-
শিরোনাম:সাহিত্য মানবতাকে পুনরায় সংযুক্ত করতে পারে
লেখা ও পড়া মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। মানব ইতিহাসের পাতায় এর বহু পর্যায় আবিষ্কৃত হয়েছে। সর্বপ্রথম মানুষ গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত, তারপর মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) সুমেরীয়রা একটি নিয়মিত লিখন পদ্ধতি শুরু করে এবং তারা মাটির ফলকে লিখতে শুরু করে। ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রণযন্ত্রের আগমন ঘটে এবং মানুষের লেখা ও পড়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এরপর মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে নয় বরং সৃজনশীলতার জন্য লেখা ও পড়াকে ব্যবহার করতে শুরু করে এবং এটি এমন একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে যা মানবজীবনকে বদলে দেয়। প্রাথমিকভাবে, মানুষ কল্পনার অবাধ বিচরণের জন্য গণনার সরঞ্জাম ব্যবহার করতে শুরু করে, যেখান থেকে পৌরাণিক কাহিনী ও কিংবদন্তির জন্ম হয়। যা মানুষের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা দূর করে এবং ধীরে ধীরে একটি সাধারণ মানব চেতনার সৃষ্টি হয়। যাকে আমরা এখন বিশ্ব মানব চেতনা বলি। সৃজনশীল লেখার প্রাচীনতম উৎস হলো ‘গিলগামেশের মহাকাব্য’ বা হোমারের ‘ইলিয়াড’, যেখানে প্রথমবারের মতো মানুষের বীরত্ব ও মৃত্যুভয়কে লিখিত রূপ দেওয়া হয়েছিল। মহাভারত হলো প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের একটি মহান সৃষ্টি, যা সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মহা কবি ফেরদৌসীর ‘শাহ নামা’ ইরানের যুদ্ধ ইতিহাস এবং বীর পুরুষদের কাহিনী। যুদ্ধ সাহিত্যের জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর দুটি প্রধান বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যেগুলোতে প্রচুর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে আনন্দ ও হতাশার উপাদানগুলো সুস্পষ্ট ছিল। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার প্রভাব জাপানি এবং বিশ্ব সাহিত্যের উপর সুদূরপ্রসারী ছিল। লিও টলস্টয়ের উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, যাকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলা হয়, তাতে রুশ সমাজে নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে
কবি আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যে ভারতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে—এতে চিতোরের রানি পদ্মাবতী ও দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি-র কাহিনি বর্ণিত। এখানে চিতোর দুর্গ দখলকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে । এই যুদ্ধ মূলত: ক্ষমতা ও সৌন্দর্য অর্জনের লড়াই ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় রাজনীতি ও সংঘর্ষের প্রতিফলন ঘটেছে।
এরিখ মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা একটি উপন্যাস, যেখানে লেখক যুদ্ধের নামে কীভাবে তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হয়েছিল, সেই বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি উপন্যাস লিখেছেন। এরপর আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’, হেমিংওয়ে নিজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক ছিলেন। এই উপন্যাসে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে জন্ম নেওয়া এক আমেরিকান সৈনিক ও এক নার্সের প্রেমের গল্প বর্ণনা করেছেন। উর্দুতে দেশভাগের আগে মানুষের রক্তপাত ও তার প্রভাব নিয়ে লেখা হয়েছে ‘খুদা কি বস্তি’, কুরাত-এ-আইন হায়দারের ‘আগ কা দরিয়া’ও একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দীর যুদ্ধের কারণে সমাজের পরিবর্তন ও তার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগ থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধ ও সমাজচিত্রের মাধ্যমে সমাজকে সচেতন করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী-এর চণ্ডীমঙ্গল এবং বিপ্রদাস পিপিলাই-এর মনসামঙ্গল-এ দেবতা ও মানুষের সংঘর্ষের মাধ্যমে ধর্মীয় শক্তির প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ঊনবিংশ শতকে দীনবন্ধু মিত্র-এর নীলদর্পণ-এ নীলকরদের অত্যাচার ও কৃষকের দুর্দশা বাস্তবভাবে চিত্রিত হয়েছে। কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মহাকাব্য অনল প্রবাহ গ্রন্থে সর্বশেষে ব্রিটিশদের শোষণের চিত্র উপস্থাপন করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর মেঘনাদবধ কাব্য-এ রাম-রাবণ যুদ্ধকে নতুন দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অতএব, বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধচিত্র ধীরে ধীরে পৌরাণিক থেকে বাস্তব সামাজিক রূপে পরিণত হয়ে সমাজকে সচেতন করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দেশভাগ পর্যন্ত সময়কালকে বর্ণনা করে। এছাড়া, আধুনিক সময়ে ফারসি সাহিত্যে ইরান-ইরাক যুদ্ধ নিয়ে প্রচুর লেখা হয়েছে। ‘চেস উইথ দ্য ডুমসডে মেশিন’ হলো ইরান-ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা একটি উপন্যাস। এছাড়া, ইসমাইল ফাসিহের একটি উপন্যাস হলো ‘উইন্টার অফ ৮২’, যা যুদ্ধকালীন তেহরানের সাধারণ জীবন এবং মানুষের মানসিক অবস্থা বর্ণনা করে। তুর্কি সাহিত্যে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং আধুনিক তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ একজন আহত অফিসারের গল্প বলে। যে-ই সেই গ্রামে যায়, সেখানকার গণযুদ্ধের শীতলতা দেখে অবাক হয়ে যায়।বিশ্বে যুদ্ধ নিয়ে এখনও প্রচুর সাহিত্য রচিত ও পঠিত হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ বারুদের ভাষা বুঝতে পারেনি। সম্ভবত ক্ষমতা ও সম্পদ দখলের সিদ্ধান্তই যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন বৃহৎ অস্ত্র শিল্প গড়ে ওঠে, তখন সেগুলোর ব্যবহারও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অপরপক্ষে, সাহিত্য মানুষকে অন্য মানুষের, এক রাষ্ট্রের, অন্য রাষ্ট্রের যন্ত্রণা অনুভব করার ক্ষমতা দেয়। একই সাথে, যুদ্ধ মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে। অস্ত্র অত্যন্ত কার্যকর, কিন্তু সাহিত্যের প্রভাব খুব ধীর। একশ বছর আগে লেখা একটি বই আজকের মনকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সেই মন হয়তো যুদ্ধ না করার বা মানবতার জন্য মঙ্গলজনক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জার্মান লেখক বের্টোল্ট ব্রেখট বলেছেন, “শাসকরা যখন শান্তির কথা বলেন, তখন বুঝবেন যে যুদ্ধ আসন্ন।” এর সর্বশেষ উদাহরণ আমরা দেখেছি ট্রাম্পের তৈরি শান্তি বোর্ডে শান্তি ঘোষণার পর, তার পরপরই ইরান আক্রমণের ফলে এর সর্বোচ্চ নেতা শহীদ হন। রাজনীতির উদ্দেশ্য হলো সমাজের ব্যবস্থা পরিচালনা করা এবং সাহিত্য সেই ব্যবস্থার প্রভাব বর্ণনা করে। যখন রাজনীতিতে অবিচার, নিপীড়ন বা দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, তখন সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটে এবং প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে একটি তত্ত্ব তৈরি করেন। কিছু লেখক প্রগতিশীল, আবার অন্যরা সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের মতো রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর সাহিত্য রচনা করেন। কিছু লেখক তাদের কলমের মাধ্যমে সাহিত্যকে প্রতিরোধের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যার উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং শেখ আয়াজের কবিতা। রাজনীতি সাহিত্যকে পরিবর্তন করে এবং সাহিত্য রাজনীতির অভ্যন্তরে ক্ষমতার জন্য চলমান যুদ্ধকে বর্ণনা করে। এটি দেখা গুরুত্বপূর্ণ যে, পৃথিবীতে যেখানেই সাহিত্যিক মনীষীরা আছেন, তারা কীভাবে প্রতীকী এবং সার্বজনীন ভাষা ব্যবহার করে তাদের কলমের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি ঘৃণা এবং শান্তিপূর্ণ জীবন ও মানবতার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। আজকের লেখকরা গতকালের যুদ্ধ-রোমাঞ্চের অবসান ঘটিয়েছেন। লেখকদের উচিত তাদের সৃজনশীল ক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ এবং মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ক্রমাগত আওয়াজ তোলা। কারণ কলমের শক্তি ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি। মহান নেতারা শুধু আবেগের সাথে পড়তেনই না, অনেক নেতা নিজেরাই লেখক ছিলেন। তাদের মধ্যে উইনস্টন চার্চিল নিজেও একজন লেখক ছিলেন, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরুর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ বইটি তাঁর সাহিত্যরুচির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বারাক ওবামা তাঁর রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে প্রিয় বই ও উপন্যাসের একটি তালিকা প্রকাশ করতেন, আব্রাহাম লিঙ্কন শেক্সপিয়রের নাটক ও কবিতার অনুরাগী ছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ব্যক্ত করেছিলেন নানা মাধ্যমে। তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর সম্মানসূচক ভ্রমণ। তিনি ভারত থেকে কাজী নজরুল ইসলামের অমর সাহিত্য, দলিলপত্র ও স্মৃতিসৌধকে সসম্মানে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা শুধু সাহিত্যকর্মের সংরক্ষণই নয়,ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতীক। কিন্তু একই সাথে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বই পড়ায় কোনো আগ্রহ নেই। যদিও নেতানিয়াহু একজন বিতর্কিত নেতা, তাঁর একটি সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। তিনি যুদ্ধ কৌশল এবং বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনি সাহিত্য, কবিতা ও ইতিহাস খুব পছন্দ করতেন এবং তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। সাহিত্য মানুষকে মানবিক করে তোলে, তাকে নিজের সাথে সংযুক্ত করে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য শেখায় এবং সংকীর্ণমনা ও চরমপন্থা দূর করে। যখন যুদ্ধ পথ বন্ধ করে দেয়, সাহিত্য তখন নিঃশব্দে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে, কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্ব এক ভয়াবহ যাত্রাপথে রয়েছে, যেখানে দর্শন, সাহিত্য এবং চারুকলা তাদের মর্যাদা হারিয়েছে। যুবসমাজ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার অভাব দেখা যাচ্ছে এবং সমাজকে মৃত বলে মনে হচ্ছে। সাহিত্য ও চারুকলার মাধ্যমে মানুষকে পুনরায় মানুষকে ভালোবাসতে শেখানো যায়।
Friends
এস এম সজিবুল ইসলাম
@shojib-rumman
Aziza Mahbub Siddique
@aziza-mahbub-siddique
Syed Farah
@syedfarah
ইভান
@ivan
মামুনুর রশিদ
@mamun01722525933gmail-com
আহমেদ আরভিন
@sweetsohely
মোঃ আবু মুনিফ আল মুকিম।
@munifalmukimrocky
অনুভূতির ডাইরি
@onuvutir-dairi
Abcde gh.
@abcdegh
