! রুপিয়া নেহি মিলেগা…!
    হারু ডোম ধাক্কা মেরে লাশকাটা ঘরের অন্ধকারে ছেড়ে দিলে দেহ থেকে অপসৃত হয়ে অনি শিল্পীর শয়নকক্ষে চলে আসে।
    তখন শেষরত। চাঁদটা একপাশে হেলে গিয়ে শহরের বুকে মায়াবী জ্যোৎস্না ছড়ায়। অনি মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে দেয়। মেয়েটা অপুর্ব মায়ায় জেগে উঠে অনিকে ফোন করে। ফোন বন্ধ। মেয়েটা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় দুচোখে জল গড়ায়। অনি বলে–সত্য তুমি জানো না, শিল্পী; যে দুঃখে তুমি কাঁদছো, সত্য তার চেয়ে ভয়নক। আমাকে ক্ষমা করো প্রিয়া; আমি বেঁচে নেই।

    26
    12 Comments
Skip to toolbar