-
নিষুতি দুপুরে
হাসনাত সৌরভ
=======================টিফিন ছুটির আগেরটায় একটা আনচান ভাব থাকে। আইঠাই করে ওঠে মন। কখন ঠং-ঠং, ঠং-ঠং করে চারটে ঘন্টা বাজাবে হারুনকাকা অফিসঘরের সামনে, আর কখন ওরা দুদ্দাড় করে দৌড়ে মাঠে গিয়ে নামবে।
আজ গিয়াস রবারের বল এনেছে। দেওয়ালে আটকানো ব্লাকবোর্ডের পাশের ফাঁকাটায় বলটা ছুঁড়ে ফিরতি বল ধরার খেলাটা জমেও গিয়েছিল বেশ। মনিটর রাতুল খালি গজগজ করছিল, খাতা বের করে এক এক করে সবার নাম লিখবে বলে ভয়ও দেখাচ্ছিল। অগত্যা গিয়াসকে ব্যাজার মুখে বলটা লুকোতে হয়েছে। রাতুলটাকে আদৌ বিশ্বাস নেই। হেডমাস্টারের ঘরে বিনে কথায় ফরফর করে ঢুকে পড়ে। পাজি একটা। ক্লাসে মনিটর বলে গুমর কত ব্যাটার!
সুমনস্যারের ইতিহাস ক্লাস শুরু হলো। মানিক ভাবছিল ইঁটের পাঁজার মধ্যে গুঁজে মুজে লুকিয়ে রাখা নারকেল বাকলের ব্যাটটা নিশ্চয় ওখানেই আছে। আজ খেলাটা জমবে ভালো। যদিও বল এনেছে বলে গিয়াস আজ প্রথমে ব্যাট ধরবেই, আর গোটা দুই নিশ্চিত আউট ফাউ নেবে, তবুও ওর হাতে একবার তো ব্যাট আসবেই…তখন……।
‘‘মানকে…, এ্যাই মানকে তুই দাঁড়া তো দেখি,… দাঁড়া। বল…’’
মানিক, যাকে বলে, থতমত খেয়ে কেঁপেই উঠল সটান। কিছুই তো কানে ঢোকেনি এতক্ষণ!
হঠাৎ বাইরে হৈ হৈ করে একটা শোরগোল উঠল। ক্লাস ফাইভের দিক থেকেই আওয়াজটা আসছে। সুমনস্যারও খানিক থমকে গেছেন। মশমশ করে হারুনকাকা নোটিশ খাতাখানা হাতে গম্ভীর মুখে দরজা দিয়ে ঢুকলো। মানিক মূর্ধন্যর মতো ঘাড়গুঁজে তখনও ঠায় দাঁড়িয়েই।সুমনস্যার ভ্রু কুঁচকে নোটিশখাতাখানা পড়ে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘এই সবাই মন দিয়ে শোন, এই স্কুলের এক প্রাক্তন মাস্টারমশাই, শ্রদ্ধেয় বজলুর রহমান গতকাল দেহত্যাগ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকপালনের জন্য আজ স্কুল অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করা হলো। চতুর্থ, মানে এই পিরিয়ডের পর আর কোনো ক্লাস হবে না, বুঝলি। আর শোন হল্লা করবি না একদম। সব শান্তভাবে বেরোবি।’’ আহা…. মানুষটা চলে গেল গো, এই কদিন আগে… শেষের কথাগুলি মৃদু হয়ে এলো সুমনস্যারের।
মানিক এদিকে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মনে মনে খুশি খুশি একটা ভাব এলেও একটু দুঃখও হচ্ছিল। বজলু মশাইকে সে কখনো দেখেনি। তবুও জানে মরে যাওয়া খুব খারাপ।
ওর দাদু যখন মারা গেল, তখন সে বেশ ছোট। তবুও তার মনে আছে, দাদু কেমন কাঠ হয়ে শুয়েছিল দলিচের বড় খাটটায়। তোবড়ানো গাল দুটো যেন আরো তুবড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। আলতো ফাঁক হওয়া ফোকলা মুখের মধ্যে জিভটা যেন শক্ত হয়ে স্থির। দাদু আর কথা বলেনি, ওকে ডাকেনি। মা কাঁদছিল, কাকিমা কাঁদছিল, কাকু শুকনো মুখে দাদিকে জড়িয়ে বসেছিল উঠোনে উনুনের পাশে, মাটিতে। বাবা ওকে দাদুর পায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, ‘‘সেলাম কর।’’ তারপর সবাই মিলে কাঁচা বাঁশের খাটিয়ায় দাদুকে তুলে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আর কোনোদিন দাদুকে দেখেনি মানিক। ফুফি বলেছিল, দাদুর গায়ে আগুন লেগিছিল। আজও কত সন্ধ্যায় সামনে বই খুলে রেখে হারকিনের কাঁচের মধ্যে তিরতির করতে থাকা আগুনের শিখাটার দিকে তাকিয়ে কেঁপে ওঠে মানিক। আগুনের তাতে কত ফোস্কাই না জানি পড়ে গেছে দাদুর সারা গায়ে।
ওরা হৈ চৈ না করলেও, দুদ্দাড় করে ব্যাগ বগলে বেরুলো। গেট পেরিয়েই চিৎকার। মানিক অবশ্য চেঁচামেচি-টেচি করে নি। খটখটে রোদ থেকে মাথাটা বাঁচাতে ব্যাগটা মাথায় ছাতার মতো ধরে সারেংবাড়ির পুকুরপাড়ের শর্টকাট রাস্তাটা ধরেছিল। খানিকটা এগোনোর পর কজন পাঁই পাঁই কওে দৌড়ে পেরুলো। জানাপাড়ার ঘোঁতনাকে জিগাতে সে বলল, হেডমাস্টারমশাই নাকি সবাইকে ডাকছেন আবার। স্কুল মাঠে নাকি বজলু মাস্টারের স্মরণে শোকসভা হবে। যারা ইতিমধ্যে বেরুতে পারেনি তারা আটকা পড়েছে। যারা গেটের সামনাসামনি ছিল তাদেরকেও ডেকে-টেকে ঢোকাচ্ছে আবার। শুনে মানিক পড়ল দোটানায়, ফিরে যাবে কি যাবে না! পুকুরের দিক থেকে হালকা হাওয়া বয়ে আসছে। হাওয়ায় যেন গরম ভাপ। মানিক নারকেল গাছের তলায় থমকে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। পুকুরের পাড়জুড়ে অজস্র কচুগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। হাওয়ায় তারা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে যেন ‘না না’ বলছে। মানিকও ভাবল, ধুর গিয়ে আর কি হবে!
বাঁশের বেড়ার তৈরি দরজাটা ঠেলে ঢুকল মানিক। চারিদিক চুপচাপ, নিস্তব্ধ। পুকুরপাড়ের কলাগাছগুলো রোদের তাতে ঝুপসে ঢুলছে। মানিকের পাও যেন শ্লথ হয়ে এলো। মনটা কেন যে খারাপ হলো হঠাৎ কে জানে! বেজায় ঘুম পাচ্ছে ওর।
ভোলু উঠোনের পাশে ছাইকাঁড়ির ধারে ঘুমিয়ে আছে। তবুও তার কানদুটো ওর পায়ের শব্দে ওর পানে তাকাল যেন। মুখে মৃদু শব্দ করল, ‘ভুক্’। লেজখানা তিনবার নাড়িয়ে থামল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল মানিক। ব্যাগখানা বেঞ্চের গায়ে রাখতে সেটি আলস্যিতে গড়িয়ে শুল মেঝেতে। চপ্পল জোড়া বেঞ্চের তলায় ছুঁড়ে জামাটা মাথা গলিয়ে খুলে ও ছুঁড়ে দিল জানালার পাশে আলনায়।
ওদিকের ঘরটা থেকে ভোঁস ভোঁস করে আওয়াজ আসছে। কাকিমার নাক ডাকছে। পা টিপে টিপে ও রান্নাশালের দিকে এগুলো। কলসি গড়িয়ে একবাটি জল খেতে খুব ইচ্ছে করছে। তেষ্টায় বুকটা চড়চড় করছে। খিড়কির বারান্দায় মাদুর পেতে দাদি চিৎ হয়ে ঘুমোচ্ছে। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। ছড়ানো বাঁহাতের পাশে হুলোটাও পেটিয়ে ঘুমোচ্ছে। দাদিমার ডানদিকে কোলকুঁজো হয়ে ওর মা ঘুমিয়ে। আলতা পরা পা দুখানি শুধু শাড়ির তলা দিয়ে বেরিয়ে আছে। মাথার কাছে পানের বাটায় জাঁতি চাপা হয়ে দুখিলি পান শুয়ে আছে।
ও রান্নাশালে ঢুকল। মাটির কলসিটার মুখে পেতলের বাটির চাপা। কেমন একটা মিঠে গন্ধ ভুরভর করছে জায়গাটায়। ওপরের শিকের মাটির সরায় কি আছে! পিড়া একটা টেনে, তার ওপর দাঁড়িয়ে শিকা থেকে সাবধানে নামাল ও সরাটা। ওফ্! কি সুন্দর ঘিয়ে রঙা পাটিসাপটাগুলো শুয়ে আছে সরাটায়। একটার ওপর একটা গা এলিয়ে ঘুমোচ্ছে সব আলস্যে।
‘‘মানিক, মানিকরে….. দেখছ ছেলের কাণ্ড! রান্নাশালে কেউ কি ঘুমোয়! মাটিতে ঘুমোচ্ছে কেমন দেখো নিঃসাড়ে! ওরে একটাও পাটিসাপটা রাখেনিরে ছেলেটা! কি কাণ্ড, দেখবি আয় বউমা।’’
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
8 Comments-
@drako বন্ধুর চোখ, নিজেকে দেখবারই আয়না!
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula



অভিনন্দন