Profile Photo

বিজয় দেবOffline

  • LetWrit
  • Profile picture of বিজয় দেব

    বিজয় দেব

    4 years, 4 months ago

    বিসর্জন
    ক্লাস নাইনে জীব বিজ্ঞানের ভাইভা পরীক্ষা। এঙ্টারনাল একজন শিক্ষক প্রশ্ন করলেন-
    কি নাম তোমার?
    জ্বী, তরুণ দেব।
    “দেব” আর “দেবতার” মধ্যে পার্থক্য বলতে পারবে?
    তরুণ ভাবছিল এটা জীব-বিজ্ঞানের ভাইভা নাকি ধর্মের। সে উত্তর দিলো-
    “জ্বী না স্যার, জানি না”
    এঙ্টারনাল স্যার বললেন, ঠিক আছে, তুমি যাও”।

    সেই ভাইভা পরীক্ষার টোটাল মার্ক ছিল ২৫, তরুণ পেয়েছিল ২৪। তারপর থেকে তার মাথায় ঢুকে গেল দেব আর দেবতা-র পার্থক্য কি জানতে হবে।

    তরুণ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরীতে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতো। লাইব্রেরিয়ান তার নাম দিয়েছিল সিরিয়ার রিডার। তরুণ সেই লাইব্রেরীয়ান (অবশ্যই মুসলমান)-এর কাছে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিল। ভদ্রলোক খুব সুন্দর ব্যাখ্যা দিলেন। সেই ব্যাখ্যা তরুণ আজও ভোলেনি। তিনি বললেন- যদি প্রকৃতির দিকে তাকাও, তুমি দেখতে পাবে। কিন্তু যদি প্রকৃতির রহস্য জানার চেষ্টা করো তাহলে তোমাকে ভাবতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে। যেমন গাছ দেখতে পাচ্ছ। আবার এই গাছ প্রকৃতির কোন নিয়ম মেনে- কি এমন পদ্ধতিতে পৃথিবীর বুকে প্রথম এলো- এটা দেখতে পাবে না- এর জন্য তোমাকে বিদ্যা অর্জন করতে হবে। যখন কিছু মাত্রও বিদ্যা অর্জন করবে তখন বুঝবে গাছের মধ্যেও শ্রেণী-বিভাগ আছে। ফুল-ফল, উপকারী-অপকারী ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতি একই ধারায় অসীম এবং একই ধারায় নিয়ম বজায় রেখেছে। তেমনি মানুষের নামের শেষে দেব থাকতে পারে। সেই দেব ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। কিন্তু মানুষ দেব-কে যারা প্রকৃতির মতোই দেখে রাখেন তাঁরা দেবতা। একই ধারায় অসীম এবং নিয়ম বজায় রাখা। যা দেব–এর পক্ষে একরকম অসম্ভব।
    ছোট কথায় ভালো-মন্দ-দোষ-গুণ যার আছে সে দেব-এ সীমাবদ্ধ। আর দেবতা… … … …
    তরুণ কথার মাঝেই বলল “অসীম। প্রার্থীব সব বিষয় থেকে অনেক অনেক উর্ধ্বে।”

    তরুণের একদিন লেখাপড়া শেষ হয়। চাকরী-তে যুক্ত হয়। ছন্নছাড়া তরুণ তার জীবনের কোন এক পূণ্যের কারণে পরিচিত হয় এক পবিত্র নারীর সাথে। সেই নারী এক সময় পরিণত হয় তার ভালবাসায়। একদিন কোন এক প্রেমময় মূহুর্তে নারীটি তরুণকে বলল- “তুমি আমার দেবতা। আমি তোমাকে প্রণাম করলে সৃষ্টি বন্দনার আনন্দ পাই।”

    সেই মূহুর্তে তরুণ ফিরে গিয়েছিল তার জীবনের প্রথম ভাইভা পরীক্ষায়। আর তারপর ইসলামিক ফাইন্ডেশনের সেই লাইব্রেবীয়ান-এর ব্যাখ্যায়। তখন প্রিয়তমা নারীটিকে তরুণ সব বলেছিল। তরুণের ব্যাখ্যা করার মূহুর্তে আর নারীটির ব্যাখ্যা শোনার মূহুর্তটিতে দু’জনের চোখেই ঝরছিল জল। চির আগ্রহী তরুণের মন তখন ভাবছিল- চোখে জল আসার কারণ কি?

    তরুণ তার এই ভাবনার উত্তর পেয়েছিল স্বয়ং প্রকৃতির কাছ থেকে। তরুণদের সম্পর্ক তখন এক কথায় বর্ণনা করার মতো পর্যায়ে। নারীটি একদিন তরুণকে বলল – “আমার মন-প্রাণ-দেহ সব তুমি খোলা ডায়রির মতো পড়তো পারো। আমার আজন্ম লালিত একটা স্বপ্ন আছে। যা আমি ছোটবেলা থেকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। সামনে একটা বিষেশ দিন। সেই দিন আমি আমার স্বপ্নটা তোমাকে অর্পণ করবো।”

    যদিও তরুণ ভীত ছিল। দ্বীধা ছিল। ভাবছিল এতো ভালবাসা পাবার যোগ্যতা অবশ্যই তার নেই। না থাকতেও যদি পেয়ে থাকে আর কখনও যদি এই পাওয়াটা কোন কারণে বন্ধ হয়ে যায় তখন তার কি হবে।

    সেই বিশেষ দিনটিতে নারীটি তরুণকে বুড়িগঙ্গা নদীতে নিয়ে গেল। একটা নৌকা ভাড়া করে কিছুক্ষণ বেড়ানো আর কথার এক ফাঁকে নারীটি তাঁর ব্যাগ থেকে কাঠের তৈরী একটি বাক্স বের করলো। হাতে নিয়ে তরুণের উদ্দেশ্যে বললো “আমার হাতে আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন। এটা আজ আমি বিসর্জন দিবো।” তরুণ বললো “স্বপ্নটা অর্পণ করার কথা”। নারীটি মুখে বেদনার হাসি ধরে রেখে বললো “যাকে অর্পণ করবো ভাবছিলাম সে তার যোগ্য নয়।”

    কয়েক মূহুর্ত, নদী, জল, আকাশ, নৌকা, মাঝি এমনকি স্বয়ং তরুণ নিজেকেও অদৃশ্য বোধ করতে লাগলো। শুধু যেন সেই নারীটি একা বসে আছে। বাক্স থেকে কি একটা বের করে নদীর বুকে ঢেলে দিল। ধীরে ধীরে সেই জিনিষটা তলিয়ে গেল গভীরে। নারীটি হাতের বাক্সটিও জলে ফেলে দিল।
    নারীটি তরুণকে বললো “গান শুনবে?” তরুণ তখন নিজের মাঝে ফিরে এলো। বললো “প্লিস, শোনাও”। নারীটি গাইলো-
    … … … আমি তো তোমাকে চাহিনি জীবনে
    তুমি অভাগারে চেয়েছো
    আমি না ডাকিতে হৃদয় মাঝারে
    নিজে এসে ধরা দিয়েছো … … …

    সেদিন তরুণ বুঝতে পেরেছিল কেন সেদিন চোখে জল ছিল দু’জনের। মানুষ দেবতা হতে পারে না। একই ধারায় একই নিয়ম মেনে চলার ক্ষমতা শুধুই দেবতার। মানুষকে দোষ ত্রুটির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, দেবতা এসবের উর্ধ্বে। সুতরাং আজন্ম লালিত স্বপ্ন অর্পণ পাবার যোগ্যতা তরুণের মতো মানুষের নেই।

    তরুণের পূন্যের ফল সেই নারীটি এই ঘটনারও বছর খানেক পর হারিয়ে গেল।

    আগ্রহী, সৌন্দর্য্যচর্চাকারী আর বইপোকা তরুণ তখন চাকরী-আগ্রহ ইত্যাদি সব ছেড়ে অগোছালো জীবনে অভ্যস্ত হচ্ছিল। নারীটি তার জীবনে নেই এই জন্য নয়- আর যে যাই ভাবুক তরুণ জানে, এটা একটা শুধু সম্পর্ক ছিল না, ছিল পরীক্ষা। সব সময় নিজেরই কথায় এক থাকার পরীক্ষা। সব সময় যোগ্য থাকার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় তরুণ পাশ করেনি। এই পরীক্ষায় টোটাল মার্ক কতো তরুন জানে না। তরুণ এও জানে না সে কতো পেল। সে এই ভেবে পরববর্তী পাঁচ-পাঁচটি বছর না ঘুমিয়ে, অগোছালো চলা ফেরা করে কাটিয়ে দিল যে, এই পরীক্ষায় সে ফেল করেছিল।

    পাঁচ বছর পর তরুণ আবার জীবন শুরু করেছে। সে চেষ্টা করে আবার ক্লাস নাইনের সেই ভাইভা পরবর্তী সময়টা শুধু ফিরে পেতে।

    কিন্তু প্রতিদিন শেষে রাত হয়। শরু হয় নীরবতা। একাকিত্ব। এখনও প্রতি রাতেই তরুন অকৃতকার্য হওয়ার মূহুর্তটার মুখোমুখি হয়। এখনও সে দেখতে পায় – অপূর্ব রূপবতী একটি নারী তার আজন্ম লালিত স্বপ্ন গঙ্গার বুকে বিসর্জন দিচ্ছে।

    7
    6 Comments

Friends

Profile Photo
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
Profile Photo
charumannan
@charumannan
Profile Photo
m. rashiduzzaman
@m-rashiduzzaman
Profile Photo
Joyanta Nath Prokash
@prokash840
Profile Photo
[email protected]
@mh7522677gmail-com
Profile Photo
Fahmida-Reea-Fahmida-Reea
@fahmida-reea-fahmida-reea
Skip to toolbar