-
দাম্পত্য
বহুবছর আমি একা ঘুমাতাম। ইদানিং একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে থাকি। মেয়েটার আপনজনরা ঘটা করে ওকে আমার সঙ্গে দিয়ে দেয়। আমরা একসাথে খাই, ঘুমাই, টিভি দেখি; বিয়ে এবং জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বেড়াতে যাই।
আমরা যা যা কথা বলি তা হলো—খাইতে আসো; জ্বর কেমন দেখি; বাজার শেষ, ফর্দ দেইখা সদাই কিনবা; আমাকে কেমন লাগতেছে, দেখতো; মশারি খাটাও; এখনো কম্পিউটারে কি করো!
দুজনে দুই অফিসে কাজ করি। আমাদের কাছে চাবি থাকে। ইচ্ছে মতো আসি-যাই। ফোনে আমাদের ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগ থাকে। ফোনে কথা হয় এইরকম—খবর-টবর কী?
এইতো ভালো। খাইছো?
না; বাসায় গিয়া খাবো। তুমি কোথায়?
বাসে; জ্যামে বসে আছি।
স্যাকলো আর এইচ নিয়ে এসো।
ওকে।
বাসর রাতে আমাদেরকে বেডরুমে রেখে সবাই সরে পড়েছিলো। সেই থেকে খাটটাকে কেন্দ্র করে দুজনের সময় কাটে। আদিতে মানুষ নাঙ্গা ছিলো। আধুনিক সমাজে সেরকম চলা অসভ্যতা। বেডরুমে কিন্তু আদি সভ্যতার চর্চা এখনো চলে; তবে দরজা বন্ধকরে নিতে হয়। একজন আরেকজনের সামনে কাপড়-চোপড় বদলাই। ও যখন গামছা দিয়ে চুল ঝড়ে, তখন স্তন দোল, আর আমি উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলে ‘অসভ্য’ বলে গালি দেয় না।
খাট হলো দাম্পত্য চর্চার প্রধান কেন্দ্র। এখন বুঝতে পারি, শশুর মশাইরা কেনো কনের সঙ্গে খাট-পালঙ্ক দিয়ে দেয়। দাম্পত্য সভ্যতার এই যুগে মেয়েরা পুরুষ কোথায় পাবে, ধরাধরি-জড়াজড়ি করার জন্য! খাটে আমরা লুটোপুটি-ঝাঁপাঝাঁপি করি। এখানেই ঝাঁপি খুলি আনন্দের।
ও বলে—আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আমি বলি—আমিও…।
ও আমার পেটের ভিতর ঢুকে শোয়। ঘুম এসে গেলে যখন উল্টদিকে ঘুরে যায় তখন আমি ওকে পিঠের দিক থেকে পেঁচিয়ে ধরে একদম কাছে টেনে নিই। এমন সুন্দর শয়ন-বিন্যাস দাম্পত্য জীবনের বড় অবদান। শয়ন কক্ষের মোহমায়ায় আরো আরো সম্পর্ককে আমরা রীতিমত অবহেলা করি; হিংসুটে হই।
দুটি বিষয়ে আমাদের ঝগড়া হয়, একটি হলো টাকা; ওর সন্দেহ, আমি হাজার হাজার টাকা বোনদের দিয়ে দিচ্ছি; অথচ বোনরা অহংকারে ওকে ‘ভাবি’ ডাকতে ভুলে যায়!
অন্য বিষয় হলো, মনসার ছোবল। ওর ধারণা, আরো আরো মেয়েদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। এই নিয়ে মারামারি করে ওর হাত মুঁচড়ে ভেঙ্গে দিয়ে স্ত্রী-নির্যতনের চিরস্থায়ী অপবাদে দন্ডিত হয়ে আছি। ফিরতে দেরি হলে প্রশ্ন করে—কোথায় তুমি?
বাসে; জ্যামে পড়ে আছি।
বাচ্চা কান্দতেছে কেনো!
বাচ্চা কোত্থেকে আসবে!
মিথ্যা কথার জায়গা পাও না; বাসায় আসো।তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি…।
আমাদেরকে বিয়ে করিয়ে দিয়ে বাবা, মা যেনো প্রানহারা হয়ে যায়। ওদের জীবন হয়ে ওঠে স্মৃতিচারণধর্মি। ওরা তীর্থ ভ্রমনে যেতে চায়। আমরা ওদের হজ্জ্বে পাঠাই। ফিরে এসে বছরখানেকের মধ্যে দুর্বল হয়ে গিয়ে ওরা মরে যায়। চার ঠেঙ্গার খাটে চড়িয়ে আমরা ওদের কবরে রেখে আসি।
হারানোর আগে গুরুজনদের গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারি না। হারানোর কষ্টে আমরা কাঁদি। একজন আরেকজনকে সান্তনা দিই। বিদেহী আত্মার আগমনের ভয়ে কয়েকদিন বেডরুমের বাতি নিভাই না। ছেলেবেলার হাজারো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তখন অনুভব করি, আমাদের একটা সন্তান দরকার; যে বলবে—তোমরা কেঁদো না। দাদা, দিদাতো স্বর্গে চলে গেছে; বুড়ো হয়ে গেলে আমি তোমাদেরকে কবরে পাঠিয়ে দেবো; তোমরাও স্বর্গে চলে যেতে পারবে; আমি আছি না!
ভাবতে ভাবতে দুঃখের দোলায় ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল বেলায় অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত থাকি। কিন্তু আজকে দেখি, ও একটা ফুলফুল শাড়ি পড়ে আমাকে চা সাধছে! আমি বলি—ঘটনা কী! ছুটি নিছো?
ও হাসে—না। আজকে যাবো না!
কেনো?
লিটমাস পেপারে ডবল লাল দাগ দেখলাম।
ওয়াও! বলো কী! আমি লাফিয়ে উঠে ওকে জড়িয়ে ধরি।
ও হাসে—হ্যাঁ। তুমিও ছুটি লও; আমাকে নিয়ে গাইনী ডাক্তরের কাছে যাবা।
সুখ আর দুঃখ যেনো পুরানো দম্পতি ; এভাবেই হাত ধরাধরি করে জীবনের ভিতর দিয়ে হেঁটে যায়; আর নতুন আশায় আমরা জেগে উঠি।12 Comments
Friends
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
Kishor Kanok
@kishorkanok-2
Shahajahan Tapu
@shahajahantapu
জুলহাজ আলী জীবন
@julhaj
গোলাম রাব্বানী
@rabbi-2
Reazul Kabir
@reazul-kabir
পিপীলিকা
@abujubair
আজহারুল ইসলাম তালহা
@ajharul
Rashed Rahman Abir
@rashed-rahman-abir



Nice